আঁকা ছবিগুলোর উপর ঢেউ খেলানো আলো নেচে নেচে এগুলোকে রোমাঞ্চকর জীবন দান করছে। আমি কয়েকটা চিত্রের সামনে একটু থেমে এই ছবিগুলো যে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে–সেই পবিত্র ও শুদ্ধ দেবতাদের আসল চরিত্রের সাথে এগুলোর দুস্তর ব্যবধানের কথা ভাবলাম। জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে যখন ইনানা আমাকে শূন্যপথে দীর্ঘ ভ্রমণে নিয়ে গিয়েছিলেন তখন আমি জেনেছি মানুষ দেবতাদের সম্পর্কে যা ভাবে তা বেশিরভাগ তাদের মনের অভিলাসী কল্পনা। প্রার্থনা, উৎসর্গ কিংবা ধার্মিক স্বীকারোক্তির মাধ্যমে দেবকূলকে মানুষ তার ইচ্ছার দিকে ফেরাতে পারে বলে যে কথা বলা হয় তা অত্যন্ত হাস্যকর একটি ধারণা। দেবকূল যা ভালো মনে করেন তাই করেন আর তা শুধু নিজেদের ক্ষমতা আর আনন্দের কারণেই করেন।
গুহাসদৃশ কামরাটির সব জায়গা ধীরে ধীরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এগুলোতে ইনানার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম না। দেবীকে প্রলুব্ধ করে এখানে এনে তাকে জিতে নেওয়ার প্রচেষ্টায় রাজা মারদুক এই বিশাল স্বপ্ন সৌধটি গড়ে তুলেছিলেন, তবে আমি জানি দেবী কখনও শিকার হন না; বরং তিনিই শিকারী।
মন্দিরের বাইরের দেয়াল ঘিরে ঘুরে ঘুরে উপরের দিকে উঠে যাওয়া বারান্দায় উঠলাম। এখানেই মাঝে মাঝে তাকে দেখা গিয়েছিল কিন্তু এখানে কিছুই নেই। উপরে সমতল ছাদে উঠে বিশাল ধাতব আয়নাটির পাশে বসলাম। এখান থেকেই দিনের বেলা নিচে গীর্জার মূল অংশে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত করা হয়।
উপরে মধ্যরাতের তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজলাম। কিন্তু সেখানেও তিনি আমার জন্য কিছুই রেখে যান নি। আমার কাছে শুধু তার স্মৃতি আর তিনি যে কথা দিয়েছিলেন আবার ফিরে আসবেন এটিই আছে।
.
নগরীর মূল ফটকের বাইরে রাজা নিমরদ একটি রাজকীয় প্যাভিলিয়ন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পতাকা, ফুল আর পাম পাতাদিয়ে এটি সাজানো হল। যেদিন আমরা সিডনের পথে যাত্রা শুরু করবো সেদিন রাজা এখানে উঁচু মঞ্চে এসে তার স্থান নিলেন।
তাকে ঘিরে দাঁড়াল সুমেরিয় অভিজাত সম্প্রদায়, তার ঊর্ধ্বতন সামরিক নেতৃবৃন্দ এবং নগরীর বিশিষ্ট নাগরিকগণ। সেনাপতি রেমরেম, কর্নেল হুই আর অন্যান্য যেসব মিসরীয় কর্মকর্তাদের এখানে থাকার কথা তারাও মঞ্চে ছিলেন।
মূল দলের আগেই আগের দিন আমি চাকরবাকর, ক্রীতদাস আর অন্যান্য অসামরিক লোকজনদের পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তাদের সাথে মালপত্র বোঝাই চারচাকার গাড়ি, অতিরিক্ত ঘোড়া আর উটগুলোও ছিল। এখন শুধু রয়েছে কর্মকর্তা আর সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
আমাদের সমস্ত রথ, অস্ত্রশস্ত্র আর বর্ম মেরামত করা হয়েছে। পলিশকরা জিনিসগুলো রোদে চকচক করছে। ঘোড়া আর উটগুলোকে দানাপানি খাইয়ে, বিশ্রাম দিয়ে পুষ্ট করে তোলা হয়েছে। জারাসও তার লোকজনের প্রতি লক্ষ্য রেখেছিল যেন তাদের প্রতিও সমান যত্ন নেওয়া হয়। এখন আমাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে পুরোপুরি সজ্জিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি সেনাবাহিনী, যা আমরা আসলেও তাই।
আমাদের দলের অনেকের সাথে স্থানীয় অধিবাসিদের মাঝে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাই এখন এখানে অনেক ক্রন্দনরত নারী দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন আবার পেটে বাচ্চাসহ ফুলো পেট নিয়ে এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে এই মুহূর্তে একটি উত্তেজনাময় এবং নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তোরান ছিল আমার বাম পাশে আর ডান পাশে আমার দুই রাজকুমারী। লক্সিয়াস মিনোয়ান রাষ্ট্রদূতের পেছনে জায়গা করে নিয়েছিল। এতে আমি খুব একটা অবাক কিংবা বিরক্ত হইনি। অমি জানতে পেরেছি সে আর এখন রাজকুমারীদের সাথে একই কামরায় শোয় না। তোরান বাগদাদে আসার পর থেকেই সে নিজের জন্য আলাদা একটি থাকার জায়গা করে নিয়েছে।
দুই পাশে রাষ্ট্রদূত আর রাজকুমারীদের নিয়ে আমি ঘোড়ায় চড়ে এগোলাম। আমাদের ঠিক পেছন পেছন সেনা-পল্টনের বাদকদল শিঙা, বাঁশি আর ঢাক নিয়ে এলো। নগরীর ফটক পার হয়ে রাজকীয় মঞ্চ বরাবার এসে আমরা থামলাম। আমি ঘোড়া থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে উঠলাম।
রাজা নিমরদের সামনে এসে আমি এক হাঁটু গেড়ে বসার সাথে সাথে বাজনা থেমে গেল আর জনতা শ্রদ্ধাভরে নিশ্চুপ হল। রাজা আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে একজন ভাইয়ের মতো আমাকে আলিঙ্গন করলেন। এটা এজন্য করেছেন, কেননা আমি তার রাজ্য আর সেনাবাহিনী পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। এছাড়া তাকে আমি একজন ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত করেছি আর তার পিতা রাজা মারদুক যে সম্পদ তছনছ করেছিলেন তার কিছু অংশ পুনস্থাপন করেছি।
আমরা চিরকাল বন্ধুত্বের শপথ নিলাম, আমার পক্ষ থেকে যা ছিল অকৃত্রিম। তারপর আমি বিদায় নিলাম।
ঘোড়ার পিঠে চড়ার পর ডান হাত তুলে আমি যাত্রা শুরু করার ইঙ্গিত করতেই বাদকদল সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রারম্ভিক সুর বাজাতে শুরু করলো।
এমন এক মুহূর্তে আমার বাম পাশ থেকে একটি আদুরে গলা এমনভাবে চিৎকার করে উঠলো যা নগরীর বিশাল দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
রাজকুমারী বেকাথা চিৎকার করে উঠলো, থামো! সাথে সাথে বাদকদল তাদের বাজনা আর তার সাথে জনতার হৈহুল্লোরও অস্বস্তিকরভাবে থেমে গেল। আমিসহ সবাই তার দিকে ঘুরে তাকালাম।
শান্ত কণ্ঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে, বাছা? লক্ষ্য করলাম তার সেই পুরোনো বিখ্যাত বদমেজাজে ফেরার উপক্রম করছে। সম্ভবত তার এই মেজাজ হারিয়ে ফেলার পেছনে আমিও কিছুটা দায়ী। অতীতে বেশি বেশি আদর দিয়ে আমি তার এই অবস্থার সৃষ্টি করেছি।
