যখন হাইকসো সেনানায়কটি সন্তুষ্ট হল ভয়ের তেমন কিছু নেই, তখন সে এক লাফ দিয়ে রথ থেকে নেমে পাথুরে পথ দিয়ে নিচে নদীতে নেমে পড়লো। ইতস্তত না করে নদীতে নেমে সে আরও তিনজনসহ হেঁটে নদী পার হয়ে অপর তীরে পৌঁছল। যখন বুঝতে পারলো নদীটি পার হওয়া যাবে তখন সে আবার ফিরে তার রথের কাছে গেল। রথে উঠে চিৎকার করে ঘোড়া ছুটিয়ে নদীর পাড় বেয়ে নামতে শুরু করলো।
নদীর কাছে এসে ঘোড়াগুলো একটু থমকালেও সে চাবুক হাঁকিয়ে ঘোড়াগুলোকে পানিতে নামালো। সামনে এগোতেই পানি পেট পর্যন্ত ছুঁলো। তারপর হঠাৎ একটা ডুবো পাথরে একটা চাকা ধাক্কা লেগে রথটা উল্টে গেল। ডুবে যাওয়া রথের ওজনে আর স্রোতের টানে লাগামে ধরা ঘোড়াগুলো হাঁটু ভেঙে সেখানেই আটকে পড়লো। রথচালক আর অন্য দুজন রথীসেনা রথ থেকে ছিটকে পড়লো। বর্ম আর সাজসরঞ্জামের ভারে ওরা পানিতে তলিয়ে গেল।
সাথে সাথে পেছনের রথের সেনারা তাদের রথ থেকে লাফিয়ে নেমে পানি ঠেলে হেঁটে অগভীর পানিতে নাকানিচোবানি খাওয়া মানুষ আর ঘোড়াগুলোর দিকে এগিয়ে এলো। চিৎকার চেঁচামেচি করে ওরা ডুবে যাওয়ার আগে ওদেরকে ডাঙায় তুলে নিয়ে এলো। তারপর উল্টেপড়া রথটি আবার চাকার উপর দাঁড় করালো। ঘোড়াগুলো ঠিকমতো দাঁড়াবার পর নদীর খাড়া পাড় বেয়ে রথটি টেনে উপরে তুললো। ঝোঁপের আড়ালে ঠিক যেখানে আমরা রথ নিয়ে লুকিয়ে ছিলাম তার সামনে এসে দাঁড়াল।
এরপর শত্রুদের অন্যান্য রথচালকরা বেশ সাবধানে রথ চালিয়ে নদীর বুকে নামলো, সেখানে অপেক্ষামান অন্যান্যরা ঠেলে ধরাধরি করে রথগুলো অপর তীরে উঠিয়ে দিল। গাছের ডালে বসে আমি পরিষ্কার পেছনের রথের সারি দেখতে পাচ্ছিলাম। গুণে দেখলাম সেখানে ১৬০টি রথ রয়েছে। যদিও এটন বলেছিল ২০০ টি রথ আসবে। বুঝতে পারলাম উত্তর মিসর থেকে ষোল দিনের দীর্ঘ যাত্রায় পথে কিছু রথ ওরা হারিয়েছে। ওদের রথগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে সহজেই চাকা ভেঙে পড়তে পারে। এছাড়া দীর্ঘ পথে উঁচুনিচু পথে ঘোড়াও অচল হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিটি রথ নদী পার হয়ে এপাড়ে ডাঙায় পৌঁছার পর রথীরা ঘোড়াগুলোর দুই পা আলগা করে বেঁধে ঘাস খেতে চরে বেড়াতে দিল। তারপর লোকগুলো কেউ ঘাসে শুয়ে পড়লো আর কেউ কেউ আগুন জ্বেলে গরম খাবার রান্না করতে শুরু করলো।
এরকম অপরিচিত আর বৈরী এলাকায় ওদের সেনাপতি সৈন্যদেরকে এরকম ঢিলেঢালা আচরণ করতে অনুমতি দিয়েছে–দেখে আমি অবাক হলেও খুশি হলাম। কোনো পাহারা বসানো হল না কিংবা সামনে রাস্তায় কোনো শত্রুপক্ষের অবস্থান খুঁজে দেখার জন্য কাউকে পাঠালো না। বেশিরভাগই মনে হল বেশ ক্লান্ত। আর জঙ্গলে যেখানে আমাদের রথগুলো লুকানো আছে তার সীমানায় কেউ দেখতে এলো না। এমনকি যারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিল তারাও খুব বেশি দূরে গেল না। এই অচেনা বিদেশে হাইকসোসেনারা স্বভাবতই আত্মরক্ষার স্বার্থেই কাছাকাছি থাকছে।
নদীর অপর তীরে জঙ্গলের পথ বেয়ে আসা মানুষ, রথ আর ঘোড়ার সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছিল। এপাড়ে আসা রথের সংখ্যা আমি গুণছিলাম। আমি অপেক্ষা করছিলাম সেই মুহূর্তটির যখন শত্রুরা সমান দুইভাগে বিভক্ত হবে আর আপাত কোনো ধরনের আশঙ্কা না দেখে শান্ত হবে। মাহেন্দ্রক্ষণটি কাছে আসতেই আমি পকেট থেকে উজ্জ্বল হলুদ রঙের রুমালটা বের করে ভাঁজ খুললাম।
নীল কোট আর চমৎকার শিরস্ত্রাণপরা হাইকসো অধিনায়ক তখনও নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সৈন্য পারাপার তত্ত্বাবধায়ন করছিল। অবশ্য তখনও জারাস আর তার লোকজনের দেখা গেল না, যদিও আমি জানি ওরা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে।
পরবর্তী হাইকসো রথটি নদীর বুক থেকে উঠে এলো। এটি হল পঁচাশিতম রথ যা নদী পার হয়েছে। এখন হাইকসো সেনারা প্রায় সমান দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। এখন কোনো অংশই অন্য দলকে সহায়তা করার অবস্থায় নেই।
যুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে রচিত আমার বিশাল পুস্তকে আমি লিখেছিলাম: ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত্রু মানে কোনঠাসা হওয়া শত্রু। এখন আমার এই শিক্ষার কার্যকারিতা প্রদর্শনের সুযোগ এসেছে।
গাছের ডালে ভারসাম্য বজায় রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, তারপর উজ্জ্বল হলুদ রুমালটা তিনবার মাথার চারপাশে দোলালাম। নদীর অপর তীরে জারাস সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আমার দিকে তুলে সেও উল্টো ইশারা করলো। রণধনুকে তীর জুড়ে সে অন্য হাতে ধরে রয়েছে।
রাস্তার দুই পাশের ঘন ঝোঁপের আড়াল থেকে তীরন্দাজ বাহিনীর সবাই বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। ওরা সবাই একযোগে তীরধনুক তুলে নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে রইল।
প্রথমে জারাস তীর ছুঁড়লো। শূন্যে উঠে তীরটা নিচের দিকে নামার আগেই আমি বুঝতে পারলাম কাকে লক্ষ্য করে তীরটা ছোঁড়া হয়েছে। হাইকসো অধিনায়ক তখনও জারাসের দিকে পেছন ফিরে নদীর তীরে দাঁড়িয়েছিল। তীরের প্রচণ্ড আঘাতে সে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লো, তারপর নদীর খাড়া পাড় বেয়ে পড়ে নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জারাস ইতোমধ্যেই দ্রুত আরও তিনটি তীর ছুঁড়ে মারলো। তার সেনারা তাকে অনুসরণ করলো। এক ঝাঁক তীর দ্রুত কালো মেঘের মতো শূন্যে উড়লো তারপর দুই পাশের তীরন্দাজদের মাঝে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাইকসো রথীবাহিনীর উপর আঘাত হানলো।
