পিঙ্গল বর্ণের তীরের মেঘে তাদের ডেক ছেয়ে গেল আর বিপুল সংখ্যায় মানুষ হতাহত হল। আহতদের আতকারের সাথে মিশে তীরের আঘাতের থাপ থাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
শত্রুর বিশাল তিনতলা জাহাজটি আমাদের বহরের যেকোনো জাহাজের প্রায় দেড়গুণ বড় ছিল। তবে এই ধরনের বিরূপ হাওয়ার পরিস্থিতিতে এর বিশাল আকার সুবিধার বদলে একটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবল বাতাসের সামনে এর খেসারত দিচ্ছে। এর বিশাল বিপজ্জনক ব্রোঞ্জের ডগাটি আর আমাদের দিকে মুখ করে নেই। বরং তিনতলা দাড়ির ডেকসহ এর কাঠামোর চওড়া দিকটি আমাদের দিকে উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে।
জারাসকে বললাম, এটা ঘুরতেই এর গায়ে গোত্তা মারো। সে এক লাফ দিয়ে আমার নির্দেশ পালন করতে গেল। ঢাকিরা দ্রুত লয়ে আক্রমণাত্মক গতিতে ঢাক পিটাতে লাগলো। দাঁড়ি বেঞ্চে বসা আমাদের দাড়িরা ছিল তরতাজা আর অধীর আগ্রহে এরকম আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওরা প্রাণপণে দাঁড় বাইতে লাগলো। হাওয়ার ধাক্কার সাথে বৈঠার গতি মিলে আমার নির্মম জাহাজটি সজোরে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমি জারাসকে নানারকম নির্দেশ দিতে লাগলাম যাতে আমাদের জাহাজের মাথায় স্থাপিত ব্রোঞ্জের তীক্ষ্ণ ডগাটি শত্রুর তিনতলা জাহাজের সবচেয়ে দুর্বল দিকে মুখ করে থাকে।
আমাদের জাহাজ আর আমাদের লক্ষবস্তর মাঝখানে হাইকসোদের ছোট ছোট একতলা জলযানগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তিনতলা জাহাজটিকে তা দেওয়ার আগে জারাস চিৎকার করে বলে উঠলো, বৈঠা হাতে নাও! আমাদের দাঁড়িরা জোরে দাঁড় বেয়ে চললো আর প্রচণ্ড শব্দে আমাদের জাহাজের ঈগলের মতো বাঁকা এবং তীক্ষ্ণ ঠোঁট শত্রুর তিনতলা জাহাজটির গায়ে আঘাত হেনে এক পাশ দিয়ে অপর জাহাজটির উপরে চড়ে বসলো। মানুষের আর্তচিৎকারের সাথে কাঠের তক্তা আর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া দাঁড়ের শব্দ মিশে গেল। জাহাজের দুটি মাস্তুলই ভেঙে ডেকের উপর পড়ে গেল। জাহাজটি একদিকে কাত হয়ে পড়লো। খোলা দাঁড়ের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বেঞ্চে শিকলে বাঁধা ক্রীতদাসেরা সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে মরলো। আর উপরের ডেকের যোদ্ধারা জাহাজের কাঠামো উল্টে যেতেই সবাই পানিতে পড়ে গেল।
প্রচণ্ড সংঘর্ষের ধাক্কায় জারাস আর আমি আমাদের জাহাজের ডেকে পড়ে গেলাম। আমাদের জাহাজটি পানিতে থেমে পড়েছিল, আমরা উঠে দাঁড়াতেই চতুর্দিক থেকে ছোট ছোট হাইকসো জলযানগুলো আমাদেরকে ঘিরে জাহাজের পাশে দড়ি বাঁধা লোহার আঁকশি ছুঁড়ে মারতে লাগলো। এক পাল নেকড়ের মতো চিৎকার করতে করতে শত্রু সেনারা আমাদের জাহাজের ডেকে উঠে পড়লো। দুইপাশ দিয়ে এসে কুড়াল আর তরবারি হাতে ওরা আমাদেরকে ঘিরে ফেললো।
জারাস, আমি আর ডেকের অন্যান্য কর্মকর্তারা পরস্পরের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে একটি বৃত্ত রচনা করে দাঁড়ালাম। অসিচালনায় সবাই সুদক্ষ ছিল আর অনেকবার আমরা একসাথে লড়াই করেছিলাম। আমরা সহজেই হাইকসো আক্রমণকারীদের পরাস্ত করলাম। তবে ওদেরকে মেরে ফেলতেই আরও একদল হাইকসো শত্রু দুই পাশ দিয়ে উঠে এল।
আমার পায়ের নিচে ডেকের মেঝে রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গেল আর কণুই পর্যন্ত আমার বাহু জমাট বাঁধা রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল। তারপরও অসভ্য হাইকসোরা আমাদেরকে আক্রমণ করতে এসে মারা যাচ্ছিল। আমার ডানপাশে জারাস ক্লান্তিহীনভাবে লড়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। হাত ভারি হয়ে আসছিল আর পাগুলো আর তাল সামলাতে পারছিল না।
একটা লোককে মেরে লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে সামনে জাহাজের এক পাশ দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার নৌবহরের অন্যান্য রণতরীর নাবিকরাও প্রচণ্ড লড়াই করছে। শত্রু জাহাজগুলো ওদেরকে ঘিরে ফেলেছে আর ওরা প্রাণ বাঁচাতে লড়ে যাচ্ছে। তারপর আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম আরও দশবারোটি শত্রু জাহাজ ভোলা সাগর থেকে উপসাগরে ঢুকছে। বড় বড় একতলা রণতরীগুলোর লোকেরা উল্লাসে চিৎকার করে দাঁড় বেয়ে আসছে। আমি জানি শুধু সংখ্যার কারণে এতোগুলো যুদ্ধ জাহাজের সাথে আমরা বেশিক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবো না। একবার ভাবলাম কোনোভাবে লড়াই থামিয়ে খোলা সাগরের দিকে যেতে পারবো কি না। তবে বুঝতে পারলাম যে এই ভাবনা শুধু এক কাপুরুষ মনের শেষ ভাবনা নয়, এটি ছিল হতাশা থেকে এক অলীক কল্পনা। মনে হচ্ছে রক্তস্নান থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। আরও শত্রু জাহাজে উঠে আসতেই আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাতে লাগলাম। অবশেষে চরম ক্লান্তিতে নিঃশেষিত হয়ে আমার পা টলমল করতে লাগলো। জারাস আমার শরীরের সাথে তার ঢাল চেপে ধরে আমাকে খাড়া করে রাখতে চেষ্টা করলো। তবে এখন আমার তরবারি উঠাবার শক্তিও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। যেসব শত্রু সেনাদেরকে হত্যা করেছি তাদের রক্তে আমার সারা মুখ, হাত রক্তে মাখামাখি হয়ে রয়েছে।
তারপর আরেকটি দাড়িওয়ালা শত্রুর মুখ আমার সামনে উদয় হতেই আমি আমার তরবারির ভেতা অংশ দিয়ে তাকে আঘাত করলাম। এততক্ষণ লড়াই করার পর তরবারির ধারালো অংশটি ভোতা হয়ে কয়েক জায়গায় ভেঙে গেছে। আমার আঘাতটি এতো দুর্বল ছিল যে নতুন শত্রু অবজ্ঞাভরে তার হাতের কব্জি ঘুরিয়ে এটা এক পাশে সরিয়ে দিল।
