কেবল একজন নাবিক জাহাজে রেখে বাকি সবাই তীরে বন্দর পরিচালকের অতিথি হিসেবে শূন্য গুদামে আশ্রয় নিয়েছিল। এর নাম পোইম্যান, অন্যান্য মিনোয়ানদের মতো সেও একজন বিষাদগ্রস্ত নিরাশাবাদি লোক।
রাতে সে আমাকে আমার কর্মকর্তাদেরসহ নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালো। তার এমন আতিথেয়তায় আমি অবাক হলাম। পরে জেনেছি সে মিনোয়ান গুপ্ত পুলিশের একজন কর্নেল। আর তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সকল মিসরীয়দের সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠাচ্ছে।
খাবারদাবার ছিল অতিরিক্ত লবণাক্ত আর পোড়া। মদও ছিল বিস্বাদ। সমস্ত কথাবার্তা কেবল ভূমিকম্প আর সাগরে যে ঝড় সৃষ্টি হয়েছিল তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আমি আলোচনাটা অন্য দিকে ঘোরাতে চাচ্ছিলাম। তাই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই ভূমিকম্প আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণ কী বলতে পারেন?
কারও কোনো সন্দেহ নেই যে দেবতার বিরুদ্ধে কোনো একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণে মানুষের উপর শাস্তিস্বরূপ এগুলো চাপানো হয়েছে।
আমি আবার বোকার মতো প্রশ্ন করলাম, এমন কী গুরুতর সে অপরাধ যার জন্য এমন শাস্তির প্রয়োজন পড়লো? আর কী উপায়ে এই অপরাধের প্রতিকার হবে?
সবাই এবার কামরায় উপস্থিত রাজাধিরাজ মিনোজের একমাত্র জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি বন্দর-পরিচালকের দিকে তাকাল। সে একজন জ্ঞানী লোকের মতো ভাব আর কর্তৃত্বব্যঞ্জক কণ্ঠে বললো, দেবতার দৈব ইচ্ছার বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না। কেবল রাজাধিরাজ মিনোজ, প্রশংসিত হোক তার নাম চিরদিন- এ বিষয়ে এই জ্ঞান রাখেন। যাইহোক আমরা এটা জেনে খুশি হতে পারি যে, মহামান্য মিনোজ এই দৈব রোষের কারণটি খুঁজে বের করেছেন এবং তিনি এর সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবেন। তারপর সে ঘাড় বাঁকা করে ঘরের দেয়ালের বাইরে ঝড়ের শব্দ শোনার চেষ্টা বললো, ঐ যে শুনুন! ঝড়ের প্রকোপ কমে আসছে। দেবতার রোষ ইতোমধ্যেই প্রশমিত হয়ে আসছে। আগামীকাল এই সময়ের মধ্যেই সমুদ্র শান্ত হয়ে আসবে আর পর্বতও স্থির হয়ে যাবে।
আমি তবু নাছোড়বান্দার মতো বিষয়টির পেছনে লেগে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, রাজাধিরাজ মিনোজ কী উপায়ে এতো সহজে দেবতাকে শান্ত করেন?
সে কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে একজন মুরব্বীর ভাব দেখিয়ে বললো, একমাত্র যে উপায়ে কোন দেবতাকে খুশি করা যায়। অর্থাৎ একটি বলি দিয়ে।
তোরান সাবধান বাণী উচ্চারণ না করলে হয়তো রাজাধিরাজ মিনোজের স্বভাবের বিষয়ে জানতে অনধিকার অনুপ্রবেশ করতাম। তবে আমি জিহ্বা সামলাম। বন্দর-পরিচালক অন্যদিকে ঘুরে তার সহকারীদের সাথে ঝড়ে তাদের কী কী ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো।
আমি বেশ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলাম এই কথাটি ভেবে যে, উরুস ষাড়কে আমি হত্যা করার পর ক্রোনাসের দৈব ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, দুটি ঘটনাই খুব কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে আর এদুটোকে কেবল হঠাৎ যুগপৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা বলা যায় না।
আমি ভাবলাম শান্ত হওয়ার জন্য ক্রোনাস দেবতা রাজাধিরাজ মিনোজের কাছে কী বলি দাবী করেছিলেন?
.
পরদিন ভোরে ক্রিমাদ বন্দর রক্ষাকারী দেয়ালের গায়ে সাগরের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া কমে এলো আর জারাস এবং হুইও হাইকেসোদের বিরুদ্ধে নৌ অভিযানের প্রস্তুতি নেবার কাজে ব্যস্ত হল।
চারদিন পর মিনোয়ান নৌবাহিনীর উপ-প্রধান হেরাকল যে ছয়টি তিনডেকওয়ালা যুদ্ধ জাহাজ আমার জন্য বরাদ্দ করেছিলেন সেগুলো ক্রিমাদ পৌঁছালো। সাগরের ঢেউ তাদেরকে পুবদিকে অনেক দূরে প্রায় সাইপ্রাস পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। ওদের পানিও প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল আর দাড়িরাও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
আমি ক্রিটের নাবিকদেরকে তিনদিনের পূর্ণ বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে নিশ্চিত করলাম যেন ওরা ঠিকমতো খাবারদাবার, জলপাই তেল এবং যথেষ্ট পরিমাণে মদও পায়। এতে ওদের মাঝে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া হল। বিশ্রাম শেষ হবার পর দুটি নৌবহরের মধ্যে যৌথ অনুশীলন শুরু করলাম।
ভাষাই আমাদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াল, তবে আমি প্রতিটি জাহাজে দুইজন করে দোভাষি নিয়োগ দিলাম আর পতাকার ইঙ্গিত মিনোয়ান আর মিসরীয়দের একই অর্থ করা হল।
দুই নৌবহরেই সুশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ নাবিক ছিল আর এক সপ্তাহের মধ্যে ওরা জটিল কৌশলী অভিযান পরিচালনার কাজ শুরু করলো। মিনোয়ানরা শিঘ্রই সৈকতে রথ আর পদাতিক সেনা অবতরণ করা এবং আবার যুদ্ধাভিযানের পর সৈন্য, ঘোড়া এবং রথ কীভাবে উদ্ধার করতে হয় তা শিখলো।
যতই ওরা দক্ষ হতে শুরু করলো সেই সাথে মিসরীয় এবং মিনোয়ানদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাঁপড়া এবং সহযোদ্ধার মনোভাব গড়ে উঠলো। আমি জানি খুব শিঘ্রই এদেরকে হাইকসোদের বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠাবো। তবে আমার মূল চিন্তা হল সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোথায় ওরা হাইকসোদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারবে।
উত্তম গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে প্রথম তীর ছোঁড়ার আগেই কিংবা খাপ থেকে তরকারি বের করার আগেই যুদ্ধ জয় করা যায়।
তারপর হঠাৎ একদিন একটি ছোট্ট এবং প্রায় পরিত্যক্ত একটি ধাউ ক্রিমাদ বন্দরের প্রবেশ মুখে এসে উপস্থিত হল। পালটি ঘেঁড়া আর ময়লা দাগে ভরা। আটজন মাল্লা প্রাণপণ চেষ্টায় পানি সেচে নৌকাটি পানিতে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। নাবিকদের চেহারা হতবিধ্বস্ত। জাহাজে কোনো পতাকা নেই আর এটা পানিতে বেশ নিচু হয়ে ভাসছিল, যেকোন মুহূর্তে ডুবে ডেতে পারে। কোনো জলদস্যু এই জাহাজের দিকে ফিরেও তাকাবে না, সম্ভবত সে কারণেই সাগরে ভেসে এতোদূর আসতে পেরেছে।
