আমি ভাবলাম এবার রাজকুমারীদেরকে পরিচয় করিয়ে দেবার উপযুক্ত সময় এসেছে। পরদিন সন্ধ্যায় তাকে আমাদের সাথে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালাম।
মদ এবং খাবারের বিভিন্ন পদগুলো বাছাই প্রক্রিয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে তত্ত্বাবধান করলাম। খাবারের তালিকাটি ক্রিটের সাথে সম্পাদিত সন্ধিচুক্তিটির মতো দীর্ঘ ছিল। তারপর সারা বিকেল আমার দুই রাজকুমারীর অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার প্রস্তুতি নিয়ে কাটালাম। তোরানকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে হবে যাতে সে কুনুসসের রাজপ্রাসাদে রাজকুমারীদের রূপগুণ সম্পর্কে ইতিবাচক বর্ণনা পাঠায় আর এই বিষয়টি আমার জন্য না হলেও মিসরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অত্যন্ত সর্তকতার সাথে থিবস থেকে আনা পোশাকের বিশাল সম্ভার থেকে এমন কাপড় আর রং বাছাই করা হল যা রাজকুমারীদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলে। বেকাথার জন্য গোলাপি আর তেহুতির জন্য সবুজ রং বাছাই করা হল।
যে দুই সৌন্দর্যবিশারদ তাদের রূপসজ্জা করছিল, আমি তাদের পাশে বসলাম। আমি চাচ্ছিলাম রূপসজ্জায় যেন কোনো খুঁত না থাকে। সমস্ত প্রচেষ্টার পর যখন আমি সন্তুষ্ট হলাম, তখন ওদের প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে ফলাফল সত্যি চমৎকার হয়েছিল। আমার মেয়েদের চেয়ে বেশি সুন্দর কেবল দেবী ইনানার চেহারাই সেদিন সন্ধ্যায় দেখেছিলাম। আমি জানি তোরান আর ক্রিটে তার প্রভু আমার দুই রাজকুমারীর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারবে না।
সেদিন সন্ধ্যায় নৈশ ভোজের জন্য সুন্দর করে সাজানো টেবিলে তোরান আর অন্যান্য অতিথিরা বসার পর তাদের মদ পরিবেশন করা হল। তারপর আমি দুই রাজকুমারীকে কামরায় প্রবেশ করার সঙ্কেত দিলাম।
বড় দরজা দিয়ে ওরা পাশাপাশি প্রায় ভাসতে ভাসতে ভেতর ঢুকতেই ভোজকক্ষে একটি গভীর নীরবতা নেমে এলো। ওরা ঢোকার সাথে সাথে পুরুষেরা মুগ্ধ হয়ে গেল আর মেয়েরা ঈর্ষান্বিত হল।
রাজকুমারীরা তোরানের সামনে এসে উভয়েই মার্জিতভাবে অভিবাদন করলো।
ওদের পেছন পেছন লক্সিয়াসও এসে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলো। অবশ্য এই ক্রেটান মেয়েটির সাজসজ্জার দিকে আমি তেমন মেনোযোগ দেইনি। সে বরং একটি সাধারণ হাঁটু বের করা বেশ খাটো মেটে রংয়ের পোশাক পরেছিল। তার মুখ আর হাঁটুও অবশ্য দেখতে বেশ সুন্দর, তবে তেমন অসাধারণ কিছু নয়। সে নিজেই তার রূপসজ্জা আর চুলের পরিচর্যা করেছে। সে অবশ্যই একজন পরিচারিকা আর এটা তার সৌভাগ্য যে ভোজে তাকেও আমি যোগদান করার অনুমতি দিয়েছিলাম।
এতোগুলো সুন্দরী মেয়ের আগমনে তোরানের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা দেখার জন্য আমি এক পাশে তাকালাম। লক্ষ্য করলাম আমার দুই রাজকুমারীর মাথার উপর দিয়ে পেছনে তাকিয়ে সে মৃদু হাসছে। সাথে সাথে আমি সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম লক্সিয়াস তার দিকে তাকিয়ে সলজ্জ হাসি দিচ্ছে। এবার আমি বুঝতে পারলাম এর আগে কেন সে রেমরেমের প্রশংসা করেছিল, বুঝা গেল বয়ষ্ক পুরুষের প্রতি মেয়েটির ঝোঁক রয়েছে।
সাথে সাথে তোরানের প্রতি আমার মতের বদল হল। সাহিত্যে উন্নত রুচিসহ আচরণে মধুর ও বিনয়ী এবং সেইসাথে পাণ্ডিত্যপূর্ণ একজন কূটনীতিবিদ হলেও মেয়েদের ব্যাপারে ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা তার নেই।
আমি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাদেরকে তোরানের দুইপাশের আসনে বসার জন্য ইশারা করলাম। তাদের প্রতি আমার নির্দেশ ছিল মিনোয়ান ভাষায় তাদের দক্ষতা দেখিয়ে তোরানকে চমকে দিতে হবে। তারপর হলের শেষ মাথায় তার সমবয়সী আমার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বসার জন্য লক্সিয়াসকে ইশারা করলাম।
.
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ তোরান, সেনাপতি রেমরেম আর ঊর্ধ্বতন সুমেরিয় সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে আমি রাজা গোরাবের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা আর অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় কাটালাম। ব্যস্ত দিনগুলো দ্রুত উড়ে যেতে লাগলো আর মনে হলো আর কখনও হয়তো আমি একমুহূর্তও অবসর পাবো না।
ব্যবিলন থেকে কাফেলা সিডনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবার দুদিন আগে শেষ বারের মতো একবার ইশতার দেবীর মন্দিরে যাবার ইচ্ছা হল। আমার মনে খুব আশা ছিল হয়তো মন্দিরে ইনানার কোনো ধরনের চিহ্ন, তার কাছ থেকে কোনো গুপ্ত বার্তা আর নয়তো তার সেখানে উপস্থিতির কোনো দুর্বোধ্য চিহ্ন হলেও পেয়ে যেতে পারি।
ওনিস নামে সবুজ আলখাল্লা পরা দেবীর একজন পুরোহিতের সাথে বন্দোবস্ত করলাম যেন সমস্ত পূজারিরা মন্দির ছেড়ে চলে যাবার পর যখন মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন যেন আমি সেখানে ঢুকতে পারি। ইনানার মতোই ধূসর একটি মাথা ঢাকা আলখাল্লা পরে একাকী সেখানে গেলাম। ছোট পকেট দ্বারের কাছে পৌঁছে দেখলাম ওনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
তার হাতে একটি রূপার মেম মুদ্রা গুঁজে দিয়ে আমি বললাম, আমি একাই যেতে চাই। সে একটু পিছিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে সম্মান জানিয়ে গীর্জার মূল অংশের ছায়ার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছাদের উপরের বিশাল সূর্য-আয়নার প্রতিফলিত আলো না থাকায় মন্দিরটি একটি অন্ধকার ভূতুড়ে জায়গায় পরিণত হয়েছে। সবুজ আলখাল্লা পরা কয়েকজন পুরোহিত আর যাজিকা ছাড়া আর কেউ নেই। ছোট ছোট যে কামরাগুলোতে মেয়েরা দেবীর উদ্দেশ্যে বাধ্যতামূলক সেবা দেবার জন্য অপেক্ষা করতো সেগুলো সব শূন্য। কয়েকটি জমকালো ফ্রেস্কোর সামনে তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করা রয়েছে।
