এমনকি রাষ্ট্রদূত তোরানের প্রধান কেবিনেও এই উৎপাতের কমতি ছিল না।
.
সাগরে আমরা চৌদ্দদিন কাটালাম। একদিন জাহাজের সামনের ডেকে বড় পালের ছায়ার নিচে আমি আর তোরান বসেছিলাম। মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আমরা গভীর আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় পেছনের ডেক থেকে হঠাৎ গণ্ডগোল শুনে আমাদের আলাপে ব্যাঘাত ঘটলো।
আমি তাকিয়ে দেখলাম পবিত্র ষাঁড়ের ক্যাপ্টেন হাইপ্যাটস মাস্তুলের ডগায় সঙ্কেতের পতাকা উড়িয়েছে। সাথে সাথে তোরানের কথা মাঝপথে থামিয়ে আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটেছে। তারপর দুজনেই দ্রুত পেছনের ডেকে গিয়ে এক জায়গায় জড়ো হওয়া জাহাজের কর্মকর্তাদের কাছে গেলাম। ওরা সবাই সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
তোরান ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার হাইপ্যাটস? সে সামনের দিকে দেখিয়ে বললো, আমাদের সাথে আসা ছোট একটা জাহাজ থেকে সঙ্কেত বার্তা এসেছে। তবে বেশি দূরত্বের কারণে সঙ্কেতটি বুঝা যাচ্ছে না।
আমি তাকিয়ে দেখলাম দীগন্ত রেখার কাছে আমার নির্মম জাহাজটি দেখা যাচ্ছে। এখন আকেমি এর নেতৃত্বে রয়েছে। পতাকার সঙ্কেত বার্তার অর্থ বিশ্লেষণ করে আমি ওদেরকে জানালাম, ওরা জানাচ্ছে ওদের সহযোগী জাহাজটির উপর একটি জলদস্যু জাহাজ হামলা করেছে আর জলদস্যুরা ওদের জাহাজে চড়েছে। আকেমি এখন দিলবারকে সাহায্য করার জন্য ওর জাহাজের দিকে যাচ্ছে।
হাইপ্যাটস অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, এসব কথা আপনি কী করে বুঝতে পারলেন প্রভু তায়তা?
আমি ধৈর্য সহকারে তাকে বুঝিয়ে বললাম, আমি কেবল আকেমির সঙ্কেত বার্তাটি পড়েছি।
তোরান বললো, এতোদূর থেকে? এটা তো আমার কাছে ভেল্কিবাজি মনে হচ্ছে তায়তা।
আমি হালকাভাবে বললাম, বাজপাখি হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত গূঢ়লিপির প্রতিকৃতি। ঐ পাখি আর আমার, উভয়েরই সূক্ষ দৃষ্টিশক্তি রয়েছে। এখন দয়া করে হাইপ্যাটসকে বলুন পাল তুলে দাঁড়িদের পূর্ণ শক্তিতে বৈঠা বাইতে।
ঘন্টা খানেক পর আমরা আমাদের পাহারাদার জাহাজের কাছে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে দেখলাম ওরা দাঁড় উঠিয়ে আর পাল গুটিয়ে জাহাজ থামিয়ে রেখেছে। আর একটি আরবী ধাউয়ের সাথে লড়াই করছে। এই জাহাজটি আমার জাহাজের চেয়েও বড়, এর দুটো ছোট আর বড় একটি পাল পেছন দিকে হেলে এলোমেলো হয়ে রয়েছে। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে লড়াই প্রায় শেষের পথে, কেননা ধাউয়ের নাবিকেরা তাদের হাতের অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত উপরে তুলে ধরেছে।
গায়ে গায়ে লেগে থাকা জাহাজদুটোর কাছে এসে আমি দেখলাম আরবী জাহাজটির গায়ে এর নাম মিসরীয় লিপিতে লেখা রয়েছে। নামটি হল শান্তির প্রতীক। মনে মনে হাসলাম। সে মোটেই শান্তির প্রতীক পায়রা নয়।
হাইপ্যাটসকে নির্দেশ দিলাম, শত্রুর জাহাজের পাশে আমাদের জাহাজ ভেড়াও! সে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশাল জাহাজটি ঐ আরবী ধাউয়ের গায়ে লাগাতেই আমি দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ধাউটির ডেকে নামলাম। জারাস আমাকে অনুসরণ করলো। আমি অনুভব করলাম লড়াইয়ে সামিল হতে না পেরে সে বেশ হতাশ হয়েছে। এদিকে দিলবার আর আকেমি খোলা তলোয়ার হাতে আমার কাছে এলো।
ওরা আমাকে অভিবাদন করতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে এখন কী অবস্থা? রক্তমাখা তরবারি তুলে দিলবার দেখালো ডেকের উপর বন্দীরা হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে। হাত পেছনে বাঁধা, ঘাড় আর মাথা ডেকের তক্তার গায়ে ঠেকানো।
দিলবার বললো, ঐ বদমাশগুলো মনে করেছে আমরা সাগরে একা রয়েছি। ওরা এসে বললো সাগরে ওরা পথ হারিয়েছে তাই আমাদের সাহায্য কামনা করছে। ডেকে তখন কয়েকজন মাত্র লোক দেখা যাচ্ছিল। যে মুহূর্তে আমরা ওদের পাশাপাশি হলাম সাথে সাথে যারা নিচে লুকিয়ে ছিল ওরা লাফ দিয়ে বের হয়ে আমাদের জাহাজের গায়ে হুক ছুঁড়ে মারলো। তারপর সবাই আমাদের জাহাজে চড়লো। অবশ্য আমরাও তৈরি ছিলাম। আকেমি পৌঁছা পর্যন্ত ওদেরকে আটকে রাখলাম তারপর দুজনে মিলে ওদেরকে কাবু করলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কতজনকে বন্দী করেছ?
আকেমি ক্ষমা চেয়ে বললো, দুঃখিত, কয়েকজনকে মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলাম। তারপর অবশ্য ওরা সবাই আত্মসমর্পণ করেছে। যাইহোক তারপরও আটত্রিশজনকে বন্দী করতে পেরেছি। সে জানে আমি মৃত লোকের চেয়ে বন্দী ক্রীতদাস পছন্দ করি।
দুজনেই ভালো কাজ দেখিয়েছে। এখন এদেরকে দুইভাগ করে তোমাদের জাহাজে দাঁড় টানার কাজে লাগাও।
আমার লোকেরা বন্দীদেরকে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে আমার জাহাজের ক্রীতদাস বেঞ্চে তাদের নতুন কর্মক্ষেত্রের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া শুরু করতেই পেছনের সারিতে একজন বন্দীর দিকে আমার নজর পড়লো। তার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে বুঝা যাচ্ছিল সে এই জলদস্যু দলের নেতা। আর তার চেহারায় এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠেছে। লোকটি আমার চোখেচোখে না তাকাতে চেষ্টা করছিল।
আমি তার দিকে তাকিয়েই ডেকে বললাম, তুমি নাকাতি! সাথে সাথে সে পিঠ সোজা করে চিবুক তুলে আমার দিকে তাকাল।
তারপর আমাকে বললো, প্রভু তায়তা, আমি আশা করিনি যে আবার আপনার দেখা পাবো।
আমি বললাম, দেবতা সবসময় আমাদের প্রার্থনার দিকে মনোযোগ দেন না।
আমাদের কথার মাঝে দিলবার এসে বললো, আপনি এই জানোয়ারটাকে চেনেন, প্রভু?
