একদিকে ইডা পর্বতের চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়লো, এর আগে দ্বীপের দক্ষিণ দিক থেকে যখন দেখেছিলাম এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত দেখছি। এখান থেকে পবর্তটি আরও উঁচু, খাড়া আর খুব বেশি রুক্ষ মনে হচ্ছে। এর নিচেই কুমুসস নগরী আর বন্দর আমাদের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে।
বন্দরটি বিশাল আর এখানে বেশ কয়েকটি মিনোয়ান রণতরী আর বাণিজ্যপোত নোঙর করা রয়েছে। কিছু কিছু জাহাজ এতো বিশাল যে, এগুলোর তুলনায় আমাদের পবিত্র ষড় জাহাজটিকেও মনে হচ্ছে বেশ ছোট।
বন্দরের উপরেই নগরীর দালানকোঠা দেখা যাচ্ছে। দেখার সাথে সাথেই আমি বুঝলাম যে, এই নগরীটি থিবস আর ব্যবিলন মিলে যা হবে তার চেয়েও কয়েকগুণ বড়। তবে কুনুসসের তুলনায় ঐ ছোট ছোট শহরগুলো বেশ সুন্দর, উচ্ছল এবং প্রীতিকর ছিল।
উঁচু পর্বতমালা আর এর বিশাল পরিসরের স্থাপত্যশিল্পের প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও কুমুসস একটি বিষণ্ণ অন্ধকারময় স্থান। আমার অত্যন্ত সুক্ষ অনুভূতি দিয়ে আমি সাথে সাথে বুঝতে পারলাম যে, কুমুসস এমন একটি বিরল ক্ষমতার ক্ষেত্রের উপর গড়ে তোলা হয়েছে যার উপর দেবতারা তাদের সমস্ত শৌর্যবীর্য কেন্দ্রিভূত করেছিলেন।
আলোকপ্রাপ্ত এই যুগে একজন শিক্ষিত মানুষ মেনে নিয়েছেন যে, পৃথিবী একটি জীবন্ত এবং নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া প্রাণী। একটি বিশালকায় কচ্ছপের মত এটি অনন্তকালের কালো সমুদ্রে চিরদিন সাঁতার কেটে চলেছে। শক্ত খোলসের যে ফলকগুলো দিয়ে কচ্ছপটির পিঠ ঢাকা রয়েছে, সেগুলো এই ক্ষমতার রেখার সাথে সমান্তরালভাবে সংযুক্ত রয়েছে। যখনই পৃথিবী নড়াচড়া করে তখন এই জোড়গুলোর কারণে এর দেহ আর অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো বেঁকে যায়। এগুলো অকল্পনীয় শক্তির কেন্দ্র, কিছু কিছু শক্তি শুভ আর অন্যগুলো অশুভ।
এখানে অশুভ শক্তি রয়েছে; আমি আমার জীহ্বার পেছনে এর অতিমাত্রায় দোষযুক্ত স্বাদ আর নাকে পূতিগন্ধটি অনুভব করলাম।
এর বিশালতা বুঝার চেষ্টা করতেই আমার সারা দেহ কেঁপে উঠলো।
তোরান উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি শীত করছে?
মাথা নেড়ে মৃদু হাসলেও আমার চেহারায় মনে হল তা প্রকাশ পায় নি। আমি ঘুরে সরাসরি সাগরের দিকে তাকালাম। তবে চোখের সামনেই ক্রোনাস পর্বতের জোড়া চূড়া চোখে পড়তেই মন আরও অশান্ত হয়ে উঠলো। আমার উত্তেজিত চেহারা চোখে পড়তেই মুখে চুচুক শব্দ করে তোরান আমার পিঠ চাপড়ে বললো, মন খারাপ করবেন না তায়তা! বেশিরভাগই লোকেরই প্রথমবার সকল দেবতার পিতা ক্রোনাস নগরদুর্গ দেখার সাথে সাথেই একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। আপনি এই জায়গার ইতিহাস আর কীভাবে এই রহস্যগুলো ঘটে চলেছে তার কাহিনী জানেন?
আমি বললাম, তেমন কিছু জানি না। আসলে আমি এ-বিষয়ে তোরানের চেয়েও বেশি জানতাম, তবে অনেক সময় না জানার ভান করাই ভালো। এতে আরও কিছু রহস্য জানার সুযোগ থাকে, যা হয়তো আমি জানতাম না।
আমার একথার পর তোরান উৎসাহ নিয়ে বললো, একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন যে ক্রোনাস হচ্ছেন সকল দেবতার পিতা। তার আগে কেবল গয়া নামে পৃথিবী এবং ইউরেনাস নামে আকাশ ছিল। এদের মিলনের ফলেই ক্রোনাসের জন্ম হয়।
সতর্কভাবে তার কথা মেনে নিয়ে আমি বললাম, এটুকু অবশ্য আমি জানি। তারপরও আপনি বলে যান তোরান। আমি কোনো তর্কে গেলাম না, যদিও আমি জানি এর সৃষ্টির পেছনে আরও কিছু যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আছে।
একসময় ক্রোনাস তার পিতা ইউরেনাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে তাকে পরাজিত করেন। তারপর খোঁজা বানিয়ে তাকে নিজের ক্রীতদাস করেন। দেবতাদের সম্পূর্ণ স্বর্ণযুগে ক্রোনাস রাজত্ব করেন। তবে তিনি সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন যে, তিনি যেরকম তার পিতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন সেরকম তারও কোনো এক সন্তান তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। কাজেই তা রোধ করার জন্য জন্মাবার সাথে সাথে তিনি তার সমস্ত সন্তানকে খেয়ে ফেলতেন।
আমি সরল চেহারায় ঠাট্টাচ্ছলে বললাম, এই পরিস্থিতিতে এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নিশ্চয়ই ছিল না। আমি এরকম অনেক মরণশীল পিতার কথা জানি যারা এই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। তবে তোরান আমার কথাটি সত্যি মনে করে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, ঠিকই বলেছেন। তবে ক্রোনাসের জ্যেষ্ঠ স্ত্রী রিয়া ষষ্ঠ পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে তার নাম দেন জিউস এবং তাকে তার পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে ইডা পর্বতের একটি গুহায় রাখেন। পর্বতের পাশে উপসাগরের ওপার দেখিয়ে সে বলে চললো, এরপর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সে ক্রোনাসের সাথে লড়াই করে। তাকে পরাজিত করার পর তার পেট চিরে ফেলতেই তার সকল ভাই পেট থেকে বেরিয়ে মুক্তি পায়।
তোরান একটু পণ্ডিতি ভাব দেখানোতে এবার আমি তার বক্তৃতাটিকে একটু দ্রুত স্তরে নিয়ে বললাম, তারপর জিউস তার ভাই-বোনদের নিয়ে উড়ে অলিম্পাস পর্বতের চূড়ায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এখনও ওরা সেখানে আছেন আর উদ্ধতভাবে আমাদের জীবন শাসন করে চলেছেন। জিউস এখন সকল দেবতার পিতা এবং ঝড়ের প্রভু। তার বোন হেস্টিয়া হচ্ছেন গৃহ এবং ভিটেমাটির দেবী; দেমেতার হচ্ছেন কৃষি এবং সুন্দর ফসলের দেবী; হেরা হচ্ছেন বিয়ের দেবী; হেইডস পাতালের প্রভু এবং পসেইডন হচ্ছেন সাগরের দেবতা।
