আমার গভীর সাগরে ক্রিটের দিকে চলেছি। আমি আমার পছন্দের জায়গা মাস্তুলের ডগায় অবস্থান নিয়েছি। জারাস পাহারাদারকে ছুটি দিল। দাঁড়িরা বৈঠা তুলে রেখে ডেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লো। পেছন দিক থেকে আসা বাতাসে পালগুলো ফুলে রয়েছে।
হঠাৎ আমার দেহ-মনে ভীষণ ক্লান্তি ভর করলো। কঠিন লড়াই আর তারপর জারাসের সাথে মুখোমুখি হওয়াটা আমাকে নিঃশেষিত করে দিয়েছে। একবার ভাবলাম নিচে নেমে কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়ি। তবে পেছন থেকে আমার প্রিয় মিসরের স্মৃতিসুরভিত উষ্ণ হাওয়া বয়ে আসছিল। মূল মাস্তুলের দোলানিতে আমার ঘুম পাচ্ছিল। জিন উপসাগরের যুদ্ধে শরীরের ক্ষতগুলোর কারণে ব্যথা অনুভব করছিলাম। মনে হল কেবিন অনেক দূরে। মাস্তুলে পিঠ ঠেকিয়ে বসে কোমরের চারদিকে শক্ত করে মাস্তুলের সাথে দড়ি বাঁধলাম। তারপর চোখ বুজে চিবুক বুকে ঠেকালাম।
এরপর ঘুম ভাঙতেই দেখলাম চাঁদ আকাশের মাঝখানে আর সাগরের বুকে এর প্রতিচ্ছায়া ঢেউয়ের উপর একটি চকচকে রূপালি পথ তৈরি করে আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। আফ্রিকার গন্ধের বদলে এখন সাগরের লোনা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। জাহাজের নিচে পানির শব্দ, মাস্তুলের গোড়ায় কাঁচকোচ আর বাতাসের ফিসফিসানি ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
হঠাৎ সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে আমি আবার সতেজ আর সতর্ক হয়ে উঠলাম। মনে এমন আজব অনুভূতি হল যাতে আমি বুঝতে পারলাম দেবী ইনানা কাছেই এসেছেন। আগ্রহভরে তাকিয়ে দেখলাম তিনি চাঁদের প্রতিফলনে সৃষ্ট রূপালি পথ ধরে শূন্যে ভাসতে ভাসতে জাহাজের দিকে আসছেন। মুখের আবরণ নেই আর চাঁদের আলো তার মুখে খেলা করছে। তাকে দেখতে অপূর্ব লাগছিল।
জাহাজের কাছে এসে তিনি সাগরের বুক থেকে ডেকে উঠে আমার দিকে তাকালেন।
তার মুখের ভাব পরিবর্তিত হতেই আমারও মেজাজ বদলে গেল। হঠাৎ আমার মনে আতঙ্ক ভর করলো। আমি বুঝলাম তিনি আমার বিজয়ে অভিনন্দন জানাতে আসেন নি।
কথা না বললেও আমি আমার তার কণ্ঠস্বরের মসৃণ কোমল প্রতিধ্বনি আমার মস্তিষ্কে শুনতে পেলাম।
দেবতা রুষ্ট হয়েছেন। ক্রোনাস চরম বলি দাবি করছেন।
আমি বলতে চেষ্টা করলাম, আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু কথাগুলো গলায় আটকে গেল।
তিনি নিঃশব্দে বললেন, ওদের কাছে যাও। ওরা বিপদের মধ্যে রয়েছে। এবার বাতাসের শব্দের উপর দিয়ে সাবধান বাণীটি পরিষ্কার শুনতে পেলাম।
চেষ্টা করলাম তার কাছে যেতে, কিন্তু নড়াচড়া করতে পারলাম না। আমি চাচ্ছিলাম তিনি তার হেঁয়ালিমূলক বার্তাটি ব্যাখ্যা করুন, কিন্তু কোনো কথা মুখ দিয়ে বের হল না।
তারপর গভীর ঘুমের ছায়া আমাকে আচ্ছন্ন করলো আর তিনিও চলে গেলেন। অন্ধকারে আমি চিৎকার করে বলতে চেষ্টা করলাম, ইনানা যেও না। আমার জন্য অপেক্ষা করো! তোমার কথা আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু অন্ধকার আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো।
পরের বার কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বুঝতে পারিনি, তবে চোখ মেলতেই দেখলাম ভোর হয়ে এসেছে।
নিচে তাকিয়ে দেখলাম ডেকে কর্মতৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রথম দাঁড়িরা দাঁড়ি বেঞ্চে তাদের জায়গায় নামছে।
কোমরে বাঁধা রশিটা খুলে মাস্তুল থেকে নিচে উপরের ডেকে পা দিতেই জারাস হাসিমুখে আমার কাছে এসে বললো, প্রভু, আপনি আবার মাস্তুলে দড়ি বেঁধে ঘুমিয়েছেন, তাই না? কেবিনে আরাম পান না? তারপর আমার চেহারা দেখে তার মুখের হাসি মুছে গেল। সে বললো, কী ব্যাপার, কী হয়েছে?
আমি নির্দেশ দিলাম, এখুনি সমস্ত রথের গাড়ি পানিতে ফেলে দাও। ঘোড়াগুলো অন্য জাহাজে নেবার ব্যবস্থা কর।
সে আড়ষ্ট হয়ে বললো, কেন তায়তা?
প্রশ্ন করো না। তোমার সাথে তর্ক করার সময় নেই আমার। অধৈৰ্য্য হয়ে তার কাঁধ ধরে জোরে কঁকি মেরে বললাম, প্রত্যেক জাহাজ থেকে একদল করে দাঁড়ি নাও। আমি প্রতি ঘন্টায় দাঁড়ি বদল করতে চাই।
প্রত্যেক ঘন্টায়?
আমি ক্রিমাদ পর্যন্ত সারা পথ আক্রমণের গতিতে যেতে চাই।
সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আক্রমণের গতি?
আমি তাকে ধমকে উঠলাম, একই কথা বার বার বলো না, জারাস। আমি পাঁচ দিনের মধ্যে কিংবা আরও আগে ক্রিমাদ গেঁছাতে চাই।
সে প্রতিবাদ করে বললো, আপনি আমার লোকদের মেরে ফেলবেন।
রাজকুমারীদের বদলে ওরা মরলে বরং ভালো।
সে আমার দিকে ভয়াকুল চোখে তাকিয়ে বললো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
দুই রাজকুমারী চরম বিপদে আছেন। হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে প্রত্যেকটি ঘন্টা আমরা হারাববা আর ওরা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে।
সে ঘুরে তার সহকারীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো, সমস্ত জাহাজের ক্যাপ্টেনদের আসার বার্তা জানিয়ে পতাকা তোলো।
অন্যান্য জাহাজগুলো আমাদের জাহাজের দুইপাশে দুটি করে এসে ভিড়লো। ওরা প্রত্যেকে পাঁচদিনের পানি আর রসদসহ তাদের সেরা বিশজন দাঁড়িকে আমাদের জাহাজে তুলে দিল। এর বদলে আমরা আমাদের নাবিকদের মধ্য থেকে ক্রীতদাস আর দুর্বল লোকগুলোকে তাদের জাহাজে পাঠিয়ে দিলাম।
মাল তোলার কপিকলে তুলে সমস্ত ঘোড়া অন্যান্য জাহাজে তুলে দিলাম। একইভাবে রথের গাড়িগুলোও উপরে উঠিয়ে পানিতে ফেলে দিলাম। জাহাজটিকে আমি যতদূর সম্ভব হালকা করতে চেয়েছিলাম। ক্রিটে পাঁচ দিনে পৌঁছানো কম কথা নয়।
