আমি জারাসকে যে জায়গাটা দেখিয়েছিলাম ঠিক সেই জায়গাটি লক্ষ্য করে আমরা রাজকীয় বজরায় আঘাত হানলাম। বিকট মচমচ আওয়াজ তুলে ব্রোঞ্জের বিশাল ডগাটা সামনের বজরাটির কাঠ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লো। সংঘর্ষের সাথে সাথেই দাড়ী বেঞ্চে বসা আমাদের বেশিরভাগ লোক ডেকে ছিটকে পড়লো। আমি শক্ত কাঠের বেঞ্চ ধরে নিজেকে সামলালাম। আমার চারদিকে কী ঘটছে সব আমি দেখতে পেলাম।
লক্ষ্য করলাম আমাদের জাহাজের পুরো শক্তি আর ওজন রাজকীয় বজরার এক পাশে ছোট একটি জায়গায় কেন্দ্রিভূত হয়ে আঘাত করেছে। একটা ভারি কুড়ালের ফলা যেমন এবটি কাঠের গুঁড়ি ফেড়ে ফেলে সেরকমভাবে আমরা এটা ফেড়ে ফেললাম। আমাদের জাহাজের ডগা বজরাটি চাপা দিতেই এর হালের কয়েক টুকরা আমাদের জাহাজের সামনের অংশের নিচে তলিয়ে গেল।
আমাদের জাহাজ ওদের উপর চড়াও হতেই আমি দেখলাম, শীতকালের ঝড়ো বাতাসের তোড়ে যেমন চিনার গাছের উঁচু ডাল থেকে পাতা ঝরে পড়ে, ঠিক তেমনি হাইকসো প্রহরীদলের সদস্যরা রাজকীয় পিরামিডের সিঁড়ির ধাপ থেকে ছিটকে পড়লো। আর রাজা বিওন সবচেয়ে উঁচু থেকে পড়লো। তার বিশাল দেহজুড়ে আলখাল্লাটা ফুলে গেল আর জটপাকানো দাড়ির বেণিগুলো মুখে আছড়ে পড়তে লাগলো। শূন্যে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে সে নদীতে পড়লো। আমাদের থেকে ত্রিশ কদম সামনে সে পানিতে ভাসছিল, পানি আটকে থাকায় তার আলআল্লাটা ফুলে গিয়ে তাকে ভাসিয়ে রেখেছিল।
আমার দুই পাশে বাকি দুটি জাহাজও হাইকসোদের অন্যান্য ছোট ছোট বজরাগুলোর গায়ে ধাক্কা মেরেছে। ওরা বেশ সহজেই বজরাগুলোর কাঠ চিড়ে ফেললো, বজরার উপরের যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করে ডেক থেকে পানিতে পড়ে গেল।
রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলো আমাদের তিনতলা জাহাজের দুইপাশ দিয়ে ছড়িয়ে পড়লো। পাল ঘেঁড়ার প্রচণ্ড চড়চড় শব্দ, দড়ি ছিঁড়ে ফট ফট শব্দ, কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ আর জাহাজের হালের ধাক্কায় পিষে যাওয়া মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আমাদের জাহাজের ডেকও একপাশে হেলে যাওয়ায় মানুষজন আর ডেকের উপরের বিভিন্ন জিনিসপত্র একদিকে সরে গেল।
তারপর আমাদের সুন্দর জাহাজটি ভাঙা বজরার ভাঙা অংশগুলো থেকে ছাড়া পেয়ে আবার ভারসাম্য ফিরে পেল এবং পানির উপর সোজা হয়ে দাঁড়াল।
জারাস আবার চিৎকার করে উঠলো, বৈঠা হাতে নাও! আমাদের লোকেরা আবার বেঁধে রাখা বৈঠাগুলো তুলে নিয়ে বাওয়ার জন্য আংটায় বসালো। জারাস আবার বলে উঠলো, পেছনে বাইতে শুরু কর! কেবল পেছনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা বৈঠা পানিতে পৌঁছাতে পারছিল। সামনের বেঞ্চিতে বসা দাঁড়িরা রাজকীয় বজরার ভাঙা অংশগুলোর কারণে দাঁড় বাইতে পারছিল না।
যারা দাঁড় বাইতে পারছিল, তারা জোরে জোরে কয়েকবার বৈঠা চালিয়ে আমাদেরকে আটকে থাকা ভাঙা বজরার অংশ থেকে ছাড়িয়ে আনলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভাঙা টুকরাগুলো পানিতে তলিয়ে গেল।
আমি অন্য তিনতলা জাহাজ দুটোর দিকে তাকালাম। দিলবার আর আকেমি তাদের অধীনস্থ লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল। ওদের জাহাজের নাবিকরাও ঢাক পেটানোর তালে তালে দ্রুত বৈঠা চালিয়ে জাহাজদুটোকে জায়গামত ফিরিয়ে নিয়ে আসছিল।
নদীর পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকা মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে, বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টারত মানুষ আর ভাঙা টুকরায় নদী ভরে রয়েছে। ডুবন্ত নারী পুরুষের মরণপণ চিৎকার আর আর্তনাদ চারপাশে এক করুণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘ এক মিনিট আতঙ্কিত হয়ে আমি এই বিভিষিকাময় হত্যাযজ্ঞ লক্ষ্য করলাম। অপরাধবোধ আর অনুতাপে আমি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম। বিপর্যস্ত এই প্রাণীগুলোর দিকে শুধু হাইকসো পশু মনে করে আর তাদের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এরাও মানুষ, যারা নিজেদের জীবন বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
তারপর রাজা বিওনের দিকে নজর পড়ার সাথে সাথেই আমার এই অনুভূতি বদলে গেল। মনে পড়ে গেল নাকুয়াদার যুদ্ধে হাইকসো পশুরা যখন আমাদের চমৎকার আর সাহসী দুইশো তিরন্দাজকে বন্দী করেছিল তখন বিওন তাদের সাথে কী আচরণ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের উপরে শেঠ দেবতার মন্দিরের ভেতরে ওদেরকে আটকে রেখে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে সেই দানবীয় দেবতার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেছিল।
এখন বিওন রাজকীয় বজরার একটা কাঠের তক্তা একহাতে ধরে রেখেছে আর অন্য হাতে তার রত্নখচিত তলোয়ার নিয়ে তার হেরেমের যে সব নারী কাঠের টুকরাটিতে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছিল তাদের মাথায় কোপ মারছিল। নির্দয়ভাবে সে তাদেরকে তাড়াচ্ছিল, কাউকেই সেই কাঠের খণ্ডটি ধরে ভেসে থাকার সুযোগ দিতে রাজি নয়। আমি লক্ষ্য করলাম সে আমার আদরের বেকাথার সমবয়সি একটি শিশুর মতো মেয়ের উপর তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলো। তলোয়ারের ধারাল ফলার আঘাতে পাকা ডালিমের মতো মেয়েটির মাথা কেটে গেল। দরদর রক্ত ঝরতে লাগলো, তারপরও বিওন অশ্লীল ভাষায় মেয়েটিকে গালি দিয়ে আবার তলোয়ার দিয়ে কোপ মারলো।
আমি দ্রুত নিচু হয়ে সামনের বেঞ্চির নিচে রাখা গুন লাগান ধনুকটি তুলে নিলাম। তীরগুলো তূণ থেকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, একটা তীর নিয়ে ধনুকের ছিলায় লাগিয়ে ছিলাটা টেনে টান টান করলাম, তারপর সোজা হয়ে পূর্ণশক্তিতে তীর ছুঁড়লাম। যেকোনো নিপুণ তিরন্দাজের মতো ধনুকের ছিলা আমার ঠোঁট ছুঁতেই সেটা ঢিল করে দিতাম। কিন্তু আজ প্রচণ্ড রাগে আমার হাত কাঁপছিল, তাই তীরটা ছুঁড়ার সময় বাঁকা হয়ে ছুটলো।
