মাস্তুল থেকে নামতে শুরু করার আগে নিচে ডেকের দিকে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যখন আমি বিশাল পাখিটিকে নিয়ে নিমগ্ন ছিলাম তখন দুজন মানুষ নিচের ডেক থেকে এসে জাহাজের রেলিংএর কিনারায় দাঁড়িয়ে দূরে দিগন্তের দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। ঠিক বুঝতে পারলাম তারা কে, কেননা ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওদের দেহ ভারী পশমি পোশাকে ঢাকা ছিল আর মুখও আমার দিক থেকে অন্য দিকে ফেরানো ছিল।
অবশেষে যখন ওরা ঘুরে মুখোমুখি হল তখন আমি চিনতে পারলাম ওরা হল জারাস আর তেহুতি। ওরা ডেকের চারপাশ চোখ বুলালেও মাস্তুলের উপরের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। যখন বুঝলো কেউ ওদেরকে লক্ষ্য করছে না, তখন জারাস তাকে দুই বাহুর মাঝে টেনে নিয়ে চুম্বন করলো। পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে তেহুতিও তাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি নিশ্চুপ রইলাম। তবে আমি চোখ ফেরাবার আগেই তেহুতি একটু পিছিয়ে কথা বলা শুরু করতেই আমি তার ঠোঁট নাড়া পড়তে পারলাম।
তায়তা ঠিকই বলেছেন। ডাঙার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। চিরদিনের জন্য আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করার আগে একসাথে থাকার জন্য দেবতা আমাদেরকে আরও একটি মূল্যবান দিন দিয়েছেন। তার প্রকাশভঙ্গিটি খুবই করুণ ছিল।
জারাস তাকে মনে করিয়ে দিল, তুমি একজন রাজকুমারী আর আমি একজন যোদ্ধা। যে কোনো মূল্যেই হোক আমাদের দুজনকেই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদেরকে সহ্য করতেই হবে।
তেহুতি আবার এগিয়ে তাকে চুম্বন দিয়ে বললো, আমি জানি তুমি যা বলছো তা সত্যি, তবে যখন তুমি চলে যাবে তখন আমার হৃদয় আর বেঁচে থাকার বাসনা তোমার সাথে নিয়ে যাবে। আমাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে তুমি চলে যাবে।
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আর একমুহূর্তও তাদের এই আকুতির গভীরতা সহ্য করতে পারলাম না। আমাকেও একটি পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেবতারা যে বিশাল জাল আমাদের জন্য বুনেছেন আমরা তাতে আটকা পড়া কীটাণুকীট। এখান থেকে পালাবার কোনো উপায় নেই।
ওরা ডেকে থেকে চলে যাবার পর আমি মাস্তুলের ডগা বেয়ে নেমে আমার কেবিনে চলে গেলাম।
তেতির মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন আমি কাঁদিনি। তবে আজ আমার কান্না পেল।
.
পরদিন ভোরে আবার মাস্তুলের ডগায় চড়লাম। এবার হতাশ হলাম না। ভোরের আলোয় দিগন্তরেখায় নিচু আর নীল ক্রিট দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। তবে এখানে নয় আমি আরও পঞ্চাশ লিগ সামনে এবং আরও উত্তরে দ্বীপটি দেখবো বলে আশা করেছিলাম।
তবে এতে তেমন অখুশি হই নি। সর্বাধিরাজ মিনোজের সাথে সাক্ষাতের জন্য আমি খুব তাড়াহুড়া করতে চাচ্ছি না, কারণ এতে আমার আদরের রাজকুমারীদেরকে আরও কয়েকটি আনন্দের দিন থেকে বঞ্চিত করা হবে। অপ্রত্যাশিতভাবে এই সুযোগ পেয়ে কল্পনা আর রূপকথার এই রাজ্যটি যতটুকু পারা যায় দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কেউ বাধা দেবার আগেই দৃশ্যটি পুরোপুরি উপভোগ করতে চেয়েছিলাম, তবে তা হল না। আমাদের সামনে ভেসে চলা আমার জাহাজ থেকে চিৎকার ভেসে এলো, ঐ যে ডাঙা দেখা যায়!
সাথে সাথে আমার নিচে ডেক আনন্দ উৎসাহে মানুষের ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠল। ওরা জাহাজের রেলিংয়ে ঝুঁকে আরও ভালোভাবে ডাঙা দেখার চেষ্টা করলো।
একটু পরই রাষ্ট্রদূত তোরানও মাস্তুল বেয়ে উপরে উঠে আমার পাশে এল। তাকে আমার চেয়েও বেশি অনুপ্রাণিত মনে হল।
সে বললো, দীর্ঘদিন ডাঙা না দেখে পানিতে ভেসে থেকে সাগরে সঠিক যাত্রাপথ নির্ধারণ করতে গিয়ে হাইপ্যাটস যে ভুল করেছে তা ক্ষমাযোগ্য। এছাড়া বাতাস আর স্রোতের ব্যাপারও আছে। সাগরে যাত্রাপথ সঠিকভাবে পরিচালনা করা কখনও সঠিক বিজ্ঞান নয়। এটা অনেকটা অনুমান নির্ভর। আসলে হাইপ্যাটসের ভুলটি আমাদের জন্য শুভ হতে পারে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, দয়া করে একটু খুলে বলবেন? আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে যখন আমরা সিডন থেকে যাত্রা শুরু করি তখন আপনাকে বলেছিলাম, সর্বাধিরাজ মিনোজের একটি অধ্যাদেশ অনুসারে রাজ্যের উত্তর উপকূলে কুমুসস বন্দরে কোনো বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ঢোকা নিষেধ। সেখানে আমাদের যুদ্ধ জাহাজের ঘাঁটি রয়েছে।
হ্যাঁ ঠিক মনে পড়েছে। আপনি বলেছিলেন আমাদের জাহাজগুলো দক্ষিণ উপকূলে ক্রিমাদ বন্দরে নোঙর করবে। আসলে এই অবস্থানটি আমাদের জন্য বরং আরও সুবিধাজনক হবে। এখান থেকে নীল নদীর ব-দ্বীপে হাইকসো অবস্থানে যেতে বেশি দূরত্ব পার হতে হবে না।
এরপর দূরে স্থলভূমির দিকে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে তোরান বললো, ইডা পর্বতের নিচে ঐ সাদা দালানগুলো দেখতে পাচ্ছেন? ওগুলো হল ক্রিমাদ বন্দরের জাহাজঘাটা। আপনি এখুনি আপনার নৌবহরকে সেখানে গিয়ে যার যার নির্দিষ্ট জায়গায় নোঙর করতে বলুন। ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটসের একজন নৌকর্মকর্তা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, চমৎকার! সর্বাধিরাজ মিনোজ কি আমাকেও আমার নৌবহরের সাথে ক্রিমাদে থাকতে বলেছেন?
সে আমাকে আস্বস্ত করে বললো, না না তায়তা! সর্বাধিরাজ মিনোজ খুব ভালো করেই জানেন যে, আপনি ফারাও ত্যামোসের প্রতিনিধি আর তাই সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। একান্তভাবে আপনার বসবাসের জন্যই কুমুসস নগরীর উপরে ইডা পর্বতের ঢালে একটি সুরম্য প্রাসাদ আলাদা করে রাখা হয়েছে। তারপর একটু থেমে সে বললো, তবে এই জাহাজে আপনার দলের মধ্যে কিছু সদস্য আছেন যাদের থাকার ব্যবস্থা কুনুসসের বদলে ক্রিমাদে করলেই ভালো হবে।
