দুজনেই কিছুক্ষণ বিব্রতকর নীরবতায় কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা মোড় ঘুরতেই হঠাৎ আমার থাকার অট্টালিকার সামনে পৌঁছলাম। বিশাল ভবনটি অন্যগুলোর মতোই সাদামাটা, কোনো ফুলের বাগান নেই। শুধু চারপাশে একটি আঙুরের মাচা দেখা যাচ্ছে।
এই আবাসনের পরিচারকবৃন্দ আমাকে স্বাগত জানাবার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে মুল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তোরান বললো, এরা সবাই ক্রীতদাস। এদের জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছে, কাজেই কোনো ধরনের অনর্থক বকবকানি আপনাকে শুনতে হবে না।
মনে মনে ভাবলাম, তার মানে এদের কাছ থেকে কোনোকিছু জানতে পারব না। তবে একথা মুখে প্রকাশ করলাম না।
গাট্টাগোট্টা চেহারার হাসিহাসি মুখে দাঁড়ানো একজনকে দেখিয়ে সে বললো, এ হল বেশাস, আপনার প্রধান পরিচারক। এ মিসরীয় ভাষা বুঝে তবে সেই একই কারণে কথা বলতে পারে না। আপনার যা প্রয়োজন তা একে বলতে পারেন।
তোরান ঘুরে ঘুরে আমার নতুন আবাসস্থলটি দেখাল। কামরাগুলো বেশ বড় তবে আড়ম্বরহীন। আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আগেই বন্দর থেকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো সব ধুয়ে পরিষ্কার করে সুন্দরভাবে থাকার জায়গায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শোবার কামরার পাশেই একটি গ্রন্থাগারে একশোর মতো বড় বড় লেখার কাগজের পাকানো ফালি এবং গ্রন্থ তাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
তোরান বললো, এখানে মিনোয়ান সাম্রাজ্যের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবেন, এখানে আমারও বেশকিছু লেখা আছে। আশা করি এগুলো আপনার কাজে লাগবে। তারপর কামরার মাঝখানে লেখার টেবিল দেখিয়ে বললো, এখানে আপনার একান্ত ব্যবহারের জন্য কালি, তুলি আর উৎকৃষ্ট মানের সাদা প্যাপিরাস কাগজ পাবেন। আর আপনার লেখা কোনো পত্র পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় পাঠাতে চাইলে আমি তার ব্যবস্থা করতে পারবো।
ভাবলেশহীন মুখে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, আপনি সত্যি একজন হৃদয়বান লোক তোরান। তবে মনে মনে হেসে ভাবলাম, তা পাঠাবেন তবে তার আগে একটা অনুলিপি করে রাখবেন। আমি বুঝেছি যে তার বন্ধুত্ব আর দয়াশীলতারও একটা পরিসীমা আছে।
তারপর সে বলে চললো, ভঁড়ারে পঞ্চাশটি উৎকৃষ্টমানের মদের পিপা রাখা আছে। এগুলো খালি হলেই সাথে সাথে আবার ভরে দেওয়া হবে। রোজ সকালে বন্দর থেকে টাটকা মাছ-মাংস আসবে। আপনার দুজন পাঁচকই ভালো, আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমি নিজে ওদেরকে পছন্দ করেছি।
আস্তাবলে গিয়ে পৌঁছতেই প্রধান সহিস আমার সামনে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে প্রণত হল। তার পিঠে সদ্য চাবুকের দাগ দেখতে পেলাম।
বন্ধুত্বপূর্ণ কন্ঠে আমি তাকে বললাম, উঠে দাঁড়াও! এককালে আমিও ক্রীতদাস ছিলাম, তাই চাবুকের আঘাতের কথা আমার ভালো মনে আছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী? সে কোনমতে উত্তর দিল, ওয়াগা। লোকটি বেশ হাসিখুশি ধরনের, স্পষ্টতই ক্রিটবাসি নয়।
আমি তার নামটি উচ্চারণ করে বললাম, ঠিক আছে ওয়াগা। এবার তোমার ঘোড়াগুলো দেখাও। সে আমার আগে আগে আস্তাবলের মধ্য দিয়ে ছুটে চলতে চলতে খালিপেটের গলা থেকে অর্থহীন তবে উৎসাহব্যঞ্জক শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলো।
আস্তাবলের পেছনে ছোট্ট চারণভূমিতে আটটি সুন্দর ঘোড়া দেখা গেল। ওয়াগা শিস দিয়ে ওদের ডাকতেই ঘোড়াগুলো সাথে সাথে তার কাছে ছুটে এলো। সে প্রত্যেকটি ঘোড়াকে তার কোমরে বেঁধে রাখা থলে থেকে এক টুকরা করে যবের পিঠা খাওয়াল। ঘোড়াগুলি যদি তাকে বিশ্বাস করে তাহলে আমিও এভাবে এগুলোকে খাওয়াব। ঘোড়া সাধারণত খুব ভালোভাবে বিবেচনা করতে পারে।
খুব শিঘ্রই একদিন আমাকে ঘোড়ায় চড়ে দক্ষিণ উপকূলে ক্রিমাদ যেতে হবে। পথ দেখাবার জন্য আমার একজন পথপ্রদর্শক দরকার। তুমি কি রাস্তাটা চেনো? ওয়াগা সায় দিয়ে মাথা ঝুঁকালো। আমি তাকে বললাম, তাহলে তৈরি থেকো। আমি তোমাকে হঠাৎ যাবার কথা বলতে পারি আর খুব জোরে ছুটতে হবে। আমার কথা শুনে সে দাঁত করে করে হাসলো। মনে হল আমাদের দুজনের মধ্যে বনিবনা হয়ে গেছে।
.
পরদিন ভোরে সূর্য উঠার আগে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত প্রাতরাশ সেরে পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে নৌ-প্রশাসনের সদর দফতরে গেলাম। সেখানে নৌবাহিনীর উপ-প্রধান হেরাকল আর তার সহকারীদের সাথে সারাদিন আলোচনা আর তর্কবিতর্ক করে কাটালাম। তবে তেমন ফল হল না। ওরা আমাকে আটটি জরাজীর্ণ দুই স্তরের দাঁড়বিশিষ্ট জাহাজ দেবার প্রস্তাব করলো। এগুলো অনেক বছর বাণিজ্যপোত হিসেবে ব্যবহারের পর এখন প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ওরা চাচ্ছে এগুলো দিয়ে আমি হাইকসোদের মোকাবেলা করি। এতোদিনে আমি জেনেছি যে, মিনোয়ানরা গোমড়ামুখো এবং কঠিন প্রকৃতির লোক। বিদেশিদের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করে। একমাত্র ব্যতিক্রম দেখতে পেয়েছি রাষ্ট্রদূত তোরানকে, যে খুবই আমায়িক এবং পরোপকারী। তাকে অনায়াসে একজন জন্মগত মিসরী বলা যায়।
সন্ধ্যায় অত্যন্ত হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। পাঁচক যে ভেড়ার কাবাব রান্না করেছিল তা ছুঁয়েও দেখলাম না। তবে তোরান আমার ভাঁড়ারে যে সুস্বাদু মদ রেখেছিল তা পান করে শক্তি সঞ্চয় করলাম। তারপরদিন ভোরে আবার নৌ সদর দফতরে গেলাম।
আমার সমস্ত কলাকৌশল ব্যবহার করে আর তোরানের সহায়তায় অনেক দরকষাকষির পর শেষ পর্যন্ত দশম দিনে তিন ডেক বিশিষ্ট প্রায় নতুন ছয়টি রণতরীর ব্যবস্থা করলাম। এগুলো পানিতে ভাসাবার জন্য একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও নৌবাহিনীর উপ-প্রধান কয়েকজন মিনোয়ান অভিজ্ঞ নৌ-কর্মকর্তা দিলেন। এছাড়া জাহাজ চালাতে উত্তর ইতালিয়ার আদিম গোত্রের শক্তিশালী ভাড়াটে নাবিক নেওয়া হল। এরা নিজেদেরকে ল্যাটিন কিংবা এটুস্কান হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। তোরান আমাকে আস্বস্ত করলো, এরা অত্যন্ত চমৎকার নাবিক এবং ভয়ঙ্কর যোদ্ধা। এক একটি তিনডেকওয়ালা রণতরীতে একশো বিশজন করে এই আদিম গোত্রের লোকদের নিয়ে আমি সন্তুষ্ট হলাম যে, এবার হাইকসো নৌবহরের যে কোনো জাহাজের মোকাবেলা করতে পারবো।
