গরমে বেশিরভাগ হাইকসো রথীসেনারা শিরস্ত্রাণ আর বর্ম খুলে রেখেছিল। ঘোড়াগুলোর পিঠে কেবল মোটা কম্বল ছাড়া বাকি শরীর আর পেছন খোলা ছিল। তীরের পাথুর ফলার নরম মাংসে আঘাত হানার পরিষ্কার উফ! উফ্! শব্দ আমি শুনতে পেলাম।
এরপর পরই আহত মানুষের আর্তচিৎকার আর তীরের আঘাতে আহত ঘোড়াগুলোরও দীর্ঘ চিৎকার শোনা গেল। কাছাকাছি ভীড় করে থাকা শত্রুপক্ষের সেনাদের মধ্যে হৈচৈ আর চরম বিশৃঙ্খলা শুরু হল।
আতঙ্কিত ঘোড়াগুলো লাগাম টেনে ছিঁড়ে ছুটে যেতে চাচ্ছিল। যেসব ঘোড়ার পেছনে তীর আঘাত করেছিল যন্ত্রণায় সেগুলো পেছনের পা ছুঁড়ে রথের গায়ে আঘাত করে রথিসেনাদের রথ থেকে ফেলে দিল।
রথচালকরা নিয়ন্ত্রণ হারাতেই যন্ত্রণায় প্রায় উম্মাদ ঘোড়াগুলো ছুটে পালাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু বের হবার কোনো পথ না পেয়ে তাদের সামনের রথের গায়ে আছড়ে পড়লো। ফলে দ্রুত একের পর রথগুলো উল্টে পড়লো, চাকা খুলে গেল, ঘোড়া আর চালক যখম হল আর এইভাবে সামনের সারির রথগুলোর উপর গিয়ে পড়লো। ফলে এগুলোও নিচে নদীর গর্ভে পড়ে গেল।
নদীর কোমর পানিতে ডুবে থাকা ঘোড়া, রথ আর মানুষের গায়ে উপর থেকে আরও ঘোড়া, রথ আর মানুষ গড়িয়ে পড়তে লাগলো। সবাই আপ্রাণ। চেষ্টা করছে নদী পার হয়ে অপর তীরে উঠতে। উম্মাদ ঘোড়া, মানুষ আর বিধ্বস্ত ভাঙা রথ মিলে নদীর পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সেদিকে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
জারাসের তীরন্দাজদের প্রত্যেকের কাছে পঞ্চাশটা তীর ছিল আর এতো কাছের লক্ষ্যে খুব কমই লক্ষভ্রষ্ট হয়েছিল। আমি দেখলাম একটি শত্রু সৈন্য রথ থেকে বের হয়ে ছুটে পালাতে চেষ্টা করছিল, তবে কয়েক কদম যেতেই তিনটি তীর তার পেছনে আঘাত করতেই সে মাটিতে পড়ে গেল।
আমার দিকে নদীর পাড়ে যেসব হাইকসো রথিসেনারা মাটিতে শুয়ে বসেছিল বা রান্না করছিল, ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা লাফিয়ে উঠে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে অপর তীরে তাদের সহযোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর দেরি না করে আমি গাছ থেকে নেমে আমার রথের দিকে ছুটলাম। আমার দলের একজন সহযোদ্ধা ঝুঁকে আমার হাত ধরে রথে উঠালো। ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়েই আমি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলাম। দল সামনে এগোও। আক্রমণ কর! আমার রণহুঙ্কার সারির সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়লো।
রথ টানা ঘোড়াগুলো টগবগিয়ে রথ টেনে নিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। হুই আর আমি মাঝখানে পাশাপাশি ছিলাম। একটা তীরের আকৃতিতে রথগুলো ছুটে চললো।
আমাদের সামনে বেশিরভাগ হাইকসো সেনা, যারা মাটিতে অলসভাবে শুয়ে বসেছিল ওরা সবাই নদীর তীরের দিকে ছুটে গিয়েছিল। এখন ওরা আতঙ্কিত হয়ে নিচে নদীর বুকে আর অপর তীরে জঙ্গলের রাস্তায় সহযোদ্ধাদের দুরবস্থার দিকে তাকিয়ে রইল। জারাসের তীরন্দাজবাহিনী তখনও তাদের উপর তীর বৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলছিল।
নদীর এপারে হাইকসোদের একটিও রথে কোনো রথিসেনা ছিল না। আর রথ টেনে নেওয়ার মত কোন ঘোড়াও লাগামে জোতা ছিল না। ঘোড়াগুলো মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘাস খাচ্ছিল। ওদের বেশিরভাগ রথচালক নদীর তীর থেকে ছুটে এসে ঘোড়াগুলো ধরবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। হঠাৎ আক্রমণে হতচকিত হয়ে ঘোড়াগুলো দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে লাগলো।
আমি আর হুই দুজনেই হেসে উঠলাম। চাকার সাথে চাকা লাগিয়ে একটি দুর্ভেদ্য ব্যুহ সৃষ্টি করে আমরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মাঝখানে কোনো জায়গা নেই যার মধ্য দিয়ে হাইকসোরা পালাতে পারবে। তখনও মনে হচ্ছিল ওরা আমাদের আক্রমণ সম্পর্কে সচেতন নয়। বেশির ভাগই অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। যারা দেখলে তারা আতঙ্কিত হয়ে আমাদের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল। ওরা বুঝলো আমাদের আক্রমণ ওরা ঠেকাতে পারবে না। আমরা ধনুকে তীর জুড়ে ধনুক উঁচু করে রেখেছিলাম।
সত্তর কদম আগে থাকতেই আমি তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দিলাম। চলন্ত রথ থেকেও আমার ছেলেরা পঞ্চাশ কদম দূরত্ব থেকে একজন ছুটন্ত মানুষের গায়ে তীর লাগাতে পারে। রথে পৌঁছার আগেই অধিকাংশ শত্রু সেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
শুধু একজনকে দেখলাম যে তার রথের কাছে পৌঁছতে পেরেছিল। সে রথের ভেতর থেকে একটা ধনুক আর এক মুঠো তীর তুলে নিল। তারপর আমাদের দিকে ফিরলো। লোমশ শরীরের বিশালদেহী লোকটি রাগে উন্মুক্ত হয়ে একটা বুনো ভালুকের মতো কুঁসছিল। আমরা তাকে আঘাত করার আগেই সে ধনুক তুলে একটা তীর ছুঁড়লো। আমার সারির তৃতীয় রথচালকের গায়ে তীরটি আঘাত করলো। সে ছিল জেনারেল ক্রাটাসের ছেলে। চমৎকার ছেলেটি তার বাবার মতোই সাহসী আর পঞ্চাশ গুণ বেশি সুন্দর ছিল। সে ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তীরের আঘাতে সাথে সাথে সে মারা গেল।
হাইকসো পশুটি আরেকটি তীর ধনুকে জোতার আগেই আমি তিনটি তীর ছুঁড়লাম। তারপর তার সারা দেহে সজারুর কাটার মতো তীর বেঁধা পর্যন্ত আমাদের তীরন্দাজদের প্রায় সবাই তার গায়ে তীর ছুঁড়লো। তারপর সে দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে আমার দিকে একটা তীর ছুঁড়লো। তীরটা আমার শিরস্ত্রাণের কপালে লেগে টং শব্দ করে একপাশে ছিটকে চলে গেল। তবে আঘাতের ধাক্কায় আমি পেছনের দিকে টলে রথ থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম।
