তবে আমাদের জাহাজ সামনে এগোবার জন্য নীল নদীর মাঝ বরাবর জায়গাটি সম্পূর্ণ খালি রাখা হয়েছে। জলপথের শেষ মাথায় সুসজ্জিত আর রং করা বেশ কয়েকটি বজরা আর ছোট ছোট নৌকা নোঙর করা রয়েছে। আর মাঝখানে রয়েছে সবচেয়ে বড় রাজকীয় বজরা। তবে এটিও আমাদের তিন জাহাজের তুলনায় ছোট।
জনতার কোলাহলের মাঝে আমি চিৎকার করে জারাসকে বললাম, আঘাত করার জন্য আরও জোরে বৈঠা বাইতে বল। মাঝখানের লাল বজরাটি বিওনেরই, এটা লক্ষ্য করে জাহাজ চালাও।
দুইহাত তুলে আমি রেশমি কাপড়ের টুকরাটি দিয়ে চোখের নিচ পর্যন্ত মুখ ঢেকে ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণটা মাথায় পরলাম। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাই। যেন অসতর্ক কোনো মুহূর্তে বিওনের রাজদরবারের কেউ আমাকে চিনতে না পারে।
আমাদের জাহাজের হাল ধরে রাখা দুই নাবিক জাহাজের ব্রোঞ্জের ডগাটা রাজা বিওনের রাজকীয় বজরা বরাবর লক্ষ্য স্থির করে রয়েছে। পেছনে বাকি দুই জাহাজ অর্ধেক জাহাজ দূরত্বে রয়েছে যেন আমরাই প্রথম আঘাত হানতে পারি। বাদকরা ঢাকের ছন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আর আমি অনুভব করলাম ঢাকের তালে তালে আমার হৃৎস্পন্দনও চলেছে।
আমাদের সাথে লাল বজরার দূরত্ব দ্রুত গতিতে চারশো থেকে দুইশো কদম কমে এসেছে। আমি দেখতে পেলাম বজরারি চওড়া দিকটা নদীর স্রোত বরাবর রেখে নোঙর করা। উপরের ডেকে উঁচু ধাপের একটা পিরামিডের চারপাশে তাঁবুর মতো শামিয়ানা টানানো হয়েছে। শামিয়ানার নিচে একটা সিংহাসন আর তার উপর বসা একটা মানুষের মূর্তি দেখতে পেলাম। তবে এতদূর থেকে সবকিছু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
সিংহাসনের চতুর্দিকে বর্শাধারী পাইক-বরকন্দাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবাই বর্ম আর অস্ত্রসজ্জিত। তাদের শিরস্ত্রাণ আর বুকের বর্ম দেখে মনে হচ্ছে রণসাজে সজ্জিত হয়ে প্রদর্শনী করছে।
রাজকীয় বজরার দুই পাশে আরও কিছু ছোট জলযান সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা রয়েছে। এগুলোতে বিওনের সভাসদরা ভীড় করে রয়েছে। মনে হচ্ছে কয়েকশো হবে, তবে এত গাদাগাদি করে রয়েছে যে, প্রকৃত সংখ্যা গণনা করার কোনো উপায় নেই। মেয়েরা বেশিরভাগ দীর্ঘদেহী পুরুষের পেছনে ঢাকা পড়ে গেছে। সবাই হাসিখুশিতে মত্ত আর উল্লাসে হাত নাড়ছিল। কিছু কিছু পুরুষ উৎসব উপযোগী বর্ম আর ধাতব শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে। আর অন্যদের পরনে বিভিন্ন ধরনের রঙিন পোশাক।
বিশাল রাজকীয় তরীর পাশেই একটি ছোট জলযানে বাদকদল বর্বর ধরনের হাইকসো সুর বাজিয়ে চলেছে। ঢোলক, বীণা, ক্লারিওনেট, পশুর শিং, তুর্য, কাঠের বাঁশি সবমিলিয়ে বেসুরো আর বিকট আওয়াজ করে চলেছে।
আমরা এতো দ্রুত রাজকীয় তরীর দিকে ছুটে চলছিলাম যে, কাছাকাছি আসার পর এখন প্রায় সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। পিরামিড আকৃতির মঞ্চের উপর রঙিন শামিয়ানার নিচে পেটানো রূপার সিংহাসনে বিওন বসে রয়েছে। তার পিতা রাজা সালিটিসের মৃত্যুর পর সে এই সিংহাসন দখল করেছে।
দেখার সাথে সাথেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। এর আগে থিবসের যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে আমি দেখেছিলাম। সে ছিল হাইকসো সেনাবাহিনীর বামবাহু, তার অধীনে চল্লিশ হাজার পদাতিক আর তিরন্দাজ ছিল। এমন লোককে সহজে ভোলো যায় না।
বিশালদেহী লোকটির বিরাট ভূড়ি জুড়ে বিপুলায়তন সাদা আল্লাখাল্লাটা একটা তাঁবুর মতো ফুলে রয়েছে। বেণি পাকানো কালো দাড়ি লম্বা হয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। বেণি পাকানো দাড়িতে উজ্জ্বল রূপা আর সোনার অলংকার লাগানো রয়েছে। সে একটা উঁচু মুকুটসহ পলিশ করা রূপার শিরস্ত্রাণ পরে রয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল রত্ন লাগানো আছে। তাকে দেখতে একজন দেবতার মতো মনে হচ্ছিল। হাইকসোদের সবকিছু ঘৃণা করলেও তার সাজসজ্জা দেখে আমিও অবাক হলাম।
রাজা বিওন একহাত উঁচু করে হাতের তালু সামনের দিকে মেলে সম্ভবত আমাদের স্বাগত কিংবা আশীর্বাদ জানাচ্ছে। সঠিক বুঝা মুশকিল, তবে সে মৃদু হাসছিল।
আমি জারাসকে সংক্ষেপে কয়েকটা শব্দে রাজকীয় বজরার সবচেয়ে দুর্বল দিকটা দেখালাম। সেটা ছিল উঁচু মঞ্চের একটু সামনে।
ঐ জায়গাটা লক্ষ্য করে আঘাত হানবে।
এখন আমরা এতো কাছে এসে পড়েছি যে, এবার দেখতে পেলাম রাজা বিওনের মুখে আর হাসি নেই। মুখ হা করাতে তার চোয়াল নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে, বাদামি ছোপ ছোপ ময়লা সামনের দাঁত দেখা যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ সে মুখ বন্ধ করলো। শেষ মুহূর্তে সে আমাদের বৈরী মনোভাব টের পেয়েছে। লোমশ দুই থাবা সিংহাসনের হাতলে ঠেস দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলো। কিন্তু সে খুব ধীরে উঠছিল।
রাজকীয় তরীর দুইপাশে নৌকাগুলোর উপর ভীড় করে থাকা সভাসদরা হঠাৎ তাদের দিকে ছুটে আসা জাহাজগুলোর ধাক্কার বিপদ সম্পর্কে সচেতন হল। মেয়েদের ভয়ার্ত চিৎকার আমাদের কানে ভেসে এলো। কিছু কিছু পুরুষ বজরার কিনারায় যাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করতে করতে তরবারি কোষমুক্ত করে আমাদের উদ্দেশ্যে রণহুঙ্কার দিতে শুরু করলো। যারা সামনে ছিল তারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মাঝে পর্বতের তুষারধ্বসের মতো আমরা তাদের উপর এসে পড়লাম।
হাইকসোদের সমস্ত চিৎকার আর হট্টগোল ছাপিয়ে জারাসের নির্দেশ শোনা গেল, বৈঠা সামলাও! আমাদের জাহাজের দুইপাশের দাড়ীরা পানি থেকে বৈঠা তুলে খাড়া করে জায়গামত সামলে রাখলো যাতে জাহাজের সংঘর্ষে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নদীর শেষ কয়েকগজ খোলা জায়গা আমরা একই গতিতে পার হলাম।
