তারপর সে চিৎকার করে উঠলো, প্রভু তায়তা! আমি একটু থেমে হতভম্ভ হয়ে তার দিকে তাকালাম। তার দাড়ির কারণে প্রথমে আমি তাকে চিনতে পারিনি। তাছাড়া চোখে রক্তের ছিটা পড়ায় আমি ঝাপসা দেখছিলাম। তবে এখন বুঝলাম সে হাইকসো শত্রু নয়, তার চেহারা পরিচিত মনে হচ্ছে।
এবার তার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলাম। সে বলে উঠলো, অস্ত্র থামান প্রভু তায়তা। আমি আপনার অধীনস্থ লোক।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, নাকাতি তুমি? আমি মনে করেছিলাম তুমি আর আসবে না।
সে দাঁত বের করে হেসে বললো, দেবতারা সবসময় আপনার প্রার্থনা পূর্ণ করেন না। তারপর সে হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরে আমার পড়ে যাওয়া ঠেকাল। তবে আমি ঝটকা মেরে তার হাত সরিয়ে দিলাম। নতুন আশায় আমার মধ্যে নতুন শক্তি সঞ্চার হয়েছে।
তুমি বেশ ভালো সময়েই এসেছো নাকাতি। যাইহোক তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি। হাত তুলে জাহাজের গলুইয়ের কাছে দেখালাম, হাইকসোরা লড়াই ছেড়ে পালাচ্ছে। জাহাজ তীরে ফেলে ওরা স্থলপথে পালাচ্ছে। ঐ ব্যাটাদের পাকড়াও কর। তারপর আমরা ওদের রথগুলো খুঁজে সেগুলো ধ্বংস করবো।
আমার কথা শুনে সে হেসে বললো, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, হাইকসো অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনী তা থেকে মাত্র এক লিগ দূরত্বে আছে।
আমি বললাম, তুমি নিশ্চিত?
প্রভু এটনের মতো আমার অনেক সংবাদদাতা না থাকলেও তারা কোনো অংশে কম দক্ষ নয়। গোরাবের লোকেরা যে এখানে আপনার জন্য ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছিল আমার সংবাদদাতারা আমাকে সে খবর জানায়। আপনাকে সাবধান করার জন্য আমি সাথে সাথে ক্রিমাদের উদ্দেশ্যে জাহাজ নিয়ে ছুটি, কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখি আপনি আগেই চলে গেছেন। হোরাস আর আইসিসকে ধন্যবাদ যে সময়মতো এখানে পৌঁছে আপনাকে জীবিত পেয়েছি।
পোশাকের কিনারা দিয়ে মুখ থেকে ঘাম আর রক্ত মুছে আমি বললাম, সেজন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। তারপর নিচু হয়ে ডেক থেকে শত্রুর একটি তরবারি তুলে নিলাম। তারপর সোজা হয়ে জারাসের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললাম, আমাদেরকে তীরে নিয়ে চল। একটিও হাইকসো জানোয়ার যেন পালাতে না পারে!
বালুকাবেলার দিকে আমরা জাহাজ নিয়ে চললাম। আমার নির্দেশ মতো নাকাতি তার লোকজনদের নিয়ে পলাতক হাইকসোদের পেছনে ছুটলো। এদিকে জারাস আর হুই রথগুলো নামিয়ে ঘোড়াগুলোর লাগাম পড়াতে শুরু করলো।
এটন যে বেদুঈন পথপ্রদর্শক পাঠিয়েছিল, ওরা সাগরতীরের বালিয়াড়িতে লুকিয়েছিল। এখন ওরা বের হয়ে এলো। অর্ধেক রথ নিয়ে হুই আর আমি বেদুঈনদের অনুসরণ করে হাইকসো অশ্বারোহী সেনাছাউনির দিকে চললাম।
জারাস নাকাতির সাথে যোগ দিল। বাকি রথে চড়ে ওরা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালানো হাইকসোদের খুঁজতে বালিয়াড়ির দিকে ছুটলো।
রথের গুদামের হাইকসো প্রহরীরা লড়াই থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে সেখানে কি ওলোটপালট ঘটনা ঘটেছে তা কিছুই জানতো না। হুই আর আমি রথে চড়ে গুদামের সীমানা বেষ্টনির কাছে পৌঁছাবার পর আমি ওদের ভাষায় প্রহরীদের মূল ফটক খুলতে বললাম। ওরা আমাদেরকে দক্ষিণের মূল হাইকসো বাহিনী থেকে আসা নতুন সেনাদল মনে করে ফটক খুলে দিল।
ওরা যখন ভুলটি বুঝতে পারলো ততক্ষণে আমাদের লোকেরা ওদের মাঝে ঢুকে ওদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললো। ওদেরকে মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসতে বাধ্য করে পিছমোড়া করে বাঁধলো।
রথের গুদামে সারিবদ্ধভাবে রাখা ৮৫০টি ঝকঝকে নতুন রথের গাড়ি পাওয়া গেল।
পরিষ্কার বুঝা গেল হাইকসো কারিগররা আমাদের মিসরীয় রথের গাড়ির নকশা নকল করেছিল। চিরাচরিত হাইকসো যন্ত্রের চেয়ে এগুলো অনেক উন্নত ধরনের। মূল কাঠামো মালাক্কা বেত আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো শক্ত পাইন কিংবা সিডার কাঠের চেয়ে অনেক হালকা আর নমনীয়। কঠিন নিচ্ছিদ্র না করে চাকাগুলোতে স্পোক বসিয়ে দ্রুতগামী এবং আরও টেকসই করা হয়েছে।
গাড়িগুলো বার্ণিশ করে গাদাগাদি করে রাখাছিল। সাথে আনা প্রদীপের তেল এগুলোর উপর ছিটিয়ে জ্বলন্ত মশাল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। গাড়িগুলো একটার সাথে আরেকটি লেগে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
হাইকসো রথগুলোর ব্যবস্থা নেওয়ার পর বেদুঈন পথপ্রদর্শক আমাদেরকে ঘোড়ার আস্তাবলের দিকে নিয়ে গেল। সেখানে নল খাগড়ার ছাউনির আস্তাবলে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ছিল।
একটি বিষয়ে আমি হাইকসোদের প্রশংসা করবো, তা হল ঘোড়ার যত্ন নেওয়ার বিষয়ে। এই প্রাণীগুলোকে সযত্নে লালন-পালন করে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তারপর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একেবারে নিখুঁতভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। অন্য যেকোনো প্রাণী থেকে আমি ঘোড়া বেশি পছন্দ করি। একটি ঘোড়ার উপর আস্থা রাখা যায়।
সৈকতের যেখানে জাহাজগুলো ছিল, ঘোড়াগুলোকে সেখানে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হল। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কীভাবে এতগুলো ঘোড়ার ব্যাপারে বন্দোবস্ত করা যায়। দুই হাজার ঘোড়া বিশাল একটি সংখ্যা। নাকাতির বহরসহ সমস্ত জাহাজেও এতগুলো ঘোড়ার জায়গা করা সম্ভব নয়।
নাকাতির একজন কর্মকর্তা এই চমৎকার প্রাণীগুলোকে হত্যা করার পরামর্শ দেওয়ায় আমি বেশ বিরক্ত হলাম। আমি নাকাতির দিকে ফিরে বললাম, তোমার এই দলের মধ্যে পঞ্চাশ জনও কি নেই যারা ঘোড়াকে বুঝতে পারে আর ভালোবাসে?
