মাটিতে বসে শিরস্ত্রাণটি কোলে নিয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে এর কারুকার্য দেখলাম। এর গালের অংশে মিসরীয় দেবতা হাথোর আর অসিরিসের চমৎকার প্রতিমূর্তি খোদাই করা রয়েছে আর কপালে রয়েছে হোরাসের প্রতিকৃতি। হাইকসো অধিনায়ক নিশ্চয়ই অন্য কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আমাদের মিসরীয় বাহিনীর উচ্চপদস্থ কোনো সামরিক কর্মকর্তার কাছ থেকে এটা নিয়েছিল। এটি একটি অমূল্য সম্পদ। এ তুলনায় আমার শিরস্ত্রাণটিকে খুবই সাধারণ মানের মনে হচ্ছে। এছাড়া হাইকসো তীরের আঘাতে এর এক জায়গা বিশ্রীভাবে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
কিছু না ভেবে আমার শিরস্ত্রাণটি ফেলে দিয়ে সোনা আর রূপার তৈরি এই সুন্দর জিনিসটি তুলে নিলাম। ভেতরে চামড়ার আস্তরণ দেওয়া আছে আর বেশ সুন্দরভাবে খাপে খাপে আমার মাথায় লেগে যেতেই মনে হল যেন এটি আমার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। এখন একটি আয়না পেলে ভালো হত।
আবার হাইকসো অধিনায়কের মৃতদেহের কাছে গিয়ে দেখলাম গলায় তিনটি সুন্দর হার ঝুলছে। তবে একটা হারে স্ফটিক পাথরের তৈরি দেবতা শেঠের মাথা ঝুলছিল, এটা নদীতে ছুঁড়ে ফেললাম। অন্যদুটোয় সাদা পাথরের তৈরি হাতি আর উটের চমৎকার প্রতিকৃতি ঝুলছিল। রাজকুমারীরা এগুলো খুব পছন্দ করবে, যদিও ওরা কখনও হাতি দেখেনি।
আবার নদীর খাড়া তীর বেয়ে উপরে আমার রথের কাছে গেলাম। আমার রথচালক নতুন শিরস্ত্রাণটি দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তাড়াতাড়ি আমরা সৈকতে ফিরে গেলাম। সবাই হাতের কাজ ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমাকে নিশ্চয়ই আজব দেখাচ্ছিল।
.
আমার নৌবহরের জাহাজগুলো অন্তরীপ হয়ে উপসাগরে ঢুকলো। জাহাজের পেছন দিক সৈকতের দিকে মুখ করে তীরে ভিড়লো। তারপর মালামাল উঠানামার ঢালু র্যাম্পটি নামিয়ে দিল।
বন্দীদেরকে হটিয়ে জাহাজে উঠানো হল, তারপর সবচেয়ে নিচের ডেকে নিয়ে দুই পায়ে শিকল বেঁধে দাড়ির বেঞ্চে বসিয়ে দেওয়া হল। ওরা সেখানেই থাকবে যতক্ষণ ওদের দেবতা শেঠ তার অন্ধকারের দেবদুত পাঠিয়ে ওদেরকে কয়েদ থেকে মুক্ত না করে।
সূর্যাস্তের ঘন্টাখানেক আগেই সমস্ত লোকজন আর রথ জাহাজে তুলে আমরা সিডন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলাম। তোরান উপরের ডেকে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সে তীরের দিকে তাকাল আর সৈকতের যেখানে আমি আহত হাইকসোদেরকে রেখে এসেছিলাম সেদিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললো, দেখা যাচ্ছে আহত শত্রুদেরকে আপনি জীবিত রেখে এসেছেন। আমি কখনও শুনিনি কোনো বিজয়ী সেনাপতি এরকম ক্ষমাশীলতা দেখিয়েছে।
আপনাকে হতাশ করেছি সেজন্য দুঃখিত। তবে ওদেরকে ওখানে রেখে এসেছি যাতে আর কেউ তাদের ব্যবস্থা নিতে পারে। ঐ দেখুন ওরা আসছে।
হাইকসো রথগুলো আসার আগে গ্রামের যে বাসিন্দাদেরকে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে বলেছিলাম ওরা এখন ফিরে এসেছে। লোকগুলোর হাতে তখনও সেই কাঠের কোদাল আর নিড়ানি রয়েছে যা দিয়ে আমাদেরকে ভয় দেখাতে এসেছিল।
এবার ওরা আমাদের দিকে একবারও তাকাল না। আমরা লক্ষ্য করলাম ওদের মধ্যে যে লোকটি নেতা ছিল সে একজন আহত হাইকসো সৈন্যের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর হাতের কোদালটা দুহাতে ধরে মাথার বেশ উপরে তুললো, যেন চুলার জন্য লাকড়ি ফাড়ছে। এতোদূর থেকেও আমরা শুনতে পেলাম পাথরের মেঝেতে পাকা তরমুজ থপ করে পড়ে যাওয়ার মতো শব্দ করে লোকটির মাথার খুলি ফেটে গেল। তারপর কোদাল হাতে লোকটি সামনে এগিয়ে গেল। মৃত্যু যন্ত্রণায় হাইকসো যোদ্ধার দেহটি ঝুঁকি মেরে চললো আর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো।
পরবর্তী আহত যোদ্ধাটি কোদাল হাতে লোকটিকে আসতে দেখে কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে সরে যেতে চেষ্টা করলো। তার বুক ভেদ করে একটা তীরের ফলা পিঠ দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে। লোকটির পক্ষাঘাতগ্রস্ত একটি পা তার পেছনে পিছলে পিছলে আসছিল। সে একজন সন্তান প্রসবের যন্ত্রণায় কাতর নারীর মতো চিৎকার করছিল। কৃষকটি তার দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে উঠলো, তারপর হাতের কোদালটি দিয়ে ঠেলে সুবিধামতো কোদালের কোপ মারার জন্য কাত করলো।
তাদের পেছন পেছন নোংরা চেহারার মহিলা আর বাচ্চাগুলো হাইকসো মৃতদেহের উপর মাছির মতো হেঁকে ধরলো। রক্তমাখা পরনের কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে সামান্য দামি যা পেল সব ছিনিয়ে নিল। তাদের উত্তেজিত হাসির শব্দ আমরা এতোদূরের জাহাজ থেকে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম।
তোরান আমার দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, প্রভু তায়তা, এখন বুঝা যাচ্ছে চেহারা যাই হোক আপনার মতো মানুষের সাথে হেলাফেলা করা যাবে না।
.
পরদিন দুপুরের ঘন্টাখানেক আগে যখন সিডন বন্দরে আমার জাহাজ নির্মম ভিড়লো, তখন আমার দুই রাজকুমারীই জেটিতে উপস্থিত ছিল। দুজনেই হাত নাড়ছিল আর আনন্দে আর উত্তেজনায় নাচছিল। যখনই আমি বেশিদিন বাইরে থেকে ফিরে আসি তখনই ওদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে আগে আমাকে স্বাগত জানাবে। তেহুতি সাধারণত নিজেকে একটু গম্ভীর রেখে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতো, তবে আজ সে আমাকে আর তার বোনকে অবাক করে দিল। সম্প্রতি জারাস তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন অসাধারণ মক্রীড়াবিদ এবং অসিচালনায় সুদক্ষ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
এবার তার প্রশিক্ষণের কিছু নমুনা সে দেখাল। জাহাজ জেটিতে ভেড়ার আগেই লাথি দিয়ে পা থেকে স্যান্ডেল ছুঁড়ে ফেলে সামনের পাথরের জমিনের উপর দিয়ে খালি পায়ে প্রায় উড়ে কিছু দূর এগিয়ে জাহাজ আর জেটির মাঝখানের ফাঁকের উপর দিয়ে এক লাফ মারলো। পুরো পাঁচ গজ হবে দূরত্বটা। একবার পা ফসকালেই সে জাহাজের কাঠামো আর জেটির মাঝে পিষ্ট হয়ে ডুবে মরতো।
