চারদিন পর রোসেটা হয়ে কার্থেজগামি জাহাজটিতে একশো কুবরসহ বন্ধুকে তুলে দিলাম।
কাৰ্থেজিয় জাহাজটি দক্ষিণ দিগন্তে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগেই আমি এটনকে উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে একটি বার্তা লিখে তার পাঠানো কবুতরের পায়ে বেঁধে পাঠালাম। আর বন্ধুর হাতে রোসেটা পর্যন্ত জাহাজে তার জন্য যে উপহার পাঠিয়েছি সেকথাও জানালাম। সবশেষে বাও খেলার প্রথম চাল-পশ্চিম দুর্গ থেকে আমার সারস পাখি মুক্ত করে দিলাম। এই চালটি এটনকে সবসময় অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
.
পরদিন ভোরে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠতেই আমি জারাস আর হুইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইডা পর্বতের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে আবার কুনুসসের পথে রওয়ানা দিলাম। আমার নির্দেশ মোতাবেক হুই পথের বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্বে সরবরাহ চৌকির ব্যবস্থা করেছিল। প্রতি চৌকিতে নতুন ঘোড়াসহ সহিস আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। ব্যবস্থাটি বেশ চমৎকার ছিল।
ওর লোকেরা একটু পর পর সারা পথে গাছের গায়ে ব্রোঞ্জের গজাল মেরে দূরত্ব নির্দেশক রেখেছিল। এতে আমার নিজের অবস্থান সম্পর্কে কোনো সন্দেহ রইল না আর চলার গতিও কমাতে হয় নি। এক একটি চৌকির কাছাকাছি পৌঁছেই আমি শিঙ্গা ফুকে সহিসদের আমার আগমনের আগাম সংকেত দিতাম। তারপর সেখানে পৌঁছেই দেখতাম ওরা নতুন ঘোড়ায় জিন পরিয়ে অপেক্ষা করে রইছে। আমি একটু থেমে পানি মেশানো কয়েক ঢোক মদ খেয়েই নতুন ঘোড়ায় চড়ে সাথে সাথে রওয়ানা দিতাম। সহিস আমার হাতে মাংস আর পেঁয়াজের কাবাব খুঁজে দিতেই তা চিবোতে চিবোতে এগিয়ে চলতাম।
একটু পর যে ক্রীতদাসটি আমার জন্য জীবন দিয়েছিল, সদ্য খোঁড়া তার সমাধির কাছে এসে রাশ টেনে ধরলাম।
প্রার্থনা করে বললাম, শান্তিতে ঘুমাও ওয়াগা। আমি জানি আবার কোথাও আমাদের দেখা হবে। তখন আমি তোমাকে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। তারপর হাত মুঠো করে তাকে অভিবাদন জানিয়ে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে পাহাড়ের পেছন দিকের ঢাল বেয়ে কুনুসস বন্দরের দিকে ফিরে চললাম।
আমার রাষ্ট্রদূতের নতুন অট্টালিকার পেছনে আস্তাবলে পৌঁছে বিকেলের সূর্যের দিকে তাকিয়ে ক্রিমাদ থেকে এখানে পৌঁছার সময় মাপলাম।
সন্তুষ্ট হয়ে আপন মনে বললাম, দ্বীপটি পার হতে ছয় ঘন্টা লেগেছে। দীর্ঘ যাত্রার পর ক্লান্ত হলেও সোজা গ্রন্থাগারে গিয়ে লেখার টেবিলে গিয়ে বসলাম। সেখানে অনেক পাকানো প্যাপিরাস কাগজ আমার মনোযোগর জন্য রাখা হয়েছিল। বেশিরভাগই ছিল রাষ্ট্রদূত তোরানের কাছ থেকে আসা পত্র।
নৈশভোজ করার আগে একজন ক্রীতদাসের হাতে চিঠির উত্তরগুলো দিয়ে রাজপ্রাসাদের কাছে তোরানের বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য পাঠালাম। খাওয়াদাওয়ার পর শোবার কামরায় গেলাম।
সে রাতে আবার স্বপ্নে ইনানাকে দেখলাম। আমার শোবার ঘরের বাইরে বারান্দায় সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাথা ঢাকা ঘোমটা আর আলখাল্লা চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে, তবে মুখ দেখা গেল না। আমি উঠে তার কাছে যেতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শীসার মতো ভারী হয়ে রয়েছে আর নড়াচড়াও করতে পারছি না। কথা বলার চেষ্টা করলাম, তবে জিহ্বা থেকে কোনো শব্দ বের হল না। তবে এতে তেমন উদ্বিগ্ন হলাম না। বরং অনুভব করলাম আমার উপর সে তার করুণা ঢেলে দিয়েছে আর তার দৈব শক্তি আমাকে একটি ঢালের মতো ঢেকে রেখেছে। নিশ্চিন্ত হয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন ভোরের আগেই তরতাজা হয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। তারপর গতরাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল ভেবে যে এটা সত্যি ছিল না।
নগ্ন অবস্থায় কামরা থেকে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে বুক ভরে সাগর থেকে ভেসে আসা তাজা বাতাস টেনে নিলাম।
সামনে ক্রোনাস পর্বতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দেবতা আবার শান্তরূপ ধারণ করেছেন। একবার কালো ধূঁয়া বের হতেই মৃদু হাসলাম। তবে এখন এসব ভেবে নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই। কেননা আমি পরিকল্পনা করেছিলাম নীল নদীর বদ্বীপের উত্তর উপকূল জুড়ে হাইকসো অবস্থানে আগামী দশদিনের মধ্যে প্রথম হামলা চালাবো।
ঘুরে শোবার ঘরের দরজার কাছে পৌঁছতেই পায়ে নরম কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা লাগলো। জিনিসটা কী দেখার জন্য নিচের দিকে তাকালাম। তারপর ঝুঁকে জিনিসটা হাতে তুলে নিয়ে একটু কৌতূহল নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলাম।
অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম এটা একটা লিলি ফুল। তবে এরকম ফুল আমি কখনও দেখিনি। একটা বড় পানপাত্রের সমান আকার। পাপড়িগুলো সোনালি আর নিচের দিকে সিঁদুরে রঙের। পুংকেশরগুলো গজদন্তের মতো সাদা আর ডগাগুলো নীলকান্ত মণির মতো নীল।
ফুলটি এমন সুন্দর আর টাটকা যে বোঁটা থেকে তখনও স্বচ্ছ রস ঝরে পড়ছিল। দু আঙুলে ধরে ধীরে ধীরে ঘুরাতে ঘুরাতে এর সুগন্ধ পেলাম। গন্ধটা এতে পরিচিত যে এটা মনে হতেই আমার ঘাড়ের পেছনে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
এটি ছিল ইনানা দেবীর সুগন্ধ; ফুলের দেবী ইশতারের সুগন্ধ। যার প্রতীক হচ্ছে লিলি ফুল।
ফিসফিস করে বললাম, এটা স্বপ্ন নয়। সে সত্যিই এসেছেল।
ফুলটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিয়ে চুমু খেলাম। সাথে সাথে অনুভব করলাম ফুলটি শুকিয়ে যাচ্ছে; পাপড়িগুলো কুঁকড়ে যাচ্ছে। রঙ ফ্যাকাশে হয়ে মলিন বাদামি হয়ে যাচ্ছে। তারপর পাপড়িগুলো গুঁড়িগুড়ি হয়ে ধূলোর মতো আমার আঙুলের ফাঁক গলে নিচের দিকে ভাসতে ভাসতে বারান্দার মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো। ভোরের মৃদু বাতাসে উড়ে গেল।
