সে ছিল ফারাওয়ের রক্ষী বাহিনীর লাল ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন। পাঁচ ছয় বছর আগে সে আবিডসের একটি গুঁড়িখানার একজন প্রমোদবালাকে নিয়ে কলহ করার সময় তার কর্নেলকে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলে। তারপর তাকে ধরে ফাঁসি দেবার আগেই সে পালিয়ে যায়।
এখন কি তাকে মেরে ফেলবো?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, দেখা যাক কী হয়। এটা পরেও করা যাবে। ততক্ষণ তাকে দাঁড় টানার কাজে লাগাও।
একসময় নাকাতি একজন দুর্ধর্ষ সেনাকর্মকর্তা ছিল। তার অনেক উপরের দিকে পদোন্নতি হবার সুযোগ ছিল।
তাকে কি চাবুক মারবো না?
নিয়মমাফিক যা করার কর দিলবার। তবে দেখো সে যেন একজন ক্রীতদাসের খাবার পুরোপুরি পায়।
তারপর একজন নৌকর্মকর্তাকে ইশারা করলাম তাকে অন্যান্য বন্দীদের সাথে এখান থেকে নিয়ে যেতে।
তারপর শান্তির পায়রা জাহাজটির মূল খোলের দিকে গেলাম।
দিলবারকে বললাম, তোমার লোক দিয়ে এই খোলের দরজাটা খুলে ফেল। খোলের দরজাটা ভেঙে খুলে ফেলার পর ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, পুরো খোলটি তামা আর টিনের পিণ্ড দিয়ে ভর্তি। বুঝা গেল আমাদের আগে নাকাতি অন্য কোনো জাহাজ লুট করেছে।
দিলবারকে নির্দেশ দিলাম, সমস্ত মাল আমার জাহাজে নির্মম-এ নেবার ব্যবস্থা করো। তারপর আমাদের বিজয়ী নাবিকদের দিয়ে জলদস্যুদের জাহাজটি আমাদের সাথে ক্রিটে নিয়ে চলো। মনে মনে আমি একটা পরিকল্পনা করছিলাম। তবে তার আগে নাকাতি কিছুক্ষণ দাঁড় টানার কাজ করে নিক, তারপর সে ঠিকই আমার প্রস্তাব পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
ক্রিট দ্বীপে পৌঁছার চার পাঁচদিন আগে নাকাতিকে আমার কেবিনে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলাম।
এতোদিনে তার অবস্থা পালকখসা ঝড়োকাকের মতো হয়েছে। পরনে কেবল একটি নেংটি আর পায়ে শিকল বাঁধা। উদ্ধতভাবটি আর নেই। পিঠে চাবুকের আঘাতে ঘা হয়েছে। একটানা দাঁড়টানার কাজ করতে করতে বাহুদুটো শক্ত হয়ে রয়েছে। একটা ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো পেট ভেতরের দিকে ঢুকে রয়েছে। পেটে আর চর্বি নেই।
তবে বুঝা গেল চাবুক পেটালেও মারধোর করা হয়নি। এখনও তার চোখে মুখে গর্বিত ভাবটি লুকিয়ে রয়েছে। সে আমাকে হতাশ করেনি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বউ কী এখন থিবসে আছে নাকি আর কারও সাথে ভেগে গেছে? সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের চাউনি কঠিন আর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
ছেলেমেয়ে কয়জন? ছেলে না মেয়ে? তারা কি তোমার কথা মনে করে? তুমি কি তাদের কথা ভাবো?
সে বললো, আপনি জাহান্নামে যান! আমি মৃদু হাসি চাপলাম। তার বড়াই ভাবের প্রশংসা করলাম। তার কথাটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলাম, যেন সে এটি বলেনি।
আমার ধারণা মনে মনে তুমি এখনও মিসরের একজন সন্তান; একজন সভ্য মানুষ এবং জলদস্যু নও। একথা শুনে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তারপরও আমি বলে চললাম, তুমি একটি ভুল করেছে আর তার মাশুল দিতে গিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছ। এবার সে মুখ কুঁচকাল, ঠিক জায়গাতেই ঘা দিয়েছি।
রেগে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তাতে আপনার কী?
আমি বললাম, আমার কিছুই আসে যায় না। তবে আমার মনে হয়। তোমার স্ত্রী আর সন্তানদের অবশ্যই কিছু আসে যায়।
এবার তার গলার স্বর পাল্টে গেল, এক সমুদ্র হতাশা নিয়ে সে বললো, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন কেউ আর এর কিছু করতে পারবে না।
আমি বললাম, আমি তোমাকে ক্ষমা করার ব্যবস্থা করতে পারি। সে একটি তিক্ত হাসি হেসে বললো, আপনি ফারাও নন।
না, তা নই আমি। তবে আমি বাজপাখির সীলমোহর বহন করছি। আমার যেকোনো কথাই এখন ফারাওয়ের কথা। এবার তার চোখে আশার আলো দেখা দিল। আর এটা দেখে বেশ ভালো লাগলো।
এবার সে বেশ নরম হয়ে ক্ষমাপ্রার্থীর সুরে বললো, আপনি আমাকে কী করতে বলেন প্রভু তায়তা?
হাইকসোদের কবল থেকে মিসরকে মুক্ত করতে আমি তোমার সাহায্য চাই।
আপনি একথাটি বেশ সহজভাবে বলছেন, অথচ এই নিষ্ফল প্রয়াসে আমি আমার জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছি।
এটা স্পষ্ট যে থিবসে থেকে পালিয়ে যাবার পর তুমি সাগরের মানুষের রাজা হয়েছ। আমি নিশ্চিত তোমার সাথীদের অনেকেই দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া মিসরীয়। স্বদেশে ফিরে আসার সুযোগ পেতে ওরা নিশ্চয় লড়াই করবে।
নাকাতি সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বললো, সামান্য রূপা আর চাষ করার মতো একটুখানি কালো মিসরীয় জমির জন্য আরও কঠিন লড়াই করবে।
এবার আমি তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, কথা দিচ্ছি তোমরা সবাই এই পুরষ্কার পাবে। তোমার এই শান্তির পায়রা জাহাজের মতো পঞ্চাশটি জাহাজ আর লড়াই করার মতো লোকজন নিয়ে এসো, আমি তোমাদের হারানো সম্মান আর মুক্ত জীবন ফিরিয়ে দেবো।
আমার কথাটি শুনে সে কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, পঞ্চশটা জাহাজ আনতে পারবো না। তবে আমাকে আমার লোকজনসহ আমার শান্তির পায়রা জাহাজটা ফিরিয়ে দিন, তিনমাসের মধ্যে আমি এরকম আরও পনেরোটা জাহাজ নিয়ে ফিরে আসবো। ঈশ্বরের নামে শপথ করছি।
আমি কেবিনের দরজার কাছে গিয়ে দরজাটি খুললাম। জারাস তার তিনজন লোকসহ আমাকে উদ্ধার করার জন্য উদ্যত তলোয়ার নিয়ে অপেক্ষা করছিল।
আমার জাহাজে গিয়ে পাঁচককে খাবার আর মদ নিয়ে আসতে বল।
যখন জারাস ফিরে এলো তখন আমি নাকাতিকে নিয়ে টেবিলে বসে রয়েছি। আমার কেবিনের বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে সে চুল আঁচড়ে নিয়েছিল। আমি যে পোশাক দিয়েছি তা পরেছে। সে বেশ লম্বাচওড়া হলেও আমার পোশাক তার গায়ে মোটামুটি মানানসই হয়েছে।
