ঘোড়াগুলো আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। পেছনের পা ছুঁড়ে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দড়ির বাঁধন থেকে ছুটার চেষ্টা করতে লাগলো। ভূমিকম্পে কেঁপে উঠা মাটির উপর দিয়ে টলমল পায়ে হেঁটে ওদের কাছে গিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। পাখি আর অন্যান্য পশুর মতো ঘোড়ার সাথেও আমি বিশেষ উপায়ে কথা বলে শান্ত করতে পারি। ওদেরকে শান্ত করে মাটিতে শুইয়ে দিলাম যাতে ওরা আহত না হয়।
তারপর ফিরে কুমুসস বন্দরের উপর দিয়ে উত্তর দিকে আর খোলা সাগর পেরিয়ে ক্রোনাস পর্বতের জমজ চূড়ার দিকে তাকালাম।
দেবতা ক্রুদ্ধ হয়েছেন। জিউস যে শিকল দিয়ে তাকে বেঁধে রেখেছেন তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য লড়াই করছেন। অনেক দূর থেকেও তার কান ফাটা গর্জন শোনা যাচ্ছে। পর্বতের অন্ধকার পাতালঘরের ছিদ্র দিয়ে ধূঁয়া, বাষ্প আর আগুনের বিরাট ঢেউ উঠে উত্তর দিগন্ত ঢেকে ফেলেছে। দেখলাম নগরীর দালানের সমান আকৃতির বড় বড় পাথর খণ্ড আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারছে।
আকষ্মিক এমন প্রলয়ঙ্কর ক্ষিপ্ততার সামনে আমার নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আর অসহায় মনে হল। এমনকি সূর্য দেবতা হেলিওসেরও মুখ ঢাকা পড়েছে। পুরো পৃথিবীর উপর অন্ধকার হতাশা নেমে এসেছে। আতঙ্কে পৃথিবীও কাঁপছে আর গন্ধকের কটু গন্ধে বাতাস ভরে রয়েছে।
আমি ঘোড়াগুলোর কাছে বসে হাতের ভাঁজে মুখ ঢাকলাম। আমিও ভয় পেয়েছি। দেবতার রোষ থেকে রক্ষা পাবার কোন আশ্রয়স্থল এই পৃথিবীর কোথাও নেই।
দেবতার আত্মস্বরূপ সেই দানবীয় শিংওয়ালা প্রাণীটিকে আমি হত্যা করেছি। নিশ্চিত এরকম ধর্মদ্রোহীতাপূর্ণ অপরাধের কারণে ক্রোনাসের আক্রোশ আমার উপর এসে পড়েছে।
এরপর প্রায় দুই ঘন্টা ধরে দেবতা তার তাণ্ডব চালিয়ে গেলেন, তারপর সূর্য মধ্যগগনে এসে পৌঁছতেই হঠাৎ এটা থেমে গেল যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল। গন্ধকের মেঘ উবে গেল, পর্বত স্থির হল আর পৃথিবীতে শান্তি ফিরে এলো।
.
মাটি থেকে ঘোড়াগুলোকে উঠিয়ে আমার ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলাম, তারপর লাগামের দড়িতে বাঁধা অন্য ঘোড়াগুলো নিয়ে পর্বতের পথ বেয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম।
তিনদিন আগে আমি জারাসকে আমার আসার কথা জানিয়ে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলাম। ক্রিমাদ বন্দরে পৌঁছার অনেক আগে জারাস আর হুইকে দেখলাম পাহাড়ের পথ বেয়ে আমার দিকে আসছে। দূর থেকে দেখেই আমাকে চিনতে পেরে ওরা উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো, তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলো। কাছে পৌঁছতেই লাফ দিয়ে মাটিতে নামলো। তারপর প্রায় টেনে আমাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে একজনের পর একজন বুকে জড়িয়ে ধরলো। আমি হোরাস আর হাথরের প্রতি আমার ভালোবাসার দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, যখন সে আমাকে তার কঠিন আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করলো তখন তার চোখে এক ফোঁটা পানি দেখা গিয়েছিল।
তারপর সে বললো, আমরা ভেবেছিলাম অবশেষে হয়তো আমরা তোমাকে হারালাম। তবে দেবতা ক্রোনাসও সেই কাজটি করতে পারেনি। যদিও আমার চোখ শুকনো ছিল, তবে আমি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম যে, এমন ভাবপ্রবণ দৃশ্যটি দেখার মতো আর কেউ সেখানে ছিল না।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হিসেবে আমি বললাম, মিনোয়ান যুদ্ধজাহাজগুলো কি ক্রিমাদ বন্দরে পৌঁছেছে?
জারাস মুখ থেকে সেঁতো হাসি মুছার চেষ্টা করে সাগরের দিকে দেখিয়ে বললো, না আসেনি। দেখতেই পাচ্ছেন ভূমিকম্পে সাগরের কি উথাল-পাথাল অবস্থা হয়েছে। নিশ্চয়ই ওরা পথ হারিয়েছে। মনে হয় ফিরে আসতে কয়েকদিন দেরি হবে।
তোমার জাহাজগুলো কীভাবে ঝড় সামলেছে? পাহাড়ের পথ বেয়ে নামতে নামতে আমরা কেবল নৌসংক্রান্ত আলোচনা করে চললাম। হুই যে হাতের ইশারা করে জারাসকে কিছু বলতে চাচ্ছে, তা দেখেও না দেখার ভাণ করলাম। যাইহোক ক্রিমাদ বন্দরের কাছাকাছি আসতেই সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলে বসলো, আমরা ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমাদের জন্য কোন বার্তা নিয়ে এসেছেন।
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, বার্তা? কার কাছ থেকে তোমরা বার্তা পাওয়ার আশা করেছিলে?
হয়তো প্রাসাদ থেকে?
আমি না জানার ভাণ করে বললাম, তোমরা রাজাধিরাজ মিনোজের কাছ থেকে বার্তা আশা করেছিলে? তাদের করুণ চাউনি উপেক্ষা করে আবার বললাম, না, কোনো বার্তা নেই। তবে তোমরা হয়তো শুনে থাকবে যে রাজকুমারী তেহুতি আর বেকাথা, দুজনেরই মিনোয়ান রাজার সাথে বিয়ে হয়েছে আর ওরা এখন রাজকীয় হেরেমের নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। তোমরা দুজনেই প্রশংসনীয় দায়িত্ব পালন করেছ। প্রথম সুযোগেই আমি ফারাওকে একথা জানাবো। আমি জানি তিনি কৃতজ্ঞ হবেন। একটু থেমে আবার বলে চললাম, তোমরা হয়তো ভাবছো কেন আমি একা এসেছি। পথে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল আর একটা বন্যপশুর আক্রমণে আমার পরিচারকের মৃত্যু হয়েছে। তোমরা পাহাড়ে লোক পাঠিয়ে তার মরদেহটা খুঁজে যথাযথ সমাধির ব্যবস্থা করো।
আমি কথা বলেই চললাম, ওদেরকে রাজকুমারীদের নিয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ দিলাম না। আমি বলতে চাই নি যে মেয়েদের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই আর ওরা হেরেমে কেমন আছে তাও আমি জানিনা।
বন্দরে পৌঁছে আমি অবাক হলাম দেখে দ্বীপের এপাশেও ক্রোনাস পর্বতের আগ্নেয়গিরির তাণ্ডবের প্রভাবে সাগরে বিক্ষুব্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বড় বড় ঢেউ বন্দরের দেয়ালে আছড়ে পড়ছিল। তবে জারাস আর হুই তাদের জাহাজগুলো রক্ষার জন্য যথাসম্ভব ব্যবস্থা নিয়েছিল। ওরা পাথরের জেটির সাথে দ্বিগুণ শক্তিতে জাহাজ বেঁধে রেখেছিল আর একটা জাহাজের সাথে আরেকটা জাহাজের সংঘর্ষ এড়াতে মাঝখানে পাকানো দড়িদড়ার গুচ্ছ ব্যবহার করেছিল।
