লক্সিয়াস মৃদু হেসে আবার পেয়ালার উপর মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, এটা বেশ সুস্বাদু।
তেহুতি প্রতিবাদ করে বললো, যথেষ্ট হয়েছে! তোমার সবটুকু খাওয়ার দরকার নেই। একথা বলে সে গ্লাসটা তার হাত থেকে নিল। তারপর গ্লাসটি টেবিলের চারদিকে একজন থেকে আরেকজনের হাতে ঘুরেফিরে চললো। হাতপা নেড়ে ওরা এর স্বাদ বর্ণনা করতে শুরু করলো। বেকাথা মনে করলো এর স্বাদ বড়ইয়ের মতো, তবে তেহুতি বললো এর স্বাদ অবশ্যই পাকা ডালিমের মতো। লক্সিয়াস কোনো মন্তব্য করলো না, তবে তার অংশ খেতে . ছাড়লো না। প্রথমে সেই হাসতে শুরু করলো। বাকি দুজন তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বেকাথা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
এক ঘন্টার মধ্যে তিনজনেই সমস্ত পোশাক খুলে সর্বাধিরাজ মিনোজ যে অলঙ্কারগুলো পাঠিয়েছিল সেগুলো পরে সাজলো। আমি আমার বীণায় ওদের প্রিয় একটা সুর বাজাতে শুরু করলাম। ওরা হাসাহাসি করতে করতে কেবিনের চারদিকে তিড়িং বিড়িং করে লাফালাফি করতে লাগলো। শেষপর্যন্ত মধ্যরাতের একটু আগে বেকাথা তার বিছানায় লুটিয়ে পড়লো। বাকি দুজনও আর দেরি করলো না। আমি ওদের গায়ে চাদরটাকা দিয়ে প্রত্যেকের কপালে চুমু খেয়ে শুভ রাত্রি বলে আলো নিভিয়ে বিদায় নিলাম। তারপর ডেকের সিঁড়ি বেয়ে উপরের ডেকে উঠে রাতের খোলা হাওয়ার মাঝে এসে দাঁড়ালাম। অনেকদিন পর মনটা বেশ খুশিখুশি লাগছে।
.
পরদিন দুপুরবেলায় একটি রাজকীয় বজরা বন্দর থেকে বের হয়ে পবিত্র ষাঁড়ের দিকে আসতে শুরু করলো। আমার রাজকুমারীরা মিনোয়ান রীতিতে পোশাক পরে তৈরি হয়ে মূল ডেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। নড়চড়া না করলে বুঝার উপায় নেই যে কালো কাপড়ের কয়েকটি স্তর আর ঘোমটার নিচে কোনো জীবিত প্রাণীর অস্তিত্ব আছে। রাষ্ট্রদূত তোরান আজ সকালেই এই পোশাকআশাকগুলো পাঠিয়েছিল। অনেক অনুনয়বিনয় আর ছলচাতুরির পর মেয়েদেরকে এই অদ্ভুত ভিনদেশি পোশাকগুলো পরতে রাজি করেছিলাম। লক্সিয়াসের বেলায়ও তেমন অমর্যাদা করা হয়নি। যদিও তার পোশাকটিও লম্বা আর কালো ছিল আর টুপিটি ছিল উঁচু আর কৌণিক আকারের, তবুও তার মুখ আর হাত খোলা ছিল। সে কেবল একজন পরিচারিকা হওয়াও আমার বিশ্বাস যদি সে বুক উন্মুক্তও রাখে তারপরও কেউ তার দিকে তেমন লক্ষ্য করবে না।
ডেকে বসা চারজন যাজকের মৃদু তালে ঢোলক বাজনার তালে তালে আমি মেয়েদেরকে নিয়ে নিচে বজরার দিকে এগিয়ে নিয়ে চললাম। তারপর বৈঠা বেয়ে বজরাটি বন্দরের দিকে এগিয়ে চললো। এই ফাঁকে আমি পোতাশ্রয়ের চারদিক ঘিরে থাকা উঁচু উঁচু অট্টালিকাগুলো ভালোমতো দেখার সুযোগ পেলাম।
পাহাড় থেকে আনা মেটে-ধূসর রঙের পাথরের বড় বড় টুকরা দিয়ে এই অট্টালিকাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। একটি দালানের সাথে আরেকটি দালানের খুব একটা তফাৎ নেই। সবগুলো দেখতে বিশ্রী। ছাদগুলো সমতল। আর সরু জানালাগুলো আলোনিরোধক ধূসর কাঁচ দিয়ে ঢাকা।
সবচেয়ে বড় ভবনটি বন্দরের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত। এর ছাদে ক্রিটের সোনালি ষাঁড়ের প্রতিকৃতি না থাকলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এটি সর্বাধিরাজ মিনোজের চারটি প্রাসাদের একটি।
অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দাঁড় টেনে দাঁড়িরা বজরাটিকে প্রাসাদের সামনের জেটিতে এনে রাখলো। তীরে কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি আমাদের ছোট দলটিকে স্বাগত জানাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। এরা সবাই একইরকম কালো পূর্ণদৈর্ঘ্য পোশাক আর উঁচু কোণিক আকারের টুপি পরে ছিল। সবার মুখ চুনা-পাথরের মতো সাদা আর চোখের চারপাশে গোল করে সূর্মা লাগানো। কয়েকজন পোশাকের উপর সোনা আর রূপার হার পরে রয়েছে।
আমিও রাষ্ট্রদূত তোরানের পাঠানো লম্বা কালো আলখাল্লা পরেছিলাম। তবে আমি আমার সেই পাখির পালক লাগানো জমকালো সোনার শিরস্ত্রাণটি পরেছিলাম আর আমার মুখে কোনো চুন কিংবা সূর্মা লাগানো ছিল না।
সমবেত লোকজনের মধ্যে কেবল চারজনের পরনে কালো পোশাক ছিল না। এরা ছিল উজ্জ্বল সবুজ আঁটোসাঁটো জ্যাকেটপরা নমনীয় শরীরের চারজন কালো যোদ্ধা। এদের বুকের উপর আড়াআড়ি চামড়ার ফিতা বসানো আর মাথায় চামড়ার শিরস্ত্রাণ পরা। রাজকুমারীরা তীরে পা রাখতেই ওরা চটপটে সামনে এগিয়ে এসে ওদের দুজনের পাশে অবস্থান নিল। ওরা সবাই ছোট তরবারি আর ছুরি বহন করছিল। দুজনের হাতে চাবুকও ছিল।
সবুজ পোশাকপরা দেহরক্ষীদলটির মাঝে আজব ধরনের মেয়েলি কিছু একটা ছিল। মসৃণ মুখে দাড়ি নেই। সুগঠিত কমনীয় দেহ আর হাতগুলোও সেকরম। শুধু নারীসুলভ স্তনের প্রস্ফীতি নেই। যে কোনো বালকের মতো ওদের বুকও সমান। আমার মনে হল এরা উভলিঙ্গ জাতীয় মানুষ যা এর আগেও এই আজব দেশে দেখেছি। যাইহোক এদের নিয়ে চিন্তা মন থেকে বাদ দিয়ে আমার রাজকুমারীদের অনুসরণ করে প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রাসাদের গুহার মতো লবিতে ঢুকলাম।
এই স্থানটিতে কালোপোশাকপরা চুন-সাদা মুখের মানুষ কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে ভীড় করে দাঁড়িয়েছিল। তবে পুরো জনসমাবেশের মধ্যে একজনও নারী দেখা গেল না। আমরা মিসরীয়রা আমাদের নারীদের নিয়ে গর্বিত আর সবসময় আশা করি যে নারীরা আমাদের জাতীয় জীবনে একটি প্রধান এবং অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করুক। এই নারী বিচ্ছিন্নতা দেখে আমার খুবই অস্বাভাবিক এবং অপছন্দনীয় মনে হল।
