পরে অবশ্য আমি জানতে পেরেছিলাম, নাকাতির সাথে আমার যে চুক্তি হয়েছিল সে অনুযায়ীই সে কাজ করেছিল। এতোদিন যাবত সে সাগরের জলদস্যুদের মধ্য থেকে তার জাহাজের জন্য নাবিক সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত ছিল।
আমার ধারণা ছিল সাগরের জলদস্যুরা বিশৃঙ্খল হয়; আধুনিক নৌবাহিনীর মতো ওদের মাঝে কোনো সংগঠন আর কাঠামোগত প্রক্রিয়া নেই। আমি এটা খেয়াল করিনি যে সাগরের জলদস্যুদের মাঝেও অনেক প্রশিক্ষিত এবং রণকুশল নাবিক রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ওরা দলত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। ওদের একটি বিশাল আর সুসংগঠিত গোয়েন্দাবিভাগ রয়েছে যা, আমার পুরোনো বন্ধু এটনের গোয়েন্দা বিভাগের চেয়েও অনেক কর্মদক্ষ। এটনের লোকদের মাঝেও তার নিজের লোক ছিল, তবে মেমফিসে হাইকসো সদরদপ্তরেও সে গুপ্তচর নিযুক্ত করেছিল। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে আমার গোয়েন্দা বিভাগেও সে তোক ঢুকিয়েছে। এইসব সূত্র থেকেই সে এটন আর আমার মধ্যেকার বার্তা বিনিময়ের বিষয় জেনেছে। সে জানতো যে আমি জিনে হাইকসো রথের সমাবেশে হামলা করতে যাচ্ছি আর এও জানতে যে হাইকসোরাও আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন। তবে কী ঘটতে চলেছে তা জানাবার জন্য তার কাছে আমাকে পাঠাবার মতো কোনো বার্তাবাহক কবুতর ছিল না। তাই এই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করার জন্য সে নিজেই চলে এসেছিল, তবে তার আসতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
.
ক্রিমাদ ছেড়ে আসার পর পঞ্চম দিনে সূর্য উঠার এক ঘন্টা আগে আমরা আফ্রিকার উপকূলে জাহাজ ভেড়ালাম। আমি ইচ্ছা করেই একটু পশ্চিম দিকে সরে জাহাজ চলার পথ বেছে নিয়েছিলাম। এমন কোনো নাবিক জীবিত নেই যে ডাঙা না দেখে পাঁচদিন জাহাজ চালিয়ে জিন উপসাগরের মতো একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে সঠিকভাবে পৌঁছতে পারে। উপসাগরের পূর্বদিকে জাহাজ ভেড়ানো আমার জন্য বিপজ্জনক ছিল। নীলনদের বদ্বীপের কাছে উপকূল জুড়ে ঘন জনবসতি রয়েছে। দিগন্তের উপরে পৌঁছার সাথে সাথে আমরা মানুষের চোখে ধরা পড়ে যেতাম। সোজা পথে জিন উপসাগরের দিকে যেতে না পারায় একটু পশ্চিম দিক ঘেঁসে যাওয়াটাই নিরাপদ ছিল। পশ্চিম উপকূলে ছিল সাহারা, এখানে বসবাস করতো খুবই কম সংখ্যক কিছু ভবঘুরে বেদুঈন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ডাঙা দেখার সাথে সাথে আমি আমার পথের নিশানা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলাম। কোনো ইতস্তত না করে আমি আমার নৌ-বহর ঘুরিয়ে পাল তুলে মরুভূমি ঘেঁসে চলার নির্দেশ দিলাম। তীরের সমান্তরাল হয়ে পাল তুলে তিন ঘন্টা ভেসে চলার পর বুঝা গেল আমার ইচ্ছাকৃত ভুলটি একটু বেশি হয়ে গেছে। প্রথমে এতে বেশ উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম, তবে পরবর্তীতে এটা সুফল বয়ে এনেছিল। এতে সময় অপচয়ের ফলে নাকাতির আমার সাথে দেখা হওয়ার যে বিলম্ব ঘটেছিল, তা পূরণ করার সুযোগ হয়।
অবশেষে আমরা জিন উপসাগরের মোহনায় এলাম। উত্তর দিক থেকে আসার পথে তীরভূমি ঢেকে রাখা সুস্পষ্ট অন্তরীপটি দেখেই এটা চিনতে পারলাম। নির্দেশ দিলাম বাতাসের গতিপথ আর পালের অবস্থান অনুযায়ী জাহাজের গতিপথ নির্ধারণ করে পর্যায়ক্রমে জাহাজ চালাতে। এভাবে চলে তারপর আমরা প্রবেশপথ দিয়ে উপসাগরে ঢুকলাম।
হাইকসোরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। অন্তরীপের মাঝখানে দিয়ে জীন উপসাগরে ঢুকতেই ওরা দলবেঁধে আমাদের দিকে তেড়ে এলো। ওরা নিশ্চয়ই উপসাগরের তীর আর নীল নদীর বদ্বীপের একশো লিগ এলাকা জুড়ে ভাসমান সবধরনের জলযান মোতায়েন করে রেখেছিল। চারকোণা পালের ছোট জাহাজ থেকে শুরু করে বিশাল তিনতলা জাহাজ নিয়ে ওরা আমাদের নৌবহরের উপর আক্রমণ করলো। কাছের জলযানগুলো পেছনের জাহাজকে ঢেকে রেখেছিল আর ছোটগুলো বড় জাহাজের আড়ালে ছিল। তবে দ্রুত একবার হিসাব করে আমি দেখলাম, আমাদের ছয়টি জাহাজের বিপরীতে ওদের প্রায় বিশটি জাহাজ ছিল।
সবকটি জাহাজের ডেকে অস্ত্রসজ্জিত লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। সূর্যের আলোয় তাদের শিরস্ত্রাণ, তরবারির ফলা আর বর্মগুলো ঝিকমিক করছে। আমাদের কাছাকাছি আসতেই তাদের রণহুঙ্কার আর যুদ্ধের আহ্বান পরিষ্কার বাতাসে ভেসে আসছে।
আমাদের পেছন দিকের উন্মুক্ত সাগর থেকে ভোরের বাতাস প্রবেশপথ দিয়ে উপসাগরে ঢুকে হাইকসোদের মুখোমুখি বয়ে যাচ্ছিল। এতে আমরা জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেদিক দিয়ে পালাবার পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে হাইকসোদের জাহাজগুলো বাতাসের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। ওরা অবশ্য সঠিকভাবে জাহাজের দিক নির্দেশনা করতে পারছিল না, বৃথা সময় নষ্ট করছিল। আর এদিকে অনুকূল বাতাসে পাল ফুলে গিয়ে আমাদের ছয়টি জাহাজ দ্রুত গতিতে সামনের দিকে ধেয়ে চলছিল। দশবারো বার দাঁড় বাইতেই আমরা পুরোপুরি আক্রমণের গতি অর্জন করলাম।
আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যে, শত্রুদের জাহাজের ডেকে লোকজন এতো ঘেঁসাঘেসি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে, ওদের তীরন্দাজরা মানুষের শরীর আর বর্মের চাপে পড়ে ঠিকমতো ধনুকের ছিলা টানতে পারছিল না। এদিকে জারাস, হুই, আকেমি আর দিলবারসহ আমার অন্যান্য জাহাজের ক্যাপ্টেনরা, তাদের জাহাজগুলোতে কম লোক থাকার সুবিধাটি কাজে লাগাতে পারছিল। তবে উপসাগরের অন্তরীপ ঢোকার আগেই আমাদের তীরন্দাজরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। ওরা ধনুকের গুণ টেনে তীর ধনুকের গায়ে ঠেকিয়ে রেখেছিল। শত্রু আর আমাদের অগ্রগামী জাহাজের মধ্যের দূরত্ব লম্বা পাল্লায় তীর ছোঁড়ার আওতায় আসতেই জারাস তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দিল। আমাদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে আসা অনুকূল বাতাস আমাদেরকে সাহায্য করলো। এতে আমরা একশো গজের সুবিধা পেলাম। হাইকসোরা তাদের ধনুক উঁচু করার আগেই আমাদের তীরন্দাজরা দশবার তীর ছুঁড়তে পারলো।
