পাঁচটি ডিঙিতে সশস্ত্র লোকজন নিয়ে জারাসকে ধাউটিতে চড়ার নির্দেশ দিলাম। সে ধাউটিকে টেনে নিয়ে বন্দরে ঢুকলো। প্রবেশ পথ পার হতেই অচেনা ধাউটির পাল গুটিয়ে মিসরীয় পতাকা উড়াল। জারাস এটাকে জেটির সাথে বাঁধলো।
ধাউয়ের অধিনায়ক প্রভু তায়তার সাথে সাক্ষাত করতে চাওয়ায় তাকে আমাদের চারজন নাবিক চ্যাংদোলা করে তীরে নিয়ে এলো। আমি উপস্থিত হয়ে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে তাকে বিশ ঘা চাবুক মারার নির্দেশ দিলাম, যাতে সে বুঝে এখানে কে হুকুম চালায়। হতভাগা লোকটি হাঁটু গেড়ে বসে জেটির পাথরে কপাল ঠেকিয়ে বাম হাতের আঙুল দিয়ে একটি শনাক্তকরণ সংকেত করলো। এটন আর আমি যখন ক্রীতদাস ছিলাম তখন আমরা এই সংকেতটি ব্যবহার করতাম।
এবার চাবুক মারার নির্দেশটি বাতিল করে তাকে আমার জাহাজের কেবিনে নিয়ে আসতে বললাম। কেবিনে ঢোকার পর প্রহরীদেরকে চলে যেতে বললাম, তারপর আমার পরিচারককে নির্দেশ দিলাম বন্দীটির হাতমুখ ধোয়ার জন্য গরম পানি আর নাবিকদের একটি পোশাক আনতে।
আমার পাঁচক টেবিলে আমাদের জন্য রান্না করা চিংড়ি আর টুনা মাছ ভাজি রাখলো, আর আমি এটুস্কান মদের একটি বোতলের কাঠের ছিপি খুললাম। তারপর বললাম, তোমার নাম কী বন্ধু?
সে দাঁত বের করে হেসে বললো, অন্য যেকোনো নামের মতো বন্ধুও একটি ভালো নাম। আমার মা যে নামটি রেখেছিলেন তার চেয়েও ভালো।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের পরস্পরের পরিচিতজনের খবর কী?
সে উত্তর দিল, মোটা লোক। তিনি শুভেচ্ছা আর কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। মাটিতে ফেলে রাখা পুরোনো জামার হাতায় সেলাই করে লুকিয়ে রাখা একগুচ্ছ পাকানো প্যাপিরাস কাগজ বের করে সে আমার হাতে দিল। পাকানো কাগজটি খুলতে খুলতে তাকে আমি খাবারগুলো খেতে ইশারা করলাম। সে টেবিলে গিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করলো।
কাগজটায় এক নজর দিয়েই আমি বুঝতে পারলাম এটা হাইকসো নৌবহরের বর্তমান সমর পরিকল্পনার একটি অংশ। এছাড়া এটন নীল নদের বদ্বীপে কয়েকটি সম্ভাব্য লক্ষবস্তু নির্দেশ করে দিয়েছে যা, তার বিবেচনায় আমার জন্য ভালো হবে।
এটন যখন এ-ধরনের কাগজ পাঠায় তখন আমি এর সত্যতা নিয়ে মাথা ঘামাই না। কাগজটি আবার পাকিয়ে রাখলাম, পরে খুঁটিয়ে দেখতে হবে।
তুমি কি উপহারের কথা বলেছিলে, বন্ধু?
সে বেশ খুশি মনে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি আপনার জন্য আটচল্লিশটা সংবাদবাহক পায়রা এনেছি। এগুলো আমার জাহাজের খাঁচায় রাখা আছে। এটনের চিঠিটা আবার খুলে আরেকবার পড়লাম।
আমি মৃদুকণ্ঠে বললাম, মোটা লোকটি এখানে লিখেছেন, তিনি আমার জন্য একশোটি পায়রা পাঠিয়েছেন। বাকিগুলোর কী হল?
আমাদের খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তার ধৃষ্টতা দেখে আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, তুমি আমার পাখিগুলো খেয়ে ফেলেছো? তারার চেঁচিয়ে জারাসকে ডাকলাম। সে আসতেই তাকে বললাম, এখুনি এই বদমাশের জাহাজে যাও। সেখানে আটচল্লিশটা কবুতর পাবে। এখুনি এখানে নিয়ে এসো। নইলে এগুলোও রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যাবে। জারাস কোনো প্রশ্ন না করে আমার নির্দেশ পালন করতে ছুটে গেল।
সে আমার দামি মদ আরেক গ্লাস খেয়ে আমাকে অভিবাদন জানিয়ে বললো, চমৎকার মদ। আপনার রুচির প্রশংসা করতে হয়। আমাদের মোটা বন্ধু তার জন্য যথোপযুক্ত উপহার পাঠাতে আপনাকে অনুরোধ করেছেন।
আমি বিষয়টা নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবলাম। আমি জানি কুনুসসে রাষ্ট্রদূত তোরানের একটি বড় কবুতরের খাঁচা আছে। কীভাবে এই আমার পাখি পাঠাবো বল। শেয়াল আর হায়েনারা যদি এগুলোও খেয়ে ফেলে?
আমার এই অপমানজনক উক্তি গায়ে না মেখে সে বললো, আপনার কোনো জাহাজে করে আমাকে সাগর পার করিয়ে নীলনদের বদ্বীপের কোনো নির্জন জায়গায় নামিয়ে দিন, আমি নিজ হাতে এগুলো তার কাছে পৌঁছে দেবো।
আমি বললাম, এর চেয়েও ভালো ব্যবস্থা করা যাবে, বন্ধু। এই মুহূর্তে কার্থেজের একটি বাণিজ্যপোত ক্রিমাদ বন্দরে অবস্থান করছে। এর ক্যাপ্টেন গতকাল আমার সাথে নৈশভোজ করেছে। চারদিন পর সে বদ্বীপে হাইকসোদের রোসেটা বন্দর হয়ে কার্থেজে ফিরে যাবে। তুমি নিশ্চয়ই জানো কার্থেজের সুলতান আর রাজা গোরাবের মধ্যে নিরপেক্ষ সম্পর্ক আছে। আমি তার জাহাজে করে তোমাকে রোসেটা পর্যন্ত পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তুমি একশো কবুতর সাথে নিয়ে যাবে, এগুলো কুনুসসে ডিম ফুটে বের হয়েছে। ছেড়ে দিলেই এগুলো নিজের বাসায় ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব হবে। আর এভাবেই সেই বিশালদেহি লোকটি আর আমি খুব শিঘ্রই পরস্পরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারবো।
আমি জানি এই ব্যবস্থায় তিনি খুব খুশি হবেন। চাই কী আপনারা দুই এক দান বাও খেলাও পত্র বিনিময়ের মাধ্যমে খেলতে পারবেন।
লোকটির এই ধরনের রসিকতায় আমার মনে হল সে সীমা লঙ্ঘন করছে। আর আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়টি তার জানাটা বেশ অনধিকার চর্চা মনে হচ্ছে। এই ধরনের অপরিচিত গুপ্তচরের সঙ্গ আমি খুব একটা পছন্দ করি না। তোরানের কবুতরগুলো এখানে আনার ব্যবস্থা করার জন্য জারাসকে কুমুসস পাঠালাম। আর ইতোমধ্যে আমার বন্ধু মিসর থেকে যে ভগ্নপ্রায় ধাউটি নিয়ে সাগর পার হয়ে এখানে পৌঁছেছিল, তা ক্রিট দ্বীপে অবস্থান করা কোনো হাইকসো গুপ্তচরের চোখে পড়ার আগেই গভীর সাগরে পাঠিয়ে ডুবিয়ে দিলাম। তার সাতজন মাল্লাকে আমার জাহাজের দাঁড় টানার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল।
