হেরাকল বললো, আপনি বলছেন গোরাব এক হাজার রথ সাজিয়েছে? তার মানে তার কাছে তিনহাজারেরও বেশি রথ রয়েছে। এই সংখ্যাটি খুব বেশি হয়ে যায়। গোরাব যদি আপনার পরিকল্পনা জানতে পারে, তাহলে আপনি আক্রমণ করার চেষ্টা করলেই সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন।
তার কথার উত্তরে আমি রেশমি কাপড়ের টুকরাটির উপর টোকা দিয়ে বললাম, এটা ঠিক যে গোরাব জিন নগরীতে এক হাজার রথের সমাবেশ ঘটিয়েছে। তবে আমার কাছে খবর আছে যে, মোয়েরিস হ্রদে ফারাও আর জেনারেল ক্রাটাসের মুখোমুখি অবস্থান করা মূলবাহিনী থেকে সে এখনও রথীসেনাদেরকে সরিয়ে এখানে আনেনি। তার মানে পাঁচশোরও কম রথীসেনা এই রথগুলোর পাহারায় রয়েছে। তারপর এটনের বার্তা থেকে পড়ে শোনালাম, পাঁচশো সেনা আর তার দ্বিগুণ ঘোড়া।
হেরাকল তার গোঁফ সমান করতে করতে চিন্তিতভাবে বললো, এটা প্রায় আপনার বাহিনীর সমান।
আমার নৌবহর সাগরে ভাসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আর গোরাব তার বাকি সেনাদেরকে এখানে আসার আগেই এখন থেকে ছয়দিনের মধ্যে আমরা জিন নগরীতে পৌঁছাতে পারবো। ওরা বুঝে উঠার আগেই জাহাজের পেছন দিক থেকে রথগুলো সৈকতে নামিয়ে ওদের উপর আক্রমণ চালাতে পারবো। অতর্কিত আক্রমণ করা মানে এক হাজার রথিসেনার সমান সুবিধা পাবো।
আমি আপনাকে একটা সরাসরি কথা বলতে চাই প্রভু তায়তা। এই ব্যাপারটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। বিষয়টা খুব বেশি পরিপাটি আর একেবারে আকস্মিক মনে হচ্ছে। এখানে একটা ফাঁদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। যাইহোক সর্বাধিরাজ মিনোজ আপনার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়েছেন। এই হঠকারী পরিকল্পনার জন্য আমার অনুমোদন নেবার প্রয়াজন নেই।
তাহলে আর কোনো আলোচনার প্রয়োজন নেই, মাননীয় এডমিরাল। আপনার পরামর্শ আর শুভেচ্ছার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। এখন তাহলে আমি যেতে পারি।
আমি একাকী পাহাড়ের পথে জোরে ঘোড়া ছুটিয়ে চললাম। সূর্যাস্তের ঘন্টাখানেক আগে ক্রিমাদ পৌঁছলাম। আস্তাবলে জারাস আর হুইকে পেলাম। ওরা আমাকে অবাক হল, তবে আমি যা পরিকল্পনা করেছি তা শোনার পর খুশিতে ফেটে পড়লো।
হুইকে বললাম, আলো থাকতে থাকতেই ঘোড়াগুলো জাহাজে তুলে ফেল। আর জারাসের দিকে ফিরে বললাম, তুমি যতজন লোক দরকার নাও আর রথের গাড়িগুলো জাহাজে তোলার পর ভালোভাবে রশি দিয়ে বেঁধে নিও। ওরা আমার নির্দেশমতো ওদের লোকজনদেরকে চেঁচিয়ে নির্দেশ দিয়ে ছুটলো।
আমি কবুতরের খোপগুলোর কাছে গেলাম। এটন যে কবুতরগুলো পাঠিয়েছিল সেগুলোর এটা নতুন বাসা। দুটো মোটাসোটা শক্তিশালী গড়নের কবুতর বেছে নিলাম, তারপর দুটোর পায়ে একই ধরনের দুটো বার্তা বেঁধে দিলাম। তারপর একটার পর একটা কবুতরের মাথায় চুমু খেয়ে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিলাম। বন্দরের চারদিকে চারবার চক্কর দিয়ে সঠিক দিক ঠিক করার পর কবুতরগুলো দক্ষিণ-দক্ষিণ-পুবে উড়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। রাতের বেলা ওড়াই ওদের জন্য মঙ্গলজনক। ঈগল আর বাজপাখি রাতের অন্ধকারে শিকার করে না। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি দুটো বার্তা এটনের জন্য পাঠিয়েছিলাম।
ছয়দিন পর আমাদের জন্য জিনের সৈকতে পথপ্রদর্শক রাখতে আমি তাকে অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা সৈকতে অবতরণ করার পর তার লোক আমাদেরকে পথ দেখিয়ে যেখানে রাজা গোরাব তার রথের সমাবেশ করেছে সেখানে নিয়ে যাবে।
মাঝরাতের ঘন্টাখানেক আগে আমাদের ছয়টি যুদ্ধজাহাজের নৌবহর বন্দর ত্যাগ করলো। গভীর সমুদ্রে ঢোকার সাথে সাথে আমরা দক্ষিণমুখি হয়ে মিসর আর জিন উপসাগরের দিকে চলতে শুরু করলাম।
ভোরের একটু আগে অন্ধকারে জলদস্যু সর্দার নাকাতির নেতৃত্বে বারোটি যুদ্ধ জাহাজ আমাদের নজর এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে উল্টোদিকে গেল। নাকাতি তার নিজের জাহাজ শান্তির কপোতে চড়ে দ্রুত ক্রিমাদের দিকে যাচ্ছিল। আমি যে খুশিমনে আমার ক্ষুদ্র নৌবহর নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা আর বিপদের মুখে চলেছি, সে সম্পর্কে আমাকে সাবধান করতে সে ক্রিমাদের দিকে দ্রুত ছুটছিল।
ভোরের কয়েকঘন্টা পর ক্রিমাদ বন্দরে পৌঁছে নাকাতি দেখলো আমরা কেউ সেখানে নেই। তবে আমি আহত আর অসুস্থ পাঁচজন সৈন্যকে বন্দরে রেখে গিয়েছিলাম। সিডন থেকে সুমেরিয়া জাহাজে আসার সময় আমি যখন নাকাতির শান্তির কপোত জাহাজটি কজা করে তাকে শিকলে বেঁধে বৈঠা বাওয়ার কাজে লাগিয়েছিলাম, তখন এই আহত লোকগুলো আমার সাথে ছিল। আবার যখন নাকাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করে তার জাহাজ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম তখনও এরা সেখানে উপস্থিত ছিল। কাজেই ওরা জানতো নাকাতি আমাদেরই একজন হয়েছে, তাই কোনো ইতস্তত না করে ওরা তাকে জানালো আমি কোথায়, কী উদ্দেশ্যে জিনের দিকে গিয়েছি।
বন্দরে আমার গুদাম থেকে পানি আর রসদ সংগ্রহ করে পরদিন ভোরের তিনঘন্টা পর নাকাতি আবার নৌবহর পানিতে ভাসালো। এবার সে আমাকে খুঁজতে বেড়িয়েছে। তবে আমি তার আট ঘন্টা আগে বন্দর থেকে জাহাজ নিয়ে বের হয়েছি।
আমার অবশ্য জানার কথা নয় যে নাকাতি দ্রুত গতিতে আমাকে অনুসরণ করছে। বরং তাকে ছেড়ে দেবার পর থেকে তার কোনো খবর এযাবত আমি পাই নি। এখন ঐ সিদ্ধান্ত নেবার জন্য অনুতাপ করছিলাম। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করছিলাম যে, সে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আবার জলদস্যুদের সর্দারের ভূমিকায় ফিরে গেছে। আর তার সাথে আমার দেখা হবে না।
