লক্ষভ্রষ্ট হয়ে তীরটা বিওনের গলার বদলে কাঠের টুকরাটা ধরে রাখা হাতে বিধলো।
জারাস আর অন্যান্য যারা এটা লক্ষ করছিল, তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলো। ওরা ভেবেছিল আমি ইচ্ছা করে বিওনের হাতটা কাঠে বিধিয়েছি। এবার আরেকটা তীর তুলে নিয়ে ওদেরকে দেখাবার জন্য লক্ষ্য স্থির করে বিওনের অন্য হাতটাও কাঠের খণ্ডটার গায়ে বিধলাম। ক্রুশবিদ্ধ হবার মতো অবস্থা হয়ে সে একটা নেকড়ের মতো চিৎকার করে উঠলো।
মুলত আমার স্বভাব করুণাময়, তাই তাকে আর কষ্ট না দিয়ে তৃতীয় তীরটা ছুঁড়তেই তার গলা ভেদ করে চলে গেল।
আমার জাহাজের নাবিকেরাও আমাকে অনুসরণ করলো। ওরাও ধনুকে তীর জুড়ে জাহাজের পাশে দাঁড়িয়ে নিচে পানিতে শক্রর উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়তে শুরু করলো।
যা ঘটছিল তা থামাবার মতো শক্তি আমার ছিল না। আমার লোকদের অনেকে এই জঘন্য হাইকসোদের হাতে তাদের বাপ আর অনেকে ভাই হারিয়েছে। তাদের মা বোনদের এরা বলাৎকার করেছিল।
কাজেই কিছুক্ষণ হাইকসো অভিজাতদের এই দুর্দশা তাকিয়ে দেখলাম, তারপর তীরবিদ্ধ শেষ মৃতদেহটা স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর আমি আমার লোকদের থামতে বললাম।
অনুতপ্ত না হয়ে আমার লোকেরা উল্লাসে চিৎকার করতে করতে আবার দাঁড় হাতে নিল। হাইকসোদেরকে তাদের জঘন্য শেঠ দেবতার করুণায় ছেড়ে দিয়ে আমরা দক্ষিণদিকে থিবসে আমাদের আসল মিসর রাজ্যের দিকে এগিয়ে চললাম।
.
আমাদের বর্তমান মিসর রাজ্য আর হাইকসো গোত্র আমাদের দেশের যে এলাকা দখল করেছিল তার মাঝে কোনো পরিষ্কার সীমানাচিহ্নিত করা ছিল না। প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে দুই পক্ষের মাঝে আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ আর লড়াই হতো।
পেয়াইনি মাসের পঞ্চম দিনে আমরা থিবস ছেড়ে এসেছিলাম। এর মধ্যে সেনাপতি ক্রাটাস হাইকসো হামলাকারীদেরকে শেখ আবাদা নগরী থেকে বিশ লিগ দূরত্বে হটিয়ে দিয়েছিলেন। যাইহোক এখন এপিফি মাস চলছে, আমাদের অবর্তমানে অনেক পরিবর্তন নিশ্চয়ই ঘটেছে। তারপরও ওদেরকে অবাক করে দেবার মতো ব্যাপার আমরা ঘটিয়েছি।
হাইকসোদের সামনের সারির সৈন্য কিংবা সেনাপতি ক্রাটাসের অধীনে যুদ্ধরত আমাদের সৈন্যদের কেউ আশা করবে না যে মধ্যসাগরের তীর থেকে চারশো লিগ নদীপথ পাড়ি দিয়ে একটি মিনোয়ান রণ-নৌবহর হঠাৎ এসে হাজির হবে। তাই পরিচিত এলাকায় পৌঁছার পর তিনতলা জাহাজগুলোর মাস্তুলের ডগায় হাতে বানানো ফারাও ত্যামোজের নীল পতাকা উড়িয়ে দিলাম।
নীল নদীর দক্ষিণপ্রান্তে আমাদের তিনতলা জাহাজগুলোর মোকাবেলা করার মতো হাইকসো কিংবা মিসরীয় কোনো জাহাজই নেই। আমরা প্রমাণ করেছি যে, কেউ আমাদেরকে থামাতে পারবে না। অবশ্য হাইকসোরা পায়রা উড়িয়ে খবর পাঠিয়ে আমাদের আর মিসরের মাঝে অবস্থান করা তাদের সেনাবাহিনীকে সাবধান করে দিতে পারে। তবে পায়রা শুধুমাত্র তাদের ডিম থেকে ফোঁটার স্থানেই ফিরে যেতে পছন্দ করে, অন্য কোথাও কেউ পাঠাতে চাইলে তারা সেখানে যাবে না।
.
হাইকসসারা যখন আমাদেরকে নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তার আগে আমাদের শাসক ছিলেন ফারাও ম্যামোজ। সে-সময়ে আমি, তায়তা ছিলাম প্রধান উজির ইনতেফের ক্রীতদাস। তিনি ছিলেন কারনাক মন্দিরের নোমার্ক বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক এবং উচ্চ মিসরের সকল বাইশটি নোম বা প্রদেশের প্রধান উজির। এছাড়াও তিনি নেক্রোপলিস এবং রাজকীয় সমাধিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশাসক ছিলেন।
জীবিত এবং মৃত সকল ফারাওয়ের সমাধি দেখাশোনার দায়িত্ব তার উপর ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি ফারাও ম্যামোজের সমাধিরও সরকারি স্থপতি ছিলেন।
তবে প্রভু ইনতেফের জন্মগত কোনো সৃষ্টিশীল প্রতিভা ছিল না। তিনি বরং ধ্বংসাত্বক কাজে পটু ছিলেন। তিনি একটি গরুবাছুরের খোয়াড় কিংবা কবুতরের খোপও তৈরি করতে পারতেন কিনা আমার সন্দেহ। তিনি শুধু রাজকীয় সেবায় সময় কাটাতেন আর কঠিন যে কাজগুলো নিজে করতে পারতেন না সেগুলো আমার কাঁধে চাপিয়ে দিতেন।
প্রভু ইনতেফের সাথে আমার তেমন সুখকর স্মৃতি ছিল না। তার অধীনস্থ লোকদের একজন গোলাম আমার উপর খোঁজা করার ছুরিটা চালিয়েছিল। সে ছিল একজন নিষ্ঠুর, নির্দয় মানুষ। তবে শেষপর্যন্ত অবশ্য আমি তার সাথে শেষ বোঝাঁপড়াটা করতে পেরেছি।
তবে সেই খুশির দিনটির অনেক আগে আমিই ফারাও ম্যামোজের চমৎকার সমাধিসৌধের সমস্ত কক্ষ, গুহাপথ আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘরের নকশা করেছিলাম। তারপর এই বিশাল সৌধ নির্মাণ কাজে শ্রম দেওয়ার জন্য যেসব নির্মাতা, রাজমিস্ত্রি, শিল্পী আর কারিগরদের ডাকা হয়েছিল, তাদের সকলের কাজ আমি তত্ত্বাবধান করেছিলাম।
ফারাও ম্যামোজের বিশালাকায় পাথরের শবাধারটি একটি মাত্র গ্রানাইট পাথরখণ্ড কেটে তৈরি করা হয়েছিল। এর ভেতরে অনায়াসে একটির মাঝে আরেকটি, এভাবে মোট সাতটি রূপার কফিন রাখার জায়গা ছিল। সবচেয়ে মাঝখানের কফিনে ফারাওয়ের মমিকরা দেহটি রাখার কথা ছিল। এতে পুরো জিনিসটা অনেক ভারি আর বড় হয়ে যেত। এই জিনিসটি যথাযথ শ্রদ্ধার সাথে নীল নদীর তীরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির থেকে দুইশো গজ দূরত্বে রাজার উপত্যকার পাদদেশে সমাধিসৌধে নেওয়ার কথা ছিল।
এই স্থানান্তরের কাজটি করার জন্য আমি নীল নদীর তীর থেকে কালো মাটির সমতল জমির উপর দিয়ে তীরের মতো সোজা একটা খাল খনন করেছিলাম। ফারাওয়ের বজরা চলার মত খালটা যথেষ্ট চওড়া আর গভীর করা হয়েছিল।
