তেহুতিও তার ছোট বোনের মতো পরিষ্কার কণ্ঠে বললো, আর আমার জারাসের কথা বলছি।
আসলেই আমার পরিকল্পনা ছিল ক্রিটে পৌঁছে মিনোজের রাজপ্রাসাদে থাকতে শুরু করার আগে ওরা যে ভয়ঙ্কর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল তা থেকে ধীরে ধীরে ওদেরকে সরিয়ে আনা। তবে আমার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে।
আমি বার বার নানানভাবে চেষ্টা করলাম ওদেরকে খুশি করতে, তবে ওরা মোটেই তাতে মন বসালো না। শেষ পর্যন্ত আমি ওদের কাছে হার মানলাম।
শেষ পর্যন্ত সিডন বন্দর ছাড়ার সময় জারাস আর হুই দুজনেই পবিত্র ষাঁড় নামে জাহাজটিতে চড়লো।
.
সাতটি জাহাজ নিয়ে নৌবহরটি গঠিত। পবিত্র ষাঁড় ঠিক মাঝখানে রয়েছে। চারকোণা পালের যে দুটি জাহাজ আমার আর জারাসের অধীনে ছিল সে দুটো দুপাশে পাহারা দিয়ে চললো। তবে এখন দিলবার আর আকেমির নেতৃত্বে এগুলো ভেসে চলেছে।
আমার বাকি চারটি জাহাজও এই নৌবহরের পেছনে পাহারাদার হিসেবে অনুসরণ করছে। জাহাজগুলো একে অন্যের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে। এভাবে ওরা চারদিকে সাগরের ষাট লিগ ব্যাপী নজর রাখতে পারবে। আমি একটি সহজ পতাকা দিয়ে সঙ্কেত দেবার পদ্ধতি প্রবর্তন করলাম, যাতে কোনো ধরনের বিপদ দেখা দিলেই প্রধান জাহাজ থেকে আমি তা জানতে পারি।
এসব সাবধানতার প্রয়োজন ছিল। কেননা মধ্যসাগর ছিল সাগরের মানুষের বিচরণ কেন্দ্র। এরা ছিল সমস্ত সভ্যজগত থেকে বিচ্ছিন্ন দলত্যাগী এবং সমাজ তাড়িত ব্যক্তি। নির্বাসিত হওয়ার পর এরা সকলে মিলে জলদস্যুর দল তৈরি করেছে। কেউ কারও অধীনে নয়, কাউকেই এরা প্রভু মানে না। কোনো ধরনের নৈতিকতা বোধ, বিবেক কিংবা অনুতাপের বালাই নেই। ওরা ক্ষুধার্ত সিংহ, বিষাক্ত সাপ কিংবা বৃশ্চিকের মতোই ভয়ঙ্কর। সাগরের ডুবন্ত পাহাড় কিংবা মানুষ খেকো হাঙ্গরের চেয়েও ওদের বিচরণ বেশি ছিল। মিসরে আমরা ওদের নাম দিয়েছিলাম, ইয়ামের সন্তান। ইয়াম হচ্ছে উত্তাল হয়ে সাগর যখন ফুঁসে উঠে তখন সেই সাগরের দেবতার নাম। এই দেবতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর।
তবে বছরের এই সময়টি সাগরের এই অংশে পাড়ি দেবার জন্য সবচেয়ে অনুকূল ছিল। মধ্যসাগরের এই অংশের মিসরীয় নাম বিশাল সবুজ। আবহাওয়া শান্ত প্রকৃতির, সুন্দর বাতাস আর সাগরও শান্ত। পবিত্র ষাঁড়ের যাত্রীরা সবাই সমুদ্র যাত্রা উপভোগ করছিল।
জারাস তেহুতিকে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ দিয়ে চললো। সে তেতির তীর ছোঁড়ার জন্য ভাসমান লক্ষ্য বস্তু তৈরি করেছিল। জাহাজের পেছনে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের দড়িতে বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
এছাড়া প্রশিক্ষণের জন্য সে কাঠের তরবারিও নিয়ে এসেছিল। এর পাতগুলো ছাগলের চামড়া দিয়ে মোড়ানো ছিল আর কাঠের ঢালও এনেছিল। খোলা ডেকে ওরা মহড়া দিত। মাঝে মাঝে তেহুতির বিজয়োল্লাস শুনে বুঝা যেত সে লড়াইয়ের মহড়ায় জিতেছে। প্রচণ্ড জোরে আঘাত করতে সে মোটেই পিছপা হত না। সে এমন জোরে আঘাত করতো, যা সামলাতে জারাসের মতো একজন দক্ষ অসিচালকও তা হিমশিম খেয়ে যেত। তবে সে কখনও তার তরবারি দিয়ে উল্টো তেহুতির উপর আক্রমণ চালাতো না।
বেকাথা তীর ছোঁড়া প্রশিক্ষণে অংশ নিত। তবে সে তার বড় বোনের মতো একই ওজনের ধনুকের ছিলা টানতে পারতো না, ফলে সে তার বোনের মতো অনেক দূরে সঠিক লক্ষ্য বস্তুতে তীর ছুঁড়তে পারতো না। তাই সারা দিন মুখ গোমড়া করে রইল। তারপর তেহুতিকে তার সাথে কাঠের তরবারি দিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানালো। তবে বোনের তরবারির আঘাতে তার গায়ে যে কালশিরে দাগ পড়েছিল তা মেলাতে এক সপ্তাহ লাগলো।
এবার এই অস্ত্র প্রতিযোগীতা থেকে সরে গিয়ে সে কর্নেল হুইকে বাও খেলা শেখাতে শুরু করলো। তবে হুই ছাত্র হিসেবে ব্যর্থ প্রমাণিত হল। বেকাথা নির্দয়ভাবে তাকে পেটাতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হুই বিদ্রোহ করতে চাইলো, তখন বেকাথা তাকে নাচ, গান আর ধাঁধা শেখাতে শুরু করলো।
তবে হুইয়ের কণ্ঠস্বর ছিল চমৎকার আর নাচেও সে বেশ পারদর্শিতা দেখালো। প্রথম দুটো নাচ শিখতে গিয়ে সে বেশ কুশলতার পরিচয় দিল। তবে ধাঁধায় সে সবচেয়ে দক্ষতা দেখাল। বেকাথাকে তার সাথে তাল সামলাতে কষ্ট হত।
একবার সে বেকাথাকে প্রশ্ন করলো, দুই জন মা আর তিনজন মেয়ে ঘোড়ায় চড়তে বের হল। ওরা কয়টি ঘোড়া নিয়েছিল?
অবশ্যই পাঁচটি।
হুই বললো, ভুল। ওদের তিনটি ঘোড়া দরকার ছিল। ওরা ছিল দাদিমা, মা এবং মেয়ে।
বেকাথা অর্ধেক খাওয়া ডালিমটি তার মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরে বললো, উহ তুমি একটা বোকা লোক! হুই ডালিমটা ধরে এক কামড় দিয়ে ফের তার দিকে ছুঁড়ে মারলো।
রাষ্ট্রদূত তোরানের প্রধানপাঁচক তার কথামতোই চমৎকার আর সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করলো। জাহাজের পেছনের খোলা ডেকে ক্যানভাসের ছাউনির নিচে আমরা একের পর এক সুস্বাদু খাবার খেয়ে চললাম, সেই সাথে চললো বাঁশি এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে চারজনের বাদকদলের সঙ্গীত পরিবেশনা।
দিনগুলো আনন্দেই কেটে চললো আর বাধাবন্ধনহীন ছোট ছোট বাচ্চার মতো আমরা হাসিখুশিতে মেতে রইলাম।
অবশ্য সবকিছুই একেবারে নিখুঁত ছিল না। রাতে এই জাহাজে ভীষণ ইঁদুরের উৎপাত হত। যখনই আমরা বাংকে শুয়ে পড়তাম তখনই শোনা যেতে কেবিনের বাইরের পথ দিয়ে কিচ কিচ আর ছুটাছুটির শব্দ। তবে মেয়েরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যেত।
