মুখোশের চোখের ছিদ্রগুলো মনে হল কালো এবং শূন্য। তবে আমি একপাশে একটু সরতেই মুখোশের মাথাটিও সেইদিকে ঘুরলো। আর এতে জানালা থেকে আলো পড়তেই আমি চোখের গর্তের গভীরে জীবন্ত চোখের নড়াচড়া বুঝতে পারলাম। এটা কি মানুষের চোখ নাকি কোনো জন্তু কিংবা দেবতার চোখ? তবে জানার কোনো উপায় নেই।
আড়াল থেকে ঢাকিরা দুবার ঢাক পিটিয়ে নীরব হল। হঠাৎ নীরব হয়ে যাওয়া কামরায় কেউ নড়চড়া করছে না। তারপর সিংহাসনে বসা মুখোশ পরা মানব-মূর্তিটি উঠে দাঁড়িয়ে দুইহাত দুপাশে মেলে ধরলো। তারপর সে একটি বন্য ষাঁড়ের মতো গর্জন করে উঠলো। শব্দটি এই প্রাণীর মাথার মুখোশের মধ্যে এমন প্রচণ্ডভাবে প্রতিধ্বনিত হল যে, আমার মনে হল মিনোয়ান প্রকৌশলীরা নিশ্চয়ই এই মুখোশের মধ্যে এমন কোনো ব্যবস্থা করেছে যার কারণে শব্দটি অসম্ভব জোরে শোনা যাচ্ছিল।
সাথে সাথে পুরোহিতসহ উপস্থিত সমস্ত মানুষ শ্রদ্ধা দেখিয়ে গম্ভীরভাবে গোঙানির মতো একটি শব্দ করে মুখ নিচের দিকে করে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লো। দুই রাজকুমারীর দুইপাশে দাঁড়ানো সবুজ পোশাক পরা প্রহরীরা রাজকুমারীদেরকে জোর করে মুখ নিচু করে মার্বেল পাথরের মেঝেতে প্রণত হতে বাধ্য করলো।
রাষ্ট্রদূত তোরান আমার কব্জি ধরে আমাকে নিচের দিকে টেনে মাটিতে প্রণত করে হিশশ করে বললো, চুপ করে শুয়ে থাকুন! প্রাণ বাঁচাতে হলে উপরের দিকে তাকাবেন না!
আমি তার কথা মান্য করলাম। বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে, তবে এটুকু বুঝতে পারলাম এখন তর্ক করার সময় নয়। চুপ করে শুয়ে রইলাম; অন্যরা যখন মেঝেতে কপাল ঠুকে গোঙানির মতো শব্দ করছে, তখন তাদের মতো আমিও মেঝেতে কপাল ঠুকে গুঙিয়ে উঠলাম। এদিকে সিংহাসন থেকে আগের মতোই প্রচণ্ডভাবে ক্রোধদ্দীপ্ত বক্তৃতা হয়ে চলেছে। শব্দটি বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার মাথা দপদপ করতে লাগলো।
যদিও মিনোয়ান ভাষা আমি ভালোভাবেই শিখেছিলাম, তবুও সর্বাধিরাজ মিনোজ যা বলছিলেন তার একবর্ণও বুঝতে পারলাম না। হয় তিনি কোনো রহস্যময় ভাষায় লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দিচ্ছেন কিংবা শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে বিকৃত হওয়ায় আমি তা বুঝতে পারছি না।
ডানহাতে আমি একটি ব্রেসলেট পরেছিলাম। চিকণ একটি চেইন থেকে ছোট্ট একটি সোনার চাকতি ঝুলছে। চাকতিটা পলিশ করে আয়নার মতো চকচকে করেছিলাম। হাত না উঠিয়ে আমার সামনে বা পেছনে কোনো জিনিস বা মানুষের ছবি এতে প্রতিফলিত হলে আমি দেখতে পারতাম। এভাবে আমি অনেক কিছু দেখেছিলাম আর কয়েকবার এর মাধ্যমে মৃত্যুও এড়াতে পেরেছি।
হঠাৎ আমার ছোট্ট আয়নায় দেখা গেল ছাদের ছায়া থেকে একটি কালো গোলাকার পর্দা নিঃশব্দে পড়ে গেল। যে মঞ্চের উপর সিংহাসনটি বসানো ছিল পর্দাটির আকার ঠিক তার সমান। পর্দাটি নিচে নেমে সম্পূর্ণভাবে সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার মা, পাসিফেকে ঢেকে ফেললো।
তারপর এটা যেমন নেমেছিল সেরকম দ্রুত আবার উপরের দিকে উঠে গেল। সিংহাসন আর মঞ্চটি শূন্য পড়ে রইল। সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার মা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এ-ধরনের চাতুর্যপূর্ণ মঞ্চাভিনয়ের শৈলী আমি আর কখনও দেখিনি।
আড়াল থেকে ঢাকিরা আবার ঢাক পেটাতে শুরু করলো। এই ইঙ্গিতটি পাওয়ার পর সবাই হাঁটু গেড়ে বসে মাথা তুললো। সর্বাধিরাজ মিনোজ আর তার মা অদৃশ্য হয়েছেন বুঝতে পেরে সবাই অবাক বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলো। আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। ক্রিটের রাজার আশ্চর্য ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখে আমার বিস্ময় প্রকাশ করার পর আমি দাঁড়িয়ে তোরানকে জিজ্ঞেস করলাম, আশা করি সর্বাধিরাজ মিনোজ বিয়ের অনুষ্ঠানের একটা দিনক্ষণ ঠিক করেছেন, তাই না?
সে অত্যন্ত বিব্রত হয়ে বললো, ক্ষমা করুন প্রভু তায়তা। আমার আগেই আপনাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলা উচিত ছিল। আমি মনে করেছিলাম কী ঘটছিল তা আপনি বুঝতে পেরেছিলেন। এতোক্ষণ যা দেখলেন তা ছিল বিয়ের অনুষ্ঠান।
প্রথমে আমার মুখে কোনো কথা জোগাল না, তারপর কোনোমতে বললাম, কিছু বুঝতে পারছি না তোরান। আমিতো মিসরী রাজকুমারীদের বিয়ের কথা বলছিলাম।
সে বললো, এটাই তো বিয়ে। এরা আর রাজকুমারী নেই। ওরা এখন মিনোয়ান রানি। আপনি আর আমি যা সম্পন্ন করতে চেয়েছিলাম তা এখন সাফল্যের সঙ্গে শেষ করা হয়েছে। তারপর সে আমার হাত ধরতেই আমি তার হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, এখন আমার মেয়েদের কী হবে?
মাথা ঘুরিয়ে সবুজ পোশাকপরা দেহরক্ষীদলটিকে দেখিয়ে সে বললো, ঐ রণচণ্ডীরা এখন ওদেরকে রাজকীয় হেরেমে নিয়ে যাবে।
আমি প্রতিবাদ করে বললাম, আমি এখনও ওদের সাথে যাওয়ার জন্য তৈরি হই নি। আগে আমাকে পবিত্র আঁড় থেকে আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিতে হবে।
আমি অত্যন্ত দুঃখিত তায়তা। রাজমহিষীদের প্রাসাদে কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই।
আপনিতো জানেন তোরান যে, আমি একজন পুরোপুরি পুরুষ নই। আমাকে কখনও আমার মেয়েদের কাছ থেকে জোর করে আলাদা করা হয়নি।
সে বললো, মিনোয়ান আইনে আপনি একজন পুরুষ।
সবুজ পোশাকপরা যে দেহরক্ষীরা রাজকুমারীদেরকে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে বললাম, ওদের বিষয়টা কি তোরান? ওরা কি পুরুষ নয়?
