না তায়তা। ওরা পশ্চিম আফ্রিকার বেলালা গোত্রের নারী।
আমি প্রতিবাদ করলাম, কিন্তু ওদেরতো স্তন নেই!
বয়ঃসন্ধির সময়ে এগুলো কেটে ফেলা হয় যাতে ওরা ভালোভাবে তরবারি চালাতে পারে। তবে এর নিচে ওরা পুরোপুরি নারী। আপনাকে প্রমাণ করে দেখাচ্ছি। একথা বলে সে দেহরক্ষীদের অধিনায়কদের দিকে ফিরে কিছু বললো। সাথে সাথে সে তার সবুজ ঘাগড়ার প্রান্ত তুলে তার স্ত্রী অঙ্গ দেখাল।
আমি প্রায় অনুনয়ের স্বরে বললাম, আবার কখন আমি আমার মেয়েদের দেখা পাবো?
তোরান চূড়ান্তভাবে বললো, আমাকে যে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে সেজন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। কেননা উত্তরটি হল কখনও না। ওদের মৃত্যু পর্যন্ত সর্বাধিরাজ মিনোজ ছাড়া আর কোনো পুরুষ তাদের দেখতে পাবে না।
পরে তার কথাটি ভাবতে গিয়ে আমার মনে হল শেষ কথাটি একধরনের সতর্কবার্তা ছিল। তবে এই বিশাল ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে তখন আমি এতো মনোকষ্টে ছিলাম যে এই কথাটি আগে ভাবার সময় পাইনি।
চার রণচণ্ডি নারী দেহরক্ষী ঘোমটায় ঢাকা রাজকুমারীদের নিয়ে চললো, লক্সিয়াস তাদের অনুসরণ করলো। তবে যাবার আগে আমার দিকে ফিরে ফিসফিস করে বললো, আমি জীবন দিয়ে ওদের রক্ষা করবো। কথাগুলো না শুনলেও ওর ঠোঁটনাড়া পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম।
আর সামলাতে না পেরে ওদেরকে বাধা দেবার জন্য আমি এগোতেই তোরান আমার হাত টেনে ধরে থামিয়ে বললো, আপনি নিরস্ত্র তায়তা। ঐ রণচণ্ডি নারীগুলো প্রশিক্ষিত হত্যাকারী। ওদের মনে কোনো দয়ামায়া নেই।
আমি দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলাম। লক্ষ্য করলাম বেকাথা কাঁদছিল, ঘোমটার নিচে তার সারা শরীর কাঁপছিল। তবে তেহুতি একজন বীর নারীর মতো অজানার পথে পা বাড়ালো।
সিংহাসনের পেছনে দেয়ালে একটি কালো রঙের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। হতাশা নিয়ে আমি দেখলাম ওরা সেই দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
মনে হচ্ছিল যেন আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। ওরা চিরদিনের জন্য আমার কাছ থেকে চলে গেছে। যাদের জন্য এতোবছর বেঁচে ছিলাম তারা আর নেই।
রাষ্ট্রদূত তোরান জানতো কত গভীরভাবে রাজকুমারীদের সাথে আমি জড়িত ছিলাম আর ওদেরকে হারিয়ে আমি কতটুকু আহত হয়েছি। এবার সে প্রমাণ করলো যে, সে আমার সত্যিকার বন্ধু হয়েছে। প্রাসাদের পেছনের উঠানে আমার জন্য একটা ঘোড়ার গাড়ি অপেক্ষা করছিল। রাষ্ট্রদূত তোরান আর আমি সেই গাড়িতে চড়ে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে কুনুসস নগরীর উপরে পাহাড়ের ধারে এক বিশাল অট্টালিকায় গেলাম। এটিই এখন থেকে মিসরীয় দুতাবাস হবে আর আমি হলাম রাষ্ট্রদূত।
উপরে উঠবার সময় তোরান শহরের বিভিন্ন দৃশ্য দেখিয়ে আমার মন চাঙ্গা করার চেষ্টা করতে লাগলো। এর মধ্যে ছিল নৌবাহিনীর সদর দপ্তর আর সরকারি বিভিন্ন ভবন, যেখান থেকে সর্বাধিরাজ মিনোজ দূর-দূরান্তে তার সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন।
তোরান বললো, সরকারের সর্বোচ্চ দপ্তর হচ্ছে রাজ্য পরিষদ, সর্বাধিরাজ মিনোজ এর দশজন সম্মানিত সদস্য নিয়োগ দেন। এদের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনের সকল দিক দেখাশুনা করা। যেমন, সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক ক্রোনাস দেবতার উপাসনা থেকে শুরু করে কর আদায় পর্যন্ত, এটা অবশ্য ঐচ্ছিক নয়। এই সামান্য রসিকতাটা করে সে চুকচুক করলো, তারপর বললো, এরপর আছে নৌপরিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনী।
অনেক চেষ্টার পর আমি আমার হারানোর ব্যথা একপাশে সরিয়ে এইসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দিলাম।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, অবশ্যই সারা পৃথিবী মিনোয়ান নৌবাহিনীর কথা জানে, তবে আমি জানতাম না যে আপনাদের একটি সেনাবাহিনীও আছে।
তোরান গর্বভরে উত্তর দিল, আমাদের সেনাবাহিনীতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার সেনা সদস্য রয়েছে।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, হোরাসের দিব্যি, তার মানে এটাতো আপনাদের জনসংখ্যার অধিকাংশ।
সমস্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা মিনোয়ান তবে সাধারণ সেনারা ভাড়াটে সৈন্য। আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ হচ্ছে দক্ষকর্মী, ওরা সেনাসদস্য নয়।
এই তথ্যটি জেনে আমি খুব অবাক হলাম। তারপর বললাম, এবার আমি বুঝেছি। আর নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনাদের এই চমৎকার নৌবহরের জাহাজে অত্যন্ত দ্রুত এই যোদ্ধাদেরকে বহন করে যখন যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিতে পারবেন।
তোরান সকল জ্যেষ্ঠ সেনাপতি আর তাদের যার যার দায়িত্বের বিশদ বিবরণ জানাল। তারপর সে এদের প্রত্যেকের ক্ষমতা আর দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করলো। কেউ কেউ অত্যন্ত কুশলী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন যোদ্ধা। তবে অন্যান্যদের বেশিরভাগই শুধু তাদের সম্পদ, পেট আর জৈবিক কামনা মেটাবার বিষয় নিয়ে ব্যস্ত।
তবে তাকে সর্বাধিরাজ মিনোজ আর সোনার মুখোশের পেছনে মানুষটি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করতেই সে তা এড়িয়ে গেল আর হালকা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বললো, সর্বাধিরাজ মিনোজ সম্পর্কে আলোচনা করা মানেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার সামিল অপরাধ। আপনি কেবল এটা জেনে সন্তুষ্ট হতে পারেন যে, তিনি হলেন আমাদের জাতির আত্মার মূর্তপ্রকাশ। এবারকার মতো আমি মনে করবো আপনি না জেনে একথা জিজ্ঞেস করেছেন, তবে আমি আপনাকে এ-বিষয়ে সাবধান করে দিচ্ছি তায়তা।
