ডান হাত বাড়িয়ে বেকাথা হুইয়ের দিকে নির্দেশ করে সে বললো, হুই কী মনে করেছে, মঞ্চে সেনাপতি রেমরেমের পেছনে লুকিয়ে সে কী করছে অথচ এদিকে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে বিরান আর হতচ্ছাড়া এক জায়গায় রওয়ানা দিয়েছি। দেখো কী রকম কাপুরুষের মতো ওখানে লুকিয়ে রয়েছে!
লক্সিয়াস বেকাথাকে মনে করিয়ে দিল, তুমিতো বলেছিলে হুইকে আর কখনও দেখতে চাও না।
বেকাথা তার দিকে ফিরে বললো, তুমি এখানে নাক গলাতে এসো না। নইলে কিন্তু খুব পস্তাবে!
এবার তেহুতি লক্সিয়াসের সাহায্যে এগিয়ে এসে বললো, লক্সিয়াস ঠিকই বলেছে। তুমি নিজে বলেছো তুমি হুইকে ঘৃণা করো।
আমি কখনও একথা বলিনি। কখনও ঘৃণা শব্দটা ব্যবহার করিনি।
এবার দুজনেই একসাথে বলে উঠলো, হ্যাঁ তুমি বলেছো। আর তেহুতি আরেকটু এগিয়ে বললো, তুমি একথাও বলেছিলে যে তার মাথা কেটে ফেলবে।
রাগে বেকাথার চোখে পানি এসে গেল। সে বললো, আমি কখনও মাথা কেটে ফেলার কথা বলিনি। আমি শাস্তি দেবার কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম তাকে আমি শাস্তি দেবো।
মঞ্চে যারা পেছনদিকে ছিল, তারা সামনের দিকে যারা একটু আধটু মিসরী ভাষা জানে এমন লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলো, সে কী বলছে?
মেয়েটি বলেছে সে কোনো একজনের মাথা কেটে ফেলবে। একথা শুনে ভীড়ের মধ্যে ছোট ছোট বাচ্চারা আবদার শুরু করলো তাদেরকে বাবামার কাঁধে উঠাতে যাতে ওরা ভালোভাবে মাথা কাটার দৃশ্যটা দেখতে পারে।
এবার আমিও ওদের কথার মাঝে ঢুকে সতর্কভাবে বললাম, আমিও শুনেছি, তুমি বলেছিলে, হুই একজন গেঁয়ো ভূত আর বর্বর লোক।
আমি শুধু বলেছিলাম আমার দিকে তাকিয়ে তার হাসা উচিত হয়নি।
তাহলে তুমি মনে করো সে দেখতে বিশ্রী নয়?
এবার সে চোখ নামিয়ে নিচু কণ্ঠে বললো, এটা সত্যি না। আসলে সে একজন মজার ধরনের সুন্দর মানুষ।
আর তার পাঁচজন স্ত্রী?
সে আমাকে কথা দিয়েছে সে ওদেরকে বাড়িতে ওদের মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেবে।
আমি চোখ পিটপিট করলাম। তাহলে ব্যাপার অনেকদূর এগিয়েছে। তারপর বললাম, তাহলে এটা ভালোই হয় তাকে আমরা এখানে ব্যবিলনে রেখে যাই কিংবা তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা মতো তার মাথা কেটে ফেল।
এমন ভয়ানক কথা বলো না তাতা। ঠিক বলছো তো, তুমি কি তাহলে চাও হুই আমাদের সাথে ক্রিট চলুক?
সে হেসে ঘাড় কাত করলো। রেকাবে পা রেখে দাঁড়িয়ে আমি সবার মাথার উপর দিয়ে চিৎকার করে বললাম, হুই! তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে কুঁচকাওয়াজের জন্য সারিতে দাঁড়াও। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবো না। সূর্যাস্তের আগে পল্টনে যোগদান না করলে তোমাকে বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত দেখাবো।
জুতার গোড়ালি দিয়ে ঘোড়ার পাঁজরের কাছে লাথি দিতেই ঘোড়া চলতে শুরু করলো। চোখের এক কোণ দিয়ে লক্ষ্য করলাম হুই ব্যস্তসমস্ত হয়ে মঞ্চ থেকে দ্রুত নেমে পড়ছে। রেমরেমের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সে তার বাক্সপ্যাটরা আনার জন্য নগরীর ফটকের দিকে ছুটলো।
মনে মনে বেশ খুশি হলাম। একটি কঠিন পরিস্থিতি থেকে মাত্র উতড়েছি। এতে আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভ না হলেও মিসরের শ্রেষ্ঠ রথিকে আবার অধীনে আনতে পেরেছি আর আমার আদরের বেকাথাকে আবার খুশি করেছি।
.
পরবর্তী ছয়টি দিন ইউফ্রেটিস নদীর তীর ধরে উত্তর-পশ্চিমে চলতে লাগলাম। তারপর রেসাফা শহরে পৌঁছে রাজার প্রধান জনপথে পৌঁছলাম। তারপর ঘুরে এই জনপথ ধরে পর্বতের মধ্য দিয়ে উঁই ফুলের শহর আশ-শাম পর্যন্ত গেলাম।
লোহিত সাগর ছেড়ে আসার পর আমরা এক বিশাল বৃত্ত জুড়ে চলছিলাম, যার কারণে একবারও হাইকসো অধিকৃত এলাকার সাতশো লিগের কাছাকাছি হই নি।
জেসমিন শহর থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা সরাসরি পশ্চিমে সিডন বন্দরে পৌঁছলাম। এর অবস্থান ছিল মধ্য সাগরের পূর্ব উপকূলের শেষ প্রান্তে। এই অংশটি ছিল আমাদের সফরের সবচেয়ে চমৎকার আর আনন্দদায়ক অংশ। এপথে আমাদের লেবাননের পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছিল।
জনপথের দুইপাশে প্রকাণ্ড সেডার গাছের সারি। কোনোকালেও এসব গাছে কুঠারের কোপ পড়েনি। উঁচু স্তম্ভের মতো গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন এর উপর আকাশ হেলান দিয়ে রয়েছে, তারপর উপরে দেবতাদের বাড়ির দিকে চলে গেছে। বছরের এই সময়ে মাত্র বরফ পড়তে শুরু করেছে, গাছের উপরের শাখাগুলো শুভ্র তুষারের মালা পরে সেজে রয়েছে আর বাতাসে গাছের আঠার তীব্র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
নিচে উপকূলের দিকে এগোতেই আবহাওয়া উষ্ণ হতে লাগলো, গা থেকে আমরা পশমি পোশাক আর জেসমিন শহর থেকে কেনা ভারী পশমি শাল খুলে ফেললাম। সেডার বন থেকে বের হয়ে আবিষ্কার করলাম সামনে আরেকটি পর্বত দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার পথ প্রদর্শক জানালো এর নাম রানা পর্বত, কেনানি ভাষায় যার অর্থ নিখুঁত সৌন্দর্য। ফোনিশিয় বন্দর টায়ার আর সিডনের মাঝে মধ্য সাগরের উপকূলে এর অবস্থান। বন্দর দুটির মাঝে দূরত্ব প্রায় দুশো লিগ।
এই পর্বতের কাছে এসে বাণিজ্য পথটি দুই দিকে চলে গেছে। আমরা ডানদিকের পথ ধরে রানা পর্বত ঘুরে এই প্রথম সাগরের দেখা পেলাম। দিগন্ত বিস্তৃত বিস্ময়কর ঘন আকাশনীল জলরাশি ছড়িয়ে রয়েছে। এমনকি উঁচু হয়ে থাকা মেঘের পেটও নিচের পানির নীল রঙে প্রতিফলিত হয়ে নীল হয়ে রয়েছে।
