জারাসের পিছু পিছু কেবিনের পরিচারক এক বোল শুকরের লোনা মাংস নিয়ে এসে নাকাতির সামনে রাখলো আর আমি একটা গ্লাসে একটু লাল মদ ঢেলে জারাসকে পাশে বসতে ইশারা করলাম। আমরা কথা শুরু করলাম, কথা বলতে বলতে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে গেল।
.
ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটস পাল নামালো আর আমাদের বিজয়ী নাবিকেরা শান্তির পায়রা জাহাজটি এর পাশে ভেড়ালো। নাকাতি তার জাহাজের ডেকে নেমে গেল, তারপর এর কর্তৃত্ব নিয়ে আমাদের যে জাহাজদুটোতে তার লোকদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখানে গেল। সেই জাহাজদুটোর নিচের ক্রীতদাসদের ডেকে গিয়ে বেঞ্চে শিকল দিয়ে বাঁধা তার লোকদেরকে তুলে নিয়ে এলো। তারপর ওদেরকে বাইরে রোদে নিয়ে এলো।
লোকগুলো বেশ শোচনীয় অবস্থায় ছিল। পরনে একটি নেংটি আর নাকাতির মতো সারা গায়ে চাবুকের দাগ। আমার নির্দেশ মোতাবেক আকেমি আর দিলবার ওদের উপর কড়া চাবুক চালিয়েছিল। ওরা হতাশা আর আত্মসমর্পণের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমি জানি একমাত্র নাকাতিই ওদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
শান্তির পায়রার পেছনের ডেক থেকে নাকাতি আমাকে অভিবাদন জানাল। তারপর সে জাহাজের হাল ঘুরিয়ে উত্তরমুখি রওয়ানা হল। জলদস্যুদের জাহাজগুলো সেদিকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এজিয়ান উপসাগরের নির্জন দ্বীপগুলোতে লুকিয়ে রয়েছে।
জারাস জিজ্ঞেস করলো, আর কখনও কি তার দেখা পাবেন? উত্তরে আমি কেবল কাঁধ ঝাঁকালাম। এর ইতিবাচক উত্তরের জন্য অন্ধকারের দেবতাদের কাছে ধন্না দেবোনা। যাইহোক নাকাতির সাথে আমার একটি চুক্তি হয়েছে আর আমি একজন মানুষের ভালোমন্দ বিচার করে তার উপর আস্থা রাখতে পারি যে, সে তার কথা রাখবে।
একটি বিষয় প্রমাণ করে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি যে, হাইকসোদের যে কোনো দুর্বল অবস্থানে অনেকগুলো রথ জাহাজ থেকে নামিয়ে গোরাবের সেনাবাহিনীর উপর প্রবল আক্রমণ করে তাদের মরণ দশা এনে দিতে পারি। তারপর শত্রু প্রতিআক্রমণ করার আগেই রথগুলো নিয়ে আবার আমার জাহাজে ফিরে যেতে পারি। অবশ্য আমার এই ক্ষুদ্র বাহিনী দিয়ে এই স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ লড়াই চালানো সম্ভব নয়, তবে আমি তার মূল বাহিনীর বড় একটি অংশকে বিচ্ছিন্ন করে মিসরের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে সরিয়ে উত্তর সীমান্ত রক্ষা করার জন্য সরিয়ে নিয়ে আনতে পারবো।
আমি নাকাতিকে কথা দিয়েছিলাম, যদি তারা লুটতরাজের কাজ ছেড়ে আমার অধীনে সাগরে অভিযানে যায়, তাহলে তার দলের প্রত্যেককে এক হাজার রূপার মেম পুরষ্কার দেবো। তারপর হাইকসোদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সম্পূর্ণ মিসর মুক্ত করার পর জলদস্যুতা আর খুনসহ তার লোকদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করা হবে। প্রত্যেককে সম্মানজনকভাবে নৌ-বাহিনীর চাকুরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে মিসরের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া এদের প্রত্যেককে থিবস নগরীর দক্ষিণে নীল নদ বরাবর তায়তার মেশির এস্টেটে পাঁচশো কাঠা উর্বর এবং সেচযোগ্য জমি দেওয়া হবে।
শান্তির পায়রা জাহাজটির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমি ভাবলাম নাকাতিকে যে উদার দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তার কতোটুকু ফারাওয়ের কোষাখানা থেকে পাওয়া যাবে আর কতোটুকুই বা আমার নিজের সঞ্চয় থেকে যোগাড় করতে পারবো। নিঃসন্দেহে ফারাও কৃতজ্ঞ হবেন, তবে সেই কৃতজ্ঞতা অর্থের ভাষায় প্রকাশ করবেন কি না, সে ব্যাপারে আমি খুব একটা আশাবাদি নই। আমার মেম আর তার রূপা এতো সহজে বিচ্ছিন্ন হবার নয়।
.
আমি জানি ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটর এর আগে সুমেরিয়া আর ক্রিটের মাঝে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করেছেন। কিন্তু যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম কখন কুনুসসে পৌঁছাবো বলে আশা করি, তখন সে উত্তরটি একটু এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে বললো।
অবশ্যই সবকিছু নির্ভর করে বাতাস আর স্রোতের উপর, তবে আমার ধারণা ষোল দিনের মধ্যে আমরা পবিত্র ক্রিট দ্বীপে পৌঁছতে পারবো।
তার অনুমান জানার পর আমি খুশি হলাম। আমাদের রথের ঘোড়াগুলো দীর্ঘদিন যাবত খাঁচার মাঝে আটকা রয়েছে। দিন দিন তাদের অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। গায়ের পশম উঠে যাচ্ছিল আর ওজন কমে গিয়ে উদাসী হয়ে যাচ্ছিল। হুই অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিল আর সেই সাথে আমিও।
চৌদ্দতম দিনে নৈশভোজের সময় আমি তাকে ষোল দিনের অনুমানের কথাটি স্বরণ করিয়ে দিতেই সে বললো:
প্রভু তায়তা আপনি নিশ্চয়ই জানেন সমস্ত নাবিক মহান দেবতা পসেইডনের মর্জি আর খেয়াল খুশির উপর নির্ভরশীল। আমি হিসাব করেছিলাম ষোল দিন আর সেটা খুব ভালো একটি হিসাব ছিল।
একটি বিষয়ে হাইপ্যাটস আর আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে, আর হয়তো জলদস্যুর আক্রমণ হবে না। কোনো জলদস্যু জাহাজই সাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহরের মূল বন্দরের এতো কাছে ঘেঁষার ঝুঁকি নেবে না। কাজেই আমি আমার জাহাজগুলোর কাছে সঙ্কেত বার্তা পাঠালাম, যেন ওরা পবিত্র ষাঁড় জাহাজটির কাছাকাছি অবস্থান নেয়।
পরদিন ভোরের বেশ আগে আমি কেবিন থেকে বের হয়ে মাস্তুলের ডগায় চড়লাম। ভোরের আগের কুয়াশাচ্ছন্ন ধূসর আলোয় দিগন্তের চতুর্দিক লক্ষ্য করে কিছুই দেখা গেল না, ডাঙার কোনো চিহ্নই নেই।
মাস্তুলের উপর থেকে নেমে কেবিনে ফিরতে যাব এমন সময় দেখলাম একটি অ্যালবাট্রস পাখি কুয়াশার ভেতর থেকে বের হয়ে আমার মাথার উপরে দুই ডানা মেলে ভেসে বেড়াতে লাগলো। মাথা এদিক ওদিক করে পাখিটা আমাকে দেখার চেষ্টা করছিল। সবধরনের পাখি আমার পছন্দ আর এতো কাছ থেকে এমন সুন্দর একটি পাখি দেখার সুযোগ এই প্রথম পেলাম। পাখিটিরও মনে হল আমার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে আর তাই সে এতো কাছ থেকে আমার মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে। চকচকে কালো দুচোখ দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল। আমি তার দিকে এক হাত বাড়াতেই পাখিটি দ্রুত সরে গিয়ে আবার সেই কুয়াশার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল, যেখান থেকে সে এসেছিল।
