ষাঁড়টি মাথা ঝাঁকাতেই ওয়াগার দেহ অনেক দূরে শূন্যে ছিটকে পড়লো। তারপর অন্ধ বঁড়টি আবার শিং দিয়ে গুতো মারলো আর এবার ঘোড়াটিকে আঘাত করতেই ঘোড়াটি হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল।
এবার বঁড়টি সম্পূর্ণ উন্মাদের মতো হয়ে গেল। শিংয়ে জড়ানো মাথা ঢাকা কাপড়টি সরাবার জন্য এদিক-ওদিক ঝোঁপঝাড়, গাছের কাণ্ডে গুতো মারতে লাগলো।
ওয়াগা আমাকে যে মূল্যবান সময়টুকু দিয়েছিল সেই সুযোগ আমি এক লাফে জিন থেকে মাটিতে নামলাম। ধনুকটি ইতোমধ্যেই হাতে নিয়ে এক টানে গুণ টেনে টান টান করে নিয়েছিলাম।
ভূণির তখনও ঘোড়ার জিনে আটকানো ছিল, তবে এ-ধরনের পরিস্থিতির জন্য আমি সবসময় দুটো আলগা তীর কোমরবন্ধে গুঁজে রাখতাম। একটা তীর ধনুকে জুড়ে ধনুকের গুণ টেনে ধরলাম।
ষাঁড়টি সম্ভবত আমার নড়াচড়ার শব্দ কিংবা গন্ধে আমার উপস্থিতি টের পেয়েছিল। এবার সে তার বিশাল দেহটি ঘুরিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। তখনও এদিক সেদিক মাথা দোলাচ্ছিল। আমি অপেক্ষা করলাম, তারপর নড়াচড়ার ফলে তার ডান কাঁধ আর বুকের সামনের অংশ আমার দিকে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো। এবার আমি তীর ছুঁড়লাম। এতো কাছের দূরত্বে তীরটা প্রচণ্ড গতিতে গিয়ে আঘাত করলো। তীরটি সম্পূর্ণ ষাঁড়ের বুকের ভেতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু বাইরের দিকে সামান্য একটু ক্ষত রয়ে গেল যেখান থেকে উজ্জ্বল রক্ত ছলকে বের হল। আমার দ্বিতীয় তীরটি একই সারিতে এক আঙুল উপরে আঘাত করলো। ষাড়টি থমকে পিছিয়ে গেল তারপর এক চক্কর ঘুরে গিয়ে ঝোঁপের মাঝে অন্ধের মতো পড়ে গেল। শুনতে পেলাম পর্বতের খাড়া ঢালের গা ঘষটে নামছে। একমুহূর্ত পর নিচের দিকে পড়লো। বিশাল দেহটি ধপাস করে মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা গেল। তারপর ঝোঁপের মধ্যে পেছনের পা ছুঁড়ে ছটফট করতে লাগলো। অবশেষে বিকট একটি আর্তচিৎকার করে ছটফট করতে করতে মরে গেল। তার চিৎকারের শব্দ পর্বতের চূড়ায় প্রতিধ্বনিত হল।
এক মুহূর্ত পর নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপতে থাকা হাত স্থির করলাম। প্রথমে ওয়াগা যেখানে পড়েছিল সেখানে গেলাম। প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝা গেল তার মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। পাশে হাঁটু গেড়ে বসলাম। ভোলা চোখদুটো স্থির হয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, মুখ হা করা। আর কিছুই করার নেই, সব কিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছে।
তার ঘোড়াটাও মারাত্মক আহত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে। পশুটির গলায় আঘাত লেগেছে। এছাড়া সামনের পাও মারাত্মকভাবে জখম হয়ে ভেঙে গেছে। আমি দাঁড়িয়ে তলোয়ার বের করলাম, তারপর পশুটির দুই কানের মাঝে মাথার খুলির উপর এক কোপ মারতেই পশুটি সাথে সাথে মারা গেল।
অন্য ঘোড়াগুলোর লাগামের দড়ি তখনও মৃত ঘোড়াটির জিনের সাথে বাঁধা ছিল। দড়ি খুলে ঘোড়াগুলোকে কাছেই একটা গাছের সাথে বাঁধলাম। তারপর আমার ঘোড়াটি আর এর সাথে বাঁধা অন্য ঘোড়াগুলোর খোঁজে চললাম। এগুলো বেশি দূর যায়নি। জঙ্গলের মধ্যেই ভোলা একটি জায়গায় ঘাস খাচ্ছিল। এদেরকে নিয়ে যেখানে অন্য ঘোড়াগুলো ছিল সেখানে এসে একই গাছের সাথে বাঁধলাম।
সবকিছু ঠিক করার পর ঢাল বেয়ে নিচে নেমে যেখানে উরুস ষাঁড়টি পড়েছিল সেখানে গেলাম। মৃত পশুটির চতুর্দিক এক চক্কর ঘুরে দেখলাম, আবার অবাক হলাম এর বিশাল আকৃতি দেখে। এবার বুঝতে পারলাম ওয়াগা কেন এতো ভয় পেয়েছিল। আমার দেখা সমস্ত প্রাণীর মধ্যে এটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল।
বুঝলাম কেন রাজা নিমরদ এই পশু একশোটি শিকার করার জন্য গর্ব করতো আর কেন মিনোয়ানরা এটাকে তাদের জাতির কুলমর্যাদাচিহ্ন মনে করতো।
বিশাল প্রাণীটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় নিয়ে এর দিকে তাকালাম, আর একটু হলেই আমি মারা যেতাম। ওয়াগার রক্তমাখা আলখাল্লাটা এর শিং থেকে খুলে নিলাম। ভাঁজ করে বগলের নিচে রাখলাম। তারপর দাঁড়িয়ে হাত মুঠো করে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষকে অভিবাদন করলাম। তারপর ঘুরে চললাম। আমার তীর মারার উপযুক্ত প্রতিপক্ষ বটে।
এরপর উপরে যেখানে সাহসী ওয়াগার মৃতদেহ পড়েছিল সেদিকে চললাম। মুখ থেকে রক্ত মুছে তারই আলখাল্লা দিয়ে তার শরীর পেচিয়ে দিলাম। তারপর দেহটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে জঙ্গলের একটা উঁচু গাছে উঠে দুই ডালের মাঝে গুঁজে রাখলাম। পরে সুযোগমতো তার সমাধির ব্যবস্থা করবো।
গাছে তার পাশে বসে তার নিজের দেবতার কাছে তাকে অর্পণ করে একবার সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা করলাম। তারপর গাছ থেকে নেমে এলাম।
.
মাটিতে পা ছুঁতেই মাটি এমন ভীষণভাবে কেঁপে উঠলো যে আমি প্রায় টলে পড়ে যাচ্ছিলাম। নিজেকে খাড়া রাখতে গাছের কাণ্ড জাপটে ধরলাম। গাছটিও কাঁপছিল, এর শাখাপ্রশাখা দুলছিল। উপরের দিকে তাকাতেই উপর থেকে গাছের পাতা আর ছোট ছোট ডাল আমার উপর ঝরে পড়তে লাগলো। ভাবলাম ওয়াগার দেহটি হয়তো সরে গেছে তাই গাছের পাতা পড়ছে। কিন্তু আমি তো খুব ভালোভাবে লাশটি খুঁজে রেখেছিলাম।
আমার চারপাশে পুরো জঙ্গল ভয়ানকভাবে কাঁপছিল। এমনকি পর্বতও যেন নেচে উঠছে। প্রচণ্ড গর্জন শুনে ঘুরে ইডা পর্বতের চূড়ার দিকে তাকাতেই দেখলাম চূড়া থেকে বিশাল একটি গ্রানাইট খণ্ড ভেঙে আলগা হয়ে নিচে উপত্যকার দিকে গড়িয়ে পড়লো।
