যখন সে শূন্যে ঝাঁপ দিল তখন আমার জান প্রায় বেরিয়ে গেল। তবে যখন সে জাহাজের ডেকে দুপা রেখে দাঁড়াল তখন আতঙ্ক চলে গিয়ে স্বস্তি ফিরে এলো। এ-ধরনের অশোভন আচরণ করার কারণে তাকে কষে বকে দেবার জন্য আমি ডেকের উপর দিয়ে ছুটে গেলাম।
তবে সে এক নিঃশ্বাসে বলা শুরু করলো, ইশ তায়তা, নতুন আলখাল্লা আর শিরস্ত্রাণে তোমাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। কোথায় পেলে এগুলো? তোমাকে তো একজন রাজার মতো দেখাচ্ছে! আমাদের জন্য কোনো উপহার এনেছো? সাথে সাথে আমার সমস্ত রাগ পানি হয়ে গেল, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
অবশ্যই তোমার জন্য একটা উপহার এনেছি। তবে আগে বল, যে কদিন আমি ছিলাম না তখন ঠিক ছিলে তো?
সে দুষ্টুমির হাসি দিয়ে জাহাজের উপর বন্দরের দিকে তাকাল। তুমি তো তার কোনো সুযোগ রেখে যাওনি। আমার সমস্ত প্রলোভন সাথে নিয়ে গিয়েছ। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমি দেখলাম দূরে চালকের ডেকে জারাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এতো দূরত্ব সত্ত্বেও তাদের দুজনের মাঝে বিদ্যুত চমকের মতো দৃষ্টি বিনিময় হল।
ক্রিটের কুনুসসের উদ্দেশ্যে শেষ সমুদ্র যাত্রা শুরু করার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করতে আরও চারদিন লেগে গেল। তোরান আমাদেরকে তার জাহাজে চড়ার আমন্ত্রণ জানালো। সুবিশাল তিনস্তরের দাঁড়বাহী জাহাজটি আকারে আমার সুমেরিয় জাহাজগুলোর দ্বিগুণ বড়।
সে বললো, আপনার ঐ চারকোণা পালের ছোট্ট জাহাজের তুলনায় আমার এই বড় জাহাজ পবিত্র ষাঁড়ে চড়ে আপনি আর রাজকুমারীরা অনেক আরাম পাবেন। ওহ আচ্ছা জাহাজটির নামটি তাহলে এই। ভাবলাম গালভরা নামটি থেকে বেশ দম্ভ ফুটে উঠছে। তবে একটু আগেই আমার যে যুদ্ধ জাহাজের কৃতিত্বে আমরা হাইকসোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেছি, সেটি সম্পর্কে তার এই তাচ্ছিল্যভাব দেখানোটা আমার পছন্দ হয়নি। তাই আমি একটু ইতস্তত করতে লাগলাম।
সে বলেই চললো, আমরা এক সাথে গেলে কুনুসসে পৌঁছে আপনারা যে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন সে সম্পর্কে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করার সময় এবং সুযোগ পাবো। সর্বাধিরাজ মিনোজের রাজদরবারের কূটনীতি এবং আদব-কায়দা অত্যন্ত জটিল আর সেগুলো অবশ্যই মানতে হবে। তারপরও আমাকে ইতস্তত করতে দেখে সে বললো, আমার প্রধান পাঁচক হেলেনিয় জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। এছাড়া আপনাকে আরেকটি কথা বলতে চাই, এই জাহাজে সাইক্লেড থেকে আনা বিশ পিপা সর্বোৎকৃষ্ট লাল মদ রয়েছে। আমি জানি দুই সপ্তাহ আমার সাথে কাটাতে আপনার জন্য এগুলো কিছুই না, তবে আপনার বুদ্ধিমত্তা, গভীর জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। অনুগ্রহ করে আমার আতিথ্য গ্রহণ করে আমাকে বাধিত করুন প্রভু তায়তা। এরকম অনুরোধের পর আমি আর না করতে পারলাম না।
তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে আমি বললাম, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ মহামান্য রাষ্ট্রদূত। তবে মনে মনে ভাবলাম, আসলেই কী সে আমার সঙ্গ এতো দাম দিচ্ছে নাকি আমার রাজকুমারীদের মিনোয়ান পরিচারিকা লক্সিয়াসের জন্য এতোসব করছে।
তবে তেহুতি আর বেকাথা দুজনেই তোরানের সাথে তার জাহাজে যাওয়ার বিষয় নিয়ে আপত্তি তুললো। ওরা আমার জাহাজে এসে আমার কাছে তাদের আপত্তির এক বিশাল তালিকা তুলে ধরলো। তবে সবগুলোই ছিল খুব দুর্বল ধরনের।
সমস্ত কথা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শোনার পর আমি ওদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দুজনেই কাতর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
তাহলে তোমরা কি রাষ্ট্রদূত তোরানকে বিশ্বাস করো না? তোমাদের কি ধারণা তিনি তোমাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার জাহাজে নিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তোমাদের হত্যা করবেন? দুজনেই বিব্রতভাবে গা মোচড়াতে লাগলো।
আর কী করে এই ধারণা তোমাদের মাথায় এলো যে পবিত্র ষাঁড়ের মতো বিশাল আকারের জাহাজ পানিতে ভাসবে না আর আমাদের সকলকে নিয়ে ডুবে যাবে?
দুজনেই চুপ করে রইল। আর হঠাৎ বেকাথার চোখ ভরে পানি দুই গাল বেয়ে পড়তে লাগলো। আমি আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এতো দুঃখ পাবে জানলে এমন কঠিন প্রশ্ন করতাম না। আমি লাফ দিয়ে টুল থেকে উঠে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ওর কাছে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু সে হাত দিয়ে ঠেলে আমাকে সরিয়ে দিয়ে মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখলো।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে শুরু করলো, আর তাকে কখনও দেখতে পাবো না। তার কথা শুনে আমি অবাক হবার ভান করে বললাম, কাকে আর কখনও দেখতে পাবে না? তুমি কি রাষ্ট্রদূত তোরানের কথা বলছো?
সে আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গড়গড়িয়ে বলে যেতে লাগলো, তুমি তেহুতিকে কথা দিয়েছিলে অন্তত ক্রিটে পৌঁছা পর্যন্ত আমরা একসাথে থাকতে পারবো। তারপরই আমাদেরকে সর্বাধিরাজ মিনোজের হারেমের অন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তুমি কথা দিয়েছিলে যতক্ষণ আমরা সতর্ক থাকবে ততক্ষণ আমরা ক্রিটে পৌঁছানো পর্যন্ত মেলামেশা করতে পারবো। কিন্তু আর কখনও ওদের দেখা পাবো না। আমার জীবন এখানেই শেষ হচ্ছে।
তাকে থামিয়ে আমি বললাম, ব্যাপারটা আমার বুঝা দরকার বেকাথা। তুমি কার কথা বলছো এখানে?
বেকাথা আবার আমার দিকে মুখ ঘোরালো, তবে এবার সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে রয়েছে। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমরা কার কথা বলছি। আমরা আমার হুইয়ের কথা বলছি।
