আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি তায়তা, কিন্তু কখনও বুঝতে পারিনি যে আপনি এতো বেপরোয়া। আমি জানি আপনি ছাড়া আর কেউ এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজ করার কথা কল্পনাও করতে পারবে না। আপনার এই বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড উদযাপন করার জন্য আপনার একটা বীরত্ব। গাঁথা রচনা করা উচিত। আর আপনি না করলে আপনার হয়ে আমি তা করবো। এই কথাটি শেষ করে সে আবার আমার পিঠ চাপড়ালো।
এই জায়গাটা মিসরীয় এলাকা হলেও অনেক বছর আগে শত্রুরা এটা দখল করে নিয়েছিল। ছোটবেলার পর আর কখনও আমি এখানে আসিনি। তাই সবকিছু আমার কাছে অচেনা মনে হচ্ছিল, আর বাকি সবাইও তাই ভাবছিল কেবল একজন ছাড়া।
সে ছিল ছাব্বিশতম রথীবাহিনীর মিসরীয় ক্রীতদাস রহিম, যাকে আমি তামিয়াত দুর্গেই মুক্তি দিয়েছিলাম। পাঁচ বছর আগে হাইকসোরা তাকে বন্দী করেছিল আর তারপর বাকি সময়ের অর্ধেক সে শেকলে বাঁধা অবস্থায় এই এলাকায় নৌকায় দাঁড় বাইতো।
আমার আর জারাসের পাশে দাঁড়িয়ে সে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। নদীপথের প্রতিটি বাঁক আর পানির নিচে লুকানো প্রতিবন্ধকতা সে আমাদেরকে দেখিয়ে নিয়ে চললো।
রাত হতেই আবার আমরা নোঙ্গর ফেলে সেখানেই থামলাম। তবে পরদিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই আবার পাল তুলে নীল নদী বেয়ে এগিয়ে চললাম। আজ এপিফি মাসের পঞ্চম দিন, আমাদের আসার খবর দিয়ে এদিনটির কথাই আমি বিওনকে আগাম জানিয়েছিলাম।
ঘন্টা চারেক চলার পর উঁচু দুই তীরের মধ্যে একটা সরু বাঁকের ভেতরে ঢুকলাম। এর ভেতর থেকে বের হয়ে সামনে দুই লিগ পর্যন্ত বয়ে যাওয়া শান্ত প্রণালীরপানির প্রবাহের মধ্যে চলে এলাম।
রহিম বললো, মেমফিস পৌঁছার এটাই শেষ পর্ব। নদীর বামদিকের বাকের পর সামনের দুই তীর জুড়ে মেমফিস নগর ছড়িয়ে রয়েছে।
আমি জারাসকে নির্দেশ দিলাম, জাহাজ থামাও। যারা বৈঠা বাইছে তাদেরকে বল, সামনের বাঁকে পৌঁছা পর্যন্ত বিশ্রাম নিতে আর একটু পানি খেয়ে নিতে। এরপর আমি যখন গোত্তা মারার জন্য জোরে বাইতে বলবো তখন ওরা প্রস্তুত হবে। বাকি দুটি জাহাজও আমাদের নির্দেশ অনুসরণ করলো। তিনটি জাহাজই এখন প্রণালীর মধ্য দিয়ে কেবল পালের সাহায্যে ভেসে চলেছে।
নদীতে বিভিন্ন ধরনের জলযান দেখা যাচ্ছে। ছোট ডিঙি থেকে শুরু করে চেটালো একতলা পাল-তোলা জাহাজ, চারকোণা পালের জাহাজ আর এর সাথে বাধা বড় নৌকা পর্যন্ত। এর আগে নদীতে যেসব নৌকা আমরা পাশ কাটিয়ে এসেছি, তা থেকে এদের ব্যবহারর সম্পূর্ণ অন্যরকম মনে হচ্ছে। যদিও সম্মান দেখিয়ে আমাদের পথ ছেড়ে দিচ্ছে, তবে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। আমাদের দেখে এই নৌকাগুলোর মাঝিমাল্লারা হাত উঠিয়ে স্বাগত জানালো।
আমি জারাসকে বললাম, আমাদের আগমন ওদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। মনে হয় কবুতরটি ঠিকই পথ চিনে ফিরে এসেছে।
জারাস আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে বললো, এটাই তো আপনি পরিকল্পনা করেছিলেন তাই না? অন্য কিছু তো আপনি আশা করেননি, প্রভু? তার কথা শুনে আমি মাথা নেড়ে অন্যদিকে তাকালাম। আমি জানি অধিকাংশ মানুষের তুলনায় আমি অনেক বিচক্ষণ আর কূটবুদ্ধিসম্পন্ন, তবে বুদ্ধির চেয়ে ভাগ্য আমার কাছে পছন্দনীয়, তবে ভাগ্যদেবী খুবই চঞ্চল। কখন কাকে ছেড়ে ভাগ্যদেবী চলে যান কেউ তা জানে না।
আমি নিচে দাঁড়ীদের বসার বেঞ্চের দিকে নামলাম। ওরা সবাই আমার দিকে হাসি মুখে তাকালো। কেউ কেউ দুএকটা হাসিখুশি মন্তব্য করলো, আমিও প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসলাম। তবে এখানে আসার মূল লক্ষ্য ছিল বেঞ্চের নিচে লুকানো ধনুকগুলোতে গুণ লাগান আছে কি না আর তূণভর্তি তীর আছে কি না তা দেখা।
পেছন দিক থেকে বয়ে আসা জোর বাতাসের তোড়ে আমরা নদীর বুক চিরে দ্রুত এগিয়ে চললাম আর এদিকে সামনের বাঁকও দ্রুত এগিয়ে আসছে। কোনো ধরনের অস্থিরতা না দেখিয়ে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে আবার জাহাজের হালে আমার জায়গায় ফিরে গেলাম।
দুপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম আকেমি আর দিলবার আমাদের জাহাজের পেছনে দুইপাশে একটা তীরের ফলার মতো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে রয়েছে। ওরা দুজনেই হাত তুলে আমাকে সম্মান জানাল আর সংকেত দিল যে আক্রমণের জন্য ওরা প্রস্তুত রয়েছে।
বাঁকে পৌঁছার সাথে সাথেই আমি জারাসের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে নির্দেশ দিলাম, বৈঠা হাতে নাও!।
সাথে সাথে আমাদের দুই পাশে রূপালি ডানা গজাল-বৈঠার পাতলা ডগাগুলো পানির উপরে চকচক করে উঠলো।
তারপর নির্দেশ দিলাম, বাওয়া শুরু কর! বলার সাথে সাথে একসাথে সমস্ত বৈঠা পানিতে নামলো আর বৈঠা টানা শুরু হল দ্বিগুণ বেগে। ঢাক বাদকরা বৈঠা বাওয়ার তালে তালে দ্রুতলয়ে ঢাক বাজিয়ে চললো।
হঠাৎ বাঁক পার হয়ে নদীর দুই তীরে বিস্তৃত মেমফিস নগরীর মুখোমুখি হলাম। মার্বেল পাথরের দেয়াল আর সুউচ্চ দালানের ছাদ থেকে সূর্য কিরণ ঠিকরে পড়ছে।
জাঁকালো রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরগুলো দেখে মনে হল আমাদের প্রিয় থিবসের মতোই জমকালো একটি নগরী।
নদীর উভয় তীরেই তিন থেকে চার সারি নৌযান দেখা যাচ্ছে। আর প্রতিটি নৌযানে মানুষ দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ নৌযান সাদা আর লাল পতাকা দিয়ে সাজানো। আমি জানতাম এটা হচ্ছে হাইকসোদের আনন্দ আর উৎসবের প্রতীক। উৎফুল্ল জনতা পামপাতা নেড়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। সবার কণ্ঠে উজ্জ্বলতা আর উম্মাতাল গানে ভরপুর।
