সৌভাগ্যবশত ক্রিটের শাসক আমার প্রতি এই সৌজন্য দেখিয়েছিলেন; নয়তো তোরান আমার এই ছোট্ট সেনাবাহিনীর লড়াই করার ক্ষমতা দেখার সুযোগ পেত না।
জাহাজগুলোর পাটাতনে পরিবর্তনের কাজগুলো শেষ করার সাথে সাথেই ঝড়ের ঋতুও শেষ হল। দেবতাদের কৃপায় আমরা সুন্দর আবহাওয়া আর মোটামুটি শান্ত সাগর পেলাম। তবে ক্রিট যাত্রার আগে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম জাহাজের কাঠামোতে যে পরিবর্তন করা হয়েছে তা সাগরে কতটুকু কার্যকর তা একবার পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার। আবার সেই সাথে রথীসেনাদেরও জাহাজের পেছনের ঢালু পথ বা র্যাম্প বেয়ে ঘোড়ায় টানা রথ উঠানামার কাজটি অনুশীলন করাতে পারবো।
পাল তুলে আমরা সাগরে ভাসলাম তারপর উপকূলের বেশ কয়েক জায়গায় তীরে জাহাজ ভেড়াবার মতো উপযুক্ত স্থানে জাহাজ ভেড়াবার পর রথীসেনারা ঘোড়ায় টানা রথগুলো নিয়ে সরাসরি জাহাজ থেকে স্থলভূমিতে নেমে গেল। কিছুক্ষণ স্থলভূমিতে ঘুরে ফিরে আবার রথগুলো জাহাজে উঠল। এরকম কয়েকদিন অনুশীলন করা হল। বার বার অনুশীলন করে সৈন্য আর ঘোড়াগুলোকে এই কৌশলী পরিচালনায় দক্ষ করে তোলা হল। পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবার পর আমরা আবার সিডনে ফিরে এলাম।
ক্রিট যাত্রার দুই দিন আগে শেষবারের মতো কাজের অগ্রগতি দেখতে জারাস আর হুইকে সাথে নিয়ে আমি ভোরবেলা শিবির থেকে জাহাজঘাটার দিকে হেঁটে রওয়ানা দিলাম। পথে এক চক্ষু একজন ভিখারি গায়ে পড়ে আমার সাথে আলাপ করতে এলো। আমি তাকে এড়িয়ে জারাস আর হুইয়ের সাথে কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু নোংরা লোকটি নাছোড়বান্দা হয়ে আমার জামার হাতা খামচে ধরলো। আমি ঘুরে তাকে আঘাত করার জন্য হাতের লাঠি তুললাম। কিন্তু সে মোটেই ভয় পেলো না, বরং দাঁত বের হেসে বললো, প্রভু এটন আপনাকে এক দান বাও খেলার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কথাটি শুনে আমি হাতের লাঠি নামিয়ে আমি হা করে তার দিকে তাকালাম। এই কথাটি দাঁতহীন, নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত এমন একটি লোকের কাছ থেকে আসাটা এমন অসঙ্গতিপূর্ণ যে আমি হঠাৎ চমকে উঠলাম। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই লোকটি একফাঁকে আমার হাতে একটি প্যাপিরাসের টুকরা গুঁজে দিয়েই পেছনের গলি দিয়ে লোকের ভীড়ে মিশে গেল। জারাস তার পিছু নিতে উদ্যত হতেই আমি তাকে থামিয়ে বললাম, যেতে দাও জারাস। সে একজন বন্ধুর বন্ধু।
জারাস থেমে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি নিশ্চিত তো সে আপনার পকেট মারে নি? আপনি বললে আমি লোকটিকে ধরে দু-এক ঘা লাগিয়ে সত্য কথাটা তার মুখ থেকে বের করতে পারি।
আমি তাকে বললাম, যা বলছি তাই করো! তাকে যেতে দাও! এখানে ফিরে এসো!
আমি তাড়াতাড়ি তাঁবুতে ফিরে গিয়ে প্যাপিরাসটা খুলে একবার চোখ বুলাতেই বুঝলাম এটা এটনেরই পাঠানো একটি বার্তা। দাম্ভিকতা পূর্ণ চরিত্রের মতো তার হাতের লেখাও দেখলে আমার ভুল হয়না।
দেয়ালের গর্তে থাকা আহত বাজপাখির নতুন দ্বীপের বাসায় উড়াল দিয়ে চলে যাওয়া বাধা দিয়ে থামাতে শকুন পূর্বদিকে জানাত থেকে প্যাঁচন মাসের পঞ্চম দিনে দুইশো শেয়াল পাঠিয়েছে।
বার্তার বিষয়বস্তুও স্পষ্ট লেখকের পরিচিতি নিশ্চিত করেছে। আমাদের নিজস্ব গোপন সংকেতে এটন আর আমি গোরাবের নাম দিয়েছিলাম শকুন। দুইশো শেয়ালের অর্থ দুইশো হাইকসো রথীসেনা। জানাত হচ্ছে উত্তর মিসর আর সিনাইয়ের মাঝের সীমান্ত শহর নিল্লোর। দেয়ালের গর্ত হল সিডন। নতুন দ্বীপ হচ্ছে ক্রিট। আর অবশ্যই আহত বাজপাখি হচ্ছে আমার ব্যক্তিগত সংকেতলিপি।
সরল ভাষায় বলা যায়, এটন আমাকে সাবধান করে জানাচ্ছে যে, ষোল দিন আগে গোরাব নেল্লোর থেকে সিডন পর্যন্ত উপকূল ঘেঁষে চলে যাওয়া পথ দিয়ে দুইশো রথীসেনার একটি দল পাঠিয়েছে। এদের উদ্দেশ্য আমার ক্রিট যাত্রা থামানো।
এটা খুব একটা অবার হবার বিষয় নয় যে, গোরাব আমার পরিকল্পনা জেনেছে। থিবস থেকে ব্যবিলন হয়ে এখন এই সিডন পর্যন্ত সফরের এই বিশাল কাফেলায় কেউ না কেউ বেফাঁস মুখ খুলেছে কিংবা অন্য কারও কান খুব খাড়া ছিল। দীর্ঘ দিনের এই সফরে সহজেই এই খবর মেমফিসে গোরাবের কানে গিয়ে পৌঁছেছে আর সেও যথারীতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। চলার পথে আমার পরিচয় গোপন রাখার যতদূর সম্ভব চেষ্টা সত্বেও গোরাব জেনে ফেলেছে এই মিশন আমার অধীন হচ্ছে। আমার সুখ্যাতি আমার আগে আগে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সে নিশ্চয়ই এটিও জানে যে আমি একজন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
এটন কীভাবে এই খবর জেনেছে আর তার সত্যতাও বা কতটুকু আর কীভাবে সে এখবর আমার কাছে পাঠিয়েছে তা ভেবে আমি এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। আমার মতো এটনেরও অনেক পথ জানা আছে। আবার আমার মতো সেও কোনো ভুল করে না।
তাঁবুর ভেতর থেকে মাথা বের করে চিৎকার করে জারাসকে ডাকলাম। সে কাছেই ছিল, হুইকে সাথে নিয়ে সে প্রায় সাথে সাথে হাজির হল।
তাকে বললাম, লোকজনসহ রথগুলো নিয়ে এখুনি জাহাজে চড়। আমি দুপুরের আগেই রওয়ানা দিতে চাই।
হুই জিজ্ঞেস করলো, এবার কোন দিকে? নতুন কোন অনুশীলন?
জারাস তার দিকে ফিরে রাগতো স্বরে বললো, বোকার মতো প্রশ্ন করোনা। তায়তা যা নির্দেশ দিচ্ছেন তা করো, খুব তাড়াতাড়ি।
.
দুপুরের একটু আগে নৌ-বহর নিয়ে আমরা সিডন বন্দর ত্যাগ করলাম। আমার আমন্ত্রণে তোরান আমার জাহাজে উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি এই জাহাজটির নাম দিয়েছিলাম নির্মম। জাহাজটি প্রথমে চোখে পড়তেই এটিই ছিল আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।
