কিছু না জানার ভান করে আমি বললাম, তাই নাকি! এরা কারা বলবেন একটু?
আমি বলতে চাচ্ছি না যে কেউ খারাপ আচরণ করেছেন, তবে এদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ সর্বাধিরাজ মিনোজের ভবিষ্যৎ স্ত্রীদের সাথে একটু বেশি মেলামেশা করছেন।
আপনি নিশ্চয়ই রাজপরিচারিকা লক্সিয়াসের কথা বলছেন না? একথা শুনে তোরান সাথে সাথে তার চোখ নামিয়ে ফেললো। আমি তাকে কৌশলে মনে করিয়ে দিলাম আমাদের উভয়েরই কিছু কিছু গোপন ব্যাপার আছে যা আমরা লুকিয়ে রাখি।
সুচতুরভাবে এই আলোচনা থেকে সরে গিয়ে তোরান বললো, সবকিছু আমি আপনার নিখুঁত বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলাম।
.
মূল ডেকে নামতেই ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটস কাছে এসে হাসিমুখে বললো, শেষ পর্যন্ত ষোল দিনই হল তাহলে, প্রভু তায়তা।
আমি তাকে প্রশংসা করে বললাম, সত্যি, চমৎকার জাহাজ পরিচালনার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ হাইপ্যাটস। দয়া করে আমার জাহাজের ক্যাপ্টেনদের এখুনি এখানে আসার জন্য সঙ্কেত পাঠান।
হাইপ্যাটস সমস্ত ক্যাপ্টেনদের উদ্দেশ্যে সঙ্কেত বার্তা পাঠাবার নির্দেশ দিল।
আমার নৌ-বহরের সমস্ত অধিনায়ক যার যার জাহাজ থেকে ডিঙ্গি নামিয়ে পবিত্র ষাঁড়ের পাশে এলো। প্রথমে দিলবার আর আকেমি, তারপর ওদের পেছন পেছন অন্যরা এলো। আমি সামনে ক্রিমাদ বন্দর দেখিয়ে ওদেরকে বললাম, এরপর এটাই হবে তাদের ভবিষ্যতে সমস্ত অভিযান পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র।
এরপর জারাস আর হুই তাদের নিজ নিজ জাহাজের নেতৃত্ব নিয়ে এই জাহাজ থেকে চলে যাবার জন্য তৈরি হল। ওদের সমস্ত জিনিসপত্র ডিঙিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমি ইচ্ছা করেই খুব অল্প সময় দিয়ে ওদেরকে বদলি করা কথা বলেছিলাম; আর বলেছিলাম তেহুতি আর বেকাথাকে একথা না জানাতে। যে কোনো উপায়ে হোক আমি চাচ্ছিলাম সবার সামনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে।
তবে আমার মেয়েদেরকে এতো সহজে বোকা বানানো যায় না। ওরা সাথে সাথে বুঝেছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। দুজনেই ওদের কেবিন থেকে বের হয়ে কী হচ্ছে দেখতে পেছনের ডেকে এলো। দুজনেই হালকা মেজাজে ছিল, তবে জারাস আর হুইকে মূল ডেকে ওদের লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখার সাথে সাথে ওদের মুখের ভাব বদলে গেল।
তেহুতির চেহারা একটি লাশের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল, বেকাথার ঠোঁট কাঁপছিল আর সে চোখের পাতা মিটমিট করে চোখের পানি সামলাতে চেষ্টা করলো।
এদিকে মূল ডেকে জারাস তার লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেই ওরা পেছনের ডেকের দিকে তাকিয়ে অভিবাদন করলো। আমি দেখলাম বেকাথা এতো জোরে ওর বড় বোনের হাত চেপে ধরলো যে, ওর আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেল।
তেহুতির ঠোঁট নাড়া দেখে আমি বুঝতে পারলাম সে ফিসফিস করে তাকে বলছে, বুকে সাহস আনো বেকাথা। সবাই আমাদেরকে দেখছে।
লক্সিয়াস ওদের পেছনেই দাঁড়িয়েছিল। এবার সে সামনে এসে বেকাথার পাশে দাঁড়িয়ে তার অন্য হাত চেপে ধরলো।
জারাস ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটসকে উদ্দেশ্য করে আনুষ্ঠানিকভাবে বললো, জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দিন ক্যাপ্টেন? আর হাইপ্যাটসও আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর দিল, অনুমতি দেওয়া হল, ক্যাপ্টেন।
জারাস জাহাজের কিনারায় গিয়ে তার লোকজনদের নিয়ে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ডিঙিতে নামলো। হুই তাকে অনুসরণ করলো। কেউ লক্ষ্য করেনি যে মেয়েরা পেছনের ডেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওরাও পেছন ফিরে তাকায়নি।
হুইকে চলে যেতে দেখে বেকাথা একটু টলে উঠেছিল আর মৃদু স্বরে কাতরে উঠেছিল। তারপর তিনজনই হাতধরাধরি করে তাদের কেবিনের দিকে চলে গেল। বেকাথা প্রথম পদক্ষেপে একবার হোঁচট খেলেও তেহুতি তাকে ধরে তার পতন থামাল।
তোরান আমার উল্টোদিকে ডেকের অন্যধারে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েরা নিচে নেমে যেতেই সে আমার দিকে একবার তাকিয়ে সমর্থনসূচকভাবে সামান্য মাথা নাড়লো।
এই সামান্য ইঙ্গিত থেকেই আমরা পরস্পরের সহযোগী হলাম। আমি জানি ভবিষ্যতে আমরা একে অন্যের উপর আস্থা রাখতে পারবো।
.
ডিঙ্গিগুলো পবিত্র ষাঁড়ের পাশ থেকে সরে গিয়ে আমার নৌ-বহরের দিকে
চলে যেতেই হাইপ্যাটস তার জাহাজের দিক পরিবর্তন করে দ্বীপের পূর্বদিকের অন্তরীপের দিকে রওয়ানা দিল।
আমি ক্রিমাদ বন্দরের দিকে সরাসরি চলে যাওয়া আমার জাহাজগুলোর দিকে রইলাম। আমার মেয়েদের কষ্টের কথা ভেবে তখনও আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ছিল, তাই তোরানের কাছে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে মন হালকা করার চেষ্টা করলাম।
ক্রিমাদ থেকে কুনুসসের দূরত্ব কত?
তোরান বললো, মূল দূরত্বটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা মোটোমুটি চল্লিশ লিগের কাছাকাছি হবে। তবে সমস্যা হল ইডা পর্বতের পাদদেশ ঘুরে যাওয়া পথটি খাড়া এবং বিপদসঙ্কুল। ঘোড়ায় যেতে দুই দিন লাগবে। এর চেয়ে দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করলে ঘোড়াগুলো টিকে থাকতে পারবে না।
আমি জানি আমার জাহাজের লোকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হলে আমাকে নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া রাজার হেরেমে আমার মেয়েদের সাথেও যোগাযোগ রাখতে হবে। আবার তোরান পথে যে দেরি হবার কথা বলেছে তা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দ্বীপের মধ্য দিয়ে আমাকে একটি সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। এই পথের মাঝে দশ লিগ পর পর সরবরাহ চৌকিতে তাজা ঘোড়া অপেক্ষামান রাখতে হবে যাতে ঘোড়াগুলো জোরে ছুটতে পারে। এইভাবে সাত ঘন্টা কিংবা তার চেয়েও কম সময়ে দ্বীপ পার হতে পারবো। মেয়েদেরকে তাদের নতুন বাড়িতে তুলে দেবার পর এটিই হবে আমার প্রথম কাজ।
