আমি কখনও বলিনি যে হাইকসেরা কাপুরুষ, তবে এই লোকটিকে মারতে সতেরোটি তীর ছুঁড়তে হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি ছিল আমার, পরে গুণে দেখেছিলাম।
তারপর কসাইয়ের মতো কচুকাটা চললো। এরকম পরিস্থিতিতে সুযোগ এলে আমি সামান্য কশাইগিরির বিরুদ্ধে নই। তবে কশাইগিরির চেয়ে দাস বানানো অনেক লাভজনক। কাজেই আমি পলায়নরপর হাইকসোদের উদ্দেশ্যে তাদের ভাষায় চিৎকার করে বললাম, গোরাবের কুকুরেরা আত্মসমর্পণ করো, আর নয়তো মরো!
আমার দলের সবাই আমার সুরে চেঁচিয়ে উঠলো, আত্মসমর্পণ করো নয়তো মরো! আত্মসমর্পণ করো নয়তো মরো!
বেশিরভাগ হাইকসো সেনা মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুই হাত তুললো। কয়েকজন তখনও ছুটে পালাতে চেষ্টা করছিল, তবে আমাদের রথিবাহিনী চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে ফেললো। ভয়ে আর ছুটাছুটির ক্লান্তিতে ওরা হাঁপাতে শুরু করলো। চারদিকে তাকিয়ে যখন দেখলো উদ্যত ধর্নবাণ তাদের দিকে তাক করে রয়েছে তখন ওরা ভেঙে পড়ে মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো, সকল দেবতার নামে দয়া করো! আমাদেরকে প্রাণে মেরো না হে মহান প্রভু তায়তা। আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। দেবতা হোরাসের দিব্যি আমি যশের কাঙাল নই। তবে সত্যি বলতে কী যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর তরফ থেকে এরকম স্বীকৃতি লাভ করে একটু খুশি অবশ্যই হয়েছি।
হুইকে নির্দেশ দিলাম, এদের সবাইকে রশি দিয়ে বাঁধো। আর ময়দান থেকে ঘোড়াগুলো নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করো। কেউ যেন পালাতে না পারে।
এদিকে জারাসের লড়াইও শেষ হয়েছে আর সে যুদ্ধবন্দীদেরকে বেঁধে রেখে লুষ্ঠিত মালামাল একত্রিত করছিল। এক নজর দেখে বুঝতে পারলাম তাদেরও আমাদের মতো নামমাত্র ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। জারাস নিজে অক্ষত রয়েছে, সে বন্দীদের আর ঘোড়াগুলো সামলানোর কাজ তত্ত্বাবধায়ন করছে। ঘোড়াগুলোও মানুষের মতো মূল্যবান।
হঠাৎ এদিকে আমাকে দেখে জারাস অভিবাদন জানিয়ে মুখে দুইহাত দিয়ে চোঙা বানিয়ে চিৎকার করে বললো, আপনার তরবারিতে আরও শক্তি সঞ্চিত হল প্রভু তায়তা! সত্যি চমৎকার শিকার হল আজ। শিঘ্রই আমি ঘরে বউ আনতে পারবো।
এটি একটি হালকা রসিকতা। তামিয়াত দুর্গে অভিযানের পর পুরষ্কারের অর্থে তাকে আগেই আমি ধনী বানিয়েছি। যাইহোক প্রত্যুত্তরে আমিও মৃদু হেসে হাত নাড়লাম।
জাহাজগুলো যেখানে লুকিয়ে ছিল সেই অন্তরীপের কাছে গিয়ে নীল পতাকা উড়িয়ে ওদেরকে ডেকে আনতে একজন ঘোড়সওয়ারকে পাঠালাম।
এবার বিজয়ানন্দ দ্রুত উবে যেতে শুরু করলো, কেননা দিনের সবচেয়ে খারাপ কাজটি এখন বাকি রয়ে গেছে। আহত হাইকসো ঘোড়াগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রাণীগুলোর প্রতি সবসময় আমার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। মিসরে আমিই প্রথম একটি বুনো ঘোড়াকে পোষ মানিয়েছিলাম।
দশটি ভালো ঘোড়ার খালি পিঠে চড়ে আমাদের সহিসরা অন্যান্য বেশি আহত ঘোড়াগুলো থেকে এদেরকে আলাদা করলো। তারপর এদেরকে উপকূলের রাস্তা ধরে সিডনের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। প্রশিক্ষপ্রাপ্ত এই রথের ঘোড়াগুলো যথেষ্ট মূল্যবান।
যেসব ঘোড়া মারাত্মক আহত হয়েছিল সেগুলোর যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করলাম। প্রথমে এগুলোর মুখের সামনে গুড়োকরা বজরা ধরলাম। তারপর যখন মাথা নিচু করে একমুঠো বজরার দানা মুখে পুরলো তখন আমার লোক ব্রোঞ্জের মাথাওয়ালা একটা ভারী মুগর পশুটির দুই কানের মাঝে মাথায় জোরে আঘাত করে মাথার খুলি গুঁড়িয়ে দিল। এতে এদের দ্রুত শান্তিপূর্ণ মৃত্যু হল।
বীভৎস এই কাজটি শেষ করার পর হাইকসো বন্দীদের দিকে নজর ফেরালাম। ঘোড়া ভালোবাসলেও এগুলোর মালিকদের প্রতি আমার প্রবল ঘৃণা ছিল। বন্দীদের সারির মাঝ দিয়ে হেঁটে তাদের অবস্থা দেখলাম। যারা আহত হয়নি কিংবা সামান্য আহত হয়েছে তাদেরকে সৈকতে পাঠালাম আমাদের জাহাজগুলো সেখানে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।
তবে অনেক বন্দী মারাত্মভাবে আহত হয়েছিল, তাদেরকে দাস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বুকের গভীরে তীর বেঁধা অবস্থায় একজন মানুষ বৈঠা বাইতে পারবে না। এদেরকে ছায়ায় নিয়ে সামান্য পানি দিতে বললাম। আর বেশিক্ষণ এরা বাঁচবে না। এদের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
একেবারে শেষে আমার নিজের আর রাজকুমারীদের কথা ভাবার এক মুহূর্ত সময় হল। আবার রথে চড়ে নদী পারাপারের উঁচু তীরের কাছে গিয়ে রথ থামালাম। ঘোড়ার লাগামে রথ চালকের হাতে দিয়ে গিরিখাতের ধারে হেঁটে গেলাম। যুদ্ধক্ষেত্রের এই জায়গায় কেউ জীবিত নেই। শত্রু বাহিনীর অধিনায়কের মৃতদেহটি কোথায় খুঁজতে হবে ঠিক জানতাম। তারপর নদীর অপর তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা লাশ, ভাঙা রথের অংশ আর অন্যান্য সরঞ্জামের মাঝে খুঁজতে খুঁজতে নীল রঙের আলখাল্লাটি দেখতে পেলাম। নদীর একেবারে কিনারায় দেহটি পড়ে রয়েছে।
সাবধানে খাড়া পাড় বেয়ে নামতে শুরু করলাম। নিচে নেমেই নদীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হেঁটে ওপাশের তীরে চললাম।
দুটো বড় পাথরের মাঝে হাইকসো অধিনায়কের লাশটি খুঁজে পেলাম। নিচু হয়ে তার এক পা টেনে পাথরের মাঝ থেকে দেহটি বের করলাম। আলখাল্লাটি রক্তে মাখামাখি হয়ে রয়েছে, তবে আমার চাকর ধুয়ে নিতে পারবে। তাই এটা ভাঁজ করে একপাশে রাখলাম। তারপর শিরস্ত্রাণটি খুঁজতে লাগলাম। ঢাল বেয়ে একটু উপরে উঠে একটি ভাঙা রথের পেছনে জিনিসটা পেলাম।
