সিডন বন্দর উপকূলের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী এবং অন্যতম ব্যস্ত বন্দর নগর। বন্দরে প্রচুর জাহাজ ভীড় করে রয়েছে। এমনকি দূরেও বড় বড় জাহাজের পালে ক্রিটের দুই মাথাওয়ালা কুঠারের প্রতীক দেখা যাচ্ছে। এই জাহাজ বহর নিয়েই তোরান ক্রিট থেকে এখানে এসেছে। সে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার জাহাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য আগেই চলে গিয়েছিল। আমাদের ক্রিটে পৌঁছার সংবাদ সর্বাধিরাজ মিনোজকে জানাবার জন্য সে জাহাজ নিয়ে আগেই চলে গিয়েছিল।
বন্দরের পাথরের দেয়ালের বাইরে অর্ধ লিগ দূরত্বে রাস্তার পাশে একটি খোলা জায়গা আমি বেছে নিলাম। রানা পর্বতের ঢাল বেয়ে নেমে আসা একটি নদীর পানি আমাদেরকে যথেষ্ট পানি যোগাবে। আমি জারাসকে এখানে তাঁবু গাড়তে নির্দেশ দিলাম। তাঁবু গাড়ার আগেই নগরী থেকে একটি প্রতিনিধি দল আমাদের দিকে এগিয়ে এলো।
দলটির নেতৃত্বে ছিল আলখাল্লা পরা একজন উচ্চপদস্থ সুমেরিয় রাজকর্মকর্তা। ঘোড়ায় চড়ে আমার কাছে এসে সে ঘোড়া থেকে নামলো।
সম্মান জানাবার প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত বুকের কাছে চেপে ধরে বললো, আমি সিডন প্রদেশের শাসনকর্তা নারাম সিন। আমি জানি আপনি প্রভু তায়তা। আপনার সুনাম ইতোমধ্যেই সারা সুমেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমার প্রতি রাজা নিমরদের কঠোর নির্দেশ রয়েছে আপনাকে যথাযথ সম্মান জানাতে এবং আপনার প্রতিটি নির্দেশ সাথে সাথে পালন করার। আমি এখানে এসেছি নিশ্চিত করতে যাতে আপনার এবং রাজপরিবারের মহিলাদের প্রতি সঠিক যত্ন নেওয়া হয়।
আপনার আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। আমার প্রথম অনুরোধ হল গবাদি পশুর শুকনো খাদ্য, বিচালি যোগানো।
নারাম সিন ঘুরে তার অধীনস্থদের প্রতি যথারীতি নির্দেশ দিল। ওরা চলে যাবার পর গভর্নর আমার দিকে ফিরে বললো, আপনার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন থাকলে অনুগ্রহ করে বলুন প্রভু তায়তা।
দয়া করে আমাকে জাহাজ নির্মাণের জায়গায় নিয়ে চলুন, যেখানে আমার নৌবহরের মেরামত কাজ চলছে। মেরামত কাজগুলো দেখার জন্য আমি অধীর হয়ে আছি।
.
যে ছয়টি যুদ্ধ জাহাজ নিমরদের কাছ থেকে কিনেছিলাম, প্রথমদৃষ্টিতে সেগুলো দেখে আমি হতাশ হলাম। জাহাজগুলো নির্মাণ কাঠামোর উপর দাঁড় করানো থাকায় জাহাজের যে অংশ পানির নিচে থাকে তা পরীক্ষা করতে পারলাম। আসলে আমি এগুলোর সাথে তামিয়াত দুর্গ থেকে নিয়ে আসা বিশাল মিনোয়ান তিনদাঁড়ি যুদ্ধ জাহাজের তুলনা করে ভুল করেছিলাম। এই
সুমেরিয় জাহাজগুলো আকারে মিনোয়ান জাহাজের অর্ধেক আর এগুলোর নকশা দেখে বুঝতে পারলাম তেমন দ্রুতগামিও নয়।
মন থেকে সমস্ত অলীক ধারণা ঝেড়ে ফেলে হাতে যা আছে তা থেকে ভালো কিছু করার দিকে মনোযোগ দিলাম।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ দিনের বেশিরভাগ সময় জারাস আর জাহাজ মেরামতকারীদের সাথে কারখানায় কাটালাম। ওরা আপ্রাণ চেষ্টা করছিল ভালো কিছু করতে, কিন্তু আমি তাতে সন্তুষ্ট হচ্ছিলাম না। আমি বার বার নিখুঁত কাজের জন্য তাগাদা দিতে থাকলাম।
প্রতিটি কাঠের তক্তা আর মাস্তুল পরীক্ষা করলাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে পেরেক তুলে দেখলাম জং ধরেছে কিনা। জাহাজের মাথায় লাগানো ব্রোঞ্জের পাত পরীক্ষা করলাম। যে আঠা দিয়ে জাহাজের পাটাতনের মধ্যেকার ফাঁকগুলো বন্ধ করা হয়েছে তাতে তলোয়ারের ডগা বিঁধিয়ে দেখলাম কী ধরনের কাজ করা হয়েছে। সমস্ত পাল খুলে তীরে বিছিয়ে পালের মোটা ক্যানভাস কাপড়টি তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করে দেখলাম কোথাও কোনো ছেঁড়া ফাটা কিংবা দুর্বল জায়গা আছে কি না।
তারপর জাহাজের কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন করার নির্দেশ দিলাম। ব্যবিলন থেকে আসার সময় জারাস আর আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ এসব নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আমার আঁকা নকশাগুলো দেখে জাহাজ মেরামতকারী সংস্থার তত্ত্বাবধায়ক কিছু কিছু বিষয়ে আপত্তি তুললেও আমি তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলাম।
আমার উদ্দেশ্য ছিল যখন আমরা মিসরের উত্তর উপকূলে হাইকসো বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণে যাব তখন এই জাহাজগুলো আমাদের স্থলবাহিনীর সাথে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করবে। আগে সংশয় থাকলেও এখন নিশ্চিত হলাম এই জাহাজগুলোতে বহন করে যখনই প্রয়োজন প্রচুর সেনা দ্রুত নীল নদীর বদ্বীপের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা যাবে। তবে রথী-সেনারা তাদের রথ আর ঘোড়া ছাড়া অকার্যকর হয়ে পড়ে।
শেষপর্যন্ত জাহাজ মেরামত কারখানার তত্ত্বাবধায়ক আমার দাবী মেনে নিয়ে জাহাজের পেছন দিক দিয়ে ঢাল বেয়ে মাল উঠা নামার জন্য সিঁড়ির পরিবর্তে ঢালু পথ বা র্যাম্প তৈরি করতে রাজি হল। আর ডেকের দুই পাশের, দাঁড় টানার বেঞ্চির মাঝে পাটাতনটি মজবুত করতে বললাম, যাতে এতে ঘোড়াসহ বারোটি রথ নিয়ে এমনকি তরঙ্গক্ষুব্ধ সাগরেও যাওয়া যায়।
সত্তরটি ঘোড়ায় টানা রথ বহন করে জাহাজগুলো উল্টোদিকে চালিয়ে নিয়ে যে কোনো তীরে ভিড়ানো যাবে আর রথীসেনারা তাদের ঘোড়ায় টানা রথ নিয়ে সরাসরি জাহাজ থেকে নেমে সাথে সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে। আবার উদ্দেশ্য সাধনের পর তাদেরকে আবার একইভাবে তীর থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যাবে।
মেরামত কাজ চলার সময় সর্বাধিরাজ মিনোজের কাছ থেকে তোরানের কাছে নির্দেশ এলো, সে যেন আরও কিছু দিন এখানে থেকে আমাদেরকে সাথে নিয়েই ক্রিটে আসে। মিসরীয় রাজকুমারী আর তাদের প্রতিনিধিদলকে সবচেয়ে বড় ক্রেটান জাহাজে চড়িয়ে নিয়ে আসবে যাতে ওরা সবাই আরামে সাগর পাড়ি দিতে পারেন।
