কিন্তু জাগতিক কোনো বাধা গ্রাহ্য করার ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন জালি হোরা। তিনি থামলেন না, সরাসরি ছুটে এলেন বেয়নেটের তীক্ষ্ণ ডগা লক্ষ্য করে। আলখেল্লা ভেদ করে ঘ্যাঁচ করে শরীরের ভেতরে ঢুকে গেল ধারাল ফলাটা, পিঠ দিয়ে বের হলো শিরদাঁড়ার পাশে। বিদ্ধ হবার পর মোচড় খাচ্ছে শরীরটা, কাতর আওয়াজ বেরিয়ে আসছে গলা থেকে।
টান দিয়ে বেয়নেটটা বের করতে চাইছেন কর্নেল, কিন্তু পারছেন না। যতই জোর খাটাচ্ছেন ততই দোমড়ানো-মোচড়ানো পুতুলের মতো নাচানাচি করছেন জালি হোরা, হাত ছুঁড়ছেন চারদিকে, পা ছুঁড়ছেন বাতাসে। বেয়নেট মুক্ত করার একটাই উপায় আছে এখন। রেট-অব-ফায়ার-সিরেক্টর ঠেলে দিয়ে সিঙ্গেল শটে নিয়ে এলেন কর্নেল, একটা মাত্র গুলি করলেন।
বেয়নেট মুক্ত হলো, মেঝেতে চলে পড়লেন জালি হোরা। পরমুহূর্তে সন্ন্যাসী আর পুরোহিতরা আক্ষরিক অর্থেই যেনো উন্মাদ হয়ে গেল। একযোগে ছুটে এলেন তারা, সশস্ত্র ট্রুপারদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কেউ কেউ কালি হাতে আঁকড়ে ধরলেন বেয়নেট।
যেখানে বহু লোক ধস্তাধস্তি করছে সেখানে গুলি করা সম্ভব নয়। কাজেই প্রথমে বেয়নেট চার্জ শুরু হলো। নিরস্ত্র প্রতিপক্ষ বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। গুরুত্বর জখম নিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে অনেকে, কেউ কেউ ভিড় ঠেলে সামনে এগুতে পারছে না, বাকি সবাই দলবদ্ধভাবে হামলা করার জন্য অপেক্ষা করছে। এ সুযোগে ট্রপাররা কোমরের কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার শুরু করলো। আঠাশ রাউন্ডের ম্যাগাজিন, একটা শেষ হলে আরেকটা লোট করা হচ্ছে।
পিলার বা ফলকটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে, সেটার পেছনে লুকিয়ে আছেন নাহুত। চোখ দুটো বন্ধ করে রেখেছেন, ভাবছেন এ সব আমার না দেখাই ভালো, শুধু শুধু রাতের ঘুম নষ্ট হবে।
সীজ ফায়ার! এক সময় নির্দেশ দিলেন কর্নেল নগু। প্রতিপক্ষের একজনও বেঁচে নেই। কার্গো তোলো। ফরওয়ার্ড মার্চ! রক্তাক্ত মেঝে আর লাশের মাঝখান দিয়ে পথ করে নিয়ে আবার এগুলো ট্রুপাররা।
আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে নাহুত। মাথার উপরের হেলিকপ্টারের শব্দ এ জন্যই পেল না।
*
ইথিওপিয়ায়, নিজ বাসভবন কোয়েনসেন হাট-এর সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হের ফন শিলার। এক পা পেছনে উতে কেম্পার। জেট রেঞ্জারের পাইলট আগেই ফোন করে জানিয়েছে গুপ্তধনের আগমনের কথা। কাজেই সবাই তৈরি, কি আছে দেখার জন্য।
একরাশ ধূলো উড়িয়ে নিচে নামলো কপ্টার। থামবার সাথে সাথেই হেলম্ লোক লাগিয়ে দিল, নাইলনের দড়ি আলগা করে বাক্স খুললো ওরা। ভিতরে নিয়ে যেতে লাগলো ওগুলো।
কনফারেন্স রুমের মাঝখানের লম্বা টেবিলটা একপাশে ঠেলে সরিয়ে জায়গা করা হয়েছে। প্রথমে, অতি সতর্কতার সাথে রাখা হলো থামগুলো, এরপর লর্ড ট্যানাস, মিশরের সাহসী সিংহের কফিন।
হাতের ইশারায় নিজের লোকদের চলে যেতে বলে, ফন শিলারের দিকে চাইলো হেলম্। একপাশে উতেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি।
খুলবো? শিলারের মুখ দেখতে দেখতে নরম স্বরে জানতে চায় হেলম্।
সাবধানে, কর্কশস্বরে বললেন শিলার। কোনোক্ষতি যেনো না হয়।
কপালে একস্তর ঘাম জমা হয়েছে। পাশে দাঁড়ানো উতের দিকে কোনো মনোযোগ নেই শিলারের, একদৃষ্টে দেখছেন সব ট্রেজার। একটা ছুরি দিয়ে সমস্ত দড়িদড়া কেটে ফেলতে লাগলো হেলম্। ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের বেগ বাড়ছে ফন শিলারের। যেনো ফুসফুসের রোগী–ঘরঘর করছে বুকের ভেতর।
হ্যাঁ, ফিসফিস করে বললেন তিনি। ওমন করে, আস্তে আস্তে।
তাঁর মুখ পরখ করলো উতে কেম্পার। সবসময় নতুন কোনো সংগ্রহ এলে এমনটিই করতে দেখছে সে শিলারকে। মনে হয় যেনো, হার্টের রোগী–এখনি মারা যাবেন।
থামের উপরে প্রান্তের কাপড়টা সরিয়ে দিল হেলম্। ধূলো উড়ে এসে পড়লো শিলারের ঘামচর্চিত কপালে। খাকি বুশ জ্যাকেটের সামনেটা ভিজে গেল ধূলোমিশ্রিত ঘর্মস্রোতে। খোদাই করা হায়াগ্লিফিকে চোখ পরতে নরমস্বরে গুঙিয়ে উঠে শিলার। ওদিকে উতে নিজের ভিতরেই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা টের পাচ্ছে। এমন আবেগঘন সময়ে কী করে শিলার জানা আছে তার।
এ দিকে দেখুন–হের ফন শিলার, নাহুত বলে। ডানা ভাঙা বাজপাখির একটা প্রতাঁকের উপর হাত বোলায় সে। এটা হলো দাস টাইটার স্বাক্ষর।
আসল? চরম অসুস্থ মানুষের গলায় বললেন শিলার।
একদম আসল। আমার জীবনের কসম! নাহুত বলে।
চোখ দুটো দারুণ জ্যোতিতে চকচক করছে জার্মান ধনকুবেরের।
এই থামটা আজ থেকে চার হাজার বছর আগে খোদাই করা হয়েছিল, নাহুত বলে চলে। এই হলো লিপিকারের স্বাক্ষর। দ্রুত অনুবাদ করে যেতে থাকে সে, শিয়াল-মাথা দেবতা আনুবিস তাঁর থাবায় রক্ত আর মাংসপিন্ড ধরে আছেন, ধরে আছেন হাড়, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড। বাও খেলার ঘুটির মতো সেগুলোকে নাড়াতে পারেন তিনি, আর আমার প্রতঙ্গ তাকে সহায়তা দেয়, আর আমার মাথা লম্বা খেলার ষড়
থামো! শিলার নির্দেশ দিলেন। এর জন্য পরেও সময় পাবে। এখন যাও এখান থেকে! আমাকে একা থাকতে দাও!।
অবাক হয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় নাহুত। এমন সময়ে কেউ মানা করতে পারে? হেলম্ ওকে ডেকে নিতে দুইজনে বেরিয়ে যায় রুম ছেড়ে।
হেলম! পেছন থেকে ডাকে শিলার। নিশ্চিত করো, যেনো কেউ বিরক্ত না করে।
নিশ্চই, হের শিলার। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে উতের দিকে তাকালো হেলম্।
