পোতাশ্রয় রক্ষার বাঁধ পার হওয়ার সাথে সাথেই আমি দক্ষিণ দিকে জাহাজের মুখ ঘুরালাম। বাকি জাহাজগুলোও আমাকে অনুসরণ করতে শুরু করলো। আমরা তীরের সমান্তরাল চলতে লাগলাম। এটনের পাঠানো সংক্ষিপ্ত তথ্যরে উপর ভিত্তি করে আমি দ্রুত কিছু হিসাব করেছিলাম।
এটনের কথামতো হাইকসো আক্রমণকারীরা নিশ্চয়ই শেমু মাসের পঞ্চম দিন জানাত থেকে রওয়ানা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে সিডন পৌঁছতে ওদের চারশো লিগ দূরত্ব অতিক্রম করার কথা। এতো লম্বা দূরত্বে রথীসেনা আর অন্যান্য মালসহ একটি রথ দিনে বিশ লিগের বেশি দূরত্ব চলতে পারবে না। অবশ্য যদি ঘোড়া অচল না হয়ে পড়ে। ঘোড়াকে বিশ্রাম আর বিচালি দিতে হবে। তাহলে সবমিলিয়ে ওদের প্রায় বিশ দিন লাগর কথা। এটনের গুপ্তচরদের তথ্য অনুযায়ী ষোলদিন হল ওরা পথে রয়েছে। তাহলে ওরা সম্ভবত সামনে কেবল আট লিগ কিংবা এর কাছাকাছি দূরত্বে রয়েছে। সূর্য ডুবতেই আমি জাহাজের নোঙর ফেললাম।
যখন তোরান জানতে চাইলো কেন আমি অন্ধকারে জাহাজ নিয়ে যেতে চাচ্ছি না তখন আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, অন্ধকারে আমি শত্রুদেরকে পার হয়ে যেতে চাই না। আর জাহাজ নোঙর করাতে আমাদের সাক্ষাত হতে খুব বেশি দেরি হবে না। হাইকসো রথগুলো বেশ দ্রুত আমাদের দিকে আসছে। সেক্ষেত্রে আশা করি আগামী কাল দুপুরের দিকে ওদের দেখা পাবো।
এই হিসাব তোরানকে জানাতেই সে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন করলো আমাকে।
ওরা আমাদের পাশাপাশি এলে আমরা কী করে তা বুঝবো? জাহাজের ডেক থেকে তো কেবল মাঝে মাঝে উপকূলের রাস্তা দেখা যাবে।
আমি তাকে বললাম, ধূলা আর ধূঁয়া।
বুঝলাম না।
দুইশো রথ টেনে নিয়ে ছুটতে ছুটতে চলার পথে ঘোড়ার খুর ধূলি উড়িয়ে ধূলার মেঘ সৃষ্টি করবে। সাগরে অনেক দূর থেকে তা দেখা যাবে।
তোরান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আবার প্রশ্ন করলো, আর ধূঁয়া?
হাইকসোদের মর্মস্পর্শী একটি অভ্যাস হল চলার পথে ওর প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। অনেক সময় বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে আটকে রেখে। বুঝতেই পারছেন ওদের এগিয়ে আসাটা জানা যাবে ধূলার মেঘ আর ধূঁয়ার স্তম্ভ থেকে। এজন্যই ওদেরকে আসলেই কেউ ভালোবাসে না।
আমার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী দ্বিতীয় দিন দুপুরের ঘন্টা খানেক পর তীরভূমির কয়েকশো কদম ভেতরে গাছের জঙ্গলের পেছন থেকে ধূঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেল।
আমি মাস্তুলের ডগায় চড়ে সেখান থেকে দেখলাম মাত্র আগুন জ্বালানো হয়েছে। প্রথম ধূঁয়ার কুণ্ডলীর পেছনে আরও তিনটি আলাদা জায়গায় ধূঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে শুরু করলো।
আমি বিড়বিড় করে উঠলাম, গেল আরেকটি গ্রাম আর তার মধ্যেকার সমস্ত জীবিত প্রাণী। আর ঠিক সেই মুহূর্তে দেখলাম দুজন নারী ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে প্রাণভয়ে সাগরের দিকে ছুটে আসছে। এদের মধ্যে একজন একটি ছোট্ট শিশু কোলে নিয়ে ছুটছিল আর মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। তীরের হলুদ বালুর উপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ওরা পানির কিনারায় এসে আমাদের জাহাজ দেখতে পেয়ে হাত দিয়ে বার বার ইশারা করে ডাকতে লাগলো।
এরপর হঠাৎ ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে একটি হাইকসো রথ এদিকে আসতে দেখা গেল। এতে তিনজন লোক ছিল। ওরা সবাই হাইকসো বর্ম আর গোল বাটির মতো আকৃতির ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ পরে ছিল। সাগরের কিনারায় নরম চোরাবালিতে পৌঁছার আগেই রথচালক রাশ টেনে ঘোড়া থামাল। তিনজনই রথ থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটন্ত নারীদের পিছু নিল। আমাদের জাহাজের দিকে ফিরেও তাকাল না। আমরা তীর থেকে অনেক দূরে থাকায় ওরা মোটেই ভীত হয়নি। ওরা কেবল ছুটে পালানো নারীদুটোর দিকে তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করে রেখেছিল। আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি মেয়েগুলোর সাথে যা করার তা করার পর ওরা শিশুটির উপরও বর্বর আচরণ করবে।
তোরান কোয়ার্টারডেক থেকে চিৎকার করে বললো, আপনি কি মেয়েগুলোকে উদ্ধার করবেন না?
আমি উত্তর দিলাম, এখানে নিরাপদে জাহাজ ভেড়াবার কোনো জায়গা নেই। হাইকসো কুকুরগুলো এখন কিছুক্ষণ বাঁচুক, তারপর ওদের দুইশোজনকে কচুকাটা করবো। তারপর কাণ্ডারিকে নির্দেশ দিলাম তীর থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যেতে। তোরান জাহাজের পেছনের রেলিং ধরে তীরের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলো মেয়েগুলোকে ধরার পর হাইকসো রথীসেনারা কীরকম অত্যাচার করছে। দৃশ্যটি দেখে প্রচণ্ড রাগে আর আতঙ্কে সে চিৎকার শুরু করলেও আমি তা উপেক্ষা করলাম।
তীরে কী হচ্ছে তা একবারও আমি ফিরে তাকালাম না। এরকম শত শত দৃশ্য আমি দেখেছি। তার চেয়ে বরং আমার ছোট্ট নৌবহরটি নিয়ে স্থলভূমি থেকে দূরে সরে যাওয়ার দিকে মনোযোগ দিলাম। সাগরে বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর আবার ঘুরে তীরের সমান্তরাল হয়ে যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেই পথেই ফিরে চললাম।
কয়েক ঘন্টা আগে আমরা পাথরবেষ্টিত একটি ছোট পোতাশ্রয় পার হয়ে এসেছিলাম। একটি বড় নদী মূলভূমি থেকে এখানে এসে মিশেছে। এই শুষ্ক মৌসুমে নদীটি শুকিয়ে একটি ক্ষীণ জলধারায় পরিণত হয়েছে। উপকূল দিয়ে যে রাস্তাটি চলে গিয়েছে, তা নদীর অগভীর একটি অংশে এসে আবার অপর পার দিয়ে চলে গেছে। এই অংশটি হেঁটে বা রথ নিয়ে পার হয়ে আবার রাস্তায় উঠা যায়। নদীর এই অংশের দুই তীর বেশ খাড়া পাথুরে। হাইকসোদের রথগুলো রাস্তা দিয়ে এসে এখানে পৌঁছে বেশ কঠিন বাধার সম্মুখিন হবে। তাদেরকে প্রতিটি রথ হাতে ধরে নদীর এই অগভীর অংশ পার হতে হবে। এতে তারা অরক্ষিত হয়ে পড়বে।
