গাছটির গোড়ায় নরম মাটি এমনভাবে এলোমেলো হয়ে রয়েছে যে, কিছুক্ষণ লাগলো বুঝতে যে, বিশাল কোনো পশুর দ্বিখণ্ডিত খুরের ছাপ সেখানে রয়েছে। খুরের ছাপটি নীল নদের তীরে আমার খামারে যে দুধেল গাই রয়েছে সেগুলোর তুলনায় অনেক গুণ বড়।
হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে খুরের ছাপটি মাপার চেষ্টা করলাম। আমার এক হাতে কুলোলো না। তারপর দুই হাত মেলে একটা খুরের ছাপ পুরোপুরি ঢাকতে পারলাম।
প্রচণ্ড বিস্ময়ে ওয়াগার দিকে তাকিয়ে বললাম, মালিন শেঠের দিব্যি। কোন দানব এই পায়ের ছাপ ফেলেছে? এর উত্তরে সে কী বললো তা আমি বুঝতে পারলাম না। বারবার মুখ দিয়ে একই শব্দ করতে লাগলো আর ভয়ে কাঁপতে লাগলো। তারপর একছুটে ঘোড়র কাছে গিয়ে কোনোমতে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ে আমাকেও ঘোড়ায় চড়তে ইশারা করলো। তারপর চারপাশের জঙ্গলের দিকে চকিত ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। তার দেখাদেখি আমিও ঘোড়ার পিঠে চড়ে সামনের দিকে ঘোড়া এগিয়ে নিলাম।
এই বিশাল খুরের ছাপের কোনো একটি যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা বের করার চেষ্টা করছিলাম। এই আকারটি দেখে বাস্তবতার চেয়ে কাল্পনিক মনে হচ্ছিল, তারপর ব্যবিলনে রাজা নিমরদের প্রাসাদের দেয়ালে ঝুলানো বিশাল বিরল উরুস ষাড়ের মাথার খুলি আর শিংয়ের কথা মনে পড়ে গেল। তবে ইউফ্রেটিস নদীর উত্তর-পুবে অনেক দূরে জাগরোস পর্বতের যে এলাকা থেকে সে এগুলো সংগ্রহ করেছিল, তা এই ক্ষুদ্র ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ থেকে অর্ধেক পৃথিবী দূরে অবস্থিত।
এই চমৎকার জঙ্গলে বিরল বন্য উরুস ষাঁড়ের বিচরণ বেশ অস্বাভাবিক, তবে সর্বাধিরাজ মিনোজ একে আশ্রয় দিয়ে থাকলে ভিন্ন কথা। সম্ভবত তিনি এই দানবীয় প্রাণীটিকে মিনোয়ান জাতির কুলমর্যাদাচিহ্ন এবং ক্রোনাস দেবতার পবিত্র প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রূপার যে মুখোশটি মিনোজ পরে থাকেন তা থেকে এই সম্ভাবনার বিশ্বাস পাওয়া যায়। তবে এই বিষয়ে তোরানের সাথে আলোচনা করাটা ঠিক হবে না। সে ইতোমধ্যেই আমাকে মিনোয়ান শাসকের ব্যাপারে বেশি গভীরে নাক গলাতে নিষেধ করেছে।
আমি ওয়াগার দিকে তাকালাম। সে তখনও ভীষণ উত্তেজিত হয়ে রয়েছে। সে প্রচণ্ড ঘামছিল আর তার নিচের ঠোঁট থরথর করে কাঁপছিল। ঘোড়ার পিঠে বসে ছটফট করতে করতে পথের দুইদিকে ঝোঁপগুলোর দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে বার বার তাকাচ্ছিল। আমি বেশ বিরক্ত বোধ করছিলাম। এই পর্বতে এখনও বন্য উরুস ষাঁড়ের বিচরণ থাকলেও সে খুবই বাড়াবাড়ি করছে।
যত বড়ই হোক না কেন উরুস হচ্ছে গরু আর গরু সাধারণত শান্ত প্রাণী হয়। তাকে কিছু বলতে যাবো এমন সময় সে চিৎকার করে উঠলো। তার গলা থেকে হঠাৎ এমন অদ্ভুত চিৎকারটি শুনে আমি চমকে উঠলাম।
তার ঘোড়াটি হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে আমার ঘোড়াটির গায়ে এসে এমনভাবে হেলে পড়লো যে সাথে সাথে সাবধান না হলে আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যেতাম। কোনোমতে সামলে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলাম। কিন্তু সে তখনও আতঙ্কিত হয়ে বিড়বিড় কিছু বলছিল আর যে পথের দিকে আমরা যাচ্ছিলাম তার উপরের কেঁপের দিকে দেখাল।
আমি তার দিকে চিৎকার করে বললাম, শান্ত হও বোকা! সাথে সাথে সামনের ঝোঁপের কাছে বিশাল কালো আকৃতিটির দিকে নজর পড়তেই আমি থেমে গেলাম। প্রথমে মনে করেছিলাম পর্বতের পাথুরে একটা অংশ। তারপর আকৃতিটি নড়াচড়া করতেই আকৃতিটি পরিষ্কার হয়ে চোখে ধরা পড়লো।
নিশ্চিতভাবে এটি একটি জীবন্ত প্রাণী।
ঘোড়ার পিঠে বসে পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বিশাল প্রাণীটির চোখের দিকে তাকালাম। চোখগুলো বিরাট। আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ওয়াগার চিৎকার শুনে প্রাণীটি বিশাল ঘন্টার আকৃতির কানগুলো সামনের দিকে খাড়া করে রেখেছে। পিঠে উটের মতো কুঁজ। দুই শিংয়ের মাঝে ফাঁক আমার দুই হাত মেলে ধরলে তার সমান হবে। শিংগুলো হাতির দাঁতের মতো মোটা আর সুঁচোলো। থিবসে ফারাওয়ের প্রাসাদে আমি যে হাতির দাঁত দেখেছি সেগুলোর মত।
এটি কোনো জাবরকাটা শান্ত গরু নয়। অবাক বিস্ময়ে ওয়াগার মতো আমিও চেঁচিয়ে উঠলাম।
প্রাণীটি মাথা নিচু করে ভয়ঙ্কর শিংদুটো আমাদের দিকে তাক করে ধরলো। সেই সাথে সামনের পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে শুরু করলো। তারপর একটি বিশাল তুষারধ্বসের মতো ঝোঁপঝাড় ভেঙে পর্বতের ঢাল বেয়ে নিচে আমাদের দিকে দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ রেখে এক লাফ দিল।
সঙ্কীর্ণ পথে আমি আটকে পড়েছিলাম। পেছনে ফেরার বা ঘোরার কোনো উপায় নেই। তরবারি কিংবা ধনুক বের করারও সময় পেলাম না।
ওয়াগার ঘোড়াটি আতঙ্কিত হয়ে পালাবার পথ খুঁজতে গিয়ে আরোহীসহ সরাসরি বঁড়টির হামলার মুখোমুখি পড়ে গেল। তবে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও লোকটি অসম্ভব সাহসের কাজ করলো। তার পশমি আলখাল্লাটি গোল করে পাকানো অবস্থায় জিনের সামনে বাঁধা ছিল। সে এটা টেনে নিয়ে ছিঁড়ে একটা পতাকার মতো ছড়িয়ে দিল। তারপর একটা চাবুকের মতো বঁড়টির মাথার উপর ছুঁড়ে মারলো। আমি বুঝতে পারিনি তার উদ্দেশ্যে, তবে আলখাল্লাটি ষাঁড়ের শিংয়ের নিচে লেগে এর মাথার চতুর্দিকে পেঁচিয়ে বঁড়টির চোখ পুরোপুরি ঢেকে ফেললো।
ঘোড়া আর আরোহীকে চোখে না দেখলেও বঁড়টি বিশাল শিং দিয়ে ওদের দিকে তো মারলো। আমি তাকিয়ে দেখলাম একটি শিংয়ের ডগা ওয়াগার ডান বগলের নিচে বুকে ঢুকে গেল। তার বুকের পাঁজর ভেদ করে শিংয়ের সুচালো ডগাটি উল্টোদিকে পিঠ দিয়ে বের হল।
