সকালে এই পোতাশ্রয়টি পার হওয়ার সময় আমি হলুদ বালুর একটি সঙ্কীর্ণ বেলাভূমি দেখেছিলাম। উত্তরের শেষ মাথায় একটি অন্তরীপের পেছনে বেলাভূমিটির অবস্থান। এখানে সৈকতের বালু বেশ শক্ত ছিল, আমাদের রথগুলো সহজেই এখান দিয়ে এগিয়ে সামনের শক্ত মাটিতে গিয়ে পড়বে।
উপকূল ধরে পেছন দিকে চলে আমি এই প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ের দিকে চললাম। অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওত পেতে থাকার একটি সুন্দর জায়গা। আমার অন্য জাহাজগুলোর কাছাকাছি গিয়ে চিৎকার করে সৈন্যদেরকে নির্দেশ দিলাম। তীরে নামার জন্য যে জায়গাটি আমি বেছে নিয়েছিলাম ওরা আমার জাহাজকে অনুসরণ করে সেই দিকে চললো। দাঁড়িরা গতি বাড়িয়ে আক্রমণের গতিতে বৈঠা বাইতে শুরু করলো। স্বাভাবিক গতিতে দাঁড়িরা কোনো বিশ্রাম না নিয়ে এক নাগাড়ে তিন ঘন্টা পর্যন্ত বৈঠা বাইতে পারে। আর আক্রমণাত্মক গতিতে বৈঠা বাইলে একঘন্টাতেই ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৈঠা বেয়ে আমরা অতি শিঘই সামনেই পোতাশ্রয়টি দেখতে পেলাম।
ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলাম, আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও জায়গাটি আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অনেক উপযুক্ত। সৈকতটি যথেষ্ট চওড়া, একসাথে পাশাপাশি দুটো জাহাজের জায়গা হবে। এর ফলে অতি দ্রুত সৈন্যদেরকে তীরে অবতরণ করাতে পারবো।
এছাড়া আরেকটি সুবিধা এখানে পাওয়া যাবে। দেখলাম যে পথ দিয়ে হাইকসোরা আসবে, সেই পথে নদীর অগভীর অংশটি পার হওয়ার জন্য রথ নিয়ে এখানে ওরা থামতে বাধ্য হবে। পথটির দুইদিকে ঘন ঝোঁপ আর গাছের সারি রয়েছে। এতে পেছনের সারির রথগুলো সামলানো খুব মুশকিল হবে। সামনে এগোতে পারবে না, কেননা নদী পারাপারের এই অংশে সামনের রথগুলো টেনে নেওয়ার কারণে রাস্তাটি বন্ধ থাকবে। দ্রুত পিছিয়ে যেতেও যেতে পারবে না, কেননা রাস্তাটি খুব সঙ্কীর্ণ হওয়ায় রথগুলো হাতে ঠেলে বা টেনে পেছন দিকে নেওয়া সম্ভবপর নয়। এখন আমি যদি রাস্তার দুই পাশে ঝোঁপের আড়ালে আমার তিরন্দাজদের লুকিয়ে রাখতে পারি, তবে ওরা খুব কাছ থেকে আটকে পড়া রথগুলোর উপর তীর ছুঁড়তে পারবে।
তীরের দিকে এগোতেই আমি হুইকে ইশারা করলাম তার জাহাজটি আমার পাশে আনতে। কাছাকাছি আসতেই চিৎকার করে বিষয়টি বুঝিয়ে নির্দেশ দিলাম। আমি কী চাচ্ছি সে সাথে সাথে তা বুঝতে পারলো। অন্তরীপের পেছনে পৌঁছতেই আমরা একসাথে জাহাজের পাল গুটিয়ে আর বৈঠা চালিয়ে অর্ধবৃত্তে ঘুরালাম, যাতে জাহাজের পেছনদিকটি সৈকতের দিকে মুখ করে থাকে। এখন রথগুলো জাহাজের পেছনে মাল নামাবার র্যাম্পের দিকে মুখ করে রইল। ঘোড়াগুলো লাগামে ছিল আর রথিসেনারা অস্ত্রশস্ত্র আর বর্মে সজ্জিত হয়ে তৈরি অবস্থায় রথে অবস্থান নিল।
শেষ মুহূর্তে তোরান উপরের ডেক থেকে ছুটে এসে আমার রথে আমার সাথে তীরে যেতে চাইল। আমি তার সাহসের প্রশংসা করলাম, তবে সে যোদ্ধা নয়। তীরে গেলে সে একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া সে ছিল সর্বাধিরাজ মিনোজের সাথে আমার একমাত্র যোগসূত্র। সুতরাং তার কোনো ক্ষতি হোক কিংবা সে মারা যাক এই যুদ্ধে তা আমার কাম্য নয়।
তার আবদার প্রত্যাখ্যান করে আমি বললাম, আপনি বরং জাহাজে থেকে সবকিছু প্রত্যক্ষ করুন যাতে পরবর্তীতে সর্বাধিরাজ মিনোজকে জানাতে পারেন! ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজের পেছনের গলুই ভেজা বালুর সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা লাগতেই তোরান পা ফসকে উল্টে পড়ে গেল। ব্যস এতেই আমার সমস্যার সমাধান হল।
পেছনের র্যাম্পটি সশব্দে নিচের দিকে খুলে যেতেই আমি চিৎকার করে উঠলাম, যাও! যাও! যাও! চাবুক মেরে আমার দলটিকে জাহাজ থেকে ঢালু পথ বেয়ে নিচে নামার পথের দিকে এগিয়ে নিলাম। ঘোড়াগুলো পানি ছিটিয়ে ছুটে চললো। শুকনো বালুতে পৌঁছার সাথে সাথে আমি রথ থেকে লাফিয়ে নেমে কাঁধ দিয়ে ঠেলে রথটিকে শক্ত শুকনো ডাঙায় টেনে উঠাতে সাহায্য করলাম। তারপর আবার লাফ দিয়ে রথে চড়ে হালকা চালে স্থলভূমির দিকে এগোলাম। একটার পর একটা রথ জাহাজ থেকে নেমে আমাকে অনুসরণ করলো।
উপকূলের রাস্তায় পৌঁছার আগে কয়েকটি জীর্ণকুটিরসহ একটি ছোট্ট গ্রামের উপর দিয়ে যেতে হল। আমাদের দেখেই গ্রামবাসীরা ছুটে এলো। বাচ্চাসহ মেয়েরা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল। এদের মধ্যে ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দশজন পুরুষ ছিল। এতে নোংরা আর হতশ্রী লোকগুলোকে মানুষ মনে হচ্ছিল না। তবে এরা হাতে কাঠের মুগর নিয়ে আমাদের প্রতিরোধ করার জন্য দাঁড়িয়েছিল।
না থেমে আমি সুমেরিয় ভাষায় চিৎকার করে তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, নারী আর শিশুদের নিয়ে দৌড়ে জঙ্গলে গিয়ে লুকাও। দক্ষিণদিকের রাস্তা দিয়ে একদল লুটেরা আর ধর্ষক সৈন্য আসছে। দুপুরের আগেই ওরা পৌঁছে যাবে। দৌড়াও! যত শিঘ্রি পার এখান থেকে পালাও। আমি জানতাম একটু দূরে জঙ্গলে গিয়ে ওরা লুকাবার জায়গা পাবে। এছাড়া বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ওরা আমার সাবধান বাণী মেনে বাচ্চাদের নিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। সামান্য যা কিছু সম্বল আছে তা নিয়ে ঘরবাড়ি ফেলে আতঙ্কগ্রস্ত বন্যপশুর মতো জঙ্গলের দিকে ছুটছে। ওদের দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে আমি সামনের রাস্তার দিকে এগিয়ে চললাম।
