এবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বধূরা কখন হেরেম ছেড়ে গিয়েছিল?
লক্সিয়াস অধৈর্য হয়ে বললো, যেদিন ভূমিকম্প হয় সেদিন দুপুরবেলা ওরা হেরেম থেকে চলে যায়। একথা কি আগে বলিনি?
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, কথার মারপ্যাঁচের সাথে তাল মিলিয়ে মনে দ্রুত চিন্তা চলছিল। বললাম, তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছো টিনের মাথা ওয়ালা ভূমিকম্পের মধ্যেই চল্লিশজন কুমারীর সাথে দুষ্টামি করতে চাচ্ছিল?
সে খিলখিল করে হেসে বললো, তাই তো মনে হচ্ছে। ইশ দেখতে পেলে কী মজা হত তাই না? তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমার এখুনি ফিরে যাওয়া উচিত, নয়তো ঐ উগ্রচণ্ডা প্রহরীরা আমাকে প্রাসাদে ঢুকতে দেবে না। মেয়েদেরকে কিছু বলবো?
ওদেরকে বল আমি পৃথিবীর আর সবকিছুর চেয়ে ওদেরকে ভালোবাসি।
সে মুখ ভার করে বললো, আর আমি?
বেশি লোভ করা না লক্সিয়াস। তুমিতো ইতোমধ্যেই একজন বুড়ো মানুষকে পেয়েছে, যে তোমাকে ভালোবাসে।
সে প্রতিবাদ করে বললো, তিনি এতো বুড়ো নন। তার বয়স খুব বেশি। আর তিনি অনেক ধনী। দেখবেন একদিন তিনি ঠিক আমাকে বিয়ে করবেন।
সে চলে যাবার পর আমি বারান্দায় বসে সে যা যা বলেছে সেগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। খুব একটা মাথামুণ্ডু অর্থ খুঁজে পেলাম না, তবে মনে হচ্ছিল মারাত্মক কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
আমার এখন ক্রিমাদে ফিরে গিয়ে জারাস আর হুইয়ের সাথে যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ করা দরকার। তবে তার আগে রাষ্ট্রদূত তোরানের কবুতরের খাঁচায় গিয়ে দেখতে হবে থিবসে এটনের কাছে আমাদের বন্ধু যে কবুতরগুলো নিয়ে গিয়েছিল, তার কোনো একটা ফিরতি ডাক নিয়ে এসেছে কিনা।
.
সেনাপতির কামরায় আমি যখন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল হেরাকল আর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম, তখন কামরার বন্ধ দরজার বাইরে শোরগোল শোনা গেল।
হেরাকল বিরক্ত হয়ে যাড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলো, কী ব্যাপার? আমি তো নির্দেশ দিয়েছিলাম এখানে কোনো ধরনের ব্যাঘাত করা যাবে না!
প্রহরীদলের অধিনায়ক পলিশকরা সেডার কাঠের দরজা খুলে ভেতরে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করে ক্ষমা চেয়ে বললো, সম্মানিত মন্ত্রণাপরিষদ-সদস্য প্রভু তোরান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অবিলম্বে বার্তাটি যেন মিসরীয় প্রভু তায়তার হাতে পৌঁছান হয়।
হেরাকল আমার দিকে হতাশার চোখে তাকিয়ে দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, আসতে দাও বুদ্ধ লোকটাকে। ওদের সকলকে আসতে দাও! আর সবাই যখন ইচ্ছা তখন আমার নির্দেশ অমান্য কর।
হেরাকলের রোষ থেকে লোকটিকে রক্ষা করতে আমি দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, মাননীয় এডমিরাল, আমি এ-বিষয়ের সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব নিচ্ছি। মিসরে আমার সূত্র থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা আসার কথা ছিল।
আমরা আপনার সুবিধামতো অপেক্ষা করবো, সম্মানিত তায়তা। একথা বলে হেরাকল গজগজ করতে করতে তার আসন থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে উপসাগরের ওপারে ক্রোনাস পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
জিনিসটা ছিল আমার কড়ে আঙুলের উপরের গাঁটের সমান প্রায় ওজনহীন একটি পাকানো হলুদ রেশমি কাপড়। ভাঁজ খোলার পর দেখলাম আমার পুরো হাতের সমান লম্বা আর এর উপর ঘনবিন্যস্ত সঙ্কেতলিপি লেখা রয়েছে, যার অর্থ কেবল এটন আর আমার জানা আছে। অন্যান্য যেকোনো লিখিত ভাষার তুলনায় এই সঙ্কেতলিপিতে অনেক সুবিধা রয়েছে। ঠাসাঠাসি করে বার্তা লেখা যায়, এতে লেখকের সুবিধা হয় আর সঠিক অর্থ বুঝাতে অনেক দিক দিয়ে ব্যতিক্রমী ধরনের সুবিধা রয়েছে।
দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে এডমিরালের দিকে তাকিয়ে বললাম, মাননীয় এডমিরাল, চমৎকার খবর এসেছে। আমাদের উভয়ের শত্রুর ঠিক বুকে আঘাত হানার সুযোগ এসেছে। নীল বদ্বীপের পশ্চিম প্রান্তের শূর সমভূমিতে হাইকসো রাজা গোরাব এক হাজার রথসহ একটি পদাতিক বাহিনী সাজিয়েছে।
জানালার দিক থেকে ফিরে উচ্ছ্বসিত হয়ে হেরাকল বললো, আমি ঐ এলাকাটা চিনি! জিন আর ধুয়ারা শহরের মাঝে মধ্যসাগরের তীর জুড়ে এর অবস্থান।
আমি একমত হয়ে বললাম, ঠিক বলেছেন! গত একবছর ধরে আমার ফারাও আর জেনারেল ক্র্যাটাস নীল নদের পশ্চিম তীরে তাদের আক্রমণভাগ সাজিয়েছেন। ওরা উত্তরদিকে মেয়েরিস হ্রদ পর্যন্ত এগিয়েছেন। জিন শহর থেকে দক্ষিণে এর দূরত্ব মাত্র আশি লিগ। তারপর চারকোণা হলুদ রেশমি কাপড়টা টেবিলে বিছিয়ে দিলাম। হেরাকল তার লোকজনসহ এর চারপাশে ঘিরে দাঁড়াল। এটন একপাশে বার্তাটি লিখেছিল। আর অন্যপাশে উত্তর মিসরের একটি বিস্তৃত মানচিত্র এঁকেছিল। এতে হাইকসো আর মিসরীয় বাহিনীর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।
রেশমি মানচিত্রে হাত রেখে আমি বললাম, আমার সূত্র জানিয়েছে গোরাব একটি বড় ধরনের আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে। মিসরের পূর্ব সীমান্ত থেকে নেমে এসে কুয়ামে আমাদের রক্ষাকূহ্যের উপর হামলা করার চেষ্টা করবে। এটি একটি চতুর পরিকল্পনা তবে, জিনে যে জায়গায় তার সেনাবাহিনীর সমাবেশ হবে তা সাগর থেকে আক্রমণের ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। মনে হচ্ছে এরকম একটা সুযোগের জন্য ক্রিমাদে অপেক্ষারত আমাদের সম্মিলিত নৌবহর সম্পর্কে গোরাব এখনও অবহিত নয়।
