পাওয়ার অফ দ্য সোর্ড

১. শান্ত আর বর্ণহীন মহাসমুদ্র

পাওয়ার অফ দ্য সোর্ড – উইলবার স্মিথ / অনুবাদ : মাসুম আহমেদ আদি

শান্ত আর বর্ণহীন মহাসমুদ্রের চারপাশে কেবল কুয়াশা আর কুয়াশা। কিন্তু সকালের প্রথম মৃদু বাতাসের ঘূর্ণি এসে ধাক্কা দিতেই ফুলে ফেঁপে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এই কুয়াশাকুণ্ডুলি। মাটি খুঁজে নিল বাতাসের গতি। সমুদ্রতট থেকে তিন মাইল দূরে কুয়াশাবেষ্টিত ঢেউয়ের মাথায় দুলছে ট্রলার; যেখানে সমুদ্রের গভীরে গাঢ় সবুজ রেখা হয়ে শান্ত উপকূলীয় জলের সাথে মিশে গেছে জীবনদায়ী প্লাঙ্কটন।

হুইল হাউজে খাঁজকাটা কাঠের হুইলের ওপর ঝুঁকে উঁকি দিয়ে বাইরের কুয়াশা দেখছেন লোথার ডি লা রে। উপভোগ করেন এই চনমনে উত্তেজনাময় অপেক্ষার মুহূর্তটা। অনুভব করলেন পরিচিত সেই শিকারের নেশাটা। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে চলল শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা। এ এমনই এক নেশা যা হার মানায় মাদকের নেশাকেও।

মনে পড়ে গেল ম্যাগারস্ ফন্টেইন পাহাড়ের ওপর লুকিয়ে থাকার সময় দেখা সেই তুলতুলে গোলাপি ভোরের কথা। ট্রেঞ্চের গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন কখন অন্ধকার কুঁড়ে এগিয়ে আসবে হাইল্যান্ড পদাতিক বাহিনি। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই আজ এতদিন পরেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

তারপর তো এরকম আরো কতশত ভোর কেটে গেছে যখন খেলেছেন ভয়ংকর সব খেলা; প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ঝাঁকড়া কেশরঅলা কালাহারি সিংহ, মাথায় মস্ত শিংআলা যোদ্ধা ষাঁড়, লম্বা আর মূল্যবান দাঁতের হাতি। এখন খেলাটা সে তুলনায় ছোট হয়ে গেলেও রোমাঞ্চটা ঠিক এই সমুদ্রের মতই বিশাল।

হঠাৎ করে ছেলেটা গ্যালি থেকে খোলা ডেকে বেরিয়ে আসতেই চিন্তার গতি বাধা পেল। বাদামিরঙা, শক্তিশালী লম্বা পা দুটো পুরোপুরি খালি। উচ্চতাতেও পরিণত বয়স্ক পুরুষের সমান হওয়ায় দু’হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ নিয়ে খানিকটা ঝুঁকে হুইল হাউজে ঢুকতে হল।

“চিনি দিয়েছ?” জানতে চাইলেন লোথার।

“চার চামচ পা।” হেসে ফেলল ছেলেটা।

“আজ যেন জাল ভরে মাছ ওঠে।” দুর্ভাগ্যের দেবী তাড়াতে ডান হাতের অঙল ভাজ করে ট্রাউজারের পকেটে ঢোকালেন লোথার। “আসলেই খুব দরকার।” মনে মনে ভাবলেন, “বাঁচতে হলে বেশ ভালো পরিমাণ মাছ পেতে হবে।”

এই বন্য খেলায় আরো একবার মত্ত হয়েছিলেন বছর পাঁচেক আগে। বিক্রি করে দিয়েছিলেন বহু কষ্টে গড়ে তোলা রোড অ্যান্ড রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। বাজির খাতায় বিকিয়ে দিয়েছেন সর্বস্ব।

তবে ভালোভাবেই জানতেন এই বেনগুয়েলা স্রোতের সবুজ শীতল জলের নিচে লুকিয়ে থাকা সীমাহীন সম্পদের কথা। যার নজির প্রথমবার দেখেছিলেন ঘূণ্য ইংরেজ আর তাদের হাতের পুতুল ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকাতে তার নিজ সেনাবাহিনি প্রধান জ্যান স্মুটের সাথে লড়াইয়ের সেসব ভয়ংকর দিনগুলোতে। পরবর্তীতে ভার্সেইলেসে থাকার সময় প্রচণ্ড পরিশ্রম আর জমানো পুঁজি ও পরিকল্পনার ফসল আজকের এই দিন।

পর্তুগালে খুঁজে পাওয়া সার্ডিন ট্রলারগুলোর গায়ে অযত্ন ও অবহেলার মরচে লেগে ছিল। এখানেই পেয়েছেন দা সিলভাকে। মাঝখানে অবশ্য আরো চারটি পুরনো ট্রলারকে মেরামত করে যন্ত্রপাতি আর হাড়জিরজিরে নাবিকের দলসহ ঘুরে এসেছেন আফ্রিকা মহাদেশের পুরো দক্ষিণাঞ্চল।

ক্যালিফোর্নিয়াতে খুঁজে পাওয়া ক্যানিং ফ্যাক্টরিটা চালাত এমন এক কোম্পানি, যারা টুনার ঝক দেখে খুশিতে দিশেহারা হয়ে ভুলেই গিয়েছিল যে, সমুদ্রের এই মুরগির বাচ্চাগুলোকে ধরার খরচ কতটা অবিশ্বাস্য হতে পারে। তাই প্রকৃত মূল্যের সামান্য এক ভগ্নাংশ খরচ করে পুরো ফ্যাক্টরিটাকে কিনে নিয়ে জাহাজে করে আফ্রিকাতে তুলে আনতে লোথারকে কোনো কষ্টই করতে হয়নি। পরবর্তীতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিত্যক্ত তিমি কারখানার পাশের মরুভূমিতে ঠিক-ঠাক করে গড়ে তোলেন পুরো ফ্যাক্টরি। যা আজ ওয়ালবিস বে’ নামে পরিচিত।

প্রথম তিন সিজনে তিনি আর অভিজ্ঞ বুড়ো দা সিলভা মিলে খুঁজে পেয়েছেন মাছের অভয়ারণ্য। অগুণতি সেসব মাছের ঝাঁকের মাধ্যমে শোধ করেছেন সমস্ত দেনা। আর তার প্রায় সাথে সাথেই ভাঙাচোরা পর্তুগিজ ট্রলারগুলোকে বদলে ফেলার জন্য নতুন সব নৌকার অর্ডার দিয়েছেন। ফলে যা হবার তাই হল। শুরুতে যতটুকু ঝুঁকি নিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়লেন লোথার।

আর তার পরে বিদায় নিল মাছের ঝাঁকও। উধাও হয়ে গেল হেরিংয়ের দল। শত শত মাইল সমুদ্র চষে বেড়িয়েও বৃথা গেল সমস্ত চেষ্টা। ক্যানিং ফ্যাক্টরির আর্থিক মূল্য ছাপিয়ে, মরুভূমির দীর্ঘ উপকূল অঞ্চল দিয়ে বেড়াতে গিয়ে নির্মমভাবে কেটে গেল মাসের পর মাস। কেবল জমতে লাগল সুদের বোঝ। ফ্যাক্টরি আর নৌকাগুলোকে বাঁচানোর জন্য তাই অবশেষে পুনরায় ঋণের আবেদন করলেন লোথার।

এভাবেই কেটে গেল আরো দু’বছর। তারপর বলা যায় একরকম নাটকীয়ভাবেই; লোথার নিজেও যখন পরাজয় মেনে নিয়েছেন; সামুদ্রিক জলস্রোত পরিবর্তিত হয়ে গেল। অথবা বাতাসের সাতের দিক বদল হয়, যার ফলে ফিরে এল সব মাছ। সংখ্যায় এত বেশি যেন প্রতিটি ভোরেই গজিয়ে উঠছে নতুন ঘাস।

“আজও যেন তাই হয়।” কুয়াশার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নিঃশব্দে প্রার্থনা করলেন লোথার। আমার প্রার্থনা শোনো, ঈশ্বর! প্লিজ।” আর মাত্র তিনটা মাস প্রয়োজন, তাহলেই সমস্ত ঋণ শোধ করে তিনি আবার মুক্ত হতে পারবেন।

“ওই তো, কেটে যাচ্ছে।” ছেলেটার কথা কানে যেতেই চোখ পিটপিট করে মাথা নাড়লেন লোথার।

থিয়েটারের পর্দার মত ঘন কুয়াশা সরে যেতেই দেখা গেল অত্যন্ত নাটকীয় আর শ্বাসরুদ্ধকর এক দৃশ্য। সকালের উজ্জ্বলতা আর ধোঁয়া মিলেমিশে শুরু হল আতশবাজির খেলা। একসঙ্গে এত রঙের সম্মিলন যেন কিছুতেই প্রাকৃতিক বলে মনে হচ্ছে না। সমুদ্রের পানি থেকে ঝিলিক দিয়ে উঠছে কমলা, সোনালি আর সবুজ বর্ণচ্ছটা। রক্তলাল আর গোলাপি আভায় ভরে উঠেছে কুয়াশা। স্রোতের গায়ে শুরু হয়েছে আগুনের নাচন। জাদুকরী এই দৃশ্য দেখে ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশের নীরবতা। অসাড় হয়ে গেছে যেন শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয় আর অনুভূতি। চোখ মেলে দুজনেই সবিস্ময়ে দেখল এই অপার্থিব দৃশ্য।

আর ঠিক তখনই উদয় হল সূর্য দেবতা। অত্যন্ত উজ্জ্বল সোনালি আলোয় ধসে পড়ল কুয়াশার ছাদ। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে স্রোতের রেখা। মেঘরঙা নীল মিশে উপকূলীয় পানি একেবারে তেলের মতই মসৃণ আর শান্তভাবে টলটল করছে। যেখানটাতে সত্যিকারের সামুদ্রিক স্রোতের সাথে মিশে গেছে সেই রেখাটা যা ঠিক একটা ছুরির ফলার মতই সোজা আর তীক্ষ্ণ। এর ওপারে আছে সীমাহীন অন্ধকার, যেন সবুজ এক ভেলভেট।

ফোরডেক থেকে শোনা গেল দা সিলভা’র গলা। দূরের কৃষ্ণকালো পানির দিকে চেয়ে নাচছে, “ওই তো লাফ দিয়েছে।”

পানির মধ্যে লাফিয়ে উঠল একটা মাছ। লম্বায় একটা মানুষের হাতের চেয়ে খানিকটা বড় হবে; চকচকে রূপার ছোট্ট একটা টুকরা। “ইঞ্জিন চালু করো।” উত্তেজনায় কাঁপছে লোথারের গলা। ছেলেটা হাতের কফি মগটাকে ঠাস করে চার্ট-টেবিলের ওপর রেখেই মই বেয়ে নিচের ইঞ্জিনরুমে দৌড় লাগাল। চারপাশে ছিটিয়ে পড়ল শেষ কয়েক ফোঁটা কফি।

একের পর এক সুইচ চালু করে থ্রটল ঠিক করে নিলেন লোথার। নিচে ক্রাংক হ্যাঁন্ডেলের ওপর ঝুঁকে আছে ছেলেটা।

“ঘোরাও।” লোথারের চিৎকার শুনেই চারটা সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে সবলে যুদ্ধ করল ছেলেটা। ওর বয়স এখনো তেরো না হলেও ঠিক একজন পুরুষের মতই শক্তিশালী, আর কাজ করার সময় পেছনে ফুলে উঠেছে পেশি।

হালের পাশের এগজস্ট পাইপ দিয়ে প্রথমে খানিকটা তেল চিটচিটে কালো ধোঁয়া বেরোলেও একটু পরেই নিয়মিত ছন্দে চলতে শুরু করল ইঞ্জিন।

পড়িমরি করে মই বেয়ে ডেকে উঠে এল ছেলেটা। দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো দা সিলভার পাশে।

স্রোতের মধ্য দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল লোথারের ট্রলার। কুয়াশা পুরোপুরি কেটে যাওয়ায় আশপাশের অন্যান্য ট্রলারগুলোকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ সবাই কুয়াশার আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল সূর্যের আশায়। প্রতিটি ট্রলারের রেইলের ধারে দাঁড়িয়ে বকের মত গলা বাড়িয়ে সামনের জল দেখছে নাবিকদের দল। ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়েও শোনা যাচ্ছে তাদের উত্তেজিত গলা।

কাঁচে মোড়া হুইল হাউজে দাঁড়িয়ে পঞ্চাশ ফুট ট্রলারের প্রায় সর্বত্রই দেখতে পারছেন লোথার। সম্পন্ন হয়েছে সমস্ত প্রস্তুতি। স্টারবোর্ড রেইলের নিচে পড়ে আছে লম্বা জাল। শুকনো অবস্থাতেই এর ওজন সাড়ে সাত টন। ভিজে গেলে তো আরো কয়েকগুণ ভারি হয়ে যায়। পাঁচশ ফুট লম্বা জালটা পানিতে সত্তর ফুট গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়; ঠিক যেন মিহি তার দিয়ে তৈরি একটা পর্দা। এর পেছনে লোথার পাঁচ হাজার পাউন্ডেরও বেশি খরচ করেছেন, যা সাধারণ একজন জেলের প্রায় বিশ বছরের আয়ের সমান। তার বাকি তিনটি ট্রলারও একই রকম স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতিটি ট্রলারের পেছনে ঝুলছে আঠারো ফুট লম্বা ডিগ্রি, আর বাইরের তক্তা বা ধাতব পাতের একটির অংশ অপর একটির নিচে বিস্তৃত হয়ে থাকে এমনভাবে প্রস্তুত ডিঙ্গি নৌকা।

তীক্ষ্ণ চোখে আরো একবার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে সন্তুষ্ট হলেন লোথার। এরপর সামনে তাকাতেই দেখলেন লাফিয়ে উঠল আরেকটা মাছ। এবার এত কাছে যে মাছটার শরীরের রঙও স্পষ্ট ধরা পড়ল চোখে। তারপর আবার পানিতে আন্দোলন তুলে টুপ করে গভীরে চলে গেল ছোট্ট মাছটা।

যেন এটাই ছিল সেই কাঙিক্ষত সিগন্যাল। সাথে সাথে জীবন্ত হয়ে উঠল পুরো মহাসমুদ্র। গাঢ় হয়ে উঠল পানির রঙ; যেন ভারি মেঘ এসে ঢেকে দিল চারপাশ। তবে এবার মেঘটা এল একেবারে অতল গভীর থেকে। স্রোতের নিচে নড়ে উঠল যেন এক জলদানব।

“এত্ত এত্ত মাছ!” বিবর্ণ আর ভঁজের দাগঅলা বাদামি মুখখানা ঘুরিয়ে লোথারের দিকে তাকাল দা সিলভা। একই সাথে হাত ছড়িয়ে বোঝাতে চাইল মাছের পরিমাণ।

এক মাইল সামনে একেবারে গভীর জল অব্দি থেকে বেরিয়ে এল বিশাল বড় একঝাক। শিকারি হিসেবে এত বছর পেরিয়ে এলেও জীবনে এরকম প্রদর্শনী লোথার আর দেখেননি। এর কাছে আফ্রিকান সূর্যকে গাঢ় পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয়া পঙ্গপাল কিংবা কোয়েল পাখির ঝাঁকও কিছুই নয়। মাছের ঝকটা পানির উপরে উঠে আসতেই চারপাশ এতটা সাদা আর তুষারের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে, তীরবেগে ছুটে চলা ট্রলারগুলোর নাবিকেরা পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মত নিশ্চুপ হয়ে গেল।

সবার আগে নড়ে উঠল দা সিলভা। ঠিক একজন তরুণের মতই ঘুরে দাঁড়িয়ে ডেকের ওপর দিয়ে দৌড় দিল। হুইল হাউজের দরজায় দাঁড়িয়ে কেবল বলল, “মারীয়া, ঈশ্বরের মাতাকে ধন্যবাদ দাও যে তারপরেও দিনশেষে আমাদের একটা জাল অবশিষ্ট থাকবে।”

তীক্ষকণ্ঠে ভবিষ্যদ্বাণী করেই বুড়ো স্টানের দিকে দৌড় দিল। তারপর গানওয়েলের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ডিঙ্গির ওপর চড়ে বসল। তার দেখাদেখি চঞ্চল হয়ে উঠল বাকি। সবাই যে যার স্থানের উদ্দেশে দৌড় লাগাল।

“ম্যানফ্রেড!” ছেলের উদ্দেশে হাঁক ছাড়লেন লোথার। পিতার ডাক কানে যেতেই পোর কিনার থেকে বাধ্যের মত চলে এল মোহাবিষ্ট ছেলেটা।

“হুইল ধরো।” কম বয়স্ক কারো জন্য এ দায়িত্ব অত্যন্ত বিশাল হলেও ম্যানফ্রেড এর আগেও বহুবার নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করাতে লোথার নিশ্চিন্তে হুইল হাউজ থেকে বেরিয়ে গেলেন। একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে একের পর এক সিগন্যাল দিয়ে চললেন লোথার। বাবার ইশারা মতই ঝাকের চারপাশে চক্রাকারে ট্রলার নিয়ে ঘুরতে শুরু করল ম্যানফ্রেড।

“বড় বেশি মাছ।” আপন মনে ফিসফিসিয়ে উঠলেন লোথার। দূরত্ব, বাতাস ও স্রোতের গতি আর বুড়ো দা সিলভার সতর্কবার্তাকে মাথায় রেখে দক্ষ চোখে হিসাব কষে বের করলেন : বড়জোর ১৫০ টন আর ভাগ্য ভালো হলে ট্রলার আর জালের ধারণক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ২০০ টন পর্যন্ত মাছ ভোলা যাবে।

অথচ চোখের সামনে পানিতে নাচছে মিলিয়ন মিলিয়ন টন মাছের ঝাঁক। অবিবেচকের মত একটু ভুলচুক হলেই দশ থেকে বিশ হাজার টন মাছের ভারে ছিঁড়ে পড়বে জাল; এমনকি হ্যাঁচকা টানে পুরো ট্রলার উল্টে পড়াও বিচিত্র নয়। আর তাহলে যে শুধু দামি একটা জাল আর ট্রলার হারাবেন তা-ই নয়; ক্রু আর ছেলেকেও হারাবেন।

অবচেতনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখলেন দাঁত বের করে হাসছে ম্যানফ্রেড। উত্তেজনায় চকচক করছে ছেলেটার চেহারা। গাঢ় হলুদাভ বাদামি রঙা চোখ আর উজ্জ্বল দাঁতের সারি দেখে মনে পড়ে গেল ওর মায়ের মুখ। মা ছেলে অবিকল একে অন্যের প্রতিচ্ছবি। কথাটা মনে হতেই তিক্ত মনে কাজে চলে গেলেন লোথার।

তবে খানিকক্ষণের এই অন্যমনস্কতার জন্য আরেকটু হলেই সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছিল। দ্রুতবেগে ধাবমান ট্রলার যেকোনো মুহূর্তে মাছের ঝাঁকের গায়ে ধাক্কা দেবে। আর ছোট্ট প্রাণীগুলোও এমন অদ্ভুতভাবে জোট বেঁধে আছে যেন একক সত্তা। ট্রলারের শব্দে একবার যদি গভীর সমুদ্রে উধাও হয়ে যায় তাহলেই কাজ সারা। তাড়াতাড়ি মোড় ঘোরানোর জন্য তীব্রভাবে ইশারা দিতেই দায়িত্ব পালন করল ম্যানফ্রেড। প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরত্বে সরে এসে সুযোগের অপেক্ষায় স্থির হল নৌকা।

চারপাশে দ্রুত একবার নজর বোলাতেই বুঝতে পারলেন বাকি ট্রলারগুলোর ক্যাপ্টেনদেরও একই অবস্থা। সোয়ার্ট হেনড্রিকের সাথে চোখাচোখি হল। বিশাল আর কালো মদ্দা ষাড়ের মত মানুষটার টাক মাথায় সূর্যের আলো পড়ে কামানের গোলার মত চকচক করছে। যুদ্ধ আর শত শত বেপরোয়া অভিযানের সঙ্গী সোয়ার্ট, লোথারের মতই স্থল থেকে জলে স্থানান্তরিত হয়ে দক্ষ এক জেলেতে পরিণত হয়েছেন। হাত দিয়ে ইশারা করে “সাবধান” আর “বিপদ” শব্দ দুটো দেখিয়ে দিলেন লোথার। নিঃশব্দে হাসি দিয়ে সম্মতিসূচকভাবে হাত নাড়লেন সোয়াট।

নর্তকীদের মতই সাবলীল তালে ঋকের চারপাশে ঘুরছে চারটা নৌকা। কুয়াশার শেষ আঁচড়টুকুও মিলিয়ে দিয়ে দিগন্তে উঠে গেল সূর্য।

কিন্তু এখনো একটুও আলগা হয়নি মাছের ঝাঁক। আস্তে আস্তে অধৈর্য হয়ে উঠছেন লোথার। সচরাচর যেটুকু থাকেন তার চেয়েও প্রায় এক ঘণ্টা বেশি সময় ধরে চক্কর কাটছেন। যেকোনো মুহূর্তে হয়ত মাছগুলো আবার হাওয়া হয়ে যাবে। অথচ একটা নৌকা থেকেও জাল ছোঁড়া হয়নি। সম্পদের খনি পেয়েও যেন কিছুতেই ছুঁতে পারছেন না। মরিয়া হয়ে উঠলেন লোথার, এমনিতে বহুক্ষণ কেটে গেছে।

“ধুত্তোরি, যা হবার হবে।” ম্যানফ্রেডকে আরো কাছে যাবার ইশারা দিলেন। কিন্তু বোকামিটা করার সাথে সাথে কানে এল দা সিলভার হুইসেল। বুড়ো পর্তুগিজের দিকে তাকাতেই দেখা গেল উন্মাদের মত হাত নাড়ছে। তাদের পেছনে ফুলে উঠেছে মাছের ঝাঁক। গোলাকার ঝকটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এতক্ষণ এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল সকলে।

“ম্যানফ্রেড!” তীব্র গর্জন করেই ডান হাতটাকে উইন্ডমিলের মত ঘোরাতে লাগলেন লোথার। ছেলেটাও হুইল ঘুরিয়ে দিতেই তরতর করে এগিয়ে চলল নৌকা। জল্লাদের তলোয়ারের ফলার মত ঝাঁকের মধ্যে ঢুকে গেল ট্রলারের মাথা।

“গতি কমাও!” লোথার হাতের ঝাঁপটা দিতেই থেমে গেল নৌকা। নিচের পানি এত স্বচ্ছ যে প্রায় প্রতিটি মাছকে আলাদাভাবে দেখা যাচ্ছে।

লোথার আর ম্যানফ্রেড মিলে ট্রলারের বো’ এত সাবধানে ঝাঁকের মাঝে নিয়ে গেলেন যেন প্রপেলারও তেমন না নড়ে। নচেৎ আতঙ্কিত হয়ে ফিরে যাবে মাছের ঝক। বাবার ইশারামত কাজ করল ম্যানফ্রেড। ঝাঁকের ছোট একটা অংশ আলাদাও হয়ে গেল।

“কিন্তু এখনো বেশি!” বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই শোনালেন লোথার। ঝাঁকের যে অংশটা আলাদা করা গেছে সেটা আকারে ক্ষুদ্র হলেও প্রায় হাজার টন মাছ আছে, অথবা এর চেয়েও বেশি। কারণ গভীরে কতটা আছে তা তো বোঝা যাচ্ছে না।

ঝুঁকিটা তাই একটু বেশিই হয়ে যাবে। চোখের কোনা দিয়ে দা সিলভার বিক্ষুব্ধ ইশারা দেখল, আর এবার তো উদ্বেগে হুইসেল দিয়ে ফেলল। এত মাছ দেখে ভড়কে গেছে বুড়োটা। হেসে ফেললেন লোথার। হলুদ চোখ দুটোকে সরু করে ম্যানফ্রেডকে জাল ছোঁড়ার স্পিড দিতে ইশারা করেই, ইচ্ছে করে বুড়োর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন লোথার।

গতি পাঁচ নটে উঠতেই ম্যানফ্রেডকে দিয়ে সজোরে নৌকাটা ঘুরিয়ে আনলেন। ঝাঁকের মাছগুলোকে চক্রের মধ্যেই থাকতে বাধ্য করলেন। তারপর দ্বিতীয়বার চক্কর দেয়ার সময় ট্রলারের স্টার্নের কাছে গিয়ে হাত গোল করে মুখের উপর রেখে চিৎকার করে বললেন, “লুস! জাল ছুঁড়ে মারো!”

স্টার্নে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ হেরেরো নাবিক ডিঙ্গির দড়ি আটকে রাখা পিচ্ছিল গিঁটের গায়ে কয়েকবার আঘাত করেই নৌকার কিনার দিয়ে ছুঁড়ে মারল। ছোট্ট কাঠের ডিঙ্গি ক্যাচকোচ করে সশব্দে পেছন দিকে আছড়ে পড়ে স্রোতের ফেনায় আগু-পিছু দুলতে লাগল। সাথে করে টেনে নিয়ে গেল ভারি বাদামি রঙা জাল।

ঝাঁকের চারপাশে ঘুরছে ট্রলার। আর কাঠের রেইলের উপর দিয়ে ঘষা খেয়ে হিসহিস শব্দে পানিতে নেমে যাচ্ছে মোটা ফাঁকলা জাল। পাইথনের মতই কুপুলি খুলে তরতর করে নেমে যাচ্ছে কর্ক লাইন, যা কিনা ডিঙ্গি আর ট্রলারকে মায়ের গর্ভে থাকা প্রাণের নালীর মত জুড়ে রেখেছে। পুরো ঝাকটার চারপাশে সমানভাবে বিছিয়ে গেছে জাল। এখন কেবল দা সিলভা আর তার ডিঙ্গি নিয়ে যত চিন্তা।

বিশাল জালটার ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য হুইল নিয়ে কাজ করছে ম্যানফ্রেড। একটু পরে থ্রটল বন্ধ করে দিল। কাঁধে তিন ইঞ্চি ভারি ম্যানিলা লাইনের শেষপ্রান্ত নিয়ে ট্রলারের সাইড বেয়ে উপরে উঠে এল দা সিলভা।

লোথারকে দেখেই গর্জন করে জানাল, “জালটাকে হারাবে, আর কিছু না। কেবল কোনো পাগলই পারে এমন মাছের ভেতর জাল ফেলতে। সাধু আন্তনী আর সাধু মার্কের সাক্ষী মেনে বলছি, হতচ্ছাড়াগুলো জাল নিয়ে ভাগবে, দেখো।” কিন্তু লোথারের নির্দেশ পেয়ে ততক্ষণে জাল উপরে তোলার কাজ শুরু করে দিয়েছে হেরেরো নাবিকের দল।

“জালও আমার আর মাছও আমার।” বিকট শব্দে কপিকল চালু করে দিলেন লোথার, “বুকি হুকে লাগাও!”

পরিষ্কার সবুজাভ পানির সত্তর ফুট গভীরে ঝুলে আছে জাল। কিন্তু তলদেশ এখনো ভোলা। তাই সবচেয়ে প্রথম আর জরুরি কাজটা হল মাছের ঝাঁক পালাবার পথ পাবার আগেই জালটাকে বন্ধ করে ফেলতে হবে। কপিকল ঘুরিয়ে একের পর এক পার্স লাইন টেনে আনতে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমে ফুলে উঠেছে লোথারের নগ্ন বাহুর পেশি আর প্রতিটি গিট। জালের তলদেশের স্টিল রিংয়ের ভেতরে থাকা পার্স লাইন আস্তে আস্তে মুখটাকে বন্ধ করে ফেলছে। ঠিক যেন চোয়াল দুটো এক করে ফেলছে কোনো দানবের মুখ।

অন্যদিকে হুইল হাউজে খুব সাবধানে ফরোয়ার্ড আর রিভার্সের মাধ্যমে ট্রলারের স্টার্নকে জালের পাশ থেকে সরিয়ে আনছে ম্যানফ্রেড। অবশেষে সবটুকু পার্স লাইন কপিকলে জড়িয়ে ফেললেন লোথার। নৌকার পাশ দিয়ে উঠে এল চকচকে স্টিল রিংয়ের গোছা। জালের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাগে উঠে এসেছে পুরো ঝাঁক।

গাল বেয়ে দরদর করে ঝরে পড়ছে ঘাম; ভিজে গেছে গায়ের শার্ট। গানওয়েলের পাশে হেলান দিয়ে বসলেন ক্লান্ত লোথার। এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন যে কথা বলার শক্তিও পাচ্ছেন না। কপাল আর চোখের ওপর লেপ্টে আছে ঘামে ভেজা রুপালি-সাদা চুল। হঠাৎ করে দা সিলভার দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলেন।

শীতল সবুজ বেনশুয়েলা স্রোতের ওপর পরিষ্কার একটা গোলাকার চক্র হয়ে ঘুরছে কর্ক লাইন। কিন্তু একটু জিরোবার আশায় বসতেই লোখারের চোখে পড়ল-নড়ে উঠেছে কর্ক লাইন। আকারেরও পরিবর্তন হচ্ছে। তার মানে এতক্ষণে জালের অস্তিত্ব টের পেয়েছে মাছের ঝাঁক। তাই ছাড়া পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভাসমান আগাছার মত দুলে উঠল পুরো জাল আর সাথে থাকা ডিঙ্গি।

ঠিক যেন লেভিয়াথানের শক্তি এসে ভর করেছে পুরো ঋকের ওপর।

“ওহ, খোদা, যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি মাছ উঠেছে।” হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়ালেন লোথার। চোখের ওপর থেকে ঘামে ভেজা চুল সরিয়েই দৌড় দিলেন দা সিলভার কাছে।

জালের ভেতর ছোটাছুটি করে পুরো ঝাঁক। পানির ঘূর্ণির ভেতর মোচার মত দুলছে ডিঙ্গি। ভারি লাইনে হ্যাঁচকা টান লাগাতে লোখারের পায়ের নিচে কেঁপে উঠল ট্রলারের ডেক।

“দা সিলভা ঠিকই বলেছিল। মাছগুলো উন্মাদ হয়ে গেছে।” ফিসফিসিয়ে নিজেকে শুনিয়েই ফ্যাহর্নের হ্যাঁন্ডেল ধরতে ছুটলেন লোথার। তীক্ষ্ণ সরে তিনবার বেল বাজালের সাহায্যের আশায়। তারপর আবার ডেকে দৌড়ে আসতে আসতে দেখলেন যে এরই মাঝে নাক ঘুরিয়ে এদিকে ছুটে আসছে। বাকি তিনটা নৌকা। এত বিশাল বড় ঝাক দেখে কেউই এখনো নিজেদের জাল ফেলতে সাহস করেনি।

“তাড়াতাড়ি! আরো জোরে আয় বাবারা!” অনর্থক ঘোঁতঘোঁত করে উঠলেন লোথার। তারপর নিজের ক্রুদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, “যে যেখানে আছো, দৌড়ে আসো, জাল ধরতে হবে।”

কিন্তু নাবিকদের চেহারা দেখে বোঝা গেল যে সবাই দ্বিধা করছে। জালে কেউ হাত লাগাতে চায় না।

“হা করে কী দেখছো, হাত লাগাও পাজির দল!” সবাইকে চিৎকার করে লোথার নিজে গানওয়েলের উদ্দেশে লাফ দিলেন। সবাই মিলে ঝাঁকটাকে চেপে ধরতে হবে। যেন ছোট্ট মাছগুলো নড়াচড়া করার শক্তি না পায়।

জালটা কাঁটাতারের মত ধারালো হলেও নাবিকেরা এক সারিতে বসে হালের সাথে আস্তে আস্তে পেঁচাতে লাগল। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েক ফুট গুটিয়ে এল।

কিন্তু মাছের ঝাঁক আবার ঢেউয়ের মত দুলে উঠতেই পিছলে গেল সবটুকু জাল। হেরেরো নাবিকদের একজন আবার চট করে ছেড়ে না দেয়ায় জালের ফাঁকে ডান হাত আটকে গেল। সাথে সাথে আঙুল থেকে মাংস খসে বেরিয়ে পড়ল কাঁচা মাংস আর সাদা হাড়। চিৎকার করে অসাড় হাতটাকে বুকের কাছে চেপে ধরল হতভাগা নাবিক। ফিনকি দিয়ে বেরুচ্ছে তাজা রক্ত।

“ম্যানফ্রেড!” চিৎকার করে উঠলেন লোথার, “ওকে সাহায্য করো!” তারপর আবার জালের দিকে মনোযোগ দিলেন। বাকের ছোট্ট একটা অংশ জালের ওপর দিয়ে লাফিয়ে গাঢ় সবুজ ধোয়ার মত পড়ল স্বচ্ছ পানির ভেতর।

“যাক, খানিকটা কমল!” বিড়বিড় করে উঠলেন লোথার। কিন্তু এর প্রায় সাথে সাথে জালে বন্দি পুরো ঝাক নিচের দিকে গোত্তা খাওয়াতে ভয়ংকরভাবে নড়ে উঠল ভারি পঞ্চাশ ফুট ট্রলার। নাবিকেরা হ্যান্ডহোল্ড আঁকড়ে ধরলেও ভয়ে সাদা হয়ে গেল সবার কালো মুখ।

গানওয়েল দিয়ে উপরে উঠে এল সবুজ পানি। ভেসে গেল ডেক।

“লাফ দাও!” বুড়ো সিলভার দিকে তাকিয়ে কিড়মিড় করে চিৎকার করে উঠলেন লোথার। “জালের কাছ থেকে সরো!” দুজনেই বিপদ টের পেয়েছেন।

আগের সিজনে নাবিকদের একজন জালের ভেতরে পড়ে গিয়েছিল। মাছের ঝাঁক সাথে সাথে লোকটাকে টেনে একেবারে নিচে নিয়ে যায়। তারপর অবশেষে যখন কয়েক ঘণ্টা পরে জালের তলা থেকে মৃতদেহটাকে উদ্ধার করা হয়, দেখা গেল যে পালাবার চেষ্টা করতে গিয়ে লোকটার শরীরের প্রত্যেকটা খোলা অংশ দিয়ে ঢুকে পড়েছে মাছ। মুখ দিয়ে পেটে; রুপালি ছোরা হয়ে চোখের ভেতরের বল ছিঁড়ে সিধে মগজে। এমনকি মলদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাওয়ায় পেট ভর্তি মরা মাছ নিয়ে ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল বেচারা। দৃশ্যটা এতটাই নির্মম আর করুণ যে কেউ কখনোই ভুলতে পারবে না।

“জলদি সরে এসো জাল থেকে।” লোথারের চিৎকার শুনেই ডুবন্ত ডিঙ্গির একেবারে এক কিনারে চলে গেল দা সিলভা; তার প্রায় সাথে সাথে পানিতে ডুবে গেল কাঠের ডিঙি। ভারি সি-বুট নিচের দিকে টেনে ধরায় উন্মাদের মত হাত-পা নাড়ছে দা সিলভা।

ঠিক এমন সময় ত্রাণকর্তার মত এগিয়ে এলেন সোয়ার্ট হেনড্রিক। কর্ক লাইনের পাশে নিজের ট্রলার নিয়ে আসায় তার দু’জন ক্রু মিলে বুড়ো সিলভাকে টেনে তুলল। আর বাকি নাবিকরা সোয়ার্টের নির্দেশমত রেইলের কাছে জড়ো হয়ে জালের বাকি অংশকে হুকে আটকে ফেলল।

“ওহ, জালটা যেন টিকে থাকে।” লোথার আকুতি জানাতেই ততক্ষণে বাকি দুটো নৌকাও চলে এল। বন্দি ঝাকের চারপাশে ঘুরছে চারটি নৌকা। নাবিকদের সবাই মিলে এবার জাল টানার কাজে হাত লাগাল।

এক ফুট এক ফুট করে উঠে এল জাল। প্রতিটি ট্রলারে বারো জন করে ক্রু; এমনকি পিতার জায়গায় এসে ম্যানফ্রেডও দাঁড়িয়ে গেল। পরিশ্রমে ঘর্মাক্ত নাবিকদের হাত কেটে বেরিয়ে গেল তাজা রক্ত; কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিবারে এক ইঞ্চি করে করে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এল পুরো ঝাক।

“ভেতরে নেয়ার জাল নিয়ে এসো!” লোথার চিৎকার করে উঠতেই প্রতিটি ট্রলারে তিনজন করে নাবিক হুইল হাউজের ওপর থেকে লম্বা হাতলঅলা ডিপ নেট নিয়ে নিচের ডেকে চলে এল।

ডিপ নেট দেখতে পুরোপুরি বাটারফ্লাই নেট কিংবা সেসব ছোট ছোট হাত জালের মত; যেগুলো দিয়ে সমুদ্রের পাশের পাথুরে পুল থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা চিংড়ি কিংবা কাঁকড়া ধরে। যাই হোক, নাবিকদের জালগুলোর হ্যাঁন্ডেল ত্রিশ ফুট লম্বা। আর প্রতিবারে একটন পর্যন্ত জীবন্ত মাছ তুলে নিতে পারে। জালের মুখের স্টিলের রিংয়ের তিনপাশে ম্যানিলা লাইন লাগানো আছে। কপিকলের সাহায্যে উঠা-নামা করা যায়।

ডিপ নেটগুলো জায়গামত বসানোর পরপরই লোথার আর ম্যানফ্রেড মিলে কার্গো হোন্ডের হ্যাঁচ কিংবা ঢাকনা খুলে দিল। তারপর আবার যার যার জায়গায় ফিরে গেল। লোথার গেলেন কপিকলের কাছে আর ম্যানফ্রেড পার্স লাইনের কাছে।

লোথার কপিকলের সাহায্যে ডিপ নেটকে উপরে তুলে রুপালি মাছের ঝকে ছুঁড়ে মারলেন। তিনজন নাবিক মিলে নিজেদের সমস্ত ওজন দিয়ে চেপে ধরল জালের হ্যাঁন্ডেল। “উঠে আয়!” দাঁত কিড়মিড় করে কপিকলের ফরোয়ার্ড গিয়ার টানলেন লোথার। ঝাঁকের মাছ তুলে উপরে উঠে এল ডিপ-নেট। সাথে নিয়ে এল এক টন জীবন্ত মাছ। পাসলাইন ধরে হোন্ডের হাঁ করা মুখের উপর জালটাকে নিয়ে এল ম্যানফ্রেড।

“ঢেলে দাও!” ছেলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন লোথার। পার্স লাইন ছেড়ে দিল ম্যানফ্রেড। জালের তলদেশ খুলে যেতেই ভোলা হোন্ডে ঝরে পড়ল সবটুকু মাছ। ঘষা খাওয়ায় মাছের গা থেকে খসে পড়ল ছোট ছোট আঁশ। ডেকে থাকা নাবিকদের ওপর যেন গোলাপি আর সোনালি তুষার কনা ঝরে পড়ল।

জাল খালি হয়ে যেতেই ম্যানফ্রেড পার্স লাইন বন্ধ করে দিল। কপিকল রিভার্স করে পুরো প্রক্রিয়াটা আবার শুরু হল দ্বিতীয় স্তূপ মাছ টেনে আনার জন্য। বাকি তিনটি ট্রলারেও কপিকল আর ডিপ-নেট নিয়ে নাবিকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রতি কয়েক সেকেন্ডে টন ওজনের মাছ হোল্ডে ঢোকানো হল। আর এর পাশাপাশি সৃষ্টি হল স্বচ্ছ আঁশের বৃষ্টি।

একঘেয়ে কাজটা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য আর প্রতিবার মাথার ওপর জাল উঠলেই সমুদ্রের ঠাণ্ডা জলে ভিজে নেয়ে উঠছে নাবিকের দল। তাই মাঝে মাঝেই ক্রুদের স্থান পরিবর্তন করাচ্ছেন নৌকার ক্যাপ্টেনগণ। যদিও লোথার নিজে এখনো কপিকল থেকে এক চুলও নড়েননি। লম্বা, ক্লান্তিহীন আর সদা সতর্ক লোথারের সাদা সোনালি চুলে আটকে গেছে মাছের আঁশ; সূর্যের আলোয় ঠিক আগুনের মতই চকচক করছে।

“সিলভার থ্রি পেনিস।” নিজের চারটি ট্রলারের হোল্ড ভর্তি মৎসবৃষ্টি দেখে আপন মনেই হাসলেন। “আজ ডেক ভর্তি টিকি (Tickey) নিয়ে যাবো।” টিকি হল নাবিকদের মাঝে প্রচলিত থ্রি পেনির পরিবর্তিত স্ল্যাং।

“ডেকলোড।” খালি হয়ে আসা মেইন জালের কাছে কপিকল নিয়ে ব্যস্ত সোয়ার্ট হেনড্রিকের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠলেন লোথার। পালিশ করা আবলুস কাঠের মতই চকচক করছে সোয়াটের কোমর পর্যন্ত উদোম শরীর।

“ডেকলোড!” পাল্টা চিৎকার করে নিজ আনন্দ প্রকাশ করলেন সোয়ার্ট। প্রতিটি ট্রলারের হোন্ডে দেড়শ’ টন করে মাছ তোলা হয়েছে। এখন তারা ডেকলোড করবেন।

আবারো একটা বড় ঝুঁকি নিতে চলেছেন লোথার, একবার লোড করা হয়ে গেলে বন্দরে ফিরে ফ্যাক্টরিতে মাছ পাম্প করে বের না করা পর্যন্ত নৌকা আর খালি হবার উপায় নেই। কিন্তু ডেকলোডিং করা হলে আরো একশ’ টন ওজনের মাছ ভোলা হবে। যা নিরাপদে বহনযোগ্য ওজনের সীমা ছাড়িয়ে যাবে। আর যদি এর ভেতরে আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়, তাহলে এক ধাক্কায় অতিরিক্ত ভার বহনকারী ট্রলারকে শীতল সবুজ গহীনে নিয়ে যাবে সমুদ্রের দৈত্য।

“আবহাওয়া নিশ্চয় এরকমই ভালো থাকবে।” কপিকল নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে নিজেকেই যেন আশ্বস্ত করলেন লোথার। অসম্ভব ভয়ংকর এক ঝুঁকি নিয়ে এক হাজার টন মাছ তুলেছেন। একবার জাল ছুঁড়েই পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড লাভ। জীবনে এতটা সৌভাগ্যের দেখা কখনো পাননি। জাল-নৌকা কিংবা নিজের জীবনও হারাতে পারতেন, কিন্তু না; এবারে সব দেনা শোধ করতে পারবেন।

“ঈশ্বরের দিব্যি, এখন আমার সাথে আর খারাপ কিছু ঘটবে না। এবারে পুরো মুক্ত হয়ে যাবো।”

চারটি ট্রলারের উপরেই চক্কর কাটছে সাদা মেঘের মত একঝাক সী বার্ডস। পার্স লাইন দিয়ে জালের ভেতর ঢুকে রাক্ষসের মত মাছ খেতে শুরু করল পাখির দল। শেষে এমন অবস্থা যে উড়ে যাবারও সাধ্য নেই। ফোলা পেট নিয়ে কোনোমতে স্রোতের তোড়ে ভেসে গেল। অন্যদিকে হাতে ধারালো লোথার আংটাযুক্ত দণ্ড নিয়ে প্রতিটি ট্রলারের বো আর স্টার্নে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে নাবিক। কারণ একটু পরপর আঘাত করে বড় বড় সব হাঙর তাড়াতে হচ্ছে। জালে আটকা পড়া মাছের ঝাক খাবার নেশায় আগত হাঙরগুলোর ত্রি-কোণাকার ছুরির মত তীক্ষ্ণ লম্বা দাঁতগুলো শক্ত জালও কেটে ফেলতে ওস্তাদ।

অন্যদিকে মাছের ভারে আস্তে আস্তে পানিতে ডুবে যাচ্ছে প্রতিটি ট্রলারের শরীর। অবশেষে দুপুরের একটু পরে লোথার নিজেই থামার নির্দেশ দিতে বাধ্য হলেন। আর একটা মাছও তোলার জায়গা নেই। বরঞ্চ নৌকার পাশ দিয়ে পড়ে হাঙরের পেটে যাচ্ছে।

কপিকলের সুইচ বন্ধ করে দিলেন লোথার। মেইন জালে এখনো না হলেও আরো একশ’ টন মাছ ঝুলছে। “জাল খালি করে ফেলল।” আদেশ দিলেন লোথার। “মাছ ফেলে জাল নৌকায় তুলে আনো।”

অতিরিক্ত ভারে পানিতে প্রায় ডুবুডুবু হয়ে এক সারিতে বাড়ির পথ ধরল চারটা ট্রলার। সবার আগে পথ দেখাচ্ছে লোখারের নৌকা।

পেছনে প্রায় এক মাইল পর্যন্ত সমুদ্রে কার্পেটের মত বিছিয়ে রইল মরা মাছ। রুপালি পেট উপরে দিয়ে এমনভাবে ভাসছে যেন অরণ্যের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে বসন্তের ঝরা পাতা। ঠিক তার উপরেই হাজার হাজার পরিতৃপ্ত সি-গাল আর মহা ভোজে ব্যস্ত বড় বড় হাঙর।

পরিশ্রমে নিঃশেষিত নাবিকের দল ডেকের ওপর এখনো তড়পাতে থাকা মাছের ঝাঁকের ওপর দিয়ে কোনোমতে নিজেদেরকে টানতে টানতে নিচের ডেকে নিয়ে গেল। মাছের আঁশ আর সমুদ্রের জলে স্নাত শরীর নিয়েই ছোট্ট বাঙ্কের ওপর গড়িয়ে পড়ল সবাই।

অন্যদিকে হুইল হাউজে পরপর দু’মগ গরম কফি খেয়ে মাথার উপরের ক্রনোমিটার চেক করলেন লোথার।

“ফ্যাক্টরিতে ফিরতে আরো চার ঘন্টা লাগবে। আমাদের পড়ার সময় হয়েছে এখন।”

“ওহ, পা!” আকুতি জানাল ছেলেটা, “আজ নয়। আজ একটা বিশেষ দিন। না পড়লে হয় না?”

ওয়ালবিস বে’তে কোনো বিদ্যালয় নেই। সবচেয়ে কাছের সোয়াকোপমুণ্ডের জার্মান স্কুলটাও ত্রিশ কি.মি. দূরে। জন্মের পর থেকে লোথারই ছেলেটার বাবা আর মা। রক্ত আর জলে ভেজা ছোট্ট শরীরটার দিকে মা তাকিয়ে দেখেনি। নার্সের দুধ ব্যতীত একা হাতেই ছেলেটাকে লালন-পালন করেছেন লোথার। তাই দুজনের আত্মিক বন্ধন এতটাই বেশি যে, একদিনের জন্য ওকে ছাড়া থাকতে পারবেন না। দূরে না পাঠিয়ে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থাও তাই তাকেই করতে হয়েছে।

“কোনোদিনই এতটা বিশেষ নয়।” ম্যানফ্রেডকে বললেন “প্রতিটি দিনই আমাদেরকে কিছু না কিছু শিখতে হবে। কেবলমাত্র পেশি থাকলেই কেউ শক্তিশালী হয় না। নিজের মাথায় টোকা দিয়ে বললেন, “এটাই একজন মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। যাও, বই নিয়ে এসো!”

সাহায্যের আশায় দা সিলভার দিকে চোখ গোল গোল করে তাকাল ম্যানফ্রেড, কিন্তু জানে তর্ক করে লাভ নেই।

“হুইল ধরো” বুড়ো মাঝিকে হুইল ধরিয়ে দিয়ে ছোট্ট চার্ট টেবিলে ছেলের পাশে গিয়ে বসলেন লোথার। “আজ গণিত নয়; ইংরেজি পড়ব।”

“আমার ইংরেজি একটুও ভালো লাগে না!” বিতৃষ্ণা নিয়ে ঘোষণা করল ম্যানফ্রেড, “ইংরেজি আর ইংরেজ দু’টোকেই ঘৃণা করি।”

মাথা নাড়লেন লোথার। “হ্যা” একমত হয়ে বললেন, “ইংরেজরা আমাদের শত্রু। সবসময় তাই ছিল আর ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এই কারণেই তাদের অস্ত্র দিয়ে নিজেদেরকে বলীয়ান করতে হবে। এ কারণেই ভাষাটা শিখতে হবে, যখন সময় আসবে তখন যেন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এর সদ্ব্যবহার করা যায়।”

সারা দিনের মাঝে এই প্রথমবার ইংরেজিতে কথা বললেন লোথার। ম্যানফ্রেড আফ্রিকান ভাষায় উত্তর দিতে গেলেও হাত তুলে থামালেন লোথার।

“ইংরেজি।” তিরস্কারের সুরে ছেলেকে বললেন, “শুধু ইংরেজি বলো।”

পরবর্তী চার ঘণ্টায় পিতা-পুত্র মিলে শেষ করল বাইবেলের কিং জেমস অংশ আর কেপ টাইমস পত্রিকার দু’মাসের পুরনো একটা কপি। এরপর এক পাতা শ্রুতিলিপি লিখতে দিলেন লোথার। অপরিচিত এই ভাষা নিয়ে খাটতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে পড়ল অস্থির ম্যানফ্রেড। শেষপর্যন্ত অধৈর্য হয়ে বলে উঠল,

“আমাকে দাদা আর শপথ সম্পর্কে বলো পা!” আহ্লাদী সুরে বাবার কাছে জানতে চাইল ছেলেটা।

হেসে ফেললেন লোথার, “দিনে দিনে তুই একটা বান্দর হচ্ছিস, তাই না? মাথায় শুধু কাজ ফাঁকি দেয়ার চিন্তা।”

“প্লিজ, পা”

“এ গল্প তো আগেও করেছি।”

“আবার বলো! আজ তো একটা বিশেষ দিন।”

হুইল হাউজের জানালা দিয়ে বহু মূল্যবান রুপালি কার্গোর দিকে তাকালেন লোথার। ছেলেটা ঠিকই বলেছে। আজ সত্যিই একটা বিশেষ দিন। গত পাঁচ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি মিলবে অবশেষে।

“ঠিক আছে” মাথা নেড়ে বললেন, “আবারো বলব ঠিকই, কিন্তু ইংরেজিতে।” ঠাস করে এক্সারসাইজ কপি বন্ধ করে টেবিলের ওপাশ থেকে ঝুঁকে এল ম্যানফ্রেড। আগ্রহে চকচক করছে স্বচ্ছ হলুদাভ বাদামি দু’খানা চোখ।

“তো শোন” শুরু করলেন লোথার, “বিশ্বাসঘাতক ইংরেজ রাজা পঞ্চম জর্জ যখন ১৯১৪ সালে জার্মানির কাইজার উইলহেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল তখন তোমার দাদু আর আমি নিজেদের দায়িত্ব ঠিকই বুঝতে পারলাম। তারপর তোমার দাদিমাকে চুমু খেয়ে বিদায় জানিয়ে-”।

“দাদিমার চুলের রঙ কী ছিল?” জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।

“তোমার দাদিমা ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী একজন অভিজাত জার্মান নারী আর সূর্যের আলোয় তার চুল দেখাত ঠিক পাকা গমেরই মতন।

“ঠিক আমার মতন।” বাবাকে শুধরে দিল ম্যানফ্রেড।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তোমার মতন” হেসে ফেললেন লোথার। “তারপর তোমার দাদু আর আমি মিলে ঘোড়ায় চেপে বসলাম অরেঞ্জ নদী তীরের উদ্দেশে; যেখানে বুড়ো জেনারেল মারিটজ আর তার ছয়শ’ বীরের সাথে যোগ দিয়ে ছুটলাম বিশ্বাসঘাতক জ্যানি মুটের খবর নেয়ার জন্য।”

“বলো পা, তাড়াতাড়ি বলো।” তাগাদা দিল ম্যানফ্রেড।

এরপর কামানের গোলা আর মেশিনগানের গুলিতে বিদ্রোহীদেরকে ঝাঁঝরা করে দেয় জ্যানি স্মুটের বাহিনি। লোথারের মুখে প্রথম যুদ্ধের সেই কাহিনি শুনে বেদনার মেঘ এসে ভর করল ম্যানফ্রেডের জোড়া চোখে।

“কিন্তু তোমরাও খুব লড়েছিলে তাইনা, পা?”

“পাগলের মত যুদ্ধ করেছি। কিন্তু ওরা সংখ্যায় বেশি ছিল আর ওদের কাছে বড় বড় কামান, মেশিনগান এসবও ছিল। তারপর তোমার দাদু পাকস্থলীতে গুলি খাওয়ার সাথে সাথে আমার ঘোড়ায় চড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উনাকে সরিয়ে নিয়ে গেছি।” সে কথা শুনে কান্নায় চকচক করে উঠল ছেলেটার চোখ।

“তারপর যখন মৃত্যু কাছে চলে এল, তোমার দাদু বালিশ হিসেবে ব্যবহার করা চামড়ার ব্যাগ থেকে পুরনো কালো বাইবেলটা বের করে আমাকে দিয়ে শপথ করালেন।”

“আমি জানি এই শপথ।” বাবাকে বাধা দিল ম্যানফ্রেড। “দাঁড়াও বলছি।”

“হুম, বলো তো দেখি?” লোথারও মাথা নেড়ে সায় দিলেন।

“দাদু বলেছে : “এই বইয়ের উপর হাত রেখে আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করো মাই সান, প্রতিজ্ঞা করো যে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না।”

“হ্যাঁ।” মাথা নেড়ে লোথার জানালেন, “ঠিক তাই। মৃত্যুশয্যায় বাবার কাছে আমি এই শপথ করেছি।” হাত বাড়িয়ে ছেলেকে ধরলেন।

পিতা-পুত্রের আবেগঘন এই মুহূর্তে হানা দিল বুড়ো দা সিলভা। কাশি দিয়ে গলা বাড়িয়ে হুইল হাউজের জানালা দিয়ে বাইরে থুথু ফেলল।

“তোমার লজ্জা হওয়া উচিত ছেলেটার মাথায় মৃত্যু আর ঘৃণার কথা ঢোকাচ্ছো।” দা সিলভার কথা শুনেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন লোথার।

“তোমার মুখ বন্ধ করো বুড়ো” সিলভাকে শাসালেন। এতে তোমার নাক না গলালেও চলবে।”

“কুমারী মারীয়াকে ধন্যবাদ যে এসব শয়তানেরই কাজ।” বিড়বিড় করে নিজের অসন্তুষ্টি জানাল দা সিলভা।

ঘোঁত ঘোঁত করে সরে এলেন লোথার। “ম্যানফ্রেড, আজকের মত যথেষ্ট হয়েছে। বই রেখে এসো।”

হনহন করে হুইল হাউজ থেকে বেরিয়ে ছাদে চলে এলেন লোথার। পানি ঠেকানোর জন্য জাহাজের ডেকের উঁচু প্রান্তদেশে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে পকেট থেকে লম্বা কালো চুরুট বের করে মাথার খানিকটা কামড়ে থু করে ফেলে দিলেন। এমন সময় মাথা উঁচু করে উঁকি দিল ম্যানফ্রেড; যখন দেখল বাবা কিছু বলেনি, লাজুক ভঙ্গিতে উঠে এসে বাবার পাশে বসল।

হাত গোল করে দিয়াশলাই দিয়ে চুরুটে আগুন ধরিয়ে গভীর টান দিলেন লোথার। তারপর হাত খুলে দিতেই দমকা বাতাস নিভিয়ে দিল আগুন। আস্তে করে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন লোথার।

আনন্দে কেঁপে উঠল ম্যানফ্রেড। সচরাচর এমনভাবে বাবার আদর পাওয়া যায় না। পিতার কাছ ঘেঁষে বসে বলতে গেলে প্রায় দম বন্ধ করে রইল ছেলেটা। পাছে নষ্ট হয় এ দুর্লভ মুহূর্ত।

“আশা করি উইলেমের মাথায় বয়লারগুলো জ্বালিয়ে রাখার বুদ্ধি ঠিকই এসেছে।” আপন মনে বিড়বিড় করলেন লোথার “হাতে এত কাজ জমে গেছে যে আজ সারারাত আর আগামীকাল সারাদিন ফ্যাক্টরিতে ব্যস্ত থাকতে হবে।”

“এত মাছের সবটুকু কি কাজে লাগানো যাবে?” ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল ম্যানফ্রেড।

“না, এগুলোর বেশিরভাগ দিয়ে মাছের তেল আর মাছের খাবার-” হঠাৎ করেই কথা বন্ধ করে উপসাগরের ওপাড়ে একদৃষ্টে তাকালেন লোথার। ম্যানফ্রেড টের পেল শক্ত হয়ে গেছে বাবার শরীর। ছেলেটাকে আরো হতাশায় ডুবিয়ে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে চোখের উপর রাখলেন লোথার।

“বেকুব কোথাকার।” দক্ষ শিকারির চোখে ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন দূরে ফ্যাক্টরির বয়লার হাউজ। ধোয়ার কোনো চিহ্নও নেই। “না জানি গাধাটা কোন নরকে পচছে?” লাফ দিয়ে দাঁড়িয়েও চলন্ত ট্রলারে ঠিকই ভারসাম্য রাখলেন লোথার। “বয়লারগুলোকে ঠাণ্ডা করে রেখে দিয়েছে। আবার আগুন জ্বালাতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগে যাবে। ততক্ষণে সব মাছ পচে যাবে। গোল্লায় যাক শয়তানটা; রাগে কাঁপতে কাঁপতে হুইল হাউজে নেমে এলেন লোথার। ফগহর্ন হাতে নিয়ে ফ্যাক্টরিকে সতর্ক করে দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। “কী, হচ্ছেটা কি সেখানে!” কন্ট্রোল প্যানেলের কাছ থেকে দূরবিন টেনে নিয়ে চোখের ওপর ধরলেন। এত দূর থেকেও ফ্যাক্টরির মেইন গেটের জটলাটা দেখা যাচ্ছে।

“ওই তো উইলেম।” ভারি গুঁড়ির পাইলিং দিয়ে বানানো উপসাগরের শান্ত জলের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের লম্বা আনলোডিং জেটির শেষ মাথায় ফ্যাক্টরি ম্যানেজারকে দেখা যাচ্ছে। সে এখানে কী করছে, বয়লারগুলো ঠাণ্ডা অথচ সবাই বাইরে হল্লা করছে। কিন্তু উইলেমের দু’পাশে দু’জন অপরিচিত লোককেও দেখা যাচ্ছে। পোশাক দেখেই লোক দুজনের পেশা আন্দাজ করে নিলেন লোথার।

“ট্যাক্স কালেক্টর কিংবা অন্য কোনো সরকারি কর্মচারী।” রাগ কমে গিয়ে তার বদলে অস্বস্তি বোধ করলেন।

“ঝামেলা।” অনুমান করলেন লোথার। “এখন আমাকে হাজার টন মাছ রান্না করতে হবে অথচ কিনা-”।

এর পরপরই চোখে পড়ল দুটো মোটরগাড়ি। একটা ভাঙাচোরা পুরনো টি মডেলের ফোর্ড হলেও অন্যটা দেখে লাফিয়ে উঠল হৃৎপিণ্ড।

পুরো আফ্রিকাতে এমন আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ড্যাফোডিল হলুদ রঙা হাতির মত ভারি ডেইমলার। শেষবার এটাকে উইন্ডহকের প্রধান রাস্তায় কোর্টনি মাইনিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানির অফিসের বাইরে পার্ক করা দেখেছিলেন।

কোম্পানিতে তার ঋণের মেয়াদ বাড়াবার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন লোথার। ধূলিমাখা চওড়া রাস্তার অপর পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন গাঢ় রঙা সুট পরিহিত দুই কর্মচারী সাথে নিয়ে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে সে। লোথারের দিকে একবারও ফিরে তাকায়নি। তারপরে কেটে গেছে প্রায় এক বছর।

দা সিলভা ভারি বোঝায় প্রায় ডুবুডুবু ট্রলারটাকে জেটির পাশে রাখতেই উঠে দাঁড়ালেন লোথার। নৌকা পানিতে এতটাই নিচু হয়ে আছে যে, জেটির উপরে দাঁড়িয়ে থাকা কু’র দিকে মুরিং লাইন ছুঁড়ে মারল ম্যানফ্রেড।

“লোথার, এই লোকগুলো আপনার সাথে কথা বলতে চায়।” গলা বাড়িয়ে বলে উঠল উইলেম। বুড়ো আঙুল নাচিয়ে লোকগুলোকে দেখাবার সময় নার্ভাস হয়ে ঘামতে শুরু করল ম্যানেজার।

“আপনিই কি মিঃ লোথার ডি লা রে?” ধূলিমলিন ফেডোরা টুপিটাকে মাথার পেছনে টেনে দিয়ে জানতে চাইলেন আগন্তুকদ্বয়ের অপেক্ষাকৃত খাটো জন।

“ঠিক তাই।” মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত কোমরে রেখে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন লোথার। “আর আপনি?”

“আপনিই কি সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকান ক্যানিং অ্যান্ড ফিশিং কোম্পানির মালিক?”

“জ্যা!” আফ্রিকান ভাষায় উত্তর দিলেন লোথার। “আমিই মালিক, কিন্তু হয়েছেটা কী?”

“আমি উইন্ডহক কোর্টের শেরিফ। এখানে কোম্পানির সমস্ত সম্পদের একটা রিট নিয়ে এসেছি।” হাতের দলিলগুলো বাতাসে ঘোরালেন শেরিফ।

“ওরা ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়েছে।” করুণ কণ্ঠে জানাল উইলেম। “আমাকে বয়লার বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।”

“না! এটা হতে পারে না!!” ফোঁস ফোঁস করে উঠলেন লোথার। ক্ষ্যাপা চিতার মতই হলুদ হয়ে ধকধক করে জ্বলতে লাগল চোখ। “আমাকে এক হাজার টন মাছ প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।”

“কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রিকৃত চারটি ট্রলার কি এগুলোই?” লোথারের প্রতিক্রিয়া দেখেও কোনো রকম নরম না হয়ে বলে উঠলেন শেরিফ। তবে জ্যাকেটের বোতাম খুলে দুটো হাতই কোমরে রেখে দাঁড়ালেন। বেল্টের চামড়ার হোলস্টারে ঝুলছে ভারি ওয়েবলি সার্ভিস রিভলবার। তারপর মাথা ঘুরিয়ে জেটির দুপাশে নোঙর করা চারটি ট্রলার দেখিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, “আমার সহকারী, নৌকা আর কার্গোগুলোর উপর কোর্টের সিল লাগিয়ে দেবে। তাই সাবধান করে দিচ্ছি, এগুলোতে হাত দেবার কিংবা সরাবার যে কোনো ধরনের প্রচেষ্টাই অপরাধ বলে গণ্য হবে।”

“না, এটা হতে পারে না!” তাড়াতাড়ি মই বেয়ে জেটিতে উঠে এলেন লোথার। কমে গেছে কণ্ঠের তেজ। “আমাকে আমার মাছগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। বুঝতে পারছেন না? নতুবা কাল সকাল অব্দি এভাবে থাকলে পচে গন্ধ বেরোবে

“এগুলো আর আপনার মাছ নয়।” মাথা ঝাঁকালেন শেরিফ। “এগুলো এখন কোর্টনি মাইনিং ও ফিন্যান্স কোম্পানির সম্পত্তি।” তারপর অধৈর্য হয়ে সহকারীর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন, “যাও কাজে হাত দাও।” তারপর যেই না অন্যদিকে ঘুরতে যাবেন, পেছন থেকে লোথার ডেকে বললেন, “উনি এখানে এসেছেন।” শেরিফ ঘুরে তাকাতেই লোথার আবারো বললেন, “উনি এসেছেন। এটা তো উনার গাড়ি। তাই না?”

চোখ নামিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন শেরিফ। কিন্তু উইলেম বলে উঠল, “হ্যাঁ এসেছেন, আমার অফিসে অপেক্ষা করছেন।”

দলটার কাছ থেকে সরে লম্বা লম্বা পা ফেলে জেটি থেকে নেমে এলেন লোথার। মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো দেখে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধে চলেছেন। এদিকে জেটির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ফ্যাক্টরির উত্তেজিত কর্মচারীর দল।

“এসব কী হচ্ছে বস?” সবাই মিলে আকুতি জানালো লোথারের কাছে, “আমাদেরকে আর কাজ করতে দেবে না? আমরা তাহলে করব কি?”

“দাঁড়াও!” খসখস কণ্ঠে উত্তর দিলেন লোথার। “আমি সবকিছু ঠিক করে দিচ্ছি।”

“আমরা বেতন পাবো বস? আমাদের ছেলেমেয়েরা-”

“অবশ্যই পাবে।” তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলে উঠলেন লোথার, “আমি নিজে প্রতিজ্ঞা করছি।” কিন্তু মাছ বিক্রি না করতে পারলে তো এ প্রতিজ্ঞা রাখতে পারবেন না। ধাক্কা দিয়ে সবাইকে সরিয়ে ফ্যাক্টরির কোনায় ম্যানেজারের অফিসে চলে এলেন।

দরজার বাইরে পার্ককৃত ডেইমলারের সামনের মাডগার্ডের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ম্যানফ্রেডের চেয়ে বছরখানেকের বড় একটা ছেলে। কিন্তু ম্যানফ্রেডের চেয়েও ইঞ্চিখানেক খাটো আর পরিচ্ছন্ন শরীরটা কৃশকায়। মেয়েদের মত রূপবান ছেলেটার চামড়া একেবারে নিখুঁত আর চোখ দুটো গাঢ় নীল।

ছেলেটাকে দেখেই লোথার বলে উঠলেন “শাসা!”

দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কপালের উপর থেকে এক গোছা কালো চুল সরিয়ে দিল ছেলেটা।

“আপনি কীভাবে আমার নাম জানেন?” কণ্ঠের রুক্ষতা সত্ত্বেও গাঢ় নীল চোখ দুটিতে দেখা গেল আগ্রহ।

শত শত উত্তর ভিড় করে এল লোথারের ঠোঁটে : “অনেক বছর আগে একবার আমি তোমাকে আর তোমার মাকে মরুভূমিতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছি… যখন তুমি মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতে চাইতে না, সেই শিশু অবস্থায় আমার ঘোড়ার জিনের সামনের বাঁকা অংশে তোমাকে নিয়ে ঘুরেছি… তোমাকে ততটাই ভালবাসি একদা তোমার মাকে যতটা বেসেছিলাম… তুমি ম্যানফ্রেডের ভাই, আমার নিজের ছেলের সৎভাই। এত বছর পরেও তোমাকে যেখানেই দেখি না কেন আমি ঠিক চিনে যাবো।”

কিন্তু এসবের কিছুই বললেন না লোথার পরিবর্তে জানালেন, “গুড ওয়াটার” এর বুশম্যান শব্দ হল শাসা, যা বুশম্যানদের দুনিয়ায় সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু।”

“ঠিক তাই।” মাথা নেড়ে সম্মত হল শাসা কোর্টনি। লোকটা তাকে বেশ আগ্রহী করে তুলেছে। আবদ্ধ এক উন্মাদনা, নিষ্ঠুরতা আর নিখাদ শক্তি সত্ত্বেও লোকটার চোখগুলো অদ্ভুত স্বচ্ছ। প্রায় একটা বিড়ালের মতই হলুদ। “আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আমার খ্রিস্টান নাম হল মাইকেল। এটা ফ্রেঞ্চ শব্দ। আমার মা’ও ফরাসি কিনা তাই।”

“তিনি কোথায়?” লোথারের প্রশ্নের উত্তরে অফিসের দরজার দিকে তাকালো শাসা।

“উনি বলেছেন কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে।” শাসার কথায় কর্ণপাত না করে এগিয়ে গেলেন লোথার ডি লা রে। এত কাছ দিয়ে গেলেন যে লোকটার তেলতেলে চামড়ায় মাছের নোংরা কাদা আর রোদে পোড়া দেহতুকে আটকে থাকা আঁশও দেখতে পেল শাসা।

“আপনি দরজায় নক করলে-” গলার স্বর নামিয়ে নিল শাসা; কিন্তু লোথার তোয়াক্কা না করে ঠাস করে খুলে ফেললেন অফিসের দরজা। শাসা দেখল জানালার কাছের চেয়ারটা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকালো মা।

ছোট্ট মেয়েদের মতন পাতলা দেহাবয়বের অধিকারী এই নারীকে এতটাই তরুণ দেখাচ্ছে যে বয়স নিজ ছেলের চেয়ে খুব বেশি বলে মনে হচ্ছে না। কেবল চিবুক ভোলার সাথে সাথে চোখের কোণ নেচে ওঠা, চোয়ালের দৃঢ়চেতা ভাব আর মধুরঙা গভীর চোখ জোড়া দেখে যে কোনো তেজস্বী পুরুষের কথাই মনে পড়ে যেতে বাধ্য।

পরস্পরের দিকে তাকিয়ে শেষবার সাক্ষাতের পর থেকে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন পরিমাপের চেষ্টা করল দুজনে।

“কত হবে ওর বয়স?” আপন মনে ভাবতে গিয়েই লোথারের মনে পড়ে গেল যে, “এ শতাব্দীর একেবারে প্রথম দিনে মধ্যরাতের কিছু পরেই ওর জন্ম। তার মানে বিংশ শতকের মতই বয়স্ক, এ কারণেই নাম রাখা হয়েছে সেনটেইন। তার মানে একত্রিশ হলেও দেখায় উনিশ বছর বয়সীরই মতন। এখনো ঠিক সেদিনকারই মতন তরুণ যেদিন মরুভূমিতে সিংহের নখের আঘাতে জর্জরিত রক্তমাখা মৃত্যুপথযাত্রী তন্বী শরীরটাকে খুঁজে পেয়েছিলাম।”

“ওর বয়স বেড়ে গেছে।” আপন মনে ভাবলেন সেনটেইন। চুলে রুপালি রেখা; মুখে আর চোখের কিনারে ভাজ। বয়স চল্লিশের উপরে আর অনেক যন্ত্রণাও সয়েছে। কিন্তু না, এখনো যথেষ্ট হয়নি। ভাবতে ভালোই লাগছে যে আমার বুলেট ওর হার্ট মিস্ করে গেছে। যাই হোক, এখন তাকে বাগে পেয়েছি। এবার আসল সত্যিটা ঠিকই টের পাবে”।

কিন্তু হঠাৎ করেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনে পড়ে গেল নিজ দেহের উপরে লোখারের নগ্ন, মসৃণ আর শক্তিশালী সোনালি শরীরের অনুভূতি। একই সাথে নিজের উপরেই রাগ হল আবেগের এ অংশটাকে কাবু করতে না পারার অক্ষমতার জন্য। অন্যান্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে অ্যাথলেটের মতই গড়ে তুলেছেন সেনটেইন; কেবল লাগামহীন এই সুখানুভূতির আকাক্ষা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

দরজায় দাঁড়ানো মানুষটাকে ছাড়িয়েও চোখ গেল রৌদ্রে স্নাত শাসার দিকে। তার অনিন্দ্যসুন্দর ছেলেটা কৌতূহলী হয়ে মাকে দেখছে। লজ্জা পেয়ে গেলেন সেনটেইন। নিশ্চিত যে মনের ভাব চেহারায় লুকোতে ব্যর্থ হয়েছেন।

“দরজা বন্ধ করে দাও।” খসখসে কণ্ঠে আদেশ দিলেন পুরোপুরি শান্ত সেনটেইন, “ভেতরে এসে দরজা বন্ধ করো।” এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে খানিক জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। যে মানুষটাকে ধ্বংস করতে চান তার মুখোমুখি হবার আগে আবারো নিজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন সেনটেইন কোর্টনি।

***

দরজাটা বন্ধ হতে দেখে অসন্তুষ্ট হল শাসা। বুঝতে পারল গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটতে চলেছে। বিড়াল চোখঅলা বিপজ্জনক ধরনের লোকটা ওর নাম জানে। তার ওপর আবার মায়ের গাল জুড়ে রঙের এরকম পরিবর্তন আর চোখের দৃষ্টি আগে কখনোই দেখেনি, অপরাধবোধ যে নয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত। তাছাড়া শাসা যতটুকু জানে মায়ের দুনিয়াতে অস্থিরতা বলতে কিছু নেই। তাই বন্ধ দরজার ওপাশে যে কী ঘটছে জানতে খুব ইচ্ছে করছে।

“যদি তুমি কিছু জানতে চাও তাহলে নিজেই খুঁজে বের করা।” মায়ের উক্তিগুলোর একটা যদি প্রয়োগ করতে যায় তাহলে ধরা খাবার সম্ভাবনা আছে জেনেও শাসা ঘুরে অফিসের অন্য পাশের দেয়ালের কাছে চলে এল।

কিন্তু কান পেতেও বিড়বিড় শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।

“জানালা।” চিন্তাটা মাথায় আসতেই তাড়াতাড়ি কোনার দিকে সরে এল শাসা। কিন্তু খোলা জানালার নিচে দাঁড়ানোর আগেই পঞ্চাশ জোড়া চোখের দৃষ্টির সামনে ধরা খেতে হল। মেইন গেইটের কাছে এখনো জটলা পাকিয়ে আছে ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আর তার কর্মচারীর দল। কোনার দিক থেকে শাসাকে এগিয়ে আসতে দেখেই চুপচাপ সবাই এদিকে তাকাল।

মাথা ঝাঁকিয়ে দিক পরিবর্তন করে জানালার কাছ থেকে সরে এল শাসা। তারপর সবাই তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে নিজের অক্সফোর্ড ব্যাগের পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে অলসের মত ঘুরতে ঘুরতে জেটিতে চলে এল; যেন লম্বা জেটিতে বেড়ানোটাই ওর উদ্দেশ্য ছিল। হঠাৎ করে চোখে পড়ল নোঙর করা চারটা ডুবুডুবু ট্রলার। নৌকা দেখলে সব সময়েই খুশি হয়ে ওঠে শাসা। তাই উত্তপ্ত মরুভূমির এই একঘেয়ে বিকেলের বিতৃষ্ণা কাটাতে জেটির কাঠের ওপর দ্রুত হয়ে উঠল তার পা-জোড়া।

পুরো ব্যাপারটা সত্যিই বেশ নতুন আর উত্তেজনাময়। এত মাছ আগে কখনো একসাথে দেখেনি। না হলেও হাজার টন হবে। প্রথম নৌকার সমান্তরালে চলে এল শাসা। নাকে আসছে ফুয়েল অয়েল আর মানুষের মলের দুর্গন্ধ। নৌকাটার এমনকি কোনো নামও নেই : সমুদ্রের নোনা জলে ক্ষয়ে যাওয়া বো’র উপরে কেবল রেজিস্ট্রেশন আর লাইসেন্স নাম্বার রঙ করা।

“একটা নৌকার অবশ্যই একটা নাম থাকা উচিত।” মনে মনে ভাবল শাসা। তার নিজের তেরোতম জন্মদিনে উপহার হিসেবে মায়ের দেয়া পাঁচশ ফুট লম্বা ইয়টের নাম দ্য মিডাস টাচ।

কটু গন্ধে নাক কুঁচকে ফেলল শাসা। একই সাথে নৌকাটার প্রতি অবহেলা আর এর বেহাল দশা দেখে মন খারাপ করে ফেলল।

“মা বুঝি উইন্ডহক থেকে এত দূরে কষ্ট করে এটার জন্যই এসেছে” শাসার চিন্তায় বাধা দিয়ে লম্বা আর কোনাকৃতি হুইল হাউজের দিক থেকে বেরিয়ে এল একটা ছেলে।

পরনে তালিঅলা ক্যানভাস শর্টস, পা দুটো বাদামি আর পেশিবহুল। কিন্তু খালি অবস্থাতেও ভাসমান হ্যাঁচের উপর চমৎকারভাবে ভারসাম্য বজায় রেখেছে।

হঠাৎ করেই পরস্পরকে দেখতে পেয়ে শক্ত হয়ে গেল দুজনে। নিঃশব্দে পরস্পরকে মেপে দেখল।

“খাসা একটা ফুলবাবু” আপনমনে ভাবল ম্যানফ্রেড। উপকূলের উপরে সোয়াকোপমুন্ড শহরে এরকম দুএকজনকে আগেও দেখেছে। বড়লোকের ছেলেমেয়েগুলো এরকম হাস্যকর আটোসোটো পোশাক পরে মুখে আলগা ভাব নিয়ে বাবা-মায়ের পেছনে ঘুরে বেড়ায়।

অন্যদিকে শাসা ভাবল, “গরিব সাদা-আফ্রিকানগুলোর একজন।” মা ওকে এদের সাথে খেলতে মানা করলেও এদের কয়েকজন কিন্তু বেশ মজার। তাদের খনিতে মেশিন শপের ফোরম্যানের ছেলে এত সুন্দর করে পাখিদের ডাক নকল করতে পারে যে শুনলে মনে হবে সত্যিকারের পাখির আওয়াজ। এছাড়াও ছেলেটা শাসাকে পুরনো ফোর্ড গাড়ির ইগনিশন আর কার্বোরেটর অ্যাডজাস্ট করা শিখিয়েছে। আবার এই ছেলেটারই বড় বোন, শাসার চেয়েও বছরখানেকের বড় হবে; মেয়েটা খনির পাম্প হাউজের পেছনে তাকে আরেকটা গূঢ় জ্ঞান দান করেছে। পরবর্তী সুযোগেও আবার এই অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে অধীর হয়ে আছে শাসা।

এখন ট্রলারের উপরের ছেলেটাকে দেখেও আগ্রহ হচ্ছে। চোখ ঘুরিয়ে ফ্যাক্টরির দিকে তাকাল; নাহ, মা কিছু দেখছে না।

“হ্যালো” অভিজাত আচরণের সাথে সাবধানে হাসল শাসা। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুতুপূর্ণ পুরুষ নানা স্যার গ্যারিক কোর্টনি শিখিয়েছেন, “তুমি জন্মসূত্রেই সমাজের একটা বিশেষ অবস্থান পেয়ে গেছে। এই সুবিধার সাথে দায়িত্বও আছে। একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক তার অধীনস্থ সকলের সাথেই সদয় আচরণ করে।”

“আমার নাম কোর্টনি” ছেলেটাকে নিজের পরিচয় দিল শাসা কোর্টনি। “আমার মায়ের নাম মিসেস সেনটেইন ডি থাইরী কোর্টনি।” নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে সচরাচর যেমন অভিব্যক্তির দেখা পায় এবারে তা অনুপস্থিত থাকায় আস্তে করে জানতে চাইল, “তোমার নাম?”

“আমার নাম ম্যানফ্রেড।” ঘন কালো চোখের ভ্রু বাঁকা করে আফ্রিকান ভাষায় উত্তর দিল ম্যানফ্রেড, “ম্যানফ্রেড ডি লা রে। আমার দাদা, বাবা আর পুরো বংশই ডি লা রে। তারা যতবার ইংরেজদের মুখোমুখি হয়েছেন ততবারই গুলি ছুঁড়েছেন।”

অপ্রত্যাশিত এই আঘাতে শাসার গালে রঙ জমলেও ফিরে যেতে পারল না। হুইল হাউজের জানালায় হেলান দিয়ে এদিকে দেখছে এক বুড়ো। দুজন কৃষ্ণাঙ্গ নাবিকও এগিয়ে এল।

“আমরা, ইংরেজরা বিদ্রোহীদেরকে হারিয়ে ১৯১৪ সালে যুদ্ধে জিতেছি।”

“আমরা!” বাকিদের দিকে তাকাল ম্যানফ্রেড। “চুলে সুগন্ধি লাগানো এই ছোট্ট ভদ্রলোক নাকি যুদ্ধে জিতেছেন।” মিটিমিটি হেসে উৎসাহ দিল নাবিকেরা। “গন্ধে মনে হয় নাম হবে লিলি, দ্য পার্ফিউম সোলজার। অন্যদিকে ঘুরতেই শাসা প্রথমবারের মত উপলব্ধি করল যে ছেলেটা ওর চেয়ে ইঞ্চিখানেক লম্বা হবে। তার মানে তুমি ইংরেজ, তাই না লিলি?”

একটা গরিব শ্বেতাঙ্গ ছেলের বুদ্ধি যে এত সুরসিক হতে পারে ভাবতে পারেনি শাসা।

“অবশ্যই, আমি ইংরেজ। মনেপ্রাণে চাইছে এই পরিস্থিতি থেকে সরে পড়তে। কারণ ঘটনার উপর থেকে ওর নিয়ন্ত্রণ সরে যাচ্ছে।

“তাহলে তো নিশ্চয় লন্ডনে থাকো, তাই না?” এখনো জেদ করছে ম্যানফ্রেড।

“আমি কেপটাউনে থাকি।…

“হাহ!” ম্যানফ্রেডের দর্শক এখন বেড়ে যাচ্ছে। নিজের ট্রলার থেকে চলে এলেন সোয়ার্ট হেনড্রিক। নাবিকেরাও ভিড় করেছে।

“এ কারণেই এদেরকে সোতপিয়েল বলে।” ঘোষণা করল ম্যানফ্রেড।

খোঁচা খেয়ে জ্বলে উঠল শাসা। “সোতপিয়েলের এক পা লন্ডনে আর আরেক পা কেপটাউনে।” নাবিকেরা সমস্বরে হাততালি দিয়ে উঠতেই মরিয়া হয়ে উঠল শাসা। জেটিতে ছেলেটার ঠিক নিচে চলে এল।

তারপর আচমকা লাফ দিল। এত জলদি আক্রমণ! ম্যানফ্রেড ভেবেছিল কথার মাধ্যমে আরো খানিকক্ষণ শাসাকে অপমান করবে।

নিজের শরীরের সমস্ত ভার আর ক্ষোভ নিয়ে ছয় ফুট উপর থেকে ম্যানফ্রেডের ওপর পড়ল শাসা। হুশ করে বেরিয়ে গেল ম্যানফ্রেডের বুকের বাতাস। একসাথে জড়াজড়ি করে দুজনে মিলে গড়িয়ে পড়ল মরা মাছের জমির উপর।

ম্যানফ্রেডের শক্তি দেখেও চমকে গেল শাসা। ছেলেটার হাত কাঠের গুঁড়ির মত শক্ত আর আঙুল যেন কসাইয়ের হুক। কেবল বুকের বাতাস বেরিয়ে হতভম্ব থাকায় বেইজ্জতির হাত থেকে বেঁচে গেল শাসা। তার বক্সিং ইনস্ট্রাকটর জক মারফির নির্দেশনাও দেরিতে মনে পড়ল;

“তোমার চেয়ে বড় কাউকে কাছে থেকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করার সুযোগ দেবে না। মাঝখানে অন্তত এক হাতের দূরত্ব রাখবে।”

ম্যানফ্রেড খুব চাইছে ওর মুখে নখ ঢোকাতে আর হাফ নেলসন ভঙ্গিতে পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরতে। ডান হাঁটুর ওপর উঠে বসল শাসা; তারপর ম্যানফ্রেডও উঁচু হতেই বুকের উপর লাথি কষাল। হাঁফ ছেড়ে পিছনে গড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেড। কিন্তু এবার শাসাও গড়ানোর চেষ্টা করতেই ডেড লকের উদ্দেশে সামনে ঝাঁপ দিল। মাথা নিচু করে ডান হাত দিয়ে ম্যানফ্রেডের হাতের বাঁধন আলগা করতে চাইল শাসা। তারপর মুক্ত হবার সাথে সাথে বাম হাত দিয়ে ঘুষি মারল।

কাছে থেকে সোজা বাম দিকে ঘুসি চালাতে বহুবার শিখিয়েছে জক।

শাসা এটা তেমন ভালো না পারলেও ছেলেটার চোখে লাগতেই মাথা পিছনে হেলিয়ে খানিকক্ষণের জন্য অন্যমনষ্ক করা গেল। ফলে নিজ পায়ের উপর দাঁড়িয়ে সরে আসার সময় পেল শাসা।

ততক্ষণে পুরো জেটি ভর্তি হয়ে গেল। রাবার বুট আর গোলগলা জার্সি পরে দলে দলে ট্রলারের কৃষ্ণাঙ্গ নাবিকেরা এসে জড়ো হল। আনন্দ উত্তেজনায় যেন মোরগ লড়াই দেখছে এমনভাবে ছেলে দু’জনকে উৎসাহ দিতে লাগল।

ফোলা চোখ থেকে জল সরিয়ে ম্যানফ্রেড এগিয়ে এলেও পায়ের নিচের মাছে বাধা পেল। ফলে কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই আরেকটা ঘুসি হজম করতে হল। আহত চোখ এত ভীষণ জ্বালা করছে যে ক্রোধে চিৎকার করে হন্যে হয়ে শাসাকে খুঁজল।

মাথা নিচু করে ম্যানফ্রেডের হাতের নিচে ঢুকে আবারো বাম দিকে আঘাত করল শাসা।

এবার ম্যানফ্রেডের মুখে লাগায় ঠোঁট কেটে সাথে সাথে রক্ত ঝরতে লাগল। প্রতিদ্বন্দ্বীর রক্ত আর দর্শকদের চিৎকার শুনে নিজের ভেতরে আদিম এক সত্তার অস্তিত্ব টের পেল যেন শাসা; ম্যানফ্রেডের ফোলা গোলাপি চোখে আবার লাগাল ঘুসি।

মাথায় ঘুরছে জ’কের কথা, “মার্ক করে বারবারই একই জায়গায় মারবে।” এবার ম্যানফ্রেডের চিৎকারে আক্রোশের পাশাপাশি ব্যথার বোধও ছিল।

“সত্যিই কাজ হয়েছে” আনন্দিত শাসা হুইল হাউজের দিকে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করতেই দু’হাত দুপাশে ছড়িয়ে হাসতে হাসতে তেড়ে এল ম্যানফ্রেড।

এ দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত শাসা হুইল হাউজের কাঠ ধরে সামনে আঘাত হানল। তার মাথা গিয়ে সোজা ম্যানফ্রেডের পাকস্থলীতে লেগেছে।

আরো একবার দম বন্ধের মত দিশেহারা হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। হামাগুড়ি আর সাঁতার দেয়ার ভঙ্গিতে আস্তে করে জেটির কাঠের মইয়ের গোড়ায় চলে এল শাসা।

হাসছে পুরো জেটি ভর্তি দর্শক। থু করে মুখ থেকে রক্ত আর মাছের আঁশ ফেলল ম্যানফ্রেড। নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টায় ভয়ংকরভাবে ওঠানামা করছে ওর বুক।

শাসা মইয়ের মাঝ বরাবর আসতেই গোড়ালি ধরে টান দিল ম্যানফ্রেড। মরিয়া হয়ে মই আঁকড়ে ধরতে চাইল শাসা। নাবিকদের মুখগুলো আর বেশি হলে ইঞ্চিখানেক দূরে। জেটির উপর ঝুঁকে সবাই যেন ওর রক্ত দেখার অপেক্ষা করছে।

পা দুটো মুক্ত হতেই ম্যানফ্রেডের ফোলা চোখে লাথি কষাল শাসা। ছেলেটা পিছিয়ে যেতেই হাঁচড়ে-পাঁচড়ে জেটিতে উঠে অগ্নিদৃষ্টিতে চারপাশে তাকাল শাসা। এতক্ষণে যুদ্ধ করার নেশা কেটে গেছে। এখন কাঁপছে।

জেটি ধরে পালিয়ে যাবার পথ খোলা থাকলেও চারপাশের লোকগুলোর হাসি আর উদ্ধত ভাব দেখে ওর পা দুটো যেন জমে গেল। চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই হতাশ হয়ে দেখল ম্যানফেডও উঠে এসেছে।

কেমন করে যে এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল শাসা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। আবারো ম্যানফ্রেডের মুখোমুখি হবার আগে চেষ্টা করল নিজের কাপুনি থামাতে।

বড়সড় ছেলেটাও কাঁপছে। কিন্তু ভয়ে নয়। খুনির মত ক্রোধে জ্বলছে ওর চেহারা। রক্তাক্ত ঠোঁট থেকেও কেমন যেন হিসহিস আওয়াজ বের হচ্ছে।

“ওকে খুন করে ফেলো ছোট্ট মনিব।” কৃষ্ণাঙ্গ ট্রলার নাবিকদের চিৎকার শুনে নিজেকে ধাতস্থ করল শাসা। গভীরভাবে বুকভর্তি দম নিয়ে ক্ল্যাসিক বক্সারদের ভঙ্গিতে হাত মুঠি পাকিয়ে দাঁড়াল।

“সারাক্ষণ নড়বে।” মনে পড়ল জকের পরামর্শ। বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে পাক দিল শাসা।

“দেখো কী করছে!” চিৎকার করে উঠল ভিড়ের দর্শক। “নিজেকে জ্যাক ডেমসে ভাবছে। ওকে ওয়ালবিস বে ওয়ালট্‌জ দেখিয়ে দাও ম্যানি!”

সংকল্পবদ্ধ গাঢ় নীল দু’খানা চোখ নিয়ে শাসার চারপাশে চক্কর কাটছে ম্যানফ্রেড।

নিজের সাবধানতা বজায় রেখে আস্তে আস্তে ম্যানফ্রেডের সাথে ঘুরছে। শাসা। দু’জনেরই সারা গায়ে, মাথায় থকথকে মাছের কাদা আর আঁশ। কিন্তু কাউকে দেখেই শিশুসুলভ বলে মনে হচ্ছে না। ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। নিশ্চুপ হয়ে গেল উপস্থিত দর্শকের দল। নেকড়ের পালের মত ধকধক করছে তাদের চোখ। হাঁসের মত গলা বাড়িয়ে সাগ্রহে দেখছে সামঞ্জস্যহীন এই জুটির লড়াই।

খানিকটা বামদিক ঘেঁষে পাশ থেকে আঘাত করল ম্যানফ্রেড। দৈহিক আকার, ভারি পা আর কাধ সত্ত্বেও গতি বেশ দ্রুত। উজ্জ্বল সোনালি চুলঅলা নিচু মাথা আর বাঁকানো জোড়া প্রমাণ করছে আক্রমণের ভয়াবহতা।

কিন্তু সে তুলনায় শাসাকে মেয়েদের মতই কমনীয় দেখাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও ম্যানফ্রেডের আঘাতের উত্তরে সরে গিয়ে নিজের বাম হাত চালাল। পাঞ্চ খেয়ে সশব্দে ক্লিক করে উঠল ম্যানফ্রেডের দাঁত। একই সাথে মাথা পেছনে হেলে গেল।

গর্জন করে উঠল সকলে, “ওকে ধরো ম্যানি!” আবারো তেড়ে এসে শাসা’র কোমল মসৃণ চেহারায় শক্তিশালী এক ঘুসি লাগাল ম্যানফ্রেড।

মাথা নিচু করে ঘুসিটাকে এড়িয়ে গেল শাসা। আর এর প্রায় সাথে সাথে ভারসাম্যহীন ম্যানফ্রেডের বেগুনি ফোলা চোখে বাম হাত দিয়ে আঘাত করল। চোখের উপর দু’হাত রেখে গর্জন করে উঠল ম্যানফ্রেড।

“ঠিকভাবে লড়ো। দুই নম্বরী করছ কেন?”

“জা!” ভিড়ের মধ্য থেকে একজন আবার ম্যানফ্রেডকে সমর্থন দিল। “ভেগে যাওয়া বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পুরুষের মত লড়াই করো।”

পাশাপাশি নিজের কৌশলও বদলে ফেলল ম্যানফ্রেড। চরকাটা বন্ধ করে সোজাসুজি এগিয়ে এল। সাথে ভয়ংকরভাবে বাতাসে ঘোরাচ্ছে দুই হাত। উন্মাদের মত কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে, মাথা নিচু করে পিছু হটছে শাসা। ম্যানফ্রেডের মুখে একের পর এক আঘাত করেও ছেলেটাকে থামাতে পারছে না। চোখের নিচে কেটে চামড়া ফুলে ঢোল হয়ে গেছে : কিন্তু মনে হচ্ছে এসব আঘাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।

ম্যানফ্রেডের বাদামি রঙা হাতের মুঠি কপিকল আর জাল নিয়ে কাজ করতে করতে শক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা ঘুসি শাসার চুলে লাগলেও একটা এসে সোজা মাথার তালুতে লাগল। নিজে আঘাত করা বাদ দিয়ে এসব ঘুসির হাত থেকে বাঁচতেই যুদ্ধ শুরু করল শাসা। কোমরের নিচে পা দুটোও ক্রমশ অসাড় আর ভারি হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে ক্লান্তিহীনভাবে আঘাত করছে ম্যানফ্রেড। হতাশা আর পরিশ্রম মিলে ধীর হয়ে যাচ্ছে শাসার গতি। প্রচণ্ড জোরে পাজরের উপর ঘুসির আঘাত সহ্য করতে না করতেই দেখে মুখের উপর আরেকটা এগিয়ে আসছে। এড়াতে না পেরে ম্যানফ্রেডের হাত আঁকড়ে ধরল শাসা। এ সুযোগেরই অপেক্ষাতে ছিল ম্যানফ্রেড। অন্যহাতে শাসার গলা জড়িয়ে ধরল।

“এবারে বাগে পেয়েছি।” জোর করে নুইয়ে ফেলে বাম হাতের নিচে নিল শাসার মাথা। তারপর ডান হাত তুলে নির্মম এক আপার কাট চালাল।

শাসা বুঝতে পারল কী ঘটতে চলেছে। এত জোরে নড়ে উঠল যে, মনে হল ঘাড় ছিঁড়ে যাবে। কিন্তু তারপরেও কোনোমতে মুখ বাঁচিয়ে কপাল দিয়ে ঠেকালো আঘাত। তারপরেও কপালের খুলি ভেঙে যেন মগজে ঢুকে গেল লোথার পেরেক। বুঝতে পারল এরকম আরেকটা আঘাত আর সহ্য করতে পারবে না।

চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল দৃষ্টিশক্তি। বুঝতে পারল দু’জনে জেটির কিনারে চলে এসেছে। সর্বশক্তি দিয়ে চাইল কিনার দিয়ে পড়ে যেতে। কিন্তু ম্যানফ্রেন্ড বুঝতে না পেরে ভুল দিকে গড়িয়ে যাওয়ায় উড়ে গিয়ে পড়ল ছয় ফুট নিচে ট্রলারের মাছভর্তি ডেকে।

ম্যানফ্রেডের শরীরের নিচে চাপা পড়ল শাসা। তাই সাথে সাথে রুপালি মাছের চোরাবালিতে ডুবতে শুরু করল ওর দেহ। ম্যানফ্রেড আরেকটা ঘুসি মারতে চাইলেও শাসার মাথার চারপাশে নরম মাছ লেগে তা ভেস্তে গেল। পুনরায় আঘাতের চেষ্টা বাদ দিয়ে শাসার ঘাড়ের উপর নিজের সবটুকু ভার দিয়ে ছেলেটার মাথা চেপে ধরতে চাইল ম্যানফ্রেড।

ডুবে যাচ্ছে শাসা। চিৎকার করার চেষ্টা করতেই একটা মরা মাছ ওর খোলা মুখে ঢুকে গলায় গিয়ে আটকে গেল। অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে সমানে হাত পা ছুড়ছে; কিন্তু ছাড়ছে না ম্যানফ্রেড। গলায় মাছের মাথা আটকে থাকায় মনে হল দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। মাথার ভেতরে বাতাসের মত শো শো শব্দ হচ্ছে; অন্ধকার হয়ে এল দৃষ্টিশক্তি। এমন সময় উপরের জেটি থেকে শোনা গেল খুনে উল্লাস।

“আমি মারা যাচ্ছি” কেমন যেন বিস্ময় বোধ করল শাসা। “আমি ডুবে যাচ্ছি-” অচেতন হয়ে পড়ায় বাধা পেল চিন্তা।

***

“তুমি এখানে আমাকে ধ্বংস করতে এসেছে,” বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করলেন লোথার ডি লা রে। “এতদূর কষ্ট করে এসেছে স্বচক্ষে দেখে আনন্দ লুটতে।”

“নিজেকে এত বেশি গুরুত্ব দিও না।” নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন সেনটেইন। “তোমার উপরে আমার এতটুকুও আগ্রহ নেই। আমি কেবল আমার বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে এসেছি। পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড, সাথে সুদ।”।

“তাহলে আমাকে কাজ করতে বাধা দিতে না। এক হাজার টন মাছ। পেয়েছি, যা আগামীকাল সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ডে পরিণত হবে।”

অধৈর্য হয়ে হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন সেনটেইন। “তুমি আসলে কল্পনার দেশে বাস করছে। তোমার এই মাছের কোনো নেই। এসব কেউ চায় না। পঞ্চাশ হাজার তো বহু দূরের কথা।”

“অবশ্যই এর মূল্য আছে, মাছের খাবার, ক্যান তৈরি

আবারো লোথারকে চুপ করতে ইশারা করলেন সেনটেইন।

“তুমি সংবাদপত্র পড়ো না? এই মরুভূমিতে কোনো খবরই রাখো না, নাকি? জানো না যে দুনিয়ার ভাড়ারগুলো সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরে উঠেছে?”

“না, এটা সম্ভব না।” জেদের সুরে বলে উঠলেন লোথার। “স্টক মার্কেটের কথা অবশ্যই শুনেছি, কিন্তু মানুষকে খেতেও তো হবে।”

“তোমাকে নিয়ে আমি অনেক কিছুই ভেবেছি, কিন্তু এতটা নির্বোধ হবে বলে কখনো ভাবিনি।” মনে হল কোনো শিশুর সাথে কথা বলছেন সেনটেইন। “দুনিয়াতে কী ঘটছে বুঝতে চেষ্টা করো। সবরকম বাণিজ্য বন্ধ। ফ্যাক্টরিগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে। বড় শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বেকার।”

“এসব তুমি তোমার কাজের অজুহাত হিসেবে বলছো। আমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছো।” সেনটেইনের দিকে এগিয়ে এলেন লোথার। “বহু আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার জন্য আমাকে শাস্তি দিতে তাড়া করছে।”

“ঠিক তাই।” খানিকটা পিছিয়ে এলেও লোথারের চোখে চোখে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। “ক্ষমার অযোগ্য, ভয়ংকর এই নিষ্ঠুর অপরাধের জন্য তোমাকে আমি যে শাস্তিই দিই না কেন যথেষ্ট হবে না। ঈশ্বর জানেন সে

“আর সন্তান?” শুরু করলেন লোথার, “যে সন্তানকে তুমি আমার কাছে ফেলে-” এই প্রথমবারের মত সেনটেইনের শান্ত অভিব্যক্তির মাঝে করাঘাত করলেন লোথার।

“তোমার ওই বেজন্মার কথা আমার সামনে তুলবে না।” এক হাত দিয়ে আরেক হাত ধরে নিজের কাঁপুনি থামালেন সেনটেইন।

“ও আমাদের ছেলে। এটা তো তুমিও অস্বীকার করতে পারবে না। তুমি কি ওকেও ধ্বংস করতে চাও?” লোথারের দাবি।

“ও তোমার ছেলে।” অস্বীকার করলেন সেনটেইন। “ও তো আমার অংশই নয়। তাই এতে আমার সিদ্ধান্তেরও নড়চড় হবে না। তোমার ফ্যাক্টরি পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেছে। তাই আমার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের আশা তো বাদই দিলাম, একটা অংশ ফেরত পেলেই বাঁচি।”

এমন সময় খোলা জানালা দিয়ে ভেসে এল বহু মানুষের কণ্ঠস্বর। এতদুর থেকেও সকলের উত্তেজিত গলা পাওয়া যাচ্ছে। যেন রক্তের নেশায় মত্ত হয়ে উঠেছে একপাল হাউন্ড। কিন্তু লোথার কিংবা সেনটেইন কেউই সেদিকে খেয়াল করলেন না।

“আমাকে একটা সুযোগ দাও সেনটেইন।” নিজের কণ্ঠের আকুতির সুরে নিজেই বিরক্ত হলেন লোথার। জীবনে কখনো কারো কাছে হাত পাতেননিঃ কিন্তু সবকিছু নতুন করে শুরু করার সম্ভাবনাও দেখছেন না। এর আগেও দুবার সর্বস্ব হারিয়েছেন। কেবল সাহস আর দৃঢ় সংকল্প টিকে ছিল। প্রতিবারই শত্রু ছিল ইংরেজ এবং শূন্য থেকে নিজ ভাগ্য গড়ে তুলেছেন লোথার।

কিন্তু এবার আর পারছেন না। তাঁর সন্তানের জননী, সেই ভালোবাসার নারী, ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করুন এখনো ওকে ওরকমই ভালোবাসেন। ছেচল্লিশ বছর বয়সে শরীরে এখন আর তরুণদের মত উদ্দাম নেই। সেনটেইনের চোখেও যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল অনুকম্পা।

“আমাকে একটা সপ্তাহ কেবল একটা সপ্তাহ সময় দাও সেনটেইন।” বললেও সাথে সাথে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন লোথার।

বাইরে প্রকাশ না পেলেও সেনটেইনের চোখ দেখে ঠিকই বুঝতে পারলেন যে এই মুহূর্তের জন্য, লোথারের হেনস্থা দেখার প্রতীক্ষাতেই বসেছিলেন সেনটেইন।

“আমার খ্রিস্টান নাম ধরে না ডাকতে তোমাকে মানা করেছিলাম। যখন জানতে পেরেছি যে তুমি আমার সবচেয়ে ভালোবাসার দু’জন মানুষকে হত্যা করেছে তখনই বারণ করেছি। এখন আবারো বলছি।”

“এক সপ্তাহ। কেবল এক সপ্তাহ।”

“আমি ইতিমধ্যেই তোমাকে দুই বছর দিয়েছি।”

এইবার মাথা ঘুরিয়ে খোলা দরজার দিকে তাকালেন সেনটেইন। মনে হচ্ছে যেন ষাড়ের লড়াইয়ের রক্তাক্ত গর্জন।

“আরেকটা সপ্তাহ দেয়া মানে বেড়ে যাবে তোমার ঋণের বোঝা আর আমার লোকসানের পরিমাণ।” মাথা ঝাঁকালেন সেনটেইন; কিন্তু দেখলেন লোথার একদৃষ্টে জানালা দিয়ে বাইরে কী যেন দেখছেন, “নিচের জেটিতে কী হচ্ছে?” জানালার শার্সিতে হাত রেখে সৈকতে তাকালেন সেনটেইন।

পাশে চলে এলেন লোথার। জেটির মাঝ বরাবর মানুষের একটা জটলা।

“শাসা!” মাতৃসুলভ উদ্বেগে চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন। “শাসা কোথায়?” হঠাৎ জানালার ভেতর দিয়ে লাফ দিয়ে জেটির দিকে ছুটলেন লোথার। চিৎকাররত নাবিকদেরকে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সোজা এগিয়ে গেলেন জেটির কিনারে।

“ম্যানফ্রেড!” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে গর্জন করে বললেন, “থামো! ওকে ছাড়ো!”।

হেডলক দিয়ে পেঁচিয়ে হাত ঘুরিয়ে রোগা-পটকা ছেলেটার মাথায় মারল তার নিজের ছেলে। শাসার খুলি ফাটার আওয়াজ পেলেন লোথার।

“বেকুব কোথাকার!” এগিয়ে গেলেন লোথার। কিন্তু ভিড়ের শব্দে কিছুই শুনল না দুই ছেলে। শাসার জন্য সত্যিই ভয় পেলেন লোথার, এও ভালোভাবেই বুঝলেন যে, ছেলেটা আহত হলে সেনটেইনের প্রতিক্রিয়া কী হবে।”ওকে ছাড়ো!” কিন্তু লোথার পৌঁছাবার আগেই জেটির কিনার বেয়ে পড়ে গেল যুদ্ধরত জুটি। “ওহ, ঈশ্বর।” তাড়াতাড়ি কিনারে গিয়ে দেখলেন যে চকচকে মাছের মধ্যে প্রায় ডুবে গেছে দুজন।

মইয়ের মাথায় পৌঁছাতে চাইলেও লড়াইয়ের এক মুহূর্তও মিস করতে নারাজ কৃষ্ণাঙ্গ নাবিকদের ভিড় ঠেলে কিছুতেই পৌঁছাতে পারছেন না লোথার। অতঃপর দুই হাতে ঘুসি মেরে নিজের লোকদেরকে সরিয়ে ট্রলারের ডেকে নিচে এলেন লোথার।

অন্য ছেলেটার ওপর বসে তার মাথা আর কাঁধ মাছের স্তূপের নিচে ঠেসে ধরেছে ম্যানফ্রেড।

তার নিজের মুখে অসংখ্য ক্ষতের আঁকিবুকি আর ক্রোধ। রক্তমাখা ফোলা ঠোঁটে অনবরত বিভিন্ন ধমক দিয়ে চলেছে ম্যানফ্রেড। শাসার মাথা আর কাঁধ দেখা না গেলেও মাথায় গুলি খেয়ে আহত লোকের স্নায়ুবিহীন পদক্ষেপের মত নড়ছে দুটো পা।

ছেলের কাধ ধরে সরিয়ে নিয়ে আসতে চাইলেন লোথার। মনে হল এক জোড়া ম্যাস্টিফকে আলাদা করতে চাইছেন। প্রচণ্ড শক্তি খাটাতে হল। ম্যানফ্রেডকে তুলে হুইল হাউজের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। একই সাথে শাসার পা ধরে মরা মাছের চোরাবালি থেকে টেনে তুললেন।

“তুমি ওকে মেরে ফেলেছে, নিজ পুত্রের দিকে তাকিয়ে ঘোঁত ঘোত করে উঠলেন লোথার। চেহারা থেকে রক্ত সরে গিয়ে ছাই রঙা হয়ে গেল ম্যানফ্রেডের মুখ। কাঁপতে শুরু করল।

“আমি তো তা চাইনি, পা। আমি চাইনি-”।

শাসার নিথর মুখের ভেতরে মরা মাছ ঢুকে দম বন্ধ করে দিয়েছে। নাকের ফুটো দিয়ে বের হল মাছের কাদার বুদবুদ।

“বেকুব কোথাকার! হাঁদারাম একটা!” আঙুল ঢুকিয়ে শাসার মুখ থেকে মাছ বের করে আনলেন লোথার।

“আমি দুঃখিত, পা। আমি সত্যিই এটা চাইনি।” ফিসফিস করে উঠল ম্যানফ্রেড।

“যদি তুমি ওকে মেরে ফেলতে তাহলে বুঝতেও পারছে না যে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তা কত বড় অপরাধ হত।” শাসাকে কোলে তুলে নিলেন লোথার।

“তুমি তোমার নিজের নির্মম সেই সত্যটা উচ্চারণ না করে কেবলমাত্র খানিক জোর দিয়েই মইয়ের দিকে ঘুরলেন লোথার।

“আমি ওকে হত্যা করিনি।” ভয় পেয়ে গেল ম্যানফ্রেড, “ও তো মারা যায়নি। ঠিক হয়ে যাবে, তাই না পা?” …

“না।” গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন লোথার। “আর কখনো ঠিক হবে না।” অচেতন শরীরটাকে বইয়ে নিয়ে জেটিতে উঠে গেলেন লোথার।

নিঃশব্দে সরে জায়গা করে দিল সকলে, ম্যানফ্রেডের মত তারাও অপরাধবোধে ভুগছে।

“সোয়ার্ট হেনড্রিক,” গলা চড়িয়ে ডাকলেন লোথার, “তুমি তো সবকিছু জানো। কেন থামালে না?”

সৈকত থেকে ফ্যাক্টরি যাবার পথে অপেক্ষা করছিলেন সেনটেইন। শাসার অসার দেহ নিয়ে তার সামনে থেমে গেলেন লোথার।

“ও মারা গেছে” অসহায়ের মত বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন।

“না।” মন থেকেই কথাটা বললেন লোথার। আর এর সত্যতা প্রমাণের জন্যই যেন গুঙ্গিয়ে উঠে বমি করল শাসা।

“তাড়াতাড়ি।” কাছে এগিয়ে এলেন সেনটেইন। “তোমার কাঁধে উল্টো করে ফেলে নাও। নতুবা নিজের বমিতেই দম বন্ধ করে ফেলবে।”

শাসার ঝুলন্ত দেহকে ব্যাগের মত কাঁধের উপর ফেলে শেষ কয়েক গজ দৌড়ে অফিসে চলে এলেন লোথার। টেবিল খালি করে দিলেন সেনটেইন।

“ওকে এখানে শোয়াও।” দুর্বলভাবে উঠে বসার চেষ্টা করল শাসা। নিজের ড্রেসের হাতা দিয়ে ছেলের নাক-মুখ মুছিয়ে দিলেন সেনটেইন।

“এটা তোমার বেজন্মাটার কাজ।” ডেস্কের ওপাশ থেকে অগ্নিদৃষ্টিতে লোথারের দিকে তাকালেন সেনটেইন। “ও আমার ছেলের সাথে এমন করেছে তাই না?”

চোখ সরিয়ে নেবার আগে লোথারের মুখে উত্তরও পেয়ে গেলেন।

“এখান থেকে যাও।”

শাসার ওপর ঝুঁকে এলেন সেনটেইন। “তুমি আর তোমার বেজন্মাটা তোমাদের দুজনকেই আমি দেখে নেবো। এখন আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হও।”

***

ওয়ালবিস বে’ থেকে বেরিয়ে রাস্তাটা বিশাল সব কমলা রঙের বালিয়ারির জট পাকানো উপত্যকার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে।

শক্ত হাতে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন সেনটেইন। ইঞ্জিনকে এতটুকুও থামতে দিচ্ছেন না। এমনকি গোলকধাঁধার মত অঞ্চলে যেখানে অন্যান্য যানবাহনও গর্তে ডুবে যায় বড়সড় হলুদ গাড়িটাকেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঠিকই সোজা রেখেছেন।

রেসিং ড্রাইভারদের মত বত্র মুষ্ঠিতে ধরে রেখেছেন হুইল। চামড়ায় মোড়ানো সিটে সোজা বসে একেবারে পুরোটা বাঁক দেখতে পাচ্ছেন। এমনকি বালির ফাঁদে আটকে গেলে ডেইমলারকে ধাক্কা দেবার জন্য ব্যাক সিটে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারককে নিয়ে ভ্রমণের নীতিরও তোয়াক্কা করেননি সেনটেইন। খনির বাইরে রাস্তা যত খারাপই হোক না কেন, মাকে কখনো পাঁকে আটকে যেতে দেখেনি শাসা।

ক্যানিং ফ্যাক্টরির স্টোর থেকে আনা পুরনো স্যুট গায়ে পরে সিটে উঠে বসল। ডেইমলারের বুটে তুলে নেয়া হয়েছে ওর মাছের গন্ধঅলা আর বমিতে মাখামাখি পোশাক।

ফ্যাক্টরি ছাড়ার পর এখনো একটাও কথা বলেনি মা। কিন্তু শত চেষ্টা করেও মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারছে না শাসা।

“কে শুরু করেছিল?” রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই জানতে চাইলেন সেনটেইন।

খানিক ভেবে শাসা উত্তর দিল, “আমি নিশ্চিত নই। প্রথম আঘাত আমিই করেছি, কিন্তু গলাটা এখনো ব্যথা করছে।

“বলো?”

“মনে হচ্ছে যেন সব সাজানোই ছিল। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাবার সাথে সাথে মনে হল যে লড়তে হবে।” মা কিছু বলছে না দেখে শাসা কাচুমাচু করে শেষ করল, “ও আমাকে গালি দিয়েছে।”

“কী বলেছে?”

“বলতে পারব না। শব্দটা অনেক খারাপ।”

“আমি জানতে চাইছি কী বলেছে?” মায়ের গলা একটু না কাঁপলেও বিপদ সংকেত টের পেল শাসা।

“সোয়েতপিয়েল বলেছে।” তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়েই অপমান বোধে অন্য দিকে তাকালো শাসা। তাই মায়ের হাসি চাপার চেষ্টা আর চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠা কৌতুকের ছটা দেখতে পেল না।

“আমি বলেছি না যে খুব খারাপ।” ক্ষমা চাইল শাসা।

“তাই তুমি তাকে মারলে, ও তো তোমার চেয়েও ছোট।”

শাসা নিজে এ তথ্য না জানলেও মা জানে দেখে একটুও অবাক হল না। মা সব জানে আসলে।

“হতে পারে ছোট; কিন্তু আমার চেয়েও দুইঞ্চি লম্বা একটা বড়সড় আফ্রিকান ষড়।” তাড়াতাড়ি আত্মরক্ষায় বলে উঠল শাসা।

সেনটেইনের মন চাইল শাসার কাছে তার অন্য ছেলের খবর নেন। দেখতে কি ওর বাবা একদা যেমন ছিল তেমন সুদর্শন হয়েছে? কিন্তু এর বদলে জানতে চাইলেন, “আর তারপর ও তোমাকে ঠেসে ধরল?”

“আমি প্রায় জিতেই যাচ্ছিলাম।” দৃঢ়কণ্ঠে আত্মপক্ষ সমর্থন করল শাসা, “রক্ত বের করে ওর চোখটাকে সুন্দর করে বুজে দিয়েছি। প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম।”

“প্ৰায় কথাটা ততটা ভালো নয়। আমাদের পরিবারে আমরা প্রায় জিতেই ক্ষান্ত হই না, একেবারে জিতে যাই।”

অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল শাসা। “নিজের চেয়ে বড় আর শক্তিশালী কারো সাথে জেতা যায় না।”

“তাহলে হাত মুঠি পাকিয়ে লড়তে যাবে না।” ছেলেকে শেখালেন সেনটেইন, “দৌড়ে গিয়ে ওকে সুযোগ দিলে যেন তোমার মুখে একটা মরা মাছ ঢুকিয়ে দিতে পারে।” অপমানে লাল হয়ে উঠল শাসার গাল। “নিজের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করবে। তারপর তোমার অস্ত্র আর শর্ত দিয়েই লড়াই করবে। তখনই লড়বে যখন জানবে যে তোমার জয় সুনিশ্চিত।”

মায়ের কথাকে খুব সাবধানে বিভিন্ন দিক থেকে ভেবে দেখল শাসা। “ওর বাবার সাথেও তুমি তাই করেছে, না?” নরম স্বরে জানতে চাইল মায়ের কাছে, ছেলের কথা শুনে চমকে গেলেন সেনটেইন। শাসার দিকে তাকাতেই ঝাঁকুনি খেল ডেইমলার।

দ্রুতহাতে আবার গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনলেন সেনটেইন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। আমি তাই করেছি। আমরা কোর্টনি বুঝেছো? হাত দিয়ে যুদ্ধ করতে হবে না। আমরা অর্থ, ক্ষমতা আর প্রভাব-প্রতিপত্তি দিয়ে লড়াই করি। আমাদেরকে তাই কেউ হারাতে পারবে না।”

চুপচাপ খানিক ভাবল শাসা। তারপর আবার হেসে ফেলল। বলল, “ঠিক আছে আমি মনে রাখব। পরেরবার ওর সাথে দেখা হলে তোমার কথা অবশ্যই মনে রাখব।”

কিন্তু মা-ছেলে কেউই জানোনা যে, এই দুই ছেলের আবার দেখা হবে আর তখনো আজ শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্বের জের চলতেই থাকবে।

***

সমুদ্রের দিক থেকে আসা বাতাসে পচা মাছের গন্ধ এত তীব্র হয়ে নাকে লাগছে যে লোথার ডি লা রের গলায় ঢুকে যেন অসুস্থ বানিয়ে ফেলল।

চারটি ট্রলার এখনো তাদের জায়গামত থাকলেও কার্গোগুলো আর রূপার মত চকচক করছে না। সারাদিন ফ্যাক্টরি অফিসের জানালার কাছে বসেই কাটিয়ে দিলেন লোথার। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ ট্রলার নাবিক আর প্যাকারদের বেতন তো দিতেই হবে। তাই পুরনো প্যাকার্ড ট্রাক আর সবশেষ অবলম্বন কয়েকটা ফার্নিচার বিক্রি করে দিতে হল। এগুলোই একমাত্র সম্পত্তি যেগুলোর উপর কোর্টনি কোম্পানির কোনো এক্তিয়ার নেই। সোয়াকোপমুন্ড থেকে আসা সেকেন্ড হ্যান্ড ডিলারও কেমন করে যেন দুরাবস্থার গন্ধ পেয়ে গেল; ঠিক শকুনদের মত। ব্যাটা আসবাবগুলোর প্রকৃত মূল্যের অনেক কম লোথারকে গছিয়ে দিয়ে চলে গেল।

নিজের কুটিরের বালির মেঝেতে লুকিয়ে রাখা অর্থ সহযোগে কোনমতে নাবিকদের পারিশ্রমিক শোধ করলেন লোথার। যদিও এখন আর এটা তার দায়িত্ব নয়, কিন্তু এরা তার আপনার জন; ওদের সাথে তো তিনি আর অন্যায় করতে পারেন না!,

“আমি দুঃখিত! জানালা দিয়ে প্রত্যেককে একই কথা বললেন লোথার; কিন্তু কারো চোখের দিকে তাকাতে পারলেন না।

তারপর সবাই চলে যাবার পর অফিসের দরজায় তালা দিয়ে ডেপুটি শেরিফের হাতে চাবি তুলে দিলেন।

এরপর পিতা-পুত্র দুজনে মিলে শেষবারের মত জেটিতে এসে পা ঝুলিয়ে বসে রইলেন। চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে মরা মাছের গন্ধে।

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, পা।” উপরের ঠোঁটে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত নিয়ে বলে উঠল ম্যানফ্রেড, “আমরা এত মাছ ধরেছি, তাহলে তো বড়লোক হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এসব কী হয়েছে পা?”

“আমাদেরকে ধোকা দেয়া হয়েছে।” আস্তে করে জানালেন লোথার। এই মুহূর্তটার আগপর্যন্ত মনে কোন রাগ কিংবা তিক্ততা ছিল না, ছিল কেবল অসার এক অনুভূতি। আগেও দুবার গুলি খেয়েছেন। একবার ওমারুরুর রাস্তায় আরেকবার নিজ পুত্রের মায়ের হাতে।

সেবারও এরকমই হয়েছিল। প্রথমে স্থবিরতা; তারপর বহু পরে রাগ আর ব্যথা, এবার কালো ঢেউয়ের মত ধেয়ে এল রাগ। তাতে খানিকটা উপশম হল সেনটেইনের গাঢ় চোখে অপমানের হাসি দেখার জ্বালা।

“আমরা ওদেরকে থামাতে পারি না, পা? জানতে চাইল ম্যানফ্রেড। কিন্তু কেউই বলল না “ওরা” কারা। নিজেদের শত্রুকে দুজনেই চেনে।

প্রচণ্ড রাগের তোড়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন লোথার। মাথা নাড়লেন কেবল।

“একটা না একটা পথ নিশ্চয় আছে।” আবারো বলে উঠল ম্যানফ্রেড। “আমাদের শক্তি আছে।” মনে পড়ল হাতের নিচে দুর্বল হয়ে পড়া শাসার কথা। আনমনেই হাত ভাজ করল ছেলেটা, “এটা তো আমাদের, পা। এই জমি আমাদের। ঈশ্বর আমাদেরকে দিয়েছেন। বাইবেলেও তো সে কথাই লেখা আছে।” তার পূর্বসূরিদের মত ম্যানফ্রেডও বাইবেলকে নিজের মত করেই ব্যাখ্যা করেছে।

বাবাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে শার্টের হাতা ধরে নাড়া দিল ম্যানফ্রেড, “ঈশ্বর তো এটা আমাদেরকে দিয়েছেন। তাইনা পা?”

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়লেন লোথার।

“আর তারপর ওরা আমাদের কাছ থেকে এটা চুরি করে নিয়ে গেছে, পুরো জমি। হীরে, সোনা সবকিছু। এবারে আমাদের নৌকা আর মাছগুলোও নিল। ওদেরকে থামাবার নিশ্চয়ই কোনো পথ আছে।”

“ব্যাপারটা আসলে এত সহজ নয়।” ছেলের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন লোথার। উনি নিজেই তো পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছেন না। তাই বললেন, “তুমি যখন বড় হবে নিজেই সবকিছু বুঝতে পারবে ম্যানি।”

বড় হলে ওদেরকে হারাবার পথ ঠিকই বের করে ফেলব।” ম্যানফ্রেড এত জোর দিয়ে কথাটা বলল যে শুকনো ঠোঁট ফেটে রুবির মত লাল ফোঁটা বের হল।

“ওয়েল, বাছা, হয়ত তুমি ঠিকই পারবে।” ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন লোথার।

“দাদার শপথ মনে নেই পা? আমার মনে থাকবে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না।”

সূর্য উপসাগরের পানি স্পর্শ না করা পর্যন্ত দু’জনে একসাথে বসে রইলেন। তারপর অন্ধকার নেমে এলে চলে এলেন কুটিরের কাছে। এগোতেই দেখা গেল চিমনির ধোয়া। হেলে পড়া রান্নাঘরে ঢুকতেই চুলার উপর থেকে চোখ তুলে তাকালেন সোয়ার্ট হেনড্রিক।

“ইহুদিটা টেবিল-চেয়ার নিয়ে গেলেও আমি মগ আর পাতিলগুলো সরিয়ে রেখেছি।”

মেঝেতে বসে সকলে মিলে সোজা পাতিল থেকেই খেয়ে নিলেন গমের পরিজ আর শুকনো নোনা মাছ। শেষ না করা পর্যন্ত কেউ কোনো কথা বলল না।

অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন লোথার, “তোমার রয়ে যাবার তো দরকার ছিল না।”

কাঁধ ঝাঁকালেন সোয়ার্ট। “দোকান থেকে কফি আর ডোবাকো কিনে এনেছি। তুমি যে টাকা দিয়েছ তা একেবারে কাটায় কাটায় যথেষ্ট ছিল।”

“আর কিছু নেই। সব শেষ।”

“আগেও তো হয়েছে এমন।” আগুনের লাকড়ি থেকে পাইপ ধরালেন সোয়ার্ট।

এবারের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার আর কোনো আইভরি নেই, শিকারের জন্য কিংবা-” অন্ধ রাগে আবারো দিশেহারা বোধ করলেন লোথার। টিনের মগে কফি ভরে দিলেন সোয়ার্ট।

“বেশ অদ্ভুত লাগছে।” বলে উঠলেন হেনড্রিক, “আমরা যখন ওকে খুঁজে পেয়েছিলাম পরনে ছিল চামড়ার পোশাক আর এখন দেখো বড়সড় হলুদ গাড়ি নিয়ে এসেছে।” মাথা নেড়ে মিটিমিটি হাসলেন, “অথচ দেখো এখন আমাদেরই পরনে ছেঁড়া ত্যানা।”

“তুমি আর আমি মিলেই তো ওকে বাঁচালাম।” বলে উঠলেন লোথার, “তার চেয়েও বড় কথা, ওর জন্য হিরে খুঁজে দিলাম, মাটি খুঁড়ে এত কষ্ট করে খুঁজে বের করলাম।”

“এখন তো সে ধনী হয়ে গেছে। এবারে বললেন হেনড্রিক, “অথচ আমাদের যা আছে তাও নিতে এসেছে। এটা করা উচিত হয়নি। বিশাল কালো মাথাটা নেড়ে বললেন, “নাহ, এটা একেবারেই ঠিক হয়নি।”

আস্তে আস্তে সোজা হয়ে বসলেন লোথার। সাগ্রহে সামনে ঝুঁকলেন হেনড্রিক। অতঃপর প্রথম বারের মত হাসল ম্যানফ্রেন্ড।

“ইয়েস।” হাসতে শুরু করলেন হেনড্রিক। “এবারে কী তাহলে?”

“না, আইভরি নয়। এবার হবে হিরে।” উত্তর দিলেন লোথার।

“হিরে?” হেনড্রিক আরেকটু হলে হোঁচট খাচ্ছিলেন। “কোন হিরে?”

“কোন হিরে?” হেসে ফেললেন লোথার। জ্বলে উঠল তার হলুদ চোখ জোড়া, “কেন ওর জন্য যে খুঁজে পেয়েছি সেসব হিরে।”

“ওর হিরে?” একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন হেনড্রিক, “হানি খনির হিরে?”

“তোমার কাছে কত টাকা আছে?”

লোথারের কথা শুনে চোখ সরু করে ফেললেন হেনড্রিক। “আমি তোমাকে ভালোভাবেই চিনি।” অধৈর্য ভঙ্গিতে হেনড্রিকের কাঁধে চাপ দিলেন লোথার, “তুমি সব সময় খানিকটা সরিয়ে রাখো। কত আছে?”

“বেশি নয়।” হেনড়িক উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই চেপে বসিয়ে দিলেন লোথার।

“শেষ সিজনে তুমি ভালোই কামাই করেছে। আমি তোমাকে কত দিয়েছি তার পাই পয়সা পর্যন্ত আমার হিসাব আছে।”

“পঞ্চাশ পাউন্ড।” স্বীকার করলেন হেনড্রিক।

“না।” মাথা নাড়লেন লোথার, “তার চেয়েও বেশি আছে।”

“হ্যাঁ, হয়ত আরেকটু বেশি। আবার মেনে নিলেন হেনড্রিক।

“তোমার কাছে একশ’ পাউন্ড আছে।” যেন পুরোপুরি নিশ্চিত এমনভাবে জানালেন লোথার, “এইটুকুই আমাদের দরকার। আমাকে দাও। তুমি জানো এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ফেরত পাবে। আগেও তাই পেয়েছো ভবিষতেও পাবে।

***

প্রভাতের প্রমম আলোয় খাড়া পাথুরে পথটা বেয়ে বহুকষ্টে উপরে উঠে এল পুরো দল। লিসবিক নদীর তীরে, পর্বতের একেবারে তলদেশে ইয়েলো ডেইমলারকে রেখে প্রভাতের এই ভূতের মত ধূসর আলোয় পেরিয়ে এসেছে পাহাড়।

দলের একেবারে প্রথমে দু’জন বুড়োকে দেখলে মনে হবে অর্থনৈতিক মহামন্দার দিনে আজকাল এরকম হরহামেশাই রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়, কমদামি পোশাক পরনে, অর্ধাহারে বেরিয়ে গেছে শরীরের হাড়।

কিন্তু না, বুড়ো দু’জনের সবচেয়ে লম্বাজন ব্রিটিশ রাজত্বের নাইট কম্যান্ডার অব দ্য অর্ডার। সেই সাথে প্রখ্যাত সামরিক ইতিহাসবিদও বটে।

“বুড়ো গ্যারি” স্যার গ্যারিক কোর্টনির বদলে সংক্ষিপ্ত স্বরেই ডাকলেন তার সঙ্গী। “আমাদের মানুষগুলো মাটি ছেড়ে শহরে ভিড় করছে।” টেবিল মাউন্টেনের উপর প্রায় ২০০০ ফুট পার হয়ে এলেও বাতাসের তোড়ে ভেসে গেল না কথা।

“এটাই হল বিপর্যয়ের রেসিপি।” সম্মত হলেন স্যার গ্যারিক। “খামারে থাকাকালীন দরিদ্র থাকলেও শহরে উপোস করে মরবে। আর জানোই তো অনাহারী মানুষ কতটা ভয়ংকর হয়। ইতিহাস তো তাই বলে।”

স্যার গ্যারিকের সঙ্গী আকারেই ছোটখাটো। তবে তার মত ধনবান নন। ট্রান্সভ্যালে ছোট্ট একটা খামার আছে আর গ্যারি নিজের ভাগ্য সম্পর্কে যতটা উদাসীন এ লোকটা নিজের দেনা সম্পর্কেও ততটাই উদাসীন। যদিও পৃথিবীর প্রথম সারির পনেরটা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জাত সবচেয়ে বুদ্ধিমান, জ্ঞানী আর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। পূর্বে প্রধানমন্ত্রী থাকলেও বর্তমানে বিরোধীদলীয় নেতা। নিজেকে তিনি প্রয়োজনের খাতিরে সৈন্য আর রাজনীতিবিদের বদলে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি।

“অন্যদের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।” পাথুরে একখানা প্লাটফর্মের উপর হেলান দিলেন, জেনারেল জ্যান সুটস্।

তাদের একশ কদম নিচে পথ বেয়ে উঠছে, এক রমণী।

“আমার ছোট্ট সোনাপাখি” প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে দেখে বলে উঠলেন স্যার গ্যারি। চৌদ্দ বছর সম্পর্ক শেষে মাত্র ছয়মাস হল তার বেডরুমে ঠাই পেয়েছে এই নারী।

“তাড়াতাড়ি করো অ্যানা।” তাগাদা দিল পেছনের ছেলেটা। “উপরে যেতে যেতে দুপুর হয়ে যাবে, আমি ক্ষিধেয় মরছি।” শাসা অ্যানার সমান লম্বা হলেও তার মত মোটা গড়ন নয়।

“যাও, তুমিই তাহলে আগে যাও।” ঘোঁত ঘোত করে উঠল অ্যানা। “কেন যে মানুষ এত বড় পাহাড়ে উঠতে চায়”।

“দাঁড়াও আমি সাহায্য করছি” বলেই লেডি কোর্টনির বিশালাকার পশ্চাদ্দেশে ধাক্কা দিল শাসা, “আরো জোরে হেইয়ো”।

“থামো তো দুষ্ট ছেলে।” হঠাৎ গতি বাড়ায় হাঁপাচ্ছে অ্যানা।

লেডি কোর্টনি হবার আগে অ্যানা ছিল শাসার নার্স আর ওর মায়ের সবচেয়ে পছন্দের পরিচারিকা। কিন্তু হঠাৎ করেই সামাজিক পদমর্যাদার মত করেই বদলে গেছে তাদের সম্পর্ক।

“এই যে তোমার বিশেষ ডেলিভারি নিয়ে এসেছি!” নানার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দিল শাসা। এই সুদর্শন ছেলেটা আর লাল-মুখো নারীই গ্যারির সবচেয়ে বড় সম্পদ।

“এই পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করার চেয়ে আমি লাঞ্চের তদারক করলেই ভালো হয়।” জেনারেল সুটের দিকে তাকিয়ে আফ্রিকান ভাষায় জানতে চাইল অ্যানা, “আর কতদূর?”

“আর বেশি দেরি নেই লেডি কোর্টনি। আহ! ওই তো বাকিরাও এসে পড়েছে। আমি শুধু শুধু চিন্তা করছিলাম।”

বহু নিচের ঢালের জঙ্গলের কিনার দিয়ে উদয় হলেন সেনটেইন আর তার দল।

স্যার গ্যারিক কোর্টনির জন্মদিনে টেবিল মাউন্টেনের এই বাৎসরিক পিকনিক মোটামুটি পারিবারিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। আর তার পুরনো বন্ধু জেনারেল স্যুটও কখনো মিস্ করেন না এই উপলক্ষ।

চূড়ায় পৌঁছে ঘাসের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে দম নিল সবাই। অন্যদের কাছ থেকে খানিকটা পৃথকে বসেছেন সেনটেইন আর বুড়ো জেনারেল। তিনিই আগে কথা বললেন, “তো সেনটেইন মাই ডিয়ার, তুমি যেন কী নিয়ে কথা বলতে চাইছিলে?”

আপনি সত্যিই মনের কথা পড়তে পারেন ওড বাস।” বিষণ্ণভাবে হাসলেন সেনটেইন, কীভাবে পারেন বলুন তো?”

“আজকাল তরুণী কেউ পাশে এসে বসলেই বুঝতে পারি যে কোনো কাজ আছে; আনন্দের মতলবে নিশ্চয়ই আসেনি।” পিটপিট করে তাকালেন মুট।

“আমার দেখা সবচেয়ে আকর্ষণীয় পুরুষদের একজন হলেন আপনি”।

“আহ, আহ, কী বলো! যাই হোক শুনে ভালোই লাগল। কিন্তু নিশ্চয়ই জরুরি কিছু।”

বদলে গেল সেনটেইনের অভিব্যক্তি। সহজভাবে জানালেন, “ব্যাপারটা শাসাকে নিয়ে।”

“কোনো সমস্যা তো দেখছি না, নাকি আমার ভুল হচ্ছে?”

স্কার্ট পকেটের ভেতর থেকে একপাতা একটা কাগজ বের করে জেনারেলের হাতে দিলেন সেনটেইন। অ্যামবোস করা সিলমোহর দেখে বোঝা যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বিশিষ্ট বিদ্যালয়ের রিপোর্ট।

সেনটেইন জানেন জেনারেল কত দ্রুত যে কোনো কাগজ পড়ে ফেলতে পারেন। এমনকি শেষ লাইনটাও পড়ে ফেললেন : “মাইকেল শাসা তার নিজের এবং বিশপদের জন্য অত্যন্ত গর্ব বয়ে এনেছে।”

সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন জেনারেল, “তুমি নিশ্চয়ই ছেলেকে নিয়ে অনেক গর্ববোধ করছে।”

“ওই আমার সবকিছু।”

“আমি জানি। আর এটা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। তোমার সন্তান কয়েক দিন পরেই পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়ে নিজের জীবন গুছাতে চাইবে। যাই হোক, এখন বলল আমি কীভাবে সাহায্য করবো?”

“ও অনেক মেধাবী আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন; সবার সাথে চমৎকারভাবে মিশতে পারে। তাই আমি ওকে সংসদে দেখতে চাই।”

মাথা থেকে পানামা টুপি নামিয়ে হাতের তালু দিয়ে রুপালি চুলগুলোকে আঁচড়ালেন জেনারেল, “আমার তো মনে হয় সংসদে যাবার আগে ওর পড়াশোনা শেষ করা উচিত, তাই না ডিয়ার?”

“হুম তাই। আমিও এটাই জানতে চাইছি। ওকে কি অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজে পাঠাবো? নাকি তাহলে পরবর্তীতে নির্বাচনে দাঁড়াতে সমস্যা হবে? নাকি স্থানীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাবো?”

“ঠিক আছে। এ ব্যাপারে ভেবে তোমাকে পরে জানাবো সেনটেইন। কিন্তু তার আগে তোমাকে মানসিকভাবে দৃঢ় হবার জন্য পরামর্শ দিতে চাই।”

“প্লিজ, ওড বাস” অনুনয়ের ভঙ্গিতে জানালেন সেনটেইন, “আপনার পরামর্শের মূল্য-” শেষ হবার আগেই জেনারেল বললেন,

“শাসাকে ঠিক করতে হবে ওর সত্যিকারের গৃহ কোনটা। যদি সমুদ্রের ওপার হয় তাহলে আমার সহায়তার তো কোনো দরকার নেই।”

“আমি কী বোকা” জেনারেলের চোখে পড়ল সেনটেইনের আত্মধিক্কার। সোয়েতপিয়েল। ব্যাপারটা আর কৌতুকের পর্যায়ে নেই।

“এরকম আর কখনো হবে না।” জেনারেলের হাতে হাত রাখলেন সেনটেইন, “আপনি ওকে সাহায্য করবেন না?”

এমন সময় দূর থেকে শাসা ডেকে বলল, “নাশতা করব না মা?”

“ঠিক আছে, ঝুড়ি নিয়ে এসো।” সেনটেইন, “আপনার উপর ভরসা করতে পারি তো?”

“আমি তো বিরোধী দলে আছি সেনটেইন”

“খুব বেশিদিন তো থাকবেন না। পরবর্তী নির্বাচনেই দেশ এ ভুল শুধরেদেবে।”

“বুঝতেই পারছো আমি এখনই কিছু প্রমিজ করতে পারছি না। সাবধানে শব্দ বাছাই করলেন জেনারেল, “তবে ওর প্রতি আমার নজর থাকবে। যদি দেখি ও সবগুলো শর্ত পূরণ করছে তাহলে আমার সমর্থন অবশ্যই পাবে।”

আনন্দ আর স্বস্তিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন সেনটেইন। জেনারেল সহজভাবে জানালেন, “আমার সরকারের আমলে শন কোর্টনি অত্যন্ত দক্ষ মন্ত্রী ছিল।”

নামটা শোনার সাথে সাথে বহু গোপন আনন্দ আর বিষাদের স্মৃতি স্মরণ করলেন সেনটেইন। যাই হোক জেনারেল এসবের কিছুই খেয়াল করলেন না। বললেন, “তাই কখনো আরেকজন কোর্টনি পেলেও মন্দ হবে না।”

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সেনটেইনকেও উঠতে সাহায্য করলেন। একটু পরে সবার ভোজনে সন্তুষ্ট হয়ে সেনটেইনের জেনারেল ম্যানেজারদের একজন সিরিল স্লেইন ঘোষণা করলেন, “যাক! নামার সময় ঝুড়ির ওজন কম হবে।”

“এখন সবাইকে ওঠার আদেশ দিলেন জেনারেল, “আজ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করা হবে।

“সবাই তৈরি হও।” বালিকার মতই চপল হয়ে উঠলেন সেনটেইন।

একেবারে প্রথমেই হাঁটতে লাগলেন জেনারেল। কেবলমাত্র শাসাই তার সাথে তালে তাল মিলিয়ে এগোতে পারল। নিচে পড়ে রইল পুরো পৃথিবী। ধূসর চূড়ার একেবারে কিনার বেয়ে উঠে গেল সবাই। এমন জায়গায় এসে থামল যেখানে পাথুরে সংকীর্ণ উপত্যকার ঠোঁটের কাছে মাটিতে আকর্ণ হয়ে আছে উজ্জ্বল সবুজ ঘাস।

“এই তো আমরা চলে এসেছি। প্রথম যে ডিসা খুঁজে পাবে তাকে ছয় পেন্স দেয়া হবে।”

জেনারেলের ঘোষণা শুনেই উপত্যকার খাড়া কিনার দিয়ে ছুটে গেল শাসা। একটু পরেই উত্তেজিত হয়ে চিৎকার শুরু করল,

“পেয়েছি! সিক্স পেন্স এখন আমার!”

সবাই মিলে ওর কাছে এগিয়ে গেল।

অত্যন্ত ভঙ্গি সহকারে এক হাঁটু গেড়ে বসলেন জেনারেল।

“এটা সত্যিই একটা নীল ডিসা। দুনিয়ার সবচেয়ে রেয়ার ফুলগুলোর একটা; যা কেবলমাত্র টেবিল মাউন্টেনেই পাওয়া যায়।”

চোখ তুলে শাসার দিকে তাকালেন, “এই বছর নানার প্রতি সম্মান জানাবার দায়িত্বটা কি তুমি নেবে ইয়াং ম্যান?”

গাম্ভীর্য নিয়ে এগিয়ে এল শাসা। তারপর বুনো অর্কিডটা তুলে স্যার গ্যারিকে দিল। নীল ডিসা প্রদানের এ ছোট্ট আনুষ্ঠানিকতাও জন্মদিনের উৎসবের অনুষঙ্গ। আনন্দের সাথে হাততালি দিল সবাই।

পুত্রগর্বে গর্বিত সেনটেইনের মনে পড়ে গেল ছেলেটার পৃথিবীতে আসার ঘটনা। বুড়ো বুশম্যান ওর নাম রেখেছেন শাসা। কালাহারির গভীরে পবিত্র উপত্যকায় শাসার জন্য নিজে রচিত গীত গেয়ে নৃত্যও করেছেন। কথাগুলো এখনো কানে বাজে :

তার তীর উঠে যাবে তারার পানে
যখন লোকে তার কথা বলবে
তা ততদূরেও শোনা যাবে,
আর একদিন ওই খুঁজে পাবে সুমিষ্ট জল।

সেনটেইনের চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুদিন আগেই পরলোকগত বুশম্যানের চেহারা। বুকের গভীর থেকে ফিসফিস করে বলে উঠল, “তাই যেন হয়, তাই যেন হয়।”

***

ফিরে আসার সময় সবাই মিলে ডেইমলারেই চড়ে বসল।

বনের আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাবার সময় পেছনের সিট থেকে মাকে উৎসাহ দিল শাসা, “কামঅন মম। তুমি আরো স্পিড় তুলতে পারবে।”

সেনটেইনের পাশেই টুপি আকড়ে বসে আছেন জেনারেল।

এস্টেটের বিশাল ত্রিকোণাকার মেইন গেইট দিয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে দিলেন সেনটেইন। বিখ্যাত ভাস্করের হাতে গড়া আঙুর হাতে নৃত্যরত বনপরীদের ভাস্কর্যের সাথে এস্টেটের নামও লেখা আছে উজ্জ্বল অক্ষরে :

ওয়েল্টেভেদেন-১৭৯০

আস্তে করে ডেইমলারের গতি কমিয়ে আনলেন সেনটেইন। অজুহাত হিসেবে জেনারেলকে শোনালেন, “আঙুরগুলোর উপর ধুলা পড়তে দিতে চাই না।” চোখের সামনে সারি সারি আঙুর ফলের বাগান দেখে বাড়ির নামের সার্থকতা উপলব্ধি করলেন জেনারেল।

দুইশ একর আঙুর ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে রাস্তাটা মূল দুর্গের দিকে চলে গেছে।

বিশাল বাড়িটার চারপাশে উজ্জ্বল কিকুড ঘাসের লন। এর মাঝখানে কর্মচারীদের বেল টাওয়ার। এর পেছনেই মূল দালান।

গাড়ি দেখে ইতিমধ্যেই চলে এসেছে সব পরিচারক।

“দেড়টা বাজে লাঞ্চ হবে।” সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন সেনটেইন। ওড় বাস, স্যার গ্যারি আপনাকে তার লেটেস্ট চ্যাপটার পড়ে শোনাবে। শাসা তুমি কি করবে?”

পালানোর চেষ্টা করতেই মায়ের হাতে ধরা খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শাসা। কোনোমতে বলল, “জ্যাক আর আমি নতুন টাট্ট ঘোড়াটাকে নিয়ে সময় কাটাবো।”

“ম্যাডাম ক্লেয়ার তোমার জন্য অপেক্ষা করবেন। গণিতে তো আরেকটু মন দেয়া উচিত তাই না?”

“ওহ, মা, এখন তো ছুটি।”

“তুমি যখন অলস সময় কাটাবে তখন কেউ হয়ত কঠোর পরিশ্রম করবে আর যখন সময় আসবে তখন তোমাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেবে।”

“ইয়েস।” সাহায্যের আশায় নানার দিকে তাকাল শাসা।

“আরে, নানুভাই, গণিতের ম্যাডাম চলে গেলেই মা তোমাকে কয়েকঘণ্টা ছুটি দেবে। কারণ এখন তো সত্যিই ছুটি।”

মেয়ের দিকে আশা নিয়ে তাকালেন স্যার গ্যারি।

“আমিও আমার ইয়াং ক্লায়েন্টের হয়ে আর্জি জানাতে চাই।” জেনারেলের কথা শুনে হেসে ফেললেন সেনটেইন।

“ঠিক আছে। কিন্তু আগে টিচার।”

পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিরস বদনে ম্যাডামের কাছে ছুটল শাসা।

“তো চলো” সিরিলের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালেন সেনটেইন, “কাজ করা যাক।”

জোড়া কাঠের সদর দরজা ঠেলে শেষ মাথার স্টাডিতে চলে এলেন সেনটেইন। পুরুষ সেক্রেটারির দল এখানেই অপেক্ষা করছে। সবাই বেশ তরুণ আর সুদর্শন। ফুলে ফুলে ভরে আছে স্টাডি। রোজ নতুন ফুল তুলে ফ্লাওয়ার ভাসে রাখাটাই তার রীতি।

চতুর্দশ লুইসের লম্বা টেবিলটাকে ডেস্ক হিসেবে ব্যবহার করেন সেনটেইন। চারপাশে পৃথক পৃথক রূপার ফ্রেমে ঝুলছে শাসার পিতার ডজন ডজন ছবি। একেবারে শেষের ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে সিঙ্গেল সিটার স্কাউট প্লেটের সামনে নিজ স্কোয়াড্রনের পাইলটদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মাইকেল কোটান। চামড়ার চেয়ারে বসে খানিকটা হেলে পড়া ছবিটাকে ঠিক করে দিলেন সেনটেইন।

“আমি পুরো কনট্রাকটটা পড়ে দেখেছি।” মুখোমুখি চেয়ারে বসল সিরিল। কিন্তু দুটি অনুচ্ছেদ মনঃপূত হয়নি। প্রথমটা হল ছাব্বিশ।” বাধ্য ছেলের মত পাতা উল্টালো সিরিল। দু’পাশে দাঁড়ানো মনোযোগী সেক্রেটারির দল নিয়ে দিনের কাজ শুরু করলেন সেনটেইন।

সব সময় হানি খনি দিয়েই কাজ শুরু হয়। এ সময় মনে হয় যেন কালাহারির বিশালতায় আত্মমগ্ন হয়ে পড়েন সেনটেইন। আনন্দচিত্তে ভাবলেন, “কাল আমি আর শাসা আবার সেখানে যাবো।” এরপর একেবারে শেষ ডকুমেন্টে সাইন করে দিয়ে এগিয়ে গেলেন খোলা ফ্রেঞ্চ দরজার দিকে।

নিচে পরিচারকদের কোয়ার্টারের পেছনে জক মারফি’র সাথে টাটু ঘোড়া নিয়ে খেলছে শাসা।

ঘোড়াটা বেশ বড়সড়। মাত্র কয়েকদিন আগেই ঘোড়ার আকার থেকে সীমারেখার নীতি তুলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক পোলো অ্যাসোসিয়েশন। বয়স কম হলেও এখনই শক্ত হয়ে বসে দৃঢ়তার সাথে পোলো অনুশীলনে দক্ষ হয়ে উঠেছে শাসা।

জক মারফিকেও সেনটেইনই খুঁজে এনেছেন। এর আগে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছে জক: রয়্যাল মেরিন, পেশাদার কুস্তিগির, মাদক বহনকারী আরো কত কী। এখন সেই শাসার শারীরিক প্রশিক্ষক। শাসাকে নিজের ছেলের মতই ভালোবাসে জক।

কেবল প্রতি তিন মাসে একবার হুইস্কি খেলে হয়ে উঠে আস্ত একটা শয়তান। ফলে সেনটেইনকে পুলিশ স্টেশনে লোক পাঠিয়ে জককে ছাড়িয়ে আনাতে হয়। প্রতিবার একই ঘটনা। বুকের উপর ঝুলতে থাকে ডার্বি হ্যাট, লজ্জায় চকচক করে ওঠে টাক মাথা আর আকুতি জানিয়ে বলে,

“আর কখনো এমন হবে না। আমাকে আরেকটা সুযোগ দিন, কথা দিচ্ছি আর এরকম করব না।”

***

একজন মানুষের দুর্বল দিক সম্পর্কে জেনে রাখা খুবই প্রয়োজন। লাগাম টেনে তাকে রুখে দেয়া যাবে আবার ইচ্ছেমত চালানোও যাবে।

উইন্ডহকেও কোনো কাজ পাওয়া গেল না। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ট্রাক আর ওয়াগনে লিফট প্রার্থনা করে অবশেষে শহরতলীতে পৌঁছালো তিনজনে।

এখানকার তাবুর মাঝে ভালো জায়গাগুলো আগেই দখল হয়ে গেছে। কোনোরকমে একটা গাছের নিচে ঠাই মিলল। আগুনের পাশে বসে গরম পানিতে গম ঠেলে যৎসামান্য খাবার বানাবার চেষ্টা করছেন সোয়ার্ট হেনড্রিক। শহরে কাজ খুঁজতে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন লোথার।

“ম্যানফ্রেড কোথায়?”

চিবুক উঁচিয়ে কাছের একটা চালাঘরের দিকে নির্দেশ করলেন হেনড্রিক। মন্ত্রমুগ্ধের মতন লম্বা দাঁড়িঅলা এক লোকের কথা শুনছে ডজনখানেক ভবঘুরে।

“ম্যাল উইলেম” বিড়বিড় করলেন হেনড্রিক, “পাগল উইলিয়াম” ছেলেকে খুঁজলেন লোথার। অন্যদের মাঝে দেখা গেল ম্যানফ্রেডের উজ্জ্বল সোনালি চুল।

এরপর নিজে পাইপ ধরিয়ে হেনড্রিকের দিকে ছুঁড়ে দিলেন তামাক পাতা।

“তুমি কী পেলে?” দিন আর রাতের বেশিরভাগ সময় উইন্ডহকের ওপাশে কৃষ্ণাঙ্গদের বস্তিতেই কাটান হেনড্রিক। কেননা কারো গোপন কথা জানলে, তার পরিচারকেরাই হতে পারে শ্রেষ্ঠ উৎস।

“কী খুঁজে পেয়েছি জানো, কেউ তোমাকে ফ্রি ড্রিংক দেবে না আর উইন্ডহকের পরিচারিকাদেরকে তো কেবল ভালোবাসার কথা বলে কিছুতেই কাবু করা যাবে না।” দাঁত বের করে হাসলেন হেনড্রিক।

থু, মুখ থেকে তামাকের পিক ফেলে ছেলের দিকে তাকালেন লোথার। ক্যাম্পে নিজ বয়সীদের ছেড়ে বয়স্ক পুরুষদের সাথে ওর মেশার আগ্রহ দেখে খানিকটা চিন্তা হচ্ছে।

“আর কী?” হেনড্রিকের কাছে জানতে চাইলেন লোথার। “লোকটার নাম ফুরি। গত দশ বছর ধরে খনিতে কাজ করছে। প্রতি সপ্তাহে চার-পাঁচটা ট্রাক নিয়ে আসে আর তারপর মাল বোঝাই করে চলে যায়।”

“বলে যাও।”

“আরো আছে। প্রতি মাসের প্রথম সোমবার পেছনে চারজন ড্রাইভার নিয়ে ছোট্ট একটা ট্রাকে চড়ে যায়। সবার কাছেই শটগান আর পিস্তল থাকে। সোজা মেইন স্ট্রিটের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে যায়। ফুরি আর আরেকজন ড্রাইভার ট্রাক থেকে ছোট্ট একটা লোথার বক্স নিয়ে ম্যানেজারের হাতে দেয়। এরপর ফুরি আর তার সঙ্গী মিলে বারে গিয়ে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পান করে। সকালে আবার খনিতে ফিরে যায়।”

“মাসে একবার।” আপন মনেই ফিসফিস করলেন লোথার।

“পুরো মাসের উৎপাদন একবারেই পাওয়া যাবে।” তিক্ত কণ্ঠে হেসে ছেলেকে ডাকলেন, “ম্যানফ্রেড!”

বাবা এসেছে এতক্ষণ টের পায়নি ম্যানফ্রেড। তাই এবার অপরাধীর ভঙ্গিতে উঠে এল। বাবার পাশে এসে পা ভাজ করে বসতেই ঘন দুধ দিয়ে পরিজ দিলেন সোয়ার্ট।

“পাপা তুমি জানো জোহানেসবার্গের সোনার খনিতে যে ইহুদি মালিকেরা একটা নাটক রচনা করেছে?” চকচকে চোখে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।

“কী?” জানতে চাইলেন লোথার।

“অর্থনৈতিক মন্দা।” মাত্রই শেখা শব্দটাকে বেশ জোর দিয়ে উচ্চারণ করল ম্যানফ্রেড। “ইহুদি আর ইংরেজরা মিলে এমনটা করেছে যেন বিনামূল্যে তাদের খনি আর ফ্যাক্টরিতে কাজ করার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায়।”

“তাই নাকি?” পরিজ খেতে গিয়ে হেসে ফেললেন লোথার। “খরাটাও কি তাদের তৈরি নাকি?” ইংরেজবিরোধী হলেও তার বিদ্বেষ কখনো যুক্তির সীমানা পার হয় না।

“হ্যাঁ সেটাও, পাপা!” তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল ম্যানফ্রেড। “ওম উইলেম আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পেছনের পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে কোলের ওপর বিছিয়ে বসল। বলল, “এই দেখো”।

তারপর আফ্রিকান ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের পিতৃভূমি’, কাটুনটার ওপর বুড়ো আঙুল রেখে বলল, “দেখো ইহুদিরা আমাদের সাথে কী করছে!”

কার্টুনের প্রধান চরিত্রটার নাম “হগেনহেইমার” পকেটভর্তি পাঁচ পাউন্ডের নোট নিয়ে মাল বোঝাই ওয়াগনে চাবুক চালিয়ে দূরের সোনার খনি’ লেখা টাওয়ারের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু ওয়াগনে আঁড়ের বদলে মানুষ জুড়ে দিয়েছে টানার জন্য। হগেনহেইমারের চাবুকের নিচে নিষ্পেষিত হচ্ছে সারি সারি হাড় সর্ব, অনাহারী নারী-পুরুষের দল।

মিটিমিটি হেসে কাগজটাকে ছেলের হাতে ফিরিয়ে দিলেন লোথার। তিনি কয়েকজন ইহুদিকে জানেন যারা সকলেই বেশ পরিশ্রমী আর সাধারণ মানুষ; দরিদ্র আর উপোস করেই দিন কাটায়।

“জীবন যদি এত সহজ হত…” মাথা নাড়লেন লোথার।

“সত্যিই তাই, পাপা! আমাদেরকে কেবল ইহুদিদেরকে তাড়িয়ে দিতে হবে, ব্যস। ওম উইলেম সব বুঝিয়ে দিয়েছেন।”

লোথার উত্তর দেবার জন্য মুখ খুলতেই বুঝতে পারলেন যে তাদের খাবারের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ক্যাম্পের জনাতিনেক ছেলে-মেয়ে এসে কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। তাই ভুলে গেলেন কার্টুনের কথা।

তিনজনের মধ্যে বারো বছর বয়সী একটা মেয়ে আছে। শীতকালের কালাহারির ঘাসের মত দুলছে ওর লম্বা বিনুনি। কিন্তু রোগা হওয়ায় হাড় আর চোখ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না।

মেয়েটার স্কার্ট ধরে রেখেছে আরো দু’জন ছোট্ট বাচ্চা। একটা ছেলে একটা মেয়ে।

চোখ সরিয়ে নিলেন লোথার। হঠাৎ করেই খাবারের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে গেছে। তাকিয়ে দেখলেন হেনড্রিকের এদিকে নজর নেই আর ম্যানফ্রেড এখনো একমনে কাগজটা দেখছে।

“ওদেরকে খাবার দিলে দেখা যাবে ক্যাম্পের সব বাচ্চা চলে এসেছে এখানে।” আপন মনেই বিড়বিড় করে জনসমক্ষে আর না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন লোথার।

“কেবল রাতে খাবার জন্য আরেকটু অবশিষ্ট আছে। তাই ওদেরকে ভাগ দেয়া যাবে না।”

কিন্তু মুখের কাছে চামচ তুলতে গিয়েও থেমে গেলেন লোথার। মেয়েটার দিকে তাকাতেই লাজুক ভঙ্গিতে এগিয়ে এল কাছে।

“নিয়ে যাও। কর্কশ কণ্ঠে আদেশ দিলেন লোথার।

“ধন্যবাদ, আংকেল” ফিসফিস করে উঠল মেয়েটা, “ডানকি ওম।”

তারপর প্লেটটাকে স্কার্টের নিচে লুকিয়ে ঘোট দুই ভাইবোনকে টানতে টানতে চালাঘরগুলোর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল মেয়েটা।

আবার একঘন্টা পরে ফিরে এল। প্লেট আর চামচ সুন্দর করে ধুয়েও এনেছে। “ওমের কোনো শার্ট বা কিছু ধুয়ে দিতে হবে?” জানতে চাইল মেয়েটা।

লোথার ব্যাগ খুলে নিজের আর ম্যানফ্রেডের মাটি মাখানো কাপড় বের করে দিলেন। সূর্যাস্তের সময় ফেরত দিয়ে গেল মেয়েটা। কার্বোলিক সাবানের খানিকটা গন্ধ থাকলেও পরিচ্ছন্নভাবে ভাজ করে নিয়ে এসেছে সবগুলো কাপড়।

“সরি, ওম, আমার কাছে ইস্ত্রি নেই।”

“তোমার নাম কী?” হঠাৎ করেই জানতে চাইল ম্যানফ্রেড। চারপাশে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গেল মেয়েটা। তারপর মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সারাহ।”

***

পরিষ্কার শার্ট গায়ে দিয়ে বোম আটকালেন লোথার। তারপর আদেশ দিলেন, “আমাকে দশ শিলিং দাও।”

“কেউ যদি শুনতে পায় যে আমার কাছে এত টাকা আছে তাহলে নির্ঘাত এসে গলা কাটবে।” ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠলেন হেনড্রিক।

“তুমি খালি খালি আমার সময় নষ্ট করছে।”

“একমাত্র এই জিনিসটাই তো আমাদের কাছে অফুরন্ত আছে।”

সুইং ডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন লোথার। কোনার দিকে বারম্যানসহ মাত্র তিনজন লোক দেখা যাচ্ছে।

“আজ রাত তো দেখি বেশ নিশ্চুপ।” বিয়ারের অর্ডার দিলেন লোথার। ছোট-খাটো বারম্যানের মাথায় সাদা চুল আর চোখে স্টিলের ফ্রেমের চশমা।

“তোমার জন্যও একটা নাও।” লোথারের প্রস্তাব শুনে বদলে গেল বারম্যানের অভিব্যক্তি।

“আমি জিন নিচ্ছি, ধন্যবাদ।” কাউন্টারের নিচ থেকে স্পেশ্যাল একটা বোতল বের করল লোকটা। দুজনেই জানে যে বর্ণহীন পানিটা আসলে সাদা পানি আর এই শিলিংয়ের পুরোটাই বারম্যানের পকেটে যাবে।

তারপর দুজনেই সুস্বাস্থ্যের কামনায় মদ গিলে অলসের মত বসে বসে খানিক গল্পও করল। বারম্যান হঠাৎ করে জানতে চাইল, “কতদিন হল শহরে এসেছেন? আগে দেখিনি তো।”

“এসেছি আর কি একদিন, বহু আগে।” হেসে ফেললেন লোথার, “আচ্ছা তোমার নামটা যেন কী?” এইবার লোথারের নাম শুনে বারম্যান সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠল।

“এই যে শুনছো” বারের অন্য কাস্টমারদের উদ্দেশে গলা চড়ালো বারম্যান, “জানো এ কে? লোথার ডি লা রে! মনে নেই সেই যে যুদ্ধের সময়ে পুরস্কারের ঘোষণা? সেই তো রুনিকিদের কলজে ভেঙে দিয়েছিল।” রুনিকি কিংবা “লাল গলা” বলতে রোদে পোড়া নতুন আগত ইংরেজদেরকে বোঝানো হত। “খোদা, ওই তো জেমস-কফনটেইনে ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছিল।”

সবাই এতটা উদ্বেলিত হয়ে উঠল যে, একজন তো লোথারকে আরেকটা বিয়ারই কিনে দিল।

“আমি আসলে কাজের সন্ধান করছি।” খানিকের মাঝেই বন্ধু হয়ে যাওয়া বাকিদেরকে জানালেন লোথার।

“শুনেছি হানি’র খনিতে নাকি কাজ পাওয়া যাবে। বাকিরা হেসে ফেলল।

“তাহলে আমি ঠিকই জানতে পারব। প্রতি সপ্তাহে সেখানকার ড্রাইভারেরা এখানে আসে।” আশ্বস্ত করল বারম্যান।

“আমার সম্পর্কে বলবে তাহলে?” জানতে চাইলেন লোথার।

“নিশ্চয়ই। সোমবারে এসো। চিপ ড্রাইভার গার্যাড ফুরি’র সাথে মোলাকাত করিয়ে দেব। আমার বন্ধুও হয়। ওখানকার সবকিছু জানে।”

সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়ায় চার রাত পরে লোথার আবার বারে যাওয়ার সাথে সাথেই আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাল বারম্যান। “বারের একেবারে শেষ মাথায় ফুরি বসে আছে। অন্যদেরকে সার্ভ করা শেষ করেই আমি তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেব।”

পুরো বার ভিড়ে লোকারণ্য থাকায় বসে বসে ড্রাইভারকে স্টাডি করলেন লোথার। মধ্যবয়স্ক আর শক্তিশালী লোকটাকে মনে হচ্ছে খুব সহজে ভয় দেখানো যাবে না। তবে কোন পথে এগোবেন তা এখনো ঠিক করেননি লোথার।

ফুরির কাছে নিয়ে গেল বারম্যান। “আমার বন্ধুর সাথে পরিচিত হও।” লোথার আর ফুরি করমর্দন করলেন। প্রথমেই শক্তি প্রয়োগ করতে চাইল ফুরি। একে অন্যের চোখের দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর লোথারের হাত থেকে নিজের হাত বের করার জন্য কুঁকড়ে উঠল। লোথারও আর ঝামেলা করলেন না। ছেড়ে দিলেন।

“তোমার জন্য ড্রিংক আনতে বলেছি।” এখন বেশ সহজ বোধ করছেন লোথার। তাছাড়া একটু পরে বারম্যানের মুখে যুদ্ধের সময়ে লোথারের কীর্তি শুনে ফুরির আচরণও পুরোপুরি নরম হয়ে গেল।

একটু পরে লোথারকে একপাশে টেনে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “এরিক বলেছে তুমি নাকি হানির খনিতে কাজ খুঁজছ? তাহলে সবকিছু ভুলে যাও। বছরখানেকের মধ্যে তারা আর কোনো নতুন লোক নেবে না।”

“হ্যা” মনমরা হয়ে মাথা নাড়লেন লোথার, “এরিককে জিজ্ঞেস করার পর খনি সম্পর্কে সত্য কথাটা জানতে পেরেছি। পরে তোমাদের সবার জন্যও ব্যাপারটা খারাপ হবে।”

অস্বস্তিতে পড়ে গেল ড্রাইভার, “কী বলছ তুমি? কোন সত্য?”

“কেন আমি তো ভেবেছি তুমি জানো।” লোথার যেন লোকটার অজ্ঞতায় বেশ মজা পেলেন।

“ওরা আগস্টের মধ্যেই খনি বন্ধ করে সবাইকে তাড়িয়ে দেবে।”

“কী বলো, ওহ ঈশ্বর, না!” ফুরির চোখে ভয় দেখা গেল, “এটা সত্যি হতে পারে না।” ওমা লোকটাকে তো দেখি সহজেই প্রভাবিত করা গেল। মনে মনে সন্তুষ্ট হলেন লোথার।

“আমি দুঃখিত কিন্তু সত্যটা জানা থাকা ভালো। তাই না?”

“তোমাকে কে বলেছে?” প্রতি সপ্তাহে শহরে আসার সময় রেলওয়ের তাবুতে বেকার লোকদের দুর্দশা দেখেছে ফুরি। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তাই।

“আব্রাহামের কাজ করে এমন এক নারীকে চিনি। কেপটাউনে মিসেস কোর্টনির কাছে আসা চিঠি দেখেই জেনেছে যে আর কোনো ভুল নেই। খনিটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওরা আর ডায়মন্ড, বেচতে পারছে না। লন্ডন, নিউইয়র্কের কেউও আর হীরে কিনছে না।” আব্রাহাম হল খনির অ্যাটর্নি।

“ওহ, ঈশ্বর! ঈশ্বর!” ফিসফিসিয়ে উঠল ফুরি, “আমাদের কী হবে তাহলে? আমার স্ত্রীর শরীরও ভালো না। আমার ছয় বাচ্চা তো তাহলে উপোস করে থাকবে।”

“তোমার নিশ্চয় কয়েকশ’ জমানো আছে। তাই না?”

মাথা নাড়ল ফুরি।

“যদি না থাকে তাহলে আগস্ট আসার আগেই কিছু জমাও।”

“বাচ্চা নিয়ে কীভাবে জমাবো?” অসহায়ের মত জানতে চাইল ফুরি।

“তাহলে চলো, বলছি কীভাবে পারবে। এক বোতল ব্র্যান্ডিও কিনে নিচ্ছি।” বন্ধুর মত ফুরির হাত ধরলেন লোথার।

পরের দিন সূর্যোদয়েরও পরে ক্যাম্পের নিজ ঘরে ফিরে এলেন। ড্রাইভার লোখারের প্রস্তাব মেনে নিলেও খানিকটা ভয় আর দ্বিধায় ভুগছে।

প্রতিটি পয়েন্ট ধরে ধরে বুঝিয়ে আশ্বাস দিলেন লোথার। “আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যে কেউ তোমার কথা জানতেই পারবে না।”

হেনড্রিকের পাশে ধপ করে বসে পড়লেন ক্লান্ত লোথার।

“কফি?”

“শেষ হয়ে গেছে।” জানালেন হেনড্রিক।

“ম্যানফ্রেড কোথায়?”

চিবুক উঁচু করে দেখালেন হেনড্রিক। ক্যাম্পের শেষ মাথায় একটা কাটা ঝোঁপের পাশে বসে আছে ছেলেটা। পাশে সারাহ। দুজনে দুই মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কোনো একটা কাগজ দেখছে। ক্যাম্প ফায়ারের কয়লা দিয়ে পেন্সিল বানিয়ে কী যেন লিখছে ম্যানফ্রেড।

“ও মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছে।”

নির্ঘুম লাল চোখ জোড়া ঘসলেন লোথার। জানালেন, “কাজ হয়ে গেছে।”

“আহ!” অট্টহাসি দিলেন হেনড্রিক।

“এখন তাহলে ঘোড়ার জোগাড় করতে হবে।”

.

একদা সিসিল রোডস্ আর দি বিয়ারস ডায়মন্ড কোম্পানির প্রাইভেট রেলওয়ে কোচকে একবারে স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়েছেন সেনটেইন। তারপর প্যারিস থেকে নিয়ে আসা ডিজাইনার দিয়ে ডেকোরেশন করিয়েছেন। দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে একমত হবে যে ডিজাইনারকে দেয়া প্রতিটি পয়সা উশুল হয়েছে।

কোচের মেইন বেডরুম স্যুইটের গোলাকার বেড দেখে আপন মনে হেসে ফেললেন সেনটেইন। সচকিত হয়ে দেখলেন যে শাসা তাকিয়ে আছে।

“জানো মা, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তোমার চোখ দেখলে কী ভাবছ তা আমি বুঝতে পারি।” আগেও কয়েকবার এ কথাটা বলেছে শাসা।

“আর আমি আশা করছি যেন না পারো।” কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। “বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।” ডিজাইনার যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে স্যালুনের বাতাস ঠাণ্ডা রাখার জন্য মেশিন বসিয়েছেন। “এটা বন্ধ করে দাও তো।”

ডেস্ক থেকে দাঁড়িয়ে দরজা ঠেলে কোচের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন সেনটেইন। মুখ উপরে তুলতেই মরুভূমির উষ্ণ বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল খাটো করে কাটা চুল।

“কয়টা বাজে?” চোখ বন্ধ রেখে জানতে চাইলেন সেনটেইন। মায়ের পিছু পিছু এসে ব্যালকনির রেইলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল শাসা। এবার জানাল, ইঞ্জিন ডাইভার শিডিউলমত এগুলে দশ মিনিটের মধ্যে অরেঞ্জ নদী পার হব।”

“অরেঞ্জ পার হলেই মনে হয় যেন ঘরে পৌঁছে গেছি।” ছেলের কাছে এসে গায়ের উপর হাত রাখলেন সেনটেইন। উত্তমাশা অন্তরীপ জার্মান কলনীর সীমানা এই নদীকে কেউ কেউ আবার দক্ষিণের নীল নামে ডাকে।

কয়েকবার কেঁপে উঠে ট্রেনের গতি ধীর করে ফেলল ড্রাইভার।

“ব্রিজের জন্য গতি কমানো হয়েছে।” শাসা ব্যালকনি দিয়ে নিচে ঝুঁকতেই ধক করে উঠল সেনটেইনের বুক। সাথে সাথে বাধা দিতে গিয়েও মনে পড়ে গেল জক মারফি’র পরামর্শ, “ওকে তো আপনি চিরকাল শিশু করে রাখতে পারবেন না। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে আর এখন পুরুষকে অনেক ধরনের ঝুঁকিই নিতে হয়।”

নদীর দিকে চলে গেছে আঁকাবাঁকা রাস্তা। লোকোমোটিভের পেছনের সমতল রাস্তায় ডেইমলারটাও দেখা যাচ্ছে। এটা একেবারে নতুন। সেনটেইন প্রতি বছর গাড়ি বদল করেন। ট্রেনে আসায় মরুভূমির ঝাঁকুনির হাত থেকে বাঁচা গেছে; কিন্তু মাইনে কোনো রেলপথ নেই।

“ওই তো ব্রিজ চলে এসেছে!” চিৎকার দিয়ে উঠল শাসা।

“হিরের নদী শাসার সমান্তরালে হেলান দিয়ে বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন।

“হিরে কোথা থেকে আসে?” উত্তরটা শাসা জানলেও মায়ের মুখ থেকে শুনতেই বেশি ভালোবাসে।

“নদী তার পথিমধ্যে প্রাপ্ত সবগুলোকে একসাথে জড়ো করে। এমনকি মহাদেশের জন্মমুহূর্তে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কণাগুলো পর্যন্ত। তারপর উপকূলে বয়ে নিয়ে আসে।” চোখের কোনা দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন সেনটেইন। “বলো তো এগুলো অন্য পাথরের মত ক্ষয়ে যায় না কেন?”

“কারণ হিরে প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পদার্থ। কোনোকিছুই হিরের গায়ে দাগ কাটতে পারে না।” দ্রুতকণ্ঠে উত্তর দিল শাসা।

“এতটা শক্ত কিংবা এতটা সুন্দর আর কিছুই নেই।” ডান হাত তুলে আঙুলের বিশাল মারকুইস হিরেটা ছেলেকে দেখালেন সেনটেইন, “তুমি এগুলোকে অবশ্যই ভালোবেসে ফেলবে। যেই এগুলোকে নিয়ে কাজ করবে, ভালোবাসতে বাধ্য।”

“নদী” মাকে মনে করিয়ে দিল শাসা। “নদীটা সম্পর্কে বলো।” মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতেই অসম্ভব ভালোবাসে।

“সমুদ্রের দিকে যাবার সময় সৈকতে নিজের হিরেগুলোকে রেখে যায় নদী। তাই হিরেভর্তি সৈকত নিষিদ্ধ এলাকা হয়।”

“ফলের বাগান থেকে পকেটে ফল নেয়ার মত করে হিরে কুড়ানো যায়?”

“ব্যাপারটা এত সহজ নয়।” হেসে ফেললেন সেনটেইন। “তুমি বিশ বছর ধরে খুঁজে একটাও পাথর পাবে না, যদি না জানো যে কোথায় খুঁজতে হবে। সাথে ভাগ্যও থাকা চাই।”

“তাহলে আমরা যেতে পারি না কেন মা?”

“কারণ সবই স্যার আর্নেস্ট ওপেনহেইমার নামে একজনের কোম্পানির সম্পত্তি।”

“একটা কোম্পানি সবকিছুর মালিক। এটা মোটেই ঠিক নয়।” প্রথমবারের মত ছেলের চোখে আকাক্ষার ঝিলিক দেখে খুশি হয়ে উঠলেন সেনটেইন। তিনি ছেলেকে অর্থ আর ক্ষমতার জন্য লোভী হিসেবেই গড়ে তুলতে চান।

“বেশিরভাগ বড় বড় উৎপাদনশীল খনি ছাড়াও উনি প্রতিটি পাথরের বিক্রিও নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনকি আমাদের উৎপাদনও।”

“সে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে?, হানি?” লাল হয়ে উঠল শাসার মসৃণ গাল।

মাথা নাড়লেন সেনটেইন। “আমাদের সমস্ত হিরে তার সেন্ট্রাল সেলিং অর্গানাইজেশনের হাতে দিতে হয়। উনি তারপর মূল্য নির্ধারণ করেন।”

“আর আমাদেরকে সেটা মেনে নিতে হয়?”

“না তা একেবারেই নয়। কিন্তু বিপক্ষে যাওয়াটাও বোকামি হবে।”

“তাহলে উনি আমাদের সাথে কী করবেন?”

“শাসা, তোমাকে আগেও কতবার বলেছি যে নিজের চেয়ে শক্তিশালী কারো সাথে লড়াই করবে না। যদিও আমাদের চেয়ে শক্তিশালী খুব কম লোকই আছে; কিন্তু আর্নেস্ট ওপেনহেইমার তাদেরই একজন।”

“বলো না কী করবেন? জেদের স্বরে জানতে চাইল শাসা।

“খেয়ে ফেলবেন বুঝলে। কারণ প্রতি বছর আমরা আরো বেশি ধনী হয়ে উঠছি। তাই যদি আমরা তার এই নদীর কাছে আসতে চাই তাহলে তাকে ভয় তো পেতেই হবে।” হাত নেড়ে নদীটাকে দেখালেন সেনটেইন।

এটার ডাচ আবিষ্কারক নদীটার নাম অরেঞ্জ রাখলেও কমলারঙা বালু তীরের উজ্জ্বলতা দেখলে মনে হয় নামটা পুরোপুরি সার্থক হয়েছে।

“উনি এই নদীর মালিক?”

বিস্মিত হয়ে গেল শাসা।

“আইনত নয়। কিন্তু সাবধানে না থাকলে এই হিরের জন্য উনার ক্রোধের আগুনে তুমি নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবে।”

“তার মানে এখানে হিরে আছে?”

আগ্রহ নিয়ে নদী তীরে চোখ বোলালো শাসা।

“ডং টুয়েন্টিম্যান জোনস আর আমার তো তাই ধারণা। দুইশ মাইল গেলেই একটা ঝরনা আছে যেটাকে বুশম্যানেরা দ্য প্লেস অব গ্রেট নয়েজ বলে ডাকে। এখান থেকে সংকীর্ণ পাথুরে পথ দিয়ে নিচের খাদে বয়ে চলেছে অরেঞ্জ নদী। তাই এই খাদে নিশ্চয়ই হিরে আছে।”

খুব সাবধানে শাসাকে সবকিছু বর্ণনা করছেন সেনটেইন। যে মুহূর্তে ছেলে বিরক্ত হয়ে পড়বে তিনি কথা থামিয়ে দেবেন। শাসাকে কিছুতেই চাপ দিতে চান না। ছেলে যেন নিজের আগ্রহেই মনোযোগ দেয়। খানিক বাদে বললেন,

“চলো স্যালুনের ভেতরটা নিশ্চয় গরম হয়ে গেছে।” শাসাকে ডেস্কের কাছে নিয়ে গেলেন। “আমি তোমাকে কয়েকটা জিনিস দেখাতে চাই।” কোর্টনি মাইনিং অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল কোম্পানির বাৎসরিক রিপোর্ট খুলে বসলেন সেনটেইন।

এটাই হবে সত্যিকারের কঠিন অংশ। পেপারওয়ার্ক তার নিজেরও ভালো লাগে না আর গণিতে শাসাও একটু কাঁচা।

“তুমি দাবা খেলা পছন্দ করো, তাই না?”

“হ্যাঁ।” খুব সাবধানে সম্মত হল শাসা।

“এটাও তেমনই একটা খেলা। কিন্তু একবার যদি নিয়ম বুঝে ফেলতে পারো তাহলে হাজার গুণ বেশি আনন্দ আর পুরস্কার পাবে।” সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠল শাসা।

“আমাকে নিয়মগুলো বলল তাহলে।”

“একেবারে সবগুলো নয়। অল্প অল্প করে শুরু করা শিখতে হবে।”

এরপর কেটে গেল বহুক্ষণ। সন্ধে নাগাদ ছেলের মুখে ক্লান্তির ছোঁয়া দেখলেও একাগ্রতার কমতি খুঁজে পেলেন না সেনটেইন।

“আজকের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। মোটা ফোল্ডারটাকে বন্ধ করে বললেন, “গোল্ডেন রুলস্ তাহলে কী বলতো?”

বিক্রি করার সময় খরচের চেয়ে বেশি আদায় করতে হবে।”

মাথা নেড়ে সম্মতি আর উৎসাহ দিলেন সেনটেইন।

“আর অন্যেরা যখন বিক্রি করবে তখন তুমি কিনবে; অন্যেরা যখন কিনবে তখন তুমি বিক্রি করবে।”

“গুড” এবারে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলো ডিনারের আগে খানিক খোলা বাতাসে দাঁড়ানো যাক।”

কোচের ব্যালকনিতে ছেলের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে জানালেন, “খনিতে যাবার পর ড, টুয়েন্টিম্যান জোনসের সঙ্গে তুমি কাজ করবে। বিকেলবেলা ফ্রি পাবে। আমি চাই তুমি খনি আর এর কাজ সম্পর্কে জানো। তোমাকে পারিশ্রমিক দেব।”

“লাগবে না, মা।”

“আরেকটা গোল্ডেন রুল শোনো মাই ডার্লিং, কখনো কোনো ভালো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে না।”

পুরো রাত আর পরের দিন সারাদিন উত্তরে ছুটে চলল ট্রেন।

“সূর্যাস্তের খানিক পরেই উইন্ডহকে পৌঁছে যাবো।” শাসাকে জানালেন সেনটেইন। “কিন্তু সন্ধ্যায় না নেমে একেবারে সকাল বেলায় খনিতে যাবো। ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস আর আব্রাহাম আমাদের সাথে ডিনার করবেন। চলো তৈরি হয়ে নাও।”

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বাটারফ্লাই টাই বাঁধতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেল শাসা। এখনো ব্যাপারটা আয়ত্তে আনতে পারেনি। হঠাৎ করেই হুইসেলের আওয়াজ শুনে খোলা জানালার দিকে এগোল।

শহরতলীতে পৌঁছে ট্রেনের গতি ধীর হয়ে গেছে। নাকে আসছে কাঠের ধোয়ার গন্ধ। রেললাইনের ধারের তাবুগুলোও চোখে পড়ছে। চলন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন ছেলে-মেয়ে।

খাটোজন মেয়ে আর তার দিকে শাসা তেমন নজরও দিল না। চমকে উঠল পাশে দাঁড়ানো লম্বা ছেলেটাকে দেখে। আধো অন্ধকারেও একে অপরকে ঠিকই চিনতে পেরেছে। অভিব্যক্তিহীন চোখে পরস্পরকে দেখল সাদা শার্ট, কালো টাই আর নোংরা খাকি পোশাক পরিহিত দু’জন ছেলে।

“ডার্লিং” স্যাপায়ারস পরিহিত মাকে দেখে জানালা থেকে মুখ সরালো শাসা।

ছেলের টাই ঠিক করে দিলেন সেনটেইন। অন্যদিকে নিজের ভেতরের রাগ দমন করতে গিয়ে হিমশিম খেলো শাসা।

***

২. মেইন রেলপথ থেকে সরে

মেইন রেলপথ থেকে সরে লোকোমোটিভকে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের পেছনকার শেডের ব্যক্তিগত অংশে নিয়ে এলেন ড্রাইভার। কোচ থামার সাথে সাথে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এলেন আব্রাহাম ওরফে অ্যাবি।

“সেনটেইন তুমি তো আগের চেয়েও বেশি সুন্দরী হয়ে গেছে।” সেনটেইনের হাত আর দুই গালে কিস করলেন অ্যাবি। ছোটখাটো লোকটার কান দুটো এমন খাড়া যেন অন্যেরা যে শব্দ না শোনে, উনি সেটাও শুনতে পান।

অ্যাবিকে অত্যন্ত পছন্দ করেন সেনটেইন। যখন তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল সাকুল্যে দশ পাউন্ড, তখনো তার পাশে ছিলেন অ্যাবি। তারপর হানি মাইন অধিকৃতের পর থেকে সেনটেইনের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত অনেক কিছুই সামলাচ্ছেন এই লোক। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের কাজে কখনো ভুল করেন না অ্যাবি।

“ডিয়ার অ্যাবি র‍্যাচেল কেমন আছে?”

“অসাধারণ।” উত্তরে জানালেন অ্যাবি। এই বিশেষণটা কেন যেন উনি বেশ পছন্দ করেন। ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়-”

“ঠিক আছে।” মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন সেনটেইন। আব্রাহাম ভালোভাবেই জানেন যে এই নারী পুরুষ সঙ্গই বেশি ভালোবাসেন।

এবার লম্বা-চওড়া বাকি লোকটার দিকে তাকালেন সেনটেইন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

“ড, টুয়েন্টিম্যান জোনস।”

“মিসেস কোর্টনি” বিড়বিড় করে উঠলেন জোনস।

নিজের সবচেয়ে মোহনীয় হাসিটা দিলেন সেনটেইন। কিন্তু তারপরেও জোনসের মনমরা ভাব কাটল না। শোকে যেন তিনি পাথর হয়ে আছেন।

পূর্বে ডি বিয়ারস ডায়মন্ড কোম্পানিতে কাজ করলেও দীর্ঘ পাঁচ বছর পেছনে লেগে থেকে অবশেষে হানি খনির রেসিডেন্ট ইনজিনিয়ার হিসেবে কাজ করার জন্য জোনসকে রাজি করিয়েছেন সেনটেইন। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে দক্ষ এই হিরে মানব সারা দুনিয়ার মাঝেই শ্রেষ্ঠ।

দু’জনকেই স্যালুনে নিয়ে গিয়ে বারম্যানকে ইশারা করলেন সেনটেইন।

“আব্রাহাম, এক গ্লাস শ্যাম্পেন?” নিজ হাতে ওয়াইন ঢেলে দিলেন, “আর ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস, একটু মাদিরা?”

“আপনি সত্যিই কিছু ভোলেন না মিসেস কোর্টনি।”

“সকলের সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশে, জেন্টেলম্যান” যে যার পানীয়তে চুমুক দেয়ার পর দরজার দিকে তাকালেন সেনটেইন।

ঘরে ঢুকল শাসা। মনোযোগ দিয়ে দেখলেন সেনটেইন। নাহ, ছেলে প্রত্যেকের সাথেই যথাযথভাবে পরিচিত হতে পেরেছে। হালকাভাবে মাথা নেড়ে সন্তুষ্টি জানিয়ে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলেন। এটা এমন এক সংকেত যার মানে পরিচয়পর্ব শেষ। এবার কাজের ব্যাপারে কথা বলতে হবে। সবাই তার দিকে মনোযোগ দিলেন। “অবশেষে ঘোষণাটা এসেছে।” জানালেন সেনটেইন, “ওরা আমাদের কোটা আরো ছোট করে দিয়েছে। পুরুষ দুজন পরস্পরের দিকে চেয়ে তারপর সেনটেইনের দিকে তাকালেন।

“আমরা তো প্রায় বছরখানেক ধরেই এর অপেক্ষায় আছি।” মনে করিয়ে দিলেন আব্রাহাম। “প্রত্যাশা আর ঘটনা ঘটার মাঝে নিশ্চয় ফারাক আছে।” তিক্ত স্বরে বলে উঠলেন সেনটেইন।

“কত?” জানতে চাইলেন জোনস। “চল্লিশ শতাংশ।” সেনটেইনের উত্তর শুনে মনে হল ভদ্রলোক কান্নায় ভেঙে পড়বেন।

সেন্ট্রাল সেলিং অর্গানাইজেশন এ দর ঠিক করে। স্বাধীন উৎপাদকদের তাই এর বিরুদ্ধে কিছুই করার নেই।

“চল্লিশ শতাংশ ক্ষেপে উঠলেন আব্রাহাম, “এটা অন্যায়”

“ঠিক তাই ডিয়ার অ্যাবি, কিন্তু কিছুই করার নেই।

“ক্যাটাগরিতেও কোনো পরিবর্তন নেই?” জানতে চাইলেন অ্যাবি।

“একই শতাংশ।” সেনটেইনের উত্তর শুনে ভেতরের পকেট থেকে নোটবুক বের করে হিসাব শুরু করলেন জোনস। পেছনে ছেলের দিকে তাকালেন সেনটেইন।

“আমরা কী নিয়ে কথা বলছি তুমি বুঝতে পারছো?”

“কোটা? হ্যাঁ।”

“কোনোকিছু না বুঝতে পারলে জিজ্ঞেস করবে।” সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েই জোনসের দিকে তাকালেন।

“দশ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য আপিল করা যায় না?” জোনসের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।

“ইতোমধ্যেই করেছি। কিন্তু ওরা প্রত্যাখ্যান করেছে।”

আবারো নোট বুকের উপর খসখস করে ঝড় তুললেন জোনস।

“জোড় সংখ্যাটাকে ভাঙা যায় না?” আস্তে করে জানতে চাইলেন সেনটেইন। জোনসের চেহারা দেখে মনে হল উত্তরের বদলে আত্মহত্যা করতে পারলে বেশি খুশি হবেন।

“আমার বলতে ভয় হচ্ছে যে সামনে বেশ খারাপ দিন আসছে মিসেস কোর্টনি। শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে। তারপরেও যদি ডি বিয়ার ফ্লোর প্রাইসটা ইতিবাচক রাখে তাহলে হয়ত খানিকটা লাভ করা যাবে।”

হঠাৎ করেই দুর্বল বোধ করলেন সেনটেইন। ডেস্ক থেকে হাত নামিয়ে কোলের ওপর রাখলেন; যেন অন্যরা তার কাঁপুনি টের না পায়। তারপর খানিক বাদে কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললেন,

“মার্চের এক তারিখ থেকে কোটা কার্যকর হবে। তার মানে ফুল প্যাকেজ ডেলিভারির জন্য আরো একটা মাস পাওয়া যাবে। এ সময়ে কী করতে হবে আপনি জানেন ড, টুয়েন্টিম্যান জোনস।”

“প্যাকেজ ভরে তুলব আমরা।”

“কীভাবে ড. জোনস? প্রথমবারের মত কথা বলল শাসা। সিরিয়াস ভঙ্গিতে ছেলেটার দিকে তাকালেন ইঞ্জিনিয়ার।

“প্রতিবার আমরা যখন হিরে তুলি তখন কয়েকটা থাকে সত্যিকারভাবেই অতুলনীয়। ভবিষ্যতের জন্য এগুলোর কয়েকটাকে সবসময় জমা করে রাখা হয়। তাই এখন এরকম হাই কোয়ালিটি হিরে সিএসও’কে পাঠিয়ে দেব।”

“বুঝতে পেরেছি।” মাথা নাড়ল শাসা, ধন্যবাদ ড. জোনস।”

“কাজটা করতে পেরে আমারও ভালো লেগেছে মাস্টার শাসা।”

উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন।

“এখন আমরা ডিনারে যাবো।” সাইডিং ভোর খুলে ডাইনিংরুমের পথ দেখাল সাদা জ্যাকেট পরিহিত পরিচারক। রূপা আর ক্রিস্টাল ভর্তি লম্বা টেবিলের উপর অ্যান্টিক ভাসের মাঝে শোভা পাচ্ছে হলুদ গোলাপ।

***

সেনটেইনের কোচ যে রেলপথে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে এক মাইল দূরে ধোঁয়া ওঠা ক্যাম্প ফায়ারের পাশে বসে আছে দু’জন পুরুষ। চুলায় ফুটছে। পরিজ। তাদের আলোচনার সবটুকু জুড়ে আছে ঘোড়া। অন্তত পনেরোটা শক্তিশালী, টগবগে ঘোড়া দরকার।

“আমি যার কথা ভাবছি সে আমার বেশ ভালো বন্ধু।” বললেন লোথার।

“দুনিয়াতে তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুও পনেরটা তরতাজা ঘোড়া ধার দেবে না। পঞ্চাশের কমে তো নয়ই, আমার ধারণা একশ’ পাউন্ডেও কাজ হবে না।”

দুর্গন্ধযুক্ত মাটির পাইপে টান দিয়ে থু করে আগুনের মধ্যে পিক ফেললেন লোথার, “একশ’ পাউন্ড দিয়ে বরঞ্চ ভালো একটা চুরুট কিনব।”

“আমার একশ দিয়ে নয় কিন্তু।” মনে করিয়ে দিলেন হেনড্রিক।

*এখন ঘোড়ার কথা ছাড়ো। চলো লোকের খোঁজে যাই।” পরামর্শ দিলেন লোথার।

“ঘোড়ার চেয়ে মানুষ পাওয়াই বেশি সহজ হবে।” দাঁত বের করে হেসে ফেললেন হেনড্রিক। “যে কোনো সৎ লোককেও খাবার দিয়ে কিনে ফেলা যাবে। আর তার বউকে তো পুডিং দিলেই পাবে। আমি এরই মাঝে সবাইকে ওয়াইল্ড হর্স প্যানে আসার জন্য বলে দিয়েছি।”

হঠাৎ করেই অন্ধকার ফুড়ে ম্যানফ্রেডকে এগিয়ে আসতে দেখে দুজনেই চোখ তুলে তাকাল। ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে নোটবুক পকেটে রেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন লোথার।

“পাপা, তাড়াতাড়ি চলো।” কাকুতি জানালো ম্যানফ্রেড।

“কী হয়েছে ম্যানি?”

“সারাহর মা আর একেবারে ছোট্ট বাচ্চাটা খুব অসুস্থ। আমি ওদেরকে তোমার কথা বলেছি।”

যে কোনো মানুষ কিংবা জন্তু-জানোয়ারকে সুস্থ করার ব্যাপারে লোখারের সুখ্যাতি আছে। গুলির আঘাত, হাম, ছুরির ঘা যে কোনো ধরনের ক্ষত সারিয়ে তোলার ব্যাপারে লোথার ওস্তাদ।

তাঁবুর মাঝ বরাবর তারপুলিনের ভাঙাচোরা চাদরের নিচে থাকে সারাহর পরিবার। ছোট দুই ছেলেমেয়েকে পাশে নিয়ে তেল চিটচিটে কম্বলের নিচে শুয়ে আছে ওর মা। বয়স ত্রিশ না হলেও অনাহার আর পরিশ্রমে মহিলাকে প্রায় বুড়ির মত দেখাচ্ছে।

হাঁটু গেড়ে মায়ের পাশে বসে ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। সারাহ। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন ওর মা।

অন্যপাশে গিয়ে মেয়েটার মুখোমুখি বসলেন লোথার। “তোমার বাবা কোথায় সারাহ?”

“উনি খনিতে কাজ খুঁজতে গেছেন।”

“কখন।”

“বহুদিন আগে।” তারপর কী মনে করে আরো বলল, “কিন্তু কয়দিন পরেই আমাদের জন্য টাকা পাঠাবেন। তখন আমরা ভালো একটা বাসায় উঠে যাব।”

“তোমার মা কয়দিন ধরে অসুস্থ?”

“গত রাত থেকে।” আবারো ভেজা কাপড় রাখতেই দুর্বলভাবে সরিয়ে দিলেন ওর মা।

“আর বাচ্চাগুলো?” ফোলা মুখগুলো দেখলেন লোথার।

“আজ সকাল থেকে।”

কম্বল সরাতেই লোথারের নাকে এল পাতলা পায়খানার দুর্গন্ধ।

“আমি পরিষ্কার করতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওরা একটু পরপরই নোংরা করে ফেলছে। বুঝতে পারছি না কী করব।” ফিসফিস করে জানাল সারাহ।

ছোট্ট মেয়েটার কাপড় তুলে দেখলেন লোথার। অপুষ্টিতে ফুলে ঢোল হয়ে আছে পেট। গায়ের চামড়া পুরো সাদা।

অবচেতনের ঝাঁকি খেয়ে হাত সরিয়ে নিলেন লোথার। “ম্যানফ্রেড” তীক্ষ্ণস্বরে জানতে চাইলেন, “তুমি ওদের কাউকে স্পর্শ করেছ?”

“হ্যাঁ, পা। আমি পরিষ্কার করার সময় সারাহকে সাহায্য করেছি।”

“এক্ষুণি হেনড্রিকের কাছে যাও। গিয়ে বলে আমাদেরকে এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে।”

“কেন? কী হয়েছে পা?”

“যা বলছি তা করো।” রেগে গেলেন লোথার। ম্যানফ্রেড অন্ধকারে চলে যেতেই সারাহর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তোমরা খাবার পানি ফুটিয়ে খাও না?” মাথা নাড়ল মেয়েটা।

গ্রামের সাদাসিধে মানুষগুলো যখন বাধ্য হয়ে অন্য অনেকের সাথে থাকতে শুরু করে তখন বুঝতেই পারে না যে কত রকমের বিপদ হতে পারে।

“কী হয়েছে ওম?” আস্তে করে জানতে চাইল সারাহ। “ওদের কী হয়েছে?”

“টাইফয়েড জ্বর।”

“এটা কি খুব খারাপ?” অসহায়ের মত জানতে চাইল মেয়েটা। ওর চোখে তাকাবার সাহস পেলেন না লোথার। ছোট্ট বাচ্চা দুটোর দিকে তাকালেন। জুরে পুড়ে আর ডায়রিয়ায় পানিশূন্য হয়ে গেছে শরীর। মায়ের খানিকটা আশা থাকলেও দুর্বল হওয়ায় তাও সম্ভব না।

“এখন আমি কী করবো?” অনুনয়ের স্বরে জানতে চাইল সারাহ।

“ওদেরকে প্রচুর পরিমাণে ফোঁটানো পানি খাওয়াও।” যুদ্ধের সময় ইংরেজদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে টাইফয়েডের ভয়াবহতা দেখেছেন লোথার। যুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষ মারা গেছে এই জ্বরে। যেমন করেই হোক ম্যানফ্রেডকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

“আপনার কাছে ওষুধ আছে ওম?” পিছু নিল সারাহ। “আমি আমার মা আর ছোট্ট বোনটাকে মারা যেতে দিতে চাই না। কোন ওষুধ-” কান্নার দমকে কথা বলতে পারছে না ভীতসন্ত্রস্ত মেয়েটা।

ছোট্ট সারাহর সাহস দেখে লোথারের মন চাইল বলতে যে, “ওদের জন্য কোনো ওষুধ আর বাকি নেই। সবটুকু এখন ঈশ্বরেরই হাতে।”

লোথারের পিছনে এসে হাত ধরে মা আর ভাই-বোনদের কাছে নিয়ে যেতে চাইল সারাহ।

কিন্তু মেয়েটা, ধরতেই মনে হল তার নিজেরও দেহ তুক ভেদ করে শরীরে ঢুকে যাচ্ছে জীবাণু। নাহ্ তাঁকে সরে যেতে হবে।

“এখানেই থাকো।” নিজের মনোভাব লুকাতে চাইলেন লোথার।

“ওদেরকে পানি খেতে দাও। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”

“কখন ফিরে আসবেন?” মুখ তুলে তাকাল সারাহ। বিশ্বাস করেছে লোথারের কথা। মিথ্যেটা বলতে গিয়ে অত্যন্ত কষ্ট পেলেন লোথার। “যত তাড়াতাড়ি পারি।” আস্তে করে ছাড়িয়ে দিলেন সারাহর হাত।

পেছনে আর না তাকিয়ে এস্তপায়ে হেঁটে এলেন লোথার। পথিমধ্যে শুনতে পেলেন অন্যান্য চালাঘরের বাচ্চাদের গোঙানি, জ্বরের তাড়নায় কোনো এক নারীর প্রচণ্ড পেটব্যথার কাতর আওয়াজ। কে যেন হঠাৎ করে বের হয়েই লোখারের হাত চেপে ধরে বলল, “তুমি কি ডাক্তার? আমার ডাক্তার দরকার।”

কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাতটাকে সরিয়ে দৌড়ে চলে এলেন লোথার।

এরই মাঝে ব্যাগ গুছিয়ে ক্যাম্পফায়ার নিভিয়ে তৈরি হয়ে গেছেন হেনড্রিক। এক পাশে কাটাগাছের নিচে বসে আছে ম্যানফ্রেড।

“টাইফয়েড” ভয়ংকর শব্দটা উচ্চারণ করলেন লোথার, “পুরো ক্যাম্পে ছেয়ে গেছে।”

জমে গেলেন হেনড্রিক। আহত মদ্দা হাতির সামনেও ওকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন লোথার। অথচ এ জ্বরের নাম শুনেই ভয় পেয়ে গেছেন সোয়ার্ট।

“চলো ম্যানফ্রেড; আমরা চলে যাচ্ছি এখান থেকে।”

“কোথায় বাবা?”

“এখান থেকে বহুদূর।”

“কিন্তু সারাহ?” কাঁধের ওপর মাথাটাকে উঁচু করে জেদের স্বরে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড।

“ওর জন্য আমাদের আর কিছুই করার নেই।”

“ও মারা যাচ্ছে, মা আর ভাই বোনদের মতই তাই না?” বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাল ম্যানফ্রেড।

“উঠে দাঁড়াও।” নিজের অপরাধবোধ লোথারকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। “চলো।” ইশারা করতেই ম্যানফ্রেডকে তুলে দাঁড় করালেন হেনড্রিক।

“চলো ম্যানি, বাবার কথা শোনো।” ম্যানফ্রেডের হাত ধরে টানতে টানতে লোথারের পিছু নিলেন হেনড্রিক।

রেলওয়ের বস্তি এলাকা পার হবার পরেই শান্ত হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। চুপচাপ বাধ্য ছেলের মত হাঁটতে লাগল। ঘণ্টাখানেক পরেই মেইন রোডে পৌঁছে গেলেন সবাই। চাঁদের আলোয় নোংরা রুপালি নদীটার ধারে থেমে গেলেন লোথার।

“এখন আমি ঘোড়ার খোঁজে যাবো?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক।

“হ্যাঁ।” মুখে বললেও চোখ ঘুরিয়ে ফেলে আসা পথের দিকে তাকালেন লোথার। সবার মাথা ঘুরে গেল সেদিকে।

“আমি ঝুঁকিটা নিতে চাইনি” ব্যাখ্যা করলেন লোথার। “ম্যানফ্রেডকে ওদের কাছে যেতে দিতে চাইনি।” কেউই কোনো কথা বলল না। আমাদেরকে এখন নিজেদের প্রস্তুতি নিতে হবে, ঘোড়া জোগাড় করতে হবে”।

সোয়ার্টের আচমকা কী মনে হতেই কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিজের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রমেন্টস আর মেডিসিন বের করে নিলেন লোথার।

“ম্যানিকে নিয়ে যাও।” হেনড্রিককে আদেশ দিয়ে বললেন, “মার্চে উসাকস থেকে আসার সময় গামাস নদীর তীরে যেখানে ক্যাম্প করেছিলাম সেখানে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো।”

মাথা নেড়ে হেনড্রিক জানতে চাইলেন, “তোমার কতদিন লাগবে?” “ওদের মরতে যতদিন লাগে।” উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন লোথার, “হেনড্রিকের কথামত চলবে।”

“আমি তোমার সাথে আসতে পারি না, পা?”

উত্তর দেবারও প্রয়োজন মনে করলেন না লোথার। ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে দাঁড়িয়ে আবার রেলওয়ের তাবুর দিকে চলে গেলেন।

***

আগুনের পাশে উবু হয়ে বসে আছে সারাহ। কয়লার মত কালো পাত্রে ফুটছে পানি।

হঠাৎ করেই চোখ তুলে লোথারকে দেখে ফেলে। একদৃষ্টে খানিক তাকিয়ে থাকার পর গাল বেয়ে গড়িয়ে নামে চকচকে অশ্রুফোঁটা।

“আমি ভেবেছিলাম আপনি আর ফিরে আসবেন না।” ফিসফিস করে উঠল সারাহ।

মাথা নাড়লেন লোথার। নিজের দুর্বলতায় এতটাই ক্ষেপে আছেন যে কথা বলতে ভরসা পেলেন না। তার বদলে আগুনের পাশে বসে নিজের পোঁটলা খুলে এক চামচ ডায়রিয়ার ওষুধ নিয়ে টিনের মগে গরম পানি মেশালেন।

“আমাকে সাহায্য করো,” সারাহকে আদেশ দিয়েই সবচেয়ে ছোট্ট বাচ্চাটাকে তুলে বসালেন। “ও হয়ত সকালের আগেই মারা যাবে।” মনে মনে ভাবলেও বাচ্চাটার ঠোঁটের কাছে মগ ধরলেন লোথার।

ভোরেরও কয়েক ঘণ্টা আগেই মারা গেল মেয়েটা।

ছেলেটা দুপুর পর্যন্ত কোনোমতে টিকল। তারপর বোনের মতই চলে গেল।

কিন্তু সারাহর মা হার মানলেন না।

“ঈশ্বরই জানেন কেন সে এখনো বেঁচে থাকতে চাইছে। আর কিছু তো পাবার নেই।” জ্বরের ঘোরে গুঙ্গিয়ে উঠল সারাহর মা। তার জেদ দেখে বিরক্তই হলেন লোথার।

অথচ সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় মনে হল এই যাত্রায় বুঝি টিকে যাবেন। মহিলার গায়ের তাপ কমে গেছে। দুর্বলভাবে সারাহর হাত ধরে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেও কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেল না।

তবু এই পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মায়ের ঠোঁট মুছে হাত ধরে বসে রইল সারাহ্।

হঠাৎ করেই এক ঘণ্টা পরে উঠে বসে পরিষ্কারভাবে সারাহর মা জানতে চাইলেন : “সারাহ, বাছা আমার তুমি কোথায়?” সাথে সাথেই ধপ করে মাথা নামিয়ে লম্বা দম নিয়ে নিথর হয়ে গেলেন। গরম মোমের মত গলে গেল চেহারা।

এইবার কমুনাল কবরস্থানে লোথারের সাথে মায়ের মৃতদেহ নিয়ে গেল সারাহ। সমাধিস্থ করার শেষে আবার চালাঘরে চলে এল দুজনে।

ফিরে এসে নিজের ক্যানভাসের ব্যাগ ভাজ করে নিলেন লোথার। বিরস বদনে দাঁড়িয়ে সব দেখল সারাহ। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক কদম এগিয়েও কী মনে হতে ফিরে তাকালেন লোথার। কুকুরছানার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপলেও নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়েনি সারাহ।

“অল রাইট” ইশারা করলেন লোথার। “চলে এসো।” লাফাতে লাফাতে পাশে চলে এল সারাহ্।

“আমি কোনো ঝামেলা করব না।” স্বস্তিতে হিস্টিরিয়ার মত চিৎকার করছে মেয়েটা, “আমি রান্না করব, সেলাই করব, কাপড় ধুয়ে দেব। কিন্তু কোনো ঝামেলা করব না।”

***

“তুমি ওকে নিয়ে কী করবে?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক, “ওতো আমাদের সাথে থাকতে পারবে না।”

“আমি ওকে ফেলে আসতে পারিনি।” আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে উঠলেন লোথার। ..

“আমাদের জন্য সেটাই ভালো ছিল।” কাঁধ ঝাঁকালেন সোয়ার্ট।

খাদের নিচের ক্যাম্প ছেড়ে পাথুরে দেয়ালের উপরে উঠে এল সবাই। অনেক নিচে সবুজ শান্ত জলের পুলের কাছে আছে দুই ছেলে-মেয়ে।

দু’জনে পাশাপাশি উবু হয়ে বসে আছে। একটু পরেই সবুজ পানি থেকে কালো পিচ্ছিল একটা মাছ ধরল ম্যানফ্রেড। লাফ দিয়ে উঠল সারাহ্! মেয়েটার উত্তেজিত চিৎকার এখান থেকেও শোনা যাচ্ছে।

“ওকে নিয়ে কী করা যায় তা পরে ঠিক করব।” আশ্বস্ত করতে চাইলেন লোথার। কিন্তু হেনড্রিক মানলেন না।

“যত জলদি হয় ততই ভালো। এখনো ঘোড়াও জোগাড় হয়নি।”

মাটির পাইপে টান দিয়ে কথাটা ভেবে দেখলেন লোথার। কোনো না কোনোভাবে ওকে তাড়ানোটাই ভাল হবে। হঠাৎ করেই কী মনে হতে চোখ তুলে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।

“আমার কাজিন।”

দ্বিধায় পড়ে গেলেন হেনড্রিক। “তোমার যে কোনো ভাই-বোন আছে তাতো জানতাম না।”

“তাদের বেশিরভাগই ক্যাম্পে শেষ হয়ে গেলেও ট্রুডি যেন কেমন করে বেঁচে গেছে।”

“কোথায় থাকে তোমার প্রিয়তম বোন?”

“এই তো উত্তরের রাস্তায়। এবার মেয়েটাকে যত জলদি ঝেড়ে ফেলা যাবে।”

***

“আমি কোথাও যেতে চাই না” মন খারাপ করে ফিসফিসিয়ে জানাল সারাহ। “আমি তো তোমার ফুপুকে চিনি না; তোমার সাথে এখানেই থাকবো।”

“শশশ।” মেয়েটাকে সাবধান করে দিল ম্যানফ্রেড। “পাপা আর হেনি জেগে যাবে।” আগুন নিভে চাঁদটাও ডুবে গেছে। মাথার উপর কালো ভেলভেটের পর্দার ন্যায় আকাশে জ্বলছে কেবল মরুভূমির তারা।

কানের কাছ থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে থাকলেও সারাহর ঠোঁট নিঃসৃত কথা ম্যানফ্রেডের বহুকষ্ট করে শুনতে হচ্ছে। “তুমিই আমার একমাত্র বন্ধু। আর তাছাড়া আমাকে পড়াশোনা শেখাবে কে বলো তো?”

নিজের উপর দায়িত্বের গুরুভার অনুভব করল ম্যানফ্রেড। মেয়েটার মত তার নিজেরও কোনো বন্ধু নেই। শিক্ষক বলতে কেবল বাবা। কখনো কোনো নারীসঙ্গও পায়নি।

যদিও সারাহর দুর্বলতা মাঝে মাঝে ওকে খুব বিরক্ত করে তোলে। যেমন পাহাড়ে ওঠার সময় বারবার অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু সারাহর কথায় ও প্রাণ খুলে হাসে। পড়াশোনাতেও মাথা ভালো।

তাই মনে হয় সারাহ্ মেয়ে না হয়ে ছেলে হলেই ভালো হত। কিন্তু আরেকটা কথা, সারাহর গায়ের গন্ধ আর চামড়ার মসৃণতা দেখলে কেমন যেন লাগে। রাতে যখন সবাই মিলে একসাথে ঘুমায় মাঝে মাঝে জেগে উঠে মেয়েটার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে ম্যানফ্রেড।

ওকাহান্ডার দীর্ঘ, ধূলিভরা পথচলা বেশ কষ্টকর। পাঁচ দিন কেটে গেছে এরই মাঝে। ওরা খুব সকালে আর সন্ধ্যার পরে পথ চলে। দুপুর বেলায় পুরুষ দু’জন শেডে বিশ্রাম নেয়। আর ছেলে-মেয়ে দু’জন আশপাশে ঘোরাঘুরি কিংবা পড়াশোনা করে। অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের মত খেলা করে না সারাহ আর ম্যানফ্রেড। আর এখন তো বিচ্ছেদের আশঙ্কায় দু’জনেরই মন খারাপ। কম্বলের নিচে মাঝে মাঝে পাশাপাশি বসে মেয়েটার সরু কাঁধে হাত রাখে ম্যানফ্রেড গালে লাগে সারাহর মসৃণ চুলের ছোঁয়া।

“আমি তোমাকে নেয়ার জন্য ফিরে আসবো।” ঠিক এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত ম্যানফ্রেড নিজেও ভাবেনি কখনো এ কথা বলবে।

“প্রমিজ করো” ম্যানফ্রেডের কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রতিশ্রুতি চাইল সারাহ।

“প্রমিজ করছি যে ফিরে আসব।” গদগদ কণ্ঠে ঘোষণা করল ম্যানফ্রেড।

“কখন?” আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল সারাহ।

“আমাদেরকে কিছু করতে হবে।” বাবা আর হেনির পরিকল্পনা না জানলেও বুঝতে পেরেছি যে ব্যাপারটা বিদজ্জনক। “একটা জরুরি কাজ। এখন বলতে পারব না। কিন্তু শেষ হলে অবশ্যই ফিরে আসব।”

মনে হল সন্তুষ্ট হয়েছে সারাহ। ম্যানফ্রেডের মনে হল নরম হয়ে গেল মেয়েটার সারা শরীর।

“তুমি তো আমার বন্ধু, তাই না ম্যানি?”

“হ্যাঁ।”

“সবচেয়ে ভালো বন্ধু।”

“হ্যাঁ। সবচেয়ে ভালো বন্ধু।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত বুলিয়ে দিল ম্যানফ্রেন্ড। কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা একটু বেশিই মেয়েসুলভ হয়ে যাবে দেখে কাঁদল না ম্যানফ্রেড।

পরের দিন সন্ধ্যাবেলা গোড়ালি পর্যন্ত সাদা ধুলায় ডুবিয়ে ছোট্ট সীমান্ত শহর ওকাহান্ডে পৌঁছালো সবাই।

আয়বুনের ছাদে ছাওয়া ঘরগুলো পড়ন্ত সূর্যের আলোয় আয়নার মত চকচক করছে।

“রাত নামলে তারপর যাবো। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে সারাহর দিকে তাকালেন লোথার। মেয়েটার সুন্দর চুলগুলো ধুলা আর ঘামে ভিজে গাল আর কপালে লেপ্টে আছে। নগ্ন পায়েও সাদা ধুলা।

মন চাইল রাস্তার পাশের দোকান থেকে মেয়েটাকে একটা পোশাক আর জুতা কিনে দেবেন। তারপর কী মনে হতেই আবার বাতিল করে দিলেন এই আইডিয়া। কিন্তু ট্রুডি যদি মেয়েটাকে রাখতে রাজি না হয় তাহলে, আর ভাবতে চাইলেন না লোথার।

“সারাহ্ সেখানে ট্রুডি বিয়ারম্যানের সাথে থাকবে। সে কিন্তু সত্যিই বেশ ভালো আর ধার্মিক।” গত তের বছরে একবারও বোনের সাথে দেখা করেননি লোথার। “উনিও কি আমাকে ম্যানির মত পড়ালেখা শেখাবেন?”

“হ্যাঁ অবশ্যই।” মেয়েটাকে আশ্বস্ত করার জন্য যেকোনো কিছু বলতে রাজি আছেন লোথার।

“তাহলে ম্যানিও আমার সাথে থাকুক।”

“না, ম্যানিকে আমার সাথে যেতে হবে।”

“প্লিজ, আমাকেও তাহলে সাথে নিয়ে যান।”

“না। তা হয় না। তুমি এখানেই থাকবে, এ ব্যাপারে আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”

রাস্তার কাছের পাম্পের পানি দিয়ে হাত-পায়ের ধুলা ধুয়ে চুল ঠিক করে নিল সারাহ।

“আমি প্রস্তুত।” কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে অবশেষে লোথারকে জানাল সারাহ। মেয়েটা একটা আলগা বোঝা হলেও কেন যেন ওর উপর সবার মায়া পড়ে গেছে। ইশ! যদি আর কোনো উপায় থাকত। নিজেকে শক্ত করলেন লোথার।

“চলো, তাহলে।” সারাহর হাত ধরে ম্যানফ্রেডের দিকে ফিরলেন, “তুমি এখানে হেনির সাথে অপেক্ষা করো।”

“তোমার সাথে আসি পা? শুধু গেইট পর্যন্ত। সারাহকে গুডবাই বলে চলে আসব।” কাতর কণ্ঠে অনুনয় করল ম্যানফ্রেড। গম্ভীর মুখে রাজি হলেন লোথার, “ঠিক আছে। কিন্তু ভদ্র আচরণ করবে আর মুখটাও বন্ধ রাখবে।

গির্জার পাশের বড়সড় বাড়িটার পেছন দিকে এসে থামলেন লোথার। গেইট খুলে রান্নাঘরের রাস্তায় উঠতেই কানে এল ধর্মীয় সঙ্গীতের সুর। স্ক্রিন ডোরের কাছে পৌঁছাতেই দেখা গেল ভেতরে লম্বা টেবিলে বসে একসাথে গান গাইছে একটা পরিবার।

লোথার দরজায় নক করতেই গান থামিয়ে টেবিলের কাছ থেকে উঠে এলেন কালো স্যুট পরিহিত এক লোক।

“কে?” গমগম কণ্ঠে স্ক্রিন ছোর খুলেই অন্ধকারে উঁকি দিয়ে জানতে চাইলেন ভদ্রলোক, লোকটার কোটরে বসা তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে ওল্ড টেস্টামেন্টের কোনো নবী।

“তুমি!” লোথারকে চিনতে পারলেন ভদ্রলোক। কিন্তু আর কোনো সম্ভাষণ করলেন না। ঘাড় ঘুরিয়ে ভেতরে চেঁচিয়ে বললেন, “মে, তোমার আহাম্মক কাজিনটা এসেছে।”

টেবিলের কাছ থেকে এগিয়ে গেলেন স্বামীর মতই লম্বা বছর চল্লিশের এক নারী। বিশাল পেটটার উপর ভাজ করে রেখেছেন মোটাসোটা দুটো হাত।

“আমাদের কাছে কী চাও লোথার ডি লা রে?” জানতে চাইলেন ট্রুডি, “এটা একটা ঈশ্বর ভীরু ক্রিশ্চিয়ান বাসা। তোমার বন্য আচরণ এখানে চলবে না।” ছেলে-মেয়েরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে দেখে থেমে গেলেন ট্রুডি।

“হ্যালো ট্রুডি” সারাহকে সামনের আলোতে ঠেলে দিলেন লোথার। “অনেক বছর কেটে গেছে। তোমাকে সুখী দেখে সত্যিই ভালো লাগছে।”

“ঈশ্বরের ভালোবাসায় সত্যিই ভালো আছি” “সম্মত হলেন ট্রুডি।

“আমি তোমাকে আরেকটা ক্রিশ্চিয়ান দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিচ্ছি।” সারাহকে এগিয়ে দিলেন লোথার।” এই ছোট্ট মেয়েটা একদম একা, এতিম। ওর একটা ঘর দরকার। ওকে ভেতরে নিয়ে যাও ট্রুডি। ঈশ্বর তোমাকে আরো বেশি করে ভালোবাসবেন।

“এটা কি তোমার আরেকটা-” রান্নাঘরের ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকা নিজের দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে নিলেন ট্রুডি, “বেওয়ারিশ বাচ্চা?”

“ওর পরিবার টাইফয়েডের প্রকোপে মারা গেছে।”

কিন্তু ভুল করে ফেললেন, লোথার। শোনার সাথে সাথে আঁতকে উঠলেন ট্রুডি। তাই তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নিলেন লোথার।

“এটা কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ।

টুড়ি খানিকটা সহজ হলেন। “আমরা আসলে অন্য কোনো নারীর মত ওর দেখভাল করতে পারব না।” তাড়াতাড়ি বললেন লোথার।

“আমাদের ঘরে এমনিতেই খাবার মানুষের অভাব নেই করলেও তার স্বামী থামিয়ে দিলেন।

“এদিকে এসো বাছা” বজ্রকণ্ঠে আদেশ দিতেই লোথার সারাহকে ঠেলে দিলেন, “তোমার নাম কি?”

“সারাহ বেস্টার, ওম।”

“তার মানে তোমার শরীরে সত্যিকারের আফ্রিকান রক্ত বইছে?” জানতে চাইলেন ট্রুডির স্বামী, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ভদ্রলোক।

অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল সারাহ।

“তোমার মৃত মা আর বাবা রিফমর্ড গির্জায় বিয়ে করেছেন?” মেয়েটা আবারো মাথা নাড়ল। “আর তুমি কি ইস্রায়েলের প্রভু ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?”

“ইয়েস, ওম। মা আমাকে শিখিয়েছে।” ফিসফিস করে জানাল সারাহ।

“তাহলে ওকে আমাদের ফিরিয়ে দেয়াটা উচিত হবে না।” স্ত্রীকে জানালেন লোকটা, “ওকে ভেতরে নিয়ে এসো। ঈশ্বরই সব ব্যবস্থা করবেন।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারাহর হাত ধরলেন ট্রুডি, “এত পলকা মেয়েটা।”

“আর তুমি লোথার ডি লা রে” লোথারের দিকে তাকালেন শিক্ষক মশাই, “দয়াময় ঈশ্বর এখনো তোমাকে সৎপথের রাস্তা দেখাননি?”

“এখনো না সাহেব।” নিজের স্বস্তি লুকিয়ে দরজা থেকে সরে এলেন লোথার।

হঠাৎ করেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানফ্রেডের উপর চোখ পড়ল। জানতে চাইলেন, “এটা আবার কে?”

“আমার ছেলে ম্যানফ্রেড।” ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন লোথার কাছে এগিয়ে চোখ সরু করে ম্যানফ্রেডের ওপর তাকালেন ট্রুডির স্বামী। ম্যানফ্রেডও সরাসরি তাকাতেই দেখল ভদ্রলোকের চোখ দুটো ভর্তি সহানুভূতি আর উষ্ণতার ছোঁয়া।

“তুমি কি ভয় পেয়েছ?” শিক্ষকের উত্তরে মাথা নাড়লো ম্যানফ্রেড।

“না, তেমন না।”

মিটিমিটি হাসলেন ট্রুডির স্বামী, “তোমাকে বাইবেল কে শেখায়?”

“আমার বাবা, ওম।”

“তার মানে ঈশ্বর তোমার প্রতি দয়া করেছেন। মেয়েটাকে না রেখে ছেলেটাকে দিয়ে যাও।” ভদ্রলোকের কথা শুনে ছেলের কাঁধে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন লোথার। লোকটা বললেন, “তোমার ছেলেটাকে দেখে বেশ ভালো বলে মনে হচ্ছে। ঈশ্বরের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অনেক লোক দরকার।”

“এমনিতেই আমি ওকে বেশ ভালোভাবেই দেখাশোনা করছি।” নিজের উম্মা লুকালেন না লোথার। ডমিনি মানে কুঁডির স্বামী আবার ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন,

“আমার মনে হয় ঈশ্বরেরও ইচ্ছা যে আমাদের পরে আবার কখনো দেখা হবে। যখন তোমার বাবা ডুবে মরবে কিংবা ইংরেজদের ফাঁসিতে ঝুলবে অথবা তাকে কোনো সিংহ খেয়ে ফেলবে তখন আবার এখানে ফিরে এসো। ওকে? আমার তোমাকে প্রয়োজন, ঈশ্বরেরও প্রয়োজন। আমার নাম ট্রম্প বিয়ারম্যান। এই ঘরে ফিরে এসো, কেমন!”

মাথা নাড়ল ম্যানফ্রেড, “আমি সারাহকে দেখার জন্য ফিরে আসব। ওর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি।”

কথাগুলো শুনেই ভেঙে পড়ল সারাহ্। ফোপানির আওয়াজ শোনা গেল। চাইল স্টুডির হাত ছাড়িয়ে চলে আসতে।

“চুপ করো। এমন বিড়বিড়ানি থামাও।” ট্রুডির ঝাঁকুনি খেয়ে চুপ করে গেল সারাহ্।

দরজা থেকে ম্যানফ্রেডকে সরিয়ে নিলেন লোথার। বোনকে বললেন, “মেয়েটা খুব পরিশ্রমী আর সব কাজে আগ্রহী। ওর প্রতি দয়া দেখিয়ে তুমি ঠকবে না।”

“দেখা যাবে।” ট্রুডির বিড়বিড় কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাল ম্যানফ্রেড।

“ঈশ্বরের বাণী স্মরণে রেখো লোথার ডি লা রে” পেছন থেকে শোনা গেল ট্ৰম্পের গলা, “আমিই পথ, আমিই আলো। যে আমাতে বিশ্বাস করে”।

বাবার হাতের মধ্যে নড়ে উঠল ম্যানফ্রেড। চোখ ঘুরিয়ে আবার পিছনে তাকাল। ট্রম্পের লম্বা দেহ ঢেকে রেখেছে রান্নাঘরের দরজা। কিন্তু তার কোমরের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল সারাহ।

মোমবাতির আলোয় চকচক করছে মেয়েটার অশ্রুমাখা মুখ।

***

গোপন স্থানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে চারজন লোক। গেরিলা কমান্ডো দলে যুদ্ধ করার সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও পুনরায় মিলিত হবার জন্য সবাই বিভিন্ন সে জোন জেনে রাখতে।

সচরাচর এসব জায়গায় পানির যথেষ্ট মজুত থাকত। বুশম্যানদের কুয়ো কিংবা শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে গর্ত করে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস লুকিয়ে রাখত সৈন্যরা। আস্তানার চারপাশ পরিষ্কারভাবে দেখা আর ঘোড়া আর মানুষ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও রাখা হতো; যেন শত্রু অতর্কিতে হামলা চালাতে না পারে।

লোথার এরকমই একটা জায়গা বেছে নিয়েছেন নিজেদের বর্তমান মিটিঙের স্থল হিসেবে আর এ পাহাড় থেকে কয়েক মাইল উত্তরে পারিবারিক বন্ধু জার্মান খামার ব্যবসায়ীর বাড়িও আছে।

শুকনো নদীখাত ধরে পাহাড়ে পৌঁছে গেলেন লোথার। ভোলা জায়গা দিয়ে হেঁটে আসছেন যেন বাকিরা তাকে দেখতে পায়। তাই দুই মাইল দূর থেকেই ছোট্ট একটা মানবসদৃশ শরীর উইন্ডমিলের মত হাত ঘুরিয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। একটু পরেই বাকি তিনজনও চলে এল।

সবার প্রথমে “শুয়োর জন”। খোইসান যোদ্ধার হলদে কাঠামো দেখলেই বোঝা যায়, শরীরে নামা ও বার্গাডামা গোত্র ও তার গর্ব বুশম্যানের রক্ত বইছে। তার ঠিক পেছনেই আছে হেরেরো মায়ের গর্ভজাত সোয়ার্ট হেনড্রিকের অবৈধ সন্তান ক্লেইন বয়।

সোজা বাবার দিকে এগিয়ে এল ক্লেইন। বাবার মত লম্বা আর শক্ত সমর্থ হলেও মায়ের মত সুশ্রী হয়েছে। গায়ের রঙও বুনো মধুর মত। এই দুজনেই ওয়ালবিস বে’তে ট্রলারে কাজ করত। হেনড্রিক বাকিদেরকে জোগাড় করার জন্য তাদেরকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে এখানে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য দুজনকে দেখলেন লোথার। বারো বছর পর দেখা। স্বভাবে পুরোপুরি শিকারি কুকুরের মত লোক দুটো লড়াইও করে খাসা।

এবারে তিনি তাদের পুরনো সাংকেতিক নামেই অভিবাদন জানালেন, ওভাষো যার পাদুটো বকের মত হল স্টর্ক লেগস আর বাফেলো যার মাথাটা মনে হয় ঠিক এই জন্তুটার মতই ঘাড়ের কাছে লটকে আছে। পরস্পরের হাত আর কব্জি ধরে সম্ভাষণের পর লোথার খেয়াল করে দেখলেন যে বারো বছরের ব্যবধান আর আরাম-আয়েশে দু’জনেই মধ্যবয়স্ক আর মোটাসোটা হয়ে গেছে।

“তো!” অট্টহাসি দিলেন লোথার, “বউ আর বিয়ার থেকে আলাদা করে নিয়ে এলাম।” হাসির হল্লা তুলল সবাই।

“শুয়োর জন আর ক্লেইন বয় তোমার নাম বলার সাথে সাথে ছুটে এসেছি।”

“অবশ্যই। আমাকে তোমরা কত ভালোবাসো তা তো আমি জানিই। শকুন আর শিয়ালের মত। মারতে পারলেই হল, মাংসের ব্যাপারে চিন্তা নেই।” আবারো চিৎকার করে হাসি শুরু করল সবাই। লোথারের কথার চাবুক তারা এতদিন অনেক মিস করেছে।

“শুয়োর জন অবশ্য সোনার কথাটাও বলেছে!” স্বীকার করল বাফেলো; হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আর ক্লেইন বয় তো বলেছে আবার নাকি যুদ্ধ হবে।”

“দুঃখের ব্যাপারটা কি জানো, আমার মত বয়স্ক মানুষ বউকে হয়ত দিনে একবার কি দু’বার আনন্দ দিতে পারে। কিন্তু পুরনো বন্ধুদের সাথে মিলে দিন রাত হল্লা করতেও ক্লান্ত হবে না আর তোমার প্রতি আমাদের বিশ্বস্ততা এই কালাহারির মতই বিশাল” বকের ঠ্যাঙের কথা শুনে হাসতে হাসতে একেকজনের গড়াগড়ি খাবার দশা।

এভাবেই একসাথে উপরে উঠে গোপন জায়গায় চলে এল পুরো দল। নিচু পাথুরে তাকের মত স্থানটা ক্যাম্পফায়ারের আগুনে কালো হয়ে আছে। ভেতরের দেয়ালে এখানে আশ্রয় নেয়া হাজারো হলদে বুশম্যানের হাতে আঁকা নকশা।

প্রথম চারজন এসে এরই মাঝে পাহাড়ের অন্যদিকে পাথুরে ফাটলের ভেতর লুকিয়ে রাখা গুপ্তভান্ডার খুলে ফেলেছে। এত বছর পরেও লুকিয়ে রাখা জিনিসগুলোর অবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলেন লোথার। টিনজাত খাবার, গোলাবারুদ, হলুদ গ্রিজে মোড়ানো মসার রাইফেল এমনকি কাপড়গুলোর পর্যন্ত কিছু হয়নি। আগে যুদ্ধের সময় প্রতিদিন খেতে খেতে একঘেয়ে লাগলেও আজ সবাই মিলে চেটেপুটে খেল বিকিট। মনের মাঝে ভেসে উঠল পুরনো স্মৃতি।

খাবার-দাবার শেষ করে পোকায় কাটা, মরচে পড়া জামা-কাপড়, বুট বাদ দিয়ে পুনরায় পলিশ আর সেলাইয়ের মাধ্যমে সবার জন্য অস্ত্র আর যন্ত্রপাতি আলাদা করে নিল পুরো দল। কাজ করার সময় লোখারের মনে হল এরকম আরো বেশ কয়েকটা গুপ্তভান্ডার হয়ত আশপাশেই ছড়িয়ে আছে যেগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মজুত জিনিস পাওয়া যাবে। আগে কখনো নিজের প্রয়োজনে এগুলো লুট করার কথা মাথাতেও আসেনি।

কিন্তু এবার দেশপ্রেম ছাড়িয়েও মনে হল-যদি একটা নৌকা নিয়ে ওয়ালবিস থেকে উপকূল ধরে যাওয়া যায়, তারপর হঠাৎ করেই মনে হল, যাহ শালা, আমি তো এই ভূমি আর ওয়ালবিসকে আর কখনো দেখবোই না। যা করতে চাইছে তারপর আর ফিরে আসার কোনো উপায় থাকবে না।

ত্রস্ত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি প্রবেশ মুখের দিকে চলে এলেন লোথার। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন পিঙ্গল বর্ণ, রৌদ্রতপ্ত সমভূমির দিকে। কেন যেন মনে হল যে সামনে খুব ভয়াবহ আর কষ্টকর সব দিন আসছে।

“আর কোথাও কি সুখী হতে পারব?” আপন মনেই ভাবলেন লোথার; কেঁপে উঠল সকল প্রতিজ্ঞা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই ম্যানফ্রেডকে দেখে মনে হল, “ছেলের জন্য এ সিদ্ধান্তটা কি ঠিক আছে? ওকে কি আমিই দেশান্তরীর পথে ঠেলে দিচ্ছি না?”

বহু কষ্টে মাথা ঝাঁকিয়ে সব দুশ্চিন্তা সরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর ম্যানফ্রেডকে কাছে ডেকে আস্তে আস্তে আস্তানা থেকে বেরিয়ে একটু দূরে চলে এলেন। যেন অন্য কেউ তাদের কথা শুনতে না পায়। ছেলেকে জানালেন, “আমাদের সবকিছু চুরি করে নিয়ে নেয়া হয়েছে ম্যানি। আইনের চোখে হয়ত নয়; কিন্তু ঈশ্বর আর প্রকৃতির বিধাতা ঠিকই জানেন। তাই নিজেদের জিনিস আমরা আবার ফিরিয়ে আনব। কিন্তু এতে করে ম্যানি, ইংরেজদের আইন আমাদেরকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেবে। আর এই কারণেই আমাদেরকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে। তবে ওরাও ঠিক বুনো জানোয়ারের মত তাড়া করবে। তাই সাহস আর বুদ্ধি খাটিয়েই কেবলমাত্র টিকে থাকা সম্ভব।

চোখ বড় বড় করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ম্যানফ্রেড। উনি যে তার সাথে সবকিছু শেয়ার করছেন তাতেই সে উত্তেজিত বোধ করছে।

“আমরা উত্তরে এগোব। সেখানে ভালো খামারের জমি আছে। স্বগোত্রীয় অনেকেই এরই মাঝে চলেও গেছে। নাম বদলে নতুন একটা জীবন পাব তাহলে।”

“কিন্তু সারাহ?” বদলে গেল ম্যানফ্রেডের অভিব্যক্তি।

প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেলেন লোথার, “আমরা শিকার করব আর খামারের কাজ করব।” মনোযোগ দিয়ে শুনলেও নিষ্প্রভ হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। সে রাতে অন্যরা ঘুমিয়ে পড়ার পরেও বহুক্ষণ জেগে থেকে সারাহর কথা ভাবল। কম্বলের নিচে যেন পাশেই টের পেল মেয়েটার অস্তিত্ব : “ওই আমার একমাত্র বন্ধু।”

কিন্তু হঠাৎ করেই অদ্ভুত একটা শব্দ কানে যেতেই বাস্তবে ফিরে এল ম্যানফ্রেড। নিচের সমভূমি থেকে আসা চিৎকারটা শুনে উঠে বসলেন লোথার। চট করে কম্বলটা সরাতেই কোমর অব্দি উনাক্ত হয়ে গেল। ভয়ংকর শব্দটা আবার শোনা গেল। কোথায় যেন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কোনো দানব।

“এটা কী পা?” সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেডের ঘাড়ের লোম।

“সবাই বলে সবচেয়ে সাহসী মানুষটাও নাকি প্রথমবার এই ডাক শুনে আধমরা হয়ে যায়।” নরম সুরে ছেলেকে জানালেন লোথার, “এটাই ক্ষুধার্ত কালাহারি সিংহের শিকারের গর্জন বেটা!”

***

সকাল হতেই পাহাড় থেকে নেমে এল পুরো দল। সবার আগে হাঁটছেন লোথার। সমভূমিতে পৌঁছে ছেলেকে নিজের পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, “তুমি তো ওর আওয়াজ শুনেছো, এবার দেখো পায়ের ছাপ।” হলদে নরম মাটিতে গভীরে দেবে গেছে ডিনার প্লেটের সাইজের একটা দাগ।

“এক নিঃসঙ্গ বুড়ো কেশরঅলা সিংহ।” রেখাটাকে হাত বোলালেন লোথার। আগেও তাকে বহুবার এমনটা করতে দেখেছে ম্যানফ্রেড। “দেখো কেমন করে গোড়ালির ওপর নিজের ভার দিয়ে হেঁটে বেড়ায় পশুরাজ। হয়ত র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি থাকতে চায়। কারণ শাবকদেরকে ধরাটা সহজ।”

নিচু হয়ে কাঁটা ঝোঁপের তলা থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিলেন লোথার। তারপর সোনালি লাল চুলের ছোট্ট একটা গোছা ম্যানফ্রেডের হাতে দিয়ে বললেন, “দেখো, তোমার জন্য নিজের কেশরের নমুনা রেখে গেছে।”

এরপর সবাইকে নিয়ে র‍্যাঞ্চে চলে এলেন। পুরনো জার্মান দুৰ্গটাকে আসলে হেরোরো রেজিমেন্ট রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বহুদূর থেকেই তাদের আসতে দেখেছেন কাউন্ট। লোথারের মায়ের প্রজন্মের হলেও ভদ্রলোক এখনো বেশ লম্বা আর ঋজুদেহী। সোয়ার্ট হেনড্রিককে কর্মচারীদের কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিলেও লোথার আর ম্যানফ্রেডকে ঠাণ্ডা আর অন্ধকার সেন্ট্রাল হলে নিয়ে এলেন। এখানে আগেই জার্মান বিয়ার আর জিনজার বিয়ার রেখে গেছেন কাউন্টেস।

গোসল করার পরে পরিষ্কার ইস্ত্রি করা পোশাক এনে দিল পরিচারকদের দল। ডিনারে এল এস্টেটের গরুর মাংস আর অত্যন্ত উপাদেয় রাইন ওয়াইন, আর তারপর হরেক পদের টার্ট আর পুডিং দেখে ম্যানফ্রেডের খুশি আর ধরে না। অন্যদিকে এতদিন পরে সভ্য জাতের বই আর সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করতে পেরে লোথারও আনন্দিত হলেন।

একটু পরে ম্যানফ্রেডকে হেরেরো পরিচারক সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর সিগার টানতে গিয়ে লোথারকে কাউন্ট জানালেন, “উইন্ডহক থেকে তোমার পাঠানো চিঠি পেয়েছি। দুর্ভাগ্যের কথা শুনে সত্যিই খারাপ লেগেছে। সময়টা আমাদের সবার জন্যই খারাপ আসলে। তোমার স্বর্গত মা অনেক ভালো একজন নারী ছিলেন। উনার ছেলের জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না। যাই হোক”।

কথাগুলো শুনে দমে গেলেন লোথার।

“তোমার চিঠি পাবার মাত্র দু’সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনির পারচেজিং অফিসারের কাছে সমস্ত বাড়তি পশুদেরকে বিক্রি করে দিয়েছি। এখন কেবল নিজেদেরগুলো আছে।”

যদিও আসার সময় র‍্যাঞ্চের চারপাশে চল্লিশটা উকৃষ্টমানের ঘোড়া চড়তে দেখেছেন, কাউন্টের কথা শুনে মাথা নাড়লেন লোথার।

“কিন্তু আমার কাছে এক জোড়া অসাধারণ খচ্চর আছে বেশ বড়সড়। তোমাকে একেবারে স্বল্পমূল্যে দেব, ধরো পঞ্চাশ পাউন্ড।”

“জোড়া?” জানতে চাইলেন লোথার।

“না, না, একেকটা পঞ্চাশ পাউন্ড।” দৃঢ়তার সাথে জানালেন কাউন্ট, “বন্ধুকে কখনো টাকা ধার দিতে নেই। তাহলে টাকা আর বন্ধু দুটোই হারাবে।”

এ কথায় কান না দিয়ে পুরনো প্রসঙ্গটা তুললেন লোথার। “আর্মি অফিসার কি এ অঞ্চলের সব খামার থেকে ঘোড়া কিনেছে?”

“আমি শুনেছি প্রায় একশটা কিনে নিয়ে গেছে।” লোথার ভদ্রভাবেই তার প্রত্যাখ্যান মেনে নিয়েছেন দেখে কাউন্ট স্বস্তি পেয়েছেন।

“তাহলে রেলপথেই এগুলো দক্ষিণে নিয়ে যাবে, তাই না?

“না।” মাথা নাড়লেন কাউন্ট। “আপাতত সোয়াককা নদীতীরে রেখে দিয়ে আরো পঞ্চাশ জোগাড় করে একসাথে পাঠাবে।”

পরেরদিন সকালবেলা সসেজ, মাংস আর ডিম দিয়ে পেট ভর্তি নাশতা করে বের হয়ে এল লোখারের দল। আসার আগে বহু দর কষাকষি করে বিশ পাউন্ডে কিনে এনেছে একটা ছাই রঙা খচ্চর।

“তো এখন কি তাহলে এই পিঠ-উঁচু প্রাচীন গাধায় করে ভাগবো নাকি? জানতে চাইলেন হেনড্রিক।

“না, এটা দিয়ে শিকার করব।” হেনড্রিকের সরু চোখ দেখে হেসে ফেললেন লোথার।

পাথুরে গোপন আস্তানায় ফিরে দ্রুতহাতে অস্ত্র, খাবার-দাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসের বারোটা পোটলা করে ফেললেন। তারপর প্রবেশ মুখের কাছে এনে রাখলেন সব।

“ওয়েল, লাগাম তো আছে। এখন কেবল ঘোড়া চাই।” টিপ্পনি কাটলেন হেনড্রিক।

তাকে পাত্তা না দিয়ে লোথার জানালেন, “এখানে একজন গার্ড রেখে যাওয়া দরকার। কিন্তু সবাইকে নিয়েও যেতে হবে।”

শুয়োর জনের হাতে টাকা তুলে দিলেন লোথার। দলের সবচেয়ে অবিশ্বস্ত জন। বললেন, “শোনো, যদি তুমি মাতাল হয়ে পড়ে থাকো তাহলে কিন্তু সোজা মাথায় একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেব। পুলিশের জন্যও রেখে যাবো না। বুঝলে?”

নিজের টুপির মধ্যে ব্যাংকনোটগুলো খুঁজে জন জানাল, এক ফোঁটাও স্পর্শ করব না। বাস্ তুমি তো জানোই লিকার, নারী আর টাকা নিয়ে আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারো।”

ওকাহান্ডা শহর প্রায় বিশ মাইল দূরে। কিন্তু টাকা পেয়েই লোথারদের আগে শহরে পৌঁছানোর জন্য বের হয়ে গেল জন।

গতকাল তেমন বাতাস না থাকায় মাটির উপর সিংহের পদচিহ্ন এখনো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ম্যানফ্রেড আর গাধাটাকে সবার আগে রেখে পাহাড় থেকে নেমে এল বাকি দল।

এক ঘণ্টার মধ্যেই এমন এক চিহ্ন পাওয়া গেল যাতে সবাই বুঝে গেল যে কাউন্টের একটা বকনা বাছুরকে মেরে গেছে সিংহ। কেবল বাছুরের মাথা, খুড় আর বড় হাড়গুলো পড়ে আছে।

দ্রুতপায়ে হত্যাস্থানের চারপাশে ঘুরে এলেন লোথার আর হেনড্রিক।

“কয়েক ঘণ্টা আগে মাত্র পার হয়েছে এলাকা।” জানালেন লোথার। কিন্তু একটা ঘাসের ডগা ভাঙা দেখে নিজেকে শুধরে নিলেন, “নাহ, আধঘণ্টা হবে, হয়ত আমাদের আসার শব্দ শুনতে পেয়েছে।”

“না।” নিজের হাতের লম্বা লাঠিটা দিয়ে সিংহের পায়ের ছাপ পরীক্ষা করলেন হেনড্রিক। “হেঁটে হেঁটে চলে গেছে। তার মানে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। আমাদের শব্দও পায়নি। পেট ভরা তাই কাছাকাছি জলের ধারেই গেছে।”

“দক্ষিণে।” রোদের মাঝেও চোখ পিটপিট করে পরীক্ষা করে জানালেন লোথার, “নদীর ধারে গেলে শহরের কাছে। আমাদের জন্য ভালোই হল।”

মসার বন্দুক কাঁধে ঝুলিয়ে লোকদের ইশারা করে আগে বাড়লেন লোথার। খানিক গিয়ে বালিয়াড়ির মাথায় পৌঁছাতেই দেখা দিল পশুজ। খোলা জায়গায় বিড়ালের মত হাটলেও পেটের দু’পাশে মাংসের ভারে সুবিধে করতে পারছে না।

লং রেঞ্জ হলেও গর্জে উঠল লোথারদের কাঁধের রাইফেল। কিন্তু লোথার প্রথম শটেই সিংহের পেটের নিচে ধূলিঝড় বইয়ে দিলেন। মরুভূমি অঞ্চলে রেঞ্জ নিয়ে সব সময় এ ভুলটা হয়।

পরের শটেই আহত হল সিংহ। গতি থামিয়ে বিশাল মাথাটা ঘুরিয়ে নিতম্বের আঘাত দেখতে যেতেই আরেকটা বুলেট গিয়ে বিধে গেল মাংসের ভেতরে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠেও আরো একবার লাফিয়ে লাফিয়ে উধাও হয়ে গেল সামনের দিকে।

“খুব বেশি দূর যেতে পারবে না!” সবাইকে সামনে এগোতে ইশারা করলেন হেনড্রিক।

লোথার হেনড্রিক আর ক্লেইন বয় মিলে সামনে এগোল।

“রক্ত” একটু আগে যে জায়গায় সিংহটার গায়ে লোখারের বুলেট লেগেছিল সেখানে পৌঁছে চিৎকার করে উঠলেন হেনড্রিক।

“ফুসফুসের রক্ত!” ফেনাফেনা হয়ে আছে লাল রক্ত। চিহ্ন দেখে দৌড় দিল সকলে।

“দেখো! নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে” সিংহটা যেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেছে সেখানে পৌঁছে লোথারের কথা শেষ হবার আগেই ওদের দিকে ধেয়ে এল আহত সিংহ।

পাহাড়ের শৃঙ্গের ঠিক পেছনেই মাটিতে শুয়ে থাকলেও লোথারদের শব্দ শুনে আবার উঠে পড়ল। দু’পক্ষের মাঝে এখন পঞ্চাশ কদমের দূরত্ব মাত্র।

লাল কেশরগুলো ফুলে ফেঁপে আরো বড়সড় দেখাচ্ছে। তীক্ষ্ণ দাঁতঅলা চোয়াল আর হাঁ করা মুখের ভেতর থেকে এমন এক গর্জন বেরোল যে ধীর হয়ে গেল লোথারের হাত। মসার রাইফেল কাঁধে তুলে নিতেই মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল সিংহ।

মন চাইল গুলি করে বসেন। কিন্তু জোর করে নিজের এইম বদল করলেন লোথার। বুক কিংবা ঘাড়ে গুলি করেও এ পশুকে পরাস্ত করা যাবে না। এতটা কাছ থেকে কেবল ব্রেইনে গুলি লাগাতে পারলেই নিস্তেজ করা যাবে এ জন্তকে।

সিংহের নাকের উপরের গোলাপি অংশটাতে গুলি করলেন লোথার। বিড়াল চোখ দুটোর মাঝখান ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে মাখন রঙা হলদেটে মগজ আর হাড় ভেদ করে খুলির পেছন দিক দিকে ছিটকে বেরোল বুলেট, কিন্তু সিংহটা এখনো এগোচ্ছে। বিশাল পুরুষালি একটা দেহ এসে আছড়ে পড়ল লোখারের বুকের উপর। একপাশে পড়ে গেল হাতের রাইফেল। সিংহের মাথা আর কাঁধের বাড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন লোথার।

হেনড্রিক এসে তাড়াতাড়ি তুলে লোথারকে বসিয়ে মাথা আর নাকের কাছ থেকে বালি ঝেড়ে দিলেন। লোথার দুর্বলভাবে হাত নাড়তেই তার ভয় কেটে গেল।

“তুমি দেখি ধীর আর বুড়োটে হয়ে যাচ্ছে বাস্।” হেসে ফেললেন হেনড্রিক।

“ম্যানি দেখে ফেলার আগেই আমাকে তুলে ধরো।”

হেনড্রিকের কাঁধে ভর দিয়ে বহুকষ্টে উঠে দাঁড়ালেও একের পর এক ঠিকই অর্ডার দিয়ে চললেন, “ক্লেইন বয়! লেগস্! তাড়াতাড়ি গিয়ে সিংহের গন্ধ পেয়ে পাগল হয়ে ওঠার আগেই গাধাটাকে থামাও।”

তারপর হেনড়িককে সরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে সিংহের মতদেহের কাছে গেলেন। এরই মাঝে মাছি এসে ওড়াউড়ি শুরু করেছে সিংহের চুর্ণ-বিচূর্ণ মাথার উপর, “এটাকে লোড করার জন্য সবাইকে হাত লাগাতে হবে।” বালি থেকে নিজের রাইফেল তুলে নিয়ে সাবধানে মুছে ফেললেন লোথার। তারপর এটার উপর ভর দিয়েই উঠে দাঁড়ালেন।

গাধাটাকে নিয়ে এগিয়ে আসছে ম্যানফ্রেড। দৌড় দিলেন লোথার।

“তুমি ওটাকে ধরতে পেরেছে পা?” উত্তেজিত স্বরে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড { গুলির শব্দ আগেই পেয়েছে।

“হ্যাঁ।” ছেলেকে গাধার পিঠ থেকে নামালেন লোথার, “ওইতো চুড়ার ওধারেই আছে।”

গাধার চিবুকের লোথার রিংয়ের সাথে বাড়তি দড়ি লাগিয়ে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর খুব সাবধানে ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে চোখও ঢেকে দিলেন।

“দেখা যাক। কেমন কাজ করে।” দুজন মিলে গাধাটাকে টানতে চাইলেও কেন যেন নিজের জায়গা থেকে একটুও নড়ল না জটা।

তাই লেজের নিচে খোঁচা দিলেন লোথার। তারপর খানিকটা এগিয়ে চূড়ার মাথা পর্যন্ত এলেও মৃদু বাতাসে ভেসে এল সিংহের তাজা গন্ধ।

সাথে সাথে উন্মাদ হয়ে গেল গাধা। তীক্ষ্ণ হেষা দিয়ে লাফ-ঝাঁপ শুরু করায় পা বেঁধে পড়ে গেল দড়ি ধরে রাখা দু’জন, পেছনের খুড়ের ভেতর আটকা পড়লেন লোথার। আর তারপরেই এক হ্যাঁচকা টানে চারজনসহ আধ মাইল দৌড়ে গেল গাধা। হাঁচোড়-পাঁচোড় করে চিৎকার দিচ্ছে লোথার আর তাঁর সহকারীরা। অবশেষে যখন নিজের তৈরি ধূলিমেঘের ভিতর থামল, দেখা গেল আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে বোবা গাধা।

চোখের পট্টি ভালোভাবে বসিয়ে টানতে টানতে আবার এটাকে ফিরিয়ে আনা হলেও সিংহের গন্ধ পাবার সাথে সাথে শুরু হল দৌড়। এবার অবশ্য কয়েকশ’ গজের বেশি যেতে পারল না। এরকম আরো দু’বার করার পর অবশেষে অবসন্ন হয়ে থেমে গেল গাধা। সুযোগ পেয়ে সবাই মিলে মৃত সিংহকে তুলে দিল কাঁধের উপরে। আর সাথে সাথে সিংহের থাবার স্পর্শ পেতেই লাথি দিয়ে দেহটাকে ফেলে দিল গাধা।

এভাবে ঘণ্টাখানেক যুদ্ধ করার পর অবশেষে সিংহের দেহ বাঁধা হল গাধার ওপর।

দড়ি ধরে আস্তে আস্তে গাধাটাকে নদী তীরে হটিয়ে নিয়ে এলেন লোথার।

***

সোয়াকোপ নদী আর ওপারের গ্রামের দিকে তাকালেন লোথার। নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে ঠিক সেখানেই তিনটা ছোট ছোট সবুজরঙা পুকুর। এখানেই ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়ানো হচ্ছে। কাউন্টের কথাই ঠিক। আর্মির ক্রেতা খুঁজে খুঁজে সেরাগুলোকেই নিয়ে এসেছে। দূরবিন চোখে দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন লোথার। বেশ লোভও জাগলো মনে। মরুভূমিতে জাত হওয়ায় এতদূর থেকেও স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছে জম্ভগুলোর সামর্থ্য।

মনোযোগ সরিয়ে সহিসদের দিকে তাকাতেই দেখা গেল সংখ্যায় পাঁচজন খাকি ইউনিফর্ম পরিহিত কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য থাকলেও কোনো অফিসার নেই।

“বোধ হয় ক্যাম্পের ভেতরে।” আপন মনেই বিড়বিড় করে আস্তাবলের পেছনে সারি সারি বাদামি তাবুর উপর ফোকাস করলেন লোথার।

পেছনে হালকা হুইসেলের আওয়াজ পেয়ে কাঁধের উপর দিকে তাকাতেই দেখা গেল হেনড্রিক। রক্তাক্ত বোঝা নিয়ে শেডের ভেতরে বসে আছে গাধাটা। বাকিরা ক্যান থেকে খাবার খাচ্ছে। এমন সময় শুয়োর জন এল। কোপজে থেকে নিচে নেমে এলেন লোথার।

“দেরি করেছো।” জনের বুকের কাছটায় খামচে কাছে টেনে গন্ধ শুঁকে জানালেন, “তোমার মত বদমাশ আর হয় না।”

“এক ফোঁটাও না মাস্টার। আমার বোনের কুমারীত্বের কসম।”

জনের পোঁটলা খুলে ভয়ংকর কেপ স্মোক ব্রান্ডির বোতল বের করলেন। লোথার। আলোর কাছে ধরতেই দেখা গেল ভেতরের গাঢ় বাদামি বিষাক্ত পানি।

“গ্রামে কি দেখলে?” বোতলটাকে আবার পোটলার ভেতরে রেখে দিয়ে জানতে চাইলেন লোথার।

“ক্যাম্পে সাতটা সহিস।”

“আমি তো শুনেছি পাঁচটা।

“সাত।” একেবারে নিশ্চিত শুয়োর জন।

“আর সাদা অফিসার?”

“তারা সবাই গতকাল আরো ঘোড়া কেনার জন্য অটজিওনোঙ্গতে গেছে।”

“এক ঘণ্টার মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে।” সূর্যের দিকে তাকিয়ে হিসাব করে জানালেন লোথার, “যাও, পোটলা নিয়ে ক্যাম্পে যাও।”

“কী বলব?”

“বলবে অনেক কম দামে বেচছে, তারপর ফ্রি একটু টেস্ট করতে দেবে। মিথ্যে বলায় তো তোমার জুড়ি নেই। তাই যা খুশি বলে দিও।”

“আর যদি না খায়?”

লোথার হাসলেও কোনো উত্তর দিলেন না। জানেন এর সম্ভাবনা শূন্য।

“চাঁদ গাছের মাথায় উঠে এলেই আমি চলে আসব। কাজ করার জন্য তুমি আর তোমার ব্র্যান্ডি হাতে চার ঘণ্টা সময় পাবে।”

শুয়োর জন কাঁধের ওপর পোঁটলাটা তুলে নিতেই কাঁচের বোতলের টুংটাং শব্দ শোনা গেল।

“আরেকটা কথা শুয়োর, নিজে কিন্তু ভদ্র হয়ে থাকবে। নয়ত আমি তোমার গলা কাটব।”

এদিকে নিজের জায়গা থেকে দূরবিন দিয়ে সবকিছু দেখলেন লোথার। প্রথমে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যের দল জনকে বাধা দিলেও একটু পরেই ঢুকতে দিল। একই সাথে শুয়োরের পোটলার মধ্যেও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল সবাই।

এমনকি এতটা দূর থেকে আর সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতেও খুশিতে গার্ডের সাদা দাঁতের ঝলকানি স্পষ্ট দেখলেন লোথার। সঙ্গীদেরকে ডাকতেই বেরিয়ে এল আরো দু’জনে। নিজের সম্পদ দেখাতে অবশেষে জনকে সম্মানিত অতিথির মত টেনে নিল ভেতরে। লোখারের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল শুয়োর।

যেকোনো নাবিকের মতই সান্ধ্য বাতাসের শক্তি আর গতি ভালোই চেনেন লোথার। তাই রাত নামারও ঘণ্টাখানেক পর শিস দিয়ে হেনড্রিককে ডেকে বললেন, “নদী পেরিয়ে ক্যাম্পের চারপাশ ঘুরে এসো।”

ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর ওপার থেকে অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতেই চোখ তুলে তাকালেন দু’জনে। তাবুর সামনের ক্যাম্প ফায়ারের শিখা ধপধপ করে আকাশে উঠে যাচ্ছে। নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের ছায়া। “পাগলগুলো করছেটা কী? নাচছে না যুদ্ধ করছে?” অবাক হলেন লোথার।

“আসলে নিজেরাই জানে না যে কী করছে।” মিটিমিটি হাসলেন হেনড্রিক। আগুনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নামছে, ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে আর হিহি করে হাসছে সব সেনা। একজন আবার পুরোই দিগম্বর।

“তোমার যাবার সময় হয়েছে। ম্যানিকে নিয়ে যাও। তোমার ঘোড়ার দড়ি ধরবে।” হেনড্রিকের কাঁধে চাপড় দিলেন লোথার।

হেনড্রিক ঢালু বেয়ে নামতে শুরু করলেও লোথারের কথা শুনে আবার দাঁড়িয়ে পড়লেন, “ম্যানি কিন্তু এখন তোমার দায়িত্ব। কিছু হলে নিজের জীবন দিয়েই উত্তর দিতে হবে।”

উত্তর না দিয়ে রাতের আঁধারে হারিয়ে গেলেন হেনড্রিক। আধঘণ্টা দু’জনকে নদীর বালুতীর পার হতে দেখলেন লোথার।

ওদিকে ক্যাম্পের সৈন্যদের সবাই এখন বদ্ধ মাতাল। একজনকে দেখে শুয়োর জনের মত মনে হলেও মুখ নিচু করে থাকায় নিশ্চিত হওয়া গেল না।

“এইবার ব্যাটা মরেছে।” দিগন্তে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে চাঁদ, উঠে দাঁড়ালেন লোথার। ঢালু বেয়ে নিচে নেমে গাধাটার কাছে এসে কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন।”

“চল রে, সোনা, তোর কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।” কাঁধ থেকে রাইফেল নামিয়ে কার্টিজ ভরে নদীতীরে চলে এলেন লোধার। সাথে সিংহবাহী গাধা।

নিভে গেছে ক্যাম্প ফায়ারের আগুন। সামনের আস্তাবল থেকে কোনো এক জন্তুর মৃদু নিঃশ্বাসের শব্দও কানে এল। লোথারের পেছন দিক থেকে বইছে বাতাস। এমন সময় গাধাটাকে সামনে ঠেলে দিলেন লোথার।

আর যায় কোথায়। সাথে সাথে পাগলের মত আচরণ শুরু করল সবকটা ঘোড়া। রক্তাক্ত সিংহের গন্ধ নাকে যেতেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে সবগুলো পশু। ভয়ার্ত চিৎকারের পাশাপাশি উন্মাদের মত পা ছুড়ছে ঘোড়ার দল।

আস্তাবলের দেয়ালের কাছে এসে গাধার পিঠ থেকে দড়ি কেটে সিংহের দেহটাকে মাটিতে ফেলে দিলেন লোথার। ফুসফুসের বাতাস মরা সিংহের গলা দিয়ে খানিকটা গর্জন হয়ে বেরোতেই চিৎকার দিয়ে ঘূর্ণির মত ঘুরতে শুরু করল ঘোড়াগুলো।

সিংহের পেছনের পায়ের দু’ফাঁক থেকে শুরু করে পাঁজর অব্দি পেট একটানে চিরে ফেললেন লোথার। এমনকি ব্লাডারের মধ্যেও ঢুকে গেল ধারাল ফলা। সাথে সাথে গন্ধে ভারি হয়ে উঠল বাতাস।

পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল ঘোড়ার পাল। কাঁধের উপর রাইফেল তুলে ফাঁকা গুলি করেই ম্যাগাজিন খালি করে ফেললেন লোথার। এবার একেবারে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে আস্তাবলের বেড়া ভেঙে অন্ধকার নদীতীর ধরে ছুটল সবকটা জম্ভ। সোজা একেবারে হেনড্রিকের কাছে।

তাড়াতাড়ি গাধাটাকে ধরে রাইফেল রি-লোড করে ক্যাম্প ফায়ারের আগুনের কাছে ছুটলেন লোথার। কিন্তু মাতাল অবস্থাতেও সবকিছু টের পেয়ে আস্তাবলের দিকে ছুটল এক সৈন্য।

“ঘোড়া ঘোড়া” চিৎকার জুড়ে দিল লোকটা, “ঘোড়াগুলোকে থামাতে হবে।” লোথারকে দেখে বলে উঠল, “আমাকে সাহায্য করে। আমাদের ঘোড়া”

ওর চিবুকের নিচে রাইফেলের হাতল ধরলেন লোথার। ভয়ে লোকটার দাঁতে দাতে বাড়ি খাওয়া শুরু হল। ঝুপ করে বালির উপর পড়তেই অন্যপাশে গড়িয়ে গেল কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য।

“শুয়োর জন!” তাড়াতাড়ি ডেকে উঠলেন লোথার, “তুমি কই?” দূর থেকে দেখা শরীরটাকে সোজা করতেই চাঁদের আলোয় পিটপিট করে তাকালো জন।

“ওহ ওঠো!” বুট জুতা দিয়ে সজোরে লাথি মারলেন লোথার। তারপরেও হাসতে শুরু করল জন; যেন কোনো ব্যথাই পায়নি। আমি কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি।” রাইফেলের নলটাকে জনের মাথার উপর ধরলেন লোথার। পুলিশ ধরলে কয়েকটা চাবুকের ঘায়েই পরিকল্পনার যতটুকু জানে সব গড়গড় করে বলে দেবে জন।

“তাই এটাই ওর জন্য ভালো হবে।” কিন্তু পারলেন না লোথার। তাড়াতাড়ি গিয়ে গাধাটাকে ধরে নিয়ে আসলেন।

পিঠের ভেজা কাপড়ের মত গাধার পিঠের দু’পাশে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রইল জন। পেছনে লাফ দিয়ে চড়ে বসলেন লোথার। তারপর গাধাটাকে এটার সর্বোচ্চ গতিতে ছোটালেন।

মাইলখানেক যাবার পর মনে হল বুঝি বাকিদেরকে হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু না, থামতেই সামনে বেরিয়ে এল হেনড্রিকের ছায়া।

“কয়টা ধরতে পেরেছো?” উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন লোথার।

হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “যতগুলোকে থামাতে পেরেছি।”

“ছাব্বিশ!” উল্লসিত হয়ে পঁড়িতে বাধা ঘোড়াগুলোকে দেখলেন লোথার। “সবচেয়ে ভালগুলোকে বেছে নেয়া যাবে। অল রাইট। এখন এখান থেকে সরে পড়তে হবে। সেনাবাহিনি ফিরে এলেই সর্বনাশ।” তাড়াতাড়ি নিজের আনন্দের লাগাম টেনে ধরলেন লোথার।

তারপর আস্তে করে গাধার মাথা থেকে দড়ি খুলে পিঠ চাপড়ে জন্তুটাকে মুক্ত করে দিলেন। আর সত্যি সত্যিই খুশিতে প্রথম একশ গজ টগবগ করে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল গাধাটা।

সবাই একটা করে ঘোড়ায় চড়ে পিছনে দড়ি বাঁধা আরো তিন-চারটা ঘোড়া নিয়ে চলে এল পাহাড়ের উপরের গোপন আস্তানাতে।

পরের দিন ভোরবেলা চেক করে দেখা গেল মাত্র দু’টো ঘোড়া আহত হয়েছে। আর শুয়োর জনও চেতনা ফিরে পেয়ে জেগে উঠেই বমি করে দুর্গন্ধযুক্ত ব্র্যান্ডি উগরে দিয়েছে পেট থেকে।

“তোমার সাথে আমার বোঝাপড়া এখনো বাকি আছে। বুঝলে শক্ত মুখে জনকে জানিয়েই হেনড্রিকের দিকে তাকালেন লোথার, “সবকটা ঘোড়াকে নিয়ে যাবো। তারপর মরুভূমিতে কয়েকটাকে ছেড়ে দেব।” এরপর কমান্ডো স্টাইলে ডান হাত নেড়ে বললেন, “মুভ আউট!”

পাহাড় থেকে নামিয়ে সবকটা ঘোড়াকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খাওয়ানো হল। তারপর আবার আস্তানাতে ফিরে এসে সমস্ত বোঝাসহ নিজেরাও একেকটা করে ঘোড়া পছন্দ করে চড়ে বসল।

এই ফাঁকে হেনড্রিক জানতে চাইলেন, “হাতে ক’দিন সময় পাব?”

“কৃষ্ণাঙ্গরা তো অফিসার ছাড়া কিছু করতে পারবে না। তারা ফিরবে আবার উইন্ডহক থেকে অর্ডার আর বাড়তি সেনা আনাতে গিয়ে ধরো চার থেকে পাঁচদিন।”

“তিনদিনেই আমরা বহুদূর কেটে পড়ব।” সন্তুষ্ট হলেন হেনড্রিক।

“তো এখন যাব? জিজ্ঞেস করতেই লোথার জানালেন, “দাঁড়াও আরেকটা কাজ বাকি।” এরপর নিজের ব্যাগ থেকে বাড়তি চামড়ার একটা লাগাম টেনে বের করে শেডের ভেতর বসে থাকা জনের দিকে এগিয়ে গেলেন। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখায় পায়ের আওয়াজও পায়নি জন।

“আমি কিন্তু প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।” বলে হাতের চামড়া ফালিটাকে নাড়ালেন।

“মাস্টার আমার কোনো দোষ নেই।” কেঁপে উঠে তাড়াতাড়ি পায়ের ওপর দাঁড়াতে চাইল জন।

লোথার লাগামটাকে ঘোরাতেই তামার তৈরি অগ্রভাগ গিয়ে পাঁজর ঘুরে পিছনে আঘাত করল। আর জনের বাহুমূলের নিচে মাংস কেটে গেল।

ঘোঁত ঘোত করে উঠল জন, “ওরাই তো আমাকে বাধ্য

পরের আঘাতেই পা ভাজ করে পড়ে গেল জন। ছিঁড়ে গেল শার্ট। এত আর্ত চিৎকার করছে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একের পর এক আঘাত করে হাঁপাতে হাঁপাতে থেমে গেলেন লোথার। জনও চিৎকার থামিয়ে দিল। তার কেটে যাওয়া ক্ষত দেখে অন্যরাও সাবধান হয়ে গেল।

সবার আগে কথা বললেন হেনড্রিক, “একদম ঠিক হয়েছে। বাকিটা কি আমি সারব?”

“না! ওর জন্য একটা ঘোড়া রেখে দাও। যদি মন চায় আমাদের পিছু নেবে। নয়তো মন যেখানে চায় সেই নরকে যাবে।” ছেলের দিকে একবারও তাকিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন লোথার, “অল রাইট, এগোও সবাই।”

বহুদিন পরে এতটা উজ্জীবিত বোধ করছেন। মাদকের নেশার মত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে অ্যাড্রেনালিনের গতি। আবারো তিনি হয়ে পড়েছেন এক ফেরারি আসামি; সমাজের সকল শৃঙ্খল থেকে মুক্ত।

“ওহ, ঈশ্বর, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে কাঁধে একটা রাইফেল আর দু’পায়ের নিচে একটা ঘোড়া থাকলে কেমন লাগে।”

“আবারো নিজেকে পুরুষ বলে মনে হচ্ছে।” পাশ থেকে বলে উঠলেন হেনড্রিক। ঝুঁকে ম্যানফ্রেডের উদ্দেশে বললেন, “আর তুমিও। তোমার বয়সেই তোমার বাবা আর আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। এখন আবার আরেক যুদ্ধে যাচ্ছি।” একটু আগেই দেখা দৃশ্য ভুলে গেল ম্যানফ্রেড। নিজেকে দলের একজন হিসেবে গণ্য করে গর্বে ভরে উঠল বুক।

সে রাতেই গভীর খাদের ক্যাম্পে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাবার পর হঠাৎ করেই পাহারাদারের মৃদু শিসে সবার ঘুম ভেঙে গেল। রাইফেল কাঁধে নিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল সবাই। একটু পরেই আঁধার কুঁড়ে এগিয়ে এল শুয়োর জন। ফোলা মুখ নিয়ে এসে দাঁড়াল ক্যাম্প ফায়ারের কাছে। এবার ওর দিকে একবারও না তাকিয়ে সবাই আবার ফিরে এসে যে যার জায়গায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। যেন কখনোই কিছু ঘটেনি।

কেবল লোথার কর্কশ কণ্ঠে জানালেন, “আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে শোও। গা থেকে ভুরভুর করে ব্র্যান্ডির গন্ধ বেরোচ্ছে।”

দলে পুনরায় জায়গা পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল জন। সকাল হতেই পুনরায় উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে শুরু হল যাত্রা।

***

হানি খনির পথটাই হল পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ রাস্তা। আর এখানে এলে প্রতিবার সেনটেইন ভাবেন আর নাহ, এবার মেরামত করতেই হবে। কিন্তু পরক্ষণেই জোনসের হাতের বিশাল খরচের হিসাব দেখে উঠে যায়। এ সাধ। ভাবেন, “মাত্র তো তিনদিনের ব্যাপার। বেশ অ্যাডভেঞ্চারও হয়ে যায়।”

খনিকে উইন্ডহকের সাথে টেলিগ্রাফ লাইন বসিয়ে সংযুক্ত করার জন্যও অনেক খরচ করতে হয়েছে। তাছাড়া সীমাহীন পোলের লাইনের সাথে লাগানো তামার তার নষ্ট করে দিয়েছে কালাহারির বন্য সৌন্দর্য।

প্রথম বছরের ভূমি শয়ান আর পানি পরিবহনের কথা মনে হলে এখনো নস্টালজিয়ায় ভোগেন সেনটেইন। এখন তো গভীর গর্ত থেকে পানি ভোলার জন্য উইন্ডমিল, প্রত্যেকটি স্টেশনে স্থায়ী পরিচারকের দল আছে কালাহারির প্রচণ্ড শীতে গরম খাবার আর আগুন জ্বেলে দেয়ার জন্য। এমনকি রেফ্রিজারেটরও আছে।

যাই হোক, এই তপ্ত গরমে ডেইমলারের ভেতরে বসে গায়ে ফোস্কা পড়ার দশা। কোচের মত গাড়ির ভেতরেও যদি বাতাস ঠাণ্ডা করার মেশিন বসানো যেত, হেসে ফেললেন সেনটেইন। এখনো মনে আছে কেমন করে দু’জন বুড়ো বুশম্যান তাকে উদ্ধার করেছিল। মরুভূমির মধ্যাহ্নের দানবীয় গরম থেকে বাঁচার জন্য গায়ের উপর নিজেদের প্রস্রাব আর বালি মেখে দিয়েছিল।

“হাসছ কেন মা?” জানতে চাইল শাসা।

“আরে ধুর, তোমার জন্মেরও বহু আগের কিছু কথা মনে পড়ে গিয়েছে।”

“বলো না, প্লিজ?” ছেলেটাকে যেন এই গরম আর উষ্ণতা একটুও ছুঁতে পারেনি। অবশ্য কেন পারবে? ও নিজেও তো এই মরুভূমিরই সৃষ্টি। শাসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন সেনটেইন। তারপর সবকিছু খুলে বললেন। শুনে তো শাসার চোখ ছানাবড়া, “তোমার নিজের পী?”

চুপচাপ বসে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। একটু পরেই বদলে গেল শাসার অভিব্যক্তি। বিতৃষ্ণার বদলে দেখা গেল শ্রদ্ধা।

“দেখো!” দূরের সিংহরঙা সমতল ভূমির দিকে ইশারা করলেন সেনটেইন। তারপর ডেইমলার থামিয়ে বের হয়ে এলেন বাইরে। সামনে যেন দারুচিনি রঙা পাতলা ধোঁয়ার আস্তরণ দিগন্ত ঢেকে ফেলেছে।

“দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিংবক হরিণ। এবার এই প্রথম দেখলাম।” একসাথে একই দিকে যাচ্ছে সুদৃশ্য হরিণের দল।

“বোধ হয় হাজার হাজার হবে।”

“এগুলো এখন উত্তরে বাস করতে যাচ্ছে।” ছেলেকে জানালেন সেনটেইন, “নিশ্চয়ই সেখানে ভালো বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাই পানির সন্ধানে যাচ্ছে।”

হঠাৎ করেই একেবারে কাছের একটা হরিণ মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্কিত চিৎকার জুড়ে বাকিগুলোকেও সচকিত করে দিল। পিঠ বাকা করে লম্বা মাথা নিচু করে ঠিক যেন উড়ে যাচ্ছে হরিণের পাল।

গাড়ির উপর থেকে নিচে নেমে এসে হাসতে হাসতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল মাতা-পুত্র দু’জনে। তারপর গাড়িতে উঠে শাসাকে হুইল ছেড়ে দিলেন সেনটেইন। সমভূমি হাওয়ায় ছেলেটা চালালোও বেশ খানিক বাদে শাসা বলল, “মা, আমরা একাকী থাকলে তুমি একেবারে বদলে যাও। এত মজা করতে পারো যে আমার সবসময় এমনটাই দেখতে ইচ্ছে করে।”

“দীর্ঘ সময় ধরে একটা কাজ বারবার করলে তখন কিন্তু বিরক্ত লাগবে। যেমন ধরো কাল আমরা খনিতে পৌঁছাবো আর তারপর সে কাজে তুমি নতুন আরেক উত্তেজনা টের পাবে। অভিজ্ঞতাও হবে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের কাছ থেকে যতটুকু পারো নিংড়ে নাও। বুঝলে?”

জোনস আগেই খনিতে পৌঁছে গেছেন। তাই পরিচারকদেরকেও সতর্ক করে দিয়েছেন। সন্ধ্যায় রেস্ট হাউজে পৌঁছে হট শাওয়ার নিলেন সেনটেইন। তারপর পছন্দের শ্যাম্পেনও পেলেন।

“ঠাণ্ডা পা আর গরম মাথা- ওয়াইন বলো আর মানুষ বলো কারো জন্যই। ভালো না।”

একটা বোতল থেকে সবসময় সিংগেল একটা গ্লাসই পান করেন সেনটেইন। এরপর চলে এল সবুজ বেনগুয়েলা স্রোতের সুস্বাদু লবস্টার। সাথে উইন্ডহকের মচমচে লেটুস, টমেটো আর পেঁয়াজ, আর সবশেষে বুনো ট্রাফল; যা কাঁচা খেলেই জিভে লাগে কালাহারির স্বাদ।

পরদিন ভোরেরও আগে নিকষ কালো আঁধার থাকতেই আবার শুরু হল যাত্রা। ধীরে ধীরে উপরে উঠে এল দিগন্তের সূর্য। বদলে গেল চারপাশের রঙ। হয়ে উঠল পুরো রুপালি সাদা।

হঠাৎ করেই গাড়ি থামাবার আদেশ দিলেন সেনটেইন, “স্টপ হিয়ার!” তাড়াতাড়ি নেমে ডেইমলারের ছাদে উঠে গেলেন। অবাক হয়ে গেল শাসা।

“কী হয়েছে মা?”।

“দেখো, দেখো, ওই তো! দিগন্তের একটু উপরে।”

পুরো আকাশ জুড়ে ভেসে উঠল অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য।

“ঠিক যেন আকাশের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।” বুঝতে পেরে শাসা নিজেও উত্তেজিত হয়ে উঠল।

“আকাশে ভেসে বেড়ায় যে পাহাড়।” আপন মনেই বিড়বিড় করলেন। এতবার দেখেছেন, তবু প্রতিবারই নতুন মনে হয়।

অতঃপর আবার ডেইমলারে চড়ে শুরু হল অন্তহীন পথ। আস্তে আস্তে বদলে গেল পাহাড়ের চেহারা। কেবল শক্ত আর কর্কশ পর্বত চারপাশে। এরকমই একটা পাথুরে পাহাড়ের নিচে অবস্থিত হানি খনি। যদিও প্রকতির মাঝে দালানগুলো কেমন যেন বিসদৃশ দেখায়।

সেনটেইন জোনসকে আদেশ দিয়েছেন যতটা সম্ভব সুশ্রী দালানকোঠা নির্মাণের জন্য; যেন কাজের ক্ষতি না করেও সৌন্দর্য বজায় রাখা যায়। কিন্তু শ্রমিকদের কম্পাউন্ড, স্টিলের টাওয়ার, এলিভেটর যেমন-তেমন হলেও স্টিম বয়লারটা খুবই জঘন্য লাগে। যাই হোক, খড়ে ছাওয়া অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ের সামনে ডেইমলার থামতেই লাফ দিয়ে ছুটে এলেন জোনস।

“ভ্রমণ কেমন হয়েছে মিসেস কোর্টনি? নিশ্চয়ই হাত-পা ধুয়ে খানিক বিশ্রাম করতে চান?”

“আপনি তো তা ভালোভাবেই জানেন ডা. জোনস। চলুন কাজ শুরু করা যাক।” চওড়া বারান্দা পেরিয়ে নিজের অফিসে চলে এলেন সেনটেইন, “আমার পাশে বসো।” মায়ের পাশে বসল শাসা।

রিকোভারী রিপোর্ট থেকে শুরু করে খরচের শিডিউল পর্যন্ত হাজারটা সংখ্যা শুনে হিমশিম খেল শাসা। এর ভেতরেই হঠাৎ করে সেনটেইন ছেলের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “বলো তো যদি আমরা গড়ে প্রতি লোডে তেইশ ক্যারাট করে পাই, তাহলে প্রতি ক্যারাটের খরচ কত পড়বে?” আচমকা প্রশ্নটা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শাসা। ছেলের আমতা আমতা ভাব দেখে ক্ষেপে গেলেন সেনটেইন। ক্রু কুঁচকে বললেন, এটা তো স্বপ্ন দেখার সময় নয়।” তারপর আবার জোনসের দিকে মনোযোগ দিলেন।

একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন। “কাল তাহলে এখান থেকেই আবার শুরু হবে।” বিড়ালের মত আড়মোড়া ভেঙে সবাইকে নিয়ে চওড়া বারান্দাটাতে সবাইকে নিয়ে চলে এলেন।

হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “যেমনটা আগেই বলেছি শাসা আপনার হয়ে কাজ করবে। আমার ধারণা পরিবহনের ব্যাপারগুলো ওর শিখে নেয়া উচিত।”

“আমিও সেটাই বলতে চাইছিলাম, ম্যাম।”

“তাহলে কখন আসব?” এবারে জানতে চাইল শাসা।

“শিফট তো ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মাস্টার শাসা চাইলে এক ঘন্টা পরে আসতে পারবে।” সেনটেইনের দিকে তাকালেন জোনস। কিন্তু তিনি কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। এটা আসলে শাসার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ এই বয়সী ছেলেরা ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠাটাকে বিভীষিকা বলে মনে করে। তাই সিদ্ধান্ত নেবার ভার ছেলের উপরেই ছেড়ে দিলেন সেনটেইন।

“আমি ভোর সাড়ে চারটায় মেইন গেইটে থাকব স্যার” শাসার উত্তর শুনে স্বস্তি পেলেন সেনটেইন। হাত ধরে বললেন, “তাহলে চলো আজ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে হবে।”

রাস্তায় নেমে এল ডেইমলার। সেনটেইন নিজেই চালাচ্ছেন। শেষ মাথায় টার্ন কটেজের দোরগোড়ায় বারান্দার কিনারে হাঁটু ছড়িয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। পরনের স্কার্ট পায়ের বেশ খানিকটা উপরে উঠে গেছে।

ডেইমলার পাশ দিয়ে যাবার সময় শাসাকে দেখে ভেংচি কাটল মেয়েটা। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল শাসা। মনে এল অপরাধবোধ। পাম্প হাউসের পেছনে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা মনে হলে এখনো লাল হয়ে ওঠে গাল। যাক! মা সোজা রাস্তার দিকে চেয়ে আছে। নিশ্চয় কিছু দেখেনি। কিন্তু বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন, “কোনো ঝামেলা হবার আগেই হতচ্ছাড়া মেয়েটাকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে।”

অবাক হয়ে গেল শাসা। কোনো কিছুই মায়ের চোখ এড়ায় না। তারপরেই মেয়েটাকে দূরে পাঠিয়ে দেয়ার কথা মনে হতেই কেন যেন মোড় দিয়ে উঠল বুক। আস্তে করে জানতে চাইল, “তাহলে ওদের কী হবে মা? মানে ওর বাবার চাকরি চলে যাবে।” মা আর জোনসের মুখে ব্যয় সংকোচের কথা শুনেছে শাসা। তখন কেবল সংখ্যা মনে হলেও মেয়েটাকে দেখে সংখ্যাগুলো রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে গেল।

“জানি না ওদের কী হবে।” শক্ত হয়ে গেল সেনটেইনের মুখে, “আর জানি যে এটা নিয়ে আমাদের চিন্তা না করলেও চলবে। বাস্তব অত্যন্ত কঠিন আর সবাইকে তা মেনে নিতেই হবে। তাই ভাবতে হবে ওদেরকে ছাঁটাই না করলে আমাদের কী হবে।”

“আমাদের লোকসান হবে।”

“ঠিক তাই। আর তাহলে খনি বন্ধ করে দিতে হবে আর এই স্বল্পসংখ্যকের জন্য সবাই একসাথে বেকার হবে। নিজেদের সবকিছু আমরা হারিয়ে ওদের মতই হয়ে যাবো। তুমি কি তাই চাও?”

হঠাৎ করে ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা রেলওয়ে ক্যাম্পের নোংরা ধূলিমাখা ছেলেটার কথা মনে পড়ে গেল। তার জায়গায় এমনকি নিজেকেই দেখল।

“না!” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেও গলার স্বর নামিয়ে নিল শাসা; কেঁপে উঠে জানতে চাইল, “সত্যিই কি এমন হবে মা? আমরা কি গরিব হয়ে যাব?”

“হতেও পারি সোনা। প্রতিটি মিনিট যদি কাজে লাগাতে না পারি তাহলে ভয়ংকর ব্যাপারটা ঘটে যেতেও পারে। সৌভাগ্য তৈরি করা বেশ কষ্ট কিন্তু ধ্বংস করতে একটুও সময় লাগে না।”

নিজের ইয়ট, বিশপ স্কুলের বন্ধু-বান্ধব, পোলো খেলার ঘোড়া, ওয়েল্টেভ্রেদেনের আঙুর ক্ষেতের কথা ভেবে ভয় পেয়ে গেল শাসা।

“মা সত্যিই এমনটা হবে?”

“নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। হাত বাড়িয়ে ছেলের হাত ধরলেন সেনটেইন, “এটাই তো জীবনে খেলার মজা।”

“আমি গরিব হতে চাই না।”

“না!” ছেলের মতই জোর গলায় বললেন সেনটেইন। “আমরা সাহস আর সুচতুরতার সাথে যতণ কাজ করব ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম কিছুই ঘটবে না।”

“তুমি যে বললে ব্যবসা থেমে যাবে। কেউ আমাদের হিরে কিনবে না…” পূর্বে এগুলো নিছক শব্দ হলেও এখন সম্ভাবনা হয়ে দেখা দিল শাসার মনে।

“সবসময় মনে রাখবে যে কোনোদিন চাকা ভিন্ন দিকে ঘোরা শুরু করবে। তাই গোল্ডেন রুলসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। মনে আছে সেগুলো কী কী? প্রথমটা বলো তো?” ছেলের কাছে জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“যখন সবাই বেচবে তখন তুমি কিনবে, যখন সবাই কিনবে তখন তুমি বিক্রি করবে।” সাথে সাথে উত্তর দিল শাসা।

“গুড। আর এখন কী হচ্ছে বলো তো?”

“সবাই কেনার চেষ্টা করছে।”

ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই চওড়া হাসি হাসল শাসা।

“আমার ছেলেটা আসলেই খুব সুন্দর আর সহজাত প্রতিভার অধিকারী।” আপন মনে ভাবলেন সেনটেইন। তারপর অপেক্ষা করলেন। দেখা যাক কতদূর পর্যন্ত বুঝতে পারে শাসা। কুণ্ডুলি পাকানো সাপের বিষদাঁত খুঁজে পাবে কিনা দেখা যাক। আর তৎক্ষণাৎ বিষণ্ণ হয়ে বদলে গেল শাসার অভিব্যক্তি।

“কিন্তু মা, আমাদের কাছে টাকা না থাকলে কীভাবে কিনব?”

রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে ইঞ্জিন বন্ধ করলেন সেনটেইন। তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে ওর দু’হাত ধরলেন।

“এখন তোমাকে আমি যা বলব তা আমাদের বিজনেস সিক্রেট। এটা কারো সাথেই শেয়ার করা যাবে না। দাদু, অ্যানা, টুয়েন্টিম্যান জোনস, আব্রাহাম কারো সাথে না। শুধু আমার আর তোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে ঠিক আছে?” শাসা মাথা নাড়তেই গভীরভাবে দম নিলেন সেনটেইন, বললেন, “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে দুনিয়ার উপর নেমে আসা এ বিপর্যয় হচ্ছে। আমাদের উন্নতির কেন্দ্রস্থল। যে সুযোগটা সবাই পায় না। তাই গত কয়েক বছর ধরেই আমি এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। কীভাবে জানো?” মায়ের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে না সুলভ মাথা নাড়ল শাসা।

“আমি খনি আর ওয়েন্টেভেদেন ছাড়া বাকি সবকিছুকে ক্যাশ বানিয়ে ফেলেছি। এমনকি এগুলো দেখিয়ে প্রচুর ধারও করেছি।”

“এই কারণেই মাছের ফ্যাক্টরি, ওয়ালবিস বে’তে গিয়েছি? তুমি এখন টাকা চাও?”

“হ্যাঁ।” ছেলেকে উৎসাহ দিলেন সেনটেইন। এরপর হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল শাসার চেহারা।

“তুমি কি এখন কিনবে?”

“আমি শুরুও করে দিয়েছি।” খুশি হলেন সেনটেইন, “জমি, মাছের ঘের, খনি এমনকি কেপটাউনে থিয়েটার পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে বেশি কিনেছি জমি। মাত্র দুই শিলিং দিয়ে এক একর। চাইলে আরো কেনা যাবে। আর জমি-ই হল সম্পদ ধরে রাখার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায়, বুঝলে!”

শাসা সবটুকু বুঝতে না পারলেও মায়ের চোখের দৃষ্টি দেখে এর বিশালতা ঠিকই অনুভব করল।

“এখন তুমি আমাদের সিক্রেট জেনে গেলে।” হেসে ফেললেন সেনটেইন, “আর আমার ধারণা যদি সঠিক হয় তাহলে আমাদের এই ভাগ্য দ্বিগুণ, তিনগুণ রূপ নেবে বুঝলে?”

“কিন্তু যদি পরিবর্তন না ঘটে” সঠিক শব্দটা স্মরণ করে শাসা বলল, “মন্দা চলতেই থাকে তাহলে কী হবে মা?”

ঠোঁট বাঁকিয়ে ছেলের হাত ছেড়ে দিলেন সেনটেইন, “কোনো কিছু নিয়েই এত ভাবিত হতে নেই, ডিয়ার।”

এরপর ডেইমলারের ইঞ্জিন স্টার্ট করলেন সেনটেইন। গাড়ি চালিয়ে চলে এলেন পথের শেষের একাকী বাংলোর কাছে।

সিঁড়ির নিচে গাড়ি পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করে আবারো তাকালেন ছেলের দিকে।

“না, শাসা ডার্লিং, আমরা গরিব হব না। বরঞ্চ আগের চেয়েও বেশি ধনী হয়ে যাব। আর তারপর তোমার মাধ্যমে পাব ক্ষমতা। দোর্দণ্ডপ্রতাপ আর দারুণ সৌভাগ্য। ওহ, ডিয়ার এ সব কিছুই আমি প্ল্যান করে রেখেছি। খুব সাবধানে প্ল্যান করেছি!”

***

মায়ের কথাগুলোই ঘুরতে লাগল শাসার মাথায়। রাতে একটুও ঘুম হল না। স্বপ্নের ঘোরে নিজের গায়ে দেখল চিতার চামড়ার পোশাক আর প্রচণ্ড শক্তি। ছাড়া ছাড়া ঘুমের মাঝে কাছে এল অ্যানালিসা। নিজের স্কার্ট আস্তে আস্তে উঠিয়ে তাকিয়ে রইল শাসার চামড়ার পোশাকের দিকে। অবচেতনেই পাজামার নিচে চলে গেল ছেলেটার হাত। আর যতবার অ্যানার কথা ভাবছে তীব্র হচ্ছে সুখের অনুভূতি। অবশেষে উষ্ণ তরলে ভিজে গেল শাসার পাজামার কোমরের অংশ। এত অবসন্ন হয়ে পড়ল যে ওঠার শক্তিটুকুও রইল না।

ভোরবেলা কফি আর শক্ত মিষ্টি বিস্কিটের ট্রে হাতে ঘুম হতে জাগাল গৃহপরিচারক। বাইরে তখনো গাঢ় অন্ধকার। মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল শাসা।

কিন্তু ওভাম্বো পরিচারক জানাল, “ম্যাডাম আমাকে বলেছেন তুমি না ওঠা পর্যন্ত যেন দাঁড়িয়ে থাকি।” অগত্যা বহুকষ্টে বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুলল শাসা। তারপর বাথরুমে যাবার সময় এমনভাবে হাত দিয়ে ঢেকে রাখল যেন পাজামার সামনের অংশের শুকনো দাগ দেখা না যায়।

সহিসদের একজন টাট্ট ঘোড়া নিয়ে শাসার জন্য অপেক্ষা করছিল। বাংলোর সিঁড়ি দিয়ে নেমে লাগাম হাতে নিল শাসা। সহিস আর ঘোড়া দুটোই যেহেতু পূর্ব পরিচিত তাই খানিকটা হাসি-তামাশাও হল।

এরপর পাইপগুলোকে অনুসরণ করে শর্টকার্ট রাস্তায় পাহাড়ের কাঁধে চড়ে উঠল শাসা। এই পাইপ লাইনের মাধ্যমেই পাহাড়ি ঝরনার পানি খনি ও ওয়াশিং গিয়ারে পৌঁছায়।

পাহাড়ের চূড়ায় দেখা দিল সূর্য। জীবন্ত হয়ে উঠল নিচের সমভূমি। পাহাড়ের এই অংশে সেনটেইনের নির্দেশে কোনো হাতই দেয়া হয়নি। তাই অরণ্য তার আপন মহিমা নিয়েই বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সোজা আকাশের দিকে উঠে গেছে লম্বা লম্বা সব মোপানি।

কিন্তু পাহাড়ের চুড়ার কোনা ঘুরে এদিকে এলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। সৌন্দর্যবিহীন চারকোনা সব লোথার দালান, ওয়াশিং গিয়ারের জঘন্য স্তূপ।

ঘোড়ার পেটে আস্তে করে গোড়ালি দিয়ে গুতো দিল শাসা। কয়েক মাইল দৌড়ে জন্তুটা তাকে মেইন গেইটে পৌঁছে দিল। মাত্র একটু আগেই গ্রাম থেকে এসে পৌঁছেছে টুয়েন্টিম্যান জোনসের পুরনো ফোর্ড। হেডলাইট পর্যন্ত এখনো জ্বলছে। গাড়ি থেকে নেমে হাতঘড়ি চেক করে মন খারাপ করে ফেললেন জোনস। শাসা ওনার চেয়ে তিন মিনিট আগে পৌঁছেছে।

“আর কখনো পরিবহন শিল্প দেখেছো মাস্টার শাসা?”

“না, স্যার।” উত্তরে জানাল শাসা। মন চাইল বলে যে মা কখনো দেয়নি। কিন্তু কেন যেন বলল না। তবে প্রথম বারের মত মনে খানিকটা উম্মাও এল মায়ের সর্বময় খবরদারির প্রতি।

এরপর শাসাকে শিফট বসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন জোনস। সাথে আদেশ দিলেন, “মাস্টার শাসা তোমার সাথে কাজ করবে। কিন্তু বাড়তি কোনো খাতিরের দরকার নেই। ওর সাথে অধীনস্ত যে কোনো তরুণদের মতই আচরণ করো। তবে হ্যাঁ, একদিন সেই হবে তোমার ম্যানেজিং ডিরেক্টর।” এতটা বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে জোনস্ তামাশা করেন যে কেউ হাসার সাহসই পায় না।

যাই হোক, সাথে আরেকটা আদেশও দিলেন, “যাও, মাস্টার শাসার জন্য একটা টিনের হেলমেট নিয়ে আসো।” একটু পরে শাসাকে নিয়ে খাড়া চূড়ার পাদদেশে চলে এলেন জোনস। চূড়ার নিচের বাকানো টানেলের মধ্য দিয়ে স্টিলের রেলপথ খানিকটা এগিয়েই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি মোচড় খেয়ে হারিয়ে গেছে গভীর অন্ধকারে। শাসাকে নিয়ে প্রথম ট্রাকে চড়ে বসলেন জোনস।

প্রথমদিকে চারপাশের অন্ধকার দেখে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করল শাসা। কিন্তু পেছনের ট্রাকগুলোতে গান গাইছে ধূলিমাখা ওভারঅল আর হেলমেট পরিহিত কৃষ্ণাঙ্গ ওভাষো শ্রমিক। তাদের সুরেলা কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো টানেল জুড়ে। শাসার আচরণও তাই সহজ হয়ে এল।

“একশ’ টন উইন্ডিং গিয়ারে একেকবারে ষাট বার পর্যন্ত আকরিক লোড করা যায়। আমাদের টার্গেট হল প্রতি শিফটে ছয়শ’ বার লোড করা।”

মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে শাসা। জানে মা সন্ধ্যাবেলায় নির্ঘাৎ প্রশ্ন করবে। কিন্তু অন্ধকার আর গানের সুরে মনোসংযোগ খানিকটা নষ্টও হচ্ছে। হঠাৎ করেই সামনের কয়েন সাইজের উজ্জ্বল আলোর বিন্দুটা বড় হতে হতে টানেলের শেষ মাথায় এত আলোকিত হয়ে উঠল যে, মনের অজান্তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শাসা। ওয়েল্টেভ্রেদেনে মায়ের ডেস্কে ছবি দেখলেও বাস্তবে জায়গাটা এত বিশাল হবে শাসা কল্পনাও করেনি।

পাহাড়ের মাঝখানে পুরোপুরি নিখুঁত গোলাকার একটি গর্ত পাশে ককপিটের মতই ধূসর পাথরের গোলাকার দেয়াল। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বাঁক হয়ে এগিয়ে যাওয়া ট্র্যাক ধরে পুরো দুইশ ফুট নিচের খনন ক্ষেত্রের মেঝেতে নেমে এল সকলে। দু’পাশে তাকিয়ে শাসার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়।

টুয়েন্টিম্যান জোনস এখনো লেকচার দিয়ে চলেছেন, “এটা অগ্যৎপাতের ফলে সৃষ্ট একটা পাইপ। পৃথিবীর সূচনালগ্নে এই গর্ত দিয়েই উপরে উদৃগিরিত হতে উত্তপ্ত লাভা। সূর্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা আর বিশাল চাপে পরবর্তীতে লাভা থেকেই গড়ে উঠেছে হিরে।” সমানে মাথা ঘুরিয়ে এক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত খনির বিশালতু মাথায় ধারণ করার চেষ্টা করছে শাসা।” টুয়েন্টিম্যান বলে চললেন, “তারপর পাইপের নিচের গভীরের ম্যাগমা ঠাণ্ডা হয়ে জমে যায়। তো উপরের লেয়ার যেটা বাতাস আর সূর্যের কাছাকাছি এসেছে তা অক্সিডাইজড হয়ে পরিণত হয় “ক্লাসিকাল ইয়েলো গ্রাউন্ড”। এখানে এগারো বছর ধরে কাজ করার পর মাত্র সেদিন আমরা “রু গ্রাউন্ডে” এসে পৌঁছেছি। আর বুঝতেই পারছো এটাই হল সেই গভীরের ম্যাগমা যা শক্ত হয়ে হিরেতে পরিণত হয়েছে।”

ট্রাক থেকে লাফিয়ে নিচে নামল সবাই।

“আমাদের কাজ একেবারেই সোজাসাপ্টা।” বলে চললেন জোনস, “সূর্যের প্রথম রশির সাথে সাথে শুরু হয় নতুন শিফট। গত সন্ধ্যার বিস্ফোরণ দিয়েই এদের কাজের সূচনা হয়। প্রথমেই মেঝের ভাঙা অংশ উপরে পাঠিয়ে তারপর ড্রিল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে চার্জ সেট করা হয়। সূর্য ডুবলে এ শিফট শেষ হয় আর শিফট বস ফিউজ জ্বালিয়ে দেয়। বিস্ফোরণের পর পরিবেশ শান্ত হবার জন্য সারারাত কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরের দিন সকাল বেলা পুরো প্রক্রিয়াটা আবার নতুন করে শুরু হয়। এরপর ধূসর-নীল ভাঙাচোরা পাথরের একটা অঞ্চল দেখিয়ে জোনস বললেন, “এটা হল গত রাতের বিস্ফোরণ। আজ আমরা এখান থেকেই কাজ শুরু করব।”

শাসা নিজেও বুঝতে পারেনি যে, পুরো কাজটাতে এতটা আনন্দ পাবে। তাই দিন গড়াতে লাগল আর তার আগ্রহ বাড়তে লাগল। এমনকি গরম আর ধূলাকেও গ্রাহ্য করল না। তবে ব্যাপারটাকে স্বীকার করলেন জোনস, “ধূলা শ্রমিকদের ফুসফুসে পৌঁছে পাথর হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত হোস পাইপ ব্যবহার করে আকরিককে ভেজা রাখা যেন ধূলা না ওড়ে। কিন্তু ওয়াশিং গিয়ারের জন্যও পর্যাপ্ত পানির অভাব আছে। তাই পানি নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। আর শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে পড়ে, মারা যায়। তবে হ্যাঁ, তাদেরকে কিংবা তাদের বিধবাদেরকে ভালো অংকের পারিশ্রমিকও দেই।”

এভাবেই কেটে গেল সারাদিন। দুপুরবেলা শাসাকে ডাক দিলেন জোনস, “তোমার মা তোমাকে মাত্র এক শিফট কাজ করতে বলেছেন। আমি এখন উপরে যাচ্ছি। তুমি যাবে?”

“না, স্যার।” দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিল শাসা, “ওরা কীভাবে বিস্ফোরণের জন্য গর্ত বানায় আমি সেটাও দেখতে চাই।”

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে চলে গেলেন জোনস।

যাই হোক সন্ধ্যাবেলা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শাসাকে ফিউজ জ্বালাতে দিল শিফট বস। পেঁচানো সাদা ফিউজে আগুন ধরাতেই রঙ হয়ে গেল কালো। মাথার উপর দেখা গেল নীল ধোয়া।

কাজ শেষ করে শ্রমিকদের কণ্ঠে “ফায়ার ইন দ্য হোল!” শুনতে শুনতে উপরে উঠে গেল শাসা আর শিফট বস। খানিক বাদেই কেঁপে উঠল পায়ের নিচের মাটি।

পুনরায় ঘোড়ায় চেপে পাইপ লাইনের রাস্তা ধরে বাংলোতে ফিরে এল শাসা। কিন্তু গা ভর্তি ধূলা আর ঘাম ও ক্লান্তি সত্ত্বেও কেন যেন নিজেকে এতটা সুখী আর কখনোই বোধ করেনি।

হঠাৎ করেই রুপালি রঙা পানির পাইপের উপর উঠে এল অ্যানা। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক যে শাসার ঘোড়াও চমকে লাফ দিয়ে উঠল। আরেকটু হলেই পিঠ থেকে পড়ে যেত শাসা।

চুলে বুনো ফুল গুঁজে রাখা অ্যানাকে দেখে ঠিক ওয়েল্টেভ্রেদেনের লাইব্রেরির সংরক্ষিত অংশে থাকা বইয়ের বনপরীদের মত লাগছে। মা সেগুলো পড়ার অনুমতি না দিলেও পকেট মানি বাঁচিয়ে শাসা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে ঠিকই দেখেছে স্বচ্ছ পোশাক পরিহিত সেসব পরীদের ছবি।

“হ্যালো, অ্যানালিসা” কেঁপে উঠে শাসার গলা। বেড়ে গেল বুকের ধুকপুকুনি। হাসলেও কিছু বলল না অ্যানা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল শাসা। কিন্তু স্কার্ট উপরে তুলে ক্রিম রঙা ঊরুর ঝলক তুলে পাইপ লাইনের ওপারে গভীর পাহাড়ে হারিয়ে গেল মেয়েটা। পিছু পিছু দৌড় দিল শাসা। কাঁটা ঝোপে বেঁধে গেল পা, কেটে গেল মুখের চামড়া। এমনকি পাথরের উপর ধাক্কা খেয়ে দুড়ম করে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর যখন উঠল উধাও হয়ে গেছে অ্যানা।

খানিক পরে নিজের আবেগ সংযত করে আবার পাইপ লাইনের কাছে ফিরে এল শাসা। কিন্তু ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে ঘোড়াটা। নিজের উপরেই অসম্ভব রাগ করল শাসা।

এদিকে ঘোড়াটাকে একা ফিরতে দেখে বাংলোতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সেনটেইন। তাই গভীর রাত হয়ে গেলেও শাসাকে ফিরতে দেখে তৎক্ষণাৎ শান্ত হয়ে গেলেন। ভুলে গেলেন ক্রোধ।

এক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত ধূলা আর গরমের মধ্যে কাজ করতে করতে একঘেয়ে হয়ে পড়ায় শাসাকে কপিকল রুমে পাঠিয়ে দিলেন জোনস। কিন্তু স্বল্পবাক গোমড়ামুখো কপিকল ড্রাইভার শাসাকে নিজের কন্ট্রোল সুইচ ছুঁতে দিতে চান না। তাই দু’দিন পরে শাসাকে উইদারিং গ্রাউন্ডে পাঠিয়ে দিলেন জোনস।

এখানে হানি মাইনের মজুদ রাখা হয় আর কাজ করে কোমর সমান উদোম একদল ওভাষো শ্রমিক। চারটা পোলো মাঠের সমান জায়গায় ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার টন আকরিক। প্রথমে বেশ শক্ত থাকলেও সূর্যের আলোয় ছয় মাস রেখে দিলে তবেই কেবল ভাঙার মত নরম হয়। তারপর ফ্যাক্টরিতে নিয়ে ওয়াশিং গিয়ারে ঢালা হয়।

শুরুতেই চল্লিশজন ওভাষো শ্রমিকের চার্জ দেয়া হলেও শীঘ্রিই বস-বয়ের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে শাসা। কর্মক্ষেত্রে ওর নাম মোজেস। বয়স পনেরোর ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমান, চটপটে আর ইংরেজি ও আফ্রিকান দুই ভাষাই বলতে পারে।

একসাথে লাঞ্চ ব্রেক কাটাবার সময় ছেলেটাকে পড়াশোনা সাহায্য করে শাসা। আর মোজেস ওকে নিজের ভাষা শেখায়।

মজার ব্যাপার হল শাসার বয়স মাত্র চৌদ্দ। আর ওর অধীনস্তদের বেশিরভাগেরই বয়স তিনগুণ বেশি হলেও সবাই শাসার হাসি আর তাদের ভাষা শেখার কষ্টকর প্রয়াস দেখে খুশি হয়। কয়েকদিনের মাঝে দেখা গেল অন্য গ্রাউন্ড টিমদের চেয়ে একটা করে লোড বেশি করতে পেরেছে শাসার টিম। এমনকি নিগার লাভারস হিসেবেও খ্যাতি জুটে গেল। যদিও শ্বেতাঙ্গ সুপার ভাইজারের এ টিপ্পনীতে কান দিল না শাসা।

তৃতীয় শনিবারের দুপুর বেলায় শ্রমিকদের পাওনা মিটিয়ে দেয়ার পর মোজেসের আমন্ত্রণে ওর ঘরে গেল শাসা। মোজেসের লাজুক আর সুন্দরী বউ আবার মোর মিল্কও খেতে দিল। খানিক বাদে বাংলো থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড বের করে মোজেসকে পড়তে সাহায্য করল শাসা।

তবে কিছুদূর পড়ার পর মোজেসের উপলব্ধি হল, “এটা বেশ দুরূহ কাজ। তার বদলে এটা পড়া যাক।” শাসাকে অত্যন্ত বাজে মানের হলদেটে নিউজ প্রিন্ট এনে ধরিয়ে দিল মোজেস। কোলের উপর পাতাটাকে মেলে ধরল শাসা। সম্পাদকীয় পড়ে বিস্মিত হয়ে গেল, আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস কি? জাবাভু কে?” আগ্রহ নিয়ে উত্তর দিল মোজেস। কিন্তু শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেল শাসা।

“বান্টুর পিতা জাবাভু, সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের পিতা। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসই আমাদের ভালো-মন্দের খোঁজ রাখে।”

“বুঝলাম না। মাথা নাড়ল শাসা। আলোচনা যেদিকে যাচ্ছে তা ওর ভালো লাগল না। এর উপরে আবার মোজেসের কবিতা শুনে কুঁকড়ে উঠল।

তোমাদের বাছুরেরা চলে গেছে। যাও এগুলোকে ধরে আনো। কলম হাতে তুলে নাও। কাগজ আর কালিও নাও। কারণ এটাই হবে তোমাদের ঢল। তোমাদের অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে কলম তুলে নিয়ে কালি ভরে নাও। কলম হাতেই যুদ্ধ করো।

“এটা তো রাজনীতি” মোজেসের গানে বাধা দিল শাসা, “এটা তো শ্বেতাঙ্গদের ব্যাপার।”

মোজেসের হাসি-খুশি ভাব দমে গেল। শাসার কোল থেকে সংবাদপত্র তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার পড়া শেষ হলে তোমার বইটা ফিরিয়ে দেব।” শাসার দৃষ্টি এড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেল বেচারা।

***

সোমবারে উদারিং গ্রাউন্ডের মেইন গেইটে শাসাকে থামিয়ে দিলেন জোনস, “আমার মনে হয় তুমি এখানকার সবকিছু জেনে গেছ মাস্টার শাসা, এখন মিল হাউস আর ওয়াশিং গিয়ার দেখার সময় হয়েছে।”

রেললাইনের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে মেইন প্লান্টে যাবার সময় অন্যমনস্কভাবে জোনস বললেন : “কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের খুব কাছে যাওয়াটা ঠিক নয় মাস্টার শাসা। ওরা কেবল তোমার কাছ থেকে ফায়দা লুটতে চাইবে।”

আচমকা কথাটা শুনে বিস্মিত হয়ে গেল শাসা, “মোজেস” আরে ধুর, ওতো বেশ মজার, স্যার।”

“হুম। আর তার নিজের পক্ষে ক্ষতিই বটে।” তিক্ত মুখে সম্মত হলেন জোনস, “সবচেয়ে বুদ্ধিমানরাই ঝামেলা বাধাতে ওস্তাদ। তোমার বন্ধু মোজেস কৃষ্ণাঙ্গ খনি শ্রমিকদের ইউনিয়ন গড়ে তুলতে চাইছে।”

দাদা আর মায়ের কাছ থেকে শাসা শুনেছে যে বলশেভিক আর ট্রেড ইউনিয়নিস্টরাই হল সবচেয়ে ভয়ংকর দানব, যারা সভ্য সমাজের কাঠামো ভেঙে দিতে চায়। তাহলে মোজেসও কি তাদের একজন? জোনস এদিকে বলেই চললেন, “আমাদের সন্দেহ সে “অবৈধ হিরে কেনা” জাতীয় ইউনিয়নের সাথেও জড়িত।”

কিন্তু শাসার মন কিছুতেই এ ধারণা মেনে নিতে চাইছে না। কিন্তু জোনসের পরের কথাটা শুনে তো মন একেবারে ভেঙে গেল।

এ মাস শেষে ছাঁটাইয়ের লিস্টে বোধ হয় মিঃ মোজেসকেই সবার আগে রাখা হবে। ছেলেটা বিপজ্জনক। সরিয়ে দেয়াই ভালো।”

“আমরা দু’জন বন্ধু, তাই ওরা মোজেসের সাথে এমন করছে।” কাতর হয়ে ভাবল শাসা, “এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না!” অপরাধবোধের পাশাপাশি মনে তীব্র রাগও জন্মালো। কিন্তু জোনসের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল যে কিছু বলাটা মোজেসের জন্য আরো খারাপ হবে।

তাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আপনিই জানেন কোনটা ভালো হবে।” মনে মনে ভাবল, “মা, মা-কে বলতে হবে। ইশ, যদি আমি নিজেই ঠিক করতে পারতাম যে কী করা হবে!” তারপরেই খেয়াল হল মা বোধ হয় ক্ষমতা বলতে এটাকেই বুঝিয়েছে।

“ক্ষমতা” আপন মনেই বিড়বিড় করল শাসা, “একদিন আমার ক্ষমতা হবে, অনেক ক্ষমতা।”

***

মিল হাউজের কাজটা আরো বেশি ইন্টারেস্টিং। বিশাল বিশাল মেশিনগুলো বেশ শক্তিশালীও বটে। এখানে ওয়াশিংগিয়ারের জন্য আকরিকগুলোকে একটা সঠিক আকারে ভেঙে ফেলা হয়। প্রতি ঘন্টায় একশ পঞ্চাশ টন আকরিক নির্দিষ্ট সাইজে ভেঙে পড়ে।

অ্যানার ভাই স্টোফেলকে শাসার দায়িত্ব দেয়া হল। আর এতে তো ছেলেটা মহা খুশি।

“রোলারের সেটিংস করার সময় তোমাকে কিন্তু বেশ সতর্ক থাকতে হবে। নয়ত এত সাধের হিরে চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে গুড়ো পাউডার হয়ে যাবে!” গম্ভীর মুখে সদ্য প্রাপ্ত কর্তৃত্ব ঝরল স্টোফেল।

“চলো শাসা তোমাকে গ্রিজ পয়েন্ট দেখাই। প্রতি শিফটের শুরুতেই সমস্ত পয়েন্টে গ্রিজ লাগানো হয়।” গর্জনরত রোলারের নিচে ঢুকে চিৎকার করে শাসাকে জানাল, “গত মাসে এক শ্রমিক বিয়ারিংয়ের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আর যায় কোথায়, মুরগির পাখনার মত ছিঁড়ে গেছে বেচারার হাত। কত রক্ত যে গেছে তুমি যদি দেখতে!”

দুপুরবেলায় লাঞ্চের বাঁশি শুনে মিল হাউজের ওপাশে শেড দেয়া ঘরে চলে এল শাসা আর স্টোফেল। ওয়ার্কম্যানদের নীল ওভারঅল গায়ে দিয়ে ঘুরছে, লাঞ্চবক্স খুলে স্টোফেলের সাথে খোলামেলাভাবে খেতে বসেছে; সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বোধ করল শাসা। এ ক’দিনে বয়স যেন কয়েক বছর বেড়ে গেছে।

নিজের খাবার থেকে স্টোফেলকেও সাধল শাসা। কিন্তু ছেলেটা প্রত্যাখ্যান করে বলল, “নো ম্যান। ওই তো আমার দিদি লাঞ্চ নিয়ে আসছে।” হঠাৎ করেই বাংলো থেকে আনা চিকেন, স্যান্ডউইচ আর জ্যাম রোল শাসার কাছে অখাদ্য বলে ঠেকল।

মিল হাউজের গেইট দিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে সাইকেল চালিয়ে ভেতরে এল অ্যানা। উন্মাতাল বাতাস এসে এলোমেলো করে দিল মেয়েটার পোশাক। ফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যৌবনোদ্দীপ্ত ভরা বুক।

মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল শাসা। ভাইয়ের পাশে ওকে বসে থাকতে দেখে অ্যানার অভিব্যক্তিও বদলে গেল।

“লাঞ্চে কী এনেছে লিসা?” জানতে চাইল স্টোফেল।

“সসেজ আর ম্যাশ।” ভাইয়ের হাতে ক্যানটিন তুলে দিল অ্যানা, “সবসময় যা আনি।”

অ্যানার হাত-কাটা ড্রেসের নিচে শাসার চোখে পড়ল মেয়েটার বাহুমূলের কেশ।

“ধুর, রোজ রোজ সসেজ আর ম্যাশ,” সত্যিই বিতৃষ্ণা বোধ করল স্টোফেল।

“পরেরবার মাকে বলব স্টেক আর মাশরুম রান্না করতে।” শাসা বুঝতে পারল যে ও হাঁ করে তাকিয়ে আছে; কিন্তু চোখ নামাতেও পারছে না। মেয়েটা অবশ্য সরাসরি ওর দিকে এখনো একবারও তাকায়নি।

“তুমি চাইলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারো” স্টোফেলকে প্রস্তাব দিল শাসা।

“চলো তাহলে আজ অদল-বদল করে খাই।” শাসার প্রস্তাব লুফে নিল স্টোফেল। আর ওর বাড়িয়ে ধরা ক্যানটিনের মধ্যে শাসা দেখল পাতলা তেলতেলে ঝোলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে একতাল আলু ভর্তা।

“আমার ক্ষুধা পায়নি প্রথম বারের মত অ্যানার সাথে কথা বলল শাসা। “তুমিও একটা স্যান্ডউইচ খাও অ্যানালিসা?”

কোমরের ওপর নিজের স্কার্টটাকে ঠিকঠাক করে বুনো বিড়ালের মত তাকাল অ্যানা। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি।

“যখন আমি তোমার কাছ থেকে কিছু চাইব শাসা কোর্টনি তখন ঠিক

বেই শিষ দেব” বলে ঠোঁট দুটোকে গোল করে সাপুড়ের মত বাঁশি দিয়ে আঙুলে গোপন এক ইঙ্গিত করল অ্যানা।

হাসতে হাসতে শাসার হাতে ঘুসি বসিয়ে দিল স্টোফেল, “তুমি এবার শেষ, বাছা?”

লজ্জায় বেগুনি হয়ে বসে রইল শাসা। নিজের সাইকেল নিয়ে চলে গেল আনা; কিন্তু ইচ্ছে করে এমনভাবে পেডাল চাপল যে নড়ে উঠল গোলাকার পশ্চাৎদেশ।

সেদিন সন্ধ্যায় ঘোড়া প্রিস্টর জনকে নিয়ে আবার পাইপ লাইনের ধারে এল শাসা। আশা নিয়ে এলেও ভাবছে যদি মেয়েটা না আসে। তাই আচমকা ওকে পাইপ লাইন খাড়া রাখার পিলারের কাছে দেখে চমকে উঠল শাসা।

“আমার হাত ধরো” শাসাকে প্রস্তাব দিল অ্যানা। তারপর উঠে এল প্রিস্টরের কাঁধে, শাসার পাশে। “বাম দিকে যাও।” রাস্তা দেখিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে। এভাবেই নিঃশব্দে কেটে গেল দশ মিনিট।

খানিক বাদে পাথুরে ছাওয়া ঢালের কিনারে এসে নিচে নেমে গেল অ্যানা।

“হেই নিচে যেও না। ব্যথা পাবে” সাবধান করে দিল শাসা। কিন্তু মেয়েটা শুনল না। নিচে নামতে গিয়ে হাঁফ ছাড়ল ছেলেটা। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল মাথার উপর সুউচ্চ টাওয়ারের মত দুলছে পাহাড়ের চূড়া।

“চলো তোমাকে গোপন একটা জিনিস দেখাচ্ছি কিন্তু শপথ করো যে কাউকে বলবে না। ঠিক আছে।”

“ওকে। শপথ করে বলছি কাউকে বলব না।” সম্মত হল শাসা।

পাথরের একগাদা বড় বড় চাইঅলা একটা স্থানে শাসাকে নিয়ে এল অ্যানা। এখানে গাছের ডাল সরাতেই পাওয়া গেল একটা ফোকর। দেখা গেল মেঝেতে বেশ কয়েকটা কাঁচের জার পড়ে আছে। কিন্তু শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে ভেতরে রাখা বুনোফুল। এর পেছনে সাদা হাড়ের তৈরি ছোট্ট একটা পিরামিড যেটার একেবারে চূড়ায় একটা নরকংকাল।

“কে?” খানিকটা ভয় পেয়ে গেল শাসা।

“পর্বতের অপদেবতা।” শাসার হাত ধরল অ্যানা।

“তুমি কীভাবে জানো?”

“আমার সাথে কথা হয়েছে তো!”

শাসা এতটাই ভয় পেয়ে গেল যে আর কোন প্রশ্ন করার সাহস পেল না।

“তুমি চাইলে তোমার একটা ইচ্ছে এখানে পুরণ করতে পারো।” ফিসফিস করে বলল অ্যানা।

“যেকোনো কিছু?” একটু ভেবে জানতে চাইল শাসা।

“হ্যাঁ। যেকোনো কিছু।” আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে অ্যানা।

খানিকটা এগিয়ে এসে নরকংকালের সাদা হাড়ের গায়ে হাত রাখল শাসা। আপনা থেকেই বুকের গভীরে ছড়িয়ে পড়ল এক ধরনের উষ্ণতা আর আনন্দ। প্রায় স্বপ্নতর কণ্ঠে বলে উঠল, “আমি অনেক ক্ষমতা চাই।” হঠাৎ করেই কেমন যেন চিনচিন করে উঠল আঙুলের ডগা; যেন বিদ্যুতের শক খেয়েছে। ঝট করে হাত সরিয়ে নিল শাসা।

ক্ষেপে উঠল অ্যানা, “ধুর! বোকা ছেলে! কেউ এরকম কিছু চায় নাকি?”

“আচ্ছা চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদেরকে যেতে হবে।” আবারো পাহাড় চূড়ায় উঠে এল দু’জনে। পথশ্রমে উভয়েই হাঁপাচ্ছে।

কিছু না বলে নিজের স্কার্ট তুলে ধরল অ্যানা। দেখা গেল লম্বা একটা লাল আঁচড়ের দাগ। নিশ্চয়ই কাটা ঝোপে লেগে কেটে গেছে।

“খানিকটা থুথু লাগিয়ে দাও।” অ্যানার কথায় শাসার হুঁশ ফিরল। এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দেখছিল অ্যানার ক্ষত।

“উঁহু। জিভ দিয়ে।” শাসা হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল থুথু দিয়ে ভিজিয়ে নিলেও পাল্টা আদেশ দিল অ্যানা।

সামনে ঝুঁকে আদেশ মত কাজ করতেই শাসার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল মেয়েটা।

***

আচমকা ঘুম ভেঙে যেতেই কেঁপে উঠল শাসা। প্রথমে বুঝতেই পারল না যে কোথায় আছে। পিঠের নিচে পাথুরে মাটি অত্যন্ত শক্ত আর বুকের উপরেও প্রচণ্ড ওজনদার কী যেন আছে। মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতেই দেখল অন্ধকার হয়ে গেছে। তারা’র আলোয় একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে প্রিস্টর জন।

হঠাৎ করেই সবকিছু মনে পড়ে গেল। বুকের উপর এলোমেলো ভঙ্গিতে শুয়ে আছে অ্যানা। শাসা এত জোরে মেয়েটাকে ধাক্কা দিল যে চিৎকার করে জেগে উঠল অ্যানা।

“অন্ধকার হয়ে গেছে! ফিরে যেতে হবে। মা- বোকার মত বলে উঠল শাসা। মাথা যেন ঠিকভাবে কাজ করছে না।

পাশেই দাঁড়িয়ে প্যান্টি ঠিক করার চেষ্টা করছে অ্যানা। আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়ের হিসেব করার চেষ্টা করল শাসা, “নয়টারও বেশি বাজে।”

“তুমি জেগে থাকতে পারলে না?” শাসার কাঁধে ভর দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করছে অ্যানা!

কাধ ঝাঁকিয়ে অ্যানার হাত সরিয়ে দিল শাসা। মন চাইছে মেয়েটার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে। কিন্তু জানে পারবে না।

“সব ভোমার দোষ।” প্যান্টি আর স্কার্ট ঠিকঠাক করে নিল অ্যানা, “বাবাকে বলব যে সব তোমার দোষ। ওহ! এবার নিশ্চয় আমার চামড়া ছিলে নিবে।”

প্রিস্টর জনের কাছে গেল শাসা। হাত দুটো এখনো কাঁপছে। আধো ঘুম আধো জাগরণভাবে বলল, “উনি তোমাকে কিছুই বলবেন না।”

মনে হল অ্যানার ক্রোধে ঘি পড়ল। ক্ষেপে উঠে বলল, “তুমি কী করবে? তুমি তো একটা বাচ্চা। যদি এমন হয় যে আমার পেটে বাচ্চা চলে এল? তাহলে কী হবে ভেবেছো?”

অ্যানার অভিযোগ শুনে অবাক হয়ে গেল শাসা, “তুমিই আমাকে দেখিয়েছে যে কী করতে হবে। নয়ত আমি জানতাম না।”

“ঈশ্বর জানেন আমাদের কী হবে” ফুঁপিয়ে উঠল অ্যানা।

“কাম অন,” অ্যানাকে প্রিস্টর জনের উপর তুলে দিয়ে নিজেও চড়ে বসল শাসা।

পাহাড় ঘুরে এদিকে আসতেই দেখা গেল নিচের সমভূমিতে মশাল নিয়ে সার্চ পার্টি বেরিয়েছে ওদের খোঁজে। রাস্তাতেও দেখা যাচ্ছে গাড়ির হেডলাইট।

“বাবা এবার আমাকে মেরেই ফেলবে।” মেয়েটার ঘ্যানঘ্যান শুনে বিরক্ত হয়ে উঠল শাসা,

“কীভাবে জানবেন? উনি তো সেখানে ছিলেন না?”

“তোমার কি ধারণা তুমিই আমার প্রথম নাকি। আগেও কতজনের সাথে করেছি। বাবা দু’বার ধরেছে আমাকে।” শাসাকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইল অ্যানা।

শাসার মনে প্রথমে হিংসে এলেও পরে ঠিকই যুক্তি দিয়ে বলল, “তাহলে তো আর আমার উপরে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই।” অ্যানা বুঝতে পারল যে নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিয়েছে। তাই নাটকীয় ভঙ্গিতে ফোপানো ছাড়া আর কিছু করার রইল না।

***

বাংলোর ড্রইংরুমে পরস্পরের কাছ থেকে যত দূরে সম্ভব দূরে এসে বসল শাসা আর অ্যানা। খানিক বাদেই বাইরের নুড়ি পাথরের ওপর শোনা গেল ডেইমলারের চাকার আওয়াজ। চোখ ঘষে আবারো কাদার চেষ্টা করল অ্যানা।

দরজায় এসে দাঁড়ালেন অগ্নিমূর্তি সেনটেইন, পাশে জোনস্। তাদেরকে দেখেই গুঙ্গিয়ে উঠল অ্যানা। চটে গেলেন সেনটেইন, আস্তে করে বললেন, “অ্যাই মেয়ে একদম চুপ।” তারপর শাসার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা কেউ ব্যথা পেয়েছো?”

“না, মা।” মাথা দোলালো শাসা।

“প্রিস্টর জন?”

“ও-ও ঠিক আছে।”

“তো ঠিক আছে, ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস, এই ইয়াং লেডিকে ওর বাবার কাছে নিয়ে যান। কী করতে হবে সে নিশ্চয়ই জানে।”

অ্যানার কব্জি ধরে দাঁড় করিয়ে দরজার দিকে নিয়ে গেলেন জোনস, বাইরে গর্জে উঠল ডেইমলারের ইঞ্জিনে।

মেয়েটা বেরিয়ে যেতেই আবার শক্ত হয়ে উঠল সেনটেইনের চেহারা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি কিন্তু বেশ অবাধ্য হয়েছে। আমি তোমাকে বলেছি এই বদমাশ মেয়েটা থেকে দূরে থাকতে?”

“হ্যাঁ, মা।”

“খনির অর্ধেক পুরুষের সাথে ওর শোয়া শেষ। উইন্ডহকে ফিরে গিয়ে তো তোমাকে রীতিমত ডাক্তারের কাছেই নিয়ে যেতে হবে।”

কী ঘটতে পারে ভেবে কেঁপে উঠল শাসা।

“অবাধ্য হওয়াটাই খারাপ। তুমি যেটা করেছে তা ক্ষমা করারও অযোগ্য?”

“গাধার মত কাজ করেছ বুঝেছো?” বলেই চললেন সেনটেইন, “হদার মত ধরা পড়েছে। এটাই হল সবচেয়ে বড় অপরাধ।”

“খনির প্রত্যেকে এখন তোমাকে নিয়ে হাসবে। নিজেকে যদি এতটা সস্তা দরের করে ফেলে তাহলে আদেশ আর নেতৃত্ব দেবে কীভাবে?”

“আমি এতটা ভেবে দেখিনি মা। ব্যাপারটা এমনিই ঘটে গেছে।”

“ওয়েল, এবার ভাবো তাহলে,” জানালেন সেনটেইন, “হাফ বোতল ডিটারজেন্ট মেখে গোসল করার সময় ভেবো। গুড নাইট।”

“গুডনাইট মা।” মায়ের দিকে এগিয়ে এল শাসা। খানিক ভেবে গাল পেতে দিলেন সেনটেইন। মাকে কিস করে শাসা জানাল, “সরি মা, আমার জন্যে তোমাকে এত লজ্জায় পড়তে হল।”

মন চাইল ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু কিছু না করে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন সিনটেইন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল শাসা।

হঠাৎ করেই বহু বছর বাদে মদের নেশা অনুভব করলেন সেনটেইন। দ্রুত বিশাল কেবিনেটের কাছে গিয়ে ঢকটক করে মুখ ভর্তি ক্যানকে খেয়েও শান্তি হল না। ধপ করে চেয়ারের উপর বসে পড়তেই মনে হল শেষ হয়ে যাবেন। নিজেকে বড় তুচ্ছ, শূন্য মনে হল।

“ব্যাপারটা ঘটেছে।” আপন মনেই ফিসফিস করলেন সেনটেইন, “নোংরা বেশ্যা মেয়েটা তৈরি হবার আগেই বের করে এনেছে এ রাক্ষস।”

“ওহ! মাই বেবি, মাই ডার্লিং” মনে হচ্ছে যেন নিজের কোনো একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছেন।

এই একাকিত্ব বুঝি কেউ আর গোছাবার নয়। কেননা মাইকেল কোর্টনি আর লোথার ডিলার দু’জনেই এখন তার কাছে মৃত।

চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে এগিয়ে গেলেন সেনটেইন। একদৃষ্টে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন, “আমি বুঝি আমার ছোট্ট সোনাটাকে হারাতে বসেছি। এরপর একদিন আরো একা, বুড়ি আর দেখতে জঘন্য হয়ে যাবো” ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন।

কিন্তু না; অন্ধকার আর নৈঃশব্দে মোড়ানো বাড়িটার ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজেকে দিয়ে করালেন ইস্পাত-কঠিন প্রতিজ্ঞা “যে পথ বেছে নিয়েছি সেখানে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই। ফিরে আসা নেই। এভাবেই শেষপর্যন্ত এগিয়ে যেতে হবে।

***

লাঞ্চের সময় স্টোফেলকে খুঁজল শাসা। “আসেনি কেন ছেলেটা?”

ওর প্রশ্ন শুনে সুপারভাইজার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কে জানে? শুধু মেইন। অফিস থেকে নোট পেয়েছি যে ও আসবে না। হয়ত চাকরি চলে গেছে। যাই হোক, শয়তানটাকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজের ভেতর অপরাধবোধের কাঁটা টের পেল শাসা।

যাই হোক বিকেলে কাজ সেরে প্রিস্টর জনের উপর চেপে বসল। গন্তব্য অ্যানাদের বাসা। জানে এতে করে মায়ের হাতে ঝাড়ি খেতে হবে, কিন্তু ভেতরে কেমন যে একরোখা জেদ চেপে বসল। দেখা গেল ওর জন্য তাদের কতটা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মিল হাউজের গেইটে ওর গতি রোধ করা হল।

উইদারিং গ্রাউন্ডের বস বয়, মোজেস এগিয়ে এসে প্রিস্টর জনের মাথায় হাত বুলিয়ে শাসাকে বলল, “আমি তোমার বই নিয়ে এসেছি।” মোটা মোটা হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড শাসার হাতে ধরিয়ে দিল মোজেস।

“তুমি বোধ হয় বই পড়োনি” তাড়াতাড়ি ওকে বাধা দিল শাসা, “এত দ্রুত তো শেষ হবার কথা নয়। আমার তো কয়েক মাস লেগে যায়।”

“আমি এটা আর পড়ব না। আসলে হানি মাইনও ছেড়ে যাচ্ছি। কাল সকালে ট্রাকে চেপে উইন্ডহক চলে যাব।”

“ওহ, নাহ!” তাড়াতাড়ি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল শাসা, “কেন চলে যাচ্ছো মোজেস?”

“এসব আসলে আমার হাতে নেই।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল লম্বা মোজেস, “কাল সকালে ট্রাকে অনেকেই চলে যাচ্ছে। জলা মানে জোনস্ বাছাই করেছে এদের সবাইকে। আর তোমার মা ছাঁটাইয়ের কারণ জানিয়ে আমাদেরকে এক মাসের পারিশ্রমিকও দিয়েছে।” তিক্তভাবে হাসল মোজেস, “এই নাও তোমার বই।”

“রেখে দাও। এটা আমার তরফ থেকে তোমার জন্য উপহার।” বইটা ফিরিয়ে দিল শাসা।

“ঠিক আছে। তোমার স্মৃতি হিসেবে রেখে দিলাম। ভালো থেকো।” অন্যদিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করল মোজেস।

“মোজেস-” পেছন থেকে ডাক দিলেও কী বলবে ভেবে পেল না শাসা। কেবল নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু পিছিয়ে গেল ওভাম্বো। একজন শ্বেতাঙ্গ আর একজন কৃষ্ণাঙ্গ কখনো করদর্শন করতে পারে না।

“ভালো থেকো।” হাল ছাড়ল না শাসা। ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকিয়ে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল মোজেস, ওর হাত এত ঠাণ্ডা শাসার অবাক লাগল ভেবে বুঝি সব কৃষ্ণাঙ্গেরই এমন হয়।

“আমরা তো বন্ধু, তাই না?” অনুনয় ঝরল শাসার কণ্ঠস্বরে।

“জানি না,” উত্তর দিল মোজেস।

“মানে?”

“জানি না আমাদের পক্ষে বন্ধু হওয়া সম্ভব কিনা।” আস্তে করে নিজের হাত ছাড়িয়ে অন্যদিকে ঘুরে গেল মোজেস। শাসার দিকে একবারও না তাকিয়ে চলে গেল কম্পাউন্ডের দিকে।

***

সমতল পথ ধরে এগিয়ে চলেছে মাইন থেকে আসা ট্রাকের কনভয়। পরস্পরের সৃষ্ট ধুলা থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের মাঝখানে অবশ্য যথেষ্ট দূরত্ব রেখেছে প্রতিটি ট্রাক, শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ উভয় পক্ষেরই চাকরিচ্যুত হতভাগ্য পরিবারসমূহ সমস্ত মালপত্রসহ ট্রাকে চড়ে চলেছে শহরের উদ্দেশে।

একদিন বয়সী চাঁদটার আলোয় গলিত প্লাটিনামের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা মরুভূমি, খুব কাছেই কোথাও ডেকে উঠল একজোড়া শিয়াল, ক্যাম্পে চুলার খাবারের ঘ্রাণে বুনো হয়ে উঠেছে জম্ভ দুটো।

গিরিখাদের দেয়ালের পাশে উবু হয়ে বসে সিগারেট ধরালো ট্রাকের ড্রাইভার ফুরি গারহার্ড। এর আগে দিনের বেলায় অ্যানালিসার সাথে পাঁচ পাউন্ডের চুক্তি হয়েছে। এত দ্রুত আর সহজে অর্থ পাবার রাস্তা খুঁজে পেয়ে ফুরির কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে একটুও দ্বিধা করেনি অ্যানা।

চোখের সামনে জ্যোৎস্নাস্নাত রুপালি, অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েটাকে দেখে আনন্দে কেঁপে উঠল ফুরি।

কাছাকাছি পৌঁছে থেমে গেল অ্যানা। কামুক হাসি দিয়ে চাইল ফুরি ব্যাগ্রতা বাড়াতে।

“পাঁচ পাউন্ড কিন্তু।” ফুরিকে মনে করিয়ে দিল অ্যানা। ড্রাইভার টাকাগুলো বের করতেই ছো মেরে টান দিয়ে নিয়ে চাঁদের আলোয় পরীক্ষা করে দেখল অ্যানা। তারপর সন্তুষ্ট হয়ে পোশাকের ভেতরে চালান করে দিয়ে এসে দাঁড়াল ফুরির সামনে।

কিন্তু ফুরি যেই না নিজের মাথা নিচু করে অ্যানার দিকে তাকাল, পেছন থেকে কিছু একটা যেন প্রচণ্ড আঘাত করে তার পাজর গুড়ো করে দিল। আকস্মিক এই আক্রমণে ফুসফুস থেকে বেরিয়ে গেল সমস্ত বাতাস। কানের কাছে বিড়বিড় করে উঠল ভয়ংকর একটা কণ্ঠ।

“মেয়েটাকে এখনি চলে যেতে বলল।” গলার আওয়াজটা ঠিকই চিনতে পারল ফুরি।

তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল অ্যানা। ফুরির কাঁধের উপর দিয়ে একদৃষ্টে চোখ বড় বড় করে খানিক তাকিয়েই ভয় পেল, ক্যাম্পের দিকে দিল দৌড়।

কোনোমতে নিজের পোশাক ঠিকঠাক করে পেছনে ঘুরল ফুরি।

“ডি লা রে।” উদ্যত মসার রাইফেল হাতে দাঁড়ানো লোথারকে দেখেই বোকার মত বলে বসল ফুরি।

“কেন? আর কাউকে আশা করেছিলে নাকি?”

“না! না!” উদভ্রান্তের মত মাথা নাড়ল ফরি।” মানে একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছো, এই যা।” লোখারের সাথে শেষবার মিটিঙের পর থেকেই সে মনোযাতনায় ভুগছে। অবশেষে লোভের ওপর জয়লাভ করেছে কাপুরুষতা। এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে যে লোথারও নিশ্চয় কখনো এতটা পারবে না।

ভেবেছিল আর কখনো লোথারের সাথে দেখা হবে না। কিন্তু এখন তো যেন টোপাজ পাথরের মত জ্বলজ্বলে দুই চোখ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে স্বয়ং লোথার।

“তাড়াতাড়ি? কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে দোস্ত। সবকিছু ঠিকঠাক করতে যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি সময় লেগেছে। এবার শক্ত হয়ে গেল লোথারের গলা, “উইন্ডহকে এখনো হিরের চালান আনননি?”

“না, এখনো না কোনোমতে বলেই মনে মনে নিজেকে গাল দিল ফুরি। এটাই তো ছিল তার টিকে থাকার পথ। বলা উচিত ছিল, “হ্যাঁ। আমি নিজেই গত সপ্তাহে নিয়ে এসেছি।” কিন্তু মুখ থেকে বের হওয়া শব্দ তো আর ফেরত নেয়া যায় না। তার বদলে নিজের প্যান্টের বোতাম লাগানোর দিকে মনোযোগ দিল।

“কখন চালান আসবে তাহলে?” ফুরির চিবুকের নিচে মসারের নল রেখে মুখখানাকে উপরে তুলে ধরলেন লোধার। বোঝাই যাচ্ছে যে ফুরির কথা বিশ্বাস করছেন না।”

“উনারা ইচ্ছে করেই দেরি করছেন। আর কতদিন লাগবে জানি না। উড়া খবরে শুনেছি এবার নাকি পাথরের বেশ বড়সড় একটা প্যাকেজ আসবে।”

“কেন?” নরম স্বরে জানতে চাইলেন লোথার; কিন্তু ফুরি কাঁধ ঝাঁকাল “জানি না। শুধু শুনেছি যে বড় একটা চালান।”

“হুম, তার মানে আমি তোমাকে যা বলেছিলাম তাই সত্যি। ওরা খনি বন্ধ করে দিতে চলেছে।” খুব সাবধানে ফুরির চেহারা পরখ করে দেখলেন লোথার; কেন যেন মনে হল লোকটা দ্বিধায় ভুগছে। এবার তাহলে একটু টাইট দিতে হবে। যেন কোনো গড়বড় না করে। এটাই হবে শেষ চালান বুঝলে; তারপর তোমরা সবাই অডিট ট্রাকে করে যেসব বেচারাকে এনেছে তোমার অবস্থাও তেমনই হবে।”

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল ফুরি, “হ্যাঁ, ওদের চাকরি গেছে।”

“তার মানে পরের বার তুমি, বন্ধু। আর পরিবারকে তো তুমি জান দিয়ে ভালোবাসো, তাই না?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তো ছেলে-মেয়ের খাবার আর পোশাকের জন্য টাকা দরকার এমনকি কাজ হারালে ওই ছুড়িকেও পাবে না।”

“ম্যান, এভাবে বলো না।”

“তাহলে আমাদের আগে যেমন কথা হয়েছে সেভাবে কাজ করো। তুমি জানো কী করতে হবে। ওরা তোমাকে চালানের তারিখ জানালেই পরিকল্পনা মত কাজ করবে।”

ফুরি মাথা নাড়ল। কিন্তু লোথার নিশ্চিত হতে পারছেন না। তাই বললেন, “বলো কী কী করতে হবে। তারপর ফুরি বিরক্ত হলেও পুরো প্রক্রিয়াটা গড়গড় করে বলে গেল আর লোথার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, এক-আধবার শুধরে দিতে হলেও অবশেষে সন্তুষ্টির হাসি হেসে বললেন, “কোনো ঝামেলা যাতে না হয় বন্ধু, ভুল করা আমার একদম ভালো লাগে না। কাছে এসে ফুরির চোখের দিকে তাকালেন লোথার। তারপর হঠাৎ করেই ঘুরে হাঁটা শুরু করলেন।

খানিক কেঁপে উঠে মাতালের মত টলতে টলতে ক্যাম্পের দিকে চলে গেল ফুরি। পথিমধ্যে মনে হল মেয়েটার কথা। টাকা নিয়ে ভেগে গেল কিন্তু তার কাজ হল না। অথচ কেন যেন এখন আর ওর কাছে যেতেও ইচ্ছে করছে না। লোথার ডিলারের কথা শুনে হিম হয়ে গেছে সারা শরীর।

***

চুড়ার ঠিক নিচের জঙ্গল দিয়ে চলেছে ওদের ঘোড়া। আগামী দিনগুলোর উত্তেজনার আনন্দে সবার চেহারাই বেশ হাসিখুশি। সেভেন এম এম ম্যানলিচার স্পোর্টিং রাইফেল নিয়ে প্রিস্টর জনের কাঁধে চড়ে বসেছে শাসা। আর সেনটেইনের স্ট্যালিয়নের রঙ ধূসর; নাম মেঘ। কিশোরী বয়সে বাবার দেয়া স্ট্যালিয়নটার নাম ও রেখেছিলেন মেঘ। গলার কাছে হালকাভাবে ইয়েলো স্কার্ফ পেঁচিয়ে রাখা সেনটেইনের চোখ দুটোও চকচক করছে,

“ওহ, শাসা, আমার নিজেকে ঠিক স্কুল গার্লদের মত মনে হচ্ছে। আগামী দুদিন পুরোপুরি নিজেদের মত করে কাটানো যাবে।”

“দেখো তোমার আগে ওই ঝরনার ধারে যাব।” মাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল শাসা। কিন্তু মেঘের সাথে পাল্লা দেবার ক্ষমতা প্রিস্টর জনের নেই। তাই ঝরনার ধারে পৌঁছে দেখা গেল স্ট্যালিয়ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন।

ছেলে দুজনেই ঘোড়ায় চড়ে ঢুকে গেল কালাহারির একেবারে বুনো এলাকার গভীরে। স্যান-এর বুশম্যানদের কাছে প্রশিক্ষিত সেনটেইন এখনো সব কৌশল মনে রেখেছেন। তাই সব অরণ্যের গভীরে টিকে থাকার সমস্ত রহস্যই তার জানা আছে।

দুপুরের ঠিক পরপরই দিগন্তে দেখা গেল একপাল জেমসবক। এক সারিতে হাঁটতে থাকা জন্তুগুলোর উন্নত মাথা আর লম্বা শিং দেখে দূর থেকে মনে হচ্ছে ইউনিকর্ন।

অতঃপর সূর্য যখন মরুভূমির গভীরে ডুবে যেতে বসেছে একপাল স্প্রিংবক দেখলেন সেনটেইন। ছেলেকে বললেন, “আমাদের ক্যাম্প আর মাত্র আধ মাইল দূরে আছে। ডিনার রেডি করা দরকার।”

সাগ্রহে নিজের ম্যানলিচার তুলে নিল শাসা। “সাবধানে, একেবারে পরিষ্কার হওয়া চাই।” ছেলেকে সাবধান করে দিলেন সেনটেইন।

পিছনে দাঁড়িয়ে শাসাকে ঘোড়া থেকে নামতেও দেখলেন। হরিণের পালের কাছে থেকে দুইশ কদম দূরে গিয়ে উবু হয়ে বসল শাসা। তারপর কনুই দুটো হাটুর ওপর রাখল। আর সাথে সাথেই একটা হরিণকে পড়ে যেতে দেখে স্বস্তি পেলেন সেনটেইন। এর আগে একবার এমনভাবেই অনিন্দ্যসুন্দর এক হরিণকে গুলি করেছিলেন লোথার ডি লা রে। মনে পড়ে গেল সেই স্মৃতি।

স্যার গ্যারি যেভাবে শিখিয়েছেন ঠিক সেভাবেই জন্তুটার কাঁধের পিছনে গুলি লাগাতে পেরেছে শাসা। কাঁধের পেছনে লেগে মোটা হৃৎপিণ্ডে চলে গেছে বুলেট। প্রিস্টর জনের কাঁধে তুলে দেয়া হল গোটা হরিণ। আরামদায়ক আর নিরাপদ ক্যাম্পটাতে গতকালই পৌঁছে গেছে তিনজন পরিচারকের দল।

রাতের বেলা স্প্রিংকের গ্রিলড কাবাব দিয়ে ডিনার সারল মা আর ছেলে। তারপর ক্যাম্পফায়ারের কাছে বসে বহু রাত অব্দি কফি হাতে গল্প করল দুজনে।

পরের দিন সকালবেলা শীত পড়াতে গায়ে ভেড়ার চামড়ার জ্যাকেট পরে নিলেন সেনটেইন আর শাসা, আর তারপর যে যার ঘোড়ায় চেপে শুরু হল যাত্রা। মাইলখানেক এগোবার পরেই মেঘের লাগাম টেনে ধরে মাটির দিকে তাকালেন সেনটেইন।

“কী হয়েছে মা?” মায়ের মুড় সম্পর্কে সদা সচেতন শাসার চোখে পড়ল সেনটেইনের উত্তেজিত চাহনি।

“তাড়াতাড়ি এসো।” তারপর নরম মাটিতে পায়ের ছাপ দেখিয়ে জানতে চাইলেন, “বলো তো কী?”

ঘোড়া থেকে নেমে উপুড় হয়ে পরীক্ষা করে দেখল শাসা। “মানুষ?” দ্বিধায় পড়ে গেছে,

“কিন্তু বেশ ছোট তো। বাচ্চা?” চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতেই বাকিটা বুঝে গেল।

“বুশম্যান!” সহাস্যে চিৎকার করে উঠল শাসা, “বুনো বুশম্যান।”

“হুম, ঠিক তাই।” সেনটেইনও হেসে ফেললেন।” একজোড়া শিকারি জিরাফের পেছনে লেগেছে দেখো!”

“আমরা ওদের পিছু নিতে পারি না মা? প্লিজ?” এবার শাসাও মায়ের মতই উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।

“ঠিক আছে। পায়ের ছাপগুলো মাত্র একদিনের পুরনো, তাই তাড়াতাড়ি করলে ধরে ফেলা যাবে।” সম্মত হলেন সেনটেইন।

“দেখো একটা বুশম্যানের টুথব্রাশ।” তরতাজা গাছের ছোট একটা ডাল তুলে দেখালেন সেনটেইন। জিরাফের পায়ের ছাপের কাছেই পড়ে আছে চিবানো ডালটা।

“তার মানে এখানেই জিরাফটাকে প্রথম দেখেছে।”

“তুমি কীভাবে বুঝলে?”

“ওই তো ওদের ধনুকের চিহ্ন।”

“দেখো শাসা, ওরা এখান থেকে দৌড়াতে শুরু করেছে। যদিও শাসা ছাপ দেখে কিছু বুঝল না। সেনটেইন বলে চললেন, “শরীরের সমস্ত ভার বুড়ো আঙুলের ওপর দিয়ে শক্ত পায়ে এগিয়েছে সামনের দিকে। তারপর কয়েকশ কদম সামনে গিয়ে আবার ব্যাখ্যা করে বললেন, “এবার দেখো পেটের উপর ভর দিয়ে সাপের মত এগিয়েছে। তারপর ওখানে হাটু গেড়ে বসে তীর ছুঁড়েছে।” আরো বিশ কদম গিয়ে তো সেনটেইন মহাখুশি হয়ে উঠলেন, “দেখো এখানে এসে জিরাফ ফাঁদ বুঝতে পেরেছে। তারপর লাফ দিয়ে সরে গেছে, আরে দেখো শিকারিরাও পিছু পিছু দৌড়ে তীরের প্রভাব দেখার চেষ্টা করেছে।”

ছাপ দেখে দেখে খানিক দৌড়ে যাবার পর আচমকা ঘোড়র ওপর সিধে হয়ে বসলেন সেনটেইন।

“শকুন!”

চার থেকে পাঁচ মাইল সামনে নীলাকাশ জুড়ে দেখা গেল কালো ফুটকির মেঘ। মাটি থেকে অনেক উপরে আস্তে আস্তে উড়ে বেড়াচ্ছে শকুনের পাল।

“এবার একটু ধীরে ধীরে যেতে হবে, শাসা।” ছেলেকে সাবধান করে দিলেন সেনটেইন। “ওদেরকে ভয় পাইয়ে দিলে কিন্তু ব্যাপারটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।”

ঘোড়ার গতি হন্টনের পর্যায়ে নামিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন মা আর ছেলে।

খানিক দূরেই পড়ে আছে জিরাফের বিশাল মৃতদেই। আশপাশের ছোট ছোট কাটা ঝোঁপগুলোর ওপরে ঝুলছে মাংসের স্তূপ, জিরাফের নাড়ি-ভুড়ি। সূর্যের তাপে শুকানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। ওজনের ভারে নুইয়ে পড়েছে ঝোঁপের ডালপালা। আর সর্বত্র চড়ে বেড়াচ্ছে বুশম্যানদের পায়ের ছাপ।

“মাংস কাটা আর বহন করার জন্য নারী আর শিশুদের কেউ নিয়ে এসেছে।” খর্বকায় বুশম্যানদের দেখে বলে উঠলেন সেনটেইন।

“ইয়াক। বিদঘুটে গন্ধ আসছে।” নাক কুঁচকালো শাসা, “কিন্তু ওরা কোথায়?”

“লুকিয়ে আছে।” জানালেন সেনটেইন, “মনে হয় পাঁচ মাইল দূর থেকেই আমাদেরকে আসতে দেখেছে।” তারপর মাথা থেকে চওড়া কানঅলা টুপিটা খুলে ফেললেন যেন তার চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এরপর অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলে চারপাশে ছড়িয়ে দিলেন নিজের মেসেজ।

হঠাৎ করেই একেবারে কাছ থেকে মাটি খুঁড়ে যেন উদয় হল এক বুশম্যান। আচানক এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল স্ট্যালিয়ন। লোকটার গায়ে কেবল এক টুকরো পশুর চামড়ার পোশাক। আকারে ছোটখাটো হলেও দেহের গড়ন একেবারে নিখুঁত।

মাথা উঁচু করে এগিয়ে এল মঙ্গোলিয়ানদের মত কুতকুতে চোখ আর উজ্জ্বল আম্বার রঙা বুশম্যান পুরুষ। ডান হাত তুলে অভিবাদনের ভঙ্গি করে প্রায় পাখির মত কিচির-মিচির করে বলে উঠল “আমি তোমাকে দেখেছি নাম চাইল্ড।” নামটা শুনেই আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন,

“আমিও তোমাকে দেখেছি কিউয়ি!”

“তোমার সাথে ও কে?” জানতে চাইল বুশম্যান।

“আমার ছেলে গুড ওয়াটার। তোমাকে বলেছিলাম না, ও এখানেই জননছে। ওয়া ওর পিতামহ আর হানি মাতামহ।”

শূন্য মরুভূমির দিকে তাকিয়ে সজোরে সবাইকে ডাক দিল কিউয়ি, “স্যানের মানুষেরা সত্যিই তাই। এই নারীর নাম চাউন্ড, আর ছেলেটা তো সেই কিংবদন্তী, ওদেরকে অভিবাদন জানাও।”

শুষ্ক মাটির বুক থেকে উদয় হল খর্বকায় সোনালি সব দেহ। কিউয়িসহ মোট বারোজন হাসতে হাসতে পিলপিল করে এগিয়ে এল। ঘোড়া থেকে নেমে সবার সাথে আলিঙ্গন করলেন সেনটেইন। প্রত্যেককে নাম ধরে ডেকে সম্ভাষণ জানিয়ে সবশেষে দুটো বাচ্চাকে দুই কোমরের উপর নিয়ে আদরও করলেন।

“তুমি ওদেরকে এত ভালোভাবে কীভাবে চেন মা?” অবাক হয়ে জানতে চাইল শাসা।

“কিউয়ি আর ওর ভাই ওয়ার আত্মীয়, তুমি ছোট থাকতেই ওদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। তারপর সবাই মিলে গড়ে তুলেছি হানি খনি, এটা ওদের শিকারের এলাকা।”

এভাবেই কেটে গেল বাকি দিন। ফেরার সময় হাত মুঠো করে সেভেন এম এমের পিতলের কার্টিজ বুশম্যান নারীদের বিলিয়ে এল সেনটেইন। যেন নেকলেসে লাগাতে পারে; যা তাদেরকে অন্যান্য স্যান নারীদের চোখে ঈর্ষার পাত্রী করে তুলবে। শাসা কিউয়িকে নিজের হান্টিং নাইফটা দিয়ে দিল। কিউয়ি তো বেশ খুশি।

কিউয়ির ভাই ফ্যাট কিউয়ি পেল সেনটেইনের বেল্ট। চকচকে পিতলের বাকলে নিজের চেহারার প্রতিবিম্ব দেখে তো মুগ্ধ মোটা কিউয়ি।

আসার সময় চোখ ঘুরিয়ে পেছনে নৃত্যরত ক্ষুদে মানুষগুলোকে দেখে শাসা ভাবল,

“আহারে ওরা কত অল্পতে খুশি হয়।”

“ওরা হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।” সেনটেইন বলে উঠলেন, “কিন্তু জানি না কতদিন থাকবে।”

“তুমি কখনো এভাবে থাকার চেষ্টা করেছিলে মা?” জানতে চাইল শাসা, সত্যিই কি চামড়ার পোশাক পরতে? শিকড়-বাকড় খেতে?”

“তুমিও তাই করেছিলে শাসা। মাঝে মাঝে ক্ষুদে বামনগুলোর মত গায়ে কিছুই রাখতে না।”

চোখ কুঁচকে কী যেন ভাবার চেষ্টা করল শাসা; তারপর বলল, “মাঝে মাঝে আমার খুব অন্ধকার, পানির গুহার মত একটা জায়গার কথা মনে পড়ে।”

“সেটাই হল উষ্ণপ্রস্রবন, যেখানে আমরা গোসল করতাম আর ওখানেই হানি মাইনের প্রথম হিরেটা পেয়েছি।”

“আমি আবার ওখানে যেতে চাই মা।”

“কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।” মায়ের মুড বদলে যেতে দেখল শাসা, “ঝরনাটা হানি পাইপের একেবারে মাঝখানে। মাটি খুঁড়তে গিয়ে আমরা ঝরনাটাকে নষ্ট করে ফেলেছি।” খানিকক্ষণ দু’জনেই নীরব হয়ে রইল। “জায়গাটা ম্যানের জনগণের জন্যে পবিত্র ভূমি হলেও অদ্ভুত ব্যাপার হল আমাদের পরিকল্পনাতে কিন্তু ওরা বাধা দেয়নি।” খুলে বললেন সেনটেইন।

“অনেক আগেই এ ব্যাপারে কিউয়ির সাথে কথা বলে নিয়েছি। তার মতে গোপন জায়গাটা তাদের নয়। এখানে যে আত্মা বাস করে সে-ই তাদের আপন কিন্তু বহু আগেই হয়ত বিরক্ত হয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে সেই আত্মা; তাই এখন আর এতে তাদের কোনো আক্ষেপ কিংবা আপত্তি নেই।”

“তুমি যে কখনো মানের মেয়েদের মত জীবন কাটাতে আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না মা।”

“ব্যাপারটা সত্যিই বেশ কঠিন।” নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন, কিন্তু সেই কষ্ট ছাড়া আজকের আমি হতে পারতাম না। তুমি জানো শাসা। মরুভূমির বুকে আমি যখন সহ্যের একেবারে শেষ সীমায় চলে গিয়েছিলাম তখন একটা শপথ করেছি; আর তা হল আমার ছেলে কখনো অভাবে পড়বে না। আমি শপথ নিয়েছি যে ভয়ংকর দিনগুলো আর কখনো আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনব না।”

“কিন্তু তখন তো আমি তোমার সাথে ছিলাম না।”

“হ্যাঁ ছিলে” মাথা নাড়লেন সেনটেইন, “তোমাকে গর্ভে নিয়েই আমি স্কোলিনি কোস্টে গিয়েছি। আর উপকূলের বার্লি বাড়িতে তুমি আমার অংশ হয়েই ছিলে। আমরা এই মরুভূমির সৃষ্টি ডালিং তাই সবাই যখন ব্যর্থ হবে আমরা তখন কেবল সমৃদ্ধির পথেই এগোব। কথাটা মনে রেখো শাসা ডার্লিং।”

৩. সকালবেলা ক্যাম্প গুটিয়ে

পরের দিন সকালবেলা ক্যাম্প গুটিয়ে রাখার জন্য পরিচারকদের রেখে বিরস বদনে নিজ নিজ ঘোড়ায় চেপে মাইনের পথ ধরল শাসা আর তার মা। দুপুরে খানিক কাটা ঝোঁপের নিচে বিশ্রাম নিলেও ক্রমেই সূর্যের তাপ বেড়ে যাওয়ায় ঘোড়া নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে চলে এল দুজনে।

হঠাৎ করেই সিধে হয়ে বসে হাত দিয়ে চোখের ওপর ছায়া বানিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকাল শাসা।

“কী হয়েছে সোনা?”

অ্যানালিসা ওকে এই পাথুরে খাদের ভেতরেই নিয়ে এসেছিল।

“কিছু একটা তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।” সেনটেইনের কথা শুনেই শাসার মন চাইল মাকে পাহাড়ে দেবতার মন্দিরে নিয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটার কাছে করা শপথের কথা মনে হতেই আবার থেমেও গেল।

“আমাকে বলতে চাইছে না?” ছেলের চেহারা দেখেই মনের ভাব আঁচ করে ফেলেছেন সেনটেইন।”

মাকে বললে কিছু হবে না। মনে হবে কোন আগন্তুককেই বলছি, আপন মনে খানিক ভেবে-চিন্তে গড়গড় করে মাকে সবকিছু উগরে দিল শাসা, “উপরের খাদের ভেতরে এক বুশম্যানের কংকাল আছে। তোমাকে দেখাব?”

বিবর্ণ হয়ে গেল সেনটেইনের চেহারা, “কী বললে? একটা বুশম্যান? কীভাবে জানলে যে বুশম্যানেরই কংকাল?” ফিসফিস করে জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“খুলির গায়ে এখনো চুল লেগে আছে, কিউয়ি আর ওর গোত্রের লোকদের মত চুল।”

“কীভাবে খুঁজে পেয়েছে এই জায়গা?”

“অ্যানা-” বলতে গিয়েও অপরাধবোধে চুপ করে গেল শাসা।

“মেয়েটা তোমাকে দেখিয়েছে?

“হ্যাঁ।” চোখ নামিয়ে নিল শাসা।

“আবার খুঁজে বের করতে পারবে?” ফিরে এল সেনটেইনের মুখের রঙ। আর কেমন যেন উত্তেজিতও হয়ে উঠল।

“হ্যাঁ বোধ হয় পারব। জায়গাটাতে চিহ্ন দিয়ে রেখেছি।” মুখ তুলে চূড়ার দিকে তাকিয়ে জানাল শাসা।

“চলো আমাকে নিয়ে যাও।” আদেশ দিলেন সেনটেইন।

“ঘোড়া রেখে পায়ে হেঁটে যেতে হবে কিন্তু।”

তবে উঠতে গিয়ে জান বের হয়ে যাবার দশা। প্রচণ্ড গরম আর কাঁটা ঝোপে লেগে ছিঁড়ে গেল হাত-পা।

খানিক বাদে মাতা-পুত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে খুঁজতে লাগল। শিস দিয়ে আর নাম ধরে ডেকে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখল যেন হারিয়ে না যায়।

হঠাৎ করেই শাসার ডাকে আর কোনো সাড়া দিচ্ছেন না সেনটেইন। ছেলেটা তো চিন্তায় পড়ে গেল।

“মা, তুমি কোথায়?

“এই তো! এখানে!” মনে হচ্ছে সেনটেইন ব্যথা পেয়েছেন।

গলার আওয়াজ অত্যন্ত অস্পষ্ট। তাড়াতাড়ি পাথর ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে গেল শাসা। সূর্যের আলোয় মাকে দেখে মনে হচ্ছে তার গায়ের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মাথার টুপি খুলে কোমরের কাছে ধরে রেখেছেন। গাল দুটোও ভেজা। প্রথমে শাসার মনে হল ঘাম। কিন্তু না একটু পরেই বুঝতে পারল মা কাঁদছেন।

“মা?” আস্তে আস্তে মা’র পেছনে এসে দাঁড়াল শাসা। বুঝতে পারল মা মন্দিরটা খুঁজে পেয়েছেন।

ডালপালা কাঁচের জার সব সরিয়ে ফেললেন সিনটেইন। তাই দেখে ভয় পেল শাসা।

“অ্যানালিসা বলেছে এটা নাকি এক জাদুকরের কংকাল।”

কিছু না বলে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।

“অ্যানা আরো বলেছে এই জাদুকর নাকি সবার একটা করে ইচ্ছে পূরণ করে।”

“হানি” দম বন্ধ করে যেন নামটা উচ্চারণ করলেন সেনটেইন, “আমার অত্যন্ত প্রিয় বুড়ি মা।”

“মা!” সেনটেইন কাঁপতে থাকায় মায়ের কাধ ধরে দাঁড়াতে সাহায্য করল শাসা। “তুমি কীভাবে জানো?”

ছেলের বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেও কোনো উত্তর দিলেন না সেনটেইন।

“পুরো পাহাড়ের গুহায় হয়ত এমন আরো শত শত কংকাল আছে।” নাছোড়বান্দার মত তীব্র বেগে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।

“এটা হানি।” দুঃখে কষ্টে বুজে আসতে চাইছে সেনটেইনের গলা। “এই তো উটের হাড়ের থেকে তৈরি পুঁতি লাগানো আছে পোশাকে।” এতক্ষণে ধুলার মাঝে অর্ধেক ঢেকে রাখা শুকনো চামড়ার ফালিটাকে দেখতে পেল শাসা। “আমার কোনো প্রমাণেরও দরকার নেই। কারণ আমি জানি ও হানি।”

“বসো মা।” মাকে ধরে পড়ে থাকা একটা পাথরের ওপর বসিয়ে দিল শাসা।

“আমি ঠিক আছি। আসলে হঠাৎ করে চমকে উঠেছি। বছরের পর বছর ধরে ওকে খুঁজেছি, জানতাম ওকে কোথায় পাওয়া যাবে।” চারপাশে মাথা ঘুরিয়ে কী যেন দেখলেন সেনটেইন, “ওয়ার দেহও নিশ্চয় এখানেই আশপাশে কোথাও আছে।” চোখ তুলে উপরের গির্জার ছাদের মত ঝুলে থাকা চূড়ার অংশের দিকে তাকালেন সেনটেইন,

“দুজনেই শয়তানটার বন্দুকের হাত থেকে বাঁচার জন্য বোধ হয় ওখানে এসে লুকিয়ে ছিল। একসাথেই নিচে পড়েছে।”

“কে ওদেরকে গুলি করেছে মা?” দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় সেনটেইন জানালেন, “লোথার। লোথার ডিলা রে!”

***

তারপর পুরো একঘণ্টা ধরে খাদের তলায় আর আশপাশে দ্বিতীয় কংকালের খোঁজ করল শাসা আর সেনটেইন। কিন্তু অবশেষে হাল ছেড়ে দিলেন, “নেই। থাক তাকে এভাবেই পড়ে থাকতে দাও শাসা, কেউ যেন বিরক্ত না করে।”

ছোট্ট পাথুরের মন্দিরটা থেকে নিচে নেমে এল দু’জনে। ফেরার সময় তুলে আনল বুনোফুল।

“প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছে দেহাবশেষ তুলে সুন্দরভাবে সমাধিস্থ করি।” মন্দিরের সামনে আবার হাঁটু গেড়ে বসে ফিসফিস করে জানালেন সেনটেইন, “কিন্তু হানি তো খ্রিস্টান নয়। এই পাহাড়ই তাঁর পবিত্র ভূমি। এখানেই সে শান্তিতে থাকবে।”

যত্ন করে ফুলগুলোকে সাজিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন।

“তোমাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে আমি সে ব্যবস্থা করব প্রিয়তম মাতামহ। আবার তোমার কাছে আসব।” শাসার হাত ধরলেন সেনটেইন। একসাথে উঠে এসে বসলেন নিজ নিজ ঘোড়ার পিঠে।

***

পরের দিন সকালবেলা নাশতার সময় মোটামুটি সহজ হয়ে গেলেন সেনটেইন। যদিও চোখের নিচে অনিদ্রার গাঢ় কালি লেগে আছে; ছেলেকে জানালেন, “কেপটাউনে ফেরার আগে এটাই এখানে আমাদের শেষ সপ্তাহ।”

“ইশ, এখানেই যদি থেকে যেতে পারতাম।”

“এটা তো বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। কিন্তু তোমাকে তো স্কুলে যেতে হবে। আর আমারও অনেক দায়িত্ব আছে। তবে আমরা আবার ফিরে আসব, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। এই শেষ সপ্তাহে তুমি ওয়াশিং প্লান্ট আর সেটিং রুমে কাজ করবে। দেখো বেশ ভালো লাগবে।”

আর মা যে কতখানি সত্যি তো বলাই বাহুল্য। মুগ্ধ হয়ে শাসা দেখে কীভাবে ধীরে ধীরে সচল কনভেয়ার বেল্টে করে মিল হাউজের চূর্ণ পাথর এনে ওয়াশিং প্লান্টে ফেলা হয়। তারপর ধাপে ধাপে প্রকৃত নুড়িগুলোকে আলাদা করে গ্রিজের ড্রামে ধোয়া হয়। ভেজা নুড়িগুলো সহজেই উপরে উঠে আসে। কিন্তু হিরে শুকনো থাকে আর এটাই হল এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হিরে যখনই গ্রিজের গায়ে লাগে তখনই পোকার মত আটকে যায়। বিস্ময়ে শাসার চোখ সরে না। পুরো সকাল এভাবেই একটা থেকে আরেকটা বিশাল বড় বড় হলুদ ড্রামের পাশে ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দেয় শাসা।

সবশেষে ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস এসে প্রত্যেকটা হীরেকে ওজন করে দেখেন। তারপর সাথে সাথে আবার চামড়ায় মোড়ানো খাতায় লিখে রাখেন সে হিসাব।

“তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ মাস্টার শাসা কোনো পাথরই হাফ ক্যারটের কম নয়।”

“হ্যাঁ স্যার”, ব্যাপারটা নিয়ে তো ভাবেইনি শাসা, “তাহলে ছোট পাথরগুলোর কী হয়?”

“গ্রিজের গায়ে আটকে থাকার জন্য ন্যূনতম একটা ওজন লাগে। অনেক সময় অনেক বড় বড় হীরেও কিন্তু নুড়ি পাথরের সাথে বেরিয়ে যায়। তাই হাত দিয়ে প্রতিটি পাথর চেক করে দেখতে হয়। এই কাজে অবশ্য মেয়েরাই ভালো। তাদের ধৈর্য আছে আর চোখও তীক্ষ্ণ।”

জোনস লম্বা একটা রুমে শাসাকে নিয়ে এলেন যেখানে পুরো রুম জুড়ে একটাই টেবিল; বালতি বালতি ভেজা পাথর এনে টেবিলের ওপর ফেলা হয়। আর নারী শ্রমিকরা তা থেকে হীরে বাছাই করে।

অতঃপর শিফট শেষে জোনসের সাথে ফোর্ডে চড়ে অফিস ব্লকে চলে এল। শাসা। কোলের ওপর রাখা ছোট্ট স্টিলের বাক্সটাতে রয়েছে আজ দিনের সংগ্রহ।

ওদের অপেক্ষাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সেনটেইন। জোনস আর শাসাকে নিজের অফিসে নিয়ে গেলেন। “তো, তোমার ভালো লাগেনি?”

শাসার কাছে জানতে চাইলেও ছেলের উত্তেজনা দেখে হেসে ফেললেন।

“অসাধারণ মা, আর দেখ আমরা কী এনেছি। ছত্রিশ ক্যারেট, কিমন দৈত্যকার একটা হিরে দেখেছো?!” টেবিলের ওপর বক্স রাখতেই ডালা খুলে দিলেন জোনস। শাসা এত গর্বভরে মাকে হিরেটা দেখাল যেন সে নিজ হাতে খনি থেকে তুলে এনেছে।

“সত্যিই বেশ বড় একমত হলেন সেনটেইন। “কিন্তু রঙটা তেমন নিখুঁত নয়। আলোর সামনে ধরে দেখো হুইস্কি আর সোডার মত বাদামি। ভেতরের কালো দাগগুলো তো খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে।”

শাসার আনা হিরের এত খুঁত বের হয়েছে দেখে মনমরা হয়ে গেল ছেলেটা। দেখে হেসে ফেললেন সেনটেইন, “ড, জোনস, ভল্টটা খুলবেন প্লিজ? ওকে কয়েকটা সত্যিকারের নিখুঁত হীরে দেখানো যাক।”

ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে একগোছ চাবি বের করে শাসাকে বারান্দার শেষ মাথার স্টিলের দরজার কাছে নিয়ে এলেন জোনস। তারপর তালা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডের ভল্টে। শাসার সামনেও পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে গোপন কম্বিনেশন নাম্বার ঘোরাতে ভুল করলেন না।

“ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড পাথরগুলোকে এসব পাত্রে রাখা হয়। এভাবে হাই গ্রেড় হিরেকে একেবারে আলাদা সযত্নে সংগ্রহ করা হয়।” স্ট্রংরুমে হাঁটতে গিয়ে দু’পাশে সারিবদ্ধ পাত্র দেখালেন জোনস।

এরপর ভল্টের ভেতরের দেয়ালের গায়ে লাগানো ছোট্ট স্টিলের দরোজাটা খুলে পাঁচ সংখ্যার বাদামি কাগজ মোড়ানো প্যাকেট তুলে নিলেন।

“এগুলোই হচ্ছে আমাদের শ্রেষ্ঠ হিরে।” শাসার হাতে প্যাকেট তুলে আবার একের পর এক দরজা আটকে উপরে উঠে এলেন দু’জনে।

সেনটেইন অফিসেই ছিলেন। শাসা এসে মায়ের হাতে প্যাকেট দিতেই খুলে ফেললেন।

আর বিশাল সব হিরের দ্যুতি দেখে শাসার রীতিমত দম বন্ধ হবার জোগাড়।

“মাই গড! মা! অবিশ্বাস্য!”

“চলো এবার ড, জোনসের কাছে এ সম্পর্কে কিছু শুনি।” স্মিত মুখে বসে রইলেন সেনটেইন।

“ওয়েল মাস্টার শাসা, এটা একেবারে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটা হিরে যেটার আটটা কোনো আছে। আরেকটা আছে যেটার বারোটা মাথা। কিন্তু কতটা নিখুঁত গোল আর আকারহীন দেখেছো। তাই বুঝতে পারছো কতটা বিভিন্ন র ীতে আসে এই হীরে।” কয়েকটা হীরে দেখিয়ে শাসাকে বুঝিয়ে বললেন জোনস। কিন্তু তার নিজের বিষণ ভাব কেন যেন এতটা সম্পদ হাতে নিয়েও একটুও কমল না।

“তবে কেটে পলিশ করার পর এই তেলতেলে আভাটাও চলে যাবে।”

“এটার ওজন কত?” জানতে চাইল শাসা।

“আটচল্লিশ ক্যারট।” রিকোভারী বই দেখে জানালেন সেনটেইন।

“কিন্তু মনে রেখ, কেটে পলিশ করার পর কিন্তু এর এই ওজনের অর্ধেকও থাকবে না।”

“তখন এটার দাম কত হবে?” টুয়েন্টিম্যান জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন।

“অনেক অনেক টাকা, মাস্টার শাসা।” সৌন্দর্যের পূজারিণী হিসেবে এর ওপর আর্থিক মূল্যের বোঝা চাপাতে পছন্দ করেন না জোনস; তাই আবার নিজের লেকচার শুরু করলেন, “এবার তোমাকে দেখাব কীভাবে পাথরের রঙের তুলনা

জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু সেদিকে কারো হুশ নেই। রুমের বাতি জ্বেলে দিলেন সেনটেইন। এভাবে আরো এক ঘণ্টা ধরে মনোযোগ সহকারে হিরের বিভিন্ন দিক বুঝিয়ে বললেন জোনস। শাসা নিজেও প্রশ্ন করে অনেক কিছু জেনে নিল। অতঃপর হিরেগুলোকে প্যাকেটে ভরে উঠে দাঁড়ালেন জোনস।

কী মনে হতেই সুউচ্চ কণ্ঠে আওড়াতে লাগলেন বাইবেলের পঙক্তি; খেয়াল হতেই আবার তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে নিলেন বাকিদের কাছে, “ফরগিভ মি, আমার যে কী হয়েছে হঠাৎ করে।”

“এজিকিয়েল?” আদুরে ভঙ্গিতে হাসলেন সেনটেইন।

“আটাশ অধ্যায় তের আর চৌদ্দ পঙক্তি।” মাথা নেড়ে চোখ নামিয়ে নিলেন জোনস; এই নারীর জ্ঞানে সত্যিই সে মহা মুগ্ধ হয়েছে।

“ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস” পথ আঁকড়ে ধরল শাসা, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি। এ পাথরগুলোর মূল্য কত?”

“তুমি কি পুরো প্যাকেজের দাম জানতে চাইছো?” অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন জোনস।”

“ইয়েস স্যার। আমাকে বলুন কত দাম হবে।”

“ওয়েল, ডি রিয়ারস যদি আমাদের শেষ প্যাকেজের সমমূল্যের অর্থ প্রদান করে তাহলে এক মিলিয়ন পাউন্ডের বেশিই হবে।” কাতর ভঙ্গিতে অংকটা জানালেন জোনস।

“এক মিলিয়ন পাউন্ড?”

শাসার হতভম্ব ভাব দেখে মনে মনে চিন্তিত হলেন সেনটেইন। ভাবলেন যাক, কোনো সমস্যা নেই। ওকে আমিই শেখাব। ছেলেকে বললেন,

“মনে রেখ শাসা, এটার পুরোটাই কিন্তু লাভ নয়। খরচ মেটাতে হবে। তারপর ট্যাক্স কালেকটরদের খায়েশ মেটাতে হবে।”

হঠাৎ করেই মাথায় একটা আইডিয়া আসাতে তাড়াতাড়ি ডেস্ক ছেড়ে উঠে এলেন সেনটেইন।

“আপনি তো জানেন আমি আর শাসা শুক্রবারে উইন্ডহক যাচ্ছি। তাই হিরেগুলো আমিই ব্যাংকে নিয়ে যাবো ডেইমলারে করে”।

“মিসেস কোটনি।” আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন জোনস। “আমি এতটা কিছুতেই অনুমতি দিতে পারব না। হায় ভগবান, পুরো এক মিলিয়ন অর্থের সমমূল্যের হিরে। নিজেই যদি রাজি হই তাহলে নিজেই অপরাধ করব।” সেনটেইনের অভিব্যক্তি বদলে যেতেই চুপ করে গেলেন জোনস। এই নারীকে তিনি ভালোভাবেই চেনেন। জানেন তাকে চ্যালেঞ্জ করে কতবড় ভুল করেছেন। তাই তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি হাল্কা করার জন্য বললেন, “আমি কেবল আপনার কথাই চিন্তা করছি। হাজার হাজার মাইল জুড়ে এত বহু মূল্যবান হিরে নিয়ে ভ্রমণ করা মানে হল ডাকাতদেরকে সেধে ডেকে আনা।”

“কিন্তু আমার কাছে হিরে আছে তা সবাই টের পাবে কীভাবে? আমি তো ঢাক ঢোল পিটিয়ে কাউকে বলতে যাচ্ছি না।” ঠাণ্ডা স্বরে জানালেন সেনটেইন।

“ইস্যুরেন্স” অবশেষে সঠিক শব্দটা খুঁজে পেয়েছেন জোনস। “যদি সশস্ত্র পাহারা ব্যতীত প্যাকেজের কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তো ইস্যুরেন্স সেটা কাভার করবে না। আপনি কি সত্যিই এতটা ঝুঁকি নিতে চান?”

এমন একটা যুক্তি ছুঁড়ে দিয়েছেন যা হয়ত সেনটেইনকে কাবু করতে পারে। ব্যাপারটা নিয়ে খানিক ভেবে তাই সেনটেইন কাধ ঝাঁকাতেই স্বস্তি পেলেন জোনস।

“ওহ, ঠিক আছে ড, টুয়েন্টিম্যান জোনস, আপনি আপনার মত কাজ করুন।”

***

মরুভূমির বুক চিরে হানি মাইনে যাবার রাস্তা লোথার নিজ হাতে খুঁড়েছেন। এখানকার প্রতিটা মাইলে এখনো লেগে আছে তার ঘাম। তবে এসব কিছুই সেই বারো বছর আগেকার কথা। তারপরেও কয়েকটা পয়েন্টের কথা স্পষ্ট মনে আছে যাতে করে তার পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।

গারহার্ড ফুরির সাথে দেখা করার পর দ্বিতীয় দিন সকালবেলা এরকমই একটা স্থানে পৌঁছালেন লোথার। এখানে পাথর ফেলে হিরের ট্রাকের রাস্তা আটকানোর পাশাপাশি শুকনো নদীবক্ষের বালির নিচে ঘোড়াদের জন্য পানিও পাওয়া যাবে।

আবার জায়গাটা এতটাই বিচ্ছিন্ন যে পুলিশে খবর দিলে, বাহিনি নিয়ে আসতেই লোথাররা পালিয়ে যাবার যথেষ্ট সময় পাবেন। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে হেনড্রিককে জানালেন, এখানেই আমাদের স্বার্থসিদ্ধি হবে।”

টেলিগ্রাফ লাইনের কাছেই নদীতীরে প্রাথমিকভাবে তাবু খাটানো হল। এরপর পিলারে উঠে মেইন টেলিগ্রাফ লাইনের সাথে নিজের ইয়ারফোন জয়েন্ট করে নিলেন লোথার। অপেক্ষার মুহূর্তগুলো একঘেয়ে হলেও হানি মাইনের কোনো মেসেজই তিনি মিস করতে চান না। তাই দিনের বেলা উত্তপ্ত মরুভূমির গরমে বসে বসে নোটবুকে তুলে নেন সমস্ত ডটস্ আর ড্যাশেস। পরে সেগুলোকে আবার অনুবাদ করেন।

দিনেরবেলা বলতে গেলে লোথার একাই থাকেন। হেনড্রিক ম্যানফ্রেড তার ঘোড় নিয়ে মরুভূমিতে যায়। যেন শিকারের পাশাপাশি এই পরিবেশে বাস করার শিক্ষাটাও হয়ে যায়। তাই অবসর পেয়ে লোথার কেবল ভাবেন তার পরিকল্পনার দুর্বল দিকগুলো নিয়ে। বলা বাহুল্য, সবার প্রথমেই মনে পড়ে ফুরির নাম। কাপুরুষ লোকটা সহজেই নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে।

হঠাৎ করেই ইয়ারফোনে বিজবিজ শব্দ হতেই নোটবুক তুলে নিলেন লোথার। পাতার উপর নেচে বেড়াল লোথারের পেনসিল। অবশেষে উইন্ডহক স্টেশন মেসেজ রিসিভ করে নিতেই ইয়ারফোন নামিয়ে অনুবাদ করলেন লোথার :

পেন্টিফগারকে বলা হচ্ছে সানডে রাতের জন্যে জুনোর প্রাইভেট কোচ তৈরি রাখতে।

পেন্টিফগার হলেন আব্রাহাম। আব্রাহামস আর জুনো হল সেনটেইন কোর্টনির কোড নেইম। কেপটাউনের উদ্দেশে রওনা দেবেন সেনটেইন। ঘটনাটা ঘটার সময় এই নারী আশপাশে থাকবে না ভেবেই স্বস্তি পাচ্ছেন লোথার।

কিন্তু হঠাৎ করেই কেন যেন সেনটেইনের সাথে দেখা করার জন্যে মন কেঁদে উঠল। ডেইমলার নদীতীর পার হবার সময়ে কেবল একঝলক! “ঠিক আছে, এতে করে হিরের ট্রাক আসার আগে রিহার্সালও হয়ে যাবে।” যুক্তি সাজালেন লোথার।

শনিবার দুপুরবেলা বহুদূর থেকে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এল ডেইমলার। দশ মাইল দূর থেকে ধূলিঝড় দেখে ম্যানফ্রেড আর হেনড্রিককে সিগন্যাল দিলেন লোথার।

অগভীর কয়েকটা পরিখা খুঁড়ে কাটা গাছের ডালপালা দিয়ে নিজেদেরকে আড়াল করে লুকিয়ে আছে পুরো দল। ব্লক সৃষ্টির জন্য জড়ো করা পাথরগুলোকেও একেবারে নিপুণ হাতে প্রাকৃতিকভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন লোথার। রিহার্সাল হওয়ায় কেউ আর মুখোশ পরল না।

শেষবারের মত সবকিছুর উপর চোখ বুলিয়ে দ্রুতবেগে ধাবমান গাড়ির দিকে তাকালেন। কিন্তু কেন যেন রাগও হল, “দেখো কাণ্ড কত জোরে গাড়ি চালাচ্ছে, ঠিক ঘাড় ভেঙে মরবে।” যদিও অশুভ চিন্তাটা তাড়াতাড়ি আবার মাথা থেকে তাড়িয়েও দিলেন।

শেষ মুহূর্তে গাড়ি এত জোরে ছুটে এল যে, মনে হল সব উপড়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু না, মোক্ষম সময়ে গ্রুটল বন্ধ করে দিয়ে দরজা খুলে নেমে এলেন সেনটেটন। লোথার যেখানে পরিখার মধ্যে উবু হয়ে বসে আছেন তা থেকে খুব বেশি হলে বিশ কদম সামনে। বেড়ে গেল লোথারের হৃৎপিণ্ডের গতি; আপন মনেই ভাবলেন “কেন আমি এমন করছি? এই নারী আমার সাথে এত প্রতারণা আর অবজ্ঞা করেছে?” শক্ত হতে চেয়েও পারলেন না লোথার। প্রাণশক্তিতে ভরপুর সেনটেইনের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক উজ্জ্বল দ্যুতি।

ঝট করে কাটা ঝোপে ঠিক লোখারের দিকেই যেন মুহূর্তখানেক তাকিয়ে ছেলেকে ডাক দিলেন সেনটেইন, “চলো আমরা হেঁটে গিয়ে দেখে আসি, ক্রসিং নিরাপদ হবে কিনা।”

লোথার যেখানে শুয়ে আছেন সেদিকেই এগিয়ে আসছে মা আর ছেলে। নিজের ট্রেঞ্চ থেকে সব দেখছে ম্যানফ্রেড সেনটেইন যে ওর মা সেটা ও জানে না কিংবা মায়ের দুধ পান করা অথবা কোলে ওঠা এ জাতীয় কোনো স্মৃতিও তার নেই। অতএব পুরো মনোযোগ দিল শাসার প্রতি।

শাসার সুদর্শন চেহারা দেখে জ্বলে উঠল ম্যানফ্রেড। মনে পড়ে গেল ছেলেটার বাম হাতের ঘুষির ক্ষত। যাই হোক, শুকনো নদীবক্ষে নেমে অ্যাকেশিয়া ডাল বিছানো পথটাকে আবার ঠিকঠাক করে দিল শাসা।

ছেলেকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে ডেইমলারের দিকে ফিরে তাকালেন সেনটেইন। দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন লোথার। কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছেন না।

“অল সেট, মা।” অ্যাকেশিয়া ডালগুলোকে আবার সুন্দর করে পেতে দিয়ে উঠে এল শাসা।

“চলো তাহলে এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আবার ডেইমলারে চড়ে বসল দু’জনে। শুকনো নদী পেরিয়ে বহু দূরে চলে গেলেন সেনটেইন। মরুভূমিতে মিলিয়ে গেল ইঞ্জিনের গর্জন। আচমকাই কেঁপে উঠলেন লোথার।

কয়েক মিনিট ধরে কেউ কোনো নড়াচড়া করল না। একটু পরে সবার আগে উঠে দাঁড়ালেন হেনড্রিক। কিন্তু কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও লোথারের চেহারা দেখে আবার চুপ করে গেলেন।

আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ডেইমলার যেখানে থেমেছিল সেখানে দাঁড়ালেন লোথার। ইচ্ছে হল নিচু হয়ে মেনটেইনের স্পর্শ করা ধুলা ধরে দেখতে। কিন্তু হঠাৎ করেই পেছন থেকে কথা বলে উঠল ম্যানফ্রেড।

“ও একটা বক্সার।” খানিকক্ষণের জন্যে তো লোথার বুঝতেই পারলেন না যে ছেলেটা শাসার কথা বলছে।

“চলো, ক্যাম্পে যাই।” বাবার কথা শুনে হাত দুটো পকেটে ভরে চুপচাপ ডাগ আউটের উদ্দেশে হাঁটা ধরল ম্যানফ্রেড।

“তুমি বক্সিং জানো, পা?” আবারো মনে সাধ জাগতেই জানতে চাইল ছেলেটা।

“আমার তো মানুষের দুপায়ের মাঝখানে লাথি মারতেই বেশি ভালো লাগে রে ম্যানি। তারপর ধর বোতল কিংবা বন্ধুকের হাতল দিয়ে ঠাস করে একটা বারি। ব্যস।

“আমি বক্সিং শিখতে চাই।” বলে উঠল ম্যানফ্রেড।

হয়ত আইডিয়াটা অনেক দিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল; তবে এবারে একেবারে ঘোষণা হিসেবে আবির্ভূত হল এ সিদ্ধান্ত।

***

“ওহ, অ্যাবি আপনি জানেন এ ধরনের লোকজন আমি কতটা অপছন্দ করি। রুম ভর্তি সিগারেটের ধোয়া, অপরিচিতদের সাথে বকবক উফ”, বিরক্তি বাড়ল সেনটেইনের কণ্ঠে।

“এই লোকটা হয়ত কখনো অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে সেনটেইন।”

গোমড়া মুখে বসে রইলেন সেনটেইন। কারণ কথাটা সত্যি। অ্যাডমিনিস্ট্রেটরই বলতে গেলে এ অঞ্চলের হর্তাকর্তা।

“আগেরগুলোর মতন এও বোধ হয় কোনো এক বুড়ো হামবড়া হবে।”

“আমি অবশ্য এখনো দেখিনি।” স্বীকার করলেন আবি।

“উইন্ডহক মাত্রই পৌঁছেছেন আর আগামী মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আমাদের সুমেরু অঞ্চলের খনির কাগজ তার ডেস্কের উপরেই সিগনচারের আশায় পড়ে আছে।”

সেনটেইন চোখ উল্টাতেই অ্যাবি মনে করিয়ে দিলেন, “দুই হাজার স্কয়ার মাইল উর্বরা জমির অধিকার নেয়ার জন্যে কয়েক ঘণ্টা কষ্টে কাটানো যায় না?”

কিন্তু সেনটেইন এত সহজে রাজি হবার পাত্রী নন; বললেন, “আমরা তো আজ সন্ধ্যায় ট্রেনে ওঠার কথা। শাসা বুধবার থেকে কলেজে যাবে।” নিজের প্রাইভেট কোচের স্যালুনের ভেতরে পায়চারি করছেন সেনটেইন।

“মঙ্গলবারেই আরেকটা ট্রেন ছাড়বে। আপনি তখন যাবেন। মাস্টার শাসা আজ চলে যাক। স্যার গ্যারি আর উনার স্ত্রী কেপটাউনে শাসাকে তুলে নেবেন। তারপর শাসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন আব্রাহাম, “একা একা নিশ্চয়ই যেতে কোনো কষ্ট হবে না, ইয়ং ম্যান?”

আব্রাহামের চতুর বুদ্ধি টের পেলেন সেনটেইন; এটা শাসার জন্যে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।

“অবশ্যই মা। তুমি এখানে থাকো। নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের সাথে দেখা করাটা অত্যন্ত জরুরি।”

বাতাসে হাত ছুড়লেন সেনটেইন, “আব্রাহাম যদি আমি বিরক্তির চোটে মরে যাই তাহলে সারা জীবন আপনি এর দায়িত্ব বয়ে বেড়াবেন কিন্তু।”

প্রথমে হিরের স্যুট পরতে চাইলেও মত বদলে হলুদ সিল্কের ইভনিং ড্রেসটাই বেছে নিলেন। সাথে কানে একজড়ো সলিটেয়ার ডায়মন্ড। তবে গলায় পরলেন বিশাল হলুদ ডায়মন্ডের পেনড্যান্ট। যা প্রাটিনাম চেইনের সাথে চমৎকার আবহ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

ভারি গোথিক ইমপেরিয়াল রীতিতে তৈরি ইঙ্ক প্যালেসে ঢুকেই বলরুমের চারপাশে চোখ বোলালেন সেনটেইন। যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই এসেছেন, সাথে তাদের স্ত্রী আর শহরের বিখ্যাত জমিদার ও ব্যবসায়ীর দলও আছে।

এদের ভিড়ে সেনটেইনের নিজস্ব কয়েকজন ম্যানেজার আর জুনিয়র ম্যানেজারও আছেন। যাই হোক, সবার সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ সারতে অ্যাবি এসে তাড়াতাড়ি সেনটেইনকে নিয়ে গেলেন যেন তিনি তটস্থ হবার আগেই কাজ সারা যায়। সেনটেইনের হাত ধরে রিসেপশন লাইনের দিকে নিয়ে গেলেন আবি, “অ্যাডমিনিস্ট্রেটর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমস। যুদ্ধ শেষে মিলিটারি ক্রুসের সাথে বারও পেয়েছেন। আর ব্যক্তিগত জীবনে একজন আইনজীবী আর

এতক্ষণ হোস্টের দিকে তেমন একটা নজর দেননি সিনটেইন। মনোযোগ দিয়ে অ্যাবির আরেক হাত ধরা র‍্যাচেলের মুখে স্যুপের রেসিপি শুনেছেন। যদিও মওকা পেলেই র‍্যাচেলকে হটিয়ে দিতেও প্রস্তুত আছেন। এমন সময় আচমকা মাইকে তাদের নাম ঘোষণা করল এ.ডি.সি, “মি. অ্যান্ড মিসেস আব্রাহাম ও মিসেস সেনটেইন ডি থাইরি কোর্টনি চোখ তুলে সামনে তাকাতেই মোহিত হয়ে গেলেন সেনটেইন। এমনকি অবচেতনেই আঁকড়ে ধরাতে আব্রাহামের কনুইতে ঢুকে গেল সেনটেইনে নখ।

কৃষ্ণকায় ব্লেইন ম্যালকম লম্বায় ছয় ফুট হবেন। এমন আমুদে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন যেন যেকোনো সময় নাচ শুরু করবেন।

“মিসেস কোর্টনি” হাত বাড়িয়ে দিলেন ব্লেইন, “আপনি আসায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী এতক্ষণ আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।” পরিষ্কার, মার্জিত আর শিক্ষিত এই কণ্ঠস্বর শুনে সেনটেইনের ঘাড়ের নিচে যেন শিরশির করে উঠল।

ম্যালকমসের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন সেনটেইন। পাশাপাশি ভদ্রলোকের চেহারাটাও পরীক্ষা করে দেখলেন। পাথরের মত ভারি আর বিশাল কপাল, চোয়ালের হাড় এবং গাল। ঠিক যেন তরুণ সুদর্শন আব্রাহাম লিংকনের প্রতিমূর্তি, বয়সও কম। মাত্র চল্লিশ।

হঠাই খেয়াল করলেন যে এখনো ম্যালকমসের হাত ধরে আছেন। আর সেনটেইনের মত আগ্রহ নিয়েই ওর দিকে তাকিয়ে আছেন কর্নেল সাহেব। ওদিকে র‍্যাচেল আর অ্যাবি আগ্রহ নিয়ে ওদের দুজনকেই দেখছেন।

আস্তে করে হাত ছাড়িয়ে নিলেন সেনটেইন। আতঙ্কিত হয়ে অনুভব করলেন যে গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে যা একবারও ঘটেনি।

“আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে এর আগেও আপনার পরিবারের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে।” উজ্জ্বল সাদা দাঁত দেখিয়ে বলে উঠলেন ম্যালকমস। বড়সড় মুখটা হাসলে আরো বৃহৎ দেখায়। খানিকটা কেঁপে উঠে সেনটেইনও হাসলেন। “তাই নাকি?” স্কুল গার্লদের মত লজ্জায় লাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন। লোকটার অদ্ভুত সবুজাভ চোখ দুটো বারবার তাকে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে।

“আমি ফ্রান্তে জেনারেল শন কোর্টনির অধীনে যুদ্ধ করেছি। উনি সত্যিকারের একজন জেন্টলম্যান ছিলেন।” ম্যালকম বলে চললেও তার মাথার ওপর টাক দেখে একটু বিরক্ত হলেন সেনটেইন।

“আমি শুনেছি আপনি নাকি ১৯৭১ সালে কয়েক সপ্তাহের জন্য জেনারেলের হেড কোয়ার্টারেও ছিলেন। আমি সে বছরের শেষ দিকেই উনার স্টাফ হয়েছি।” গভীরভাবে দম নিয়ে অবশেষে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেন সেনটেইন। মাইকেল আর শাসার কথাও ভাবতে হবে। তাই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিয়ে সরে পড়াই ভালো হবে।

“আমি খুব সম্মানিত বোধ করব, মিসেস কোর্টনি-” হাত বাড়িয়ে দিলেন ব্লেইন আর মুহূর্তখানেকের দ্বিধা ছাড়াই আঙুল দিয়ে তার কনুই স্পর্শ করলেন সেনটেইন।

অন্যান্য জুটিরা নাচতে নাচতে দূরে সরে তাদের জন্যে খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। আর ব্লেইন সত্যিই একজন অসাধারণ ড্যান্সার। নিজেকে এতটা হালকা আর স্বাচ্ছন্দ্য কখনো বোধ করেননি সেনটেইন।

প্রজাপতির মত ঘুরে ঘুরে নাচলেন দু’জনে। প্রতিটি মুদ্রা কাউন্টার টার্নে এত মজা পেলেন যে, মিউজিক বন্ধ করে বাদক দল ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেও সেনটেইন একটুও ক্লান্ত হলেন না। বরঞ্চ বাজনেদারদের ওপর রাগই হল। আরেকটু বাজালে কী হত! মেঝেতে সবার মাঝখানে হাত ধরে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসছেন ব্লেইন ম্যালকমস আর সেনটেইন কোর্টনি। বাকি জুটিরা তাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে হাততালি দিচ্ছে।

এখন আর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকাটা শোভা পায় না। তাই আস্তে করে পিছিয়ে দাঁড়ালেন সেনটেইন।

“আমার মনে হয় শ্যাম্পেন হলে খারাপ হবে না” সাদা জ্যাকেট পরিহিত ওয়েটারকে ইশারা দিলেন ব্লেইন।

ভিড়ে ভিড়াকার পুরো রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জনে। এক দু’জন সাহসী আত্মা কাছে আসতে চাইলেও কাধ আর মাথা দিয়ে স্পষ্ট বিরক্তির ভাব প্রকাশ করলেন সেনটেইন। তা দেখে বাকিরাও দূরে সরে গেল।

খানিক বাদে দ্বিতীয়বার ডান্স ফ্লোরে একসাথে নাচার পর ব্লেইন জানালেন, “আমি আমার স্ত্রীর সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই মিসেস কোর্টনি, মে আই?”

হঠাৎ করেই প্রচণ্ড হিংসা অনুভব করলেন সেনটেইন। কিছু না বলে কেবল মাথা নাড়লেন। নিজের কণ্ঠস্বরকেও বিশ্বাস নেই।

মেঝের উপর দিয়ে মেইন সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন ব্লেইন। মুখগুলোর মধ্যে খোঁজ করলেন সেনটেইন। না জানি কে হবেন সেই ভাগ্যবতী। দু’পাশে সরে পথ করে দিল বাকি নারী-পুরুষের দল। আর ওই তো সে, অনিন্দ্যসুন্দর বিষণ্ণ মাখা দু’চোখ তুলে সেনটেইনকে দেখছে। বয়সেও তরুণ মেয়েটার পুরো অবয়বে তা আর বিনয় ছড়িয়ে থাকলেও হাসিতেও কেমন দুঃখের ছাপ!

“মিসেস কোর্টনি ইনি হলেন আমার স্ত্রী ইসাবেলা।”

“আপনি বেশ চমৎকারভাবে ডান্স করেছেন মিসেস কোর্টনি। আপনাকে আর ব্লেইনকে দেখে আমি বেশ মজা পেয়েছি।”

“ধন্যবাদ মিসেস ম্যালকমস” ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রেগে উঠলেও কোনোমতে ফিসফিস করলেন সেনটেইন।

হুইল চেয়ারে বসে আছেন ইসাবেলা ম্যালকমস। পেছনে নার্সও দাঁড়িয়ে আছে। ইভনিং ড্রেসের নিচে দিয়েও দেখা যাচ্ছে প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া পায়ের গোড়ালি।

“ও তোমাকে কখনো ছাড়বে না” নিজের দুঃখে যেন কেঁদেই ফেলবেন সেনটেইন; আপন মনে বললেন, “ও কখনো পক্ষাঘাশ্রস্ত পত্নীকে ছেড়ে যাবে না।”

***

সূর্য ওঠারও একঘণ্টা আগে ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন সেনটেইন আর সাথে সাথে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল এক ধরনের ভালো লাগার আবেশ। চাদর ছুঁড়ে ফেলে নগ্নপায়ে মেঝের ওপর নামতেই চোখ গেল মাইকেল কোর্টনির ফ্রেমে বাঁধানো ছবির দিকে।

“অ্যায়াম সরি, মাইকেল।” ফিসফিস করে জানালেন, “আমাকে ক্ষমা করো ডার্লিং, অনেক দিন ধরেই আমি একা। এখন ওকে চাই মাইকেল, ওকে বিয়ে করে নিজের করে পেতে চাই।” তারপর ছবিটাকে হাতে নিয়ে খানিক পেটের কাছে চেপে ধরলেও পরে আস্তে করে ড্রয়ারে রেখে দিলেন সেনটেইন।

কোনোমতে গায়ে চায়নিজ সিল্কের ড্রেসিং গাউন জড়িয়েই কোচের ডেস্কে বসে স্যার গ্যারির কাছে ব্লেইন ম্যালকমসের সমস্ত তথ্য জানতে চেয়ে টেলিগ্রাফ পাঠালেন।

এরপর সেক্রেটারিকে ফোন করে আনিয়ে মেসেজটা ধরিয়ে দিয়েই বললেন, “আব্রাহামকে ফোন দাও।”

“সেনটেইন এখন মাত্র সকাল ছয়টা বাজে। আর গতরাতে তিনটার আগে বিছানাতেই যেতে পারিনি।” ঝাঁকিয়ে উঠলেন অ্যাবি।

“তিন ঘণ্টার ঘুমই এক দক্ষ লইয়ারের জন্য যথেষ্ট। অ্যাবি, আমি চাই আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে ডিনারের জন্য কর্নেল ম্যালকমস আর তার পত্নীকে নিমন্ত্রণ করবেন।”

দীর্ঘ কয়েক মুহূর্তের জন্য একেবারে চুপ করে রইলেন আব্রাহাম।

“আপনি আর র‍্যাচেলও আসবেন। তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন সেনটেইন।

“এতটা শর্ট নোটিশে উনার মত ব্যস্ত মানুষ আসতে পারবেন না।” খুব সাবধানে প্রতিটি শব্দ বাছাই করলেন অ্যাবি।

“উনাকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত পাঠিয়ে দিন। কোনোভাবেই যেন প্রথমে ওয়াইফের কাছে না যায় আপনার বার্তাবাহক।” অ্যাবির কথায় পাত্তাই দিলেন না সেনটেইন।

“উনি আসতে পারবেন না।” তবুও জেদ করলেন অ্যাবি। “অন্তত আমি ঈশ্বরের কাছে সে প্রার্থনাই করব।”

“মানে? কী বলতে চান?” সাপের মত ফোঁস করে উঠলেন সেনটেইন।

“আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন। মোমবাতির শিখা নয়। একেবারে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা বুশ ফায়ারের আগুন।”

নিজের দু’ঠোঁট কামড়ে ধরে সেনটেইন জানালেন, “নিজের চরকায় তেল দাও, আমি আমারটা বুঝব।”

খিলখিল করে হেসে উঠলেন সেনটেইন। অবাক হয়ে গেলেন আব্রাহাম। আগে কখনো সেনটেইনকে এভাবে হাসতে শোনেননি।

এবার সত্যিই বেশ উম্মা প্রকাশ পেল আব্রাহামের গলায়,

“সেনটেইন আমি যেন আপনার ব্যাপারে মাথা ঘামাই সে কারণে প্রতি মাসে আপনিই আমাকে পারিশ্রমিক দিচ্ছেন। এমনিতেই আপনার গত রাতের আচরণ নিয়ে সকাল হলেই কথা বলতে শুরু করবে পুরো শহর। সবাই আপনাকে দেখেছে।”

“অ্যাবি, আপনি আমি দু’জনেই জানি যে যা ইচ্ছে করার ক্ষমতা আমার আছে। তাই না? আপনি শুধু নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দিন, প্লিজ!”

দুপুরবেলা বেশ খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিলেন সেনটেইন। সেক্রেটারি চারটার পরে ঘুম থেকে তুলে জানাল তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কর্নেল ও তাঁর ওয়াইফ, শুনে বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাসলেন সেনটেইন। তারপর বললেন স্যার গ্যারির পাঠানো উত্তর পড়তে।

লোকটার বয়স হিসাব করেও খুশি হয়ে উঠলেন। সিংহ জাতক হিসেবে কর্নেলের বয়স এখন মাত্র ঊনচল্লিশ। আগ্রহ নিয়ে পড়তে লাগলেন সেনটেইন অক্সনের গ্র্যাজুয়েট কর্নেলের দুই কন্যার নাম তারা ইসাবেলা ও মাতিল্ডা জানিন। উনার পিতাও ছিলেন বিখ্যাত লইয়ার আর মাইনিং এন্টারপ্রেনার।

কিন্তু কন্যাদ্বয়ের কথা শুনে চমকে উঠলেন সেনটেইন। ছেলেমেয়ে সম্পর্কে তো তিনি ভাবেনইনি।

“যাক মহিলা অন্তত ব্লেইনকে কোনো পুত্রসন্তান দিতে পারেননি।” ভয়ংকর কথাটা মাথায় আসতেই সেনটেইন নিজেই অপরাধবোধে দগ্ধ হলেন। তাই স্যার গ্যারির পাঠানো দীর্ঘ কেবলের বাকি অংশ পড়লেন : এস এ পার্টি ক্ষমতায় এলে কেবিনেট র‍্যাঙ্ক বেড়ে যাবার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। জেনারেল সুটের স্টাফ হিসেবেও কাজ করেছেন। পড়ে যারপরনাই খুশি হলেন সেনটেইন। কিন্তু শেষ লাইনে সর্বক্ষেত্রে সতর্ক থাকার জন্যে স্যার গ্যারির পরামর্শ পড়ে বেজায় ক্ষেপেও উঠলেন।

“আমার কিসে ভালো হবে তা নিয়ে সবার এত মাথাব্যথা কেন?” রেগে মেগে আয়নার দিকে তাকাতেই চেহারা শান্ত হয়ে গেল। এমনকি তরুণীদের মত মনোযোগ দিয়ে খুঁজলেন কোথাও কোনো খুঁত পাওয়া যায় কিনা। চোখের কোণে চুলের সমান চিকন লাইন দেখে হাহাকার করে উঠল বুক।

“সব সুদর্শন পুরুষগুলো কেন এরই মাঝে বিয়ে করে বসে আছে?”

***

ইসাবেলা ম্যালকমসের খাতিরদারি আর হুইল চেয়ারকে ব্যালকনিতে টেনে তোলার জন্যে নিজের চারজন পরিচারককে প্রস্তুত করে রাখলেন সেনটেইন। তবে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে পত্নীকে নিজের কোলে তুলে নিলেন ব্লেইন ম্যালকমস। তারপর এমনভাবে কোচের সিঁড়িতে উঠে এলেন যেন তার কোনো ওজনই নেই। স্কার্টের নিচ দিয়ে ঝুলছে ইসাবেলার বোধশক্তিহীন দুটো পা। দেখে হঠাৎ করেই সমবেদনা অনুভব করলেন সেনটেইন।

কিন্তু স্যালুনে ঢুকে সেনটেইনের অনুমতি না নিয়েই একেবারে শ্রেষ্ঠ চেয়ারটাতে নিজের স্ত্রীকে বসিয়ে দিলেন ম্যালকমস। সচরাচর এখানে সেনটেইনই বসেন। সিল্ক কার্পেটের ওপর ইসাবেলার পা দুটোকে পাশাপাশি রেখে স্কার্ট দিয়ে ব্লেইন এমনভাবে ঢেকে দিলেন যে বোঝা গেল আগেও এ কাজ বহুবার করেছেন।

এরপর ইসাবেলা ব্লেইনের গালে আস্তে করে আঙুল ছুঁয়ে এমনভাবে হাসলেন যে দেখে হতাশায় ছেয়ে গেল সেনটেইনের হৃদয়। মনে হল অ্যাবি আর স্যার গ্যারির কথাই বোধ হয় ঠিক।

এতক্ষণে সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন ইসাবেলা আর সাথে সাথে বদলে গেল তার হালকা বাদামি আর সোনালি রঙা চোখের রঙ। সেনটেইনের গাঢ় বুনো মধুরঙা চোখের দিকে তাকিয়ে যেন চ্যালেঞ্জ জানালেন, যেন নিজের হাতের গ্লাভস খুলে সেনটেইনের মুখে চপেটাঘাত করলেন।

“কত বড় সাহস!” রাগে দিশেহারা হয়ে গেলেন সেনটেইন, “আমি ভেবেছিলাম ব্লেইনের দিকে আর হাত বাড়াব না। কিন্তু তুমি যদি যুদ্ধ করতে চাও, তবে আমিও রাজি আছি। দেখা যাক কী হয়।” নিঃশব্দে ইসাবেলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন সেনটেইন।

ডিনারের জন্য রকলবস্টারের ড্রেসিং আর রোস্টের সস তিনি নিজের হাতে বানিয়েছেন। তাই খাবারগুলো সবাই অত্যন্ত উপভোগ করল। ইসাবেলা আর সেনটেইনও পরস্পরের সাথে হাসি-খুশি আচরণ করেছেন দেখে ব্লেইন ও অ্যাবিও দারুণ খুশি। অন্যদিকে চুপচাপ বসে রইলেন র‍্যাচেল আব্রাহম, স্পষ্ট বুঝতে পারলেন কী ঘটছে। তাই আনমনে ইসাবেলাকেই সমর্থন করলেন। জানেন তার নিজের ছোট্ট কুটিরের উপরেও সর্বদা শিকারির নিঃশ্বাস পড়ছে।

“আপনার তো দু’জন মেয়ে তাই না মিসেস ম্যালকমস? খুব কষ্ট হয়, না? ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা থাকলেই কাজ বেশি বাড়ে।” প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে কতটা গবেষণা করেছেন জানিয়ে দিলেন সেনটেইন।

অন্যদিকে টেবিলের শেষ মাথায় বসে কেঁপে উঠলেন র‍্যাচেল। ছুরির এক খোঁচায় ইসাবেলার ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছেন এই নারী।

“ওহ, বাসার কাজের জন্য আমি যথেষ্ট সময় পাই। বাইরে ব্যবসা করি না। তো! তাছাড়া আমার ডার্লিং মেয়েরা বাবার অন্ধ ভক্ত।”

হুম, বোঝা গেল ইসাবেলাও সমানভাবে পারদর্শী। নিপুণভাবে মেয়েদেরকে ব্লেইনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। বিষয় পরিবর্তন করে রাজনীতিতে চলে গেলেন সেনটেইন।

আর আলোচনার পুরো সময়টুকু জুড়ে উপভোগ করলেন ব্লেইনের কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ও মাধুর্য। এতটাই শ্রুতিমধুর মনে হল যে, মাঝে মাঝেই প্রশ্ন করে, ছোট-খাটো মন্তব্য করে আরো উৎসাহ দিলেন। আপন মনে ভাবলেন, আমিই এত কাবু হয়ে পড়েছি; সাধারণ লাখ লাখ ভোটার তো অঙুলি হেলনে কেবল তাকেই ভোট দেবে। হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা একটু বেশিই দৃষ্টিকটু দেখাচ্ছে। তারা দুজনে এমনভাবে মগ্ন হয়ে কথা বলছেন যেন রুমে আর কেউ নেই। তাই তাড়াতাড়ি ইসাবেলার দিকে ফিরলেন।

“আপনারও স্বামীর মত একই ধারণা মিসেস ম্যালকমস?”

হা হা করে হেসে উঠে স্ত্রীর মত জানিয়ে দিলেন কর্নেল সাহেব। “আমার স্ত্রী আসলে রাজনীতি একেবারেই পছন্দ করে না, তাই না ডিয়ার?” নিজের ডিনার জ্যাকেটের পকেট থেকে সোনার ঘড়ি বের করে চোখ বোলালেন ম্যালকমস।

“মাঝরাতেরও বেশি হয়ে গেছে। সময়টা আসলে এত দারুণ কেটেছে যে, সময়েরই হুঁশ নেই।”

“ইউ আর রাইট ডার্লিং” স্বস্তি পেলেন ইসাবেলা।

“কিন্তু আমি তো ব্র্যান্ডি আর সিগার ছাড়া যেতে দেব না।” বাদ সাধলেন সেনটেইন। কিন্তু নার্ভাস ভঙ্গিতে কাঁপতে থাকা সেক্রেটারিকে দেখে থেমে যেতে হল। হাতে টেলিগ্রাফ।

“কী হয়েছে? লোকটা এমনভাবে কাঁপছে যেন নিজের মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ধরে রেখেছে।

“ড, টুয়েন্টিম্যান জোনসের কাছ থেকে এসেছে। ইটস আর্জেন্ট।”

টেলিগ্রাফের পাতা হাতে নিয়েও আগে অতিথিদের তদারক করলেন সেনটেইন। ব্লেইন আর অ্যাবিকে হাভানার চুরুট, লিকার দিয়ে এক্সকিউজ মি বলে চলে এলেন নিজের বেডরুমে। টেলিগ্রাফ মেসেজটা পড়ে দেখলেন :

গারহার্ড ফুরির নেতৃত্বে অবরোধ কমিটি সমস্ত কাজ বাতিল করে বসে আছে। তারা চাকরিচ্যুত সকলের পুনঃবহাল আর চাকরির নিশ্চয়তা দেবার দাবি তুলেছে। আপনার নির্দেশনার জন্য অনুরোধ করছি।

বিছানার উপর বসে রাগে কাঁপছেন সেনটেইন। এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা। এটা তার খনি, তার হিরে। তিনি তো তাদেরকে মজুরি দিচ্ছেন। তার মানে চাকরি দেয়া আর কেড়ে নেয়া উভয় অধিকারই তার হাতে। শিপমেন্ট বাতিল হয়ে গেছে মানে? এটার উপর নির্ভর করছে উনার ভাগ্য। কে এই গারহার্ড ফুরি? ভাবতে গিয়েই মনে পড়ল ট্রান্সপোর্ট ড্রাইভারের কথা।

এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলেন করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার সেক্রেটারি।

“মি, আব্রাহামকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।”

আব্রাহাম দরজার ভেতরে পা রাখতেই মেসেজ লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিলেন সেনটেইন।

“আমার সাথে এরকম করার ওদের কোনো অধিকার নেই” ভয়ংকর রকম ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার দিলেন।

“কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল তাদের সে অধিকার সত্যিই আছে। ১৯২৪ অ্যাক্ট অনুযায়ী”

“আমার সামনে আইন কপচাবেন না” অ্যাবিকে কথা শেষ করতে না  দিয়েই সেনটেইন বলে উঠলেন, “একদল বলশেভিকে বাচ্চা যে খাওয়ায় তার হাতেই কামড় দেয়।”

“সেনটেইন তাড়াহুড়া করে কিছু করা যাবে না। যদি

“অ্যাবি, এক্ষুণি ডেইমলার রেডি করে জোনসকে টেলিগ্রাফ করে জানিয়ে দিন যেন আমি না আসা পর্যন্ত কিছু না করে। কোনো সমঝোতা না, কিছু না।”

“আপনি না কাল সকালে চলে যাবেন?”

“না।” ফোঁস করে উঠলেন সেনটেইন, “আমি আধঘণ্টার মধ্যেই রওনা দিচ্ছি। অতিথিরা চলে যাক আর যত তাড়াতাড়ি পারেন ডেইমলার রেডি করুন।”

“রাত একটা বাজে সেনটেইনের চেহারা দেখে বাকিটা আর বলার সাহস পেলেন না অ্যাবি।

কোনোমতে নিজেকে ঠাণ্ডা করে স্যালুনে ফিরে এলেন সেনটেইন।

“কোনো সমস্যা হয়েছে মিসেস কোর্টনি?” উঠে দাঁড়ালেন ব্লেইন, “আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?”

“আরে না, না সব ঠিক আছে। শুধু খনিতে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে তাই আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে।”

“আজ রাতেই?”

“হ্যাঁ, এক্ষুণি-_”

“একা একা যাবেন আপনি?” ব্লেইনের মুখে চিন্তার রেখা দেখে উফুল্ল হয়ে উঠলেন সেনটেইন। “রাস্তা তো বেশ দূর।”

“আমি আসলে একা ট্রাভেল করতেই বেশি পছন্দ করি।” পরের বাক্যটা বেশ জোর দিয়ে বললেন, “কিংবা বলা যায় সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটু বেশিই খুঁতখুঁতে। আমার কয়েকজন কর্মী অববোধ ডাকাতেই যাবার তাড়া। হয়ত সংঘর্ষের মুখেও পড়তে হতে পারে।”

তাড়াতাড়ি আশ্বাসের সুরে ব্লেইন বলে উঠলেন, সরকারের তরফ থেকে আমি নিজে আপনাকে সবরকম সহায়তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। চান তো পুলিশও পাঠিয়ে দিতে পারি।”

“ধন্যবাদ, আপনাকে ডাকা যাবে জেনেই বেশ স্বস্তি পেলাম।”

“কাল সকালের আমার প্রথম কাজই হবে এটা। কিন্তু কয়েক দিন হয়ত লেগে যেতে পারে।” আবারো দু’জনে নিচু গলায় কথা বলে এমন আচরণ করছেন যেন চারপাশে আর কেউ নেই।

“ডার্লিং মিসেস কোর্টনি উনার ভ্রমণের জন্য তৈরি হবেন নিশ্চয়ই।” স্ত্রীর কথা শুনে ব্লেইন এমনভাবে চমকে উঠলেন যেন ইসাবেলার অস্তিত্বের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ সেটাই। আমাদের এক্ষুণি চলে যাওয়া উচিত।”

ইসাবেলার হুইল চেয়ারের পাশে হেঁটে হেঁটে রেলওয়ের প্লাটফর্ম পর্যন্ত গেলেন সেনটেইন।

অপেক্ষারত শেভ্রলেতে সাবধানে ইসাবেলাকে তুলে দিয়ে দরজা আটকে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন।

“ও অসাধারণ, সাহসী এক নারী। আমি ওকে ভালোবাসি তাই কখনো একা ছাড়তে পারব না; কিন্তু মনে হচ্ছে–” চুপ করে সেনটেইনের হাত ধরলেন ব্লেইন।

“হ্যাঁ, আমিও যদি নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন। তারপর ব্লেইনের হাত ছেড়ে দিয়ে ঝুঁকে জানালার ওপাশে ইসাবেলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেপ টাউনে এলে অবশ্যই ওয়েল্টেভ্রেদেনে আসবেন?”

এতক্ষণে খসে পড়ল ইসাবেলার শান্ত সুন্দর মুখশ্রীর মুখোশ। প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে বললেন,

“ও আমার। তুমি কখনোই ওকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। নিজের সিটে হেলান দিয়ে বললেন ইসাবেলা। ব্লেইনও ঢুকে পড়ে পত্নীর হাত ধরলেন। বোঝা গেল একটু আগের কথাটা শুনতে পাননি।

চলে গেল শেভ্রলে। স্ট্রিটলাইটের আলোয় একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন।

***

লোথার ডি লা রে কানের পাশে ইয়ারফোন নিয়েই ঘুমিয়েছেন। তাই বিপবিপ আওয়াজ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে বললেন, “হেনি, তাড়াতাড়ি মোমবাতি জ্বালাও, এত রাতে টেলিগ্রাফে যোগাযোগ করছে, নিশ্চয়ই জরুরি কিছু।”

নোটবুক হাতে নিয়ে টুয়েন্টিম্যান জোনসের মেসেজ অনুবাদ করে তো হতভম্ব হয়ে গেলেন লোথার।

“গারহার্ড ফুরি। গাধার বাচ্চাটা কোন আক্কেলে এরকম একটা কাজ করতে গেল।” তাড়াতাড়ি ডাগ আউট থেকে বের হয়ে শুকনো নদীবক্ষের উপর পায়চারি শুরু করলেন লোথার।

“অবরোধ, এখন কেন অবরোধ ডাকতে গেল? শিপমেন্ট বাতিল হয়ে গেছে মানে ডায়মন্ড অবরোধকারীরা হিরে-খনি থেকে বের হতে দিচ্ছে না।” হঠাৎ করেই থেমে গিয়ে নিজের হাত মুঠি করে বাতাসে ঘুষি ছুড়লেন, “তার মানে বেকুবটা আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে চাইছে না। এখন কী হবে? আমার সব প্ল্যান ভেস্তে গেল।”

অন্ধ রাগে কেঁপে উঠল লোথারের সর্বাঙ্গ।

“আমার সমস্ত পরিশ্রম আর ঝুঁকি বৃথা গেল। ঘোড়াগুলোকে এত কষ্ট করে চুরি করলাম; সব পণ্ড হল এই পেট মোটা হলুদ শয়তানটার জন্য”

মনে হচ্ছে ফুরি এখন চোখের সামনে থাকলে নির্দ্বিধায় খুন করে ফেলতেন লোথার।

“বাস!” দৌড়ে এসে হাঁপাতে লাগলেন হেনড্রিক, “তাড়াতাড়ি এসো! টেলিগ্রাফ!”

দু’লাফ মেরে ডাগআউটে ফিরে এসে হেডসেট তুলে নিলেন লোথার। উইন্ডহকের কোর্টনি অপারেটর খনিতে মেসেজ পাঠাচ্ছে—

“আমি এক্ষুণি আসছি তার আগে কোন ওয়াদা কিংবা সমঝোতা নয়। কোম্পানি স্টোর এক্ষুনি বন্ধ করে দিন। অবরোধকারী ও তাদের কাছে সমস্ত খাবার-দাবার বিক্রি বন্ধ। তাদের চালাঘরের পানি আর বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ করে দিন। অবরোধ কমিটিকে আরো জানিয়ে দিন যে পুলিশ ফোর্সও রওনা দিয়েছে।”

ফুরির উপর সমস্ত রাগ আচমকা ভুলে গিয়ে আনন্দে হেসে ফেললেন লোথার।

“ফুরি আর তার চ্যালাদের কোনো ধারণাই নেই যে, তাদের উপর কোন ঝড় নেমে আসছে। ওহ ঈশ্বর। সেনটেইন কোর্টনির পথে পড়ার চেয়ে ছোট একটা লাঠি নিয়ে কালো মাম্বার সাথে লড়াই করাটাও আরো বেশি সহজ।”

কী যেন ভাবলেন লোথার। তারপর হেনড্রিক আর ম্যানফ্রেডকে তাড়াতাড়ি জানালেন, “আমার মনে হচ্ছে অবরোধ থাক বা না থাক, হিরে খনি থেকে বেরিয়ে উইন্ডহকে যাবেই যাবে। তবে ফুরি বোধ হয় আসছে না। তাই প্যাকেজটা আমাদের হাতে লক্ষ্মীর মতন তুলে দেয়ারও কেউ নেই। যাই হোক, হিরে আসছে মানে আমাদের কার্যও ঠিকই সিদ্ধি হবে।”

পরের দিন রাত এগারোটা বাজে তাদের পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেল হলুদ ডেইমলার। দিয়াশলাই জ্বালিয়ে নিজের ঘড়ি চেক করে দেখলেন লোথার। “তার মানে গত রাতে টেলিগ্রাফ পাবার আধা ঘণ্টা পরেই রওনা দিয়ে দিয়েছে। তার মানে পাক্কা বাইশ ঘণ্টা ধরে ড্রাইভ করে একা একা পার হয়ে এসেছে এতটা পথ।” হাল্কাভাবে শিষ দিয়ে উঠলেন লোথার। “এভাবে গেলে আগামীকাল দুপুরের আগেই হানি খনিতে পৌঁছে যাবে। সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।”

***

সামনেই দেখা যাচ্ছে নীল পাহাড়ের সারি। কিন্তু এখন এ দৃশ্য উপভোগ করার মত সময় আর মন কোনোটাই সেনটেইনের নেই। বত্রিশ ঘণ্টা ধরে টানা গাড়ি চালাচ্ছেন। পথের পাশে গাড়ি রেখে মাত্র দু’ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। ক্লান্তিতে হাড়ের গিটগুলো পর্যন্ত অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু তারপরেও চোখের সামনে সূর্যের গনগনে রোদে জ্বলতে থাকা খনির টিনের ছাদগুলো দেখে নিমিষেই ভুলে গেলেন সমস্ত অবসাদ।

ডেইমলার থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খানিক হাত-পা ঝেড়ে নিলেন। রিয়ারভিউ মিররে চেহারাটাও দেখলেন। ওয়াটার ব্যাগ থেকে পানি নিয়ে কাপড় ভিজিয়ে তাই ক্লান্ত মুখখানাও মুছে নিলেন। সাদা রঙের ডাস্ট জ্যাকেট খুলে ফেলতেই সারা শরীর আবার পরিষ্কার আর নিখুঁত দেখাল। এতক্ষণ সবকিছু দেখেছে অ্যাভিনিউর কর্নারে থাকা একদল নারী আর ছোট ছেলে মেয়ের জটলা। তাদের পাশ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ে চলে এলেন সেনটেইন।

গেইটের বাইরে জনাবিশেক লোক এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মালিককে দেখে এই শ্বেতাঙ্গ কর্মীদের দলই হাতে হাত রেখে লাইন করে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

ডেইমলারের হন চেপে ধরে মেঝের সাথে এক্সিলারেটর ঠেসে ধরলেন। সেনটেইন। সোজা লাইনটার মাঝ বরাবর এগিয়ে যেতেই সবাই বুঝল তাদেরকে চাপা দিতেও তিনি একটুও ভ্রূক্ষেপ করবেন না। একেবারে শেষ মিনিটে দু’পাশে ছিটকে পড়ল পিকেটারদের দল।

একেবারে বারান্দার সামনে গিয়ে গাড়ি থামালেন সেনটেইন। জ্যাকেট আর টাই ঠিক করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন জোনস।

“আমরা ভেবেছি আপনি হয়ত কালকের আগে আসতেই পারবেন না।”

“আপনার বন্ধুরা” ডেইমলার নিয়ে তেড়ে আসার সময় পিকেটারদের ছোঁড়া পাটকেলে ভাঙা কাঁচ দেখালেন সেনটেইন।

“ওরা আপনার উপর আক্রমণ করেছে? এটা ক্ষমার অযোগ্য, সত্যি।”

“ঠিক তাই, আর ক্ষমার কোনো ইচ্ছেও আমার নেই।”

জোনসের সরু কোমরে ঝুলছে বিশাল এক সার্ভিস পিস্তল। পেছনেই ছোটখাটো ব্রানটিংহ্যাম। উনার চশমা পরা চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি বুঝি কেঁদে ফেলবেন। তারপরেও কাঁপা কাঁপা হাতে ডাবল ব্যারেল শর্টগান ধরে রেখেছেন।

তাঁকে সাহস দিতে চাইলেন সেনটেইন; বললেন, “আপনি সত্যিই একজন সাহসী লোক। আমি আপনার কথা কখনো ভুলব না।

অতঃপর অফিসে গিয়ে নিজের ডেস্কে বসলেন সেনটেইন, জোনসের কাছে জানতে চাইলেন, ক’জন আমাদের পক্ষে আছে।”

“মাত্র আটজন অফিস স্টাফ।”

“রজার আর ম্যাক্সিয়ারও?”

সিনিয়র দু’জন ওভারসিয়ারের কথা জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“ওরা দুজনেই কমিটিতে আছে।

“ফুরির সাথে?”

“ওরা তিনজনই তো সর্বেসর্বা।”

“ওরা যাতে আর কখনো কাজ করতে না পারে সেটা আমি অবশ্যই নিশ্চিত করব।” তিক্ত কণ্ঠে সেনটেইনের ঘোষণা শুনে জোনস বিড়বিড় করে উঠলেন।

“আমার মনে হয় এটাও মনে রাখতে হবে যে, ওরা কোনো আইন ভঙ্গ করেনি। একত্রে জড়ো হবার লিগ্যাল অধিকার তাদের আছে”।

জোনসের আমতা আমতা কথা শুনে ক্ষেপে গেলেন সেনটেইন।

“এখন যখন আমি খনিটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করছি, ওদের জন্য এতকিছু করেছি, তারপর তো কোন অধিকারই নেই। আপনি কোন পক্ষে বলুন তো জোনস?”

ব্যথাভরা চোখ নিয়ে তাকালেন জোনস, “আপনি কেমন করে এই প্রশ্নটা করলেন? প্রথম যেদিন আপনার সাথে দেখা হয়েছে সেদিন থেকেই তো আপনার বাধ্যগত। আমি কেবল লিগ্যাল অবস্থানটা দেখাবার চেষ্টা করেছি।”

সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে জোনসের হাত ধরলেন সেনটেইন।

“আমায় ক্ষমা করুন জোনস। আমি আসলে ক্লান্ত আর বেশ দিশেহারা বোধ করছি।” বলেই কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে চামড়ার মোড়া সোফায় বসিয়ে দিলেন জোনস, “শেষবার আপনি কখন ঘুমিয়েছেন?”

“এখন আপনাকে ঘুমাতে হবে। অন্তত আট ঘণ্টা। বাংলো থেকে আপনার জন্যে পরিষ্কার কাপড় আনার ব্যবস্থা করছি।”

“কিন্তু আমাদেরকে ওদের সাথে কথা বলতে হবে।”

“না।” মাথা নেড়ে পর্দা টেনে দিলেন জোনস। “খানিক বিশ্রাম না নিলে সঠিক সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন না।

চোখের পাতা চেপে ধরলেন সেনটেইন, “আপনি ঠিকই বলেছেন, যমন সবসময় বলেন।”

“সন্ধ্যা ছয়টায় আপনাকে ঘুম থেকে ডেকে দেব। আর স্ট্রাইক কমিটিকেও জানিয়ে দিচ্ছি যে আপনি আটটায় ওদের সাথে মিটিং করবেন। তাহলে নিজেদের রণকৌশল ঠিক করে নেয়ার জন্য আমরাও হাতে দু’ঘণ্টা সময় পাব।”

***

সন্ধ্যায় অফিসে এসেছে স্ট্রাইক কমিটির সদস্যরা। আর কোনো কথা না বলে একদৃষ্টে ঝাড়া তিন মিনিট তিনজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। ইচ্ছে করেই সবগুলো চেয়ার সরিয়ে কেবল তার আর জোনসদের জন্য দুটো রেখেছেন।

“বর্তমানে সারাদেশে হাজার হাজার লোক তাদের চাকরি হারাচ্ছে।” আবেগহীন গলায় সেনটেইন জানালেন, “তাদের যে কেউ এসে সানন্দে তোমাদের জায়গায় বসে যাবে।”

“এতে কোনো ছাতার কাজ হবে না, বুঝলেন।” মাঝারি উচ্চতার ম্যাক্লিয়ারের মুখে কথাটা শুনে চটে উঠলেন সেনটেইন।

“আমার সামনে এসব আজেবাজে কথা বললে এক্ষুণি বেরিয়ে যাও ম্যাক্লিয়ার।”

“আপনি আমাদের অধিকার ভালোভাবেই জানেন মিসেস কোর্টনি।” বিষণ ভঙ্গীতে হাসল ম্যাক্লিয়ার।

রজারের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “তোমার স্ত্রী এখন কেমন আছে?” এক বছর আগে জোহানেসবার্গে নিয়ে পত্নীর অপারেশন করিয়েছেন রজার যার সবটুকু খরচ বহন করেছেন সেনটেইন।

“ভালো আছে।” নাজুক ভঙ্গিতে জানাল রজার।

“তোমার এই মূর্খামি সম্পর্কে তার কী ধারণা?” চোখ নামিয়ে পায়ের দিকে তাকাল রজার। সেনটেইন বললেন, “ছোট তিনজনের মুখ নিয়েই নিশ্চয় বেশি চিন্তিত হয়ে আছে, তাই না?”

“আমরা যা করছি সবাই একসাথেই করছি” তাড়াতাড়ি বলে উঠল ফুরি। নারীরাও

কিন্তু তাকে কথা শেষ করার সুযোগ দিলেন না সেনটেইন, “দয়া করে আমি কথা বলার সময় মাঝখানে কিছু বলবে না ফুরি।”

তবে এবার আর ফুরিকে দমাতে পারলেন না। তেড়েফুড়ে সক্রোধে গর্জন করে উঠল ড্রাইভার “আপনার এই বেহুদা খনি আর এর হিরে সব এখন আমাদের কজায়। তাই আপনিই আমাদের কথা শুনতে বাধ্য এখন। আমরা না চাইলে এক টুকরো হিরেও বাইরে যাবে না। স্ট্রংরুমে যে মোটাসোটা প্যাকেট রেখে দিয়েছেন সেটাও কখনো বাইরের আলো দেখবে না যদি না আমাদের কথা শোনেন।” সমানে ফড়ফড় করে কথা বললেও মনে মনে উভয় সংকটে পড়ে যাওয়া ফুরি আন্দাজ করে নিল সেনটইনের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। তাহলে লোথারের হাত থেকে সে নিজেও বেঁচে যাবে।

মনোযোগ দিয়ে ফুরির চেহারা দেখলেন সেনটেইন। মনে হচ্ছে লোকটার পিছনে অন্য কেউ আছে। তাই বললেন, “ঠিক আছে। আমি শুনছি। বলো কী বলতে চাও।”

হাতের কাগজ মেলে একের পর এক দাবি পড়ে শোনাল ফুরি। চুপচাপ বসে রইলেন সেনটেইন। কিন্তু তার গলার কাছে তাজা রক্তের আভা দেখে জোনস ঠিকই বুঝতে পারলেন যে তিনি কতটা রেগে গেছেন।

শেষ করে একটা কপি সেনটেইনের দিকে বাড়িয়ে ধরল ফুরি।

“আমার ডেস্কে রেখে দাও। চাকরিচ্যুত সবাইকে তিন মাসের সমপরিমাণের চেয়েও বেশি টাকা আর গুড রেফারেন্স লেটার দেয়া হয়েছে। তুমি নিশ্চয় জানো।” কাগজটাকে স্পর্শও করতে চান না সেনটেইন।

“ওরা আমাদের বন্ধু।” এখনো নিজের জেদ ছাড়ছে না ফুরি।

“ঠিক আছে। এখন তোমরা যাও।” সেনটেইন উঠে দাঁড়াতেই অবরোধ কমিটি পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

“আপনি তো আমাদেরকে কোনো উত্তর জানালেন না?” জানতে চাইল ম্যাক্সিয়ার।

“যখন আমি প্রস্তুত হব তখন।”

তিনজনে দরজার দিকে হাঁটা ধরলেও কী মনে হতেই ঘুরে সেনটেইনের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল ম্যাক্সিয়ার।

“ওরা আমাদের পানি-গ্যাস কেটে দিয়েছে।”

“আমার আদেশে।” বিনা সংকোচে মেনে নিলেন সেনটেইন।

“আপনি জানেন আমরা চাইলে হিরেসহ আপনার সবকিছু নিয়ে নিতে পারি। আপনি থামাতেও পারবেন না।”

“তাহলে তো আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। এসো। স্টোর ভেঙে সব নিয়ে নাও। ডিনামাইট দিয়ে স্ট্রংরুম উড়িয়ে সব হিরে নিয়ে যাও। আমার কিছু যায় আসে না তাতে।”

লোকেরা বেরিয়ে যেতেই জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “ও ঠিকই বলেছে। সবার আগে হিরের কথা মাথায় রাখতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উইন্ডহকে নিয়ে যেতে হবে।”

“তাহলে পুলিশ এসকর্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিই।” জোনসের পরামর্শ শুনে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।

না। পুলিশ আসতে এখনো পাঁচদিন বাকি। কাল ভোরের আগেই হিরেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। ইসুরেন্সে দাঙ্গা-হাঙ্গামা কিংবা গৃহযুদ্ধের কাভার নেই। এইসব বেকুবদের হাতে হিরেগুলো পড়লে আমি শেষ হয়ে যাবো। জোনস।”

“বলুন আপনি কী করতে চান।”

“ডেইমলারকে গ্যারেজে নিয়ে চেক করে তেল ভরে নিন। পেছনের দরজা দিয়ে হিরে লোড করে দেব।” অফিসের গোপন দরজাটা দেখালেন ইঙ্গিতে “মাঝরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে গ্যারাজের বিপরীত দিকের কাঁটা তার কেটে দিবেন।”

“গুড” বুঝতে পেরে খুশি হলেন জোনস।” তাহলে ম্যানিটারি লেইন দিয়ে বের হওয়া যাবে। পিকেটাররা মেইন গেইটে থাকায় কিছু টের পাবে না। সেকেন্ডের মাঝে উইন্ডহকের রোডে উঠে যাওয়া যাবে।”

“আমি একাই এতদূর চলে এসেছি। তাই একা একাই ফিরে যাবো। আপনাকে এখানে প্রয়োজন আছে। নয়ত ওরা অন্য কোনো দুরভিসন্ধি করে খনির ক্ষতি করবে।”

সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলেন জোনস। এই খনি তার গর্ব, একই সাথে কন্যা কিংবা স্ত্রীর মতই সেনটেইনকেও একইরকম ভালোবাসেন। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, এটাই ঠিক হবে।

“ঠিক আছে। আমি অ্যাবিকেও টেলিগ্রাফ পাঠিয়ে দেব যেন এসকর্ট টিম পাঠিয়ে দেয় আপনার জন্যে।”

“আমি বের না হওয়া পর্যন্ত জানাবেন না। হয়ত লাইনে পিকেটাররা আঁড়ি পেতে রেখেছে। এ কারণেই টেলিগ্রাফ লাইন এখনো সচল আছে।”

মাথা নাড়লেন জোনস।

“ঠিক আছে। কখন রওনা দিতে চান?”

“রাত তিনটায়।”

“ভেরি ওয়েল, মিসেস কোর্টনি। আমি বাবুর্চিকে বলে আপনার জন্যে হালকা ডিনার রেডি করাচ্ছি। আর আপনিও একটু রেস্ট নিয়ে নিন। সবকিছু প্রস্তুত করে আড়াইটায় আপনাকে ডেকে দেব।”

***

কাঁধে জোনাসের স্পর্শ পাবার সাথে সাথে উঠে বসলেন সেনটেইন।

“আড়াইটা বাজে। ডেইমলার রেডি আর হিরেও লোড় হয়ে গেছে। কাঁটাতারও কেটে রেখেছি।”

“আমি পনেরো মিনিটের মাঝেই তৈরি হয়ে যাচ্ছি।”

একটু পরেই অন্ধকার গ্যারাজে ডেইমলারের পাশে এসে দাঁড়ালেন দু’জনে।

“কাঁটাতারের মধ্যে চিহ্ন দিয়ে রেখেছি ইশারা দিয়ে দেখাতেই পঞ্চাশ গজ দূরে ছোট সাদা একটা পতাকা উড়তে দেখলেন সেনটেইন।

ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল হিরের বোতল গাড়ির বুটের ভেতরে আর টপ হিরের প্যাকেট আপনার পাশের সিটেই রেখে দিয়েছি।” ছোট্ট কালো সুটকেসটাতে পিতলের তালাও লাগানো আছে।

“গুড। নরম ড্রাইভিং দস্তানা পরে নিলেন সেনটেইন।

“দশ নাম্বার বার্ডশট লোড করে শটগানকেও প্রস্তুত করে দিয়েছি। কেউ থামাতে চাইলেই ফায়ার করবেন। ব্যাটা মরবে না, তবে ঝাঁকুনি খাবে।”

আস্তে করে হেসে হুইলের পেছনে উঠে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে দরজা আটকে দিলেন সেনটেইন।

“এছাড়াও বুটের ভেতরে স্যান্ডউইচ আর কফির ফ্লাক্স আছে।”

সাইড উইন্ডো দিয়ে জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “আপনি না থাকলে আমার যে কী হত।”

“প্লিজ সাবধানে থাকবেন। হিরে তো কিছু না। আমরা আরো মাটি খুঁড়ে বের করতে পারব। কিন্তু আপনি হলেন আপনিই। একক এবং একমাত্র।” নিজের কোমর থেকে সার্ভিস রিভলবারটা নিয়ে ড্রাইভার সিটের পেছনের পকেটে রেখে দিলেন জোনস। “আশা করছি হয়ত এটা ব্যবহারই করতে হবে না। গুড লাক!” পিছিয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট করলেন ডক্টর।

সেনটেইন স্টার্ট দিতেই মৃদু স্বরে নড়ে উঠল ডেইমলারের সাত লিটার ওজনের ইঞ্জিন। নিশানা করে ঘন্টায় চল্লিশ মাইল বেগে কাঁটাতারের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলেন বাইরের মেইন রোডে। তীব্র বেগে গর্জন করে সামনে ছুটল ডেইমলার।

কিন্তু হঠাৎ করেই পেছনের মেইন গেইট থেকে কোনাকুনি দৌড় দিল কয়েকজন পিকেটার। হেড লাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে লোকগুলোর ক্রোধে উন্মত্ত মুখ। শটগান তুলে নিলেন সেনটেইন। এমন সময় ঠিক ডেইমলারের সমান্তরালে পৌঁছে গেল দু’জন পিকেটার।

তাদের পা বরাবর গুলি ছুড়লেন সেনটেইন। কানে তালা লাগানো শব্দের পাশাপাশি ঝলকে উঠল কমলা রঙের শিখা। চমকে উঠে পা দুটো চেপে বসে পড়ল বেচারা দুই খনি শ্রমিক। পাশ দিয়ে হুশ করে পার হয়ে গেল ডেইমলার।

***

“পেটি ফগার জুনো একা রাত তিনটায় মালামাল নিয়ে রওনা দিয়েছেন। এক্ষুণি তাই উনার এসকটের জন্য স্বশস্ত্র বাহিনি পাঠান।”

মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় হাতের প্যাডের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন লোথার ডি লা রে।

একা” আপন মনেই ফিসফিস করে বললেন, “জুনো একা মাল নিয়ে আসছে। ওহ খোদা, একা এতগুলো হিরে নিয়ে আসছে। দ্রুতহাতে হিসাব করে দেখলেন তিনটায় রওনা দিয়েছে তার মানে দুপুরের পর এক ঘণ্টার মধ্যেই এখানে পৌঁছে যাবে।”

ডাগআউট থেকে বেরিয়ে নদীতীরে উঠে এলেন লোথার। চুরুট ধরিয়ে চোখ মেলে তাকালেন আকাশের দিকে। খানিক বাদেই চারপাশে ফুটে উঠল ময়ুররঙা ভোরের আলো।

খানিক বাদে ডাগআউট থেকে বেরিয়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে এলেন হেনড্রিক। তারপর আগুনের ধারে এসেই দেখলেন লোথার চা বসিয়েছেন। আমাদেরকে পরিকল্পনা বদল করতে হবে।” চোখ পিটপিট করে তাকালেন হেনড্রিক। “কেন?”

“ও একাই হীরে নিয়ে আসছে। তার মানে এত সহজে কেড়ে নিতে দিবে না। আর আমি তাকে আহত করতে চাই না।”

“গোল্লায় যাও তুমি। আমি তো কিছুই বুঝতে_”

“তোমাকে এত কিছু বুঝতে হবে না।” খসখসে কণ্ঠে লোথার জানালেন, “আর এটাই একমাত্র কারণ নয়। একজন একাকী নারীর জন্যে একজন পুরুষই যথেষ্ট। ওতো তোমাকে চেনে। তাই তোমার যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি ম্যানির সাথে থাকবে। কাজ শেষ হলেই যেন রওনা দিতে পারি সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে।”

আসলে হেনড্রিককে তিনি যা জানালেন না তা হল, সেনটেইনের সাথে শেষবারের মত একাকী একবার দেখা করতে চান।

***

আচমকা রাস্তার উপর আলগা মাটি আর পাথর দেখে ধুলার মেঘ উড়িয়ে ব্রেক কষলেন সেনটেইন।

“ধুত্তরি।” এই রাস্তা পরিষ্কার করতে কিংবা আরেকটা পথ খুঁজে পেতে খালি খালি দেরি হবে ভাবতেই বাতাসে গালি ছুড়লেন। ডেইমলারকে খানিকটা পিছিয়ে এনে রেখে প্রথমবারের মত আতঙ্ক অনুভব করলেন সেনটেইন।

সামনে আর পিছনে দু’দিকেই ভেঙে পড়েছে রাস্তার কিনারা। উদ্বিগ্ন মুখে চারপাশে তাকাতেই প্রচণ্ড কাশিও পেল।

এরপর ধুলার মেঘ থামতেই দেখা গেল সামনের রোড। একপাশে একটু ব্লক করা হলেও চিকন একটা ফাঁকাও আছে। যদিও ডেইমলারের দেহ সেখান দিয়ে বেরোতে পারবে না। তবে গাড়িতে একটা কোদাল আছে। তাই এত্ত গরমে কয়েক ঘণ্টার পরিশ্রমের কথা ভাবতেই আবার মনে বিতৃষ্ণা এল। কিন্তু দরজার হাতলে হাত রেখেও অজানা এক আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠতেই ঝট করে চোখ ঘুরিয়ে পাশে তাকালেন সেনটেইন।

অনেক উপরের চূড়া থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে এক লোক। পরনের নীল শার্টে ঘামের দাগ। লম্বা-চওড়া মানুষটাকে দেখে সৈন্য কিংবা শিকারি বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু ভয়ংকর কথা হল কোমরের কাছের রাইফেলটা সোজা তার দিকেই তাক করা আর পরনের মুখোশটাও বেশ ভয়ের। লোকটা কী চায় তাও বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।

আর তারপরেই মনে পড়ল যে শটগানটাও রি-লোড করতে ভুলে গেছেন।

এমন সময়ে কথা বলতে লাগল আগন্তুক, ইঞ্জিন বন্ধ করে বাইরে বের হও!”

গাড়ি থেকে বের হলেও মরিয়া হয়ে চারপাশে তাকালেন সেনটেইন। আতঙ্ক ভুলে গিয়ে কী করা যায় তাই ভাবছেন। এক মনে সামনের ফাঁকা জায়গাটা দেখে ঠিক করলেন, “অন্তত বেরুবার চেষ্টা তো করা যায়।” নিচু হয়ে আবার তাই গাড়িতে ঢুকে গেলেন।

“স্টপ!” গর্জে উঠল লোকটা। কিন্তু লো গিয়ারে ডেইমলার চালু করে দিয়েছেন সেনটেইন। লাফিয়ে আগে বাড়ল গাড়ি।

লোকটার চিষ্কারের পাশাপাশি ক্যাবের উপর গুলির সতর্ক বার্তা পেলেও থামলেন না। প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে ছুটতেই একপাশে কাত হয়ে গেল ডেইমলার। সেনটেইন নিজেও থরথর করে কাঁপছেন। কোনোমতে হুইল চেপে ধরে সিটে বসে আছেন।

ডাইভার সিটের পাশের হুইল এসে মাটি পাথরের উপর ধাক্কা খেতেই উইন্ডশিন্ডের গায়ে আছাড় খেলেন সেনটেইন। বুনো পশুর মত ধাড়াম করে ধাক্কা খেল ডেইমলার। তবুও তিনি হুইল ছাড়লেন না।

চামড়ার মোড়ানো সিটের উপর ছিটকে পড়লেন সেনটেইন। টের পেলেন ডেইমলারের পেটের ভেতর যেন বক্সারের ঘুষি খেয়ে সেদিয়ে গেল একগাদা পাথর। কিচকিচ করে উঠল রাবারের টায়ার। এত যুদ্ধ করেও অবশেষে গুলির মত ছিটকে ওপাশে পড়ল ডেইমলার। প্রচণ্ড শব্দে কিছু ভেঙে পড়ার আওয়াজ পেলেন সেনটেইন। বাধা ভেঙে পেরিয়ে আসতে পারলেও আহত হয়েছে গাড়িটা। সাথে নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে। স্টিয়ারিং নেই। থ্রটলও জ্যাম হয়ে গেছে।

তরতর করে নদীবক্ষে নেমে যাচ্ছে ডেইমলার। পাগলের মত চিৎকার করছেন সেনটেইন। ইগলিশন সুইচের জন্য হাত বাড়ালেও কাত হয়ে পড়ে গেলেন পাশের হিরের স্ক্যাটকেসের ওপর। সমানে দুলতে দুলতে এগোচ্ছে গাড়ি। পাজরে গুঁতো খেয়ে আবার দড়াম করে বিপরীত দিকে ছিটকে পড়লেন।

রাস্তার কিনার দিয়ে শুকনো নদীবক্ষে আছড়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে গড়িয়ে পড়লেন সেনটেইন। বলের মত ডাবল হয়ে নরম সাদা মাটিতে অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু বুনো জানোয়ারের মত গর্জন করতে করতে গিয়ে দূরের নদীবক্ষে পড়ে গেল ডেইমলার। মাটিতে ডুবে গেল নাক। আকাশের উপর চাকা তুলে উপুড় হয়ে গেল বিশাল গাড়ি। বনেট ভেঙে বেরিয়ে আসা তেলে ভিজে গেল বালি।

দাঁড়িয়েই দৌড়াতে লাগলেন সেনটেইন। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে গেল বালিতে। আতঙ্কে যেন সময়ের গতিও থেমে গেছে। মনে হচ্ছে কোনো এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছেন।

পেছনে তাকাবার সাহসও হচ্ছে না। ভয়ংকর মুখোশ পরিহিত লোকটা নিশ্চয়ই কাছে কোথাও আছে। যেকোনো মুহূর্তেই হয়ত এসে তার ঘাড় চেপে ধরবে কিংবা গুলি করবে। তারপরেও দৌড়ে ঠিক ডেইমলারের কাছে পৌঁছে গেছেন। হাঁটু গেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেলেন ড্রাইভারের সিটের পাশে। শটগান তুলে নিয়েই গ্লাভ কম্পার্টমেন্ট খুলে শেলগুলো বের কর নিলেন। কিন্তু হাত দুটো এত কাঁপছে যে হাঁটুর কাছে বালির ওপর ছড়িয়ে পড়ল সবগুলো বুলেট।

কোনোমতে বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে ফাঁকা ব্যবহৃত কার্টিজগুলো ফেলে দিলেও হঠাৎ করেই অস্ত্রটা কে যেন ছিনিয়ে নিয়ে নিল।

এসে গেছে তার আতঙ্ক। লোকটা বোধ হয় চিতা বাঘের মতই দৌড়াতে পারে। নয়ত এত দ্রুত কেমন করে চূড়া থেকে নেমে এল। খালি শটগান ছুঁড়ে ফেলে দিল লোকটা। পঞ্চাশ ফুট দূরে পড়লেও সে নিজেও খানিকটা ভারসাম্য হারিয়ে টলে উঠল। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন সেনটেইন। হাঁটু দুটো ভাঁজ করে সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার বুকের উপর আঘাত করলেন।

অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণে দুজনেই একসাথে বালির ওপর আছাড় খেলেন, কিন্তু সেনটেইনই আগে নড়ে উঠলেন।

পিস্তল! মনে হতেই হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠে ডেইমলারের মাঝখানের দরজার হ্যাঁন্ডেল ধরলেন সেনটেইন। কিন্তু দরজা আটকে গেছে। তাড়াতাড়ি ড্রাইভার সিটের পেছন দিয়ে হাত ঢুকাতে চাইলেন। কিন্তু টের পেলেন কাঁধের মাংসের ভেতরে ঢুকে গেলো হাড়সর্বস্ব কতগুলো আঙুল। সাড়াশির মত ধার টেনে-হিঁচড়ে গাড়ির কাছ থেকে তাকে সরিয়ে আনল লোকটা। চট করে মাথা ঘোরাতেই ময়দার বস্তার মুখোশের মধ্যের ফুটোয় দেখা গেল একজোড়া মানুষের চোখ। সাথে সাথে সেদিক লক্ষ্য করে নখ ঢুকিয়ে দিলেন সেনটেইন।

লোকটা ঝাঁকি দিয়ে মাথা সরিয়ে নিলেও তার বুড়ো আঙুল আটকে যাওয়ায় চিবুক পর্যন্ত ছিঁড়ে গেল মুখোশ। লোকটা সেনটেইনের কব্জি ধরে ফেলল আর তৎক্ষণাৎ সরে যাওয়ার পরিবর্তে ডান হাঁটু দিয়ে অন্তকোষ লক্ষ্য কর প্রচণ্ড এক লাথি কষালেন সেনটেইন। ব্যথায় মোচড় খেলেও উরু দিয়ে তার হাঁটুতে শুতে দিল লোকটা।

কুঁকড়ে উঠলেও মাথা নিচু করে লোকটার কব্জি কামড়ে ধরলেন সেনটেইন। একই সাথে শরীরের নিম্নাঙ্গে সমানে কিল, ঘুষি চালাচ্ছেন। যদিও লাথির বেশিরভাগই লাগল লোকটার ইস্পাত কঠিন মাংসে কিংবা হাড়ে।

সেনটেইনকে নিয়ন্ত্রণ করার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে লোকটা। বোঝ গেল যে এরকম বুনো আক্রমণের কল্পনাও করেননি। একই সাথে কব্জিতেও নিশ্চয় ব্যথা পাচ্ছে। সেনটেইনের মুখ ভরে গেল উষ্ণ আর নোনা রক্তে।

এবারের খালি হাত দিয়ে সেনটেইনের ঘন কোঁকড়া চুলের গোছা মুঠো করে ধরে পিছন দিকে হ্যাঁচকা টান দিল লোকটা। যে কোনো মুহূর্তে হয়ত মাথায় গুলি চালাতেও পারে। চোখ বন্ধ করে ফেললেন সেনটেইন। কিন্তু মনে হচ্ছে লোকটার সে ধরনের কোনো আঘাত করার প্ল্যানই নেই।

হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন যে মুখের ভেতরে কামড়ে রাখা কব্জির শিরা ছিঁড়ে ফেলছেন। কামড় একটুও আলগা না করে মুখের কোনা বেয়ে ফেলতে লাগলেন ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত। এতক্ষণে ব্যথায় মুষড়ে উঠল লোকটা। সেনটেইনের চোয়াল খামছে ধরায় জ্বলে উঠল চোখ।

তবে এবারও লোকটাকে অবাক করে দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলেন ডেইমলারের দিকে। ..

এবারে সোজা ড্রাইভারের সিটের পেছনের পকেটে হাত ঢুকাতেই রিভলবারের হাতল পেলেন। কিন্তু ঘামে হাত তেলতেলে হয়ে কাঁপতে থাকায় আর কিছুতেই শক্ত করে ধরতে পারলেন না। এই ফাঁকে পেছনে চলে এল লোকটা। চুলের মুঠি ধরে পেছন দিকে টেনে রাখলেন। হাত থেকে স্বশব্দে ক্যাবের ভেতরে পড়ে গেল ভারি পিস্তল।

আবার লোকটার দিকে ঘুরেই রক্ত লাল দাঁত দিয়ে মুখোশটা কামড়ে ধরলেন সেনটেইন। ছেঁড়া মুখোশটা স্থানচ্যুত হয়ে খানিকক্ষণের জন্যে লোকটাকে অন্ধ করে দিল। আবারো দুজনে একসাথে জড়াজড়ি করে পড়ে গেলেন নিচে। আঁচড়ে কামড়ে যুদ্ধরত সেনটেইন। হঠাৎ করেই একেবারে শান্ত হয়ে হাঁ হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকালেন।

মুখোশের একটা অংশ পুরোপুরি খসে পড়ায় লোকটার চোখ দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

“লোথার।”

নিজের নাম শুনে লোকটাও চমকে উঠল। তবে খানিক বাদেই ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পুরো মুখোশ খুলে ফেললেন লোথার। তাড়াতাড়ি সেটা দিয়েই নিজের কব্জি পেঁচিয়ে নিলেন। আঘাতটা সত্যিই গুরুতর।

উঠে বসে লোথারের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। ফিসফিস করে জানতে চাইলেন,

“কেন এরকম করছো?”

“তুমি জানো কেন।” দাঁত দিয়ে কব্জির বাঁধনে গিট দিলেন লোথার আর একই ফাঁকে পড়িমড়ি করে ক্যাবের দিকে ছুট লাগালেন সেনটেইন। কিন্তু পিস্তল ধরার আগেই পেছন থেকে থেকে তাকে বালির উপর ফেলে দিলেন লোথার।

তারপর তিনি নিজে পিস্তলটাকে তুলে খুলে ফেললেন ছুরি। উপরের বাহুতে খোঁচা দিয়ে রক্ত পড়া সাময়িকভাবে বন্ধ করলেন।

“ওগুলো কোথায়? নিচে পড়ে থাকা সেনটেইনের উদ্দেশে বলে উঠলেন লোথার।

“কি নিয়ে কথা বলছো?”

উপুড় হয়ে ডেইমলারের ক্যাবের ভিতর থেকে কালো বাক্সটা বের করে আনলেন লোথার। জানতে চাইলেন “চাবি?”

ঘাড় তেড়া করে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। এবার আর কিছু জিজ্ঞেস না করে বাক্সটাকে বালির উপর রেখে খানিকটা পিছিয়ে এলেন লোথার। পিস্তলের সিঙ্গেল একটা গুলিতে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল বাক্সের তালা। ঢাকনার কালো রঙ উঠে বেরিয়ে পড়ল চকচকে ধাতু।

পিস্তলটাকে পকেটে পুরে ঢাকনা তুলে ফেললেন লোথার। ভেতরে বাদামি কাগজে মোড়া বেশ কয়েকটা ছোট ছোট প্যাকেট থরেথরে সুন্দর করে সাজানো আছে। মুখ আবার লাল মোম দিয়ে আটকানো একটা প্যাকেট হাতে তুলে নিতেই চোখে পড়ল জোনসের হাতের লেখা :

১৫৬ পিস, সর্বমোট ৩৮২ ক্যারট।

“আমি জানতাম যে তুমি একজন খুনী, কিন্তু এরকম ছিঁচকে চুরিও করো তা তো বুঝতে পারিনি।” বলে উঠলেন সেনটেইন।

“তুমি আমার নৌকা আর কোম্পানি চুরি করেছে। তাই চৌর্যবৃত্তি নিয়ে কথা না বলাই ভালো।” বাক্সটাকে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন লোথার। ঘুরে গিয়ে তারপর ডেইমলারের বুট চেক করে দেখলেন।

“গুড, বুদ্ধি করে সাথে বাড়তি পানি এনেছে। এই বিশ গ্যালন দিয়ে এক সপ্তাহ কাটতে পারবে। তার আগেই অবশ্য আব্রাহামের লোক চলে আসবে।”

“শুয়োর কোথাকার।” রাগে কাঁপছেন সেনটেইন।

“তবে যাবার আগে টেলিগ্রাফের তার কেটে দিয়ে যাবো।”

“ওহ গড, লোথার।”

“গাড়িটার আশপাশেই থাকো। মরুভূমির প্রথম আইনই হল এটা। তাই। যত্রতত্র ঘুরে মরো না। দুই দিনের ভেতরে ওরা তোমাকে পেয়ে যাবে। বছরের পর বছর ধরে তোমার ছেলেকে আমি বড় করছি। অথচ তুমি ফিরে এসে আমার সমস্ত কিছু তছনছ করে দিলে।” বালি থেকে শটগানটাকে তুলে নিয়ে বড় একটা পাথরের উপর আছড়ে ভেঙে ফেললেন লোথার। তারপর নিজের মসার কাঁধে ঝুলিয়ে অন্য হাতে সুটকেসটাকে নিয়ে নিলেন। ব্যথায় টিনটন করছে আহত হাত।

“আমি কিন্তু তোমাকে আঘাত করতে চাইনি আর কখনো তোমার সামনে আসব না সেনটেইন, গুড বাই।”

“আমাদের আবার দেখা হবে।” লোথারের কথায় বাধা দিলেন সেনটেইন। “তুমি আমাকে ভালোভাবেই চেন। তাই নিশ্চয় বুঝতে পারছে যে তোমার আজকের কাজের হিসাব পুরো না করা পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।

মাথা নাড়লেন লোথার, “আমি জানি।” তারপর ঘুরে অন্যদিকে হাঁটা শুরু করলেন।

“লোথার!” খানিকটা নরম হল সেনটেইনের গলা, “চলো একটা সমঝোতায় আসা যাক। আমার হিরের বিনিময়ে তোমার কোম্পানি আর নৌকাগুলোর দেনা মাফ করে দিচ্ছি।”

“উঁহু, হু।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হাসলেন লোথার, “এখন আর সেগুলোর কোন কার্যক্ষমতা নেই, কিন্তু তোমার হিরে–

“সাথে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড আর আমি প্রমিজ করছি যে এ ব্যাপারে পুলিশকে কিছু জানাব না।” নিজের কণ্ঠস্বরে মরিয়া ভাব লুকাতে চাইলেন সেনটেইন।

“শেষবার আমি এমনভাবে অনুনয় করেছিলাম, মনে আছে? আর কোনো দর কষাকষি নয় সেনটেইন। আমি চললাম।”

“অর্ধেক লোথার, অর্ধেক হীরে অনন্ত রেখে যাও।”

“কেন?”

“একদা আমাদের মাঝে যে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল তার খাতিরে?”

তিক্ত কণ্ঠে হাসলেন লোথার “এর থেকে ভালো আর কিছু মাথায় এল?”

“অল রাইট। তাহলে শোনো, আমার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। আর যদি তুমি এখন এগুলো নিয়ে যাও তাহলে আমি সর্বনাশ হয়ে যাবো।”

“তুমি আমার নৌকাগুলো কেড়ে নেবার পর যেমন আমি হয়েছিলাম।”

বালির উপর দিয়ে থপথপ করে হাঁটা শুরু করলেন লোথার। উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন,

“লোথার ডি লা রে! তুমি আমার প্রস্তাব পায়ে ঠেলেছে। তাহলে আমার শপথও মনে রেখো, তোমাকে ফাঁসির দড়িতে না ঝোলানো পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেব না।”

একবারও পেছনে তাকালেন না লোথার। কেবল মাথা নাড়লেন।

লোখারের শরীর চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যেতেই বালির ওপর ধপ করে বসে পড়লেন সেনটেইন। টের পেলেন যে তাঁর কাঁপুনি কিছুতেই থামছে না। কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ঠোঁট আর চিবুক থেকে মুছে গেল শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।

তবে মুখে নোনা স্বাদ পেতেই অনুভব করলেন ফিরে এল মনোভাব আর দেহের শক্তি। বহু কষ্টে উঠে ডেইমলারের কাছে গেলেন। কাকতালীয়ভাবে হলেও পানি এখনো জায়গামতই আছে। তাই মুছে ফেলতে পারলেন রক্ত আর চোখের জল।

তারপর উল্টানো ডেইমলারের বুটের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে বালি সরিয়ে খুলে ফেললেন ডালা। দুটো বিশ গ্যালন পানির ক্যান আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিরের বোতল নিয়ে কিনারের দিকে বালুর মাঝে গর্ত করে লুকিয়ে ফেললেন যাতে পানি ঠাণ্ডা রাখা যায়। তারপর আবার ডেইমলারের কাছে এসে অধৈর্যভাবে খুঁজতে লাগলেন বাকি সারভাইভাল প্যাক। হঠাৎ করেই মনে হল হায় হায় টেলিগ্রাফ ট্যাপ বুঝি ফেলে এসেছেন। কিন্তু না টুল বাক্সে ঠিক পাওয়া গেল।

তারের বোঝা আর ট্যাপ ভর্তি হ্যাঁঙারসাক নিয়ে লোথারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পিছু নিলেন সেনটেইন। খানিক বাদেই লোথারের ঘোড়ার খুঁড়ের চিহ্নও পেয়ে গেলেন। দাগ দেখে এগোতেই দুইশ গজ দূরের টেলিগ্রাফ তার ছেঁড়ার জায়গাটা নজরে পড়ল। লাইন যেখানে নদী পার হয়ে গেছে সেখানে পৌঁছাতেই অনেক নিচে লোথারদের ক্যাম্পের অবশিষ্টাংশ চোখে পড়ল। তাড়াহুড়া করে বালি ছিটিয়ে আগুন নেভানো হলেও লাকড়ি এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।

তারের বান্ডিল আর হ্যাঙারসাক রেখে কিনার বেয়ে নিচে নেমে এলেন সেনটেইন। ডাগআউটে পৌঁছেই তিনটা ম্যাট্রেস দেখে বুঝতে পারলেন তারা বেশ কয়েকদিন যাবৎ এখানে থেকেছেন।

এখনো ম্যানফ্রেডকে নিজের ছেলে বলে ভাবতে পারেন না সেনটেইন। ধারণা করলেন সে ছাড়াও সোয়ার্টও সাথে ছিল।

ডাগআউট থেকে বেরিয়েও খানিক দাঁড়িয়ে রইলেন। বুঝতে পারছেন না কী করবেন। যাই হোক পূর্বদিকে কালাহারি। লোথাররা নিশ্চয় সেদিকে যাবেন না।

“তার মানে উইন্ডহকে ফিরবে।” অনুমান করেই পরবর্তী কর্তব্য ঠিক করে ফেললেন। এক্ষেত্রে কাজে লেগে গেল তার বুশম্যান ট্রেনিং।

“ওরা তাহলে দক্ষিণে গেছে।” এবার ক্যাম্পের দক্ষিণাংশ ঘুরে এসেও গতকালকের খুড়ের দাগ ছাড়া নতুন কোনো চিহ্ন না পেয়ে অবাক হয়ে গেলেন।

“তাহলে কি উত্তরে? এদিকে তো ওকাভাঙ্গো নদী আর পর্তুগীজদের অঞ্চল।” যাই হোক কী মনে করে উত্তরে খুঁজতেই সাথে সাথে পেয়ে গেলেন তরতাজা খুড়ের দাগ।

“তিনজন ঘোড়সওয়ার সবার সাথে একটা করে বাড়তি ঘোড়া। এক ঘণ্টাও হয়নি রওনা দিয়েছে। লোথার হয় পাগল নয়ত মাথায় অন্য কোনো প্ল্যান আছে।” মাইলখানেক দাগগুলোকে অনুসরণ করে এগিয়েই বুঝতে পারলেন তার ধারণা কতটা সত্যি।

“লোকটা বদ্ধ পাগল। অ্যাংগোলা সীমানার দিকে গেছে। এখানেই তার পুরনো আস্তানাও আছে যখন আইভরি চোরাচালান করত। তাই সীমান্ত পার হবার আগেই ওকে ধরতে হবে।”

পরমুহূর্তেই মনে হল, “তার মানে কতটা সাবধানে সবকিছু পরিকল্পনা করেছে। আমরা পারব তাকে ধরতে?”

আবার নিজেই নিজেকে সাহস দিলেন, “টিকে থাকতে হলে আমাকে পারতেই হবে।”

এস্তপায়ে আবারো পরিত্যক্ত ক্যাম্পে ফিরে এলেন সেনটেইন।

মাটি থেকে ছেঁড়া টেলিগ্রাফের তার কুড়িয়ে নিজের ভালো তার পেঁচিয়ে ঠিক করে ফেললেন। তারপর নিজের ট্যাপ সার্কিটে বসিয়ে টার্মিনালের সাথে শ্রু দিয়ে ড্রাই সেল ব্যাটারি লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যে মনে হল একটাও মোর্স কোড স্মরণ নেই। পরক্ষণেই অবশ্য সব আবার মনে পড়ে গেল। পিতলের চাবির উপরে দ্রুত তালে পড়তে লাগল হাতুড়ির বাড়ি।

“জুনো বলছি। শুনছো?”

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড বাদেই বিপ বিপ করে উঠল হেড ফোন, “বলুন”

সংক্ষিপ্ত কয়েকটা শব্দে জোনসকে ডাকাতি আর নিজের অবস্থান জানিয়ে বললেন,

“অবরোধকারীদের সাথে আলোচনা করে সমঝোতা করে নিন। কারণ হিরে উদ্ধার করা প্রথম জরুরি কাজ। তারপর ট্রাক নিয়ে উত্তরে ওচি প্যানে চলে যান আর মনগঙ্গো জঙ্গলে বুশম্যানদের বসতি খুঁজে বুশলিডার কিউয়িকে বলুন “নাম চাইল্ড কালেয়া।” কিউয়িকে আপনার সাথে নিয়ে আসবেন।” বুশম্যানদের ভাষায় কালেয়া মানে হল “সাহায্য প্রার্থনা।” যা কোনো গোত্রের সদস্যই অবহেলা করতে পারে না।

মেসেজ পাঠানো শেষ করে হলুদ সিষ্কের স্কার্ফ দিয়ে মুখমণ্ডলের ঘাম মুছে ফেললেন সেনটেইন। এরপর আঙুলগুলোকে খানিক ব্যায়াম করে নরম বানিয়ে আবারো কী বোর্ড নিয়ে উইন্ডহকে মেসেজ পাঠাতে বসলেন।

অপারেটর একটু আগে জোনসের কাছে পাঠানো বার্তা পেয়েছে নিশ্চিত হয়ে বললেন,

“আগের মেসেজসহ এখন যা বলব সবকিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেটর কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমসকে জানাবে। ডাকাতকে ধরা আর চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে উনার সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। এছাড়াও গত তিন মাসে খুব বড়সড় কোনো ঘোড়া চুরির ঘটনায় লোথার ডি লা রের বিরুদ্ধে রিপোর্ট পেয়েছে কিনা তাও জানাও।”

অপারেটর সেনটেইনের বার্তা লিখে নিয়ে পাল্টা জানাল,

“পেটিফগার জুনোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তিত। উইন্ডহক থেকে ভোর পাঁচটায় সশস্ত্র পাহারাদার বাহিনি রওনা দিয়েছে। তাই সেখানে জুনো ম্যালমসের জন্য অপেক্ষা করলে ভালো হয়।”

কাজ সেরে অপেক্ষা করার সময় পরবর্তী করণীয় নিয়ে ভাবতে লাগলেন সেনটেইন।

কয়েকটা ব্যাপার পুরোপুরি পরিষ্কার। যেমন সোজা পথে লোথারকে ধরা যাবে না। তার মানে ঘোড়া চাই। ট্রাক নিয়ে কোনো কাজ হবে না। এসব এলাকাতে চষে বেড়ানোর ফলে লোথার এ অঞ্চল যতটা ভালোভাবে জানে কোনো শ্বেতাঙ্গ তা পারবে না। তবে হ্যাঁ বুশম্যান কিউয়ির কথা আলাদা।

চোখ বুজে উত্তরাঞ্চলের মানচিত্র কল্পনা করার চেষ্টা করলেন সেনটইন। বিশাল এই নিষিদ্ধ মরুভূমিকেই বলা হয় বুশম্যানল্যান্ড।

যেহেতু সাথে ঘোড়া আছে লোথার পানির কাছে অবশ্যই যাবে আর পনের বছর আগে তাকে দত্তক নেয়া দাদাজানের কাছে এরকম দুটো জায়গার কথা শুনলেও সে স্মৃতি অনেকটাই ভুলে গেছেন সেনটেইন।

হঠাত করেই টেলিগ্রাফের বিপ বিপ শব্দে ছিঁড়ে গেল চিন্তার সুতো। আগ্রহ নিয়ে পড়ে দেখলেন :

ম্যালকমস জানিয়েছেন গত মাসে ওকাহান্ডার মিলিটারি ক্যাম্প থেকে ছাব্বিশটা ঘোড়া চুরি গেছে। আর কি প্রয়োজন তাও জানতে চেয়েছেন ম্যালকমস।

“দেখেছ, আমার ধারণাই ঠিক। লোথার পুরো মরুভূমিতেই পোস্ট বসিয়েছে।” আপন মনে উত্তরাঞ্চলের মানচিত্র স্মরণ করে দূরত্ব মেপে আবার বার্তা পাঠালেন সেনটেইন।

“ডাকাতের দল সোজা ওকাভাঙ্গো নদীমুখে যাচ্ছে। বাড়তি ঘোড়াসহ মরুভূমির বিষয়ে দক্ষ এমন ভ্রাম্যমাণ বাহিনি পাঠিয়ে দিন। কালক্রান্ড মিশন স্টেশনে বুশম্যান নিয়ে আমিও যাচ্ছি।”

***

উইন্ডহকের বাহিনির আগে জোনসই সেনটেইনের কাছে পৌঁছে গেলেন। কোম্পানির ট্রাককে এগিয়ে আসতে দেখেই মাথার উপর দু’হাত তুলে ইশারা দিতে দিতে দৌড়ে গেলেন সেনটেইন।

লাফ দিয়ে নেমেই লম্বা লম্বা পায়ে দৌড়ে এলেন জোনস। সাথে সাথে সেনটেইনকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বললেন,

“থ্যাঙ্ক গড, আপনি সুস্থ আছেন।”

কিন্তু কী করছেন বুঝতে পেরেই তাড়াতাড়ি সেনটেইনকে ছেড়েও দিলেন। বোঝা গেল বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।

“কিউয়িকে পেয়েছেন?” জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“ওই তো ট্রাকে আছে।”

দৌড় দিয়ে ট্রাকের কাছে গেলেন সেনটেইন। কিউয়ি আর তার ভাই মোটা কিউয়ি ভয়ে জড়োসডো হয়ে বসে আছে। তাদের জন্যে এ অভিজ্ঞতা পুরোপুরি নতুন।

সেনটেইনকে দেখেই তাই আনন্দে কিচির-মিচির করতে করতে নাম চাইল্ড” বলে এগিয়ে এল।

“ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমাদের সাথেই আছি। আর এরা সকলেই ভালো লোক। ভেবে দেখ তো ফিরে গেলে পুরো কালাহারির মধ্যে তোমরা কত গল্প করবে। একেবারে বিখ্যাত হয়ে যাবে।” ছোট্ট শিশুর মত জড়িয়ে ধরে দুই ভাইকে আশ্বস্ত করলেন সেনটেইন।

“এখন আমরা কিছু দুষ্ট লোককে খুঁজে বের করব যারা আমার অনেক বড় ক্ষতি করেছে। তোমরা তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে আমাকে নিয়ে যাবে। তারপর তোমাদেরকে এত উপহার দেব যা কেবল এতদিন স্বপ্নেই দেখেছ। আর এরপর তোমাদের দুভাইয়ের গুনগান করবে সকলে, তাহলে এখন তাড়াতাড়ি চলো সেই শয়তানগুলোকে খুঁজে বের করি।”

জোনসের কাছে ফিরে এলেন সেনটেইন।

“ডি লা রে ইন্ডাস্ট্রিট্রিয়ালগুলো রেখে গেছে। আমি সেগুলোকে নদীর তীরে পুঁতে রেখেছি।” কিন্তু জোনসের সাথে বাকি দুজনকে দেখে তো তার চোখ বিস্ময়ে থ বনে গেল। গারহার্ড ফুরি আর ম্যাক্লিয়ার।

“আপনাকে সুস্থ দেখে আমরা সবাই সত্যি খুশি হয়েছি মিসেস কোর্টনি।” লাজুক গলায় জানাল ম্যাকক্লিয়ার। “যা করার দরকার আমরা সব করব। একসাথে”।

“ধন্যবাদ ম্যাক্লিয়ার, কারণ হিরে নেই মানে বেতনও নেই। এখন আমরা সবাই মিলে কালক্লান্ডে যাবো। ফুয়েল আছে তো ফুরি?

“সকালের ভেতরেই সেখানে পৌঁছে দেব, মিসেস কোর্টনি।” প্রমিজ করল ড্রাইভার।

ফুরি তাদেরকে যে পথ দিয়ে কালক্রান্ড নিয়ে এল তা তাদেরকে লোথারের প্রায় ৮০ মাইল কাছাকাছি নিয়ে এল। তবে এমনট হতে পারে যে সেনটেইনের অনুমান ভুল। যদিও এরকম সম্ভাবনার কথা তিনি মাথায়ও আনতে চাইছেন না।

“মনে হচ্ছে গত কয়েক ঘণ্টায় এখান দিয়ে আরো কয়েকটা ট্রাক গেছে। আপনার কী মনে হয় ম্যালকমদের পাঠানো পুলিশ বাহিনি? উইডস্ক্রিনের ফাঁক দিয়ে রাস্তায় তাকিয়ে জোনসের কাছে জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“হলে তো ভালোই হত। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সাপ্লাই কনভয়। হয়ত মিশন স্টেশনে ঘোড়া আর পুলিশের জন্য আমাদেরকেও অপেক্ষা করতে হবে।”

খানিক বাদেই সামনে দেখা গেল মিশন স্টেশনের ছাদ। তারপর আরো একটু সামনে এগোতেই উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন, “লুক! গির্জার পাশেই ট্রাক” উইন্ডমিলের কাছে ঘোড়া। আরে দেখুন উর্দি পরা সৈন্য। কর্নেল ম্যালকমস তার প্রমিজ রেখেছেন।”

বালিরঙা পুলিশ ট্রাকের পাশেই থামল ফুরি। সাথে সাথে নেমে দৌড় দিলেন সেনটেইন। ছোট্ট চার্চের পাশের দালানের বারান্দায় বেরিয়ে এল লম্বা চওড়া এক দেহ। হালকা পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এগিয়ে এল তার দিকে। অস্ফুট কণ্ঠে সেনটেইন জানালেন, “কর্নেল ম্যালকমস’ আমি আশা করিনি যে আপনি নিজে এখানে আসবেন।”

“আপনি সম্পূর্ণ সহযোগিতা চেয়েছেন মিসেস কোর্টনি হাত বাড়িয়ে দিলেন ম্যালকমস। পরস্পরের হাত বেয়ে সাথে সাথে যেন প্রবাহিত হল নীল বিদ্যুৎতরঙ্গ।

“আপনি নিশ্চয় মরুভূমিতে যাচ্ছেন না?” জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“আমি না গেলে আপনিও যাচ্ছেন না কিন্তু।” হেসে ফেললেন ম্যালকমস, প্রধানমন্ত্রী জেনারেল হার্টজাগ আর বিরোধী নেতা জেনারেল মুট দু’জনেই আমাকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যেন আপনাকে চোখের আড়াল না করি। “কিন্তু আমাকে তো যেতেই হবে। নয়ত বুশম্যান দু’জনকে কেউ সামলাতে পারবে না। আর ওরা ছাড়া ডাকাতেরা উধাও হয়ে গেলেও কিছু করার থাকবে না।”

বুঝতে পেরে মাথা নাড়লেন ম্যালকমস, “তাহলে আমাদের দুজনকেই যেতে হবে। এরপর হঠাৎ করেই স্কুল পড়ুয়া দুষ্টু ছেলের মত হাসি দিয়ে বললেন, “আমি ছাড়া আপনার আর কোন গতি নেই।”

একমুহূর্তের জন্য লোথার, হিরে, ম্যালকমসের স্ত্রী- সবার কথা ভুলে গেলেন সেনটেইন। কেবল মনে হল এই সুযোগ। তারা দুজন একাকী সময় পাচ্ছেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে জানতে চাইলেন,

“আমরা কখন রওনা দিচ্ছি?”

তাড়াতাড়ি পিছু ফিরে হাঁক দিলেন ম্যালকমস, “সবাই যার যার ঘোড়ায় চড়ে বসো। আমরা এক্ষুণি রওনা দিচ্ছি।”

আর সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “আপনার মনোভাবটা এবার খুলে বলুন। আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

হেসে ফেললেন সেনটেইন, “আপনার কাছে কোন ম্যাপ আছে?”

“এদিকে আসুন।” সেনটেইনকে মিশন অফিসে নিয়ে দু’জন ডমিনিকান ফাদারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ম্যালকমস। তারপর ডেস্কের ওপর বিছিয়ে বসলেন নিজের লার্জ স্কেল ম্যাপ।

“এখানে ডাকাতি হয়েছে” আঙুল দিয়ে মানচিত্রে লোথারের ক্যাম্প দেখালেন সেনটেইন “তারপর ওরা এই দিকে গেছে। পর্তুগিজের উদ্দেশে। কিন্তু তাহলে তো তিনশ’ মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে।”

“তাহলে আপনি পূর্বদিকে এগিয়ে পথিমধ্যে ওদেরকে আটকাতে চান। এটা তো খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মত হয়ে যাবে।”

“পানি। নিশ্চয়ই বাড়তি ঘোড়াগুলোকে পানির কাছে ছেড়ে যাবে, আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।”

“কিন্তু এরকম কোনো জায়গা তো দেখছি না?”

“মানচিত্রে না থাকলেও সে ঠিকই জানে কোথায় পাওয়া যাবে। আমার বুশম্যান দু’জনও বলতে পারবে।”

মানচিত্র ভাঁজ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন ব্লেইন। “আপনার সত্যি মনে হচ্ছে এরকমটা সম্ভব?”

“আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে সে এই মরুভূমিতেই সারা জীবন চড়ে বেরিয়েছে। তাই ওকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।”

“লোকটার রেকর্ড চেক করে দেখেছি আমি।” ম্যাপটাকে লেদার কেসে ভরে মাথায় খাকি রঙের শোলার হেলমেট পরে নিলেন ব্লেইন। উচ্চতা যেন আরো বেড়ে গেল তাতে। “বিপজ্জনক লোকটার মাথার দাম একবার দশ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত উঠিয়েছিল পুলিশ।”

দরজায় দেখা দিলেন এক সার্জেন্ট, “সব প্রস্তুত কর্নেল।”

“মিসেস কোর্টনির ঘোড়ায় লাগাম পরানো হয়েছে?”

“ইয়েস স্যার।” বাদামিরঙা পেশিবহুল লোকটাকে দেখে সেনটেইনও খুশি হলেন।

“উনি সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার” সেনটেইনকে স্যালুট করলেন সার্জেন্ট।

তারপর দ্রুত ফাদারদের সাথে করদর্শন করে বাইরে চলে এল সবাই।

জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “আপনার সাথে যেতে পারলে খুশিই হতাম মিসেস কোর্টনি। কিন্তু আজ থেকে বিশ বছর আগে হলে এটা কোনো ব্যাপারই ছিল না।”

সদয় ভঙ্গিতে হাসলেন সেনটেইন, “আমাদের জন্য শুভ কামনা করবেন সেটাই যথেষ্ট।”

নিজের ঘোড়ায় চেপে ব্লেইনের পাশে চলে এলেন সেনটেইন। তারপর বুশম্যান ভাইদেরকে ডেকে বললেন, “আমাদেরকে পানির কাছে নিয়ে চলো কিউয়ি।”

জন্মসূত্রে দৌড়াতে ওস্তাদ বুশম্যান ভাইদের পিছু নেয়ার জন্য দৌড়াতে লাগল সেনটেইনদের ঘোড়ার পাল।

পরস্পরের পাশাপাশি নীরবে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন সেনটেইন আর ব্লেইন। পেছনে সার্জেন্ট আর চার সেনা সদস্য। চোখের কোনা দিয়ে অবশ্য ম্যালকমসকে ঠিকই খেয়াল রেখেছেন সেনটেইন। বুঝতে পেরেছেন কেন পোলো প্লেয়ার হিসেবে এত বিখ্যাত কর্নেল সাহেব!

নরম পাথুরে স্তর পার হয়ে প্রথমবারের মত কথা বল “আপনার কথাই ঠিক। এ পথে ট্রাক নিয়ে আসা যেত না।”

সামনে বুশম্যান ভ্রাতৃদ্বয় একবারও না থেমে সোজা দৌড়ে চলেছে। নিশ্চিতভাবে চেনে তাদের গন্তব্য। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় অবশ্য যাত্রা থামিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে নিজের লোকদের খবর নিচ্ছেন ব্লেইন। পাঁচ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার শুরু হচ্ছে যাত্রা।

পুরোপুরি অন্ধকার নামার পর সবাইকে আমার নির্দেশ দিলেন কর্নেল। পানি আর ঘোড়াগুলোর তদারক করে তারপর এলেন অগ্নিকুণ্ডের কাছে। এখানেই বসে আছেন সেনটেইন। বুশম্যানদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজের আর ক্লেইনের জন্য খাবার বানিয়েছেন।

“ম্যান থেকে ক্যাঙিয়ার বাদ দিতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত স্যার। বিফ স্টু দিয়েই কাজ সারতে হবে।”

পেট ভরে তাই খেলেন কর্নেল। তারপর আগুনের লাকড়ি থেকে চুরুটও ধরালেন। মুগ্ধ কণ্ঠে সেনটেইনকে জানালেন “এভাবে খেতে পারাটা আসলেই উপাদেয়।”

ঘোড়ার জিনের কাপড় এনে বসলেন ব্লেইন। সকালের জন্য প্যাকিং শেষ করে এলেন সেনটেইন। তারপর খানিক দ্বিধা করলেও অবশেষে এসে কর্নেলের পাশেই বসে পড়লেন। দুজনের মাঝে মাত্র ইঞ্চিখানেকের ফাঁক।

***

পরদিন সকালবেলা। ভোরের আলো ফোঁটারও বহু আগেই বেরিয়ে পড়েছে পুরো দল। পথ দেখাচ্ছে বুশম্যান দুই ভাই। একটু পরেই সূর্য উপরে উঠে পড়ায় গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ল। এমনকি ঘোড়ার পিঠে ঘাম শুকিয়ে সাদা লবণের ক্রিস্টাল জমে গেল।

হঠাৎ করেই থেমে গেল কিউয়ি। বোচা নাক টেনে বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুকলো, মোটা কিউয়িও একই রকম করছে।

“ওরা কী করছে?” পেছন থেকে জানতে চাইলেন ব্লেইন। কিন্তু সেনটেইন উত্তর দেবারও ফুরসৎ পেলেন না। বাঁশির মত সুর তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে কিউয়ি।

“পানি।” ঘোড়ার পিঠে সিধে হয়ে বসলেন সেনটেইন, “ওরা পানির গন্ধ পেয়েছে।”

“আপনি সিরিয়াস?” হা করে তাকিয়ে আছেন ব্লেইন।

“প্রথম দেখলে আমারো বিশ্বাস হত না। ওয়া তত পাঁচ মাইল দূর থেকেই গন্ধ পেত।” চলুন আপনাকে প্রমাণ দেখাই। হেসে ঘোড়া হোটালেন সেনটেইন।

ধুলার কুয়াশার মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠল বেগুনিরঙা ছোট শিলা পাহাড়। নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসল সেনটেইনকে। জায়গাটা তিনিও চিনতে পেরেছেন। শেষবার যখন এখানে এসেছেন তখন পেটে শাসা ছিল।

কিন্তু তার আগেই পাশাপাশি থেমে গিয়ে পায়ের নিচের মাটি পরীক্ষা করতে লাগল দুই বুশম্যান। কিচির-মিচির করে সেনটেইনকে কিছু বলতেই তিনি নিজেও বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।

“ঘোড়ার খুঁরের চিহ্ন পাওয়া গেছে। নির্ঘাত লোথার ডি লা রে। আমার আর কোনো সন্দেহই নেই। দক্ষিণ দিক থেকে তিন ঘোড়সওয়ার এসে ঝরনার দিকে গেছে।”

নিজের স্বস্তি লুকাতে হিমশিম খাচ্ছেন সনটেইন। তার মানে তাঁর অনুমান সঠিক। লোথার আর হিরে আর খুব বেশি দূরে নেই।

কতক্ষণ আগে কিউয়ি?” উদ্বিগ্ন মুখে জানতে চাইলেন কিউয়ির কাছে।

“আজ সকালে নাম চাইল্ড।” আকাশের দিকে তাকিয়ে রি অবস্থান ইশারা করে লোথারদের সময় জানাল কিউয়ি।

“সূর্যোদয়ের ঠিক পরে। অতএব আমরা মাত্র আট ঘণ্টা পিছিয়ে আছি।”

“তার মানে আরো বহুদূর বাকি। প্রতিটা মিনিটকে কাজে লাগাতে হবে। চলুন রওনা দেই।” ব্লেইনও সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন।

ছোট্ট পাহাড়টা থেকে আধমাইল দূরে থাকতেই সেনটেইন আবার জানালেন, “কয়েক সপ্তাহ ধরে এখানে আরো একপাল ঘোড়া থেকে গেছে। সবদিকেই চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ লোথার এখানে নিজের লোকদেরকে প্রস্তুত রেখেছিল।” পাহাড়ের নিচে তিনটি কালো টিবি মতন দেখে চুপ করে গেলেন আবার।

“এগুলো কী?” ব্লেইন নিজেও অবাক হয়ে গেছেন।

“মৃত ঘোড়া। কাছে যেতেই চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন, “ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে মেরে রেখে গেছে লোথার।”

“না। কোনো বুলেটের গর্ত তো দেখছি না।” ঘোড়া থেকে নেমে পরীক্ষা করে দেখলেন ব্লেইন।

চারপাশে তাকিয়ে কিউয়িকে কাছে ডাকলেন সেনটেইন “এবার ঘোড়ার দাগ কোথায় গেছে দেখো।” তারপর নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা সামনের ঝরনার দিকে এগোলেন।

ছোট্ট পাহাড়টার নিচেই পাওয়া গেল ঝরনা। পনের ফুট তলায় চকচক করছে পানি। পাহাড়ের পাশেই এক স্তর নরম শিলা এমনভাবে বারান্দার মত ঝুলে আছে যে পানির ওপর সরাসরি সূর্যের তাপ পড়তে পারে না। বাথটাবের মত ছোট্ট এই পুলটাতে সেনটেইনের জানামতে লবণ আর বিভিন্ন খনিজ পদার্থ আর একই সঙ্গে পশু-পাখির মল মূত্রও মিশে আছে।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুলটাতে মনোযোগ দিলেও কিনার ঘেঁষে মানুষের হাতে তৈরি ছোট্ট কাঠামোটা দেখে আঁতকে উঠে মুখে হাতচাপা দিলেন সেনটেইন।

মোটা একটা কাঁটাগাছ তুলে সাইনপোস্ট হিসেবে মাটিতে পুঁতে পাথরের পিরামিড বানিয়ে সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। একেবারে উপরে খালি একটা হাফ গ্যালনকে হেলমেটের মত পরিয়ে রাখা হয়েছে। এর উপরে কালো কালিতে লেখা এই কুয়া বিষাক্ত আর্সেনিক।

সেনটেইনের পাশে চলে এলেন ব্লেইন। নিঃশব্দে সাইনটা পড়ে জানালেন, ঘোড়াগুলো তাহলে এ কারণেই মারা গেছে।” রাগে কেঁপে উঠল কর্নেলের গলা। ঘোড়ার নাক ঘুরিয়ে নিজের সৈন্যদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, “সার্জেন্ট, বাকি পানির অবস্থা কী? এই কুয়াটা বিষাক্ত। এটার পানি খাওয়া যাবে না।” নরম সুরে শিস দিয়ে উঠলেন হ্যানসমেয়ার,

“তাহলে তো ভালোই হল। আবার কালক্রান্ডে ফিরে যেতে হবে।”

রাগ আর হতাশায় সেনটেইন নিজেও কাঁপছেন। “এত সহজে পার পেয়ে, গেল শয়তানটা।”

পানির গন্ধ পেয়ে ছাড়া পাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে তার ঘোড়া। তাই বহু কষ্টে থামাতে হচ্ছে অবোধ জীবটাকে।

আবারো এগিয়ে এলেন ব্লেইন, “আয়্যাম সরি সেনটেইন। আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। পানি ছাড়া এগোনো আত্মহত্যারই শামিল।” আস্তে করে জানালেন কর্নেল।

“আমি জানি।”

“নোংরা একটা চাল চেলেছে ব্যাটা। মরুভূমির মাঝে এরকম বিষাক্ত পানির পরিণাম ভয়াবহ হয়। আগেও একবার এর নজির দেখেছি। ১৯১৫ সালে যখন ওয়ালবিসে ছিলাম-ছোট কিউয়ি কিচির-মিচির করে এগোতেই থেমে গেলেন কর্নেল। জানতে চাইলেন, “ও কী বলছে?”

“ওদের মধ্যে একজন নাকি অসুস্থ। কিউয়ি এই ব্যান্ডেজগুলো পেয়েছে।” তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়েই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে কিউয়িকে আদেশ দিলেন সেনটেইন, “জলদি হাত থেকে ফেলো কিউয়ি।” পুঁজের বদগন্ধ পাচ্ছেন। নিজের বেয়নেটের হাতল দিয়ে বালির উপর ফেলে কাপড়গুলোকে পরীক্ষা করে দেখলেন ব্লেইন।

“মুখোশ!” লোথারের ময়দার বস্তার ফালি আর খাকি শার্টের ভেঁড়া অংশ চিনতে পারলেন সেনটেইন।

“অন্যরা যখন ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত তখন অসুস্থ লোকটা মাটিতে শুয়ে ছিল। তারপর সবাই মিলে তাকে ঘোড়ায় উঠিয়েছে।” ঘোড়ার খুড়ের চিহ্ন দেখে গড়গড় করে বলে দিল কিউয়ি।

“ধস্তাধস্তির সময় আমি ওর হাতে কামড় দিয়েছিলাম, হাড় পর্যন্ত আমার দাঁত লাগায় আঘাতটা বেশ গম্ভীর হয়েছে।” নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন।

“মানুষের কামড় সাপের কামড়ের মতই মারাত্মক।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন, “আর সাথে সাথে চিকিৎসা না হলে ব্লাড পয়জনিং হয়ে যাবে। লোথার ডি লা রে গুরুতরভাবে অসুস্থ। সাথে যদি পানি থাকত তাহলে ওকাভাঙ্গোর নদীর কাছে পৌঁছাবার আগেই তাকে ধরতে পারতাম।” সেনটেইনের গোমড়া মুখ দেখার ভয়ে তাড়াতাড়ি ঘোড়া ঘুরিয়ে সার্জেন্টের দিকে চলে গেলেন কর্নেল, “রাতের বেলা আবার আমরা রওনা দেব। ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই হাফ অংশ করে পানি পাবে।”

কিন্তু সেনটেইন স্থির থাকার পাত্রী নন। ঘোড়া নিয়ে আবার পুলের কাছে। ফিরে এলেন,

“এভাবে কী করে করতে পারলে লোথার? এরকম ভয়ংকর একটা কাজ?”

কী মনে হতেই ঘোড়া থেকে নেমে উপুড় হয়ে কিনারে বসে আঙুল দিয়ে পানি স্পর্শ করলেন। ঠাণ্ডা, পুরোপুরি মৃত্যুর মতই ঠাণ্ডা সে পানি।

মনে পড়ে গেল ব্লেইনের মন্তব্য। একই সাথে স্মৃতির গহীন থেকে উঁকি দিল লোথারের প্রায়শ্চিত্তের কথা। তাকে একবার লোথার বলেছিলেন।

“আমরা আসলে বাধ্য হয়ে কাজটা করেছিলাম। ইউনিয়ন ফোর্স এত পিছু নিয়েছিল যে না করে উপায় ছিল না, কিন্তু পরিণামটা যদি জানতাম।”

তখন লোথারকে সত্যিই ভালোবাসতেন সেনটেইন। উঠে গিয়ে তাই ওর হাত ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। কিন্তু লোথার বলেছিলেন, “এ ধরনের মূর্খামি আমি আর করিনি। এক মাস পরে খুনীর মত আবার ফিরে গিয়েছিলাম সেখানে। জেব্রা, ডোমসবক, পাখি, শিয়াল এমনকি শকুন পর্যন্ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ লজ্জা আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না।

ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন সেনটেইন। উত্তেজনার চোটে ভুলে গেলেন ক্রোধ। পানি আবার স্পর্শ করে ঢেউ বানিয়ে দিলেন।

“না, সে সত্যিই লজ্জিত ছিল। একই কাজ আর দুবার করবে না।”

জোরে চিৎকার করেই কাঁপতে লাগলেন সেনটেইন, “এই নোটিশটা আসলে ভুয়া।” কিন্তু মৃত ঘোড়াগুলোর কথা মনে হতেই আবার থেমে গেলেন। “হয়ত বালতিতে ভরে ওগুলোকে খাওয়ানো হয়েছে। পুরো পুকুরে নিশ্চয়ই কিছু মেশায়নি।”

এরপর মাথা থেকে টুপি খুলে উপরকার ময়লা সরিয়ে পানি ভরে নিলেন সেনটেইন। কিন্তু যেই না পানিতে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবেন পেছন থেকে চিৎকার করে ছুটে এসে ধাক্কা দিয়ে পানি ফেলে সেনটেইনের হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন রেইন। রাগে ধকধক করে জ্বলছে কনেলের চোখ, “পাগল হয়ে গেলেন নাকি?”

এত জোরে সেনটেইনকে ধরেছেন যে হাত কেটে বসে গেল ব্লেইনের নখ।

“ব্লেইন আমি ব্যথা পাচ্ছি।”

“ব্যথা? মন চাইছে আপনাকে চড় লাগাই”।

“আরে ব্লেইন এসব কিছুই ভুয়া। আমি নিশ্চিত, প্লিজ আমার কথা শুনুন।” কর্নেলের এরকম আচরণে সেনটেইনও ভয় পেয়ে গেছেন। তাকে ছেড়ে দিলেন ব্লেইন।

“আমি সত্যি বলছি। সে পানিতে কোনো বিষ মেশায়নি। বাজি ধরে বলছি, সত্যি।”

“কিন্তু কীভাবে বুঝলেন?” ঘোঁত ঘোঁত করলেও আগ্রহ বোধ করলেন ব্লেইন।

ওর সাথে আমার পরিচয় ছিল। তখন ওকে ভালোভাবেই চিনতাম। একবার এরকম করেছে ১৯১৫ সালে। কিন্তু তারপর আর না করার শপথ ও নিয়েছে।”

“তাহলে মৃত ঘোড়াগুলো?”

“হ্যাঁ সেগুলোকে হয়ত বিষ খাইয়েছে। তাছাড়া ওগুলো এমনিতেই ক্লান্ত ছিল। হয়ত সিংহের পেটেই যেত। তাই ও নিজেই শেষ করে দিয়ে গেছে।”

লম্বা লম্বা পা ফেলে পানি কিনারে গিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলেন ব্লেইন।

“তার মানে আপনি এই সুযোগ– “ থেমে গিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সার্জেন্টকে ডাকলেন কর্নেল,

“সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার।”

“স্যার” এস্তপায়ে দৌড়ে এলেন সার্জেন্ট।

“ক্লান্ত একটা ঘোড়া নিয়ে এসো আমার কাছে।”

সার্জেন্ট কথামত কাজ করতেই আবার আদেশ দিলেন, “ওকে পানি খাওয়াও।”

“স্যার?” অবাক হয়ে গেলেন সার্জেন্ট। এতে বিষ আছে স্যার।”

“আছে কিনা আমরা সেটাই খুঁজে বের করব। পানি খাওয়াও।”

ছেড়ে দিতেই লম্বা গলা ডুবিয়ে পুকুরের পানি খেতে লাগল কালো ঘোটকীটা।

সবার চোখের সামনেই ফুলে ঢোল হয়ে গেল ঘোড়ার পেট।

“আমি কিন্তু ঘোড়া ব্যবহার করার কথা চিন্তাও করিনি। যদি আমার অনুমান মিথ্যা হয়!” ফিসফিসিয়ে বললেন সেনটেইন।

খানিক বাদেই কর্নেল আবার আদেশ দিলেন, “সার্জেন্ট ওকে লাইনে নিয়ে যাও।”

তারপর নিজের হাতঘড়ি চেক করে বললেন, “ঘোড়াটাকে এক ঘণ্টা সময় দিলাম।” এরপর সেনটেইনের হাত ধরে পাথরের ছাদের নিচে ছায়ায় বসিয়ে দিলেন। জানতে চাইলেন, “এত ভালোভাবে ওকে কীভাবে চিনতেন?”

“আমার কর্মচারী ছিল, সেও অনেক বছর আগে। খনির প্রথম দিককার শ্রমিক। ইঞ্জিনিয়ার, জানেন তো।”

“হুম। ফাইলে পড়েছি।” কিছুক্ষণ চুপ করে জানালেন, “তবে নিশ্চয়ই বেশ সুসম্পর্ক ছিল? একজন মানুষের অপরাধ জানা চাট্টিখানি কথা নয়।”

কিছু না বলে চুপ করে রইলেন সেনটেইন।

কিন্তু মিটিমিটি হাসলেন ব্লেইন। “আসলে হিংসা মোটেও সুখকর কিছু নয়। ঠিক আছে। বাদ দিন। আমি আমার প্রশ্নটা তুলে নিচ্ছি।”

ব্লেইনের কাঁধে হাত দিয়ে প্রশ্রয়ের হাসি দিলেন সেনটেইন।

তাকিয়ে দেখলেন মিশন ছাড়ার পর থেকে আর শেত্ করেননি ব্লেইন। নতুন দাড়িতে তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে।

কর্নেল সেনটেইনের দিকে তাকাতেই দেখা গেল সবুজ চোখেতে জ্বলছে তাকে পাওয়ার আকুতি।

হঠাৎ করেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল। “ওহ, ঈশ্বর আমাদেরকে ক্ষমা করুন।” বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন। একাকী বসে রইলেন সেনটেইন।

অবশেষে ডাকতে এলেন হ্যানসমেয়ার। পুলের কাছে এসে জানালেন, “কর্নেল ম্যালকমস, আপনাকে ডাকছেন মিসেস কোর্টনি।”

যেন স্বপ্নের ঘোরে ফিরে এলেন সেনটেইন। পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে অদ্ভুত রকমের বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে।

ক্লান্ত ঘোটকিটার কাছে দাঁড়িয়ে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ব্লেইন। সেনটেইন কাছে এসে দাঁড়াতেই পরস্পরের দিকে তাকালেন দুজনে।

“আমরা একসাথেই সামনে এগোব।

“ইয়েস ব্লেইন।” আনন্দ ঝরে পড়ল সেনটেইনের কণ্ঠে।

কয়েক সেকেন্ড বাদেই চড়া গলায় সার্জেন্টকে আদেশ দিলেন কর্নেল, “বোতলগুলো ভরে নাও। আর ঘোড়াগুলোকেও পেট ভরে পানি খাওয়াও, নয় ঘন্টা মেকআপ করার জন্যে ছুটতে হবে সামনে।

.

সারারাত ধরে পথ চলল পুরো দল। আকাশের তারা আর চাঁদের রুপালি আলোয় ঘোড়ার খুড়ের চিহ্ন দেখে পথ দেখাল দুই বুশম্যান।

ভোরের ঘণ্টাখানেক বাদে গত রাতে ডাকাতদের ক্যাম্পের ভাঙা অংশের কাছে পৌঁছাল কর্নেলের দল। নিজের অসম্ভব ক্লান্ত দুটো ঘোড়াকে ফেলে গেছেন লোথার। পরিত্যক্ত ক্যাম্প ফায়ারের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে অবলা জীব দুটো। সাথে সাথে অবশ্য বালি সরিয়ে দিয়েই আগুনে ফুঁ দিল কিউয়ি আর ছাই থেকে দপ করে জ্বলে উঠল শিখা। দেখে তো খুশি আর ধরে না।

“ওরা যতক্ষণ ঘুমিয়েছে ততক্ষণে আমরা পাঁচ ছয় ঘণ্টা এগিয়ে এসেছি।” আপন মনে বিড়বিড় করে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন।

চেস্টনাট রঙা ঘোটকী দুটো একেবারে শেষ অবস্থায় পৌঁছে গেছে। মাথা ঝুলছে। কালো জিভও বেশ ফুলে উঠেছে। তাই দেখে কর্নেল জানালেন, “ওদেরকে পানি খাইয়ে অপচয় করেনি শয়তানটা।”

“হুম, তুমি ওদেরকে খতম করে দাও।”

“এ কারণেই তো লোথার ওদেরকে ফেলে গেছে।”

“মানে?”

“গুলি।” ব্যাখ্যা করে শোনালেন ব্লেইন, “নিজে গুলি করলে তো শব্দ হত”

“ওহ ব্লেইন! তাহলে আমরা কী করব?”

“কফি আর নাশতা বানান। আবার রওনা হবার আগে আমাদের সবারই কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম দরকার।” জিন থেকে নেমে নিজের কম্বলের রোল খুললেন কর্নেল, “ততক্ষণে আমি দেখি কী করা যায়।”

প্রথম ঘোটকীটার কাছে গিয়ে ডান হাতে পিস্তল ধরে ভেড়ার লোমের ব্লাঙ্কেটে জড়িয়ে নিলেন ব্লেইন।

সাথে সাথে পড়ে গেল ঘোড়াটা। খানিক তাকিয়েই নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সেনটেইন। দ্বিতীয় ঘোটকীর দিকে এগিয়ে গেলেন ব্লেইন।

***

পাখি ডানা ঝাঁপটানোর মত করে দুলে উঠল বাতাস। পুরোপুরি কোনো শব্দ না হলেও সোয়াত হেনড্রিক আর লোথার ডি লা রে দু’জনেই নিজ নিজ ঘোড়ার ওপর সচকিত হয়ে বললেন। দম বন্ধ করে কী যেন ঘটার অপেক্ষায় রইলেন দুজনেই।

আবারো শোনা গেল দূরাগত এক বন্দুকের আওয়াজ। পরস্পরের দিকে তাকালেন হেনড্রিক আর লোথার।

“আর্সেনিকের কৌশলটা আসলে কাজে লাগেনি।” যা বোঝার বুঝে গেল বড়সড় কৃষ্ণাঙ্গ ওভাষো।

“তোমার উচিত ছিল পানিতে সত্যিকারের বিষ মিশিয়ে দেয়া।”

দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন লোথার।

“ডাইনির মত ঘোড়া ছোটাচ্ছে। আমাদের মাত্র চার ঘণ্টা দূরত্বে আছে। এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে তাই বা কে জানত।”

“এতটা নিশ্চিত হয়ো না।”

একটু দ্বিধা না করে লোথার জানালেন, “ও আমার কাছে প্রমিজ করেছে যে আসবেই।”

লোথারের হাতে কনুই পর্যন্ত ব্যান্ডেজে হলুদ পুঁজের দাগ। কার্টিজের বেল্ট জড়িয়ে গলার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছেন আহত হাত। মুখে বহুরঙা না কামানো দাড়ি।

মাথা ঘুরিয়ে পেছনের সমভূমির দিকে তাকাতে গিয়ে আরেকটু হলে পড়েই যেতেন। তাড়াতাড়ি জিনের সাথে আটকানো কালো কেস ধরে নিজেকে সামলালেন।

“পা!” বাবার সুস্থ হাত ধরে টান দিল ম্যানফ্রেড; চোখে উদ্বেগ, “তুমি ঠিক আছে তো?”

উত্তর দেবার আগে চোখ বন্ধ করে ফেললেন লোথার; ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে হাতের মাংস পর্যন্ত ফুলে ছড়িয়ে পড়েছে ইনফেকশন। রক্তে মিশে গেছে বিষ। চামড়া এতটাই ফুলে গেছে যে পাকা তালের মত টসটস করছে। চোখ আর মাথার তালু পর্যন্ত জ্বলছে ব্যথায়।

“চলো” ফিসফিস করে ছেলেকে জানালেন, “দেরি করলে চলবে না।”

লোথারের ঘোড়ার লাগাম টেনে নিলেন হেনড্রিক।

“দাঁড়াও!” হঠাৎ করেই জানতে চাইলেন লোথার “পরবর্তী পানির পুকুরটা কত দূরে?”

“আগামীকাল দুপুরের আগেই পৌঁছে যাব।”

জ্বরের তাপে মাথাও যেন ঠিকমত কাজ করছে না, তবুও হেনড্রিককে বললেন ঘোড়ার আয়রনের কথা।

মাথা নাড়লেন হেনড্রিক। সামনের ঘোড়াগুলো সত্তর পাউন্ড বোঝা বহন করছে। এখন সময় হয়েছে এগুলো ফেলে দেবার।

“দেখা যাক সে টোপ গিলে কিনা।” ভাঙা ভাঙা গলায় বলে উঠলেন লোথার।

***

ক্রমেই সেনটেইন নিজেও বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু সেটা কাউকে টের পেতে দিতে চান না।

চোখের কোনা দিয়ে ব্লেইনের দিকে তাকালেন। এমনভাবে সোজা, ঋজু দেহে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে যে মনে হচ্ছে একটুও অবসন্ন হননি। কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই সেনটেইনের অবস্থা বুঝে ফেললেন কর্নেল। নরম স্বরে জানালেন, “দশ মিনিটের পানি বিরতি নেয়া যাক।”

“আমি ঠিক আছি তো।” তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন সেনটেইন।

“আমরা সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এটা স্বীকার করতে কোনো লজ্জা নেই আসলে।” তারপর চোখের ওপর হাত দিয়ে সামনে কী যেন দেখলেন।

“কী হয়েছে?”

“বুঝতে পারছি না।” বুকের কাছের দূরবিন তুলে ফোকাস করলেন ব্লেইন। তারপর সেনটেইনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন গ্লাস। “ব্লেইন?” আচমকা চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন। “হিরে! এটাই তো হিরের কেস! ওরা হিরে ফেলে গেছে।”

মুহূর্তেই সব ক্লান্তি অবসাদ উঠে গেল। ব্লেইন বাধা দেবার আগে ঘোড়ার পিঠে গুঁতো দিয়ে টগবগিয়ে সামনে এগোলেন সেনটেইন।

চিৎকার করতে করতে পিছু নিলেন ব্লেইন। তাড়াতাড়ি সার্জেন্টও এগোল বাধ্য হয়ে।

হঠাৎ করেই তীব্র হ্রেষাধ্বনি দিয়ে আতঙ্কে লাফাতে লাগল সেনটেইনের ঘোড়া। বাড়তি ঘোড়াগুলোও এরকমই রকম পাগলের মত করছে। ব্লেইন তাই দেখে ঘুরতে গিয়েও দেরি করে ফেললেন।

“থামো!” মরিয়া হয়ে হাত নেড়ে সার্জেন্টকে থামাতে চাইলেন কর্নেল। কিন্তু তাও কাজ হল না। পুরো দলের ঘোড়াগুলো যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে।

তাড়াতাড়ি নেমে নিজের ঘোড়ার সামনের পা দুটো চেক করে দেখলেন সেনটেইন। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পেছনের পা দুটো তুলতেই বিস্ময়ে অবিশ্বাসে হাঁ হয়ে গেল চেহারা। মরচেপড়া লোথার চোরকাঁটা লেগে কেটে গেছে খুড়। গাঢ় রক্তে কাদা মাটির পেস্ট হয়ে গেছে মরুভূমির বালি।

আস্তে করে ঘোড়ার পা তুলে চোরকাটা তুলে ফেলতে চাইলেন সেনটেইন। কিন্তু বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে লোথার কাঁটা। ব্যথায় কাঁপছে ঘোড়া। বহু কষ্টে মোচড় দিয়ে দিয়ে সবশেষে সফল হলেও রক্তপাত বেড়ে গেছে বেচারা ঘোড়ার। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন ব্লেইনও দুটো চোরাকাটা বের করেছে।

“হর্স আয়রন, যুদ্ধের পর থেকে এ ভয়ংকর জিনিসগুলো আর দেখিনি।” জানালেন ব্লেইন। তিন ইঞ্চি তীক্ষ্ণ এই চার মাথা তারার আকৃতির লোথার চোরকাটা মানুষ কিংবা পশু অথবা টায়ার সবকিছুকেই অথর্ব করে দিতে ওস্তাদ।

চারপাশে তাকিয়ে এরকম অসংখ্য চোরকাটা দেখতে পেলেন সেনটেইন। উপরে ধুলার পরত থাকায় চট করে চোখে না পড়লেও কার্যক্ষমতা ঠিকই আছে।

হ্যানসমেয়ার আর তার সৈন্যদের ঘোড়াগুলো পেছনে থাকায় চোরকাটার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। এবারে নিজ নিজ ঘোড়া দূরে রেখে সাবধানে এগিয়ে এলেন কর্নেলের দিকে। ব্লেইন আর সেনটেইনের বাড়তি ঘোড়াসহ মোট ছয়টা ঘোড়া প্রচণ্ডভাবে জখম হয়েছে।

সব দেখে রাগে কাঁপতে কাঁপতে আদেশ দিলেন কর্নেল, “সার্জেন্ট, আমাদের জিনের সবকিছু তোমার দুইটা ঘোড়ায় তুলে দাও আর সৈন্য পাঠিয়ে হর্স আয়রন কতটুকু পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে খুঁজে দেখো। এক মিনিটও নষ্ট করা যাবে না।”

সাবধানে পা ফেলে আস্তে আস্তে কেসটার দিকে এগিয়ে গেলেন সেনটেইন। হাতে নিতেই দেখা গেল ভেতরে ফাঁকা কিছু নেই। শূন্য চোখে তাই পেছনে তাকালেন।

দ্রুতহাতে কাজ করছে সার্জেন্টের লোকেরা। নতুন করে কালো একটা ঘোড়া নিয়ে সেনটেইনের দিকে এগিয়ে আসছেন সার্জেন্ট। পেছনে সৈন্যরাও এক সারিতে এগোচ্ছে। একটু পর পর উপুড় হয়ে দেখে নিচ্ছে পথে কোনো কাঁটা আছে কিনা। যাই হোক, সেনটেইন ভালোভাবেই জানেন যে এখানেই শেষ নয়। লোথার নিশ্চয় আরো ব্যবস্থা করে রেখেছে।

কোমরের কাছে লি এনফিল্ড রাইফেল নিয়ে ছয়টা অথর্ব ঘোড়ার দিকে তাকালেন ব্লেইন। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে প্রার্থনা করছেন এমনভাবে মাথাটা নিচু করে ফেললেন।

তারপর ধীরে ধীরে রাইফেলের হাতল কাঁধে তুলে একের পর এক গুলি ছুঁড়তেই ঝাঁকি দিয়ে পড়ে গেল সবকটা ঘোড়া।

ফুঁপিয়ে উঠলেন সেনটেইন। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কান্নার ফোঁটা। খানিক বাদে নিজের ঘোড়া নিয়ে তার পাশে চলে এলেন ব্লেইন। সেনটেইনের চোখের জল দেখেও কিছু বললেন না। কেবল সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, “আমরা প্রায় এক ঘণ্টা পিছিয়ে পড়েছি। টুপ ফরোয়ার্ড।”

এরপর রাত নামার আগে আরো দু’বার এমন ভাবে থেমে যেতে হল। চোরকাটা পেরিয়ে সাবধানে এগোতে গিয়ে নষ্ট হল মূল্যবান কিছু সময়।

***

বুশম্যানল্যান্ড ছাড়িয়ে কাভাঙ্গো অঞ্চলে পা রাখতেই নাটকীয়ভাবে বদলে গেল চারপাশের দৃশ্য।

প্রাচীন বালিয়াড়ির গা ঘেঁষেই জন্মেছে লম্বা সব গাছ। উইলো সোপানি আর আলবিজিয়ার ঝাড়ও আছে। মরুভূমির ঘাসে ঢেকে আছে অগভীর উপত্যকাসমূহ। এখানকার মাটি খুঁড়লেই পানির দেখা মেলে। প্রকৃতিও তাই অকৃপণ হাতে সাজিয়েছে চারপাশ। কালক্লান্ড ছাড়ার পর এই প্রথমবারের মত চোখে পড়ল জেব্রা আর লাল সোনালি ইম্পালা হরিণ।

লোধার ডি লা রে এতটাই অসুস্থ যে তার একপাশে হেনড্রিক আর আরেক পাশে চলছে ক্লেইন বয়। জ্বরের ঘোরে হঠাৎ হঠাৎই হেসে উঠছেন লোথার। কখনো আবার এত নড়ছেন যে না ধরলে মাটিতেই পড়ে যাবেন। পেছন পেছন আসছে ম্যানফ্রেড।

ঘোড়ার পা-দানির ওপর দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে সামনে তাকালেন হেনড্রিক। যা দেখলেন তাতে তো খুশি আর ধরে না। লম্বা সব সোপান আর চারটা বিশাল ছাতার মত অ্যাকেশিয়া গাছ। ঠিক যেমনটা তাঁর স্মৃতিতে আছে। আর এগুলোর মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে টলটল পানি।

শেষ কয়েক কদম কোনোমতে দৌড়ে গেল ঘোড়ার পাল। সোজা পুকুর বরাবর ছুটে গেলেন হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। তারপর শুরু হল পাগলামি। পানিতে হেসে-খেলে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করতে লাগলেন দুজনে।

বাবাকে নামতে সাহায্য করল ম্যানফ্রেড। তারপর টুপি ভরে পানি নিয়ে এল। বসা থেকে ধুপ করে পড়ে গেলেন লোথার। ছেলে পানি নিয়ে আসতেই তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে শুরু করলেন কাশি।

একটু পরেই পাশে এসে বসলেন হেনড্রিক। সারা গা ভেজা। তখনো হাসছেন। কিন্তু কী মনে হতেই যেন আচমকা থেমে গেলেন। চারপাশে তাকিয়ে আপন মনেই বলে উঠলেন,

“এখানে কেউ নেই কেন? বাফেলো আর লেগস কোথায় গেল?” তাড়াহুড়ো করে দৌড় দিলেন কাছাকাছি একটা অ্যাকেশিয়ার ছাতার দিকে।

পুরোপুরি শূন্য আর পরিত্যক্ত। ক্যাম্প ফায়ারের কয়লা চারপাশে ছড়ানো। খুব বেশি হলে একদিন আগের। ত্রস্তপায়ে জঙ্গল ঘুরে আবার লোথারের কাছে এগিয়ে এলেন হেনড্রিক।

“ওরা পালিয়েছে। লোথারও মনে মনে সে রকমটাই ভাবছিলেন, “দশটা ঘোড়া, প্রতিটা পঞ্চাশ পাউন্ড করে, এত লোভ সামলাতে পারেনি।” পানি খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবারো খানিকটা তরতাজা হয়ে উঠেছেন লোথার।

“ব্যাটারা নির্ঘাৎ ঘোড়াগুলো পর্তুগিজদের কাছে বেঁচে বউদের কাছে ফিরে গেছে।” ধপ করে বসে পড়লেন হেনড্রিক।

“আমার কাছে প্রমিজ করো হেনড্রিক আবার ওদের সাথে দেখা হলে তুমি ওদেরকে ধীরে, অতি ধীরে ধীরে খুন করবে।”

“এটাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন।” ফিসফিস করে উঠলেন সোয়ার্ট, “যার যার পুরুষাঙ্গ কেটে টুকরো টুকরো করে দু’জনকেই খাইয়ে দেব।”

চুপচাপ পুলের কিনারে নিজেদের চারটা ঘোড়ার ছোট্ট দলটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল সকলে।

কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে রাখার সময়ও তো নেই। তাই নীরবতা ভাঙলেন লোথার, “আরো অন্তত সত্তর মাইল গেলে নদী পাওয়া যাবে। আস্তে আস্তে নিজের হাতের নোংরা কাপড়টা খুলতেই দেখা গেল পুরো জায়গাটা ফুলে তরমুজ হয়ে আছে। কনুই পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ঘা। চামড়া ফেটে গড়িয়ে পড়ছে বদ রক্ত আর রস। আর গন্ধের চোটে লোখারের নিজেরই বমি পেল। কনুইয়ের উপর দিকটা তেমন না ফুললেও চামড়ার নিচে পরিষ্কার টকটকে লাল রেখা দেখা যাচ্ছে।

“গ্যাংগ্রিন” নিজেকেই যেন শোনালেন, “হাতটাকে কেটে ফেলতে হবে।” আসলে কার্বলিক এসিড সলুশন দিয়ে ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করেছিলেন। তাতেই আরো বেড়ে গেছে গ্যাংগ্রিন। কিন্তু ম্যানির জন্যে আমাকে টিকে থাকতেই হবে।” তাড়াতাড়ি চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকালেন।

“আমাকে কয়েকটা ব্যান্ডেজ দাও।” গলার স্বর যথাসম্ভব শান্ত আর দৃঢ় রাখতে চাইলেও কেমন যেন ফ্যাসফ্যাসে শোনাল।

ও আমাদের চেয়ে কতটুকু পিছিয়ে আছে হেনি?” ব্যান্ডেজের গিঁট বাঁধতে গিয়ে জানতে চাইলেন লোথার। বাড়তি যেখানে যতটুকু কম্বল আর কাপড়ের টুকরা ছিল সব এখন এ কাজেই লাগছে।

“আমরা সময় বাঁচাতে পেরেছি। অনুমান করলেন হেনড্রিক, “কিন্তু ঘোড়া?”

একটা ঘোড়া পানির কিনারে শুয়ে পড়েছে। তার মানে বেশ শ্রান্ত।

“পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা হবে।” অথচ নদী এখনো সত্তর মাইল দূরে। আর যদি ওরা সীমান্তে গিয়েও পিছু নেয়া বন্ধ না করে?” আর ভাবতে চাইলেন না লোথার। তার বদলে ফিসফিস করে বললেন, “ম্যানফ্রেড হিরেগুলো নিয়ে এসো।”

বাবার কাছে ক্যানভাসের হ্যাঁঙারস্যাক নিয়ে এল ম্যানফ্রেড। সাবধানে ব্যাগ খুললেন লোথার।

আটাশটা বাদামি কাগজে মোড়ানো প্যাকেটগুলোকে মোট চার ভাগে ভাগ করলেন।

“সবার সমান। আমরা যেহেতু মূল্য জানি না তাই সবচেয়ে ছোটজনকে আগে বেছে নেবার সুযোগ দেব। ঠিক আছে?” হেনড্রিকের দিকে তাকালেন লোথার।

সোয়াট হেনড্রিক বুঝতে পারলেন সবাই মিলে আর নদীতীরে এগোনো হবে না। লোখারের মুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে ভাবলেন কিসের টানে এই লোকটার সাথে এতদিন ধরে আছেন। একসাথে তারা অনেক কিছু সয়েছেন, দেখেছেন। ভালোবাসা না বন্ধুত্ব! বুঝতে না পারলেও আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় তেতো হয়ে উঠল মন।

“ঠিক আছে।” লোথার আর ম্যানি দু’জনেই তাঁর কাছে সমান।

“বেছে নাও ম্যানি।” আদেশ দিলেন হেনড্রিক।

“আমি জানি না।” হাত দুটো পেছনে নিয়ে অপারগতা দেখাল ম্যানি। “তাড়াতাড়ি যাও।” সাপের মত ফণা তুললেন লোথার। এগিয়ে এসে সবচেয়ে কাছের ভাগটা দেখাল ম্যানি।

“তুলে নাও।” এবারে কৃষ্ণাঙ্গ ক্লেইন বয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেছে নাও।”

আর মাত্র দুটো ভাগ বাকি। তা দেখে ফাটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসলেন লোথার,” তো তোমার বয়স কত হেনি?”

“ধরো বসন্তের প্রথম ফুলটার মত।” ওভাষোর কথা শুনে দুজনেই হেসে ফেললেন।

লোথারের হাসি দেখে হেনড্রিকের বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল; বললেন, “তুমি নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ছোট। সবসময় তো নার্সের মত তাই তোমার সেবা করলাম।”

নিজের প্যাকেটগুলোও ম্যানফ্রডকে দিয়ে লোথার জানালেন, “এগুলো হ্যাঁঙারস্যাকে ভরে রাখো। তারপর পানির বোতল ভরে নাও। আর মাত্র সত্তর মাইল গেলেই নদী।”

সবকিছু প্রস্তুত করে নিয়ে লোথারকে তুলতে গেলেন হেনড্রিক। কিন্তু বিরক্ত হয়ে তার হাত সরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর অ্যাকেশিয়ার গুঁড়ি ধরে উঠে দাঁড়ালেন।

আর সোজা হতে না পারায় একটা ঘোড়াকে পানির কিনারেই ফেলে আসতে হল। এক মাইল পেরোবার পর আরেকটা পড়ে গেল। তবে বাকি দুটো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঠিকই এগোচ্ছে। খানিক বাদে তাও না পারায় একটার ওপর পানির বোতল তুলে দিয়ে আরেকটার ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন লোথার।

একমনে উত্তরে এগিয়ে চলেছে চারজনের ছোট্ট দলটা। মাঝে-মাঝে বিনা কারণেই লোথার চড়া গলায় গান গেয়ে ওঠেন। দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে ম্যানফ্রেড। কিন্তু পরক্ষণেই ভাঙা গলায় এমন গালি দেন যে ছুটে এসে বাবার কোমর জড়িয়ে ধরতে হয়।

“ইউ আর আ গুড বয় ম্যানি। এখন থেকে তোমার আর কোনো কষ্ট থাকবে না। স্কুলে যাবে, পুরোদস্তুর ভদ্রলোক হয়ে উঠবে, আমরা একসাথে বার্লিন যাবো, অপেরা”।

“ওহ পাপা, কথা বলো না তো।” ছেলের গায়ে ভর দিয়ে এগিয়ে চলেন লোথার। নয়ত কখন মুখ থুবড়ে পড়ে যেতেন এই কালাহারির উষ্ণ বালির ভেতরে।

বহুদূরে সূর্যের আলোয় রূপার মত চকচক করছে গ্রানাইট পাথর।

***

৪. ঘোড়া থামালেন সেনটেইন

চূড়ায় পৌঁছে ঘোড়া থামালেন সেনটেইন। কিন্তু পানির গন্ধ পাবার সাথে সাথে উন্মাদ হয়ে উঠেছে ঘোড়া। মরুভূমির এমন অনেক অভিযাত্রীর কথা শুনেছেন যারা নিজেদের পশুদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পানির তৃষ্ণায় মারা যায়। কারণ অবলা জীবগুলো ছুটে গিয়ে কাদা-মাটি বানিয়ে ফেলে গোটা পুকুর। তবে সার্জেন্ট আর কর্নেল এ কাজে বেশ অভিজ্ঞ। তারা পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামলে নিলেন।

ঘোড়াগুলো পানি খেয়ে উঠে যাবার পর বুট জুতা খুলে সম্পূর্ণ কাপড় পরেই পানিতে নেমে গেলেন সেনটেইন।

তীরে ওঠার সময় আড়চোখে তাকাতেই দেখেন যে শার্ট খুলে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মাথায় ছিটে দিচ্ছেন ব্লেইন। এই প্রথম কর্নেলকে উদোম গায়ে দেখলেন সেনটেইন। বুকের ঘন কোকড়া লোম থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়া পানির বিন্দু দেখে শিহরিত হয়ে উঠল তার সারা শরীর। পালিশ করা মার্বেলের মত দেহখানা দেখে মনে পড়ে গেল মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডের কথা।

সেনটেইনকে এগোতে দেখে তাড়াতাড়ি শার্ট পরে নিলেন ব্লেইন। সাথে সাথে ভিজে গেল কাপড়। কর্নেলের ভদ্রতা দেখে হেসে ফেললেন সেনটেইন, জানালেন, “ডি লা রে এখানে কোনো বাড়তি ঘোড়া পায়নি।”

অবাক হয়ে গেলেন কর্নেল, “কীভাবে বুঝলেন?”

“কিউয়ি বলেছে দু’জন মানুষ অনেকগুলো ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করলেও বহুদিন আগেই আবার চলেও গেছে। ইয়েস আমিও নিশ্চিত।”

হাত দিয়ে ভেজা চুল ঠিক করে নিলেন ব্লেইন, “তার মানে লোথারের পরিকল্পনাতে কোনো একটা গড়বড় হয়েছে।”

“কিউয়ি বলছে ওরা নাকি পায়ে হেঁটে সামনে এগিয়েছে।” হঠাৎ করেই বনের কিনার থেকে শোনা গেল কিউয়ির গগনবিদারী চিৎকার। তাড়াতাড়ি সেদিকে ছুটলেন দুজনে।

অ্যাকেশিয়া গাছের নিচে পড়ে আছে খাবারের পাত্র, টিনজাত মাংস, কম্বল। পা দিয়ে জিনিসগুলো উল্টে দিলেন ব্লেইন,

“দেখো ওরা কতটা মরীয়া হয়ে সব ফেলে গেছে। হর্স আয়রনও পড়ে আছে। শেষবারের মতন নদীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।”

“এখানে দেখো ব্লেইন,” সেনটেইনের কাছে যেতেই দেখা গেল বালির উপর পড়ে আছে ব্যান্ডেজ।

“ওর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। ও মারা যাচ্ছে ব্লেইন।” অদ্ভুত হলেও সত্যি সেনটেইন কেন যেন বিজয়ের উল্লাসও বোধ করছেন না।

চড়া গলায় সার্জেন্টকে ডাকলেন ব্লেইন, “আমরা ঘণ্টাখানেকের মাঝেই আবার রওনা দেব। সবার খাওয়া হয়েছে কিনা দেখো।” তারপর সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে দেখেন যে নিজেকে ভালোই সামলেছেন।

ছায়ার নিচে পাশাপাশি এসে বসলেন দুজনে। গরম আর ক্লান্তিতে ক্ষুধাও মরে গেছে। চুরুট ধরাতে গিয়েও কী মনে করে রেখে দিলেন কর্নেল। সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“প্রথম দেখায় আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি তোমার হিরের মতই সুন্দর, জেদী আর বুদ্ধিমান।”

“আর এখন?”

“তোমাকে আমি পঙ্গু ঘোড়ার জন্যে কাঁদতে দেখেছি। এতটা ক্ষতি করেছে যে তোক তার জন্যেও তোমার চোখে গভীর সমবেদনা দেখেছি। কালক্লান্ড ছাড়ার পরেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আর এখন তো শ্রদ্ধাও করি। বুঝলে?

“এটা কি ভালোবাসার চেয়ে ভিন্ন কিছু?”

“অবশ্যই।”

আর কিছু না বলে দুজনেই কিছুণ চুপ করে রইলেন। তারপর সেনটেইন জানালেন, “ব্লেইন, অনেকদিন ধরেই আমি একা। কেবল আমার ছেলেকে নিয়ে ভেবেছি। ওর জন্য নানান পরিকল্পনা করেছি। যখন মরুভূমিতে এসেছিলাম তখন থেকেই জানি যে আমিই আমার ভরসা। আপন শক্তি আর মনোবল ছাড়া বাকি সবকিছু মিথ্যা। এখনো এ ধারণার পরিবর্তন হয়নি। আমার জন্য কেউই নেই। তাই না ব্লেইন?”

চোখ না সরিয়েই কর্নেল উত্তরে বললেন, “যদি

উনার হয়ে লাইনটা শেষ করলেন সেনটেইন, “ইসাবেলা আর মেয়েরা তো আছে।”

মাথা নাড়লেন ব্লেইন। “কিন্তু আমি নিজেকে সামলাতে পারি তাই না ব্লেইন?”

“আমার সাথে এতটা কঠোর হয়ো না। আমি কখনোই কোনো প্রতিজ্ঞা করিনি তোমার কাছে।”

“আয়্যাম সরি।” নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ করে গেলেন সেনটেইন। একটু পরে জানালেন, “সত্যিই তাই। তুমি তো আমার কাছে কোনো প্রমিজ, করোনি।” তাড়াতাড়ি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলল। আমাদের সময় শেষ।”

***

এবার বাধ্য হয়ে নিজেদের পাঁচটা ঘোড়াও রেখে যেতে হল। আর বাকিগুলোকে ক্লান্ত হতে না দেয়ার জন্য ব্লেইন খানিক হাঁটছেন, খানিক আবার ঘোড়ায় চড়ে এগোচ্ছেন।

কেবল বুশম্যান ভ্রাতৃদ্বয়কে গরম, তৃষ্ণা কিংবা ক্লান্তি কিছুই কাবু করতে পারেনি।

এদিকে প্রচণ্ড কাহিল হয়ে পড়েছেন সেনটেইন। শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা পর্যন্ত ব্যথায় টনটন করছে। জিহ্বা যেন ভারি হয়ে চামড়ার মত শক্ত হয়ে গেছে। মাথায় কেবল একটাই চিন্তা যে আবার কখন পানির কাছে। পৌঁছাতে পারবেন।

দলের কেউ কোনো কথা বলছে না। পাছে সেটুকু শক্তিও নষ্ট হয়ে তাদেরকে আরো ক্লান্ত করে তোলে।

মনে মনে ভয় পেয়ে গেলেন সেনটেইন। কিছুতেই সারেন্ডার করা চলবে না। বহুকষ্টে মাখাটা উপরে তুলে রাখলেন যেন পায়ের কাছে ঝুলে না পড়ে। কয়েক কদম এগিয়ে গেছেন ব্লেইন। প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আর মনোবল খাটিয়ে পা চালিয়ে নিজেও চলে এলেন তার পাশে। তৎক্ষণাৎ মনে হল এই তো নিজ শরীরের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জিতে গেছেন।

এদিকে ফিরে হাসলেন ব্লেইন। যদিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, কত কষ্ট করে তা করছেন, “ওই টিবিগুলো কিন্তু মানচিত্রে নেই।”

এতক্ষণ সেনটেইনের চোখে পড়েনি। এবার চোখ তুলে তাকাতেই তিনিও দেখতে পেলেন। মাইলখানেক সামনেই জঙ্গলের মাথা কুঁড়ে বেরিয়েছে মসৃণ গ্রানাইট।

“একেবারে কাছের পাহাড়টার কাছে গিয়েই আমরা পানি পান করব।” সেনটেইনের অবসাদ পরিষ্কারভাবে অনুভব করছেন কর্নেল।

“গাধাকে গাজর দেখাচ্ছে।” আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন।

খানিক বাদে গ্রানাইটের কাছে পৌঁছে দেখা গেল লোথার ডি লা রে’র সর্ব শেষ ঘোড়ার দেহ।

নতুন মানুষকে দেখে বেচারা মাথা উঠাতে চাইলেও অল্প পরিশ্রমে আবার হেলে পড়ল মাটিতে। খানিক দূর গিয়ে ঘুরে এল কিউয়ি। তারপর চোখ উপরের দিকে তুলে কী যেন দেখাল।

অন্যরাও এগিয়ে গিয়ে খাড়া সুউচ্চ গোলাকার গ্রানাইটের চূড়ার দিকে তাকাল। না হলেও দুইশ থেকে তিনশ ফুট উঁচু। কিন্তু পৃষ্ঠদেশ দূর থেকে যতটা মসৃণ লেগেছিল বাস্তবে তা নয়। তাছাড়া বহুদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর উষ্ণ আবহাওয়ায় জায়গায় জায়গায় ক্ষয়েও পড়েছে। ফলে ছোট ছোট সিঁড়ি মতন তৈরি হয়েছে যেটার উপর পা রেখে উপরে হয়ত ওঠা যাবে; তবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে সে সিদ্ধান্ত।

একেবারে চূড়ার নিখুঁত গোলাকার বোল্ডারগুলো দেখে সেনটেইনের মনে পড়ে গেল ছোটবেলার ফ্রান্সে দেখা সমাধিকক্ষ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলের মাঝের মায়ান মন্দিরের কথা।

নিজের ঘোড়া নিয়ে গ্রানাইট চূড়ার পাদদেশে চলে গেলেন ব্লেইন। আর তখনি কী যেন একটা দেখে অবাক হলেন সেনটেইন। মাথার বোল্ডারগুলোর পেছনে যেন নড়ে উঠল একটা ছায়া।

“ব্লেইন, সাবধানে! ওই যে উপরে- কিন্তু সেনটেইনের সতর্কবাণী শুনে সরে আসার আগেই গমের বস্তার মত ধপ করে পাথরের মেঝেতে পড়ে গেলেন ব্লেইন আর তার ঘোড়া। উপর থেকে প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা বুলেটে ধরাশায়ী হয়েছে তার ঘোড়া।

মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন আর সে সময়ই কানে এল মসার রাইফেলের আওয়াজ। তার মানে শব্দের আগেই বুলেটটা যথাস্থানে পৌঁছে গেছে।

চারপাশে যেন নরক ভেঙে পড়েছে। আতঙ্কিত ঘোড়াগুলোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সৈন্যদের দল। নিজের ঘোড়া নিয়ে কর্নেলের কাছে ছুটলেন সেনটেইন। মৃত ঘোড়াটার পাশেই পড়ে আছেন ক্লেইন। কিন্তু তাকে তুলে দাঁড় করাবার আগেই আরেকটা বুলেট এসে ঝাঁঝরা করে দিল হ্যাঁনসমেয়ারে ঘোড়াকে; মাথা মাটিতে ঠুকে পড়ে গেলেন সার্জেন্ট।

তাই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েই সেনটেইনের দিকে দৌড় দিলেন ব্লেইন। কোনো রকম জিন ধরেই ছুটছেন সামনে। তারপরেও সেনটেইনকে মানা করলেন যেন ঘোড়া না থামায়। এদিকে চকিতে একবার পিছনে তাকাতেই সেনটেইনের চোখে পড়ল বুলেট এসে শেষ করে দিয়ে গেছে আরেকজন সৈন্যকে।

অতএব কেবল বেঁচে আছে সেনটেইনের ঘোড়া। বাকি সবগুলো মাথায় গুলি খেয়ে মারা গেছে। দেড়শ’ কদম দূর থেকে এতটা নিখুঁত রেঞ্জে গুলি করা যার-তার কাজ নয়।

ছুটতে ছুটতেই সামনে দেখলেন কয়েকটা মরা মোপানির ডাল পড়ে প্রাকৃতিক দুর্গ মতন তৈরি হয়েছে। লাগামের দড়ি ছেড়ে গড়িয়ে সেদিকে চলে গেলেন কর্নেল। “গাধার মতন গিয়ে ওদের অ্যাম্বুবুশে পা দিলাম।” বোঝ গেল নিজের উপরেই বেজায় ক্ষেপে গেছেন। তারপর ঝট করে সেনটেইনের ঘোড়ার পা-দানি থেকে রাইফেল নিয়ে তীরের মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন। আহত হলেও অক্ষত আছেন সার্জেন্ট। তাড়াতাড়ি বাকি সৈন্যদেরকে নিয়ে চলে এলেন সেনটেইনদের কাছে।

তবে মজার ব্যাপার হল প্রথম গুলির শব্দ শোনার সাথে সাথে হাওয়া হয়ে গেছে বুশম্যান দুই ভাই। সেনটেইন ভালোভাবেই জানেন এতক্ষণে হয়ত ওচি প্যানেও পৌঁছে গেছে।

লি এনফিল্ড বের করে ছুটন্ত সৈন্যদেরকে কাভার দিলেন ব্লেইন। কিন্তু চারশ’ গজ দূরের চূড়ার লোকটাকে কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না। বারুদের নীল ধোয়া তাকে আড়াল করে রেখেছে।

হাঁপাতে হাঁপাতে তীরে এসে পৌঁছে গেলেন সার্জেন্ট আর তার দল। সবাই যে যার রাইফেল ঠিকই নিয়ে এসেছে দেখে সন্তুষ্ট হলেন কর্নেল।

“ওরা কেবল প্রতিটি ঘোড়ার মাথা টার্গেট করেছে। কোনো মানুষকে নয়।” কোনোরকমে দম নিতে নিতে জানালেন হ্যানসমেয়ার।

“আমার আশপাশেও একবারও গুলি ছোড়েনি।” বললেও সেনটেইন, বুঝতে পারলেন যে লোথার তবে বিপদে ফেলতে চান না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই যে তার মাথায় বুলেট ঢুকিয়ে দেয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না তা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

এনফিল্ড রিলোড করে হাসলেন ব্লেইন। যেন বেশ মজা পেয়েছেন, এমনভাবে বললেন, “শয়তানটা আসলে নিজের নামের পাশে খুনি তকমাটা লাগাতে চায় না। তারপর হ্যাঁনসমেয়ারের কাছে জানতে চাইলেন, “কতজন আছে উপরে?”

“জানি না। তবে একের বেশি। একজন এতটা ফায়ার করতে পারবে না।”

“অল রাইট। চলো তাহলে খুঁজে দেখি আসলেই কতজন আছে।” সেনটেইন আর সাজেন্টের দিকে ঝুঁকে নিজের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিলেন কর্নেল।

বাইনোকুলার নিয়ে গিরিখাতের মুখে চলে এলেন সেনটেইন। তারপর ঘাসের গুচ্ছের পেছনে লুকিয়ে দূরবিন একেবারে গ্রানাইটের চূড়ার দিকে ফোকাস করলেন।

“রেডি!”

সেনটেইনের ঘোষণা শুনে হ্যানসমেয়ার উপরের লোকটার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পরপর দুবার গুলি ছুড়লেন। ব্লেইনের নিজের রাইফেলের ওপর হেলমেট পরিয়ে রেখেছিলেন। তাই সার্জেন্টের গুলির সাথে সাথে প্রতিউত্তর হিসেবে ঝাঁঝরা হয়ে গেল কর্নেলের হেলমেট।

“তিনজন।” দূরবীন চোখে সবকিছু পরিষ্কার দেখে জানালেন সেনটেইন।” আমি তিনটা মাথা দেখেছি।”

“গুড।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন।

ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো থলে থেকে পানির বোতল এনে কর্নেলকে দেখালেন সেনটেইন, “মাত্র এটুকুই আছে।” চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম পানি দেখে অবচেতনেই ঠোঁট চাটলেন কর্নেল,

“কোনো সমস্যা নেই। অন্ধকার নামলেই বাকি বোতলগুলোও উদ্ধার করে নিয়ে আসব।” তারপর কর্কশ কণ্ঠে সার্জেন্টকে আদেশ দিলেন, “দুজনে সৈন্য নিয়ে ঘুরে আরেক পাশে চলে যান। কেউ যেন ওদিক দিয়ে পালাতে না পারে।”

***

গ্রানাইটের চুড়ার গোলাকার বিশাল এক বোল্ডারের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছেন লোথার ডি লা রে। কোলের মাঝে মসার রাইফেল। কপালের ওপর লুটিয়ে পড়েছে নরম সোনালি রঙা চুল।

দক্ষিণের মোপানি জঙ্গলটার দিকেই একমনে তাকিয়ে আছেন। খাড়া গ্রানাইটের দেয়াল বেয়ে ওঠার ধকল এখনো সামলাতে পারেননি।

“আমাকে এক বোতল পানি এনে দাও, ব্যস।” হেনড্রিককে জানাতেই কথামত কাজ করলেন ওভাষো।

মাথা নেড়ে গ্রানাইটের স্ল্যাবের ওপর পড়ে থাকা বাকি জিনিসগুলোও চেক করে দেখলেন লোথার। চারটা হ্যান্ড গ্রেনেড, যেগুলোতে কাঠের হ্যাঁন্ডেল লাগানো আছে। এছাড়া ক্লেইন বয় তার রাইফেল রেখে যাচ্ছে, সাথে বুলেট। তার মানে লোখারের কাছে দুইটা মসার রাইফেল আর দেড়শ’ রাউন্ড গুলি, আছে।

“অল রাইট” সব দেখেশুনে জানালেন লোথার। আমার যা যা দরকার সব আছে। তোমরা এবার রওনা দাও।”

নিজের কামানের গোলার মত মাথাটা ঘুরিয়ে দক্ষিণে তাকালেন হেনড্রিক। পিছু ধাওয়াকারীদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না এখনো। কিন্তু মাথা সরাতে যেতেই আবার থেমে গেলেন। “ধুলা!” প্রায় পাঁচ মাইল দূরে হলেও অস্পষ্ট কুয়াশার মত ঠিকই দেখা যাচ্ছে।

“হ্যাঁ।” মিনিটখানেক আগে লোথারও খেয়াল করেছেন।

“হয়ত জেব্রার দল হবে। এখন যাও। দেরি হয়ে যাবে।”

কিছু না বলে লোখারের হলুদ রঙা চোখের দিকে তাকালেন হেনড্রিক। সাধারণত কখনো লোথারের আদেশের বিপক্ষে যান না। জানেন সেটাই সঠিক কিন্তু এবারে কেন যেন কিছু বলতে মন চাইল; অথচ ভাষাও খুঁজে পাচ্ছেন না। টের পেলেন যেন নিজের শরীরের একটা অংশকেই রেখে যাচ্ছেন এই রৌদ্রে ক্ষয়ে যাওয়া পাথরগুলোর ওপরে। কেবল সহজ, সাধারণভাবে জানালেন, “আমি ওর খেয়াল রাখব।” মাথা নাড়লেন লোথার।

“আমি একটু ম্যানির সাথে কথা বলতে চাই।” রক্তে বিষ মিশে যাওয়ায় কেঁপে উঠলেন, বললেন, “তোমরা নিচে গিয়ে অপেক্ষা করো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পাঠিয়ে দেব।”

“চল,” উঠে দাঁড়িয়ে ক্লেইন বয়কে ইশারা করে শিকারি চিতার মতই ক্ষিপ্রগতিতে কিনারের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন হেনড্রিক। কেবল যাবার আগে একবার পিছু তাকিয়ে ডান হাত তুলে লোথারকে বললেন,

“ভালো থেকো।

“তুমিও ভালো থেকো, বন্ধু।” এর আগে কখনো বন্ধু শব্দটা উচ্চারণ করেননি লোথার। শুনে তাই খানিকটা কেঁপে উঠলেও আর কিছু বললেন না হেনড্রিক।

“ম্যানফ্রেড” বাবার কাছে এসে বসল ম্যানফ্রেড। একাগ্র মনে তাকিয়ে দেখল বাবার চেহারা, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি। ফিসফিস করে বলে উঠল, “পা, আমি যাব না। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”

নিজেকে নরম হতে দিলেন না লোথার, “আমি যা বলেছি তুমি ঠিক তাই করবে।”

“পা—”

“তুমি সবসময় আমার বাধ্য ছেলে হয়ে থেকেছে ম্যানি। তাই তোমাকে নিয়ে আমি অনেক গর্ব করি। এখন আর অবাধ্য হয়ো না। আমি যেন না ভাবতে পারি যে আমার ছেলে একটা কাপুরুষ।”

“আমি কাপুরুষ নই!”

“তাহলে যা করতে হবে তাই করো।” ম্যানি আর কিছু বলার আগে কর্কশ কণ্ঠে লোথার আদেশ দিলেন, “যাও, হ্যাঁঙারস্যাকটা নিয়ে এসো।”

কথামত কাজ করল ম্যানি। পায়ের কাছে ব্যাগ রেখে সুস্থ হাত দিয়ে খুলে ফেললেন লোথার। একটা প্যাকেট নিয়ে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন কাগজ। তারপর গ্রানাইটের উপর ছড়িয়ে দিলেন সবগুলো হীরে। খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে বড় আর সাদা দশটা পাথর বেছে নিলেন।

অতঃপর ছেলেকে আদেশ দিলেন, “তোমার জ্যাকেট খোলো।”

ম্যানফ্রেড জ্যাকেট খুলে বাবার হাতে দিলে পর লাইনিংয়ের মাঝে ছোট্ট একটা গর্ত করে ফেললেন,লোথার।

“এই হীরেগুলোর মূল্য হবে হাজার হাজার পাউন্ড। যা দিয়ে তোমার বড় হওয়া আর পড়াশোনার সব খরচ মেটানো যাবে। আঙুল দিয়ে ঠেলে ঠেলে সবকটা পাথরই লাইনিংয়ের মাঝে ঢুকিয়ে দিলেন।

“কিন্তু বাকিগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি আর ভারি হওয়ায় লুকানোও কষ্টকর হবে। তাই তুমি সাথে নিয়ে না যাওয়াই ভালো।” বহু কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালেন লোথার, “এসো।”

তারপর বড় বড় বোল্ডারগুলো ধরে চলে এলেন এমন এক জায়গায় যেখানে গ্রানাইটের মাঝে চিকন একটা ফাঁক আছে। দেখে মনে হবে বাটালি দিয়ে কাটা হয়েছে। ফাটলটা মাত্র হাত ঢোকানোর মত চওড়া হলেও ভেতরে বেশ গভীর। উঁকি দিয়েও তল দেখা যায় না। ত্রিশ ফুট মতন হতে পারে।

হ্যাঙারস্যাকের দড়ি উপুড় করে ফাটলের মধ্যে ঢেলে দিলেন লোথার। তারপর ফিসফিস করে ছেলেকে জানালেন, “এই জায়গাটা মনে রেখো। প্রয়োজনের মুহূর্তে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে এসব পাথর।”

পিতা-পুত্র দুজনে একসাথে উঁকি দিতেই প্রায় ত্রিশ ফুট নিচে হালকা রঙের আভা চোখে পড়ল। তবে না জানলে পথচারীদের কেউ বুঝতেই পারবে না যে এখানে কোনো সম্পদ লুকানো আছে।

“অল রাইট। হেনড্রিক তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এখন যাও ম্যানি।” হামাগুড়ি দিয়ে জায়গাটা থেকে সরে এলেন লোথার।

ইচ্ছে করল শেষবারের মতন ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন; বুক ভরে ছেলের গন্ধ নেন, নাকে-মুখে চুমু দেন। কিন্তু নড়লেন না লোথার। জানেন তাহলে দু’জনেই দুর্বল হয়ে পড়বেন। তাই কর্কশ কন্ঠে আদেশ দিলেন, “যাও!” ফুঁপিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রইল ম্যানি।

“আমি তোমার সাথে থাকব।” ছেলের কব্জি ধরে অতঃপর হাত দিয়ে কাঁধ চেপে ধরলেন লোথার। “তুমি কি চাও আমি তোমার এই কাঁদুনে চেহারাটাই মনে রাখি?” ..

“পা, প্লিজ আমাকে তোমার কাছে থাকতে দাও।”

ছেলের হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এসে প্রচণ্ড জোরে ম্যানিকে এক চড় কষালেন লোথার। সাথে সাথে গালে ফুটে উঠল লাল লাল দাগ; এমন কি নাক কেটে ঠোঁটের উপরও গড়িয়ে পড়ল রক্ত। এতটাই বিস্মিত হয়ে গেল যে বাবার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল ম্যানি।

“চলে যাও এখান থেকে নিজের সর্বশক্তি জড়ো করে ধমক দিলেন লোথার।

নড়ে উঠে সামনে এগোল ম্যানি। চোখে এখনো অবিশ্বাস। কিছুতেই ভাবতে পারছে না যে বাবা কেন এমন করল। কিনারের দিকে যেতেই হোঁচট খেয়ে আবার পিছু ফিরে তাকাল,

“বাবা! প্লিজ, আমাকে”

“যাও, আর কোনো কথা নয়, যাও!”

এগোতে গিয়ে ধপাস করে ওপাশে গড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেন্ড। আর ছেলে চোখের আড়াল হতেই প্রথমবারের মত ফুঁপিয়ে উঠে নিঃশব্দে পুরো শরীর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন লোথার।

“জ্বর, আসলে জ্বরটাই বোধ হয় আমাকে দুর্বল করে ফেলেছে।” নিজেকে প্রবোধ দিলেও কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ছেলের অনিন্দ্যসুন্দর সোনালি চেহারা। আপন মনেই ফিসফিস করে বলে উঠলেন, “মাফ করে দে বাবা, মাফ করে দে। নয়ত তোকে বাঁচানো যেত না।”

***

লোথার নির্ঘাত বেহুশ হয়ে পড়েছিলেন। কারণ আচমকা জেগে উঠে প্রথমে ঠাহর করতে পারলেন না যে কোথায় আছেন কিংবা কীভাবে এসেছেন এ জায়গায়। তারপরেই অবশ্য হাতের ক্ষতের গন্ধে সবকিছু মনে পড়ে গেল। হামাগুড়ি দিয়ে চুড়ার কিনারে গিয়ে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল ছোট্ট দুই মানবাকৃতির দেহ।

“বুশম্যান!” ওদের এত দ্রুত এগিয়ে আসার কারণটাও বুঝতে পারলেন লোথার, “ও আমার পিছনে পোষা বুশম্যানদের লাগিয়ে দিয়েছে। এ কারণেই তার সমস্ত কৌশলও বৃথা গেছে। কারণ পদচিহ্ন দেখে কারো পিছু নিতে এদের মত ওস্তাদ অন্য কোনো গোত্র নেই।

বুশম্যানদের পেছনে পেছনে আসছে মোট সাতজন। কিন্তু চোখ দুটো সরু করেও ঘোড়সওয়ারদের মধ্যে নারী শরীরটাকে আলাদা করতে পারলেন না লোথার। মোপানির ঘন ঝাড়ে আটকে যাচ্ছে দৃষ্টি। এবার নিজের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিলেন। পিছু ধাওয়াকারীদেরকে যতদূর সম্ভব দেরি করিয়ে দিতে হবে আর এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যেন ওরা ভাবতে বাধ্য হয় যে তিনি গোটা দল নিয়েই উপরে বসে আছেন।

এক হাতে কাজ করাটা সত্যিই দুঃসাধ্য। তারপরেও বহু কষ্টে ক্লেইন বয়ের রাইফেলটাকে সমভূমির দিকে নিশানা করে ফিট করে রাখলেন।

খানিক বাদে বাদেই মিনিটখানেকের জন্য হলেও বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। পা দুটো যেন কিছুতেই আর ভার বইতে নারাজ। অন্যদিকে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসছে।

আবারো একবার নিচে তাকাতেই দেখলেন যে প্রায় সমভূমির কিনারে চলে এসেছে পিছু ধাওয়াকারী। এবারে সেনটেইনকে চিনতে পারলেন। এমনকি গলার কাছে পেঁচানো হলুদ স্কার্ফটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জ্বরতপ্ত শরীরেও অনুভব করলেন এক অম্ল-মধুর শ্রদ্ধা, “হায় ঈশ্বর, কখনোই হারতে চায় না। মনে হয় নরকের ওপাড়েও ঠিকই পিছু নেবে।”

তারপর নষ্ট পানির বোতলগুলোর কাছে গিয়ে তিন সারিতে সাজিয়ে লেদার স্ট্র্যাপ দিয়ে এমনভাবে সাজালেন যেন চাইলেই এক টানে কাজে লাগানো যায়।

“সোজা গুলি করা ছাড়া আর কিছু করার নেই আসলে।” ফিসফিস করে নিজেকেই যেন শোনালেন লোথার। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে গলা; পুরো শরীর যেন দাউদাউ করে জ্বলছে। তাড়াহুড়া করে পানির বোতলের মুখ খুলে কয়েক ঢোঁক খেয়ে নিতেই অবশ্য ভালো লাগল। অতঃপর নিজের জ্যাকেট ভাজ করে কুশন বানিয়ে উপরে মসার রাইফেল রেখে তাক করলেন সামনের দিকে। ততক্ষণে নিচে মৃত ঘোড়াটার কাছে এসে পৌঁছে গেছে সেনটেইনের দল। এতগুলো ঘোড়া দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন লোথার।

বহু নিচে লুটিয়ে পড়ল ব্লেইন ম্যালকমসের ঘোড়া। নিজের মসার ছাড়াও স্ট্যাপ টেনে ক্লেইন বয়ের রাইফেলও কাজে লাগাচ্ছেন। অদ্ভুত ব্যাপার হল ঘটনার উত্তেজনায় যেন কমে গেছে দেহের তাপমাত্রা। স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে দৃষ্টিশক্তি। একের পর এক বুলেট গিয়ে ধরাশায়ী হল সবকটা ঘোড়া কেবল বেঁচে গেল সেনটেইনেরটা। কিন্তু কিছুতেই সেদিকে ট্রিগার টিপতে পারলেন না।

মোপানির পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল সেনটেইন। সাথে ব্লেইন। শোনা যাচ্ছে ছুটন্ত সৈন্যদের আর্তচিৎকার। চাইলে তাদেরকেও পরিষ্কার নিশানা বানিয়ে ফেলতে পারেন লোথার। তবে এর পরিবর্তে ভাবলেন দেখা যাক কতক্ষণ এভাবে পার করে দেয়া যায়।

একেবারে শেষ সৈন্যটাও মোপানির আড়ালে চলে যেতেই খেয়াল হল প্রচণ্ড কাঁপছেন আর একই সাথে ঘামছেন।

“না, না, এভাবে হবে না। তৈরি হতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে।”

এবার দ্বিতীয় রাইফেলের কাছে গিয়ে রিলোড করে নিলেন। খানিক বাদেই চোখে পড়ল গিরি সংকটের মুখে হেলমেট। সেই বোয়ার যুদ্ধের সময় থেকেই সকল সৈন্য চেনে এই অনর্থক হাস্যকর কৌশল।

“ঠিক আছে দেখা যাক তাহলে। কে কাকে খোয়াড়ে পোরে।” হেসে ফেললেন লোথার।

দুটো রাইফেল থেকে একসাথে গুলি ছুড়লেন। পাশাপাশি খালি পানির বোতলের তূপ ধরেও ঝাঁকুনি দিলেন। অত নিচ থেকে আকাশের দিকে তাকালে যে কেউ বোতলগুলোকেও রাইফেলম্যান বলে ভুল করবে।

এবার নিশ্চয়ই পাহাড়টাকে চক্কর কাটার জন্য সৈন্য পাঠাবে।” অনুমান করলেন লোথার। কোনো সমস্যা নেই; মসার প্রস্তুত আছে।

“অন্ধকার নামতে এখনো পাঁচ ঘণ্টা বাকি। হেনড্রিক আর ম্যানি নদী তীরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কাল ভোর হয়ে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত এদেরকে আটকে রাখতেই হবে।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই ডান দিকে নড়াচড় দেখা গেল। লোকগুলোর মাথার উপরের মোপানির গুঁড়ি টার্গেট করে গুলি ছুড়লেন লোথার। ভেজা সাদা গাছের ছাল ছিটিয়ে পড়ল বাতাসে।

“ভাগ, বেজন্মার দল ভাগ।” আবার হেসে ফেললেন। হিস্টিরিয়ার মত কিছুতেই যেন থামতে পারছেন না। তবে এরই ফাঁকে চোখের সামনে ভেসে উঠল ম্যানির মুখ।

“বাছা আমার। ঈশ্বর, আমি কেমন করে ওকে ছাড়া থাকব।”

আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে অন্ধকারে ছেয়ে গেল চোখের সীমানা। মাথাটাও আপনাতেই বুকের উপর ঝুলে পড়ল। চেতনা হারালেন লোথার।

একটু পরেই আবার জ্ঞান ফিরতে খেয়াল হল যে সূর্যের অসহ্য গরমটা কমে গেছে। বুক ভরে ঠাণ্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস নিলেন। সাথে সাথে তৃষ্ণাও পেল। কিন্তু বোতলের ঢাকনা খোলাটাও যেন এক কঠিন পরিশ্রম। এক চুমুক খেতেই গড়িয়ে পড়ে ভিজে গেল শার্ট। উত্তপ্ত পাথরে পড়তেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল মূল্যবান পানিটুকু। বোতলটা তুলে মুখ আটকে ফুঁপিয়ে উঠলেন লোথার।

কিন্তু কান পাততেই শুনতে পেলেন পাহাড়ে মানুষের আওয়াজ। গ্রানাইটের সিঁড়িতে স্টিলের লরির ঠকঠাক শুনেই কাঁধে রাইফেল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিনারের কাছে এসে পাথরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

উপরে যেহেতু আসেনি, তার মানে এখনো সিঁড়িতে। সমস্ত মন-প্রাণ ঢেলে কান পাতলেন লোথার। হ্যাঁ, ওই তো কাছেই চলে এসেছে। এমনকি কাপড়ের খসখসানির শব্দও কান এড়ালো না।

ওরা পেছন থেকে উঠছে।” এমনভাবে বললেন যেন ছোট্ট কোনো শিশুকে বোঝাচ্ছেন কী ঘটছে। কাঠের হ্যাঁন্ডেলের দিকে তাকাতেই মনে হল, “ওরা বড় বেশি কাছে চলে এসেছে।”

গ্রেনেডটাকে তুলে ফায়ারিং পিন টান দিলেও প্রথমটাতে জ্যাম হয়ে থাকায় কাজ হল না। তারপর এটার উপর ভর দিয়ে বসে টানতেই খুলে এল পিন।

সময় হিসাব করে কিনার দিয়ে গড়িয়ে ফেলে দিলেন গ্রেনেড। সাথে সাথেই কে যেন চিৎকার করে উঠল,

“হায় হায়! এটা একটা গ্রেনেড়!” প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন লোথার।

“যা ব্যাটা ইংরেজ শেয়াল।” হাঁচোড়-পাঁচোড় করে পালানোর জন্যে ফিরতি পথেই নামতে শুরু করল নিচের দল। কিন্তু কোনো বিস্ফোরণ ঘটল না।

হাসি থামিয় দিলেন লোথার। “ধুত্তোরি।”

আর তার পরেই দেরিতে হলেও হঠাৎই কানে এল প্রচণ্ড গর্জন। চূড়া থেকে অনেক নিচে বিস্ফোরিত গ্রেনেডের আওয়াজ ছাপিয়েও শোনা গেল একজন মানুষের আর্তনাদ।

তাড়াতাড়ি আবার নিচে উঁকি দিলেন লোথার। তিনজন খাকি ইউনিফর্মড সৈন্য দেখা দিতেই কোমরের কাছে মসার তুলে পরপর গুলি ছুড়লেন। আর যায় কোথায় পড়িমড়ি করে বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল সবকটা মাথা। একজন আবার শার্পনেলের গুতো খেয়ে আহত হয়েছে। সঙ্গীরা ধরে তাকে নিরাপদে অন্যদিকে সরিয়ে নিল।

এতসব পরিশ্রমের ধকলে একেবারে নিঃশেষ হয়ে পড়লেন লাথার। প্রায় একঘন্টা সেখানেই পড়ে থেকে বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার গেলেন দক্ষিণ দিকে। নিচে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল মৃত ঘোড়ার ঢোলা পেট। পানির বোতলগুলো এখনো সেখানেই আছে। তার মানে এগুলোর কাছে চুম্বকের টানে ওদেরকে আসতেই হবে।” আপন মনেই ভাবলেন লোথার।

খানিক বাদে মনে হল আবার বুঝি তার দৃষ্টিশক্তি আঁধার হয়ে এসেছে। কিন্তু না পশ্চিমে তাকাতেই দেখা গেল মিলিয়ে যাচ্ছে সূর্যের শেষ কমলারশ্মি। তারপর ঝুপ করে নেমে এল আফ্রিকার রাত। চুপচাপ শুয়ে থেকে নিচের লোকদের নড়াচড়ার জন্যে অপেক্ষা করছেন লোথার। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব রহস্যময় যেসব আওয়াজ যেমন শিকারি বাদুরের ডানা ঝাঁপটানো শেয়াল আর কীট-পতঙ্গের শব্দ ছাপিয়ে মানুষের তৈরি শব্দ শোনা বেশ কঠিন কাজ।

তবে লোহার পা-দানির উপর ক্লিক শব্দ হতেই সচকিত হয়ে উঠলেন লোথার। হাত ঘুরিয়েই ছুঁড়ে মারলেন গ্রেনেড। বিস্ফোরণের আলোয় দেখা গেল মৃত ঘোড়াগুলোর কাছে বেশ কয়েকজন হাঁটছে। দু’জনে ধারণা করলেও নিশ্চিত না হয়েই ছুঁড়ে মারলেন দ্বিতীয় গ্রেনেড।

আরো একবার কমলা আলোয় চোখে পড়ল মানুষের ছুটন্ত দেহ। নাহ, পানির বোতল নিতে পারেনি।

কিন্তু তাঁর নিজের গ্রেনেডও শেষ। আর মাত্র একটা আছে। বুকের কাছে পরম ধনের মত সেটাকেই আঁকড়ে ধরে উঁচু গলায় বলে উঠলেন, “ওদেরকে কিছুতেই পানি নিতে দেব না। আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত আটকে রাখতেই হবে।” অথচ ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন শরীরের কাহিল দশা। মাথা ক্রমাগত ঘুরছে। তারপরেও দূরত্ব আর সময়ের হিসাব করে বের করলেন, “আর আট ঘণ্টা গেলেই নিরাপদে নদী পার হয়ে যাবে হেনড্রিক আর ম্যানি।”

লোথার!” আচমকা নিজের নাম শুনে ভাবলেন জ্বরতপ্ত মনের কল্পনা; কিন্তু না। আবার শোনা গেল, লোথার।”

উত্তর দেবার জন্যে মুখ খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললেন। দেখা যাক কী বলতে চায় সেনটেইন কোর্টনি।

“লোথার, আমাদের একজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।” লোথার হিসাবে করে দেখলেন সেনটেইন বনের কিনারে বসে কথা বলছেন। কল্পনার চোখে স্পষ্ট দেখলেন সাহসী আর গাঢ়রঙা দু চোখ জোড়া।

“আমি এখনো কেন তোমাকে এত ভালোবাসি?” ফিসফিস করে উঠলেন লোথার।

“ওর জন্য পানি দরকার।” সেনটেইনের গলা যেন স্পর্শ করে গেল লোখারের সারা শরীর। আবেগে চোখে জল এসে গেল পর্যন্ত।

“লোথার! আমি পানি নিতে আসছি।”

“আরো কাছে চলে এল সেনটেইনের গলা। তার মানে গাছের সীমানার বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

“আমি একদম একা লোথার।” একেবারে খোলা জায়গায় মাঝামাঝি চলে এলেন সেনটেইন।

“পিছিয়ে যাও!” চিৎকার করতে চাইলেন লোধার। কিন্তু পারলেন না। “আমি তোমাকে পানি নিতে দেব না, ম্যানির জন্য এটা করতেই হবে।”

গ্রেনেডের ফায়ারিং রিংয়ের হুক ধরলেন লোথার।

“আমি প্রথম ঘোড়াটার কাছে পৌঁছেছি, শুধু এক বোতল পানি নেব ব্যস।” জানিয়ে দিলেন সেনটেইন। একেবারে লোথারের হাতের মুঠোয় চলে এসেছেন সেনটেইন। চাইলে গ্রেনেডটাকে ছুঁড়তেও হবে না। শুধু গড়িয়ে দিলেই হবে। কিন্তু ঘৃণা নয় বরঞ্চ এত ভালোবাসেন এই নারীকে যে কেঁদে ফেললেন লোথার।

“আমি ফিরে যাচ্ছি লোথার, শুধু একটা বোতল নিয়েছি।”

এবারে কিন্তু সেনটেইনের গলায় এক ধরনের কৃতজ্ঞতা, তাদের সম্পর্কের এক ধরনের স্বীকৃতি টের পেলেন লোথার। এ এমন এক বন্ধন, সময় যার গায়ে এতটুকু আঁচড় ফেলতে পারেনি।

তারপরেই আবার শোনা গেল সেনটেইনের গলার স্বর প্রায় ফিসফিস করে লোথারকে বললেন, “ঈশ্বর যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন, লোথার ডি লা রে।”

আর তার পরেই চুপচাপ হয়ে হয়ে গেল চারপাশ।

মন খারাপ করে ফেললেন লোথার। এতটা গভীরভাবে আর কখনোই আহত হননি। সবকিছু এমনভাবে সমাপ্ত হল যে মনে হল অসহ্য হয়ে উঠল এ বেদনার ভার। গলার কাছে উঠে আসা কান্না থামাবার জন্য কাঁধের ওপর মাথা কাত করে দিলেন। আচমকাই টের পেলেন তিনি যেন কোনো অতল গহ্বরে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছেন আর পড়েই যাচ্ছেন।

***

“মারা গেছে।” পড়ে থাকা মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বল উঠলেন ব্লেইন ম্যালকম। অন্ধকারে দু’দিক দিয়ে চূড়ায় উঠেছে তার দল তারপর ভোর হতেই একত্রে ধেয়ে এসেও অবাক হয়ে গেলেন, “কিন্তু বাকিরা কোথায়?”

তাড়াতাড়ি বোল্ডারদের পিছনে খুঁজে এলেন সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার, “পাহাড়ে আর কেউ নেই স্যার। নিশ্চয় ভেগে গেছে।”

“ব্লেইন!” তাড়াতাড়ি ডাকলেন সেনটেইন, “কী হয়েছে?” ওঠার আগে জোর করেই তাকে নিচে রেখে এসেছেন ব্লেইন। কিন্তু ঠিকই চলে এলেন সেনটেইন। “ওরা কোথায়?” আর তারপরেই মৃতদেহটা দেখে সেখানেই বসে পড়লেন। লোথারের পাশে। “ওহ, ঈশ্বর।”

“ওহ, তাহলে এই লোকটাই ডি লা রে।” জানতে চাইলেন ব্লেইন।

“বাকিরা কোথায়? উদ্বিগ্ন মুখে ব্লেইনের দিকে তাকালেন সেনটেইন।

“এখানে আর কেউ নেই।” মাথা নাড়লেন কর্নেল।” ডি লা রে আমাদেরকে বোকা বানিয়ে ওদেরকে সরে পড়তে সাহায্য করেছে। এতক্ষণে বোধ হয় নদী পার হয়ে গেছে।”

ম্যানফ্রেড। এই প্রথমবারের মত ছেলের নাম মনে আনলেন সেনটেইন। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হল, হৃদয়ের গভীরে পুত্র হারানোর মত শোকও বোধ করছেন। চেয়েছিলেন ও এখানেই থাকুক। ছেলেকে শেষবারের মতন অন্তত দেখবেন। চোখ মেলে লোথারের দিকে তাকাতেই হাহাকারে ভরে উঠল সেনটেইনের অন্তঃস্থল।

কনুইয়ের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে পড়ে আছেন লোথার। আস্তে করে তার কানের নিচে করোটিভ আর্টারীতে হাত রেখেই চমকে উঠলেন সেনটেইন। দেহতৃক এখনো বেশ উত্তপ্ত হয়ে আছে।

“ও বেঁচে আছে।”

“তুমি নিশ্চিত?” ধুপ করে সেনটেইনের পাশেই বসে পড়লেন ব্লেইন। দু’জনে মিলে লোথারকে গড়িয়ে সোজা করতেই দেখা গেল পড়ে আছে আরেকটা গ্রেনেড।

“তুমি ঠিকই বলেছ।” নরম গলায় জানালেন ম্যালকমস, “সে চাইলেই কিন্তু তোমাকে গত রাতেই খুন করতে পারত।”

লোথারের মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। সুদর্শন সোনালি মুখখানা জ্বরের অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে গেছে।

“প্রচণ্ডভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে শরীর। বোতলে আর পানি আছে?” ব্লেইন লোথারের মুখে পানি ঢালতেই হাতের ব্যান্ডেজ খুলে ফেললেন সেনটেইন।

“রক্ত দূষিত হয়ে গেছে।” পচা মাংসের গন্ধও পেলেন। “হাত কেটে ফেলতে হবে। হাতের ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন হায়েনা কিংবা চিতা কামড়ে দিয়েছে।

“নদীর কাছে একটা পর্তুগিজ রোমান ক্যাথলিক মিশন আছে। যদি জীবিত ওখানে নিয়ে যেতে পারি তাহলে বলতে হবে যে সে সত্যিই ভাগ্যবান।” উঠে দাঁড়ালেন ব্লেইন। “সার্জেন্ট, তোমার একজন সেনা পাঠিয়ে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এসো আর বাকিদেরকে পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি খোঁজার কাজে লাগিয়ে দাও। মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যমানের হীরে খোয়া গেছে।”

কর্নেলকে স্যালুট করে ত্ৰস্তপায়ে চলে গেলেন সার্জেন্ট।

আবারো সেনটেইনের পাশে বসে পড়লেন ব্লেইন, “ফার্স্ট এইড কিট আসতে আসতে ওর দেহ তল্লাশি করে দেখা যাক। যদি কোনো হীরে থেকে থাকে।”

“সম্ভাবনা সত্যিই নেই। নিশ্চয় ছেলে আর ওই ওভাম্বো রাফিয়ানটাকে দিয়ে দিয়েছে।”

লোথারের নোংরা টিউনিক খুলে পরীক্ষা করে দেখলেন কর্নেল। আর ক্ষতস্থান মুছে পরিষ্কার সাদা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন সেনটেইন।

খানিক বাদেই ফিরে এলেন হ্যানসমেয়ার। “কিছুই নেই স্যার।”

“ঠিক আছে সার্জেন্ট। এখন এই হতচ্ছাড়াটাকে ঘাড় গলা না ভেঙেই নিচে নামাতে হবে।”

পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রার জন্য তৈরি হয়ে গেল পুরো দল। লোথার আর আহত সৈন্যকে মোপানির ডাল দিয়ে তৈরি খাঁটিয়াতে শুইয়ে অবশিষ্ট একমাত্র ঘোড়ার সাথে জুড়ে দেয়া হল।

কিন্তু সবাই উত্তরমুখে হাঁটা ধরলেও দাঁড়িয়ে গেলেন সেনটেইন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকাভাবে ব্লেইনের কাঁধে ভর দিয়ে জানালেন, “ব্লেইন, আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এই বৈরী প্রকৃতি আমার অনেক কিছুই কেড়ে নিল।”

“বুঝতে পেরেছি। হিরের লোকসান আসলেই খুব বড় ক্ষতি করে দিল। তবে এখনো হীরে উদ্ধারের আশা শেষ হয়ে যায়নি কিন্তু।”

না ব্লেইন। আমরা দুজনেই জানি এ কথা সত্যি নয়। হিরেগুলো আর ফিরে পাব না।”

“চুপ করে রইলেন রেইন। সত্যিই মিথ্যে আশা দেয়ার কোনো মানে হয় না।

“আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি ব্লেইন। আস্তে আস্তে ধসে পড়বে এত দিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা স্বপ্ন। হ্যাঁ, হয়ত ভিক্ষা চেয়ে ধার করে কিছুটা সময়ের জন্যে নিষ্কৃতি পাব; কিন্তু ভিত্তিটাই তো নড়বড়ে হয়ে গেছে। এক মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ মোটেই ছোট কোনো পরিমাণ নয় ব্লেইন।”

সেনটেইন, আমি কিন্তু দরিদ্র নই, “আমিও তোমাকে সাহায্য করতে হাত বাড়িয়ে ব্লেইনের ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখলেন সেনটেইন।

“তোমার কাছে আমার একটাই চাওয়া আছে কেবল সামনের দিনগুলোতে আমি শান্তির কোনো একটা আশ্রয় চাই।”

“যখনই প্রয়োজন হবে আমাকে পাবে সেনটেইন। শুধু একবার ডেকে দেখো, প্রমিজ করছি আমি ছুটে আসব।”

“ওহ, ব্লেইন, যদি সত্যিই তাই হত!” মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন ব্লেইন।

“ইয়েস সেনটেইন” এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন ব্লিইন।

***

কনুইয়ের দুইঞ্চি নিচ থেকে লোথার ডি লা রে’র হাত কেটে ফেলে দিলেন পর্তুগিজ মিশনের যাজক ডাক্তার। অপারেশনের পুরো সময়টাতে সার্জিক্যাল মাস্ক মুখে দিয়ে ডাক্তারকে সাহায্য করেছেন সেনটেইন। তবে শেষ হতেই ছুটে গিয়ে বমি করাও কিছুতেই আটকাতে পারেননি। মিশনের কুঁড়েঘরে তাকে একাকী একটা রুম দেয়া হলেও বিতৃষ্ণা কাটাতে পারলেন না সেনটেইন। মনে হচ্ছে সারা শরীরে, চুলে, তুকে ছড়িয়ে পড়েছে গ্যাংগ্রিনের গন্ধ। একদা যে মানুষটাকে ভালোবেসেছিলেন তার পঙ্গু মুখচ্ছবি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

কিন্তু তারপরেও কাজ হল না। পরের দিন দুপুরবেলা যাজক এসে বিড়বিড় করে জানালেন নিজের মনস্তাপের কথা, “আমি আসলে দুঃখিত। সংক্রমণ এত তীব্র যে আরেকটু কাটতে হবে।”

দ্বিতীয়বার ব্যাপারটা আরো অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেল। আরেকটু হলে বোধ হয় তিনি নিজেই অজ্ঞান হয়ে যেতেন। সেনটেইনের চোখের সামনে লোথারের আহত হাত কাঁধের নিচ থেকে কেটে ফেলে দিলেন ডাক্তার।

পরবর্তী তিনদিন কোমায় পড়ে রইলেন লোথার। মনে হল বুঝি জীবন মৃত্যুর সীমানাও পার হয়ে গেছেন।

এমনকি ডাক্তারও আশা করতে ভয় পেলেন।

যাই হোক, তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় লোথারের রুমে ঢুকতেই সেনটেইনের চোখে পড়ল হলুদ চোখ দুখানা মেলে তাকে দেখলেন লোথার।

তারপর আরো দুদিন পর ব্লেইনকে যাবার অনুমতি দিলেন ডাক্তার, মওকা পেয়ে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেন কর্নেল।

“আমার সার্জেন্ট তোমার সার্বক্ষণিক চার্জে থাকবে। তারপর উইন্ডহকে নিয়ে যাবার পর বিচার হবে।”

বিবর্ণ, হাড়সর্বস্বদেহ নিয়ে ভাবলেশহীন চোখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন লোথার।

“তো, লোথার ডি লা রে ফাঁসির দড়ি এড়াবার মত ভাগ্যবান হয়ত তুমি নও। তবে যদি হিরেগুলো কোথায় আছে বলল, তাহলে হয়ত লড়াই করার খড়কুটো পেয়ে যাবে।”

মিনিটখানেক অপেক্ষায় পরেও লোখারের দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন দেখতে পেলেন না কর্নেল। বরঞ্চ মাখা হেলিয়ে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন লোথার।

“তুমি তো জানেনা যে আমিই এ অঞ্চলের প্রশাসক। সুতরাং আমার সুপারিশে অবশ্যই কাজ হবে। হিরেগুলো দিয়ে দও। বিনিময়ে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা আমি দিব।”

চোখ বন্ধ করে ফেললেন লোথার।

“তো ঠিক আছে লোথার। দুজনেই বুঝতে পারলাম কী ঘটতে যাচ্ছে।” সার্জেন্টকে ডেকে চব্বিশ ঘণ্টাই লোথারকে গৃহবন্দি রাখার আদেশ দিলেন কর্নেল।

অতঃপর লম্বা লম্বা পা ফেলে নদীর তীরে কুঁড়েঘরে অপেক্ষারত সেনটেইনের কাছে চলে এলেন ব্লেইন। ধপ করে ক্যাম্প চেয়ারে বসেই একটা চুরুট ধরালেন। লোথারের ওপর রাগকে কিছুতেই কেন যেন দমাতে পারছেন না।

“লোকটার সাথে কিছুতেই আপোষ করা গেল না। আমি নিজে তাকে হিরের বিনিময়ে জীবন ফিরিয়ে দেবার নিশ্চয়তা দিলাম। অথচ কত বড় সাহস! উত্তর পর্যন্ত দিল না।”

চুরুটে লম্বা একটা টান দিয়ে জানালার ওপাশের নদীর দিকে তাকালেন ব্লেইন, “তুমি ভেবো না। যা করেছে তার জন্যে অবশ্যই মূল্য দিতে হবে।”

“ব্লেইন” কর্নেলের পেশিবহুল বাদামিরঙা বাহুতে আলতো করে হাত রাখলেন সেনটেইন, “তোমার মত মানুষের ক্ষেত্রে এতটা বাতুলতা শোভা পায় না।”

“সেনটেইন, তুমি জানো এই অভিযানে আমার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমি আমার কাজ ফেলে এখানে এসেছি। প্রিটোরিয়াতে আমার ঊর্ধ্বতনদেরকে নাখোশ করেছি। তাই হ্যানসমেয়ার আর তার সৈন্যরা এখানেই ডি লা রের কাছে থাকবে। সুস্থ হয়ে উঠলে উইন্ডহকে নিয়ে আসবে। তবে আমরা নদীপথে রুন্টু গিয়ে পুলিশ ট্রাক ঠিক করে নেব।”

সেনটেইনও মাথা নাড়লেন, “হুম, আমাকেও ফিরে গিয়ে অনেক কিছুর দেখভাল করতে হবে।”

“কাল সকালের প্রথম আলো ফুটলেই আমরা রওনা দেব।”

“ব্লেইন, যাবার আগে আমি লোথার ডি লা রের সাথে একবার কথা বলতে চাই।” খানিকটা দ্বিধার স্বরে জানালেন সেনটেইন, একাকী। প্লিজ ব্লেইন মানা করো না।”

***

কুঁড়েঘরের ভেতরকার অন্ধকারের সাথে চোখ সইয়ে নেয়ার জন্য দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন।

পায়ের ওপর সস্তাদরের কম্বল বিছিয়ে পাড়ুর মুখে বসে আছেন লোথার।

“সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার কয়েক মিনিটের জন্য কি আমি একা থাকতে পারি এখানে?”

পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হ্যানসমেয়ার ফিসফিস করে সেনটেইনকে অভয় দিয়ে গেলেন, “আমাকে এক ডাক দিলেই চলে আসব মিসেস কোর্টনি।”

একা হয়ে কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর সেনটেইনই প্রথম কথা বললেন,

“তুমি যদি আমাকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে থাকো তাহলে বলতে হবে যে সফল হয়েছে।” মুখে কিছু না বলে হাতবিহীন কাঁধে হাত বোলালেন লোথার। দৃশ্যটা সত্যিই বেদনাদায়ক। তারপর জানতে চাইলেন, “কে কাকে শেষ করেছে সেনটেইন?” চোখ নামিয়ে নিলেও খানিক বাদে সেনটেইন আবার জানতে চাইলেন,

“আমার কাছ থেকে যা চুরি করেছে তার একটা অংশও কি ফেরত দিতে পারবে না? অন্তত বহু আগে আমাদের মাঝে যে সম্পর্ক ছিল তার খাতিরে?”

এবারও উত্তর না দিয়ে অক্ষত হাত তুলে বুকের পুরাতন একটা চিহ্নের উপর হাত বোলালেন লোথার। কেঁপে উঠল সেনটেইন।

লুসার পিস্তল দিয়ে গুলি করে একদা এ দাগ তিনিই তৈরি করেছেন লোখারের বুকে।

“ছেলেটার কাছে আছে হিরেগুলো, তাই না?” তোমার বেজন্মা ছেলে বলতে গিয়েও নিজেকে কোনোমতে শুধরে নিয়ে বললেন, “তোমার ছেলে?”

লোথার চুপ করে আছেন শুনে জেদের স্বরে সেনটেইনের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “আমাদের ছেলে ম্যানফ্রেড?”।

“তোমার মুখ থেকে কথাটা শুনব কখনো ভাবিনি।” কণ্ঠস্বরের আনন্দ আর খুশি লুকাতে পারলেন না শোখার, “যখন তুমি ওকেও ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে তখন কি মনে হয়নি যে ও আমাদেরই ভালোবাসার নিদর্শন?”

“না” তীব্রভাবে মাথা ঝাঁকালেন সেনটেইন, “তুমি আমাকে এখনো চেনোনি।”

“ও তোমার পথে এলে তুমি অবশ্যই ওকে শেষ করে দিতে।” সোজা সাপটাভাবেই জানিয়ে দিলেন লোথার।

“তোমার সত্যিই তাই মনে হয়?” একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন, “তোমার ধারণা আমি এতটাই নিষ্ঠুর যে নিজের ছেলের ওপর প্রতিশোধ নেব?”

“তুমি তো কখনো ওকে স্বীকৃতিই দাওনি।”

“এখন দিচ্ছি। গত কয়েক মিনিটে তো বেশ কয়েকবারই বলেছি এ কথা।”

“তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ যে ওর কোনো ক্ষতি করবে না?”

“আমাকে প্রমিজ করতে হবে না, লোথার ডি লা রে! তুমিও তা জানো। আমি ম্যানফ্রেডের কখনো কোনো ক্ষতি করব না।”

“আর এর পরিবর্তে আমার কাছ থেকে নিশ্চয় কিছু চাও” সামনে ঝুঁকে এলেন লোথার। শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় বেশ ঘামছেন। পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সেই কটু গন্ধ।

“তুমি কি পরিবর্তে কিছু দিতে চাও?” আস্তে করে জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“না। নাথিং, কিছুই না।” ক্লান্ত হয়ে আবার পাশ বালিশে হেলান দিলেন লোথার, “এখন তাহলে তোমার প্রতিজ্ঞা ফিরিয়ে নিবে নিশ্চয়?”

“আমি তো কোনো প্রতিজ্ঞাই করিনি। তবে হ্যাঁ আবারো বলছি, আমাদের ছেলে ম্যানফ্রেড আমার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইচ্ছাকৃতভাবে কখনোই ওর কোনো ক্ষতি করব না। তবে তোমার ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”

মুখ ঘুরিয়েই সার্জেন্টকে ডাক দিলেন সেনটেইন।

পেছন থেকে দুর্বল স্বরে ডাক দিলেন লোথার। বলতে চাইলেন, “পাহাড়ের চূড়ার ফাটলের ভেতরেই পড়ে আছে তোমার হীরে কিন্তু সেনটেইন যখন তাকালেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বললেন, “বিদায় সেনটেইন।” অবশেষে সবকিছু সাঙ্গ হল।

***

আফ্রিকার সবচেয়ে সুন্দর নদীগুলোর একটা হল ওকাভাঙ্গো। তবে স্বচ্ছ হ্রদ আর প্যাপিরাসের ঝাড় থাকলেও কালাহারির মরুভূমির কাছে এসে শীর্ণ হয়ে নিষ্ঠুর বালির নিচে হাওয়া হয়ে গেছে পুরো নদী।

এ নদীর সবচেয়ে চওড়া অংশ দিয়েই এবার বাড়ি ফিরবেন সেনটেইন আর ব্লেইন। বাহন হিসেবে আছে বিশ ফুট লম্বা ক্যাম্প। জলহস্তীর আচানক আক্রমণ ঠেকাবার জন্য কোলের ওপর লি এনফিল্ড নিয়ে বসে আছেন ব্লেইন।

আফ্রিকার এ অংশে আগে আর কখনো আসেননি সেনটেইন। তাই নদী আর এর তীরবর্তী জীবনযাত্রা তার জন্যে সম্পূর্ণভাবেই নতুন। অন্যদিকে এ অঞ্চল সম্পর্কে ব্লেইন অত্যন্ত দক্ষ। ১৯১৫ সালে জেনারেল স্মুটের বাহিনির সাথে এসেছিলেন বিধায় এখানকার প্রতিটি গাছ, পাখি আর প্রাণী সম্পর্কে জানেন।

খানিক বাদে হঠাৎ করেই বদলে গেল নদীর প্রকৃতি। কোনো কোনো জায়গা এতটাই সরু যে তীক্ষ্ণ পাথরে ঘষা খেয়ে ক্যানুই ফুটো হয়ে যাওয়ার দশা হল। আতঙ্ক আর উত্তেজনায় প্রায় দম বন্ধ করে বসে আছেন সেনটেইন। যেন সেই ছোট্টবেলার মত শিশু হয়ে রোলার কোস্টারে চড়ছেন। একটু পরেই অবশ্য চওড়া হয়ে এল দু’পাশ। নদী তীরের সমভূমির ওপর চড়ছে বুনো সঁড়ের দল। বিশালাকার প্রাণীগুলোর গায়ে শুকিয়ে যাওয়া মাটি, ট্রাম্পেটের মত কান। ষাড়ের পাল কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখল সেনটেইনদের ক্যানু।

নদীর ধারের লম্বা গাছগুলোর প্রায় প্রতিটির উপর দেখা গেল উজ্জ্বল সাদা মাথাঅলা ঈগল। এছাড়া বালুতীরে আয়েশ করে পড়ে আছে বিদঘুটে চেহারার লম্বা সব কুমির।

হঠাৎ করেই ক্যাম্প দেখে তেড়ে এল মসৃণ গোলাকার পাথরের ন্যায় ধূসররঙা জলহস্তী। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠেই দ্রুত কয়েকবার গুলি ছুড়লেন ব্লেইন। কুঁকড়ে উঠলেন সেনটেইন। ভাবলেন এই বুঝি মদ্দা জলহস্তীটার স্বচ্ছ গোলাপি চোখ দুখানা থেকে ফিনকি দিয়ে ছুটবে রক্ত। কিন্তু না, জন্তুটার কপালেরও কয়েক ইঞ্চি উপরে নিশানা করেছেন ব্লেইন। দক্ষ হাতে ক্যানু নিয়ে সরে এল মাঝি। আর মনে হল যেন নিজের ব্যর্থতার লজ্জা ঢাকতেই সবুজ পানির মধ্যে ডুব দিল বিশাল জলহস্তী।

“তুমি ওকে মারোনি দেখে আমি খুশি হয়েছি ব্লেইন।”

সংকটের মুখেও কর্নেলের ঠাণ্ডা মাথা আর মানবতাবোধ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সেনটেইন।

কিন্তু আপন মনেই ভাবলেন, “আমি কি স্কুল গার্ল হয়ে গেলাম নাকি। কেবল ওরাই এমন হিরোগিরি পছন্দ করে।” খিকখিক করে হেসে ফেললেন সেনটেইন।

অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ব্লেইন জানতে চাইলেন, “কী দেখে এত মজা পেলে?”

“একটা মেয়ে সব সময় অপেক্ষা করে কখন তার প্রিন্স চার্মিং এসে তাকে আগুন খেকো ড্রাগনের হাতে থেকে বাঁচাবে।”

“ধুর।“

“মানে? সান্তাক্লজ আর পরীদের তুমি বিশ্বাস করো না?”

“তোমার মাথায় একটু ছিট আছে বুঝলে?”

“হুম, জানি।” মাথা নাড়লেন সেনটেইন, “আর তোমাকে সাবধান করে দেবো ভেবেছি; কারণ এটা কিন্তু ছোঁয়াচে বুঝলে?”

“বড় দেরিতে বলে ফেললে।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন কর্নেল।

“গুড। সামনে ঝুঁকে এলেন সেনটেইন। প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে কিস করলেন ব্লেইনের কানের পিছনে।

কেঁপে উঠলেন ব্লেইন। “দেখো তুমি কী করেছো?” হাত মেলে ধরতেই দেখা গেল সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেছে। “এরকম আর করবে না।”

“আমিও তোমার মত কোনো প্রমিজ করি না।” সেনটেইনের কথা শুনে অনুশোচনার মেঘ ঘনাল ব্লেইনের চোখে। তাই দেখে মুড বদলাবার জন্যে সেনটেইন তাড়াতাড়ি বললেন,

“ওহ, ব্লেইন পাখিগুলোকে দেখো।” নদীর উপর যেন কমলা রঙের মেঘ জমেছে। একসাথে উড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার উজ্জ্বল লালরঙা পাখি।

এরপর দুজনে আর তেমন কথাবার্তা না বলে চুপচাপ বসে রইলেন। তবে এই নীরবতাই যেন পরস্পরকে আরো বেশি কাছে নিয়ে এসেছে।

মাঝিদের সাথে কথা বলে রাত কাটাবার জন্য বড় একটা দ্বীপ বেছে নিলেন ব্লেইন। লম্বা লম্বা প্যাপিরাসে ঘেরা হৃদের পানি একেবারে স্বচ্ছ আর সবুজ। তীরে নেমে রাইফেল তুলে নিলেন ব্লেইন।

“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”

জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“দেখি, ডিনারের জন্য কিছু পাই কিনা।”

“ওহ, ব্লেইন আজকে অন্তত কোনো জীব হত্যা করো না। আজ সত্যিই একটা বিশেষ দিন।”

“বীফ খেতে খেতে তোমার ক্লান্ত লাগছে না?”

“প্লিজ…”

হেসে রাইফেলটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে দিলেন ব্লেইন। তারপর তদারক করে দেখে এলেন কুঁড়েঘর আর মশারীর অবস্থা। সন্তুষ্ট হয়ে মাঝিদেরকে পাঠিয়ে দিলেন ক্যানুতে।

“ওরা কোথায় যাচ্ছে?” ক্যানু স্রোতে ভাসতেই জানতে চাইলেন সেনটেইন।

“আমি ওদেরকে ওপাশের গ্রামে ক্যাম্প করতে বলেছি।” উত্তর দিয়েই চট করে চোখ সরিয়ে নিলেন ব্লেইন। সেনটেইন নিজেও অন্যদিকে তাকালেন। জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই একাকী হওয়ার অনুভূতি আচমকা দু’জনকেই লাজুক করে তুলেছে।

তাড়াতাড়ি ক্যাম্পের কাছে গিয়ে নিজের থলে খুলে বসলেন সেনটেইন। ব্লেইনের দিকে না তাকিয়েই বললেন, “আমি হ্রদে যাচ্ছি। গত রাতের পর থেকে তো গোসল হয়নি।”

“তাহলে তোমার কোনো শেষ ইচ্ছে থাকলে জানিয়ে দিয়ে যাও।”

“মানে?”

“এটা ওকাভাঙ্গো নদী সেনটেইন। ছোট্ট মেয়েদের জন্য ওঁৎ পেতে থাকে কুমীর।”

“তাহলে তুমি রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো”

“আনন্দচিত্তে ম্যাডাম?”

“চোখ কিন্তু বন্ধ থাকবে।”

“তাহলে কুমির দেখব কেমন করে?”

হ্রদের নিচের সাদা বালি এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, চোখ এড়িয়ে কুমির আসার কোনো উপায় নেই। তীরে সবচেয়ে উঁচু পাথরটার উপর সেফটি ক্যাচ অফ করে এনফিল্ড রাইফেল নিয়ে এসে বসলেন ব্লেইন।

“আপাতত উঁকি-ঝুঁকিও বন্ধ।” সেটেইনের সাবধান বাণী শুনে বহুদূরের একপাল হাঁসের দিকে উদাস চোখে চেয়ে রইলেন কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমস। তবে সেনটেইনের কাপড় খোলার খসখস শব্দ কিন্তু কান এড়ালো না।

“ঠিক আছে এবার কুমিরের খোঁজ করতে পারো।”

হ্রদের তলদেশে শরীর ডুবিয়ে বসে পড়লেন সেনটেইন। কেবল মাথাটা উপরে ভেসে আছে। চুলগুলো সব চুড়ো করে বাঁধা।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ঘোড়র উপর থেকে পড়ে গিয়ে অথর্ব হয়ে গেছেন ইসাবেলা ম্যালকম। তখন থেকেই ব্লেইন আর তার মাঝে পুরুষসুলভ কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও একবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই ব্যর্থতার কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন ব্লেইন। তাই প্রচণ্ড মনোবল খাটিয়ে নিজের দৈহিক চাহিদাকে ভুলে আছেন কর্নেল। কিন্তু আজ আচমকা টের পেলেন এক আগ্রাসী ঝড়ের পূর্বসংকেত। যা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যাবে তার সবকিছু।

হঠাৎ করেই বন্য আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠলেন সেনটেইন।

“ব্লেইন!”

তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন কর্নেল। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে নিরাভরণ দেহে ঠকঠক করে কাঁপছেন সেনটেইন। গভীর পানি থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে একটা কুমির।

“দৌড় দাও সেনটেইন, রান।” ব্লেইনের চিৎকার শুনে সেনটেইনের সম্বিত ফিরলেও সরীসৃপটা যেন ঘোড়র বেগে ধেয়ে আসছে।

ছুটে এসে হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে গেলেন ব্লেইন। কোমরের কাছে উদ্যত রাইফেল। কিন্তু সেনটেইনের জন্য নিশানা তা করতে পারছেন না।

“ডাউন! মাথা নামিয়ে বসে পড়ো।” সাথে সাথে সামনের দিকে ঝাঁপ দিলেন সেনটেইন আর একই সময়ে গুলি ছুঁড়লেন ব্লেইন।

বুলেট গিয়ে সোজা ঢুকে গেল কুমিরের খুলিতে। পিঠ বেঁকিয়ে জটা পানিতে এত প্রচণ্ড আলোড়ন তুলল যে ফেনার মাঝে ডুবে গেলেন ব্লেইন আর সেনটেইন। কোনোমতে তাকে তুলে দাঁড় করিয়েই এক হাতে রাইফেল আরেক হাতে সেনটেইনের পিঠ ধরে তীরের দিকে দৌড় দিলেন ব্লেইন।

পাথুরে কিনারে পৌঁছেই ব্লেইনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেনটেইন। ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। কোনোমতে জানালেন, “ওহ ব্লেনি, কী ভয়ংকর এক দানব।”

“ঠিক আছে। এখন আর কোনো ভয় নেই ডার্লিং।” পাথরের সাথে রাইফেলটাকে ঠেস দিয়ে রেখে সেনটেইনকে জড়িয়ে ধরলেন ব্লেইন।

বিড়ালের মত গুটিগুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন। বুঝতে পারলেন এসে গেছে সেই মুহূর্ত। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ব্লেইন। ছোট ছেলে-মেয়ের মত পরস্পরের হাত ধরে প্যাপিরাসের বনে ছুটলেন দুজনে।

প্রকৃতির আদিমতার মাঝে হারিয়ে গেলেন ব্লেইন আর সেনটেইন। মনে হচ্ছে তারাই বুঝি পৃথিবীর একমাত্র মানব আর মানবী। গলা চিড়ে চিৎকার করে নিজের সমস্ত একাকিত্ব আর বেদনা বাতাসে মিলিয়ে দিলেন সেনটেইন।

***

পরের দিন সকালবেলা। রুন্টুর সীমান্ত পোস্টের কাছে এগোতেই এসে গেল বিচ্ছেদের ক্ষণ। এ অঞ্চলের দায়িত্বে নিযুক্ত পুলিশ সার্জেন্ট আর তার গার্ডদের কবলে পড়ে দুজন দুজনের দিকে তাকানোর সুযোগ পর্যন্ত হারিয়ে ফেললেন। অবশেষে উইন্ডহকে পৌঁছাতেই শেষ হল-এ অত্যাচার।

কিন্তু তখন তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে পুরো পৃথিবী- ইসাবেলা, বাবার কাছে কে আগে আসবে সে প্রতিযোগিতায় রত তারা আর ম্যাটিল্ডা, পুলিশ, রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার, টুয়েন্টিম্যান জোনস, আব্রাহাম, স্যার গ্যারি, উদ্বেগ আর অভ্যর্থনা জানিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মেসেজ।

তারপরেও যেন এত হৈ-হট্টগোলের কিছুই সেনটেইনকে স্পর্শ করতে পারল না। বিচ্ছিন্ন হয়ে ভাবতে লাগলেন সেই সবুজ নদী, দু’জনের হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটা, একত্রে কাটানো রাত্রি।

রেলওয়ে কোচ থেকে শাসাকে ফোন করেও নিরস আগ্রহে শুনলেন ছেলের গণিতের নম্বর।

তারপরেও দু’বার ব্লেইনের সাথে কথা বলার জন্যে ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবার অন্য কেউ ফোন ধরেছে। তাই কথা না বলেই রেখে দিতে বাধ্য হয়েছেন সেনটেইন।

পরের দিন প্রশাসকের অফিসে দু’জনের আবার দেখা হল। ব্লেইনের প্রেস কনফারেন্সে থাকায় রুমভর্তি ছিল কেবল সাংবাদিক আর হুইল চেয়ার নিয়ে ইসাবেলা। বহুকষ্টে তাই কর্নেলের সাথে বন্ধুত্বসুলভভাবে হাত মেলানোর নিপুণ অভিনয় করলেন সেনটেইন। ব্লেইনের সাথে একাকী কথা বলার কোন সুযোগই পেলেন না।

নিজের অফিসে ফিরতেই দেখা গেল অপেক্ষারত আব্রাহামের সঙ্গে।

“সেনটেইন আপনি কিন্তু দেরি করে ফেলেছেন। বোর্ডরুমের সবাই গত একঘণ্টা ধরে বসে আছে।”

“তাহলে বসে থাকুক। সমস্যা কী?” এতটা কড়া ভাষা বের হল যে সেনটেইন নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। অথচ এই ব্যাংকই তার একমাত্র ভরসা।

“হিরেগুলো হারিয়ে ভয়ে তাদের একেকজনের চেহারায় দশ রকমের হলুদ রঙ ফুটে উঠেছে, সেনটেইন।”

ব্যাংক ডিরেক্টরের দল সেনটেইন শহরে এসেছেন শোনার পর থেকেই এই মিটিঙের জন্য অপেক্ষা করছেন।

“ড, টুয়েন্টিম্যান জোনস কোথায়?”

“উনিও বোর্ডরুমে আছেন।” মোটা মোটা একটা ফোল্ডার এগিয়ে দিলেন অ্যাবি, “এখানে সুদ পরিশোধের শিডিউল দেয়া আছে।”

খানিক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলেন সেনটেইন। প্রতিটা আর পরিমাণ সবকিছুই তার মুখস্থ। একই সাথে এসব ঠেকানোর পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন। যদিও শুনলে হয়ত যে কারো হাস্যকর বলে মনে হবে।

“সিংহের গুহায় ঢোকার আগে আমাকে জানতে হবে এরকম নতুন আর কিছু কি আছে?”

“লন্ডনের লয়েডস থেকে দীর্ঘ একটা টেলিগ্রাম এসেছে। তারাও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।”

মাথা নাড়লেন সেনটেইন।

“সেটাই তো ধারণা করেছিলাম। আপনার কী মনে হয়? ব্যাপারটা কোর্ট পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাব?”

“আমার মনে হয় তাতে কেবল সময় আর অর্থেরই অপচয় হবে।”

“আর কিছু?”

“ডি রিয়ারস্। স্যার আর্নেস ওপেনহেইমার নিজে মেসেজ পাঠিয়েছেন।”

“ইতিমধ্যেই গন্ধ শুঁকে চলে এসেছেন, না?” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সেনটেইন। মাথা থেকে ব্লেইনের ছবি কিছুতেই তাড়াতে পারছেন না।

“কিম্বলি থেকে বৃহস্পতিবারে উইন্ডহকে পৌঁছাবেন স্যার আর্নেস্ট।”

“সত্যিই কাকতালীয় ব্যাপার।” কাষ্ঠ স্বরে হাসলেন সেনটেইন।

“আপনার সাথে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিং করতে চান।”

“ভদ্রলোকের নাকটা ঠিক হায়েনার মত আর চোখ দুটোও শকুনের চোখ। শত শত মাইল দূরে থেকেও মৃতপ্রায় পশুর গন্ধ ঠিকই পেয়ে যান।”

“উনি হানি মাইনের পিছনে লেগেছেন সেনটেইন। গত তের বছর ধরেই ঘুরছেন মওকামত পাওয়ার আশায়।”

“সবাই তো হানির পেছনেই লেগেছে অ্যাবি। কিন্তু ঈশ্বরের দিব্যি এজন্য আগে ওদেরকে আমার সাথে লড়তে হবে।”

দু’জনেই একসাথে উঠে দাঁড়ালেন বোর্ডরুমে যাওয়ার জন্য।

হাঁটতে গিয়ে দেয়ালের সাথে লাগানো আয়নায় চোখ পড়তেই চুলগুলোকে হালকা ঠিক করে জিভের ডগা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন। ব্যস তিনি তৈরি। কেটে গেছে মাথার ধোঁয়াশা ভাব। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী আর আত্মবিশ্বাসী সেনটেইন কোর্টনি। মনের মাঝে কেবল একটাই মন্ত্রঃ- হানি আমার, কেউ এটা আমার কাছ থেকে নিতে পারবে না।

***

অন্ধকারের মধ্যে দিয়েও দ্রুত পায়ে উত্তর মুখে এগিয়ে চলেছে ম্যানফ্রেড ডি লা রে। সাথে হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। একটু আগে বাবার কাছ থেকে পাওয়া অপ্রত্যাশিত অবহেলাই তার মনোবলকে দৃঢ় করে তুলেছে।

কিন্তু পাহাড় চূড়ায় ফেলে আসা একাকী মৃত্যুপথযাত্রী বাবার কথা মনে হতেই কেঁদে উঠল পুরো অন্তর। “ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি বাবা, তুমি একদিন আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে।” বয়স্ক পুরুষের মতই ক্লান্তিহীন দেহে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেনড্রিকের সাথে এগোল প্রায় তার সমান উচ্চতার ম্যানি।

এমনি করেই কেটে গেল পুরো রাত। অবশেষে নদী তীরে যখন পৌঁছাল তখন গাছের মাথায় উঠে এসেছে সূর্য।

কোনোরকমে খানিকটা পানি খেয়েই আবার শুরু হল যাত্রা। দিনেরবেলা নদীর পাড়ে খোলা জায়গা এড়িয়ে শুকনো মোপানির বনে লুকিয়ে রইল তিনজন। তারপর অন্ধকার নামার পর আবার পথে নামল ছোট্ট দলটা।

এরকমভাবে বারোটা রাত কঠোর পরিশ্রমের পর হেনড্রিক নিশ্চিত হলেন যে কেউ তাদের পিছু নেয়নি।

“আমরা কখন নদী পার হবো, হেনি?” জানতে চাইল ম্যানি।

“কখনোই না।” উত্তরে জানালেন হেনড্রিক।

“কিন্তু বাবার তো প্ল্যান ছিল পর্তুগিজে গিয়ে তারপর লুয়ান্ডাতে যাব।”

“সেটা তোমার বাবার কথা ছিল। কিন্তু এখন তো সে আর আমাদের সাথে নেই। উত্তরে তো বটেই এমন কি পর্তুগিজে কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন অনেক কঠিন। ওরা জার্মান বোয়া কিংবা ইংরেজদের চেয়েও কৃষ্ণাঙ্গদেরকে বেশি ঘৃণা করে। দেখা যাবে আমাদের হিরে কেড়ে নিয়ে শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দিবে। না ম্যানি তা হতে দেয়া যাবে না। আমরা এখন ওভামোল্যান্ডে নিজের গোত্রের মাঝে ফিরে যাব। সেখানে আমাদের সাথে মানুষের মত আচরণ করা হবে; জানোয়ারে মত নয়।”

“কিন্তু পুলিশ তো তাহলে আমাদেরকে খুঁজে বের করে ফেলবে।”

“কেউই আমাদেরকে দেখেনি ম্যানি।”

“তারপরেও তো সবাই জানে তুমি আমার বাবার বন্ধু।”

দাঁত বের করে হেসে ফেললেন হেনড্রিক। “ওখানে তো আর আমার নাম হেনড্রিক নয়। আর ওরা হাজারবার শপথ নিয়েও বলবে যে আমি কোনো শ্বেতাঙ্গ ডাকাতকে চিনিই না, বুঝলে? তাছাড়া আমার এক ভাইও আছে। ও এত চালাক যে হিরেগুলোর হিল্লে হয়ে যাবে। আমরা তাই ঘরেই ফিরে যাব, ম্যানি।”

“তাহলে আমার কী হবে? আমি তো তোমার সাথে ওভাষোর গোত্রে যেতে পারব না।”

“তোমার জন্যও আমি একটা প্ল্যান করে রেখেছি।” পিতাসুলভ মনোভাব নিয়ে ম্যানফ্রেডের কাঁধে হাত রাখলেন হেনড্রিক, “তোমার বাবা আমার ওপর ভরসা করতেন। তাই তোমার কোনো ভয় নেই। তোমাকে আমি অবশ্যই নিরাপদ কোনো জায়গায় পৌঁছে দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরব।”

“তুমি চলে গেলে আমি একেবারে একা হয়ে যাবো হেনড্রিক।” হাত নামিয়ে নিলেন হেনড্রিক। মুখে কিছুই বললেন না।

সে রাতেই নদী ছেড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে যাত্রা শুরু করল হেনড্রিক, ম্যানফ্রেড আর ক্লেইন বয়। মানুষের বসতি এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত ধীরে চলতে চলতে অবশেষে বিশতম দিনে পৌঁছে গেল এক ওভাদো গ্রামে।

কিন্তু চট করে গ্রামে না ঢুকে উপত্যকার পেছনে লুকিয়ে রইল তিনজনে। যেন অচেনা কাউকে দেখলে সতর্ক হওয়া যায়। গ্রামের দিক থেকে আসা সব ধরনের শব্দও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলেন হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। এভাবে বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে পড়ল ম্যানফ্রেড।

বিকেলের দিকে অবশ্য বদলে গেল পরিস্থিতি। ঢালু পেরিয়ে একপাল ছাগল নিয়ে গ্রামের দিকে ঢুকতে যাচ্ছে উদোমদেহী এক শিশু।

বাচ্চাটাকে দেখেই হালকাভাবে শিষ দিলেন হেনড্রিক।

চমকে উঠে ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটা এদিকে তাকাতেই হেনড্রিক আরেকবার শিষ দিলেন। এবার সাবধানে কাছে এগিয়ে এল ছোট্ট মানুষটা। হঠাৎ করেই হেনড়িককে দেখে বিশাল এক অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার। বুকে।

হেনড্রিক নিজেও হেসে উঠে কোমর পর্যন্ত বাচ্চাটাকে তুলে ফেললেন আদর করার জন্য।

“ও আমার ছেলে।” হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ম্যানির জ্ঞাতার্থে অবশেষে জানালেন হেনড্রিক। কিচির-মিচির করে বাবাকে বিভিন্ন সংবাদও দিয়ে দিল বাচ্চাটা।

“গ্রামে অচেনা কেউ নেই। কয়েকদিন আগে পুলিশ এলেও এখন চলে। গেছে। ব্যাখ্যা দিলেন, হেনড্রিক।

তারপর ছেলেকে কোলে নিয়েই পাহাড় থেকে নেমে ঢুকে গেলেন গ্রামে। নগ্ন উর্ধাঙ্গ নিয়ে দল বেঁধে কাজ করছে চারজন ওভাষো নারী। এদেরই একজন হেনড়িককে দেখে চিৎকার দিয়ে ছুটে এলেন ঠিক বাচ্চাটারই মতন। শরীরে কুঁচকানো চামড়া, দন্তবিহীন বয়স্ক এই নারী আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন হেনড্রিকের পা।

“আমার মা” পরিচয় করিয়ে দিলেন হেনড্রিক।

একেবারে কোনার কুঁড়েঘরের প্রবেশ দ্বারে বসে আছে কালের একমাত্র পুরুষ। মনে হচ্ছে হেনড্রিকদের আগমনে সৃষ্ট হৈ-চৈয়ে তার কোনো রকম ভাবান্তর হল না। হেনড্রিকের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও লোকটার পেশি কঠোর পরিশ্রমের ফলে অত্যন্ত মজবুত আর তার চারপাশে বেশ একটা আত্মবিশ্বাসের আবহ। চেহারাখানাও তরুণ ফারাওয়ের মত। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল তার কোলের উপর ম্যাকলের হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড বইটা পড়ে আছে।

শান্ত ভঙ্গিতে হেনড্রিককে অভ্যর্থনা জানালেও এ দুজন যে বেশ আপন কোনো আত্মীয় তা বুঝে গেল ম্যানফ্রেড।

“এই হচ্ছে আমার বুদ্ধিমান সবজান্তা ছোটভাই। আমাদের বাবা এক হলেও মা ভিন্ন ও আমার চেয়ে অনেক ভালো ইংরেজি বলে আর বইও পড়ে। ওর ইংরেজি নাম হল মোজেস।”

“ও হানি হিরে খনিতে কাজ করে। কিন্তু মাথা নেড়ে তা এড়িয়ে গেল মোজেস।

“এখন আর করি না ভাই। একমাস আগে চাকরি চলে গেছে। তাই এখন কেবল রৌদ্রে বসে বিয়ার খাই, বই পড়ি, চিন্তা করি আর পুরুষদের যা যা করণীয় তা করি।” শেষ হবার সাথে সাথে একত্রে হো হো হেসে উঠল দুই ভাই।

পশ্চিমা ইউরোপীয় পোশাক ছেড়ে নিজ গোত্রের সাদাসিধে কাপড় পুনরায় পরতে পেরে যারপরনাই খুশি হয়ে উঠলেন হেনড্রিক। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত জনের সাথে পোষা প্রাণী, মাঠের শস্য, বৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ে গল্প করতে গিয়ে এতটাই মশগুল হয়ে গেলেন যে, ভুলেই গেলেন বর্তমান সমস্যা। তাই মনে পড়তেই সবকিছু মোতজাসকে খুলে বললেন।

“ইয়েস” ভাইয়ের অবস্থা শুনে মাথা নাড়ল মোজেস।

“পুলিশ এসেছিল। বেশ কয়েকদিন থেকেও গেছে। প্রথমে হাসি-খুশি থাকলেও শেষের দিকে হুমকি আর ধমক-ধামক দিত। সোয়ার্ট হেনড্রিককে খুঁজতে এসেছিল। তোমার মা সহ কয়েকজন নারীকে মেরেছেও হেনড্রিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখে মোজেস তাড়াতাড়ি সামলে নিল, “উনি কিন্তু বৃদ্ধ হলেও বেশ শক্ত। বাবার হাতে আগেও তো মার খেয়েছেন। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও কেউ সোয়াট হেনড়িককে চিনতে পারেনি। তাই ক্লান্ত হয়ে চলে গেছে পুলিশের কুত্তাগুলো।”

“ওরা আবার ফিরে আসবে। হেনড্রিক আনমনে জানাতেই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল মাজেস।

“হা শ্বেতাঙ্গরা কিছু ভোলল না। প্রিটোরিয়াতে পঁচিশ বছর আগে খুনের দায়ে এক লোককে ফাঁসি দিয়েছে। ওরা অবশ্যই আবার আসবে।”

সবার হাতে হাতে ঘুরছে কালো একটা বিয়ারের পাত্র।

“ওরা বলে গেল যে হানির রাস্তায় নাকি বড়সড় হিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর তুমি যে শ্বেতাঙ্গের সাথে চলতে-ফিরতে যুদ্ধ করতে, মাছ ধরতে সবুজ সমুদ্রে যেতে, তার নামও বলে গেছে। হিরে নেয়ার সময় তুমিও নাকি তার সাথে ছিলে। তাই সুযোগ পেলেই তোমার গলায় দড়ি পরিয়ে দেবে।”

মিটিমিটি হেসে উঠলেন হেনড্রিক, এরকম একটা কাহিনি আমিও শুনেছি বৈকি। আমার পরিচিত এক আত্মীয়ের হাত দিয়ে নাকি চুরি হয়েছে সব হিরে।”

“তোমাকে এসব ডাহা মিথ্যে কে বলল?” বিবর্ণ মুখে হেসে ফেলল মোজেস। ক্লেইন বয়কে ইশারা দিলেন হেনড্রিক। চামড়ার একটা ব্যাগ এনে বাবার সামনে রেখে দিল ক্লেইন বয়। ব্যাগের মুখ খুলে কার্টিজ পেপারে মোড়া ছোট ছোট প্যাকেটগুলো বের করে মাটিতে সাজিয়ে রাখলেন হেনড্রিক। এক সারিতে মোট চৌদ্দটা প্যাকেট হল।

প্রথম প্যাকেটটা নিয়েই ছুরির ফলা দিয়ে কাগজ ছিঁড়ে ফেলল মোজেস। মোমের সীল দেখে বলল, “এটা তো হানি মাইনের সীল।” সাবধানে ভেতরের জিনিসগুলো দেখেও অবশ্য তার মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হল না। একে একে চৌদ্দটা প্যাকেট দেখে অবশেষে নরম স্বরে জানাল, “মৃত্যু। সাথে করে শত শত হাজার হাজার মৃত্যু নিয়ে এসেছে।”

“তুমি বিক্রি করতে পারবে না?” হেনড্রিকের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল মোজেস।

“একসাথে এত হিরে আমি জীবনেও দেখিনি। তার উপর যদি একত্রে বিক্রি করতে যাই তো আমাদের সবার উপরেই মৃত্যুর খড়গ নেমে আসবে। তাই ভেবে দেখি কী করা যায়। তবে ততদিন পর্যন্ত এগুলোকে আমাদের বসতির মধ্যেও রাখা যাবে না।”

অতঃপর পরদিন সকালবেলা হেনড্রিক, মোজেস আর ক্লেইন বয় মিলে গিরিসংকটের একেবারে চূড়ায় গিয়ে লিডউড গাছ খুঁজে বের করল। মাটি থেকে ত্রিশ ফুট উপরে গাছের গুঁড়ির মধ্যে ফাঁপা একটা ফোকর আছে। মাঝে মাঝে এক জোড়া ঈগল এসে বাসা বাঁধে। যাই হোক বাকি দু’জন নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দিল আর গাছে উঠে পাখির বাসার মধ্যে হীরে ভর্তি চামড়ার থলে রেখে দিল ক্লেইন বয়।

***

এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। একদিন এসে মোজেস জানাল, “ভাই, তুমি আর আমি বোধ হয় আর এখানে থাকতে পারব না। তোমার মাঝে আমি অস্থিরতার আগমন টের পাচ্ছি। যে জীবন আগে অনেক মধুর ছিল তা এখন তিক্ত লাগে। বিয়ারের স্বাদও আগের মত ভালো লাগে না।”

হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “তুমি যে এতকিছু জানো আমি তো জানতামই না ভাই, মানুষের মনের কথাও টের পাও!”

“আমাদের এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। পাথরগুলোও এখানে রাখাটা বিপজ্জনক।”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন হেনড্রিক “বলল আমি শুনছি।”

“আমি আসলে এমন এক কলার কথা বলছি যেটাকে শ্বেতাঙ্গরা রাজনীতি বলে; যেখানে আমাদের কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার নেই।”

মুখ বাঁকিয়ে হেনড্রিক বললেন, “তুমি আজকাল একটু বেশি বেশি বই পড়ছে। এসব কাজে কোনো ফায়দা নেই বুঝলে।”

“ভুল বললে ভাই। এ কলাতে এত সম্পদ আছে যার কাছে তোমার ওইসব পাথর তুচ্ছ।”

কিছু বলার জন্য মুখ খুলেও আস্তে করে বন্ধ করে ফেললেন হেনড্রিক। এ ব্যাপারে এমন করে সত্যিই আগে আর কখনো ভাবেননি। কিন্তু আজ ভাইয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আর আগ্রহ দেখে তিনিও বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।

“ভাই, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমাদের এখানকার পাট চুকিয়ে দেয়া উচিত।”

সম্মতি দিলেন হেনড্রিক। তিনি নিজে সারা জীবন যাযাবর হয়ে ঘুরেছেন। তাই এতে তার কোনো সমস্যাই নেই।

“কিন্তু আমরা যাব কোথায়?”

ভাইয়ের কথা শুনে হেনড্রিকের হাত ধরল মোজেস, “এ ব্যাপারে পরে আলোচনা করব। তবে তার আগে সাথে করে যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটাকে নিয়ে এসেছো তাকে সরিয়ে দিতে হবে। ও আসলে হিরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। ওর গন্ধ শুঁকে শুঁকে পুলিশ এখানেও চলে আসবে।”

শারীরিক আর মানসিক উভয় দিক দিয়েই মোয়ার্ট হেনড্রিক অত্যন্ত শক্তিশালী একজন পুরুষ। কোনো কিছুতেই ভয় নেই। যা চান তার জন্য প্রচণ্ড কষ্ট করতেও রাজি। তবে একটা সমস্যা হল সারা জীবনই অন্য কাউকে অনুসরণ করে এসেছেন। এবারও তাই হল।

“তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে ভাই।” মনে হল এতদিনে পাহাড়ের উপর ফেলে আসা মানুষটার স্থলাভিষিক্ত হবার জন্য উপযুক্ত কাউকে পেয়েছেন।

***

“আমি এখানে আগামীকাল সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। যদি এর ভেতরে তুমি আর ফিরে না আসো তাহলে ধরে নেব যে নিরাপদ আছে। ঠিক আছে?”

“তোমার সাথে আর দেখা হবে না হেনি?” মন খারাপ করে ফেলল ম্যানফ্রেড হেনড্রিকও মিথ্যে প্রতিজ্ঞা করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন।

*এখন থেকে আমাদের ভাগ্য ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে আমাদেরকে, ম্যানি। তবে তোমার কথা আমার সবসময় মনে থাকবে আর কে জানে আবার হয়ত কোনোদিন আমাদের ভিন্ন রাস্তা একসাথে মিলে যেতেও পারে।” ম্যানির কাঁধে হাত রেখে সান্তনা দিলেন। টের পেলেন ছেলেটা আসলেই বয়স্ক পুরুষ হয়ে উঠেছে। পেশিগুলো এরই মাঝে বেশ মজবুত হয়ে গেছে। “ভালো থেকো ম্যানি আর ঠিক বাবার মত মানুষ হয়ে উঠো।”

হালকাভাবে ধাক্কা খেয়েও দাঁড়িয়ে রইল ম্যানফ্রেড।

“হেনড্রিক তোমাকে আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে; কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না।”

“যাও ম্যানি। জানি তুমি কী বলতে চাও।”

কম্বল আর ব্যাগখানা তুলে নোংরা ধূলিমাখা রাস্তায় নেমে এল ম্যানফ্রেড। আস্তে আস্তে হেঁটে সামনের গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে আর ওই গির্জার মাথা দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকছে নতুন এক জীবন।

তবে আনমনেই প্রধান রাস্তা ছেড়ে পাশের স্যানিটারি লেইনে চলে এল। শেষ মাথায় যাজকের বাড়ির পেছনের দরজায় পৌঁছে হুড়কো খুলে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

কিন্তু খানিক এগিয়েও ভয়ংকর এক হাক শুনে থেমে গেল ম্যানফ্রেড। উচ্চ কণ্ঠে আরেকটা চিৎকার শোনা গেল। এদিক-ওদিক তাকাতেই বোঝা গেল শব্দগুলো উঠানের শেষ মাথার কাঠের বাড়িটা থেকেই আসছে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজার ফুটো দিয়ে উঁকি দিল ম্যানফ্রেড। অন্ধকারে চোখ সইয়ে আসার পর চোখে পড়ল মাটির মেঝের একেবারে মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন ট্রম্প বিয়ারম্যান।

চোখ দুটো বন্ধ করে দু’হাত উপরে তুলে প্রার্থনা করছেন বিয়ারম্যান।

“ওহ ইস্রায়েলের প্রভু ঈশ্বর, তোমার ভূতত্যর প্রয়োজনের সময় মুখ ফিরিয়ে থেক না। তোমার ইচ্ছে যদি আমি না জানি তো এই দায়িতু কীভাবে পালন করব? আমি নগণ্য মানুষ, একাকী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ। আমার দিকে তাকাও প্রভু”

আচমকা চোখ মেলে তাকালেন ট্রম্প। মাথা ঘুরিয়ে সোজা তাকালেন ম্যানফ্রেডের দিকে। ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে উঠে আসা কোনো নবীর চোখের মত দেখে নিলেন ছেলেটার অন্তর।

ভয়ে ভয়ে আকৃতিবিহীন ঘামে ভেজা টুপিটা মাথা থেকে নামিয়ে বুকের কাছে ধরল ম্যানি।

“আমি ফিরে এসেছি ওম, আপনি যেমনটা বলেছিলেন।”

ভয়ংকর ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন ট্রম্প। পেশিবহুল দু’খানা পা, চওড়া কাধ আর ধূলিমাখা সোনালি চুলের ম্যানফ্রেডের চোখ দুটোতে দেখতে পেলেন দৃঢ় মনোবল আর বুদ্ধিমত্তার ছাপ।

তাই আদেশ দিলেন, “এদিকে এসো।” ব্যাগ রেখে ম্যানের কাছে এগিয়ে যেতেই হাত ধরে বসিয়ে দিলেন ট্রম্প।

“তোমার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাও বস। ঈশ্বরের গুণকীর্তন করা যে তোমার বাবা আমার কথা শুনেছে।”

সুবোধ বালকের মত চোখ দুটো বন্ধ করে হাত জড়ো করল ম্যানফ্রেড।

কিন্তু একের পর এক প্রার্থনা করে “আমেন” বলতে বলতে ছেলেটার মাথা ঘুরে উঠল ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে। একই সাথে হাঁটুও ব্যথায় মোচড় দিচ্ছে এমন সময় ঝট করে ম্যানফ্রেডের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন টুম্প। “মেভু। তুমি কোথায়?”

রুদ্ধশ্বাসে রান্নাঘরে দৌড়ে এলেন ট্রুডি বিয়ারম্যান। কিন্তু নোংরা আর ছেঁড়া কাপড় পরিহিত ম্যানফ্রেডকে দেখেই আবার দাঁড়িয়ে গেলেন।

“আমার এত সুন্দর রান্নাঘর। মাত্রই আমি পরিষ্কার করে গেছি।”

“প্রভু ঈশ্বর ওকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।” সুর করে বলে উঠলেন ট্র। “ওকে আমাদের ঘরেই রেখে দিব। আমাদের সাথে এক টেবিলে বসে খাবে, আমাদের একজন হয়েই থাকবে।”

“কিন্তু ও এত নোংরা।”

“তাহলে ওকে পরিষ্কার হতে সাহায্য করো।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রুডি বিয়ারম্যানের বড়সড় শরীরটার পেছন থেকে ভেতরে তাকাল ভীতসন্ত্রস্ত চেহারার ছোট্ট একটা মেয়ে। ম্যানেফ্রডকে দেখার সাথে সাথেই ফুঁপিয়ে উঠল বেচারি।

কিন্তু সারাহকে দেখে অবাক হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। মেয়েটার একদা বিবর্ণ গাল দুটো এখন আপেলের মত গোলাপি হয়ে গেছে। হাড়জিরজিরে হাতেও মাংস লেগেছে। সোনালি চুলগুলো সুন্দর বেণি বাধা আর পরনের স্কার্টটাতেও একটা দাগ নেই।

দু’হাত বাড়িয়ে ম্যানফ্রেডের কাছে ছুটে আসতে চাইল সারাহ। কিন্তু পেছন থেকে আটকে ধরলেন ট্রুডি।

“অলস মেয়ে কোথাকার। তোমাকে না আমি অংক করতে দিয়ে এসেছি। এক্ষুণি যাও, শেষ করো।” ধাক্কা দিয়ে সারাহাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন। “আর তুমি, চুলগুলো তো মেয়েদের মত লম্বা। পরনের কাপড় তো আর কী বলব। এখানে আমরা সবাই খ্রিস্টান বুঝলে, তোমার বাবার মত বন্য নই।”

“আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে ট্রুডি আন্টি।”

“সবাই যখন খাবে তুমিও তখন খাওয়া পাবে আর পরিষ্কার হওয়ার আগে তো নয়ই।”

তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “গরম পানির গিজার কীভাবে চালাতে হয় ছেলেটাকে দেখিয়ে দাও।”

এখানেই শেষ না, ম্যানফ্রেডের শত আপত্তি সত্ত্বেও বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নিজে তদারক করে, ওর গায়ে সাবান ঘষে গোসল করিয়ে দিলেন ট্রুডি।

তারপর ম্যানফ্রেডের কোমরে মাত্র একটা ভোয়ালে জড়িয়ে টেনে নিয়ে এলেন নিচের বাগানে। ফলের বাক্সের উপর বসিয়ে কেটে দিলেন ছেলেটার চুল। একটু পরে মাথায় হাত বুলিয়ে ম্যানফেড় নিজেই হা হয়ে গেল। গলা ঘাড় আর কানের পিছনটা বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।

অতঃপর ম্যানফ্রেডের নোংরা কাপড়-জামা সব জড়ো করে ফার্নেসে ঢুকানোর জন্যে তৈরি হলেন ট্রুডি। একেবারে শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে জ্যাকেটটা তুলে নিল ম্যানি। আলতো করে ছুঁয়ে দেখল লাইনিং।

ছেলেটার মুখভার দেখে ট্রুডির দয়া হল, “ঠিক আছে, ধুয়ে কয়েকটা সেলাই করে দিলেই হবে।”

তারপর ম্যানফ্রেডের ক্ষুধা নিবারণকে যেন ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিলেন ট্রুডি। শেষ করার আগেই ভরে দিলেন ম্যানির প্লেট।

অন্যদিকে পাখির মত টুকটুক করে খায় বলে সারাহও বিস্তর বকা হজম করল। যাই হোক, খেতে গিয়েও ম্যানফ্রেডের ওপর থেকে চোখ সরাল না মেয়েটা।

সারাহ আর বিয়ারম্যান পরিবারে এমনিতেই পূর্ণ হয়ে গেছে পুরো বাড়ি। তাই উঠানের শেষ মাথার যন্ত্রপাতি রাখার ছাউনির এক কোনায় ম্যানফ্রেডকে শোয়ার জায়গা দেয়া হল। প্যাকিং কেসকে উল্টে কার্ড বানিয়ে দিলেন ট্রুডি। আর লোথার খাঁটিয়ায় মাট্রেস ও পুরাতন পর্দা ঝুলিয়ে করা হল ঘুমানোর বন্দোবস্তু।

যাই হোক, যাওয়ার আগে ট্রুডি বারবার সাবধান করে দিলেন, “মোমবাতির অপচয় করো না। প্রতি মাসের শুরুতে কেবল একটাই পাবে। কারণ আমাদেরকে অনেক হিসাব করে চলতে হয়। বুঝলে?”

জীবনে প্রথমবারের মত নিজের একটা রুম আর বিছানা পেয়েছে ম্যানি। গ্রিজ আর প্যারাফিনের গন্ধ সত্ত্বেও কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও জানে না।

আচমকা গালে হালকা স্পর্শ পেয়েই ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল ম্যানফ্রেড। মনে হল যেন বাবার গ্যাংগ্রিন আহত হাতটাই বুঝি কবর থেকে উঠে এসেছে। কম্বল সরিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়।

“ম্যানি, ম্যানি আমি!”

সারাহও ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল সাদা নাইট ড্রেস গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে মেয়েটা। রুপালি মেঘের মত কাঁধ ছাপিয়ে পড়েছে লম্বা চুল।

“তুমি এখানে কী করছো?” আলতো স্বরে জানতে চাইল ম্যানেফ্রড, “তোমার এখানে আসাটা উচিত হয়নি। ওরা যদি দেখে তো-” চুপ করে গেল ম্যানি। কী ঘটবে না জানলেও এই নিরাপত্তা বোধের আনন্দ যে উবে যাবে তা বেশ টের পেল।

“আমার একটুও ভালো লাগত না এখানে।” সারাহর কণ্ঠ শুনে বোঝা গেল যে সে কাঁদছে। “তুমি যাবার পর থেকেই আমার কিছু ভালো লাগত না।

মেয়ে দুটো তো আমাকে আবর্জনা বলে ডাকে। আমি ওদের মত পড়তে পারি না, অংক জানি না, মজা করে কথা বলতে পারি না যে তাই। তোমরা আমাকে এখানে রেখে যাবার পর প্রতি রাতে আমি কেঁদেছি।”

সব শুনে ম্যানফ্রেডের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল! প্রথমে নার্ভাস লাগলেও আস্তে করে সারাহকে ধরে বিছানায় ওর পাশে বসালো। “আমি চলে এসেছি। এখন থেকে আর কোনো সমস্যা হবে না।”

ম্যানফ্রেডের ঘাড়ে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ। দৃঢ় কণ্ঠে ম্যানফ্রেড জানাল, “ব্যস সারি, কান্না থামাও। তুমি আর ছোট্ট খুকি নও। সাহসী হতে হবে এখন।”

“কাঁদছি কারণ এখন অনেক আনন্দ হচ্ছে।”

“এমনকি আনন্দের সময়েও কাদা যাবে না।” আদেশ দিল ম্যানফ্রেড, “বুঝেছ?” কোনোমতে নিজের চোখ মুছে নিল সারাহ।

“আমি প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি যেন তোমাকে ফিরিয়ে আনেন। আচ্ছা তোমার সাথে একটু বিছানাতে শুয়ে থাকি? ঠাণ্ডা লাগছে।”

“না।” শক্ত হয়ে উঠল ম্যানফ্রেডের গলা।

“একটু ক্ষণের জন্য শুধু।” ম্যানফ্রেড আর কিছু বলার আগেই বিছানায় উঠে কম্বলের নিচে ওর পাশে শুয়ে পড়ল সারাহ। পাতলা নাইট গাউনের নিচে ওর শরীর এত ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে যে বাধা দিতে পারল না ম্যানফ্রেড।

“শুধু পাঁচ মিনিট। তারপরেই কিন্তু চলে যেতে হবে।”

সারাহর চুলগুলো এত সুন্দর আর নরম যে নিজেকে হঠাৎ বেশ বড় বড় বলে মনে করল ম্যানি। আস্তে আস্তে মেয়েটার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।

“তোমার কি মনে হয় ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন? অনেক দিন লাগলেও তুমি কিন্তু ঠিকই এসেছো, তাই না।” নরম স্বরে জানাল সারাহ।

“কে জানে। আমি প্রার্থনার বিষয়ে বেশি কিছু জানি না। আমার পা কখনোই তেমন প্রার্থনা করত না। আমাকেও শেখায়নি।”

“ওয়েল, এখন থেকে কিন্তু করতে হবে। এই ঘরে সবাই সারাক্ষণ প্রার্থনা করে।

***

বাইরে তখনো অন্ধকার। কানের কাছে প্রচণ্ড গর্জন শুনে ম্যানফ্রেডের ঘুম ভেঙে গেল। “দশ সেকেন্ড আর তার পরেই তোমার গায়ে কিন্তু ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিব।” কাঁপতে কাঁপতে আংকেল ট্ৰম্পের সাথে আস্তাবলের পাশে ঘোড়ার খাবারের জায়গায় চলে এল ম্যানফ্রেড।

“তরুণদের পাপ লাঘব করার জন্য ঠাণ্ডা পানির চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছু নেই, বুঝলে? এখন যাও। নাশতার আগেই আস্তাবল পরিষ্কার করে ঘোড়াগুলোকে খাইয়ে দেয়া চাই।”

তারপর সারাদিন কেটে গেল একের পর এক কাজ, প্রার্থনা আর স্কুলের ওয়ার্ক করে। তবে হাঁটু গেড়ে থাকাটাই হল সবচেয়ে কষ্টের। সারাক্ষণেই আংকেল অথবা আন্টি কিছু না কিছুর জন্য ঈশ্বরকে আবদার জানিয়েই চললেন।

যাই হোক, প্রথম সপ্তাহের শেষে অবশ্য সবকিছু গা সওয়া হয়ে গেল। এমনকি ওর হলুদ চোখ জোড়ার কঠিন দৃষ্টি দেখলে ট্রাম্পের মেয়ে দুটিও ভয়ে পালাত।

কিন্তু বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। তাই আপন মনেই ওদেরকে এক হাত দেখে নেয়ার প্রতিজ্ঞায় মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করল ম্যানি। আস্তে আস্তে টের পেল ওরা কীভাবে সারাহকে জ্বালাতন করছে। এমন গোপনে আর নির্দয়ভাবে করত যে কেউ টের পেত না। হয়ত গালি দিল, কিংবা মুখ ভেংচাল। নিজেদের খেলা থেকে সারাহকে বাদ দিয়ে তামাশা করল। অথবা সারাহর ইস্ত্রি করা কাপড়ে কালি ঢেলে দিল, বোয়া প্লেটে তেল লাগিয়ে দিত ইত্যাদি ইত্যাদি।

একদিন বিয়ারম্যানের মেয়েদেরকে হাতেনাতে ধরে ফেলল ম্যানফ্রেড। তারপর চুলের বেণী ধরে কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে সাবধানও করে দিল, “দৌড়ে গিয়ে মাকে কাহিনি বলার কোনো দরকার নেই বুঝলে?” হঠাৎ করেই সুবোধ বালিকায় পরিণত হল দুই বোন। তখন থেকে ওদের অত্যাচারের হাত থেকে অবশেষে নিষ্কৃতি পেল সারাহ।

সপ্তাহ শেষে, রবিবারের গির্জায় টানা পাঁচবার সাহায্যকারীর কাজ শেষ করে যেই না নিজের বিছানায় এসে বসল ম্যানফ্রেড, দরজায় দেখা দিল দুই বোনের একজন,

“পা তোমাকে স্টাডিতে ডাকছে।” এর আগে আর কখনো যাজকের বাড়ির সামনের অংশে আসেনি ম্যানফ্রেড। তাছাড়া দুই বোনের কাছে অনেকবারই শুনেছে যে স্টাডিতে ডাক পড়ার মানে হল কোনো না কোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিংবা শাস্তি ভোগ করতে হবে। ভয়ে কাঁপছে ম্যানফ্রেড। বুঝতে পেরেছে নিশ্চয় সারাহর রাতে ওর কাছে আসাটা সবাই টের পেয়ে গেছে। যাই হোক, আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে পা দিল ম্যানফ্রেড।

ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন আংকেল, “ভেতরে এসো বাছা। আর দরজাটা বন্ধ করে দাও।” তারপর ধপ করে বসে পড়লেন নিজের চেয়ারে।

কী বলবে মনে মনে তাই গুছিয়ে নিল ম্যানফ্রেড। কিন্তু তার আগেই আংকেল বলে উঠলেন, “ওয়েল আমি তোমার আন্টির কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছি যে এতদিন তোমার পড়াশোনার প্রতি কেউ খেয়াল না করলেও এ ব্যাপারে নাকি তুমি বেশ আগ্রহী।” ম্যানফ্রেড এতটাই স্বস্তি পেল যে এর পরের কথাগুলো প্রায়ই শুনতেই পারল না। “আমরা দমন-নিপীড়নের শিকার ম্যানফ্রেড। তাই শত্রুকে ঠেকাবার একটাই উপায় আছে। আর তা হল শক্তি, বুদ্ধি আর নির্দয়তার ক্ষেত্রে তাদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়া।”

নিজের ভাবনা ছেলেটার সামনে তুলে ধরতে তিনি ব্যস্ত রইলেন যে ওর দিকে আর না তাকিয়ে স্বপ্নাতুর চোখে বলে চললেন বিভিন্ন কথা।

ম্যানফ্রেডও ফুসরত পেয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল পুরো কামরার সাজসজ্জা। হঠাৎ করেই দেয়ালের ছবিগুলোর মধ্যে আবিষ্কার করল এক ভিন্ন ট্রম্প বিয়ারম্যানকে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সিঁথি করে আঁচড়ানো চুলের ক্লিন, শেভ চেহারার বছর পঁচিশের ট্রম্প। পেশিবহুল শক্তিশালী দেহ। সামনেই ছোট একটা টেবিলে একগাদা কাপ আর ট্রফি। ছবিতে হাস্যরত সুদর্শন চেহারার ওই তরুণকে বেশ রোমান্টিকও লাগছে।

“আপনি বক্সার ছিলেন” আচমকা বলে উঠল ম্যানফ্রেড। এত অবাক হয়ে গেছে যে চুপ করে থাকার কথাও ভুলে গেল। কথার মাঝখানে বাধা পেয়ে বিশাল বড় মাথাটা ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন ট্রম্প। ম্যানফ্রেডের দৃষ্টি অনুসরণ করে ছবিটা দেখে জানালেন,

“শুধু বক্সারই না। আমি ছিলাম চ্যাম্পিয়ন। লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ান।”

চোখ ফিরিয়ে ম্যানফ্রেডের সপ্রশংস দৃষ্টি দেখে তিনি নিজেও বেশ আপুত হলেন।

“এই বেল্ট আর কাপগুলো কি আপনি পেয়েছিলেন?”

“অবশ্যই। ফিলিস্তিনিদের কোমর আর উরু ভেঙে দিয়েছিলাম না।”

“শুধু ফিলিস্তিনিদের সাথেই লড়েছিলেন আংকেল ট্রম্প?”

“ওরা সবাই আসলে আমার কাছে ফিলিস্তিনিই ছিল।” হাত মুঠো পাকিয়ে ম্যানফ্রেডের নাকের কয়েক ইঞ্চি সামনে বেশ কয়েকটা পাঞ্চ মেরে দেখালেন ট্রম্প বিয়ারম্যান।

“আমি মাইক উইলিয়ামকেও হারিয়ে দিয়েছি, বুঝেছ? ১৯১৬ সালে জ্যাক লালোরের কাছ থেকে পদবী নিয়েছি।” হঠাৎ করেই কোলের উপর হাত রেখে আবার চুপচাপ হয়ে গেলেন আংকেল, “আর তারপর তো তোমার ট্রুডি আন্টি আর ঈশ্বরের প্রভু আমাকে রিং থেকে ডেকে এনে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ দিলেন।” আংকেলের চোখ থেকে বিদায় নিল ময়দানের স্মৃতি।

“বক্সিং আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া এ দুটোই আমার জীবনের সবচেয়ে জরুরি কাজ।” একনিঃশ্বাসে বলে ফেলল ম্যানফ্রেড। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ছেলেটাকে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন বিয়ারম্যান।

“তুমি ফাইট করতে চাও?” চকিতে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে যেন ষড়যন্ত্র করছেন এমন ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন আংকেল।

এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠল যে ম্যানফ্রেডের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হল না। কেবল তীব্র বেগে মাথা নাড়ল।

কিন্তু তোমার আন্টি তো এসব পছন্দ করে না। একদিক দিয়ে ঠিকই আছে। মারামারি আসলে গুণ্ডাদের কাজ। এসব মাথা থেকে তাড়াও বাছা। অন্য কোনো উচ্চ চিন্তা করো।” মুখে বললেও আংকেল কিন্তু নিজে তা বিশ্বাস করেন না। তবুও ম্যানফ্রেডের সামনে মাথা নেড়ে হাত দিয়ে নিজের দাড়ি ঠিক। করতে লাগলেন।

“এর পরিবর্তে আমার কথা শোনো। আমি আর তোমার আন্টি দু’জনেই চাইছি যে তুমি কয়েকদিনের জন্য ডি লা রে পদবীটাকে ব্যবহার করো না। অন্তত তোমার বাবার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ারম্যান পদবীটা ব্যবহার করো। এমনিতেই সংবাদপত্রে বেশ কয়েকবার চলে এসেছে এ নাম। তাছাড়া আগামী মাসেই উইন্ডহকে আবার তোমার বাবার কেস আদালতে উঠবে।”

“আমার বাবার বিচার?” হাঁ করে তাকিয়ে রইল ম্যানফ্রেড। “কিন্তু বাবা তো মারা গেছে।”

“মারা গেছে? তোমার তাই ধারণা?” উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের পিছন থেকে বের হয়ে ম্যানফ্রেডের কাছে এলেন বিয়ারম্যান, “আমাকে ক্ষমা করো বাছা। তোমাকে আরো আগেই বলা উচিত ছিল। তোমার বাবা মারা যায়নি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। আগামী মাসের বিশ তারিখে উইন্ডহকে সুপ্রিম কোর্টে তার বিচার হবে।”

কেঁপে উঠল ম্যানফ্রেড। ওর কাঁধে হাত দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন ট্রম্প বিয়ারম্যান, তারপর নরম স্বরে জানালেন, “এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে কেন তোমার নাম পরিবর্তনের কথা বলেছি?”

***

দ্রুতহাতে কাপড় ইস্ত্রি করা শেষ করে বাসা থেকে বের হয়ে এল সারাহ। এবার কাঠের স্তূপের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে দেখতে লাগল ম্যানফ্রেডের কাজ।

শার্ট খুলে দ্বিতল হাতলের লম্বা কুঠার নিয়ে কাঠ কাটছে ম্যানফ্রেড। ঘামে ভিজে গেছে ছেলেটার উদোম পিঠ আর বুক।

হাতের তালুতে থুথু ছিটিয়ে খানিকটা পিছিয়ে এল ম্যানি। তারপর আদেশের সুরে বলে উঠল, “পাঁচের ঘরের নামতা….একই সাথে মাথার উপর কুঠারটাকে ঘুরিয়ে কাঠের গুঁড়ির ওপর দিল কোপ। “পাঁচ একে পচ।” কুঠারের তালে তালে বলা শুরু করল সারাহ্। “পাঁচ দু’গুণে দশ।” মাথা সমান লম্বা একফালি কাঠ কেটে নিল ম্যানি। এভাবে কাটতে কাটতে ঠিক যখন মেয়েটা পাঁচ দশে পঞ্চাশ” বলল ঠিক তখন পুরো কাঠটা দুটুকরো হয়ে গেল। পিছিয়ে এসে হাতলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হেসে ফেলল ম্যানফ্রেড।

“ভেরি গুড, সারি, একটাও ভুল হয়নি।”

খুশিতে চকচক করে উঠল সারাহর চোখ; কিন্তু হঠাৎ তখনই ম্যানফ্রেডের কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে কী যেন দেখে আবার শক্ত করে ফেলল শরীর। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে স্কার্ট তুলে ঘরের দিকে দৌড় দিল।

ঝট করে পিছু ফিরল ম্যানফ্রেড। শেড়ের নিচে থেকে এদিকেই তাকিয়ে আছেন আংকেল ট্রম্প। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে ম্যানফ্রেডের কাছে এসে দাঁড়ালেন। কী মনে করে আবার ওর চারদিকে একবার ঘুরে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করেছেন ম্যানফ্রেডের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবকিছু।

অস্বস্তিতে পড়ে গেল ম্যানি।

“তোমার বয়স কত বাছা?”

জানতে চাইলেন বিয়ারম্যান।

উত্তর শুনে মাথা নেড়ে বললেন, “আর তিন বছর হলেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবে। লাইট হেভিওয়েটের জন্যে তুমি পুরোপুরি ঠিক আছে আর তারপর কোনো ঝামেলা না বাঁধলে হেভিওয়েট পর্যন্ত যেতে পারবে।”

উত্তেজনায় ম্যানফ্রেডের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। অথচ আংকেল ট্রম্প আর কিছু না বলে কাঠের স্কুপের দিকে এগিয়ে গেলেন। নিজের জ্যাকেট খুলে পরিপাটি করে ভাজ করে একপাশে সরিয়ে রাখলেন, তারপর টাই খুলে শার্টের হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এলেন ম্যানির কাছে।

“তো তুমি বক্সার হতে চাও?” হাতের কুঠারটাকে কাঠের নিচে ঢুকিয়ে রেখে আংকেলের সামনে এসে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড। ডান হাতের তালু বাড়িয়ে দিলেন আংকেল। বললেন, “হিট ইট!” হাত মুঠো করে ঘুরিয়ে মারল ম্যানি।

“তুমি কি সোজা সেলাই করছো নাকি আটা বানাচ্ছ? জোরে মারো। আরো জোরে। এই তো। গুড! এবার বামে! হুস! বামে! ডানে! আবার বামে!”

দু’হাত সামনে বাড়িয়ে হেলে-দুলে যেন নাচলেন আংকেল। ম্যানফ্রেড নিজেও এখন আগ্রহ নিয়ে ঘুষি চালাচ্ছে।

“অল রাইট।” অবশেষে হাত সরিয়ে নিলেন আংকেল।

“এবারে আমার মুখে মারো। একেবারে বোতামের ওপর। দেখা যাক পিঠে লাগাতে পারো কিনা।”

হাত নামিয়ে পিছিয়ে এল ম্যানফ্রেড।

“না, আংকেল আমি এটা পারব না।”

“কেন?”

“আপনাকে মারাটা উচিত হবে না।”

“আমরা তো এখন বক্সিং করছি।” চিৎকার করে উঠলেন আংকেল। “আমি তো আরো ভেবেছি তুমি লড়তে চাও। আমি ভেবেছি তুমি বুঝি পুরুষ হয়ে উঠতে চাও। এখন তো দেখি বাচ্চাদের মত ঘ্যানঘ্যান করছে। তারপর নাকি সুরে ম্যানফ্রেডকে নকল করে বললেন, “না আংকেল আপনাকে মারাটা উচিত হবে না।”

তারপর হঠাৎ করেই ডান হাত দিয়ে ম্যানফ্রেডের গালে এত জোরে ঘুষি মারলেন যে চামড়ায় দাগ পড়ে গেল।

“তুমি পুরুষ নও! কখনো ফাইটার হতেই পারবে না।”

পরের আঘাতটা এত জোরে এল যে ম্যানফ্রেড ঠিকভাবে ঠাহরই করতে পারল না। এত ব্যথা পেল যে চোখ ভরে গেল জলে।

“তোমার জন্য আসলে মেয়েদের স্কার্ট বানাতে হবে। তাই না?”

খুব সাবধানে ম্যানফ্রেডকে পরখ করে দেখছেন আংকেল। চাইছেন বিশৃঙ্খল মনোজগতের অধিকারী এই কিশোরকে স্থির করার জন্যে। আরেকটা আঘাত করে এবারে ম্যানফ্রেডের নিচের ঠোঁট কেটে দিলেন।

“কাম অন!” একের পর এক অপমান করে নিঃশব্দে চ্যালেঞ্জ করলেন ছেলেটাকে।

আর তারপরেই যা ঘটল দেখে ভরে গেল তার বুক। উল্লাসিত হয়ে দেখলেন যে বদলে গেল ম্যানফ্রেডের চোখের দৃষ্টি। আচমকা সেখানে ধপ করে জ্বলে উঠল হলুদ আলো। ঠিক যেমনটা শিকারকে আক্রমণের আগমুহূর্তে থাকে সিংহের চোখে। এগিয়ে এল ম্যানফ্রেড।

যদিও আংকেল এমনটাই চাইছিলেন, তারপরেও ম্যানফ্রেডের গতি আর আক্রমণের তীব্রতায় ভারসাম্য হারিয়ে টলে উঠলেন আংকেল। কেবল ফাইটারের জাত দক্ষতার গুণেই এ যাত্রা বেঁচে গেছেন। তারপরেও টের পেলেন ভয়ংকর এক প্রাণীকে বুঝি তিনি নিজেই গুহা থেকে টেনে বের করে এনেছেন।

আর তারপরেই মনে পড়ে গেল রিংয়ের অভিজ্ঞতা আর পুরনো সব কৌশল। নিচু হয়ে এঁকেবেঁকে এড়িয়ে গেলেন ম্যানফ্রেডের সবকটা আঘাত। তবে বিস্মিত হলেন ছেলেটার সক্ষমতা দেখে, “কেমন সুন্দর করে দু’হাতে ঘুষি মারছে। যেন জন্ম থেকেই খেলে।”

ম্যানফ্রেডের চোখের দিকে তাকাতেই শিরশির করে উঠল আংকেলের দেহ। “না জানি দুনিয়ার ওপর কোনো প্রলয়ঙ্করী ঝড় উড়ে আসছে।”

“ও একটা খুনি। ঠিক একটা চিতার মতই রক্ত দেখার আনন্দে খুন করবে। আমাকে যেন দেখছে না। দেখছে নিজের শিকার।”,

ভাবতে গিয়ে যেই না আংকেল একটু আনমনা হলেন অমনি চোয়ালের মধ্যে দাঁত ঢুকে গেল, গোড়ালির হাড় ভেঙে গেল ম্যানফ্রেডের ঘুষি খেয়ে, মনে হচ্ছে পা দুটো বুঝি আর তার দেহের ভার বইতে পারছে না। তিনি নিজে সেই বাইশ বছর আগে খেলা ছেড়েছেন অথচ ছেলেটা যেন মেশিন। দুটো হাতই সমানে ঘুরছে। হলুদ চোখ দুটোর আগুনে দৃষ্টি তো কিছুতেই তাকে আড়াল হতে দিচ্ছে না।

নিজেকে সামলে নিয়ে বাম হাত দিয়ে পাল্টা পাঞ্চ মারলেন বিয়ারম্যান, যা দিয়ে ব্ল্যাক জেপটাকে কুপোকাৎ করেছিলেন।

হঠাৎ করে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ম্যানফ্রেড।

“এই তো হয়েছে। কোনোমতে শ্বাস নিতে নিতে জানালেন আংকেল। “এভাবেই হাঁটু গেড়ে বসে তোমার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাও।” তারপর নিজেও ম্যানফ্রেডের পাশে বসে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সর্বশক্তিমান ঈশ্বও, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই তরুণের মাঝে এতটা শক্তি দান করার জন্যে। ডান হাতটা যেন সরাসরি তোমার আশীর্বাদে ধন্য হয়ে এসেছে। যার জন্য সর্বদা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব প্রভু!”।

এখনো ম্যানফ্রেডের মাথা ঘুরছে। চোয়াল ঘষে কোনোমতে তাও প্রার্থনা শেষে বলল, “আমেন।”

“কিছুদিনের মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করব প্রভু। শেডের কাছে রিং বানিয়ে আমাদের এই সৎকর্মের প্রয়াসে তোমার সদা সহযোগিতা কামনা করছি যেন তোমার ভৃত্য ঢুডি বিয়ারম্যানের নজর থেকে এটাকে বাঁচাতে পারি।”

***

এরপর দেখা গেল বেশিরভাগ দিন বিকেলবেলাতেই স্ত্রীকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে কোনো এক খ্রিস্টভক্তের সাথে দেখা করার অজুহাতে বাড়ির বাইরে চলে আসেন আংকেল ট্রম্প। অন্যদিকে উইন্ডহক রাস্তার ধারের গাছের ঝাড়ের পিছনে খাকি শর্টস পরে প্রস্তুত হয়ে থাকে ম্যানি।

ট্রুডির অগোচরে ট্রাঙ্ক থেকে বহু পুরাতন একজোড়া গ্লাভস্ বের করে এনেছেন আংকেল। কিন্তু ম্যানফ্রেডের হাতে দিতেই নাকের কাছে তুলে মুখে বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে তুলল ছেলেটা।

“ঘাম রক্ত আর চামড়ার গন্ধ বাছা, বুক ভরে ঘ্রাণ নাও। এখন থেকে এটাই তোমার জীবন।”

খানিকক্ষণের জন্যে চোখে সেই হলুদ আলো জ্বলে উঠলেও হেসে ফেলল ম্যানফ্রেড,

“ভালোই। তেমন দুর্গন্ধ না।”

“এর চেয়ে ভালো আর কিছু নেই। বুঝলে।” একমত হয়ে শেডের নিচে বালুভর্তি কিটব্যাগের কাছে ওকে নিয়ে গেলেন আংকেল।

“শুরু করার জন্যে আমি তোমার বাম হাতের কাজও দেখতে চাই। এটাকেও শেখাতে হবে। যেন শক্তি আর সামর্থের অপচয় না ঘটে।”

দুজনে মিলে বানিয়ে ফেলেছেন রিং। কোনার পোলগুলোকে মাটিতে গেঁথে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে দিয়েছেন। তারপর মেঝের ওপর পেতে দিয়েছেন ক্যানভাস।

ম্যানফ্রেড আর আংকেল ট্ৰম্পের মধ্যকার এই বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারবে না এই শর্তে শপথ নেয়ার পর প্রবেশাধিকার পেয়েছে সারাহ। যদিও ও কেবল লজ্জার মাথা খেয়ে ম্যানফ্রেডের পক্ষই নেয়।

এভাবে দুটো সেশন শেষ হবার পর দেখা গেল আংকেল ট্রম্প আঘাত না পেলেও স্টিম ইঞ্জিনের মত হাঁপাচ্ছেন। বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে তাই ম্যানিকে জানালেন, “এভাবে চলবে না। হয় তোমার জন্য নতুন পার্টনার খুজতে হবে; নয়ত আমাকেই নতুন করে প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে।”

এরপর আবার সেই গাছের নিচে থেকে ঘোড়া নিয়ে ঘামতে ঘামতে বাড়ি ফিরে আসেন আংকেল আর ম্যানফ্রেড।

যাই হোক, একেবারে যে কাজ হয়নি তা নয়। কাকতালীয়ভাবেই কয়েকদিন পর দেখা গেল যে আংকেলের কাধ আর বুকের নিচের চর্বির ভাজ উধাও হয়ে ফুটে উঠল শক্ত পেশি। ধীরে ধীরে রাউন্ডের সময় দুই থেকে বাড়িয়ে চার মিনিটে প্যাছালো। আর এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হল সারাহকে। সাথে আংকেল ট্ৰম্পের সস্তাদরের রুপালি পকেটঘড়ি।

এভাবে প্রায় একমাস কেটে যাবার পর আংকেল যেটা বলবেন বলে স্বপ্নেও ভাবেননি সেটাই মনে মনে স্বীকার করলেন “ওকে এখন অনেকটাই বক্সারদের মত দেখায়।” যদিও মুখে ম্যানফ্রেডকে বললেন, “এবারে গতি চাই। তোমাকে ঠিক মাম্বার মতই হতে হবে, র‍্যাটল স্নেকের মতই সাহসী।” দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী এই মাম্বা সাপ। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষকে কামড় দেবার চার মিনিটের মাঝে মেরে ফেলতে সক্ষম এই সাপের বিষ। অন্যদিকে র‍্যাটেলের সম্পর্কে লোকগাঁথা আছে যে, পুরুষাঙ্গের প্রতি এ প্রাণীর অন্যরকম দুর্বলতা আছে। তাই মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এসে যে কোনো পুরুষ প্রাণী মানুষ কিংবা সিংহ, হাতি যাই হোক না কেন সবগুলোর পুরুষাঙ্গে আঘাত করে।

“চলো তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।” শেডের পেছনকার দেয়ালের সাথে লাগোয়া কাবার্ডের ঢাকনা খুলে চামড়া আর রাবারের তৈরি একটা জিনিস বের করে ম্যানফ্রেডের হাতে দিলেন আংকেল।

“এটা কী আংকেল ট্রম্প?”

“তোমার জন্য কেপটাউন থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছি। চলো দেখাচ্ছি।”

তারপর খুলে ম্যানফ্রেডকে দেখালেন। দাড়ির ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে আংকেলের হাসি।

“কেমন হয়েছে?”

“এত সুন্দর উপহার এর আগে কেউ আর দেয়নি আমাকে। কিন্তু এটা কী?”

“তুমি নিজেকে বার বলে দাবি করো অথচ স্পিড ব্যাগ চেন না?

“স্পিড ব্যাগ। এটা তো অনেক দামি!”

“হুম। কিন্তু তোমার আন্টিকে বলতে যেও না আবার।”

“এটা দিয়ে আমরা কী করব?”

“দেখ তবে!” বলেই ফ্রেমের সাথে আটকানো ব্যাগটাতে একের পর এক ঘুষি চালালেন আংকেল। দুহাত একসাথে চালানোর ফলে খানিক পরেই হাঁপিয়ে উঠলেন।

“স্পিড বুঝলে, ঠিক মাম্বার মতই।”

আংকেল ট্ৰম্পের মহানুভবতা আর আগ্রহ দেখে যা বলতে চেয়েছিল তা বলতে গিয়ে শরমে মরে গেল যেন ম্যানফ্রেড। অথচ না বলে উপায়ও নেই। তাই বহুকষ্টে নিজের সমস্ত সাহস জড়ো করে কোনোমতে বলে ফেলল, “কিন্তু আমাকে তো যেতে হবে আংকেল।”

অবাক হয়ে চোখে একগাদা অবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকালেন আংকেল, “চলে যেতে হবে? তুমি আমার বাসা ছেড়ে চলে যাবে?” গলার কাছে পেঁচানো তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছে নিলেন, “কেন?”

“আমার পা। তিনদিনের ভেতরেই পা’র বিচার শুরু হবে। তাই আমাকে ওখানে যেতেই হবে আংকেল। তবে কথা দিচ্ছি, আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার ফিরে আসব।”

মুখ ঘুরিয়ে দৌড়াতে লাগলেন আংকেল ট্রম্প। সাথে সাথে এল ম্যানফ্রেড। ঘোড়র কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত আর কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর ঘোড়ার গাড়িতে বসে লাগাম টেনে সামনের হুইলের পাশে দাঁড়ানো ম্যানফ্রেডের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার নিজের যদি এরকম বিশ্বস্ত একটা ছেলে থাকত তবে বেশ হত।” দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে এলেন আংকেল।

পরের দিন সন্ধ্যায় ডিনার শেষ করে নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে গ্যেটে পড়ছে ম্যানফ্রেড। এতটাই তন্ময় হয়ে ছিল যে কখন আংকেল ট্রম্প এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটাও টের পায়নি। ম্যানফ্রেডের হাত থেকে বই নিয়ে রেখে দিলেন আংকেল, বললেন, “চোখ খারাপ হয়ে যাবে তো৷” ট্রুডি আন্টির ভয়ে বহু ঝামেলা করে মোমবাতির আলোকে ঢেকে এতক্ষণ পড়েছে।

তাড়াতাড়ি উঠে বসল ম্যানফ্রেড। আংকেলও পাশে এসে বসলেন। খানিক বাদে ম্যানফ্রেডের দিকে না তাকিয়েই বললেন, “আগামীকাল নিজের ফোর্ড নিয়ে টটেনবাক্ উইন্ডহকে যাচ্ছে। সাথে একশ’ টাকি থাকলেও তোমার জায়গা হয়ে যাবে। ট্রেনের চেয়ে সস্তা হবে বুঝলে।”

“ধন্যবাদ, আংকেল ট্রম্প।”

“শহরে বুড়ি এক বিধবা আছে, রাধেও ভালো। তুমি ওর কাছেই থাকবে। আমি চিঠি লিখে দিয়ে দিব।” কোটের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ম্যানির কোলে রেখে দিলেন।

ধন্যবাদ আংকেল।” এছাড়া আর কী বলা যায় ভেবে পেল না ম্যানফ্রেড। মন চাইল আংকেলের গলায় হাত ধরে খসখসে দাড়িতে মুখ ঘষে; কিন্তু কিছু না করে চুপ চাপ বসে রইল।

“অন্যান্য আরো খরচ আছে। জানি না এখানে কীভাবে ফিরবে। যাই হোক— আবার কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কী যেন একটা বের করে ম্যানফ্রেডের খোলা হাতের তালুতে রেখে দিলেন আংকেল।

চকচকে দুটো কয়েন দেখে মাথা নাড়ল ম্যানি

“আংকেল”।

“কিছু বলল না। বিশেষ করে তোমার আন্টিকে তো নয়ই।” এই বলে আংকেল উঠে দাঁড়াল