মনে হল লিলি ফুলটির মধ্য দিয়ে দেবীর সত্তা আমার দেহে চলে এসে আমাকে নববলে বলিয়ান করে তুলেছে।
.
বারান্দায় চামড়ার বালতিতে পরিচারকেরা গরম পানি রেখে গিয়েছিল। সেই পানিতে স্নান সেরে নাবিকদের একটা নীল জামা পরে গ্রন্থাগারের দিকে চললাম।
গতরাতে দরজাটা একটু ফাঁক রেখে গিয়েছিলাম। দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিতেই আতঙ্কে সেখানেই জমে গেলাম। আমার দিকে পেছন ফিরে আপাদমস্তক আলখাল্লায় ঢাকা একটি নারী মূর্তি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ফিস ফিস করে বললাম, ইনানা! আর তখনই সে দ্রুত ঘুরে আমার পায়ের কাছে এসে নতজানু হয়ে বসে আমার হাতে চুমু খেল।
মাথা ঢাকা কাপড়টা ঠেলে ফেলে দিয়ে সে বলে উঠলো, প্রভু তায়তা! আপনাকে দেখে কি ভালো লাগছে। আপনার কথা খুব মনে পড়তো। আমরা সবাই আপনার অভাব অনুভব করেছি।
আমি বিস্ময়ে বলে উঠলাম, লক্সিয়াস, তুমি! আমি মনে করেছিলাম অন্য কেউ। কী করে আমাকে খুঁজে পেলে?
আমি আমার বন্ধু প্রভু তোরানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিই জানালেন আপনি এখানে আছেন।
তাকে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে কৌচের দিকে নিয়ে গেলাম। তাকে বসিয়ে লেখার টেবিলে পিতলের ঘন্টা বাজাতেই রান্নাঘর থেকে তিনজন ক্রীতদাস সিঁড়ি বেয়ে ছুটে এলো।
ওদেরকে নির্দেশ দিলাম, খাবার নিয়ে আস।
বড় থালায় ক্রীতদাসেরা সিদ্ধ ডিম, শুকনো মাছ, মাংসের বড়া আর শক্ত রুটি রেখে গেল। আমরা দুজনে মুখোমুখি বসে খেতে শুরু করলাম।
এখানে তোমার আসাটা নিরাপদ তো? আমি ভেবেছিলাম তেহুতি আর বেকাথার মতো তোমাকেও হেরেমে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
সে মাথা নেড়ে বললো, না! ঐ খাণ্ডারি মেয়েগুলো আমাকে নিচুজাতের ক্রীতদাসি মনে করে। ওরা আমাকে আমার ইচ্ছামতো ভিতরবাহির আসা যাওয়া করতে দেয়।
তাহলে ক্রীতদাসির জীবন তোমার জন্য ভালোই হয়েছে, লক্সিয়াস। তবে আগের চেয়ে দেখতে সুন্দর হয়েছে।
সে লজ্জা পেয়ে বললো, আপনি খুব মন জুগিয়ে কথা বলতে পারেন তায়তা।
আমার অন্য মেয়েদের কথা বল। ওরা কি তোমার মতো খুশি আছে?
ওরা দুজনেই ভীষণ একঘেয়েমিতে ভুগছে। আপনার কাছ থেকে একটি গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।
আমি একটু কৌশল করে বললাম, কেন, ওদের নতুন স্বামী কি ওদের সঙ্গ দেন না?
সে হেসে বললো, আপনি সেই টিনের মাথাওয়ালা বুড়ো সর্বাধিরাজ মিনোজের কথা বলছেন? আমরা তার এই নাম দিয়েছি, তবে সে যদি শুনতে পায় তবে নিশ্চয়ই আমাদের কল্লা কেটে নেবে। বিয়ের অনুষ্ঠানের পর তেহুতি কিংবা বেকাথা কেউ তাকে আর দেখেনি। হেরেমে আমাদের নতুন বন্ধুরাও কেউ তাকে বিয়ের পর একবারও দেখেনি। অনেকে বিশ বছরের বেশি সেখানে থাকার পরও তাকে কোনোদিন দেখেনি। আসলে কেউ তাকে সেই টিনের মাথা ছাড়া দেখেনি।
আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম, বুঝলাম না। তার স্ত্রীদের কারও সাথে কি রাজার দৈহিক সম্পর্ক হয়নি? তুমি কি আমাকে একথা বলতে চাচ্ছো?
লক্সিয়াস বেশ কিছুদিন থেকেই রাষ্ট্রদূত তোরানের সাথে মেলামেশা করছে, কাজেই আমার কথার মানে বুঝতে তার খুব একটা অসুবিধা হল না। সে লজ্জিত হয়ে চোখ নামিয়ে বললো, কিছু দিন পর পর মিনোজ প্রহরীদের দিয়ে তার কয়েকজন স্ত্রীকে ডেকে পাঠান। তবে একবার হেরেম ছেড়ে যাওয়ার পর ওরা আর ফিরে আসে না।
আমি হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয় ওদের?
প্রহরীরা বলে ওদেরকে দেবতার পছন্দের সারীতে উন্নিত করা হয়। তারপর ওদেরকে পর্বতের উচ্চ মন্দিরে পাঠান হয়।
আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্সিয়াসকে আরও প্রশ্ন করলাম, তবে মনে হল সে এর বেশি কিছু জানে না। তাছাড়া উচ্চ মন্দিরের অবস্থান সম্পর্কেও তার খুব একটা আগ্রহ নেই। সে বারবার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জারাস আর হুই কেমন আছে, কোথায় আছে এসব জানতে চাচ্ছিল। আমি জানি রাজকুমারীদের নির্দেশেই সে এই তথ্যগুলো জানতে চাচ্ছিল।
আর আমিও বারবার সর্বাধিরাজ মিনোজের অগণিত স্ত্রীদের দিকে আলাপ ঘুরিয়ে নিতে থাকলাম।
আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা হেরেমে যাওয়ার পর থেকে কতজন বধূ দেবতার প্রিয় হয়েছেন?
সে একমুহূর্ত ইতস্তত না করে উত্তর দিল, চল্লিশজন। আমি অবাক হয়ে গেলাম তার এই নিশ্চিত উত্তর আর সংখ্যাটি শুনে।
তার মানে তুমি আর রাজকুমারীরা হেরেমে যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিন একজন করে স্ত্রীকে নেওয়া হত?
না না তায়তা। চল্লিশজন একইসময়ে হেরেম ছেড়ে যায়। ওরা চুলে ফুল খুঁজে নাচতে নাচতে আর গাইতে গাইতে চলে যায়।
এবার আমি একটু সরস মন্তব্য না করে পারলাম না, তাহলে সর্বাধিরাজ মিনোজ বেশ ব্যস্ত রাতই কাটিয়েছেন। তুমি নিশ্চিত যে এই চল্লিশজনের কেউ আর হেরেমে ফিরে আসেনি?
লক্সিয়াস চেহারা যতদূর সম্ভব নির্বিকার রাখার চেষ্টা করছিল, তবে তার চোখে হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। সে বললো, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। রাজপ্রাসাদের আমাদের অংশে যা যা ঘটে তা সব আমরা জানি।
আমি তার উত্তরটা শুনে কিছুক্ষণ ভাবলাম। আমার একধরনের অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল গুরুত্বপূর্ণ কোনো একটা বিষয় আমার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।
তারপর আবার বললাম, চল্লিশজন স্ত্রী একসাথে গেল কিন্তু একজনও ফিরে এল না।
লক্সিয়াস মুখ ভার করে বললো, একথাটা একবার কিন্তু বলেছি তায়তা। তেহুতি জানতে চায় জারাস এখন কোথায় আছে। ক্রিমাদে আছে নাকি জাহাজে দায়িত্ব পালন করছে? সে তাকে একটি উপহার পাঠাতে চায়। আপনি কি সেটা নিয়ে যাবেন? আমি তার প্রশ্ন উপেক্ষা করলাম। এখন আমি তার কথার প্যাঁচে পড়তে চাই না।
