আমার চতুর্দিকের লোকেরা আবার উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো। তবে আমি ওদের চেয়েও জোরে চিৎকার করে জারাসকে বললাম, এই নিষ্ঠুরতা এখনই থামাও জারাস। তোমার তলোয়ার খাপে ঢোকাও। তুমি তো হাইকসো পশুদের মতো একই পর্যায়ে নিচে নেমে পড়েছ!
জারাস ওর তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে ঘুরে আমার মুখোমুখি হল। চিবুক তুলে আমার মতোই একইভাবে হিংস্র ও রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, প্রভু তায়তা। এদেরকে বন্দী করে আমাদের জাহাজে নেবার মতো জায়গা নেই। আর যদি অক্ষত অবস্থায় ওদেরকে মুক্তি দেন তাহলে আমাদের আর কত লোককে ওরা হত্যা করবে বলুন? আর কত নারী ও শিশু ওদের হাতে মারা পড়বে?
ধীরে ধীরে তার কঠিন যুক্তির সামনে আমার ক্রোধ কমে এলো। আমি। বুঝতে পারলাম খোঁজা করার সময় আমার উপর যখন ছুরি চালান হয় সেই ক্ষতের স্মৃতি আমার বিচার বিবেচনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি চাই না যে এ-ধরনের নৃশংসতা আর কোনো মানুষের সাথে হোক, তা সে যতই খারাপ হোক না কেন। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করলাম, তারপর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করে রাগটা দূর করার চেষ্টা করে বললাম, তুমি ঠিক কথাই বলেছো জারাস। আমি যাচ্ছি তুমি এসে আমার সাথে দেখা করো। বুড়ো আঙুল কাটো ঠিক আছে, তবে পুরুষাঙ্গটা বাদ দাও, ওটা ওদের দেবতা শেঠের জন্য রেখে দাও।
আমার কথা শুনে অন্যান্যরা একটু খোশ মেজাজে ফেরার চেষ্টা করে একটু অশ্লীল রসিকতা করতে লাগলো। আমিও ওদের কথা শুনে জোর করে হাসার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুরে জারাসের দিকে তাকাতেই আমার ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গেল।
জারাস অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল। চারদিকে নীরবতা নেমে এল। শুধু শোঁ-শোঁ বাতাসের শব্দ আর আহত বন্দীটির ফোঁপানি শোনা যাচ্ছিল। এরপর জারাস শীতল আর পরিষ্কার কণ্ঠে বলতে শুরু করলো, হাইকমোরা যখন আমাদের গ্রামে হামলা চালায় তখন আমার দুই বোনের বয়স ছিল সাত আর আট বছর। বাবা তার সেনাদলের সাথে দূরে ছিলেন। হাইকমোরা প্রথমে আমার মা, তারপর পালাক্রমে দুই বোনকে ধর্ষণ করে। অর্ধেক দিন এভাবে ওদের উপর নির্যাতন চালায়। আমার তখন বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর, তবে আমি কোনক্রমে পালিয়ে মাঠে লুকালাম। সেখান থেকে সবকিছু দেখতে পেলাম। সবশেষে আমাদের কুটিরে আগুন লাগিয়ে আমার মা আর বোনদেরকে জীবন্ত অবস্থায় আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়। আমি মাঠ থেকে ওদের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। কথা শেষ করে সে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখন আপনি আমাকে কী করতে বলেন?
আমি তাকে কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। বিষণ্ণভাবে মাথা নেড়ে বললাম, ফারাও আর তোমার পরিবারের স্মৃতির প্রতি তোমার দায়িত্ব পালন কর।
জারাস উত্তর দিল, ধন্যবাদ প্রভু। তারপর খাপ থেকে তলোয়ার বের করে নাকাতির সাথে যোগ দিল।
অঙ্গচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে ওরা দুজনে ত্রিশজন লোক বেছে নিল, যারা খুব ভালোভাবে কুড়াল চালাতে পারে। প্রত্যেকের সাথে চারজন করে সহকারী দেওয়া হল, যারা বন্দীকে টেনে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখবে। প্রথম প্রথম বন্দীদের দুএকজন হাত মুঠো করে রেখেছিল। কিন্তু কুড়ালধারীরা সময়ের অপচয় না করে পুরো হাতটা কব্জি থেকে কোপ মেরে কেটে ফেললো। এরপর বন্দীরা সহযোগিতা করলো।
তারপর সহকারীরা ওদেরকে উল্টে চিৎ করে শুইয়ে দিল। তারপর ওদের পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়ে বালিয়াড়ির উপর ছেড়ে দেওয়া হল। ওরা গোঙাতে গোঙাতে কাটাস্থান চেপে ধরে রক্তপাত কমাবার চেষ্টা করতে লাগলো।
রক্তের গন্ধে গাংচিলের দল আকৃষ্ট হয়ে কাটা বুড়ো আঙুল আর যৌনাঙ্গের স্থূপের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
সমস্ত দৃশ্যটি দেখে আমি অসুস্থবোধ করে ঘুরে আমাদের জাহাজের দিকে চললাম। হাইকসো বন্দীদের আর্তচিৎকার আর কাকুতিমিনতি উপেক্ষা করার চেষ্টা করলাম। বরং রথের গাড়ি আর ঘোড়াগুলো জাহাজে উঠাবার কাজ তত্ত্বাবধান করতে লাগলাম।
রক্তপাতের কাজটি সমাপ্ত করার পর নাকাতি আমার কাছে বিদায় নিতে এল। তার সাথে আমার চুক্তি অনুযায়ী সে মধ্যসাগরের উপকূল জুড়ে হাইকসো বন্দর আর নগরগুলোতে লুটতরাজ চালিয়ে যাবে।
অবশেষে জারাস জাহাজের ডেকে উঠেই সাথে সাথে আমার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে বললো, প্রভু আমি আপনার কথা অমান্য করেছি। সমস্ত লোকের সামনে আমি আপনার নির্দেশ অমান্য করেছি। আপনি অবশ্যই আমাকে পদাবনতি দিয়ে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে খারিজ করতে পারেন।
আমি উত্তর দিলাম, তুমি যা ভালো মনে তা করেছে। আর কোনো মানুষ এর চেয়ে ভালো কিছু করতে পারে না। এখন যাও জাহাজ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ক্রিমাদের পথে চল।
সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ধন্যবাদ তায়তা। আর কোনো দিন আপনার অবাধ্য হবে না।
.
সর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তেই আমি মাস্তুলের ডগায় উঠলাম, সেখান থেকে পেছনে সাগরের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম যে, পেছন থেকে কোন হাইকসো জাহাজ আমাদের পিছু নেই নি। সবকিছু পরিষ্কার। সাগরের গভীর নীলের উপরে মিসরের হালকা নীল উত্তর উপকূল দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার সাগরে সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করার সুবিধার্থে জাহাজগুলোর পেছনের গলুইয়ে লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে আগের মাঝি চেঁচিয়ে বললো, এই রশিতে তল পাওয়া যাচ্ছে না!
