মানুষের ভীড়ের মাঝখানে মার্বেল পাথরের মেঝের উপর দিয়ে যাওয়ার জন্য আমার মেয়েদের আর তাদের সবুজ পোশাক পরা দেহরক্ষীদলের জন্য একটি পথ খোলা ছিল। এটি সোজা চলে গেছে হলের শেষ মাথায় আরেকটি দরজার কাছে। এই গলি দিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করতেই, কয়েক কদম যাওয়ার পর ভীড়ের মধ্য থেকে একজন লোক এসে আমার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলো। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি লোকটি রাষ্ট্রদূত তোরান। সেও আপাদমস্তক কালো পোশাকে আবৃত ছিল আর তার মুখও একজন মরামানুষের মতো সাদা রং আর চোখে গোল করে সূর্মা লাগানো ছিল। তবে সে একটি সোনার হার পরেছিল, যা দেখে আমি চিনতে পারলাম। বিষাদময় স্বরে কথা বললেও আমি তার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলাম।
সামনের বন্ধ দরজাটি দেখিয়ে সে বললো, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে। ঐ দরজার পেছনেই বন্ধ কামরাটিতে সর্বাধিরাজ মিনোজ তার সভাসদদের নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। রাণীমাতাও তার সাথে আছেন। এটি একটি বিরল সম্মান। আজকের অনুষ্ঠানে আপনার অংশগ্রহণ করার মতো কিছু নেই। তবে কাল থেকে নৌ-বাহিনী প্রধান এবং যুদ্ধপরিষদের সাথে আপনি হাইকসোদের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করবেন।
আমিও তার মতো নিচুস্বরে বললাম, শুনে খুব খুশি হলাম। তবে বিয়ের উৎসবটি কখন হবে? এতোবছরের পরিকল্পনা আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পর এই পর্যায়ে এসেছি। আমরা প্রায় সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছি। তাই আমার আস্বস্ত এবং খুশি হওয়াটা স্বাভাবিক।
সূর্মা লাগানো চোখে তোরান আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই চকচকে পলিশ করা সিডার কাঠের দরজাটি নিঃশব্দে খুলে গেল। একটি ঢাকের কাঠির আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা রাজদরবারে ঢুকলাম। ঢুকার পর একটু থামতেই পেছনে দরজাটি আবার নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
ভেতরে স্লান আলো। কোনো প্রদীপ দেখা যাচ্ছে না। কয়েকটি মাত্র সরু জানালা কালো রঙের পর্দা দিয়ে ঢাকা। ছাদ এতো উঁচু যে উপরে ছায়াছন্ন হয়ে আছে। তবে আবছা আলোয় আমার চোখ সয়ে এলে প্রায়ান্ধকারে বিভিন্ন বস্তুর আকৃতি আর মানুষের অবয়ব বুঝতে পারলাম।
কামরাটির মাঝখানে একটি উঁচু মঞ্চের উপর সিংহাসনটি স্থাপন করা রয়েছে। এর নিচে চারদিক ঘিরে রয়েছে কয়েকজন মানুষ। সিংহাসনের বামদিকে ক্রোনাস দেবতার যাজকরা সমবেত হয়ে রয়েছেন। এরা ঢিলা লম্বা আস্তিনহীন টুপিযুক্ত আলখাল্লা পরে রয়েছে। এতে তাদের শরীরের আকার কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। পোশাকের রং ছিল ষাঁড়ের রক্তের মতো লাল।
সিংহাসনের অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকদল সভাসদ আর অভিজাত ব্যক্তি। এরা কেউ কেউ ঐতিহ্যগতভাবে লম্বা কালো আলখাল্লা আর উঁচু টুপি পরেছিল।
এদের মুখোমুখি ছিল উচ্চপদস্থ সামরিক এবং নৌকর্মকর্তারা। এদের পোশাক বেশ জমকালো এবং রঙচঙে হলেও সভাসদদের পোশাক ছিল মেটে রঙের।
সিংহাসনটি বিশাল। আবলুশ কাঠের উপর মুক্তার কাজ। বসার জায়গায় বেশ চওড়া, পাঁচজন বড় বড় মানুষ বসতে পারে। তবে এখন দুজন বসে রয়েছে। একজন ছিলেন নারী, রাজদরবারে উপস্থিত আমার রাজকুমারী আর লক্সিয়াস ছাড়া তিনি ছিলেন একমাত্র মহিলা।
আমি অবিশ্বাসি চোখে তার দিকে তাকালাম। এমন অতি প্রবীণা নারী আমি কখনও দেখিনি। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সময়ের সমবয়সী এক বৃদ্ধা। হাড্ডিসার দেহটি ধূলিমলিন কালো লেস কাপড়ে আবৃত, তবে হাতে কোনো দাস্তানা নেই। বাতরোগ আর বয়সের কারণে আঙুলগুলো অদ্ভুতভাবে বেঁকে রয়েছে। কঙ্কালসার হাতের পিঠে নীল শিরাগুলো জট পাকিয়ে রয়েছে।
পাণ্ডুর মুখের চামড়ার বলিরেখাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন গাছ থেকে পড়ে যাওয়া একটি আপেল রোদে শুকিয়ে রয়েছে। এটা দেখে আর মানুষের মুখ মনে হচ্ছে না। মাথার কয়েকগাছি চুল উজ্জ্বল লাল রঙ করা। চোখ দুটো গর্তে ঢুকে রয়েছে। একটা চোখ কালো রঙের কাঁচের মতো আগ্নেয় শিলার মতো চকচকে। আর অন্যটি অনচ্ছ আর সেই চোখ থেকে পানি চুঁইয়ে শুকনো গাল বেয়ে পড়ছে। চোখের পানিতে দেহের উপরের কালো লেসের পোশাক ভিজে যাচ্ছে।
নীরবতা ভঙ করে বৃদ্ধা হুউক করে কেশে উঠলো আর সবুজ আর হলুদ রঙের একদলা কফ মুখ থেকে বের করে মার্বেলের মেঝেতে থুক করে ফেললো। মুখ খুলতেই আমি তার কালো দাঁতগুলো দেখলাম।
তোরান ফিসফিস করে বললো, রানি মাতা, পাসিফে।
রূপার ঝালরের কারুকাজকরা আলখাল্লা আর বুকে সোনার বর্মপরা দানবীয় একজন মানুষ তার পাশে বসে রয়েছে। তবে প্রাণীটিকে দেখে মানুষের চেয়ে অনেক বড় মনে হল। ভাবলাম এটি কি মিনোয়ান অমর সর্বদেবতার মন্দির থেকে আসা কোনো প্রকৃতিক্রমবহির্ভূত জন্তু কিংবা মানব?
এর হাতদুটো কালো লোমশ চামড়ার দাস্তানায় ঢাকা। মনে হল বন্য মহিষের চামড়া। এর নিচের অঙ্গও একই চামড়ার তৈরি উঁচু বুটজুতা দিয়ে ঢাকা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের জিনিস হল এর মাথা। মাথাটি সম্পূর্ণ মূল্যবান ধাতুর মুখোশে ঢাকা। মুখোশটির আকার ছিল নাকের ছিদ্র আর রুক্ষ কেশরসহ একটি বন্য ষাঁড়ের মাথার মতো। মুখোশে লাগানো বিশাল শিংগুলো ছিল আসল। সম্ভবত একই প্রাণীর কোনো মৃতদেহ থেকে আনা। লম্বা শিংগুলো সামনের দিকে বাঁকা আর ডগাগুলো ভয়ঙ্কর রকমের সুচোলো। এ-ধরনের মহিষের শিং আমি ব্যবিলনে রাজা নিমরদের প্রাসাদের দেয়ালে ঝোলানো দেখেছি।
