এসব কঠিন নিয়ম-কানুনের কথা মনে রেখে আমি পবিত্র সঁড়ের পেছনের ডেকে দাঁড়িয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে আগত প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
রাজপ্রাসাদের তিনজন কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রদূত তোরান এক মাস্তুল বিশিষ্ট একটি নৌযানে চড়ে এদিকে আসছিলেন। কাছাকাছি হতেই ঐ তিনজনের একজন কর্মকর্তা সর্বাধিরাজ মিনোজের নামে চিৎকার করে আমাদের জাহাজে উঠার অনুমতি প্রার্থনা করলো। ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটস সাথে সাথে তাদেরকে উঠার অনুমতি দিয়ে উত্তর দিলেন।
আপাদমস্তক কালো আলখাল্লা পরা লোকগুলো ধীরে ধীরে ডেকের উপর দিয়ে হেঁটে এগিয়ে এলো। তাদের আলখাল্লার প্রান্ত ডেকের উপর দিয়ে লুটাতে লুটাতে চলছিল। ওরা মাথায় কালো ফিতা জড়ানো উঁচু কানাবিহীন টুপি পরেছিল। কুচকুচে কালো দাড়ি আংটা দিয়ে কোঁকড়ানো রয়েছে। মুখে চকের গুড়ো মেখে সাদা করা হয়েছে, তবে চোখের চারপাশে গোল করে সুর্মা লাগানো রয়েছে। আশ্চর্যরকম বৈপরীত্য। চোখমুখে বিষণ্ণ ভাব।
ওরা আমার সামনে এসে থেমে দাঁড়াতেই রাষ্ট্রদূত তোরান তাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। তোরান একে একে তাদের লম্বা-চওড়া নাম আর উপাধি উচ্চারণ করে যেতেই আমি মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলাম।
জ্যেষ্ঠ দূত আমাকে অভিবাদন করে বললো, সম্মানিয় তায়তা, সর্বাধিরাজ মিনোজের আদেশক্রমে আমি আপনাকে ক্রিটে স্বাগত জানাচ্ছি। তারপর সে জানালো প্রাসাদে সবাই আমাদের জন্য সাগ্রহে প্রতিক্ষা করছেন। তবে আনন্দের অনুষ্ঠানটি উদযাপনের সঠিক সময় ও তারিখ নিয়ে এখনও একটু অনিশ্চয়তা রয়েছে। সর্বাধিরাজ মিনোজের সাথে বাগদত্তা মিসরীয় রাজপরিবারের নারীদের স্বাগত জানাবার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আরও চব্বিশ ঘন্টা লাগবে।
তারপর সে বললো, আগামীকাল দুপুরে একটি রাজকীয় বজরা এই জাহাজের কাছে আসবে। এটা আপনাকে এবং ভাবী রাজবধূদেরকে রাজপ্রাসাদে বহন করে নিয়ে যাবে। আপনাদেরকে রাজ পরিবারে স্বাগত জানাবার জন্য সর্বাধিরাজ মিনোজ সেখানে অপেক্ষা করে থাকবেন।
আমি ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, সর্বাধিরাজ মিনোজ অত্যন্ত সৌজন্যময়। আমি জানি কূটনীতির ভাষার এই আমন্ত্রণ আসলে রাজার নির্দেশ।
মহানুভব রাজা আরও জানিয়েছেন, মিসরীয় রাজপরিবারের মহিলাদের আগমনে তিনি আনন্দিত। তিনি তাদের জন্য এই উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন। এই কথা বলে সে তার সাথে আসা সহকারীদের হাতের ভারী রূপার কৌটার দিকে ইঙ্গিত করলো। ওরা উপহারগুলো আমার সামনে ডেকের উপর রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে পিছু হটলো।
সাক্ষাতকারের এখানেই পরিসমাপ্তি হল। ওরা আবার এক মাস্তুলবিশিষ্ট নৌযানটিতে ফিরে গেল। আমি জানছিলাম যে মিনোয়ানরা অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কোনো ধরনের সৌজন্যমূলক আনুষ্ঠানিকতায় ওরা বেশি সময় নষ্ট করে না। রাষ্ট্রদূত তোরানও ওদের সাথে চলে গেল। যাওয়ার আগে সে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মৃদু হেসে হাত নাড়লো।
আমি আশা করেছিলাম সর্বাধিরাজ মিনোজ যে উপহার পাঠিয়েছেন তা দেখে আমার রাজকুমারীদের মন একটু হালকা হবে। উপহারগুলো দেখেই বুঝা গেল এগুলো আসলেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজার উপযুক্ত জিনিস বটে। সোনা-রূপা চকচক করে উঠলো আর মূল্যবান রত্নের বিভিন্ন রংয়ের দূতির ছটায় কেবিন ভরে গেল। তেহুতি আর বেকাথা জিনিসগুলোর দিকে একবার তাকিয়েই আবার বিষণ্ণতায় ফিরে গেল।
এযাবত আমার কঠিন নির্দেশ ছিল যে, আমার মেয়েরা যেন আঙুরের মদ পানের সুযোগ না পায়। তবে আমি বুঝলাম এখন এটাই একমাত্র তাদের মন ভালো করার সঠিক প্রতিষেধকের কাজ করবে। নিচে নেমে জাহাজের খোলে গিয়ে রাষ্ট্রদূত তোরানের একটি মদের পিপা খুললাম। তারপর তিনটি তামার বড় মদের ঘড়ার অর্ধেক অংশে অতীব সুমিষ্ট লাল সিক্লডস মদ ঢালোম। তার উপর পানি ভরে জাহাজের পরিবেশনকারীকে মেয়েদের কেবিনে নিয়ে যেতে বললাম।
তেহুতি বললো, তুমি আমাদেরকে এই বিষ পান করতে বলছো? অথচ তুমি বলেছিলে এটা খেলে আমাদের চুল পড়ে যাবে?
আমি ব্যাখ্যা করে বললাম, খুব কম বয়সে খেলে এটা হয়। দেখো আমার দিকে? আমার কি টাক পড়েছে? অনিচ্ছা নিয়ে ওরা আমার একথা মেনে নিল।
এবার বেকাথা মনে করিয়ে দিল, তুমি বলেছিল এটা খেলে দাঁত পড়ে যাবে? সাথে সাথে আমি আমার পুরো দাঁতের সারি ওদের দেখালাম। ওরা নিরবে এটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো।
এরপর আমি বললাম, এটা তোমাদের মন খুশিতে ভরে দেবে?
বেকাথা দৃঢ়ভাবে বললো, আমি হাসিখুশি হতে চাই না। আমি শুধু মরতে চাই।
আমি বললাম, অন্তত খুশি হয়ে মরতে পারবে।
মিনোয়ন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তা করে তেহুতি বললো, প্রথমে লক্সিয়াসকে দিয়ে শুরু করা যাক। কথাটি বলে সে একটি মদের পাত্র টেবিলের উপর দিয়ে লক্সিয়াসের দিকে ঠেলে দিল। লক্সিয়াস একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কম আনন্দদায়ক আর মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সে পেয়ালাটি তুলে ঠোঁটের কাছে নিয়ে ছোট্ট একটা চুমুক দিল; তারপর পেয়ালাটি মুখের কাছে ধরে সোজা হয়ে বসলো।
তেহুতি আদেশ দিল, গিলে ফেল! সে তার নির্দেশ পালন করলো। আর ওরা সতর্কচোখে তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো দেখার যে, তার চুল কিংবা দাঁত পড়ে যাচ্ছে কিনা।
