রাস্তায় পৌঁছে একটু থামলাম। সত্তরটি রথই নিরাপদে তীরে নেমে আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম জাহাজবহরটি ইতোমধ্যেই উপকূলের প্রায় এক লিগ দূরত্বে চলে গিয়ে পরবর্তী অন্তরীপের আড়ালে নোঙর ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কয়েকজন দাঁড়ি আর পাল টানার লোক ছাড়া সমস্ত লোক অস্ত্র হাতে নিয়ে জারাসের অধীনে তীরে নেমে এসেছে। ওরা আমার রথীবাহিনীর পিছু পিছু ছুটে আসছে।
ধারণা করলাম হাইকসোদের এখানে পৌঁছতে বড় জোর দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগবে। এসময়ের মধ্যে আমি ওদের মোকাবেলা করার জন্য মোটামুটি একটা অবস্থান নিতে পারবো। পদাতিক সেনাদের নিয়ে জারাস আসা পর্যন্ত জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি নদীর দুই তীরের জায়গাটি সতর্কভাবে নিরীক্ষণ করলাম।
নদীর অপর তীরে জঙ্গল খুব ঘন, রথ যেতে পারবে না। সেক্ষেত্রে জারাস তার পদাতিক বাহিনী নিয়ে ঘন ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে শত্রুর জন্য অপেক্ষা করবে। অবশ্য নদীর এই তীরে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা আছে। এখানে আমরা সুবিধামতো রথগুলো সাজাতে পারবো।
মনে মনে ছক কাটার করার পর আমি হুইকে নির্দেশ দিলাম রাস্তা পার হয়ে জঙ্গলের শেষ প্রান্তে তার রথগুলো নিয়ে লুকিয়ে থেকে আমার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করবে। হুই রথীবাহিনীর একজন চৌকশ নায়ক। লক্ষ্য করলাম সে তার রথিসেনাদের রথ থেকে নেমে ঘোড়াগুলোর লাগাম টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তা পার হবার নির্দেশ দিল। যাতে ঘোড়ার খুর ধূলির মেঘ উড়িয়ে হাইকসোদেরকে আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করতে না পারে।
রাস্তা পার হবার পর ওরা ঘাসের জমি উপর দিয়ে সামনে গিয়ে রথের মুখ ঘুরিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঘন ঝোঁপের আড়ালে লুকাল। তারপর পেছনে গিয়ে ডালপালাসহ গাছের ডাল কেটে টেনে নিয়ে এসে রথগুলোর সামনে একটা পর্দার আড়াল তৈরি করলো। হুইকে সাথে নিয়ে আমি রাস্তার কিনারায় এসে নিশ্চিত হলাম যেন রথগুলো সম্পূর্ণ লুকানো থাকে।
ইতোমধ্যে তীরন্দাজবাহিনীসহ জারাস এসে পৌঁছালো। শক্তিশালী একটি বাঁকানো ধনুক ছাড়াও প্রত্যেকে কাঁধে অতিরিক্ত একটা ধনুকের ছিলার ফেটি ঝুলিয়ে নিয়েছিল। আর প্রতি তূণীরে পঞ্চাশটি তীরসহ তিনটি চামড়ার তৃণিরও কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছিল।
ওদেরকে দম নিতে কয়েকমিনিট সময় দেওয়ার পর জারাসকে দেখালাম। নদীর অপর তীরের কোনো জায়গায় সে অবস্থান নেবে। ওরা চলে যেতেই নদীর উঁচু পার থেকে আমি লক্ষ্য করলাম ওরা উঁচু পাড় থেকে দুইশো গজ নিচে নেমে হেঁটে নদী পার হল।
অপর তীরে উঠার আগে ওরা প্রত্যেকে মুখে আর হাতে নদীর কালো মাটি লেপে নিল। সবশেষে জারাস আর তার বিশ্বস্ত সহকারী আকেমি পার বেয়ে তীরে উঠলো।
নদীর অপর তীরের রাস্তায় পৌঁছার পর জারাস তার লোকদেরকে রাস্তার দুই পাশে বিশ কদম পর পর ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে রাখলো। মুখে লেপা কালো মাটির মুখোশের কারণে ঘন লতাপাতার জঙ্গলে কাছ থেকেও ওদেরকে দেখা যাবে না। হাইকসোদেরকে অত্যন্ত সুদক্ষ এই দুই সারি তীরন্দাজের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
জারাসের লোকজন রাস্তার দুপাশের জঙ্গলে অবস্থান নেবার পর আমি দ্রুত আমার রথিসেনাদের কাছে ফিরে গেলাম।
সবাই ঠিকমতো লুকিয়েছে নিশ্চিত হবার পর আমি রথের সারির একটু পেছনে একটা উঁচু গাছ বেছে নিয়ে তার উপরের একটি ডালে চড়ে বসলাম। এখান থেকে নদীর দুই তীরের রাস্তা পরিষ্কার দেখা গেল। এমনকি এই উচ্চতা থেকেও জারাসের লোকদের কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেল না।
সমস্ত প্রস্তুতি সুচারু রুপে সম্পন্ন হওয়ার পর আমি দূরে সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার নৌবহরও অন্তরীপের পেছনে অদৃশ্য হয়েছে। এবার হাইকসো হামলাকারীদের মোকাবেলা করার জন্য আমি প্রস্তুত।
অনেকক্ষণ গাছের ডালে বসে অপেক্ষা করে সূর্যের অবস্থান লক্ষ্য করে বুঝলাম প্রায় এক ঘন্টা পার হয়েছে। তারপর আমার দৃষ্টিসীমার কিনারায় জারাস যেখান তীরন্দাজদের নিয়ে অপেক্ষা করছে সেখান থেকে বেশ দূরে জঙ্গলের উপরে হালকা ধূলি উড়ছে লক্ষ্য করলাম।
ধূলির মেঘটি ধীরে ধীরে কাছে আসতেই আরও স্পষ্ট হলো। তারপর হঠাৎ ধূলির মেঘের নিচে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে পালিশ করা ধাতব কোনো কিছু চকচক করে উঠলো। সম্ভবত কোনো শিরস্ত্রাণ কিংবা তরবারির ফলা।
একটু পরই আমি দূরে রাস্তার বাঁকে প্রথম রথজোড়া দেখতে পেলাম। নিঃসন্দেহে ওরা হাইকসো। উঁচু রথের গাড়ি আর প্রান্তে চাকু লাগানো জবরজং ধরনের চাকাগুলো দেখে পরিষ্কার বুঝা গেল এরা হাইকসো।
জারাস রাস্তার যে জায়গায় তার তীরন্দাজদের নিয়ে অপেক্ষা করছিল; হাইকসো রথের সারি সেখানে পৌঁছল। সামনের দিকে হাইকসো রথীসেনাদলের প্রধান নদীর অগভীর অংশের কাছে পৌঁছতেই দাস্তানাপরা মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে পেছনের রথগুলোকে থামার নির্দেশ দিল।
তারপর হাইকসো সেনানায়ক সতর্কভাবে নিচে নদীর তলদেশ আর আমাদের দিকের এলাকা পর্যবেক্ষণ করলো। এতোদূর থেকে তাকিয়েও আমি বুঝতে পারলাম সে একজন শৌখিন ফুলবাবু। তার আলখাল্লাটি নীল রংয়ের। গলায় তিনচারটে চকচকে হার ঝুলছে। পালিশ করা ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণের মুখের অংশটি সুন্দর কারুকাজ করা রূপার। জিনিসটা দেখে আমার খুব লোভ হল।
