মেয়েদেরকে সান্ত্বনা দেবার জন্য নিচে তাদের কেবিনে গেলাম। কিন্তু ওরা আমার সাথে উপরে আসতে রাজি হল না। গভীর দুঃখে কাতর হয়ে ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে এক বাঙ্কে বসেছিল। আমার কোনো প্রশ্নের উত্তরে মুখ খুলতে চাচ্ছিল না। লক্সিয়াস ওদের পায়ের কাছে আসন পেতে বসেছিল। এই মিনোয়ান মেয়েটির বিশ্বস্ততা দেখে আমি আবারও মুগ্ধ হলাম।
নিয়তির নিষ্ঠুরতা আর দেবতার হৃদয়হীনতার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে ওদেরকে আরও সময় দিতে হবে। তরুণ বয়সে জীবনের দাবী শতগুণ বেড়ে যায়, তবে বয়সের সাথে সাথে তা কমে আসে। কীভাবে সহ্য করতে হয় তা অবশ্যই আমাদেরকে শিখতে হবে।
ওদেরকে ছেড়ে আমি ডেকে ফিরে এলাম।
৭. সাগরের এই পথ
সাগরের এই পথ হাইপ্যাটসের খুব চেনা। সে বিভিন্ন ডুবো চর আর অন্তরীপ এড়িয়ে বেশ সহজে জাহাজ নিয়ে এগোল।
স্থলভূমির পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমি অবাকবিস্ময়ে তাকালাম। সারা জীবন মরুভূমিতে কাটিয়েছি, তাই এতো পর্বতময় স্থান আর সবুজ বনানী দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
দুপুরের একটু পর দ্বীপের পূর্বদিকের প্রান্তসীমা ঘুরে উত্তর উপকূল ধরে কুনুসসের দিকে চললাম। সূর্যের আলোর কোণ বদলে যেতেই সাগরের পানির রং অপূর্ব নীল হল।
সামনের সাগরে নোঙর করা ছোট ছোট মাছধরা নৌকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রঙের পালসহ বিশাল তিনস্তরের দাঁড়ওয়ালা বাণিজ্যপোত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
উপসাগরের প্রবেশ পথ আর বন্দর পার হতেই আমরা দেখলাম এখানেও প্রচুর নোঙর করা জাহাজ ভীড় করে মাল উঠানামা করছে। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করে এই বাণিজ্যপোতগুলো যে সম্পদ আহরণ করছে, তা এই ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে সভ্য জগতের সামনে এক বিশাল আকারে পরিণত করেছে।
আমি জানি এই স্থানটি পর্বতময় আর এবড়োথেবড়ো। মাটি ভালো নয়, মূল্যবান কোনো খনিজ নেই আর চাষেরও আযোগ্য। বিশাল বনএলাকা থাকলেও, গাছের শিকড় মূল্যবান ফসল চাষের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মিনোয়ানরা তাদের জাহাজ পাঠিয়ে অন্যান্য দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে ক্রিটে নিয়ে এসেছে। তারপর তাদের প্রযুক্তি আর নব উদ্ভাবনী কৌশল কাজে লাগিয়ে এইসব কাঁচামাল দিয়ে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করেছে, যার জন্য বাকি বিশ্ব বুভুক্ষ হয়ে রয়েছে।
অন্যান্য আদিম জাতিরা ধারালো গাছের ডাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে যেসব আকরিক ধাতু বের করে, ওরা তা শোধন করে এবং এই ধাতু দিয়ে যোদ্ধাদের জন্য তলোয়ার, ছুরি, শিরস্ত্রাণ, বর্ম আর কৃষকদের জন্য নিড়ানি, খড় তোলার জন্য লম্বা হাতলওয়ালা কাটা লাগানো দণ্ড এবং লাঙলের ফলা তৈরি করে।
ওরা পাথর-বালি আর অন্যান্য খনিজ পদার্থ নিখুঁতভাবে পুড়িয়ে কাঁচ উৎপাদন করে। এটি একটি অসাধারণ পদার্থ যা দিয়ে থালা, বাসন এবং বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করে রাজামহারাজাদের খাবার টেবিলে ব্যবহৃত হয়। আর ধনী ব্যক্তিদের স্ত্রীদের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন রঙের গহনা ও অলঙ্কার; আর কিছু কিছু গোষ্ঠির মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের জন্য পুঁতি তৈরি করা হয়। কোনো কোনো আদিম দেশে এইধরনের একটি কাঁচের পুঁতির মালা দিয়ে একটি তেজস্বী ঘোড়া কিংবা একজন সুন্দরী কুমারিকে কেনা যায়।
মিনোয়ানরা এসব পণ্যের বিনিময়ে অন্যান্য দেশের সাধারণ কৃষকদের দ্বারা উৎপাদিত ভাং, তুলা,পাটের কাপড় এবং পশমি সুতা কিনে নেয়। এই সুতা বুনে তৈরি করা কাপড় এবং ক্যানভাস দিয়ে পোশাক, তাবু এবং জাহাজের পাল তৈরি করা হয়।
আবার এগুলো দিয়েও বাণিজ্য করা হয়; এভাবে চক্রাকারে বার বার এটি নিরন্তর চলতে থাকে যতদিন না আর কোনো জাতি তাদের সম্পদের সমকক্ষ হয়। এমনকি আমাদের মিসরও নয়।
অন্তহীন সম্পদ আহরণের অন্বেষণের কারণে একটি গোপন মূল্যও দিতে হয়েছে।
পবিত্র ষাঁড় নামে জাহাজটির উঁচু স্থানটি থেকে আমি স্থলভূমির দিকে। তাকিয়ে দেখতে পেলাম অসংখ্য কামারশালা আর চুল্লি থেকে ধূঁয়া বের হচ্ছে। এসব জায়গায় আকরিক পরিশুদ্ধ করা হচ্ছে, ধাতুতে খাদ মেশানো হচ্ছে আর বালু থেকে কাঁচ উৎপাদন করা হচ্ছে।
নগরী এবং কারখানা এলাকার উপরিভাগে পাহাড়ি অঞ্চলের অনেকখানি জায়গাজুড়ে ক্ষতবিক্ষত জমি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। এখানে কুঠার দিয়ে জঙ্গলের গাছ কেটে মিনোয়ান জাহাজের জন্য কাঠের কড়ি-বরগা কিংবা কারখানার চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য কাঠকয়লা তৈরি করা হত।
আমি দেখলাম তটসংলগ্ন সাগরের পানির রং বিবর্ণ আর কলুষিত হয়ে আছে। কারখানাগুলোতে বিষাক্ত রঙ আর ক্ষয়কারী তরল ব্যবহার করার পর তরল বর্জ্য সরাসরি সাগরে নিষ্কাশন করার ফলে এটি হয়েছে।
অন্য জীবিত যে কোনো মানুষের মতো আমিও আমার হাতে সোনা রূপার ওজন এবং এর ঔজ্জল্য পছন্দ করি। তবে আদি-অকৃত্রিম প্রকৃতির এই অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবি যে, মানুষকে তার সীমাহীন লোভের পরিণামে চরম মূল্য দেবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
নিচে থেকে হঠাৎ কারও চিৎকার শুনে আমার চিন্তার সূত্র ভেঙে গেল। নিচে তাকিয়ে দেখলাম নিচের ডেক থেকে রাষ্ট্রদূত তোরান আমাকে নিচে যাওয়ার জন্য ডাকছেন। আমি তার কাছে পৌঁছতেই সে দুঃখ প্রকাশ করে বললো, কিছু মনে করবেন না, আমি বেশিক্ষণ উঁচুতে থাকতে পারি না। আর মাস্তুলের উপরে উঠলে জাহাজের ঘূর্ণন খুব বেশি মনে হয়। আসুন পাঁচক আমাদের জন্য যে চমৎকার প্রাতরাশ তৈরি করে রেখেছে তার গ্ল্যবহার করি। তারপর সে আমার হাত ধরে সামনের দিকে নিয়ে চলতে চলতে আবার বললো, চলুন জাহাজের সামনে থেকেও সবকিছু ভালোভাবে দেখা যাবে। আর ড্রাগোনাদা দ্বীপ পার হতে হতে আমি আপনাকে কয়েকটি সুন্দর দৃশ্য দেখাবো। এর সাথে কুনুসস আর ক্রোনাস পর্বতও পুরোপুরি দেখা যাবে। সামনের পালের ছায়ার নিচে আমরা আরাম করে বসলাম। জাহাজটি দ্বীপের মাথা দিয়ে ঘুরতেই ক্রিটের উত্তর উপকূলের নতুন একটি দৃশ্য আমাদের সামনে ছড়িয়ে পড়লো।
