নতুন জাহাজের ক্যাপ্টেনদের দ্বীপ ঘুরে অন্যপাশে ক্রিমাদ বন্দরে যেতে নির্দেশ দিলাম। সেখানে জারাস আর হুই আমার সুমেরিয় দুই ডেকওয়ালা রণতরীগুলো নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এখন থেকে এটিই আমার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলঘাটি হবে। এখান থেকে মাত্র ছয়শো লিগ দক্ষিণে শত্রুর অবস্থানে আঘাত হানতে পারবো। অনুকূল বাতাসে সমুদ্র পথে মাত্র পাঁচ দিনের পথ।
.
আমার সংগ্রহ করা নতুন তিন ডেকওয়ালা জাহাজগুলো সকালেই কুমুসস থেকে যাত্রা শুরু করলো। আর এদিকে একইদিন ভোর হবার আগেই অন্ধকার থাকতেই আমি ওয়াগাকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে জাহাজগুলো পৌঁছাবার আগেই ক্রিমাদ বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমার নির্দেশ মোতাবেক ওয়াগা দুটি ঘোড়ায় জিন পরিয়েছিল আর আরও চারটি ঘোড়া সাথে নিয়েছিল। পথে কোনো একটি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেই সাথে সাথে ঘোড়াটি বদলে নিতে পারবো।
তোরান আমাকে সতর্ক করে বলেছিল পথে পাহাড়ি জঙ্গলে দস্যু আর পলাতক আসামিরা লুকিয়ে থাকে। একথা ভেবে কোমরের খাপে একটা ছোট তরবারি আর ডান কাঁধে আমার লম্বা বাঁকা ধনুকটাও ঝুলিয়ে নিলাম।
ক্রীতদাস হিসেবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ওয়াগা কোনো ধারালো অস্ত্র বহন করতে পারে না। তবে সে একটা গুলতি আর একটি থলে ভর্তি নদী থেকে আহরণ করা গোলাকার পাথর নিল। এই অস্ত্রটি দিয়ে তাকে আমি আকাশে অনেক উপরে উড়তে থাকা তিতির পাখি শিকার করতে দেখেছি। আরেকবার দেখেছি রান্নাঘরের পেছনের বাগানে ঘুরতে থাকা একটি হরিণকে এই অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল।
ভোর হবার আগেই আমরা রওয়ানা দিলাম। একজন দক্ষ ঘোড়সওয়ার হিসেবে ওয়াগা আমার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছিল। সে রাস্তার প্রতেক্যটি বাঁক আর মোড় চিনতো। আমার ডান দিক দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে সে পশুর মতো ঘোঁতঘোঁত শব্দ করে আর হাতের ইশারায় আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো।
প্রথমে ইডা পাহাড়ের ঢাল দিয়ে তির্যকভাবে পার হলাম তারপর পূর্বদিকে সবচেয়ে উঁচু চূড়ার গিরিপথের দিকে চললাম। গ্রীষ্মের শেষেও এই জায়গাটি বরফাবৃত ছিল। এই উচ্চতার বড় বড় গাছগুলো কেটে কামারশালার হাপর আর কারখানার চুল্লির জন্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ দেখে আমার মন খারাপ হল। কাঠুরেরা একটি গাছও রাখেনি।
অবশেষে অনেক উঁচুতে আমরা আদিম অবস্থায় থাকা জঙ্গলে পৌঁছে বিশাল গাছগুলোর মধ্য দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগলাম। গাছের উপরের শাখাগুলোর একটি আরেকটির সাথে জোড়া লেগে নিচে ছায়া দিচ্ছে। ঘন শৈবালের উপর দিয়ে চলার কারণে ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ চাপা পড়ে গিয়েছিল। শুধু পাখির ডাক আর ছোট ছোট প্রাণীর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পাহাড়ের বরফ গলে যে ঝরণা বয়ে চলেছে, ঘোড়াগুলোকে সেই ঝরণার ঠাণ্ডা আর পরিষ্কার পানি পান করালাম।
জঙ্গলের মাঝে একটি খোলা জায়গায় পৌঁছে সূর্য দেবতা হেলিওসকে লক্ষ্য করার জন্য একটু থামলাম। পূর্ব দিগন্তের উপরে সূর্য দেবতা মাথা তুলেছেন।
এটি একটি পবিত্র স্থান। এখানেই সকল দেবতার পিতা ক্রোনাস আর তার পুত্র কন্যার জন্ম হয়। আমি তাদের উপস্থিতি অনুভব করলাম আর জঙ্গলের সুমিষ্ট বাতাসে আর দোঁ-আশ মাটিতে তাদের সুঘ্রাণ পেলাম। অমরাত্মাদের এতো কাছে আসতে পেরে কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। হয়তো আমার মাঝে এই অনুভূতি জেগে উঠার পেছনে কারণ হচ্ছে আমার শিরার মধ্যে একই সূত্রে জাত রক্ত প্রবাহিত হওয়া যা, ইনানা আমাকে প্রথম জানিয়েছিল। তারপর আমি নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, ইনানা আমার একটি কল্পনা প্রসূত বিষয় মাত্র। আর আমি আমার নিজের অলস কুসংস্কারের একটি শিকার ছিলাম। তবে তার চেহারা বার বার আমার মনে ফিরে আসায় আমি খুবই বিরক্ত হচ্ছিলাম।
ইনানার চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতেই আমি তার হাসির প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম সে কাছেই রয়েছে আর এতে আমার অটল সিদ্ধান্ত ভেঙে পড়লো।
ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে খাড়া ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলাম। নিচে ক্রিটের দক্ষিণ উপকূলে পাহাড়ের ধারে ক্রিমাদ বন্দরের অবস্থান। দুপুর হতে আরও দুই ঘন্টা বাকি। আমরা বেশ ভালোই এগোচ্ছি।
মনে হল বিশ লিগ দূরত্ব থেকেই আমি বন্দরে নোঙর করা আমার সুমেরিয় জাহাজগুলোর মাস্তুলের ডগা দেখতে পাচ্ছি। ঘোড়ার পিঠে বসে পেছন ফিরে ফেলে আসা পথের দিকে তাকাতেই সেই আগ্নেয়গিরিটি দেখতে পেলাম যার মাঝে ক্রোনাস দেবতাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। উত্তর দিগন্তে এটা সোজা পানির উপরে উঠে গেছে। এর যমজ চূড়া থেকে বেয়ে পড়া ক্রিম রঙের ধূঁয়ার স্রোত-প্রবাহের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মৃদু হাসলাম। তার মানে দেবতার মেজাজ এখন শান্ত।
এই ফাঁকে ওয়াগা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে কাছের গাছটির পেছনে বসে পেচ্ছাব করতে লাগলো। এই আচরণ থেকে বুঝা যাচ্ছে ক্রীতদাস হওয়ার আগে সে একটি দ্র পরিবারের সন্তান ছিল। কেবলমাত্র নিম্ন শ্রেণীর এবং সাধারণ মানুষেরা দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে।
তারপর ওয়াগা লাফ দিয়ে উঠে পোশক হাঁটুর নিচে নামিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে যেখানে সে বসে প্রস্রাব করছিল তার কাছেই মাটির দিকে দেখাল। আর সেই সাথে মুখ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের শব্দ করতে লাগলো। কী হয়েছে জানার জন্য আমি ঘোড়া থেকে নেমে তার কাছে গেলাম।
