ফারাও

১. তলোয়ার গিলে নিতে

ফারাও – উইলবার স্মিথ
অনুবাদ: শাহেদ জামান

যদিও কথাটা মেনে নেওয়ার আগে বরং নিজের তলোয়ার গিলে নিতেই আমি বেশি পছন্দ করব; কিন্তু অন্তরের গভীরে ঠিকই বুঝতে পারলাম, সব শেষ।

পঞ্চাশ বছর আগে পুবের বন্য অঞ্চল থেকে কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই আমাদের মিশরের সীমান্তে এসে হাজির হয়েছিল হিকসসদের দল। পুরোদস্তুর বন্য এবং নিষ্ঠুর এক জাতি ওরা, ভালোর ছিটেফোঁটাও নেই কারো মধ্যে। কেবল একটা কারণেই যুদ্ধে অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল তারা। আর তা হচ্ছে তাদের ঘোড়া এবং রথ, যেগুলোর কোনোটাই এর আগে কোনো মিশরীয় দেখেনি, এমনকি সেগুলোর কথাও আগে শোনেনি; এবং যেগুলোকে আমরা অত্যন্ত ভয়ানক এবং ঘৃণার বস্তু বলে ধারণা করেছিলাম।

পদাতিক সৈন্যের দল নিয়ে হিকসস আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা; কিন্তু সহজেই আমাদের হারিয়ে দিয়েছিল ওরা। রথের সাহায্যে অনায়াসে আমাদের ঘিরে ফেলা হতো, তারপর তীরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হতো আমাদের ওপর। ফলে নৌকায় করে নীলনদের উজানে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ ছিল না আমাদের। বড় বড় জলপ্রপাতের ওপর দিয়ে নৌকাগুলো টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা, হারিয়ে গিয়েছিলাম বুনো প্রকৃতির মাঝে। সেখানেই জন্মভূমির জন্য শোকবিহ্বল অবস্থায় দশ বছর কাটিয়ে দিই আমরা।

সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে যাওয়ার আগে শত্রুদের অনেকগুলো ঘোড়া দখল করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। সেগুলো নিয়ে গিয়েছিলাম নিজেদের সাথে। খুব তাড়াতাড়িই আবিষ্কার করলাম ঘোড়াগুলো আসলে ভয়ানক তো নয়ই বরং অন্যান্য প্রাণীর মাঝে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, খুব সহজেই পোষ মেনে যায়। আমার নিজের নকশায় আলাদা করে রথ তৈরি করলাম, যেগুলো হিকসসদের রথের চাইতে অনেক বেশি হালকা, দ্রুতগামী এবং সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। টামোস নামের ছেলেটি যে পরে মিশরের ফারাও পদে অভিষিক্ত হয় তাকে একজন দক্ষ রথচালক হিসেবে গড়ে তুলি আমি।

সঠিক সময় উপস্থিত হলে নৌকায় করে নীলনদ ধরে ফিরে আসি আমরা। মিশরের ঠিক কিনারায় অবতরণ করে আমাদের রথ বাহিনী, এবং সেগুলোর সাহায্যে শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের উত্তরের সমভূমির দিকে বিতাড়িত করি। পরবর্তী দশকগুলোতে হিকসস শত্রুদের সাথে প্রায় নিয়মিত লড়াইয়ে লিপ্ত হতে হয়েছে আমাদের।

কিন্তু এখন ভাগ্যের চাকা পুরোপুরি ঘুরে গেছে। ফারাও টামোস এখন একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি এবং হিকসস তীরের আঘাতে মুমূর্ষ অবস্থায় পড়ে আছেন তার তাঁবুতে। ধীরে ধীরে কমে এসেছে মিশরীয় সৈন্যসংখ্যা। আগামীকাল সেই অবশ্যম্ভাবী নিয়তির মুখোমুখি হতে হবে আমাকে।

গত অর্ধ-শতাব্দীর লড়াইয়ে মিশরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপরিহার্য ছিল আমার সাহস। কিন্তু সেই সাহসও এখন আর যথেষ্ট নয়। গত এক বছরে পরপর দুটো বড় যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে আমাদের, দুটোই ছিল আমাদের জন্য তিক্ত এবং রক্তাক্ত এক অভিজ্ঞতা। আমাদের পিতৃভূমির বেশির ভাগ অংশ যারা দখল করে নিয়েছে সেই হিকসস অনুপ্রবেশকারীরা এখন তাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। মিশরের প্রায় পুরোটাই এখন তাদের দখলে। হেরে যাচ্ছে আমাদের সৈন্যরা, মনোবল ভেঙে পড়ছে তাদের। আমি যতই তাদের নির্দিষ্ট অবস্থানে সাজিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দিই না কেন মনে হচ্ছে যেন তারা নিজেরাই নিজেদের পরাজয় আর অসম্মান মেনে নিতে প্রস্তুত। আমাদের প্রায় অর্ধেক ঘোড়া মারা পড়েছে, যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোও আর মানুষ বা রথের ওজন টানতে পারছে না। আর সৈন্যদের মাঝে প্রায় অর্ধেকের শরীরে রয়েছে তাজা ক্ষতচিহ্ন, ঘেঁড়া কাপড় দিয়ে কোনোমতে বেঁধে রাখা। এর আগে বছরের শুরু থেকে যে দুটো যুদ্ধে আমাদের লড়তে হয়েছে তাতে প্রায় তিন হাজার সৈন্য হারিয়েছি আমরা। যারা বেঁচে গেছে তাদের বেশির ভাগই এখন এক হাতে তলোয়ার আর আরেক হাতে ক্যাচ নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যোগ দিয়েছে যুদ্ধে।

এটা সত্যি যে, আমাদের সেনাবাহিনীর এই দৈন্যদশার পেছনে মূল কারণ যতটা না মৃত্যু বা যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়া তার চাইতে বেশি সৈন্যদের পালিয়ে যাওয়া। ফারাওয়ের একসময়ের গর্বিত সৈন্যরা শেষ পর্যন্ত মনোবল হারিয়ে ফেলেছে, শত্রুর সামনে থেকে দলে দলে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেছে তারা। দারুণ লজ্জায় চোখে পানি নিয়ে তাদের মিনতি করেছি আমি, এমনকি চাবুক, মৃত্যু আর অসম্মানের ভয়ও দেখিয়েছি। তবু আমার পাশ কাটিয়ে বিপুলসংখ্যক সৈন্য সরে গেছে বাহিনীর পেছনে। আমার কথায় কেউ কোনো কান দেয়নি, একবার আমার দিকে তাকায়ওনি, শুধু অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ে বা খুঁড়িয়ে পালিয়ে গেছে। আর এখন লুক্সরের প্রবেশপথের ঠিক বাইরেই জড়ো হয়েছে হিকসস বাহিনী। প্রায় অবশ্যম্ভাবী এক ভয়ানক পরিণতি এড়ানোর জন্য, বলতে গেলে অত্যন্ত ক্ষীণ একটা সুযোগ রয়েছে আমাদের হাতে, আর কাল সকালে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সেটা কাজে লাগাব আমি।

যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর রাত নেমে এলো। দাসদের সাহায্যে আমার ঢাল এবং বর্ম থেকে তাজা রক্তের দাগ পরিষ্কার করে নিলাম আমি, সেইসাথে হেলমেটের দেবে যাওয়া জায়গাটাও পিটিয়ে ঠিক করে নিলাম। আজ সকালেই একটা। হিকসস তলোয়ারের আঘাত ঠেকিয়েছে এই হেলমেট। হেলমেটের পালকটা এখন আর নেই, কেটে পড়ে গেছে ওই একই আঘাতে। কাজ শেষ হতে মশালের কম্পমান আলোয় আমার পালিশ করা ব্রোঞ্জের হাত-আয়নায় নিজের চেহারার প্রতিফলন পরীক্ষা করে দেখলাম। বরাবরের মতোই এটা আমার ভেঙে পড়া মনকে একটু হলেও চাঙ্গা করে তুলল। আরো একবার আমার মনে পড়ল নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়তে যাচ্ছে জেনেও সৈন্যরা কীভাবে একটা ধারণা বা নামকে অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম, চোখের নিচে জমাটবাঁধা বিষণ্ণ কালো ছায়াগুলোকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করছি। তারপর তাঁবুর দরজার মাঝ দিয়ে মাথা নিচু করে বের হয়ে এসে এগিয়ে গেলাম আমার প্রিয় ফারাওয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

নিজের অসংখ্য সন্তানের মাঝ থেকে ছয় ছেলে এবং তিনজন চিকিৎসকের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে নিজ বিছানায় শুয়ে আছেন ফারাও টায়োস। তাদের পরে আরো বড় একটা বৃত্ত রচনা করে দাঁড়িয়ে আছে তার জেনারেল এবং একান্ত পরামর্শকরা, তাদের সাথে তার পাঁচজন প্রিয় স্ত্রী। সবার চেহারা বিষণ্ণ, কাঁদছে কেউ কেউ। কারণ মারা যাচ্ছেন ফারাও। দিনের শুরুর দিকেই যুদ্ধক্ষেত্রে এক ভয়ানক আঘাতের শিকার হয়েছেন তিনি। তার পাঁজরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে একটা হিকসস তীরের অবশিষ্টাংশ। ফারাওয়ের যেসব চিকিৎসক এখানে উপস্থিত তারা কেউই তার হৃৎপিণ্ডের এত কাছ থেকে তীরের বাঁকানো মাথাটা বের করে আনতে সাহস পায়নি, এমনকি তাদের মাঝে যে সবচেয়ে দক্ষ সেই আমিও না। আমরা শুধু ক্ষতের মুখের কাছ থেকে তীরের গোড়াটা ভেঙে এনেছি এবং এখন অপেক্ষা করছি সেই অবশ্যম্ভাবী পরিণতির। এটা প্রায় নিশ্চিত যে আগামীকাল দুপুরের আগেই ফারাও তার সোনালি সিংহাসন ছেড়ে দেবেন তার বড় ছেলে উটেরিক টুরোর হাতে। তার ছেলে এখন ফারাওয়ের পাশে বসে আছে, বোঝা যাচ্ছে যে মিশরের শাসনভার নিজের হাতে চলে আসার মুহূর্ত উপস্থিত হওয়ায় অনেক কষ্টে নিজের আনন্দটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে সে। উটেরিক একজন খামখেয়ালি এবং অপদার্থ যুবক, এটা কল্পনাই করতে পারছে না যে আগামীকাল সূর্য ডোবার সময় তার সাম্রাজ্যের হয়তো কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। অন্তত সেই সময়ে আমি তার সম্পর্কে এটাই ভাবছিলাম। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমি জানতে পারব যে তাকে বিচার করতে কত বড় ভুল হয়েছিল আমার।

টামোস এখন একজন বৃদ্ধ মানুষ। নিখুঁতভাবে তার বয়স জানা আছে আমার, এমনকি ঘণ্টার হিসাবও বলতে পারব; কারণ এই কঠিন পৃথিবীতে নবজাতক ফারাওয়ের জন্ম নেওয়ার সময় আমি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। জনপ্রিয় কিংবদন্তি আছে, তিনি জন্মের পর প্রথম যে কাজটা করেছিলেন সেটা হচ্ছে আমার গায়ে প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব করে দেওয়া। পরবর্তী ৬০ বছরে সেই একইভাবে আমার প্রতি নিজের বিরক্তি প্রকাশ করতে কখনো একটুও দ্বিধা বোধ করেননি তিনি, কথাটা মনে পড়তে এই দুঃখের মাঝেও হাসি চাপতে হলো আমাকে।

এবার তিনি যেখানে শুয়ে আছেন সেদিকে এগিয়ে গেলাম আমি, তার হাতে চুমু খেলাম। সত্যিকার বয়সের চাইতেও অনেক বেশি বয়স্ক লাগছে ফারাওকে। যদিও কিছুদিন আগে নিজের চুল আর দাড়িতে রং করিয়েছিলেন তিনি, আমি জানি যে তার পছন্দের উজ্জ্বল তামাটে রঙের নিচে চুলগুলো সব সূর্যের তাপে পোড়া শেওলার মতো ধবধবে সাদা হয়ে গেছে। মুখের চামড়ায় অজস্র গভীর বলিরেখা, তার সাথে রোদে পোড়া ফুটকি ফুটকি দাগ। দুই চোখের নিচে ফুলে আছে চামড়া, চোখগুলোতে আসন্ন মৃত্যুর চিহ্ন সুস্পষ্ট।

নিজের বয়স সম্পর্কে সামান্যতম ধারণাও নেই আমার। তবে এটা ঠিক যে, ফারাওয়ের চাইতে আমার বয়স অনেক বেশি; যদিও চেহারা দেখলে মনে হতে পারে যে আমার বয়স তার স্রেফ অর্ধেক। এর কারণ হলো আমি একজন দীর্ঘজীবী মানুষ এবং দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট- বিশেষ করে দেবী ইনানার আশীর্বাদ আছে আমার ওপর। ইনানা হচ্ছে দেবী আর্টেমিসের এক গোপন নাম।

মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন ফারাও। কথা বলতে ব্যথা পাচ্ছেন, কষ্ট হচ্ছে তার। কণ্ঠস্বর খসখসে হয়ে আছে। নিঃশ্বাসে ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে, অনেক কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। টাটা! ছোটবেলায় আমাকে আদর করে যে নাম। দিয়েছিলেন সেই নাম ধরেই ডাক দিলেন তিনি। আমি জানতাম যে তুমি আসবে। তোমাকে কখন আমার সবচেয়ে বেশি দরকার সেটা বুঝতে কখনো অসুবিধা হয়নি তোমার। বলো হে প্রিয় বন্ধু আমার, আগামীকাল কী ঘটতে যাচ্ছে?

আগামীকালের মালিক তো আপনি এবং মিশর, মহান প্রভু আমার। জানি না কেন তার কথার জবাবে ঠিক এ কথাগুলোই কেন বেছে নিলাম আমি, যখন এটা প্রায় নিশ্চিত যে আমাদের সবার ভবিষ্যই এখন কবরস্থান আর মৃত্যু পরবর্তী জীবনের দেবতা আনুবিসের হাতে। তবু আমার ফারাওকে আমি ভালোবাসি এবং চাই যে যতটা সম্ভব শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করার সুযোগ পান তিনি।

মৃদু হাসলেন ফারাও, আর কোনো কথা বললেন না। তবে কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দুর্বল আঙুলগুলো দিয়ে আমার হাত ধরলেন তারপর নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রাখলেন যতক্ষণ না ঘুম নেমে এলো তার চোখে। চিকিৎসক এবং তার ছেলেরা এক এক করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল। শপথ করে বলতে পারি, দরজা দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার আগে উটেরিক টুরোর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখলাম আমি। মধ্যরাতের অনেক পরেও টামোসের সাথে বসে রইলাম আমি, ঠিক যেমনটা ছিলাম তার মায়ের মারা যাওয়ার সময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সারা দিনের যুদ্ধের পর আগত অপরিসীম ক্লান্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলাম। ফারাওয়ের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম আমি, তখনো সেই হাসি লেগে আছে তার মুখে। কোনোমতে টলতে টলতে নিজের কম্বলের কাছে এসে দাঁড়ালাম আমি, তারপর মৃত্যুর মতো ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে গেলাম তার ওপর।

.

ভোরের প্রথম আলোয় আকাশ সোনালি হয়ে ওঠার আগেই আমাকে ডেকে তুলল আমার চাকররা। তাড়াহুড়োর সাথে যুদ্ধের পোশাক পরে নিলাম আমি, কোমরে বেঁধে নিলাম আমার তলোয়ার। তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম রাজকীয় তাবুর দিকে। আরো একবার যখন ফারাওয়ের বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলাম, তখনো তার মুখে সেই হাসি খেলা করছে। কিন্তু আমার হাতের নিচে ঠাণ্ডা লাগল তার হাত, বুঝতে পারলাম মারা গেছেন তিনি।

তোমার জন্য পরে শোক করব আমি, আমার মেম, সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম আমি কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে, চেষ্টা করতে হবে তোমার কাছে, সেইসাথে আমাদের মিশরের প্রতি আমি যে শপথ করেছিলাম তা পালন করার।

দীর্ঘ জীবন পাওয়ার এই হলো অভিশাপ: যাদের তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো তাদের সবাইকে এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখা।

আমাদের এলোমেলো সেনাদলের যা কিছু বাকি ছিল তারা সবাই সোনালি শহর লুক্সরের সামনে পথের শুরুতে এসে জড়ো হয়েছে। এখানেই গত পঁয়ত্রিশ দিন ধরে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে হিকসসদের রক্তপিপাসু বাহিনীকে ঠেকিয়ে রেখেছি আমরা। সৈন্যদের মুষ্টিমেয় দলগুলোর সামনে দিয়ে যুদ্ধ-রথ নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। আমাকে চিনতে পারার সাথে সাথে যারা যারা সক্ষম ছিল তারা সবাই নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াল। ঝুঁকে নিজেদের আহত সঙ্গীকেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল তারা, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধের অবস্থান নিল। তারপর সুস্থ ও সবল সৈন্যরা, সেইসাথে যেসব সৈন্য ইতোমধ্যে মৃত্যুর পথে অর্ধেক এগিয়ে গেছে তাদের সবাই ভোরের আকাশের দিকে নিজেদের অস্ত্র তুলে ধরল, আমি এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অভিনন্দন জানাল আমাকে।

সুরেলা একটা ধ্বনি ভেসে আসতে শুরু করল: টাইটা! টাইটা! টাইটা!

মিশরের এই সাহসী সন্তানদের এমন করুণ পরিস্থিতিতে দেখে কোনোমতে চোখের পানি আটকে রাখলাম আমি। তার বদলে জোর করে হাসি ফোঁটালাম ঠোঁটে, হাসি আর চিৎকারের মাধ্যমে পাল্টা উৎসাহ দিলাম তাদের সবাইকে। সেনাদলের মাঝে পরিচিত মুখগুলোকে নাম ধরে ডাকলাম।

এই যে ওসমেন! জানতাম যে তোমাকে সামনের সারিতেই পাওয়া যাবে।

আপনার কাছ থেকে আমার দূরত্ব কখনো এক তলোয়ারের বেশি ছিল না প্রভু, আর হবেও না! সেও পাল্টা চিৎকার করে জবাব দিল আমার কথার।

লোথান, ব্যাটা লোভী বুড়ো সিংহ। ইতোমধ্যে যথেষ্ট হিকসস কুকুর কুপিয়ে মেরেছ তুমি, আর কত?

যথেষ্ট মেরেছি ঠিক কিন্তু আপনি যতগুলো মেরেছেন তার অর্ধেকও পারিনি, প্রভু টাটা। লোথান আমার বিশেষ প্রিয়ভাজনদের একজন, তাই তাকে অনুমতি দিয়েছি আমার ডাকনাম ধরে সম্বোধন করার। সবার সামনে দিয়ে আমার রথ পার হয়ে যাওয়ার পর সৈন্যদের উচ্ছ্বাসধ্বনি নীরব হয়ে গেল, আরো একবার তার জায়গা দখল করল ভয়ংকর নীরবতা। আবার হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সবাই, তাকিয়ে রইল উঁচু পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পথের শেষ প্রান্তের দিকে। সবাই জানে যে ওখানে হিকসস সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়েছে, ভোরের আলো সম্পূর্ণ ফুটলেই আবার পুরোদমে আক্রমণ চালাবে তারা। আমাদের চারপাশের যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে আছে বিগত দিনগুলোর যুদ্ধে মারা যাওয়া মানুষগুলোর লাশ। প্রত্যুষের হালকা বাতাসে অপেক্ষারত আমাদের কাছে বয়ে আনছে মৃত্যুর গন্ধ। প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে সেই গন্ধ। টেনে নিচ্ছি আমি, মনে হচ্ছে যেন তেলের মতো ঘন হয়ে সেই গন্ধ লেগে থাকছে আমার জিভ আর গলার ভেতরে। বারবার গলা পরিষ্কার করে থুতু ফেলছি রথের পাশে, তবু প্রতিবার নিঃশ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে মনে হচ্ছে যেন আরো বেশি শক্তিশালী আর বিশ্রী হয়ে উঠছে গন্ধটা।

ইতোমধ্যে আমাদের চারপাশে ছড়ানো লাশগুলোর ওপর জুটে বসে ভোজে মেতেছে শব-খেকো পাখির দল। শকুন আর কাকেরা ধীর গতিতে চক্কর দিচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে, তারপর মাটিতে এসে নামছে। শেয়াল আর হায়েনাদের হট্টগোল আর চেঁচামেচিতে যোগ দিচ্ছে তারা, পচতে শুরু করা মানুষের মাংস টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে আস্ত গিলে নিচ্ছে। হিকসস তলোয়ারের সামনে পরাজয়ের পর এই একই পরিণতি আমার জন্যও অপেক্ষা করছে কথাটা ভাবতেই অনুভব করলাম ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে শরীরে।

থরথর করে কেঁপে উঠে চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম, চিৎকার করে ক্যাপ্টেনদের নির্দেশ দিলাম তীরন্দাজদের সামনে পাঠাতে। লাশগুলো থেকে যতগুলো সম্ভব তীর সংগ্রহ করে আনতে হবে, যাতে সবার খালি হয়ে আসা তূণ আবার ভরে নেওয়া যায়।

তারপর পাখি আর পশুদের হইচইয়ের তীক্ষ্ণ শব্দ ছাপিয়ে ঢাকের শব্দ ভেসে এলো আমার কানে, সামনের পথটার মাঝে প্রতিধ্বনি তুলল। আমার লোকেরাও সবাই শুনতে পেল সেই শব্দ। গলা ফাটিয়ে নির্দেশ ছুড়ল সার্জেন্টরা। যে কটা তীর পাওয়া গেছে তাই নিয়েই যুদ্ধের মাঠ থেকে তড়িঘড়ি করে ফিরে এলো তীরন্দাজরা। পেছনে থাকা সৈন্যরা এবার সামনে চলে এলো, কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়াল তারা। প্রত্যেকের ঢাল ঠেকিয়ে রেখেছে পাশের জনের ঢালের সাথে। সবার তলোয়ারের ফলা আর বর্শার মাথা বহু। ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে গেছে ভেঙে গেছে জায়গায় জায়গায়। তবু সেগুলোই শত্রুর দিকে ফিরিয়ে রেখেছে তারা। তাদের ধনুকের যেখানে যেখানে ফেটে গেছে সেখানে সরু তার দিয়ে বাঁধা, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কুড়িয়ে আনা তীরগুলোর মাঝে অনেকগুলোতে অদৃশ্য হয়েছে পালক। তবে সন্দেহ নেই কাছাকাছি দূরত্বে এখনো ওগুলো সঠিকভাবেই কাজ করবে। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিক আমার লোকেরা, ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্র আর যন্ত্রপাতি দিয়েও কী করে সর্বোচ্চ ফলাফল বের করে আনতে হয় তা ভালো করেই জানে।

দূরে পথের অন্য পাশে ভোরের কুয়াশার মাঝে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করল শত্রু সৈন্যদের অগ্রযাত্রা। দূরত্ব আর স্বল্প আলোর কারণে প্রথমে তাদের দলটাকে ছোটখাটো দুর্বল বলে মনে হলো; কিন্তু আমাদের দিকে তারা এগিয়ে আসার সাথে সাথে দ্রুত বেড়ে উঠল আকারে। চিৎকার করে প্রতিবাদ জানিয়ে আকাশে উড়াল দিল শকুনরা, শেয়াল আর অন্যান্য শবভোজী প্রাণীর দল এদিক-ওদিক পালিয়ে গেল তাদের এগিয়ে আসার সাথে সাথে। পথের সম্পূর্ণ প্রস্থ পূর্ণ হয়ে গেছে হিকসস বাহিনীর কারণে, যা দেখে আরো একবার সাহস হারিয়ে ফেলতে শুরু করলাম আমি। মনে হচ্ছে যেন আমাদের চাইতে কমপক্ষে তিন বা চার গুণ হবে ওদের পরিমাণ।

তবে আরো কাছে এগিয়ে আসার পর আমি দেখলাম আমাদের ওপর ওরা যা অত্যাচার চালিয়েছে তার সাধ্যমতো জবাবও আমরা দিয়েছি। ওদের বেশির ভাগই আহত, আমাদের মতোই ক্ষতস্থান বেঁধে রেখেছে রক্তে ভেজা ঘেঁড়া কাপড় দিয়ে। কেউ কেউ ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনে এগোচ্ছে, বাকিদের অবস্থাও ভালো নয়। সেনাবাহিনীর সার্জেন্টদের অনেকের হাতেই রয়েছে পশুর চামড়ার তৈরি চাবুক, তাদের তাড়া খেয়ে হোঁচট খেতে খেতে আগে বাড়ছে তারা। নিজেদের সৈন্যদের সঠিক অবস্থানে ধরে রাখতে এমন কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে হিকসসরা, দেখে খুশি হয়ে উঠলাম আমি। রথ চালিয়ে আমাদের বাহিনীর সামনে চলে এলাম এবার। চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছি আমার লোকদের, সেইসাথে দেখাচ্ছি হিকসস ক্যাপ্টেনদের হাতে থাকা চাবুকের দিকে।

দায়িত্বের গুরুত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য কখনো চাবুকের ভয় দেখাতে হয়নি তোমাদের, হিকসস ঢাকের শব্দ আর তাদের বর্মপরা পায়ের ঝনঝনানি ছাপিয়ে পরিষ্কারভাবে সবার কানে পৌঁছে গেল আমার কণ্ঠস্বর। উল্লাসে চিৎকার করে উঠল আমার লোকেরা, অপমান আর ঠাট্টা-তামাশা জুড়ে দিল ক্রম অগ্রসরমাণ শত্রুকে লক্ষ্য করে। পুরো সময়টা জুড়ে দুই সেনাবাহিনীর মাঝে দ্রুত কমে আসতে থাকা দূরত্বটা মেপে নিচ্ছিলাম আমি। এই যুদ্ধ শুরুর সময়ে তিন শ বিশটা রথ ছিল আমার কাছে, এখন সেখানে আছে আর মাত্র বায়ান্নটা। ঘোড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় সত্যিই খুব অসুবিধা হয়ে গেছে। তবে আমাদের একমাত্র সুবিধা হচ্ছে এই খাড়া এবং বন্ধুর পথের মাথায়। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অবস্থানে আছি আমরা। নিজের দীর্ঘ জীবনে অসংখ্য যুদ্ধ থেকে পাওয়া সমস্ত বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই এই অবস্থানকে বেছে নিয়েছি আমি।

নিজেদের তীরন্দাজদের তীরের পাল্লার মাঝে আমাদের নিয়ে আসার জন্য রথের ওপর অনেক অংশে নির্ভর করে হিকসসরা। আমাদের দুই প্রান্ত বাঁকানো ধনুকের উদাহরণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও ওরা কখনো এমন কিছু বানানোর চেষ্টা করেনি, তার বদলে গোঁয়ারের মতো নিজেদের সোজা ধনুক আঁকড়ে ধরে থেকেছে। আমাদের অপেক্ষাকৃত উন্নত অস্ত্রগুলোর মতো এত বেশি দূরত্বে এবং দ্রুততার সাথে তীর ছুঁড়তে পারে না ওদের ধনুক। পাথুরে পথটার প্রবেশমুখেই রথ রেখে আসতে বাধ্য করেছি ওদের, ফলে এটাও নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ওদের তীরন্দাজরা এত তাড়াতাড়ি তীর ছোঁড়ার মতো কাছাকাছি দূরত্বে আসতে পারছে না।

এবার সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উপস্থিত, যে রথগুলো বাকি ছিল সেগুলো ব্যবহার করার সময় হয়েছে। নিজে রথ বাহিনীর নেতৃত্ব দিলাম আমি, রথগুলোকে সারিবদ্ধ অবস্থায় সাথে নিয়ে এগিয়ে গেলাম হিকসসদের দিকে। ষাট অথবা সত্তর কদম দূরে থাকতে তীর ছুড়ল আমাদের তীরন্দাজরা, লক্ষ্যবস্তু হলো সরু পথ ধরে দলবেঁধে এগিয়ে আসা শত্রুরা। ওরা আমাদের কাছাকাছি আসার আগেই প্রায় ত্রিশজনকে ঘায়েল করতে পারলাম আমরা।

এর পরেই নিজের রথ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম আমি। চালক এবার আমার রথটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল, আর আমি সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দুই সঙ্গীর মাঝে ঢালটা সোজা করে ধরে দাঁড়িয়ে গেলাম। শত্রুর দিকে মুখ করে রইল আমার ঢাল।

প্রায় সাথে সাথেই হাজির হলো সেই প্রলয়ংকর মুহূর্ত, দুই পক্ষ লিপ্ত হলো মরণপণ যুদ্ধে। শত্রুসৈন্যরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, ব্রোঞ্জের সাথে ব্রোঞ্জের সংঘর্ষে তীক্ষ্ণ শব্দে কেঁপে উঠল বাতাস। পরস্পরের সাথে নিজেদের ঢাল আটকে ধরেছে দুই দলের সৈন্যরা, সেই অবস্থায় একে অপরকে ঠেলে বা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রত্যেকেই চাইছে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ফাটল ধরাতে। এ যেন এমন এক লড়াই, যেখানে কোনো বিকৃত যৌন মিলনের আসনের চাইতেও শারীরিকভাবে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছি আমরা। পেটের সাথে পেট, মুখের সাথে মুখ ঠেকিয়ে ঠেলছি একে অপরকে। গলা দিয়ে যখন নানা রকম চিৎকার বা জান্তব আওয়াজ বেরিয়ে আসছে তখন, তার সাথে আমাদের বিকৃত মুখ থেকে ছিটকে আসছে থুতু, গিয়ে লাগছে আমাদের চাইতে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে থাকা শত্রুর মুখে। আমাদের দীর্ঘ অস্ত্রগুলো এই অবস্থায় ব্যবহার করার উপায় নেই, অনেক বেশি কাছাকাছি রয়েছে শত্রুরা। ব্রোঞ্জের ঢালগুলোর মাঝে আটকা পড়ে গেছি আমরা। এই অবস্থায় কেউ যদি পা ফসকে পড়ে যায় তাহলে তার অর্থ হবে দুই দলেরই সদস্যদের ব্রোঞ্জের স্যান্ডেলের নিচে ভয়ানকভাবে পিষ্ট হওয়া, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

এই ঢালের প্রাচীরের মাঝে আমাকে এতবার যুদ্ধ করতে হয়েছে যে, শুধু এই পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার জন্যই একটা বিশেষ অস্ত্রের নকশা করেছি আমি। এমন অবস্থায় পদাতিক সৈনিকের লম্বা তলোয়ার কোনো কাজে আসে না, সুতরাং সেটা খাপেই রেখে দিতে হয়। তার বদলে ব্যবহার করা হয় একটা সরু ছোরা, যার ফলার দৈর্ঘ্য হবে খুব বেশি হলে হাতের কবজি থেকে আঙুলের ডগার সমান। যখন বর্মপরা দেহের চাপে নিজের দুটো হাতই আটকা পড়ে যায়, শত্রুর মুখ থাকে নিজের মুখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে, তখনো এই ছোট্ট অস্ত্রটা ব্যবহার করতে অসুবিধা হয় না। শত্রুর বর্মের সামনের দিকে কোনো একটা ফুটোয় ঢুকিয়ে দিতে হয় ছুরির ফলা, তারপর চাপ দিয়ে পাঠিয়ে দিতে হয় জায়গামতো।

সেই দিন লুক্সরের প্রবেশপথের রাস্তায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্তত দশজন বিশালদেহী দাড়িওয়ালা হিকসস বর্বরকে খুন করলাম আমি, একবারও কয়েক ইঞ্চির বেশি নাড়ানো লাগল না আমার ডান হাত। আমার হাতে ধরা ছুরির ফলা শত্রুর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে বিদ্ধ করার সাথে সাথে ব্যথায় বিকৃত হয়ে উঠতে লাগল তাদের চেহারাগুলো। মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা শেষ নিঃশ্বাসটুকু গরম ভাপ ছড়িয়ে দিল আমার মুখের ওপর। পুরো ব্যাপারটা অদ্ভুত এক সন্তুষ্টির অনুভূতি জাগিয়ে তুলল আমার মনে। এমনিতে আমি নিষ্ঠুর বা অত্যাচারী প্রকৃতির মানুষ নই; কিন্তু দেবতা হোরাস সাক্ষী আছেন, আমি এবং আমার লোকেরা এই বর্বর জাতিগোষ্ঠীর হাতে যথেষ্ট অত্যাচার সয়েছি। এখন তাই যেকোনো উপায়ে প্রতিশোধ নিতে পারাই আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।

জানি না এভাবে কতক্ষণ ওই ঢালের প্রাচীরে বন্দি হয়ে ছিলাম আমরা। আমার কাছে মনে হলো যেন বহু ঘণ্টা ধরে এমন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু মাথার ওপর নিষ্করুণ সূর্যের অবস্থান পরিবর্তন দেখে বোঝা গেল যে এক ঘণ্টারও কম সময় পার হয়েছে। তার পরেই হঠাৎ হিকসসরা নিজেদের ঢাল ছাড়িয়ে নিল, একটু দূরে সরে গেল আমাদের কাছ থেকে। লড়াইয়ের তীব্রতায় দুই দলই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মাঝখানের সরু এক চিলতে মাটির ওপর দিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম, আমরা বুনো জন্তুর মতো হাঁপাচ্ছি। নিজেদের রক্ত আর ঘামে ভিজে আছে সবার শরীর, টলতে টলতে দাঁড়িয়ে আছি কোনোমতে। যদিও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমার জানা আছে এই বিশ্রামের দৈর্ঘ্য খুবই সামান্য, তার পরেই পাগলা কুকুরের মতো আবার একে-অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা। এটাও জানি যে, আজই আমাদের শেষ লড়াই। নিজের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকালাম আমি। দেখলাম ওরাও সবাই শেষ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। খুব বেশি হলে বারো শর মতো হবে ওদের সংখ্যা সব মিলিয়ে। ঢালের প্রাচীর তুলে ধরে হয়তো আরো ঘণ্টাখানেকের মতো টিকে থাকতে পারবে ওরা; কিন্তু তার বেশি নয়। তার পরেই সব শেষ হয়ে যাবে। তীব্র দুঃখবোধ আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাইল আমাকে।

তখনই হঠাৎ কে যেন আমার পেছনে এসে দাঁড়াল। আমার হাত ধরে টান দিল সে, চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। যদিও কথাগুলোর অর্থ প্রথমে আমার মাথায় ঢুকতে চাইল না। প্রভু টাইটা, আমাদের পেছনে আরো একটা বড় সেনাদল এসে হাজির হয়েছে। আমাদের সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলেছে ওরা। এখন আপনি যদি আমাদের বাঁচানোর মতো কোনো রাস্তা খুঁজে বের করতে না পারেন তাহলে আমরা শেষ!

কে এমন ভয়ানক খবর নিয়ে এলো দেখার জন্য চরকির মতো ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। এই কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। কিন্তু আমার সামনে যে মানুষটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম তার কথা অনায়াসে বিশ্বাস করা যায়। ফারাওয়ের সেনাবাহিনীর অন্যতম এক তরুণ সৈনিক, সে এক শ একতম ভারী রথ বাহিনীর দলনেতা। আমাকে নিয়ে চলো সেখানে মেরাব! তাকে নির্দেশ দিলাম আমি।

এইদিকে আসুন প্রভু! আপনার জন্য একটা তাজা ঘোড়া প্রস্তুত করে রেখেছি আমি। মেরাব নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল যে আমি কতটা ক্লান্ত, কারণ কথাটা বলেই আমার হাত চেপে ধরল সে, তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা মৃত এবং মৃতপ্রায় মানুষ আর নানা রকমের অস্ত্র এবং অন্যান্য জিনিসের স্তূপ ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করল। সেনাদলের পেছন দিকে থাকা নিজেদের অশ্বারোহী সৈনিকদের কাছে চলে এলাম আমরা। এখানে দুটো ঘোড়াকে আমাদের জন্যই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। ততক্ষণে অবশ্য কিছুটা শক্তি ফিরে পেয়েছি আমি, ফলে মেরাবের হাতটা সরিয়ে দিলাম। নিজের সৈন্যদের সামনে, এমনকি সামান্যতম দুর্বলতার চিহ্নটুকুও দেখাতে চাই না আমি।

একটা ঘোড়ায় উঠে বসলাম আমি, তারপর অশ্বারোহীদের ছোট্ট দলটা নিয়ে সেই উঁচু জায়গাটার ওপরে উঠে এলাম, যেটা আমাদের অবস্থান থেকে নীলনদের নিচু পাড়কে পৃথক করেছে। জায়গাটার ওপর উঠে আসার সাথে সাথে আমি এমন আচমকাভাবে আমার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম যে, আঁকি দিয়ে ঘাড় বাঁকা করে ফেলল প্রাণীটা, ছটফটে পায়ে চক্কর খেল একটা। চোখের সামনে যে দৃশ্যটা দেখলাম তাতে নিজের হতাশা কীভাবে প্রকাশ করব তার কোনো ভাষা খুঁজে পেলাম না আমি।

একটু আগে মেরাব আমাকে যা বলেছিল তাতে আমি আন্দাজ করেছিলাম যে, খুব বেশি হলে হয়তো আরো তিন থেকে চার শ হিকসস সৈন্য আমাদের পেছনে এসে হাজির হয়েছে, দুই দিক থেকে আমাদের আক্রমণ করার মতলব ওদের। ওই তিন-চার শ সৈন্যই অবশ্য আমাদের শবাধারে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো। কিন্তু এখন আমি দেখলাম আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার পদাতিক সৈন্যসহ বিশাল এক সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে, সাথে কমপক্ষে পাঁচ শ রথ আর একই পরিমাণ অশ্বারোহী। নীলনদের এই তীরেই অবস্থান নিয়েছে তারা। বিদেশি যুদ্ধজাহাজের একটা বাহিনী থেকে নেমে আসছে সবাই। সোনালি শহর লুক্সরের নিচে নদীর তীরে নোঙর ফেলেছে। জাহাজগুলো।

শত্রুদের অশ্বারোহী সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ নেমে পড়েছে তীরে। বারো কি তেরোজন অশ্বারোহী নিয়ে গঠিত আমাদের ছোট্ট দলটাকে দেখার সাথে সাথেই ঘোড়া ছুটিয়ে ঢাল বেয়ে উঠে এলো তারা, উদ্দেশ্য আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। বুঝতে পারলাম, ওদের সামনে একেবারেই অসহায় আমরা। ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে আমাদের বেশির ভাগ ঘোড়া। এখন যদি ঘুরে দাঁড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করি, সন্দেহ নেই যে শত্রুদের শক্তিশালী এবং তাজা ঘোড়াগুলো এক শ কদম যাওয়ার আগেই আমাদের ধরে ফেলবে। আবার যদি অবস্থান ধরে রেখে লড়াই করতে চাই তাহলে এক ফোঁটা ঘামও না ঝরিয়ে আমাদের টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারবে ওরা।

তবে তার পরেই হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারলাম আমি, নতুন দৃষ্টিতে তাকালাম এই আগন্তুকদের দিকে। খুব সামান্য একটু স্বস্তির ছোঁয়া লাগল আমার মনে, তবে আমার সাহসকে ফিরিয়ে আনার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট। ওদের কারো মাথায় হিকসস ধাচের শিরস্ত্রাণ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি যে জাহাজগুলো থেকে ওরা নেমে আসছে সেগুলোর সাথেও হিকসসদের যুদ্ধজাহাজের চেহারার কোনো মিল নেই।

দাঁড়াও ক্যাপ্টেন মেরাব! ধমকে উঠলাম আমি। এই আগন্তুকদের সাথে প্রথমে আমি কথা বলতে যাব। তারপর তরুণ ক্যাপ্টেনকে তর্ক করার কোনো সুযোগ না দিয়ে কোমর থেকে খুলে আনলাম খাপসহ তলোয়ার এবং খাপ থেকে বের না করে উল্টো করে ধরলাম, শান্তির সর্বজনীন চিহ্নের অনুকরণে। তারপর বিদেশি অশ্বারোহীদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ঘোড়া নিয়ে ধীরগতিতে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলাম।

সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমার মাঝে যে হতাশার অনুভূতি মাথাচাড়া দিয়েছিল, তার কথা এখনো মনে আছে আমার। বুঝতে পারছিলাম যে, এবার বোধ হয় ভাগ্যনিয়ন্তা দেবী টাইকির ওপরে একটু বেশিই ভরসা করা হয়ে গেছে। তার পরেই অবাক হয়ে দেখলাম অশ্বারোহী দলটির নেতা চড়া গলায় নির্দেশ দিল কিছু একটা, সাথে সাথে তার দলের সবাই নিজেদের তলোয়ার খাপবদ্ধ করে ফেলল আবার। তারপর নেতার পেছনে ঘোড়া নিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল তারা।

তাদের উদাহরণ অনুসরণ করে আমিও আমার ঘোড়াটাকে দাঁড় করালাম, ফলে দলের নেতা এবং আমার মাঝে দূরত্ব থাকল স্রেফ বিশ কি ত্রিশ কদম। এই অবস্থায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে যতটা সময় লাগে ঠিক ততক্ষণই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা। তারপর নিজের চেহারা দেখানোর জন্য আমার দোমড়ানো শিরস্ত্রাণের ভাইজর বা সামনের মুখাবরণ ওপরে তুলে দিলাম আমি।

.

হেসে উঠল বিদেশি অশ্বারোহী দলের নেতা। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে শব্দটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত লাগল; কিন্তু একই সাথে অত্যন্ত পরিচিতও মনে হলো আমার কাছে। এই হাসির শব্দ আমি চিনি। তার পরেও প্রায় আধা মিনিট ধরে তাকিয়ে রইলাম মানুষটার দিকে, এবং শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় উদ্ধার কতে পারলাম। এখন অনেক বয়স হয়েছে তার; কিন্তু একই সাথে বিশাল পেশিবহুল এবং আত্মবিশ্বাসী চেহারা। তারুণ্যে ভরপুর সদা ব্যগ্র চেহারার সেই ছেলেটার আর কোনো চিহ্ন নেই, যে কিনা এই কঠিন আর রুক্ষ পৃথিবীতে নিজের একটা জায়গা খুঁজে বেড়াত সব সময়। নিশ্চয়ই সেই জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে সে। এখন তার ব্যক্তিত্বে পূর্ণ কর্তৃত্বের ছাপ স্পষ্ট, পেছনে রয়েছে এক বিশাল শক্তিশালী সেনাবাহিনী।

জারাস? সন্দিহান গলায় নামটা উচ্চারণ করলাম আমি। আমি যাকে দেখছি সে নিশ্চয়ই তুমি নও, তাই না?

নামটা একটু বদলে গেছে; কিন্তু আমার আর সব কিছুই সেই আগের মতোই আছে, টাইটা। তবে এটা বলতে পারো যে আগের চাইতে বয়স একটু বেড়েছে, সাথে বোধ হয় একটু জ্ঞানীও হয়েছি।

এতগুলো বছর পরেও আমাকে মনে রেখেছ তুমি। কত দিন হলো? তাকে প্রশ্ন করলাম আমি।

বেশি না, মাত্র ত্রিশ বছরের মতো। আর হ্যাঁ, এখনো তোমাকে মনে রেখেছি আমি। আর কোনো দিন ভুলব বলেও মনে হয় না, এমনকি বর্তমান বয়সের চাইতে আরো দশ গুণ বেশি বাঁচার সুযোগ পেলেও তোমাকে মনে থাকবে আমার।

এবার আমার হেসে ওঠার পালা। নামটা বদলে গেছে তোমার, তাই তো বললে? এখন তাহলে কী নামে পরিচিত তুমি জারাস?

এখন আমার নাম হুরোতাস। আমার আগের নামটা নিয়ে কিছু দুর্ভাগ্যজনক ঝামেলা তৈরি হয়েছিল, জবাব দিল সে। ব্যাপারটাকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চাইছে না দেখে মুচকি হাসলাম আমি।

তার মানে ল্যাসিডিমনের রাজা আর তোমার নাম এখন একই? প্রশ্ন করলাম আমি। নামটা আগেই শুনেছি আমি, এবং প্রত্যেকবারই গভীর সম্মান আর বিস্ময়ের সাথে উচ্চারিত হয়েছে সেটা।

ঠিক তাই, মাথা ঝাঁকাল সে। তোমার পরিচিত সেই ছোট্ট জারাসই এখন ল্যাসিডিমনের রাজা।

নিশ্চয়ই ঠাট্টা করছ আমার সাথে? অবাক হয়ে বলে উঠলাম আমি। দেখা যাচ্ছে আমার প্রাক্তন অধঃস্তন এখন পৃথিবীর বুকে বেশ ভালোভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে নিজেকে। কিন্তু তোমার কথা যদি আসলেই সত্যি হয় তাহলে আমাকে এটা বলো যে ফারাও টামোসের বোন এবং রাজকুমারী তেহুতির কী খবর, যাকে তুমি আমার অভিভাবকত্ব থেকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলে?

তুমি আসলে বলতে চাইছ ভালোবেসে নিয়ে গিয়েছিলাম, অপহরণ শব্দটা ভুল হচ্ছে। আর তা ছাড়া এখন সে আর রাজকুমারী নয়, জোরে জোরে মাথা নাড়ল হুরোতাস। এখন সে একজন রানি, কারণ আমাকে বিয়ে করার মতো সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে দেরি করেনি সে।

এখনো কি আগের মতোই সুন্দরী আছে সে? কিছুটা উদাস গলায় প্রশ্ন করলাম আমি।

আমার রাজ্যের ভাষায় স্পার্টা শব্দের অর্থ হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দরী। এবং আমার স্ত্রীর সম্মানেই ওই শহরের নামকরণ করেছি আমি। আর তাই এখন রাজকুমারী তেহুতি হচ্ছে ল্যাসিডিমনের রানি স্পার্টা।

আর বাকিদের কী খবর, যারা আমার একই রকম প্রিয় ছিল? যাদের তুমি বহু বছর আগে তোমার সাথে উত্তরে নিয়ে গিয়েছিলে–

নিশ্চয়ই রাজকুমারী বেকাথা এবং হুইয়ের কথা বলছ তুমি, আমার কথা শেষ na হতেই বলে উঠল রাজা হুরোতাস। এখন ওরাও আমাদের মতোই স্বামী স্ত্রী। তবে হুই এখন আর সামান্য কোনো ক্যাপ্টেন নয়। এখন সে ল্যাসিডিমন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এবং নৌ-সেনাপতি। নদীতে যে জাহাজের বহর দেখছ সেগুলো সবই ওর অধীনে, বলে নীলনদের তীরে নোঙর করে থাকা জাহাজগুলোর বিশাল দলের প্রতি ইঙ্গিত করল সে। এই মুহূর্তে ও আমার বাকি সৈন্যদের তীরে নামানোর তদারকি করছে।

তাহলে এবার বলো রাজা হুরোতাস, এত বছর পর কেন মিশরে ফিরে এলে তুমি? জানতে চাইলাম আমি।

আমার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় উত্তেজিত হয়ে উঠল তার চেহারা। আমি এসেছি কারণ অন্তরের গভীরে আমি এখনো একজন মিশরীয়। আমার গুপ্তচরদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম যে মিশর এখন চরম বিপদের মুখে, হিকসস বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণের দ্বারপ্রান্তে এসে পড়েছ তোমরা। আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে অপবিত্র করেছে ওই পশুগুলো। আমাদের নারীদের ধর্ষণ করেছে, খুন করেছে শিশুদের। ওদের শিকারের মাঝে আমার নিজের মা এবং দুই ছোট বোনও ছিল। তাদের ওপর নির্যাতন চালানোর পর জীবন্ত অবস্থাতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল আমাদের বাড়ির জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের মাঝে পুড়ে মরতে দেখে অট্টহাসি হেসেছিল ওই হিকসসগুলো। আমি মিশরে ফিরে এসেছি আমার মা আর বোনদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, সেইসাথে মিশরের আর কারো কপালে যেন এমন দুর্ভাগ্য নেমে না আসে তা নিশ্চিত করতে। যদি আমি সফল হই তাহলে আমার আশা এই যে, আমাদের দুই দেশ মিশর এবং ল্যাসিডিমনের মাঝে এক দীর্ঘস্থায়ী মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হবে।

ফিরে আসার আগে কেন তেইশ বছর অপেক্ষা করলে তুমি?

তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে টাইটা, শেষবার যখন আমাদের দেখা হয়েছিল তখন আমরা ছিলাম স্রেফ কিছু পালিয়ে যাওয়া মানুষ তিনটে ছোট নৌকা ছিল আমাদের সম্বল। এমন এক ফারাওয়ের কাছ থেকে আমরা পালাচ্ছিলাম, যিনি আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন ভালোবাসার নারীদের কাছ থেকে।

মাথা ঝাঁকিয়ে কথাটার সত্যতা মেনে নিলাম আমি। এখন আর এটা করতে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই, কারণ যে ফারাওয়ের কথা হুরোতাস বলছে তিনি হলেন টামোস। এবং গতকালই তার মৃত্যু হয়েছে।

রাজা হুরোতাস, একসময় যে পরিচিত ছিল জারাস নামের এক তরুণ হিসেবে, আবার বলে চলল। নিজেদের জন্য নতুন কোনো দেশ কোনো আশ্রয় খুঁজছিলাম আমরা। সেই দেশ খুঁজে পেতে এবং তাকে শক্তিশালী এবং সমীহের যোগ্য করে তোলার জন্য পাঁচ হাজারেরও বেশি দক্ষ যোদ্ধার সমন্বয়ে এক সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে এই সময়ের দরকার ছিল আমাদের।

এবং সেটা কীভাবে সম্ভব করলেন, হে মহান রাজা? ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

একটু কূটনীতি খাঁটিয়ে, আর কিছু নয়, নিষ্পাপ গলায় জবাব দিল হুরোতাস। তবে আমার চেহারায় সন্দেহের ভাব ফুটে উঠতে দেখে হেসে ফেলল সে, তারপর স্বীকার করল আসল কথা। কূটনীতির সাথে অবশ্য কিছুটা অস্ত্রবাজির মহড়া আর দখলও চালাতে হয়েছে। হাতের ইশারায় নীলনদের পুব তীরে জড়ো হতে শুরু করা শক্তিশালী সেনাবাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করল সে। এখন যে বাহিনী তুমি দেখতে পাচ্ছ তেমন শক্তিশালী কিছু যখন তোমার সাথে থাকবে তখন খুব কম মানুষই তোমার সাথে তর্কে জড়াতে চাইবে।

এটাই বরং তোমার স্বভাবের সাথে বেশি মেলে, একটু খোঁচা মেরে বললাম আমি। মাথা ঝাঁকিয়ে এবং একটু হেসে আমার ঠাট্টা গ্রহণ করল হুরোতাস, তারপর আবার নিজের কথায় ফিরে গেল।

আমি জানতাম এই মুহূর্তে তোমাকে সাধ্যমতো সাহায্য করাটা একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে আমার দায়িত্ব। আরো এক বছর আগেই আসতাম আমি; কিন্তু তখনো আমার নৌবাহিনী এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি যে আমার পুরো সেনাবাহিনীকে বহন করতে পারবে। আরো জাহাজ তৈরি করতে হয়েছে আমাকে।

তাহলে তোমাকে উষ্ণ স্বাগতম জানাচ্ছি আমি। একেবারে সঠিক মুহূর্তে এসে উপস্থিত হয়েছ তুমি। আর এক ঘণ্টা পরে এলেই দেখতে অনেক দেরি করে ফেলেছ। এক লাফে ঘোড়া থেকে নামলাম আমি; কিন্তু আমার আগেই নিজের ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছে হুরোতাস। নিজের অর্ধেক বয়সী কোনো মানুষের মতো ক্ষীপ্র ওর চালচলন, দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো আমার দিকে। আপন ভাইয়ের মতো পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম আমরা। অন্তরের গভীরে তো আমরা তাই। যদিও হুরোতাসের জন্য কেবল ভ্রাতৃসুলভ ভালোবাসা নয়, বরং আরো বেশি কিছু অনুভব করছি আমি। সে শুধু আমার প্রিয় মিশরকে নিষ্ঠুর ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় বয়ে আনেনি, তার সাথে এটাও বোঝা যাচ্ছে যে, আমার প্রিয় তেহুতিরও খবর নিয়ে এসেছে, যে কিনা রানি লসট্রিসের মেয়ে। আমার দীর্ঘ জীবনে এই দুই নারীকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসে এসেছি আমি।

আমাদের আলিঙ্গনটা হলো উষ্ণ, তবে ক্ষণস্থায়ী। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হুরোতাসের কাঁধে হালকা একটা ঘুষি মারলাম। সামনে এসবের জন্য অনেক সময় পাওয়া যাবে। এই মুহূর্তে পথের ও প্রান্তে কয়েক হাজার হিকসস আমার এবং তোমার মনোযোগ আকর্ষণের অপেক্ষায় আছে, পেছন দিকে ইঙ্গিত করে বললাম আমি। একটু যেন চমকে গেল হুরোতাস। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই সামলে নিল নিজেকে, খাঁটি আনন্দের হাসি ফুটেছে মুখে।

ক্ষমা চাইছি পুরনো বন্ধু আমার। বোঝা উচিত ছিল যে আমি পৌঁছানোর সাথে সাথেই আমার জন্য যথেষ্ট বিনোদনের ব্যবস্থা করবে তুমি। তাহলে চলো হতচ্ছাড়া হিকসসগুলোর একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলি এখনই। কী বলো?

মাথা নাড়লাম আমি, যেন রাজি নই। তোমার সব সময়ই অনেক বেশি তাড়াহুড়ো। জোয়ান ষাঁড় যখন গাভীর পালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাড়াহুড়ো করে কয়েকটা গাভির দখল নিতে চেয়েছিল তখন বুড়ো ষাঁড় কী বলেছিল জানো তো?

বলো, কী বলেছিল বুড়ো ষাঁড়, আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল হুরোতাস। আমার ছোট ছোট কৌতুকগুলোতে দারুণ মজা পায় সে। এবারও সেই মজা থেকে তাকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছে করল না।

বুড়ো ষাঁড় বলেছিল, তার চাইতে বরং আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যাই, গিয়ে সবকটাকে ধরি।

অট্টহাসি বেরিয়ে এলো হুরোতাসের মুখ দিয়ে। তোমার পরিকল্পনা কী বলো টাইটা। আমি জানি ইতোমধ্যে কিছু একটা বুদ্ধি করে ফেলেছ তুমি। সব সময়ই তাই করো।

পরিকল্পনাটা খুব সাধারণ, ফলে কয়েক কথায় তাকে বুঝিয়ে দিলাম আমি। তারপর লাফ দিয়ে উঠে বসলাম আমার ঘোড়ার পিঠে। একবারও পেছনে না। তাকিয়ে মেরাব এবং অন্যান্য অশ্বারোহীসহ আমার ছোট্ট দলটাকে নিয়ে টিলার ওপর উঠে এলাম। জানি যে হুরোতাস, একসময় যার পরিচয় ছিল জারাস নামে; আমার পরামর্শ সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। যদিও এখন সে একজন রাজা; কিন্তু এটা ভুলে যাওয়ার মতো বোকা নয় যে আমার উপদেশ কখনো খারাপ হয় না।

.

টিলার ওপর উঠে আসতেই দেখলাম একেবারে ক্রান্তিলগ্নে এসে উপস্থিত হয়েছি আমরা। আহত মুষ্টিমেয় কিছু মিশরীয় যোদ্ধাকে লক্ষ্য করে আবারও সামনে এগোতে শুরু করেছে। হিকসসদের দল। ঘোড়ার গতি বাড়ালাম আমি। ঢাল দিয়ে তৈরি করা দেয়ালের কাছে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে শত্রুরা। ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে পেছনে পাঠিয়ে দিলাম আমি। কেউ একজন একটা ব্রোঞ্জের ঢাল ধরিয়ে দিল আমার হাতে। সামনের সারির মাঝখানে নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালাম আমি। তার পরই মরুঝড়ের মতো তীব্র শব্দ উঠল, ব্রোঞ্জের সাথে বাড়ি লাগল ব্রোঞ্জের। হিকসসদের সামনের সারির সৈন্যরা আক্রমণ করল আমাদের দুর্বল ব্যুহের ওপর। প্রায় সাথে সাথেই যুদ্ধক্ষেত্রের দুঃস্বপ্নের মতো ভয়াবহতা যেন গিলে নিল আমাকে, সময় তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলল। প্রতিটি মুহূর্ত পরিণত হলো অনন্ত কালে। আতঙ্কের কালো পর্দার মতো আমাদের চারপাশে বিস্তার লাভ করতে লাগল মৃত্যু। কতক্ষণ পরে ঠিক বলতে পারব না, এক ঘণ্টা হতে পারে বা এক শ বছর- অবশেষে অনুভব করলাম আমাদের ভঙ্গুর ব্যুহের ওপর হিকসসদের অসহ্য চাপ ধীরে ধীরে কমে আসছে। তার পরেই দেখলাম হোঁচট খেতে খেতে পিছিয়ে যাওয়ার বদলে দ্রুত গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।

শত্রুদের হেঁড়ে গলায় যুদ্ধ বিজয়ের উন্মত্ত গর্জনের বদলে এখন শোনা যাচ্ছে হিকসসদের বর্বর ভাষায় নানা রকম আর্তনাদ আর আর্তচিৎকার। তার পরেই মনে হলো যেন শত্রুদের দলটা হঠাৎ ছোট হয়ে এসেছে, কমে আসছে তাদের সংখ্যা। ফলে এখন আর সামনে কী হচ্ছে তা দেখতে অসুবিধা হলো না আমার। দেখলাম হুরোতাস আমার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে, ঠিক যেমনটা আমি আশা করেছিলাম। নিজের লোকদের দুই ভাগে ভাগ করে আমাদের দুই পক্ষের পেছন দিক দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে সে। ফলে বৃত্তের মতো একটা সীমানার মাঝে বন্দি হয়ে পড়েছে হিকসসরা, ঠিক যেন কোনো জেলের জালে আটকা পড়েছে এক ঝাঁক সার্ডিন মাছ।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরে যে বেপরোয়া মনোভাব তৈরি হয় তাই নিয়ে লড়ল হিকসসরা। কিন্তু আমাদের তৈরি করা ঢালের দেয়াল তাদের সামনে এগোতে দিচ্ছে না, অন্যদিকে ল্যাসিডিমন থেকে আসা হুরোতাসের সৈন্যরাও যুদ্ধের জন্য পূর্ণ উদ্যমে তৈরি। ঘৃণিত শত্রুদের আমাদের তৈরি করা ব্যুহের দিকে ঠেলে দিতে লাগল তারা, যেভাবে কাঁচা মাংস টুকরো টুকরো করে কাটার জন্য কাঠের গুঁড়ির ওপর আছড়ে ফেলে কসাই। যুদ্ধের গতিপথ বদলে গেল খুব দ্রুত, স্বাভাবিক সংঘর্ষের বদলে শুরু হলো স্রেফ ঠাণ্ডা মাথায় খুন। অবশিষ্ট কয়েকজন হিকসস শেষ পর্যন্ত অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রক্তেভেজা পিচ্ছিল মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। প্রাণভিক্ষা চাইছে সবাই; কিন্তু তাদের আবেদন শুনে হেসে উঠল রাজা হুরোতাস।

চিৎকার করে বলে উঠল সে, আমার মা আর ছোট ছোট দুই বোনও তোদের কাছে একইভাবে ক্ষমাভিক্ষা চেয়েছিল। তোদের পাষাণ বাপ-দাদারা আমার প্রিয় মানুষগুলোকে যে জবাব দিয়েছিল আমিও তোদের সেই একই জবাব দিচ্ছি। মর হারামজাদার দল, মর!

শেষ পর্যন্ত যখন সর্বশেষ হিকসসের অন্তিম চিৎকারের প্রতিধ্বনিও বাতাসে মিলিয়ে গেল, রক্তে মাখামাখি যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝ দিয়ে নিজের লোকদের নিয়ে এগিয়ে গেল রাজা হুরোতাস। শত্রুদের কারো মাঝে জীবনের সামান্য চিহ্ন দেখা গেলেও তাকে জবাই করা হলো। আমিও স্বীকার করছি, যুদ্ধের উন্মাদনায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজের মহৎ এবং দয়ালু সত্তাটাকে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম। বেশ কিছু আহত হিকসসকে তাদের কুৎসিত দেবতা সেথের অপেক্ষমাণ বাহুবন্ধনে পাঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমি নিজেও বিজয় উদযাপনে যোগ দিলাম। যাদের জবাই করলাম তাদের প্রত্যেককে আমার পক্ষের একজন করে সাহসী ব্যক্তির স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করলাম মনে মনে, যারা এই একই দিনে একই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছে।

.

রাজা হুরোতাস এবং আমি যখন যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করলাম তখন রাত নেমে এসেছে, আকাশে উঠেছে বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ। আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব বহু পুরনো, ফলে এটা হুরোতাস অনেক আগে থেকেই জানে যে সকল আহত সৈনিককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে হবে, তাদের যত্ন নিতে হবে। তারপর নির্ধারণ করতে হবে শিবিরের সীমানা এবং সেই অনুযায়ী পাহারা বসাতে হবে। কেবল তার পরেই সেনাপতিরা নিজেদের কাজে মনোযোগ দিতে পারবে। ফলে এই সব দায়িত্ব পালন করতে করতে মাঝরাত পেরিয়ে গেল। তারপর আমরা দুজন ঘোড়া নিয়ে নীলনদের ঢালু পাড় বেয়ে নিচে নেমে এলাম, যেখানে নোঙর করা রয়েছে হুরোতাসের বহরের প্রধান জাহাজটি।

জাহাজে উঠতেই অ্যাডমিরাল হুই এগিয়ে এলো আমাদের স্বাগত জানাতে। হুরোতাসের পরেই হুই আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিদের একজন, এবং পুরনো ও প্রিয় বন্ধুর মতোই একে অপরকে স্বাগত জানালাম আমরা। তার মাথায় সেই ঘন ঝোঁপের মতো চুল এখন আর নেই, ধূসর এবং পাতলা হয়ে আসা চুলের গোছার মাঝ দিয়ে উঁকি দিচ্ছে চকচকে চামড়া। কিন্তু চোখগুলো এখনো আগের মতোই উজ্জ্বল, সতর্ক। তার প্রখর রসবোধের কারণে কিছুক্ষণের মাঝেই সজীব হয়ে উঠল আমার মন। আমাদের নিয়ে ক্যাপ্টেনের কামরায় প্রবেশ করল সে, এবং নিজের হাতে হুরোতাস ও আমাকে বড় বড় দুই পেয়ালা মধু মেশানো লাল মদ ঢেলে দিল। মনে হলো এর মতো সুস্বাদু পানীয় খুব কমই খেয়েছি আমি। বেশ কয়েকবার আমার পেয়ালা ভরে দিল হুই, যতক্ষণ না ক্লান্তি এসে বাধা দিল আমাদের উচ্ছ্বসিত পুনর্মিলনীতে।

পরদিন সকালে সূর্য পরিষ্কারভাবে দিগন্তের ওপর উঠে আসা পর্যন্ত ঘুমোলাম আমরা। তারপর নদীতে গোসল করে সব ময়লা আর গতকাল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শরীরে লাগা রক্তের দাগ ধুয়ে ফেললাম। তারপর যখন মিশর এবং ল্যাসিডিমনের যৌথ সেনাবাহিনী নদীর পাড়ে একত্র হলো, তাজা ঘোড়ায় উঠে বসলাম আমরা। আমাদের সামনে গর্বিত পদক্ষেপে কুচকাওয়াজ করে চলতে শুরু করল হুরোতাসের বাহিনী, সেইসাথে আমার দলের যারা বেঁচে ছিল। বিজয় নিশান ওড়ানো হলো, ঢাক আর বাঁশির শব্দে মুখরিত হলো বাতাস। নদীর পাড় থেকে লুক্সর শহরের বিজয়দ্বারের দিকে এগোতে শুরু করলাম আমরা, উদ্দেশ্য মিশরের নতুন ফারাও টামোসের জ্যেষ্ঠ পুত্র উটেরিক টুরোকে আমাদের বিশাল বিজয়ের সংবাদ জানানো।

তবে সোনালি শহরের দরজায় পৌঁছে দেখলাম বন্ধ করা রয়েছে দরজার পাল্লা। ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দ্বাররক্ষকদের উদ্দেশ্যে ডাক দিলাম আমি। ভেতরে ঢুকতে চাওয়ার কথা জানিয়ে বেশ কয়েকবার চিৎকার করতে হলো আমাকে। তার পরেই প্রাচীরের ওপর প্রহরীদের চেহারা উদয় হতে দেখা গেল। ফারাও জানতে চাইছেন তোমরা কারা, কেন এসেছ, প্রহরীদের প্রধান জানতে চাইল আমার কাছে। তাকে ভালো করেই চিনি আমি। তার নাম ওয়েনেগ, সুদর্শন এক তরুণ ক্যাপ্টেন। ইতোমধ্যে মিশরের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরত্বের স্বর্ণ পরার সুযোগ পেয়েছে সে। আমাকে চিনতে পারেনি দেখে বেশ অবাক হলাম আমি।

তোমার স্মৃতিশক্তি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ, নিচ থেকে জবাব দিলাম আমি। আমি লর্ড টাইটা, রাজপরিষদের সভাপতি এবং ফারাওয়ের সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাধ্যক্ষ। হিকসসদের সাথে যুদ্ধে আমাদের বিশাল বিজয়ের খবর জানাতে এসেছি ফারাওকে।

এখানেই দাঁড়ান! এই কথা বলে সরে গেল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ, মাথাটা অদৃশ্য হয়ে গেল প্রাচীরের কিনারের ওপাশে। এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। তারপর আরো এক ঘণ্টা।

মনে হচ্ছে নতুন ফারাও কোনো কারণে খেপে আছেন তোমার ওপর, তিক্ত হাসি হেসে আমাকে বলল রাজা হুরোতাস। কে এই নতুন ফারাও? আমি কি তাকে চিনি?

কাঁধ ঝাঁকালাম আমি। তার নাম উটেরিক টুরো। আর তোমার তাকে চেনার কথা নয়।

গত কয়েক দিনে নিজের রাজকীয় দায়িত্ব অনুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে আসেননি কেন তিনি? কেন যুদ্ধ করেননি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে?

কারণ তিনি সবে পঁয়ত্রিশ বছরের এক শিশু, এসব নীচু স্তরের লোকজনের সঙ্গ এবং তাদের রুক্ষ আচার-ব্যবহার একেবারেই সহ্য করতে পারেন না, বুঝিয়ে বললাম আমি। হাসি চাপতে গিয়ে বিদঘুঁটে শব্দ বেরিয়ে এলো হুরোতাসের নাক থেকে।

তোমার কথাবার্তায় সেই আগের মতোই ধার আছে টাইটা, একটুও কমেনি! শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ওয়েনেগকে শহর-প্রাচীরের ওপর দেখা গেল আবার। মহান ফারাও উটেরিক টুরো দয়াপরবশ হয়ে আপনাকে শহরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন। তবে তার নির্দেশ এই যে, আপনাদের ঘোড়াগুলো বাইরে রেখে আসতে হবে। আপনার সাথে যে অপরিচিত মানুষটি আছেন তিনিও ভেতরে আসতে পারবেন, তবে আর কেউ নয়।

কথাগুলোর মাঝে লুকিয়ে থাকা উদ্ধত ভাব ধরতে পেরে সশব্দে চমকে উঠলাম আমি। উপযুক্ত একটা জবাব উঠে এসেছিল ঠোঁটের ডগায়; কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিতে বাধ্য হলাম। ল্যাসিডিমন এবং সমস্ত মিশরের সেনাবাহিনী এখন আমার কথা শুনছে অখণ্ড মনোযোগের সাথে। প্রায় তিন হাজার মানুষ। এই অবস্থায় এমন কিছু বলা আমার একেবারেই উচিত হবে না।

ফারাওয়ের দয়ার সীমা নেই, জবাব দিলাম আমি। ধীরে ধীরে খুলে গেল বিশাল দরজাটা।

এই যে আমার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মানুষ, চলুন ভেতরে যাই, হুরোতাসকে উদ্দেশ্য করে তিক্ত গলায় বললাম আমি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনে এগোতে শুরু করলাম আমরা। শিরস্ত্রাণের মুখাবরণ ওপরে ওঠানো, হাত রাখা যার যার তলোয়ারের বাঁটে; এই অবস্থায় আমরা লুক্সর শহরে প্রবেশ করলাম। কেন জানি না; কিন্তু কিছুতেই নিজের মাঝে বিজয়ী সেনাপতির অনুভূতিটা আসছিল না আমার।

আমাদের সামনে সামনে এগিয়ে চলল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ এবং তার কিছু সৈন্য। শহরের রাস্তাগুলো ভৌতিক রকমের নির্জন নিস্তব্ধ। নিশ্চয়ই যে দুই ঘণ্টা আমাদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল সেই সময়টা ফারাও জনতার উৎসুক ভিড়কে সরিয়ে রাখার কাজে ব্যয় করেছেন। প্রাসাদের সামনে পৌঁছানোর পর যেন নিজেই ধীরে ধীরে খুলে গেল প্রধান ফটক। কোথাও কোনো বাজনার আওয়াজ নেই আমাদের স্বাগত জানাতে, এগিয়ে আসতে দেখা গেল না কোনো উল্লসিত জনতার ভিড়কে।

চওড়া সিঁড়ি বেয়ে রাজদরবারের প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম বিশাল ভবনটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা, নিস্তব্ধ। কেবল আমাদের ব্রোঞ্জে বাঁধানো জুতা ছাড়া আর কোনো কিছুর শব্দ নেই। পাথরের তৈরি সারি সারি শূন্য আসনের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম আমরা, কক্ষের একেবারে শেষ মাথায় উঁচু মঞ্চের ওপর রাখা সিংহাসনের দিকে এগোচ্ছি।

শূন্য সিংহাসনটার সামনে থমকে দাঁড়ালাম আমরা। আমার দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। কর্কশ গলায় কোনো ভদ্রতার ধার না ধরে বলল, এখানেই দাঁড়ান! প্রায় ধমকের সুরে কথাটা বলল সে, তারপর চেহারায় কোনো পরিবর্তন না এনেই নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়তে শুরু করল। ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই কী বলা হচ্ছে বুঝে নিতে পারি আমি, তাই তার কথাগুলো বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। সে বলছে, ক্ষমা করবেন প্রভু টাইটা। আপনাদের সাথে এমন আচরণ করার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে আমি আপনাকে অত্যন্ত সম্মান করি।

ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন, বললাম আমি। নিজের দায়িত্ব তুমি খুব ভালোভাবেই পালন করেছ। আমার কথার জবাবে মুঠিবদ্ধ হাত বুকে ঠেকাল ওয়েনেগ। তারপর নিজের লোকদের নিয়ে চলে গেল সে। শূন্য সিংহাসনের সামনে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের দেয়ালগুলোর ফুটো দিয়ে যে অনেকগুলো অনুসন্ধিৎসু চোখ আমাদের দিকে চেয়ে আছে সেটা হুরোতাসকে মুখে বলে দেওয়ার দরকার হলো না আমার। তার পরেও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, এই নতুন ফারাওয়ের অদ্ভুত রীতিনীতি দেখে আমার নিজের ধৈর্যও ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করেছে।

অবশেষে দূর থেকে হাসিঠাট্টা আর মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসতে লাগল তা, আরো জোরালো হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত ঝটকা দিয়ে সরে গেল সিংহাসনের পেছনে দরবার কক্ষের দরজায় ঝুলে থাকা বিশাল পর্দা। ভেতরে প্রবেশ করল ফারাও উটেরিক টুরো, নিজেকে যে মহান উটেরিক টুরো হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করে। চুলগুলোকে কোঁকড়া করা হয়েছে তার, এখন সেগুলো ঝুলে আছে দুই কাঁধের ওপর দিয়ে। গলায় ফুলের মালা। হাতে একটা ডালিম, সেখান থেকে দানা তুলে নিয়ে খাচ্ছে সে, আর বিচিগুলো থু থু করে ফেলে দিচ্ছে মেঝেতে। আমার এবং হুরোতাসের দিকে একবারও না তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সিংহাসনের কাছে এগিয়ে গেল সে, গদি সাজিয়ে তৈরি করা আসনে বসল আরাম করে।

উটেরিক টুরোর পেছন পেছন দরবারে প্রবেশ করেছে ছয়জন অল্পবয়স্ক কিশোর, সবার পোশাক কমবেশি এলোমেলো। তাদেরকেও ফুলের সাজে সাজানো হয়েছে। ঠোঁটে লাগানো হয়েছে রক্তের মতো লাল রং, চোখের চারপাশে নীল অথবা সবুজ আভা। কেউ কেউ ফারাওয়ের মতোই কোনো ফল বা মিষ্টান্ন খাচ্ছে, তবে দু-তিনজনের হাতে মদের পেয়ালাও দেখা গেল। নিজেদের মাঝে হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত তারা, মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছে পেয়ালায়।

সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে একটা গদি ছুঁড়ে মারল ফারাও। মদের পেয়ালা পড়ে গেল তার হাত থেকে, ভেতরের মদটুকু ছিটকে গিয়ে লাগল গায়ের পোশাকে। হাসির ফোয়ারা বয়ে গেল দরবারে।

ওহ, দুষ্টু ফারাও! ধমকে উঠল ছেলেটা। দেখো দেখি, আমার এত সুন্দর পোশাকটা একেবারে নষ্ট করে দিলে!

মাফ করে দাও প্রিয় আনেন্ত, ঢং করে চোখ ঘুরিয়ে বলল উটেরিক। এসো, বসো আমার পাশে। খুব বেশি সময় নেব না এখানে, কথা দিচ্ছি। এই দুই ভদ্রলোকের সাথে দুদণ্ড কথা বলব শুধু। দরবারে ঢোকার পরে প্রথমবারের মতো আমার এবং হুরোতাসের দিকে সরাসরি তাকাল সে। শুভেচ্ছা নাও প্রিয় টাইটা। আশা করি বরাবরের মতোই সম্পূর্ণ সুস্থ আছ তুমি? তার পরেই আমার সঙ্গীর দিকে তাকাল। বলল, আর তোমার সাথে এই লোকটা কে? আমার সাথে বোধ হয় তার পরিচয় নেই, কি বলো?

মহামান্য ফারাও, ইনি হচ্ছেন ল্যাসিডিমন রাজ্যের সর্বাধিকারী রাজা হুরোতাস। তার সাহায্য ছাড়া আপনার সোনালি শহর লুক্সরের দরজায় এসে হাজির হওয়া হিকসসদের কিছুতেই পরাজিত করতে পারতাম না আমরা। হাতটা লম্বা করে দিয়ে ইশারায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখালাম আমি। মিশরীয় সভ্যতা সম্পূর্ণভাবে বিপদমুক্ত হয়েছে এই ব্যক্তির কারণে, সে জন্য আমরা সবাই তার কাছে কৃতজ্ঞ…

ডান হাতের তালু ওপরে তুলে ধরল উটেরিক, ফলে সাথে সাথে থেমে গেল আমার উদাত্ত বক্তৃতা। হুরোতাসের দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে, মনে হলো যেন একটু বেশিই সময় নিল কাজটা করতে। তারপর বলল, রাজা হুরোতাস, তাই না? কিন্তু একে দেখে আমার অন্য এক ব্যক্তির কথা মনে পড়ছে।

থতমত খেয়ে গেলাম আমি, এই কথার জবাবে কী বলব বুঝতে পারলাম না। এবং কোনো কথার জবাবে কিছু বলতে না পারাটা আমার সাথে একেবারেই বেমানান। এর পরেই অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। টামোসের সন্তানদের মাঝে যে ছিল পুরোপুরি দুর্বল অপদার্থ কিসিমের, আমার চোখের সামনেই সে পরিণত হলো উন্মত্ত ভয়ানক এক দানবে। চেহারা লাল হয়ে উঠল তার, জ্বলে উঠল চোখগুলো। প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপতে শুরু করল কাঁধ দুটো। আমার সঙ্গীর দিকে আঙুল তাক করল ফারাও।

আমার মহান পিতা ফারাও টামোসের সেনাবাহিনীর এক সাধারণ ক্যাপ্টেনের সাথে এই লোকের চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছি আমি; যার নাম ছিল জারাস। তুমি নিশ্চয়ই সেই গুণ্ডাটার কথা ভুলে যাওনি টাইটা? তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, তবু এই জারাস নামের লোকটার কথা আমার ঠিকই মনে আছে। তার শয়তানিতে ভরা চেহারা আর উদ্ধত আচরণের কথা কখনো ভুলব না আমি। কণ্ঠস্বর উঁচুতে চড়ছে তার, ধীরে ধীরে মুখ থেকে থুতুর ছিটা বেরিয়ে আসছে। আমার মহান পিতা শক্তিমান ফারাও টামোস এই লোকটাকে বিশেষ এক উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত রাজা মিনোসের রাজধানী নসোসে। আমার দুই ফুপু রাজকুমারী তেহুতি এবং রাজকুমারী বেকাথাকে নিরাপদে ক্রিটে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল এর ওপর। ঠিক হয়েছিল ক্রিটের রাজা মিনোসের সাথে তাদের বিয়ে হবে, যাতে আমাদের দুই রাজ্যের মধ্যে বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হয়। অথচ পথিমধ্যে এই জারাস আমার আত্মীয়দের অপহরণ করে, তারপর নিয়ে যায় পৃথিবীর একেবারে সর্বশেষ প্রান্তে এক বর্বর ভয়ানক দেশে। আর কখনো আমার দুই ফুপুর খবর জানতে পারেনি কেউ। তাদের দুজনকেই অত্যন্ত ভালোবাসতোম আমি, কী সুন্দরী ছিলেন তারা… এই পর্যায়ে এসে একের পর এক অভিযোগের তীর ছোঁড়া থামাতে বাধ্য হলো উটেরিক। নিজের নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করল সে প্রাণপণ চেষ্টায়, কোনোমতে আগের সেই নির্লিপ্ত ভাবটা ফিরিয়ে আনতে চাইল। কিন্তু হুরোতাসের দিকে তুলে রাখা তার কম্পিত আঙুল একটুও নিচু হলো না।

মহামান্য ফারাও… সামনে এগিয়ে এসে বললাম আমি, দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে তার উন্মত্ত অকারণ ক্রোধ প্রশমিত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ফলশ্রুতিতে একই রকম রাগ নিয়ে এবার আমার দিকে ফিরল ফারাও উটেরিক।

আর তুমি, বিশ্বাসঘাতক কুকুর! আমার বাবা আর তার সকল মন্ত্রীকে তুমি ধোকা দিতে পারো; কিন্তু আমি তোমাকে কোনো দিন বিশ্বাস করিনি। তোমার কোনো দুরভিসন্ধি বা ষড়যন্ত্র কখনো আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। তোমার আসল পরিচয় আমি সেই শুরু থেকেই জানতাম। তুমি একটা দু-মুখো সাপ, মিথ্যেবাদী, কুচক্রী শয়তান… পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল সে, প্রহরীদের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকাল। এদের গ্রেপ্তার করো। বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে ওদের মৃত্যুদণ্ড দেব আমি…

হঠাৎ যেন শক্তি হারিয়ে ফেলল ফারাওয়ের গলা। রাজকীয় দরবার কক্ষে নেমে এলো অটুট নিস্তব্ধতা।

কোথায় আমার দেহরক্ষীরা? মেয়েদের মতো তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল উটেরিক। তার কিশোর সঙ্গীরা সবাই গিয়ে সিংহাসনের পেছনে জড়ো হয়েছে, সবার চেহারা ফ্যাকাশে, ভয়ার্ত। শেষ পর্যন্ত যাকে আনেন্ত নামে ডেকেছিল উটেরিক সেই ছেলেটা কথা বলে উঠল।

তোমার রক্ষীদের তুমি নিজেই বিদেয় করে দিয়েছিলে প্রিয়। এখন আবার আমাকে বোলো না কাউকে গ্রেপ্তার করতে, বিশেষ করে এই দুই গুণ্ডাকে তো একেবারেই নয়। দেখেই মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথার খুনি এরা। ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছনের দরজার পর্দা সরিয়ে ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সাথে সাথে তার পিছু নিয়ে বাকি ছেলেগুলোও বেরিয়ে গেল।

আমার প্রহরীরা কোথায়? সবাই কোথায় গেল? কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো ফারাওয়ের গলা, যেন এখনই মাফ চাইতে শুরু করবে কারো কাছে। ওদের বলেছিলাম গ্রেপ্তার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে। এখন কোথায় গেল সব? কিন্তু কেউ তার কথার জবাব দিতে এগিয়ে এলো না। আমাদের দুজনের দিকে তাকাল সে ভয়ার্ত চোখে, দেখল আমাদের বর্ম পরা শরীর, শক্ত হাতের মুঠোতে ধরা তলোয়ারের বাট, গম্ভীর চেহারা। সিংহাসন থেকে নেমে পর্দায় ঢাকা দরজার দিকে পিছু হঠতে শুরু করল সে। দ্রুত পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। সাথে সাথে প্রচণ্ড ভয়ে বিকৃত হয়ে উঠল ফারাওয়ের চেহারা। ধপ করে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে রেখেছে, যেন আমার তলোয়ারের আঘাত ঠেকাতে চায়।

টাইটা, প্রিয় টাইটা, আমি তো স্রেফ ঠাট্টা করছিলাম তোমার সাথে। একটু মজা করছিলাম শুধু, তোমার কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছে ছিল না আমার। তুমি তো আমার বন্ধু, আমার পরিবারের রক্ষাকর্তা। দয়া করে আমাকে মেরো না। তুমি যা বলবে তাই করব আমি… তার পরেই ঘটল সেই আশ্চর্য ঘটনা। মলত্যাগ করে ফেলল উটেরিক। কাজটা সে এমন জোরালো আওয়াজ আর দুর্গন্ধের সাথে করল যে, এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। একেবারে যেন জমে গেছি, সামনে এগোনোর জন্য শূন্যে পা তুলেছি ঠিকই কিন্তু নামাতে আর মনে নেই।

আমার পেছনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল হুরোতাস। রাজকীয় সম্মান, টাইটা! মিশরের মহাশক্তিমান শাসক তোমাকে এই রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছেন!

হুরোতাসের সাথে সাথে নিজেও হাসিতে ফেটে পড়ার হাত থেকে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম আমি, যদিও কাজটা কীভাবে করতে পারলাম আমার জানা নেই। কোনোমতে চেহারা ভাবলেশহীন রেখে সামনে এগিয়ে গেলাম। আমার তলোয়ারের আঘাত ঠেকানোর জন্য ফারাওয়ের সামনে বাড়িয়ে রাখা হাতগুলোর একটা শক্ত করে ধরলাম, তারপর তাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলাম। মৃদু গলায় বললাম, আহা, ফারাও উটেরিক টুরো। আপনাকে অনেক বড় দুরবস্থার মাঝে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু মহান দেবতা হোরাস সাক্ষী, এমন কিছু করার ইচ্ছে মোটেও ছিল না আমার। এখনই নিজের কামরায় চলে যান, গোসল করে নিন। পরিষ্কার কাপড় পরুন। তবে তার আগে আমাকে এবং রাজা হুরোতাসকে অনুমতি দিন আমরা যেন আপনার সেনাবাহিনীকে নিয়ে উত্তরে নদী-অববাহিকার দিকে রওনা দিতে পারি, আক্রমণ করতে পারি হিকসসদের স্বঘোষিত রাজা খামুদির ওপর। জন্মভূমির বুক থেকে হিকসস হানাদার নামের ওই অভিশাপকে চিরতরে দূর করার শপথ নিয়েছি আমরা। আমার কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল উটেরিক, পিছিয়ে গেল কয়েক পা। এখনো ভয়ার্ত হয়ে আছে তার চেহারা। জোরে জোরে কয়েকবার মাথা ঝকাল সে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে কাঁপা গলায় বলল হা! হা! এখনই যাও! অনুমতি দিচ্ছি তোমাদের। তোমার যা কিছু দরকার, যাকে যাকে দরকার সবাইকে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি যাও! বলেই ঘুরে দাঁড়াল সে, এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল রাজকীয় দরবার থেকে। প্রতিবার পা ফেলার সাথে সাথে তার জুতো থেকে ফুচুত ফুচুত শব্দ হতে লাগল।

.

দরবার কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে শহরের নির্জন রাস্ত গুলোতে ফিরে এলাম আমি আর রাজা, হুরোতাস। যদিও অভিযানের পরবর্তী ধাপে এখনই পা দেব কি না বুঝে উঠতে পারছি না; কিন্তু এটাও চাইছি না যে গুপ্তচরদের মুখে আমাদের তাড়াহুড়ো করে লুক্সর ছাড়ার খবর পৌঁছাক ফারাওয়ের কানে। নিশ্চয়ই আশপাশের বাড়িঘর আর অলিগলিতে এমন অনেক চরই লুকিয়ে আছে, নজর রাখছে আমাদের ওপর। তাই বাধ্য হয়েই ধীর পদক্ষেপে সামনে এগোলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত যখন শহরের বিজয়দ্বার নামক ফটক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম আমাদের যৌথ সেনাবাহিনী তখনো আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে।

পরে শুনেছিলাম সৈনিকদের মাঝে নাকি নানা রকম গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং আমরা শহরের মাঝে যত বেশি সময় ছিলাম ততই সেই গুজবের মাত্রা বাড়ছিল। কেউ কেউ এমনকি এটাও বলছিল যে, আমাদের দুজনকে বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, প্রথমে ভূগর্ভস্থ কারাগার এবং পরে অত্যাচারের কক্ষে পাঠানো হয়েছে। আমাদের প্রত্যাবর্তনে পোড় খাওয়া সব সৈনিকের মাঝে যে উষ্ণ প্রতিক্রিয়া দেখলাম তা সত্যিই আমার এবং রাজা হুরোতাসের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। বৃদ্ধ সৈনিক থেকে শুরু করে তরুণ পদাতিক সবার চোখে অশ্রু নামল, আমাদের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে গলা ভেঙে ফেলল সবাই। সৈন্যদের মাঝ থেকে সামনের সারিগুলো এগিয়ে এলো। আমাদের বরণ করতে, কেউ কেউ তো হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের পায়ে চুমুই খেয়ে বসল।

তার পরেই আমাদের কাঁধে তুলে নিল তারা, নীলনদের তীরে নিয়ে গেল। সেখানে ল্যাসিডিমনের নৌবাহিনী সদলবলে নোঙর করেছে। তারস্বরে বিজয়ের গান গাইতে লাগল সবাই, আমার এবং হুরোতাসের কান প্রায় বধির হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না কারো মাঝে। স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, নতুন ফারাওয়ের শিশুসুলভ আচরণ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাইনি আমি, কারণ তার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা কাজ করছিল আমার মাথায়। আমি ভেবেছিলাম হুরোতাস এবং আমি নিশ্চয়ই ফারাওয়ের মাথায় যথেষ্ট পরিমাণ বিচারবুদ্ধি ঢোকাতে সক্ষম হয়েছি এবং এর পরে আর তার পক্ষ থেকে তেমন কোনো ঝামেলা হবে না।

ল্যাসিডিমন নৌবাহিনীর প্রধান জাহাজে উঠলাম আমরা। সেখানে আমাদের স্বাগত জানাল নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল হুই। যদিও বিক্ষুব্ধ দিনটা তখন প্রায় শেষের পথে, আঁধার নেমে এসেছে দিগন্তে। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই হিকসসদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানের সর্বশেষ অধ্যায়ের পরিকল্পনায় লেগে পড়লাম আমরা। এবার যুদ্ধ হবে নীলনদের উত্তর অববাহিকায় ঘাঁটি গেড়ে বসা অবশিষ্ট যত হিকসস আছে তাদের রাজা খামুদির বিরুদ্ধে। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে আরো ভাটিতে, মেফিসে নিজের রাজধানী গড়েছে খামুদি। তার সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত এবং সর্বশেষ তথ্যের ভাণ্ডার রয়েছে আমার কাছে। মিশরের মাঝে হিকসস অধ্যুষিত এবং দখলকৃত এলাকাগুলোয় বেশ পোক্ত অবস্থানে রয়েছে আমার গুপ্তচররা।

চরদের মতে পুরো উত্তর মিশর থেকে প্রায় সকল সৈনিক এবং রথকে সরিয়ে নিয়ে তাদের দক্ষিণে পাঠিয়েছে খামুদি, ইচ্ছা যে মিশরীয় শক্তির ওপর মরণ আঘাত হেনে তাদের চিরতরে দূর করে দেবে। কিন্তু আগেই বলেছি আমি, রাজা হুরোতাসের সময়োচিত আবির্ভাবে ছেদ ঘটেছে খামুদির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায়। হিকসস বাহিনীর বিরাট বড় এক অংশ এখন লুক্সরের সামনের গিরিপথে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে, শেয়াল-শকুনের খাবার হচ্ছে। মিশরের বুকে হিকসস নামের দুঃস্বপ্নের চিরতরে অবসান ঘটানোর জন্য এই মুহূর্তের চাইতে সঠিক সময় আর আসবে না।

হিকসস সেনাবাহিনীর যে সামান্য পদাতিক এবং অশ্বারোহী সৈন্য বাকি আছে তারা সবাই এখন নীলের উত্তর অববাহিকায় খামুদির রাজধানী শহর মেফিসে। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি হবে না। ওদিকে হুরোতাস এবং আমার অধীনে রয়েছে সব মিলিয়ে এর প্রায় দ্বিগুণ সৈন্য, তার সাথে কয়েক শ রথ। তবে এগুলোর প্রায় সবই ল্যাসিডিমন থেকে আগত, ফলে আমি নিজে মিশরের এবং খুব সম্ভব সভ্য পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ সেনানায়ক হওয়া সত্ত্বেও সৌজন্যবোধের খাতিরে ঠিক করলাম যে, আমাদের যৌথ বাহিনীর দায়িত্ব রাজা হুরোতাসকেই দেওয়া ঠিক হবে। আমাদের আক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায় কেমন হবে সেটা হুরোতাসকে নির্ধারণ করার আমন্ত্রণ জানালাম আমি। এর মাধ্যমেই প্রকাশিত হলো প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব থেকে আমার অব্যাহতি নেওয়ার ইচ্ছা, সরাসরি আর মুখে বলা লাগল না আমাকে। কিন্তু হুরোতাসের মুখে সেই ছেলেমানুষি হাসিটা ফুটল আমার কথায়, বহু বছর আগে যে হাসি দেখতাম ওর মুখে। বলল, আদেশের কথা যদি বলো, কেবল একজনের সামনেই মাথা নত করতে রাজি আছি আমি। আর সেই মানুষটা এই মুহূর্তে এই টেবিলে আমার সামনেই বসে আছে। দয়া করে বলো টাইটা। তোমার যুদ্ধ পরিকল্পনার কথা শোনাও আমাদের। তোমার নেতৃত্বেই সামনে এগিয়ে যাব আমরা।

ওর বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে খুশি হয়ে মাথা কঁকালাম আমি। হুরোতাস কেবল সাহসী যোদ্ধাই নয়, ওর বিচক্ষণতা কখনো অহংকারের সামনে পরাজিত হয় না। সুতরাং পরবর্তী প্রশ্নগুলো ওর উদ্দেশ্যে ছুঁড়তে শুরু করলাম এবার তাহলে এবার বলো যে কীভাবে হঠাৎ করে লুক্সর এসে হাজির হলে তুমি, অথচ আমরা বা হিকসসরা- কেউই তোমার আগমনের কথা জানতে পারল না? হিকসস দুর্গ আর প্রাচীরঘেরা শহরের পাশ দিয়ে নদীর উজানে শত শত লিগ পথ পাড়ি দিয়ে বিশটা বড় বড় যুদ্ধজাহাজ নিয়ে কীভাবে এসে পৌঁছালে আমাদের কাছে?

মামুলি ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমার প্রশ্নটা উড়িয়ে দিল হুরোতাস। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু সারেংকে আমি আমার জাহাজগুলোতে নিয়োগ দিয়েছি টাইটা। যদিও তোমার কাছে তাদের যোগ্যতা কিছুই নয়। নীলনদের মুখে প্রবেশ করার পর কেবল রাতের বেলায় জাহাজ চালিয়েছি আমরা, দিনের বেলায় নদীর কিনারে নোঙর করে গাছের ডাল কেটে তাই দিয়ে ঢেকে রেখেছি নিজেদের। সৌভাগ্যক্রমে আকাশের দেবী নুট সেই সময়টায় চাঁদকে ছোট রেখেছিলেন, যাতে আমরা চলাচল কারো চোখে না পড়ে। মাঝরাতের পরে নদীর তীরে অবস্থিত শত্রুদের দুর্গ পার হয়েছি আমরা এবং সব সময় মাঝ নদীতে থেকেছি। কয়েকজন জেলে হয়তো আমাদের দেখে থাকবে তবে অন্ধকারে নিশ্চয়ই আমাদের হিকসস বলে ধরে নিয়েছে তারা। এবং অত্যন্ত দ্রুত ছিল আমাদের গতি। নীলনদের মুখ থেকে রওনা দিয়ে তোমাদের সাথে যেখানে দেখা হলো সে পর্যন্ত আসতে মাত্র ছয় রাত গায়ের জোরে দাঁড় টেনেছে আমার মাল্লারা।

তার মানে ওদের চমকে দেওয়ার যে সুবিধাটা সেটা এখনো আমাদের হাতে আছে, আনমনে বলে উঠলাম আমি। গিরিপথের যুদ্ধে কিছু শত্রু যদি বেঁচে গিয়েও থাকে যদিও সেটা একেবারেই অসম্ভব- হেঁটে মেসি ফিরে সবাইকে সতর্ক করতে বেশ কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে ওদের। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ডেকের ওপর পায়চারি করতে লাগলাম আমি। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা সেটা হলো আমরা যখন খামুদির রাজধানীতে আক্রমণ চালাব তখন কোনো শত্রুকে পালাতে দেওয়া যাবে না। যদি ওরা পালিয়ে গিয়ে সুয়েজ আর সিনাই-এর সীমান্ত পর্যন্ত চলে যেতে পারে এবং সেখান থেকে আরো পুবে ওদের জন্মভূমিতে পৌঁছে যায় তাহলে কয়েক বছর পর নতুন করে দল গঠন করে আবার আমাদের ওপর হামলা চালাতে ফিরে আসবে। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ, পরাজয় আর ক্রীতদাসে পরিণত হওয়ার এই অভিশপ্ত চক্র চলতেই থাকবে।

ঠিক বলেছ টাইটা, আমার কথায় সম্মতি প্রদান করল হুরোতাস। এর শেষ দেখতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সদস্যরা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য জাতি হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারে, তাদের জন্য যেন কোনো হিকসস হুমকি না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু গল্পের এমন শুভ সমাপ্তি কীভাবে লিখব আমরা? আমার মনে হয় রথ বাহিনীকে পুব সীমান্তে মোতায়েন করা উচিত, যাতে বেঁচে যাওয়া কোনো হিকসস তাদের প্রাচীন জন্মভূমিতে ফিরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজে নিতে না পারে, বললাম আমি।

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার প্রস্তাবটা নিয়ে চিন্তা করল হুরোতাস, তার পরেই হঠাৎ হাসি ফুটল তার মুখে। তোমাকে পেয়ে আমরা সত্যিই সৌভাগ্যবান টাইটা। নিঃসন্দেহে আমার পরিচিত যত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ রথচালক আছে তাদের মাঝে তুমিই সেরা। তুমি যদি সীমান্তে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নাও তাহলে একটা হিকসস কুকুরও যেন তার খোয়াড়ে ফিরে যেতে না পারে সেটা আমি অনায়াসে নিশ্চিত করতে পারব।

মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয়, আমার পুরনো বন্ধু হুরাতাস বোধ হয় প্রশংসার ছলে আমাকে নিয়ে মজা করে। তবে সাধারণত যেটা হয়, আমি কিছু বলি না। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।

ওদিকে প্রায় মধ্যরাত গড়িয়ে গেছে; তবে অন্ধকারের কারণে আমাদের যাত্রার প্রস্তুতি নিতে কোনো অসুবিধা হলো না। মশাল জ্বালিয়ে নিলাম আমরা, তারপর সেই আলোয় সবগুলো রথকে তুলে নিলাম ল্যাসিডিমন থেকে আসা জাহাজগুলোতে। তারপর জাহাজে উঠল আমাদের সৈন্যরা, তাদের সঙ্গে থাকল মিশরীয় সৈন্যদের মাঝ থেকে মুষ্টিমেয় কিছু অংশ, যারা যুদ্ধে বেঁচে গেছে।

বাড়তি ওজন বইতে হওয়ায় জাহাজগুলো এত বেশি ভরে গেল যে ঘোড়াগুলোকে তোলার কোনো উপায় থাকল না। তাই যাদের ওপর প্রাণীগুলোর দায়িত্ব ছিল তাদের নির্দেশ দিলাম নীলনদের পুব তীর ধরে জাহাজবহরের সাথে সাথে ওগুলোকে নিয়ে যেতে। তারপর অন্ধকার থাকতে থাকতেই নোঙর তুললাম আমরা, ভাটি ধরে এগিয়ে চললাম হিকসস এলাকার দিকে। নদীর বাঁক এবং মোড়গুলোতে আসার সাথে সাথে সাবধান করে দিতে লাগল সারেং, প্রধান মাল্লার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ছন্দময় সংগীত। নদীর তীরে হালকা চালে ছুটে চলা ঘোড়াগুলো প্রায় বহরের সাথে সাথেই রইল, যদিও আমাদের জাহাজগুলো স্রোতের দিকে চলছে বলে বেশ দ্রুত গতিতে ছোটার সুযোগ পাচ্ছে।

.

সূর্য ওঠার আগেই প্রায় ত্রিশ লিগ পথ পাড়ি দিলাম আমরা। সূর্য উঠলে তীরে নোঙর ফেললাম, উদ্দেশ্য দিনের মাঝে সবচেয়ে গরম সময়টা বিশ্রাম নিয়ে কাটাব। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘোড়ার পালগুলো যোগ দিল আমাদের সাথে, নদীর তীরে জন্মানো ফসল আর শস্যের ক্ষেতে নেমে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে শুরু করল।

এসব ফসল লাগিয়েছে হিকসস চাষিরা। এখন শত্রু এলাকায় রয়েছি আমরা। চাষিদের প্রথমে তাদের উদারতার জন্য ধন্যবাদ জানানো হলো, তারপর পাঠিয়ে দেওয়া হলো অ্যাডমিরাল হুইয়ের জাহাজগুলোতে। সেখানে দাঁড় টানার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হলো তাদের, মাল্লাদের নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে পায়ে বেঁধে দেওয়া হলো ক্রীতদাসের শিকল। মেয়েদের তুলে দেওয়া হলো হুরোতাসের সৈন্যদের হাতে। তবে তাদের কপালে কী ঘটল তা আর জানার চেষ্টা করলাম না আমি। যুদ্ধ মানেই নিষ্ঠুরতা। বিনা আমন্ত্রণেই আমাদের দেশে পা রেখেছে ওরা, আমাদের চাষিদের কাছ থেকে ফসলি জমি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ক্রীতদাস বানিয়েছে। এখন আমাদের কাছ থেকে এর চাইতে ভালো আচরণ ওরা কীভাবে আশা করে?

সব কাজ শেষ হওয়ার পর নদীর তীরে জন্মানো ডুমুর গাছগুলোর ছায়ায় বসলাম আমরা। বাবুর্চিরা নাশতা দিয়ে গেল; আগুনে ঝলসানো মাংস আর মাটির চুলায় তৈরি করা মচমচে বাদামি রুটি। সদ্য প্রস্তুত বিয়ার সহযোগে উদরপূর্তি করলাম আমরা। মনে হলো এমন তৃপ্তিসহকারে খাওয়ার জন্য আমি এমনকি ফারাওয়ের সাথে রাজকীয় ভোজে বসার সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজি আছি। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়তে শুরু করার সাথে সাথে জাহাজে উঠলাম আমরা। আবার শুরু হলো মেফিসের উদ্দেশ্যে আমাদের উত্তরমুখী যাত্রা। তবে এখনো প্রায় দুই দিন এভাবে চলতে হবে আমাদের। ওদিকে হুই আর হুরোতাসের অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রথম ওদের সাথে আমাদের ফেলে আসা জীবন নিয়ে আলাপ করার সুযোগ পেলাম আমি। সত্যি কথা বলতে, আমি আসলে সেই দুই রাজকুমারীর খবর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি; ফারাও টামোসের ক্রোধ থেকে পালানোর সময় যাদের নিজেদের সাথে নিয়ে গিয়েছিল হুই আর হুরোতাস।

জাহাজের পেছনের ডেকে বসে ছিলাম আমরা। তিনজন বাদে আর কেউ নেই আশপাশে, নাবিকদের কারো আড়ি পেতে শোনার সম্ভাবনাও নেই। এবার দুজনকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতে শুরু করলাম আমি।

তোমাদের দুজনকে আমি এমন কিছু প্রশ্ন করতে চাই, যেগুলোর উত্তর তোমরা দিতে চাইবে বলে মনে হয় না। তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমার তত্ত্বাবধান থেকে ফারাও টামোসের দুই অল্পবয়স্ক কুমারী বোনদের চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলে তোমরা, যাদের জন্য অনেক বেশি ভালোবাসা ছিল আমার মনে?

তোমার মাথায় যে শুধু নোংরা চিন্তাভাবনা চলে সেটা আমি জানি টাইট। আশা করা যায় আমার কথা শুনলে সেই চিন্তাগুলো দূর হয়ে যাবে, আমার প্রথম প্রশ্নটা পুরো না শুনেই বলে উঠল হুরোতাস। এখন আর ওরা অল্পবয়স্ক নয়, কুমারীও নয়।

হেসে উঠে সম্মতি জানাল হুই। তবে হ্যাঁ, প্রত্যেকটা বছরই যেন ওদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আরো বেশি বেড়ে চলেছে। তারা দুজনই তুলনীয় রকমের অভিজাত সত্যবাদী এবং উর্বর। আমার বেকাথা চারটে পুত্রসন্তান উপহার দিয়েছে আমাকে।

আর তেহুতি আমাকে উপহার দিয়েছে একটি কন্যা, যার সৌন্দর্যের কথা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়, জোর গলায় বলে উঠল হুরোতাস। তবে তার মতামত নিয়ে আমার মনে কিছুটা সন্দেহ কাজ করল, কারণ আমি জানি যে প্রতিটি মা-বাবাই তাদের সন্তান সম্পর্কে অনেক লম্বা চওড়া ধারণা পোষণ করতে ভালোবাসে। আরো অনেক পরে যখন আমি প্রথমবারের মতো হুরোতাস আর তেহুতির একমাত্র কন্যাকে সচক্ষে দেখি; কেবল তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে নিজের মেয়ে সম্পর্কে আসলে কিছুই বাড়িয়ে বলেনি হুরোতাস। তেহুতি বা বেকাথা তোমাদের কাছে আমার জন্য কোনো চিঠি দিয়েছে বলে তো মনে হয় না, কণ্ঠস্বর থেকে উদাস অবটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম আমি। আমাদের যে আবার দেখা হবে এমন সম্ভাবনা তো ছিল না বললেই চলে, তা ছাড়া এতগুলো বছর পর আমার কথা কি আর ওদের মনে আছে… আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হাসিতে ফেটে পড়ল হুই আর হুরোতাস।

তোমাকে ভুলে যাবে ওরা? হাসির দমক কোনোমতে থামিয়ে প্রশ্ন করল হুরোতাস। তুমি কি জানো আমার স্ত্রী যেন ল্যাসিডিমন ছেড়ে মিশরে এসে তার প্রিয় টাটাকে খুঁজতে শুরু না করে সেটা নিশ্চিত করতে কত কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে? তেহুতি আমাকে আদর করে যে নামে ডাকত সেই একই নাম হুরোতাসের মুখে শুনে লাফ দিয়ে উঠল আমার বুকের ভেতরে। ওর কথাগুলো আমি মুখস্থ করে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে পারব কি না এটা নিশ্চিত হতে পারেনি তেহুতি। তাই তার বদলে সব কথা প্যাপিরাসে লিখেছে, আমাকে বলেছে যেন তোমার হাতে তুলে দিই সেই চিঠি।

প্যাপিরাস? আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। কোথায় সেটা? দাও আমাকে, এখনই!

আমাকে ক্ষমা করে দাও টাইটা। লজ্জিত দেখাল হুরোতাসকে। কিন্তু চিঠিটা এত ভারী হয়ে গিয়েছিল যে কিছুতেই বহন করা যাচ্ছিল না। ভাবছিলাম ল্যাসিডিমনেই রেখে আসব কি না। চোখে যুগপৎ বিস্ময় আর রাগ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি, ঠিক কীভাবে ধমকালে ওর উপযুক্ত শাস্তি হবে তাই ঠিক করার চেষ্টা করছি। তবে বেশিক্ষণ আমাকে কষ্টে রাখল না হুরোতাস, অথবা বলা যায় রাখতে পারল না। নিজেকে সামলাতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠল সে। আমি তো জানতাম এমন কাজ করলে তুমি আমাকে কী করবে টাইটা! তাই চিঠিটা আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সাথে নিয়ে এসেছি। এখন আমার কামরায় আছে সেটা।

ওর কাঁধে ঘুষি মারলাম আমি, প্রয়োজনের চাইতে একটু বেশিই জোরে। এখনই নিয়ে এসো ওটা বদমাশ! না হলে কখনো তোমাকে ক্ষমা করব না আমি। ডেকের নিচে চলে গেল হুরোতাস, ফিরে এলো প্রায় সাথে সাথেই। সাথে রয়েছে প্যাপিরাসের বেশ ভারী একটা চিঠি। সেটা প্রায় ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিলাম আমি, তারপর সামনের ডেকে চলে গেলাম। এখানে একাকী থাকা যাবে কিছুক্ষণ, নির্বিঘ্নে পড়া যাবে চিঠিটা।

আমার পরিচিতদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরভাবে হায়ারোগ্লিফ আঁকতে পারে আমার প্রিয় তেহুতি। আমার প্রতীক ভাঙা ডানার বাজপাখির ছবিটা এত সুন্দর করে এঁকেছে সে, মনে হচ্ছে যেন ওটা ছবি নয়, রক্ত-মাংসের তৈরি। এখনই প্রাণ ফিরে পাবে, তারপর প্যাপিরাসের ওপর থেকে উঠে আমার চোখে জমা হওয়া নোনা কুয়াশার মাঝ দিয়ে উড়ে প্রবেশ করবে আমার হৃদয়ে।

যে কথাগুলো তেহুতি লিখেছিল সেগুলো আমাকে এতই স্পর্শ করেছে যে, আর কখনো কোনো জীবিত প্রাণীর কাছে সেগুলো দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করার কথা আমি ভাবতেও পারব না।

.

লুক্সর ছেড়ে আসার পর তৃতীয় দিন সকালে আমাদের নৌবহর এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছাল যেখান থেকে হিকসসদের দখলে থাকা মেম্ফিস শহর মাত্র বিশ লিগ উজানে। শহরটা নদীর দুই তীর জুড়ে অবস্থিত। এখানে আমাদের জাহাজগুলো চড়ায় তুলে রাখলাম আমরা, তারপর রথগুলো নামিয়ে ফেললাম। রাখালরা ঘোড়াগুলো তাড়িয়ে এনে নির্দিষ্ট দল অনুযায়ী ভাগ করে ফেলল। রথচালকরা রথের সাথে জুড়ে নিল নিজ নিজ ঘোড়াগুলোকে।

ল্যাসিডিমন বাহিনীর প্রধান জাহাজে শেষবারের মতো একবার পরামর্শে বসলাম আমরা তিনজন। এখানে আরো একবার আমাদের পরিকল্পনার সকল পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাপারগুলো আলোচনা করা হলো, মেসি আক্রমণের সময় সম্ভাব্য সকল ঝামেলা থেকে বাঁচার উপায় ঠিক করে রাখা হলো। তারপর হুই আর হুরোতাসের কাছ থেকে বিদায় নিলাম আমি, তবে তার আগে তাদের দুজনকেই পালা করে জড়িয়ে ধরে তাদের ওপর সকল দেবতার আশীর্বাদ চেয়ে নিতে ভুললাম না। এবার নিজের রথ বাহিনী নিয়ে রওনা দিলাম লোহিত সাগরের মুখ বরাবর জায়গাগুলো অবরোধ করতে, যাতে হিকসস বাহিনী মিশর থেকে পালানোর পথ না পায়। ওরা চলে গেল আরো উত্তরে, যেখান থেকে হিকসসদের রাজা খামুদির ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানাটা সহজ হবে।

মেফিস শহরের গোড়ায় অবস্থিত বন্দরে পৌঁছে হুয়োতাস আর হুই দেখতে পেল ইতোমধ্যে সেটাকে ত্যাগ করেছে খামুদি। পাথরের ঘাটে নোঙর করে থাকা সবগুলো জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সে। পোড়া জাহাজগুলো থেকে যে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল তা এমনকি বহু লিগ দূরে সুয়েজের কাছাকাছি মিশর সীমান্তে অবস্থানরত আমার চোখেও পরিষ্কার ধরা পড়েছিল। তার পরেও প্রায় ত্রিশটি হিকসস জাহাজকে আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম হলো হুরোতাস আর হুই। কিন্তু জাহাজগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত নাবিক নেই আমাদের কাছে।

এবং এখানেই আমার রথ বাহিনী কাজে লাগল। সুয়েজ এবং সিনাইয়ের মাঝে মিশর সীমান্তে অবস্থান নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাঝেই আমরা কাজে নেমে পড়লাম, পরাজিত শহর মেফিস থেকে পালিয়ে আসা শত শত শরণার্থীকে জড়ো করতে শুরু করলাম এক জায়গায়। স্বাভাবিকভাবেই এদের প্রত্যেকের কাছেই ছিল অনেক মূল্যবান জিনিস।

বন্দিদের সতর্কতার সাথে আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করা হলো। বৃদ্ধ এবং শিশুদের কাছ থেকে সব কিছু কেড়ে নেওয়া হলো, তারপর সিনাই মরুভূমি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। তবে তার আগে বলে দেওয়া হলো যে, এরপর আর কখনো মিশরে ফিরতে পারবে না তারা। অপেক্ষাকৃত কমবয়সী এবং শক্তিশালী যারা তাদের প্রতি দশজনকে একসাথে দড়ি দিয়ে বাধা হলো, তারপর তাদের নিয়ে আবার মেফিস এবং নীলনদের দিকে যাত্রা। শুরু করলাম আমরা। তাদের মূল্যবান জিনিসপত্রগুলো এখনো আমাদের কাছেই রয়েছে। যারা আমাদের হাতে বন্দি হয়েছে তাদের পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, আয়ু বেশি নেই ওদের। আমাদের যুদ্ধজাহাজে শিকলে বাঁধা অবস্থায় দাঁড় টানার কাজে খুব বেশি দিন টিকতে পারবে না কেউ। আর তা না হলে নীলনদের তীরে ফসলের ক্ষেতে ভারবাহী জন্তুর মতো কাজ করতে হবে। মেয়েগুলোর মাঝে যাদের চেহারা খুব একটা খারাপ নয় তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে পতিতালয়গুলোতে, আর তা না হলে আমাদের মিশরের প্রাসাদগুলোর রান্নাঘর অথবা ভঁড়ার ঘরে। পাশার দান উল্টে গেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মিশরীয়দের সাথে যে আচরণ ওরা করেছিল এখন সেটাই ফেরত পাবে।

বন্দিদের দলগুলো নিয়ে আমরা যখন মেসি শহরে পৌঁছলাম, দেখলাম ইতোমধ্যে তাকে ঘিরে অবরোধ বসিয়েছে হুরোতাসের সৈন্যরা। রথ জিনিসটা যতই কাজের হোক, অবরোধের মতো ক্ষেত্রে খুব একটা কাজে আসবে না। তাই রথচালকদের নামিয়ে শহর প্রাচীরের নিচে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হলো। ওই পথ দিয়েই শহরে ঢুকব আমরা, খামুদি আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বের করে আনব শহরের ভেতর থেকে।

আর সব অবরোধের মতোই এটাও হলো অত্যন্ত ক্লান্তিকর সময়সাপেক্ষ এক অভিযান। প্রায় ছয় মাস ধরে মেফিসের বাইরে তাঁবু খাঁটিয়ে অবস্থান নিতে বাধ্য হলো আমাদের সেনাবাহিনী। তবে ক্রমাগত সুড়ঙ্গ খোঁড়ার ফলে একদিন শহরের পুরো পুব অংশের প্রাচীর ধসে পড়ল, গুরুগম্ভীর গর্জনের সাথে সাথে ধুলোর মেঘ উড়ল আকাশে। বহু দূর থেকে দেখা গেল সেই ধুলো। ধসে পড়া অংশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল আমাদের লোকেরা।

আরো অনেক দিন লাগল শহরকে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করতে, কারণ শহরটা নদীর দুই তীরেই বিস্তৃত। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের বিজয়ী বাহিনী খামুদির আস্তানা খুঁজে বের করতে সক্ষম হলো। নিজের প্রাসাদের নিচে এক গুপ্তঘরে পরিবারকে নিয়ে লুকিয়ে বসে থরথর করে কাঁপছিল খামুদি। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবিষ্কার করলাম, সোনা আর রুপার এক বিশাল সম্পদের ভাণ্ডারের ওপর বসে আছে তারা। তার সাথে আরো রয়েছে দামি গহনাভর্তি অসংখ্য বড় বড় সিন্দুক। মিশরীয় জনগণের কাছ থেকে প্রায় এক শতাব্দী সময় নিয়ে এই বিশাল সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে খামুদি আর তার বাপ-দাদারা। এবার খামুদি আর তার সঙ্গের সবাইকে নীলনদের তীরে বন্দরের ওপর নিয়ে এলো হুরোতাসের সৈন্যরা। এখানে গান আর হাসিঠাট্টার শব্দের সাথে সাথে তাদের এক এক করে পানিতে ডুবিয়ে মারা হলো। সবার আগে মারা হলো পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যকে।

পরিবারের মাঝে বয়স সবচেয়ে কম ছিল দুই যমজ শিশুর, বয়স হবে দুই কি তিন বছর। অবাক হয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, হিকসস উপজাতির অন্যদের মতো নয় এদের চেহারা, বরং বেশ সুন্দরই বলতে হবে। নীলের পানিতে ছুঁড়ে ফেলা হলো তাদের, পানির নিচে চুবিয়ে ধরে রাখা হলো। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল খামুদি। এটার জন্যও আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কেন যেন আমার ধারণা ছিল অসভ্য জন্তু-জানোয়ারদের মতোই হিকসসদের মাঝে ভালোবাসা বা কষ্টের কোনো চিহ্ন থাকে না।

খামুদিকে রেখে দেওয়া হয়েছিল সবার শেষে মারার জন্য। যখন তার পালা এলো, পরিবারের অন্যদের চাইতে একটু বেশি গুরুত্বের সাথে পৃথিবী ছাড়ার ব্যবস্থা করা হলো তার জন্য। প্রথমেই কয়লার আগুনে পুড়িয়ে টকটকে লাল করে তোলা ছুরি দিয়ে জ্যান্ত অবস্থায় তুলে ফেলা হলো খামুদির চামড়া। তারপর চারটে ঘোড়ার সাথে বাঁধা হলো তার চার হাত-পা, ঘোড়া দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হলো অঙ্গগুলো। উপস্থিত দর্শকদের সবাই উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল। বোঝা গেল হুরোতাসের সৈন্যদের রসবোধ একটু অতিমাত্রায় চড়া।

এই ঘটনাগুলো যখন ঘটছিল তখন সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন চেহারায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। এমনিতে এই সব ব্যাপারে আমি থাকতে না পারলেই খুশি হতাম। কিন্তু আমার অনুপস্থিতিকে দুর্বলতার পরিচয় হিসেবে ধরে নিতে পারত আমার লোকেরা। মাঝে মাঝে মানুষের সশরীরে উপস্থিতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, শুধু তাদের সুনাম তখন আর যথেষ্ট থাকে না।

.

হুরোতাস, হুই এবং আমি যখন মেসি প্রাসাদে ফিরে এলাম তখন আমরা সবাই ক্লান্ত। তবে খামুদির প্রাসাদের নিচে গুপ্তঘরে রাখা ধনসম্পদের পরিমাপ এবং তালিকা করার কাজে হাত দিতেই খুব দ্রুত স্বাভাবিক চাঙ্গা ভাব আর হালকা মেজাজ ফিরে এলো আমাদের মাঝে। মাঝে মাঝে একটা ব্যাপার আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হয়। জীবনের সব কিছু, সব আশা যদি হারিয়ে যায়, কেবল স্বর্ণ একাই সেই সব কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে।

হুরোতাসের লোকদের মাঝ থেকে সবচেয়ে বিশ্বাসী পঞ্চাশজন লোক আমাদের সাহায্য করল, তবু সব সম্পদের তালিকা গুছিয়ে আনতে কয়েক দিন সময় লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত যখন মূল্যবান ধাতু আর রঙিন পাথরের বিশাল স্কুপের দিকে আমরা আমাদের মশালগুলো তাক করলাম মনে হলো যেন উজ্জ্বল আলোয় ধাধিয়ে যাবে আমাদের চোখ। দারুণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমরা।

তামিয়াতের দুর্গে যে ক্রিটীয় গুপ্তধন আমরা দখল করেছিলাম তার কথা মনে আছে তোমার? মৃদু স্বরে আমাকে প্রশ্ন করল হুরোতাস।

যখন তুমি সবেমাত্র সেনাবাহিনীর এক তরুণ ক্যাপ্টেন এবং যখন তোমার নাম ছিল জারাস? সেই ঘটনার কথা কখনো ভুলব না আমি। আমার মনে হয়েছিল সমস্ত পৃথিবীতেও এই পরিমাণে সোনা এবং রুপা আছে কি না সন্দেহ।

অথচ আমাদের সামনে এখন যা রয়েছে, ওই গুপ্তধন এর দশ ভাগের এক ভাগের সমানও হবে না, বলল হুরোতাস।

তাতে তেমন কিছু আসে-যায় না, বললাম আমি।

হুরোতাস আর হুই দুজনেই অবাক হয়ে চাইল আমার দিকে। কেন টাইটা?

কারণ এই সম্পদকে আমাদের অন্তত চার ভাগে ভাগ করতে হবে, বুঝিয়ে বললাম আমি। তার পরেও যখন দুজনের চেহারা থেকে বিভ্রান্ত ভাব কাটল না তখন আরো ব্যাখ্যা করে বললাম: তুমি আর হুই, আমি এবং উটেরিক টুরো। ওই আস্ত গাড়ল উটেরিকের কথা বলছ তুমি? হুরোতাসের চেহারা দেখে মনে হলো কেউ বাড়ি মেরেছে ওর মাথায়।

ঠিক বলেছ! তাকে আশ্বস্ত করলাম আমি। মহান উটেরিক, মিশরের ফারাও। এই গুপ্তধনের আসল মালিক ছিল তার পূর্বপুরুষেরা।

আমার কথাগুলো নীরবে কিছুক্ষণ ভেবে দেখল ওরা। তারপর বেশ সতর্কতার সাথে হুরোতাস প্রশ্ন করল, তার মানে তুমি উটেরিক টুরোর রাজত্বেই থেকে যাবে বলে ঠিক করেছ?

সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? প্রশ্নটা শুনে বেশ অবাক হয়ে বললাম আমি। আমি একজন মিশরীয়, অভিজাত সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। এই দেশে আমার প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে। আর কোথায় যাব আমি?

তাকে তুমি বিশ্বাস করো?

কাকে?

কাকে আবার, আস্ত গাড়ল উটেরিককে? বেশ জোর দিয়ে বলল হুরোতাস।

সে আমার ফারাও। অবশ্যই আমি তাকে বিশ্বাস করি।

লুক্সর যুদ্ধের সময় কোথায় ছিল তোমার ফারাও? কড়া গলায় প্রশ্ন করল হুরোতাস। কোথায় ছিল সে যখন মেফিসের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আমরা আক্রমণ চালালাম?

উটেরিক আসলে ঠিক যোদ্ধা প্রকৃতির নয়। তার মনটা খুবই নরম, ফারাওয়ের পক্ষে অজুহাত তৈরি করার চেষ্টা করলাম আমি। তবে তার বাবা টামোস ছিলেন একজন দক্ষ এবং সাহসী যোদ্ধা।

এখানে ছেলেকে নিয়ে কথা হচ্ছে, বাবাকে নিয়ে নয়, আমাকে মনে করিয়ে দিল হুরোতাস।

কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করলাম আমি। অবশেষে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি আমি ধরে নিতে পারি যে আমি যখন ফারাও উটেরিক টুয়োর কাছে এই বিজয়ের খবর নিয়ে যাব তখন তুমি আমার সঙ্গী হচ্ছ না?

মাথা নাড়ল হুরোতাস। আমার মন পড়ে রয়েছে ল্যাসিডিমনে আমার রানি আর কন্যার কাছে। লুক্সরে আমার যে কাজ ছিল তা শেষ হয়েছে। তা ছাড়া ওই শহরে এখনো এমন মানুষ আছে যারা আমাকে সেই আগের জারাস বলে চিনে ফেলার ক্ষমতা রাখে। তোমার ফারাও উটেরিক টুরোর সাথে আমার মাত্র একবার দেখা হয়েছে, এবং সেই সাক্ষাতে তাকে আমার পছন্দ করার মতো কোনো মানুষ বলে মনে হয়নি। আমার মনে হয় নিজের আস্তানায় ফিরে গেলেই ভালো করব আমি। সেখানে অন্তত পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আরেকজনের হাতে নয়। এগিয়ে এসে আমার কাঁধে চাপড় মারল সে। তুমি আমার পুরনো বন্ধু। আমরা সবাই যেমন জানি তুমি যদি সত্যিই ততটা জ্ঞানী হয়ে থাকো তাহলে এই বিশাল সম্পদে তোমার অংশটুকু আমার কাছে দিয়ে দেওয়াই উচিত হবে তোমার। তাহলে তোমার কাছ থেকে খবর পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই সম্পদ আমি নিরাপদে রাখতে পারব এবং সম্পদ হারিয়ে ফেলার কোনো ভয় থাকবে না তোমার। যদিও আমার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে আমার কথা শুনলে শীঘ্রই আমাকে ধন্যবাদ জানাবে তুমি।

আমি ভেবে দেখব কথাটা, কিছুটা অনিচ্ছুক গলায় জবাব দিলাম আমি।

হুরোতাস আর হুই আরো দশ দিন রইল মেফিসে। এই সময়ের মাঝে মেসি থেকে পাওয়া সকল ক্রীতদাস আর অন্যান্য সম্পদের ভার জাহাজে তুলল তারা। তার মাঝে হিকসস গুপ্তধন থেকে পাওয়া আমার নিজের অংশও রইল। অনেক চিন্তাভাবনার পর সেগুলো হুরোতাসের জিম্মায় রাখতে সম্মত হয়েছি আমি। সব শেষে নিজেদের রথ আর ঘোড়াগুলো জাহাজে তুলল তারা। নীলনদের পশ্চিম তীরে পাথরের তৈরি জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে একে অপরকে বিদায় জানালাম আমরা।

হুই এবং রাজকুমারী বেকাথার চার ছেলে আমাদের সাথে ছিল মেফিসে। প্রত্যেকে এখন একটি করে রথ বাহিনীর প্রধান। যদিও ওদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তেমনভাবে পাইনি আমি; তবে মনে হয়েছে ওরা ওদের বাবা এবং মায়ের সব লক্ষণই পেয়েছে। আর তার অর্থ হচ্ছে প্রত্যেকেই সুদর্শন যুবক, সাহসী এবং দক্ষ রথচালক। সবার বড় জনের নাম হচ্ছে হুইসন, কারণটা তো নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে। বাকি তিনজন হলো সস্টেটাস, পালমিস এবং লিও। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে নামগুলো বর্বর গ্রিক ভাষা থেকে নেওয়া। কিন্তু যেভাবে ওরা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমাদের সম্মানিত ও সাহসী স্বজন বলে সম্বোধন করল তাতে ওদের প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল। ল্যাসিডিমনে পৌঁছেই নিজেদের মা আর খালার কাছে আমার ভালোবাসার কথা পৌঁছে দেবে বলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিল ওরা।

নীলনদের অববাহিকা থেকে ল্যাসিডিমন দ্বীপ পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি অনুমতিপত্র লিখে আমার হাতে দিল হুরোতাস। তার সাথে আরো দিল মেসি থেকে পাওয়া গুপ্তধনে আমার অংশের দলিল। সেগুলো আমার হাতে খুঁজে দিয়ে বলল, এবার আশা করি প্রথম সুযোগেই আমাদের সাথে দেখা করতে যাবে তুমি, আর কোনো অজুহাত দেখাবে না। কথাগুলো বলার সময় ওর কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলো, দ্বিতীয়বার আমাদের বিদায়ের মুহূর্তে কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করছে।

ওদিকে আমি নিজেও আমার দুই প্রিয় রাজকুমারী তেহুতি এবং বেকাথার জন্য আলাদা আলাদা চিঠি লিখলাম দুটো প্যাপিরাসে। বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই ওগুলো তাদের হাতে তুলে দেবে হুই আর হুরোতাস। এখানে আমার মুখের কথাই হয়তো যথেষ্ট হতো; কিন্তু এই দুই গুণ্ডা কথাগুলো হুবহু ওদের স্ত্রীদের মুখস্থ শোনাতে পারবে কি না তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। চিঠিতে এত সুন্দর কাব্যিক অলংকার দিয়ে লিখেছিলাম আমি যে এত বছর পরেও সেগুলো নিঃশব্দে আবৃত্তি করতে গেলে পানি চলে আসে আমার চোখে।

এবার সবাই জাহাজে উঠল, ঘাট থেকে ঠেলে সরিয়ে নেওয়া হলো জাহাজ। দাঁড়িদের দাঁড় টানার সুবিধার জন্য তালে তালে বাজতে শুরু করল ঢাক। লম্বা দাঁড়গুলো ছন্দবদ্ধ তালে সাগরের বুকে উঠতে আর নামতে শুরু করল। জাহাজের সারি দেখে মনে হতে লাগল ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কোনো বিশালাকায় সাগর দানব। নীলনদের স্রোত অনুকূলে থাকায় বেশ দ্রুতই প্রথম মোড়টা ঘুরে ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। পরবর্তী গন্তব্য নদীর অববাহিকা যেখানে বিশাল ভূমধ্যসাগরে নেমে গেছে নীলনদ।

একাকী বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।

.

তিন দিন পর আমি আমার নিজের জাহাজে উঠলাম। দক্ষিণ দিকে রওনা দিলাম আমরা, গন্তব্য এবার সেই সোনালি শহর লুক্সর, যেখানে আমাদের বাড়ি। কিন্তু আমার মনটা এখনো ভারী হয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন বাতাস আর দাঁড়ের টান আমাকে যেদিকে নিয়ে চলেছে তার উল্টোদিকে কোথায় যেন বাঁধা পড়ে গেছে আমার হৃদয়।

লুক্সরের শহরের গোড়ায় অবস্থিত বন্দরে যখন আমরা পৌঁছলাম, বোঝা গেল মেফিসে আমাদের বিশাল বিজয়ের খবর ইতোমধ্যে পত্রবাহী পায়রার মাধ্যমে ফারাও উটেরিকের প্রাসাদে পৌঁছে গেছে। মনে হচ্ছে যেন পুরো মিশরের জনগণ এসে হাজির হয়েছে বন্দরে এত ভিড়। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফারাওয়ের প্রধান প্রধান তিনজন মন্ত্রী। জনতার ভিড়ের পেছনে দেখা যাচ্ছে। কমপক্ষে বিশটি মালবাহী গাড়ি, প্রতিটা টানার জন্য রয়েছে বারোটা করে ষাঁড়। আন্দাজ করলাম এগুলো রাখা হয়েছে হিকসসদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্পদ বয়ে নিয়ে ফারাওয়ের কোষাগার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। সন্দেহ নেই এই সম্পদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কোষাগার। হার্প, বাঁশি, ট্রাম্পেট, তাম্বুরিন এবং ঢাকের মিলিত শব্দ শোনা যাচ্ছে, ফারাও উটেরিক ঢুরোর সম্মানে রচিত নতুন একটা গানের তালে বাজনা বাজাচ্ছে। তারা। গুজব ছড়িয়েছে গানটা নাকি সে নিজেই লিখেছে। উপস্থিত জনতা খুব রাখেনি। এখন সেগুলো মাথার ওপরে তুলে প্রবল উৎসাহে জোরে জোরে নাড়ছে তারা, সেইসাথে বাদকদের সাথে গলা মিলিয়ে গান গাইছে।

প্রধান ঘাটে বাঁধা হলো আমার জাহাজটা। মনে মনে ফারাও উটেরিক টুরো এবং সেইসাথে উপস্থিত বিপুল জনতার কাছ থেকে প্রশংসা এবং আন্তরিক ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম আমি। মিশরকে খামুদি আর তার উপজাতির ভয়ানক সদস্যদের হাত থেকে বাঁচানো, সেইসাথে শত্রুদের খপ্পর থেকে এই অপরিমেয় সম্পদ উদ্ধার করার পর এমনটাই তো স্বাভাবিক।

উটেরিকের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে সুদর্শন এক যুবক, ক্রীতদাস ব্যবসায় বিশাল লাভবান হয়েছে সে। তার নাম হচ্ছে মেনাক্ট। ফারাওয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও সহযোগী সে। এবং শুধু ঘনিষ্ঠ বললে ভুল হবে, কারণ তাদের ঘনিষ্ঠতা মানসিক পর্যায় থেকে অনেক আগেই শারীরিক পর্যায়েও গড়িয়েছে। গুজব শুনেছি আমি, তাদের দুজনের মাঝেই নাকি ওই ধরনের কামুক মনোবৃত্তি আছে। তার ভাষণটা সম্ভবত কোনো কেরানি লিখে দিয়েছে, কারণ সেটা একেবারেই একঘেয়ে কণ্ঠে পড়ে গেল সে, একটু বড় শব্দ পড়তে গেলেই হোঁচট খেল বারবার। এতে হয়তো আমি তেমন কিছু মনে করতাম না; কিন্তু তার ভাষণটা শোনার সাথে সাথে একটা ব্যাপার বেশ বড় রকমের খটকা জাগিয়ে তুলল আমার মনে। হিকসসদের বিরুদ্ধে আমি সর্বশেষ যে অভিযান পরিচালনা করলাম তাতে আমার অবদানের কথা বেমালুম বাদ দিয়ে গেল সে। সত্যি কথা বলতে একবারের জন্যও আমার নামটা তার মুখে উচ্চারিত হতে শুনলাম না। কেবল তার পালনকর্তা ফারাও উটেরিক টুরোর কথা বলে গেল সে, সেইসাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যে সাহসী সৈন্যরা যুদ্ধ করেছে, যাদের নেতৃত্বে থাকার কথা ছিল ফারাওয়ের নিজের; তাদের কথা। ফারাও উটেরিক টুরোর নেতৃত্বের গুণাবলি, সাহস এবং তার জ্ঞান আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কথা বলে চলল সে, যার মাধ্যমে আমাদের মিশরকে এক শতাব্দীব্যাপী দাসত্ব থেকে মুক্ত করা গেছে। সে এটাও বলল যে, উটেরিকের আগে যে পাঁচ ফারাও এসেছেন তারা সবাই একই ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছেন বারবার। সেই পাঁচ ফারাওয়ের মাঝে, এমনকি উটেরিক টুরোর বাবা টামোসও আছেন। নিজের ভাষণ সে শেষ করল এই বলে যে, এই বিশাল বিজয়ের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই ফারাও উটেরিক টুরো স্বর্গের দেবতা হোরাস আইসিস, ওসিরিস এবং হাথোরের পাশে স্থান পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। এবং এ কারণেই মেফিসে হিকসসদের কাছ থেকে ফারাও উটেরিক যে সম্পদ পুনরুদ্ধার করেছেন তার একটি প্রধান অংশ ব্যবহার করা হবে একটি মন্দির তৈরির কাজে। ফারাও উটেরিকের সাধারণ মানুষ থেকে স্বর্গীয় এবং অমর দেবতায় পরিণত হওয়ার ঘটনাকে উদ্যাপন করতে তৈরি করা হবে মন্দিরটি।

মেনাক্ট যখন এই ভাষণের মাধ্যমে জনতার মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতে ব্যস্ত, আমার নাবিকরা তখন আমাদের সাথে নিয়ে আসা সম্পদ সব জাহাজ থেকে নামিয়ে ঘাটের ওপর তূপ করে রাখতে শুরু করেছে। সে সময় সত্যিই এক। অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। উপস্থিত জনতার সবার মনোযোগ মেনাক্টের লম্বা চওড়া বক্তৃতা থেকে সরে গিয়ে স্থির হলো স্থূপীকৃত সম্পদের ওপর।

অবশেষে নীরব হলো মেনাক্ট, শেষ হলো তার বক্তৃতা। নির্দেশ পেয়ে সামনে এগিয়ে এলো গাড়িগুলো। ক্রীতদাসরা ঘর্মাক্ত দেহে সম্পদভর্তি সিন্দুকগুলো তুলতে লাগল সেগুলোতে। সব ভোলা হয়ে গেলে চাবুক বাতাসে ছুঁড়ে তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল গাড়িগুলোর চালকরা। সাথে সাথে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রহরীরা তাদের ঘিরে তৈরি করল নিরাপত্তা বেষ্টনী। লুক্সর শহরের প্রধান দরজার দিকে চলতে শুরু করল সম্পদবাহী গাড়ির বহর।

এই সব কিছু দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম আমি। ভেবেছিলাম এই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য হবে আমার, ফারাওয়ের হাতে সম্পদের ভার তুলে দেওয়ার সম্মানটুকু আমি ছাড়া আর কেউ পাবে না। এই উপহার পাওয়ার পর নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞ বোধ করবে ফারাও, তার সম্পূর্ণ স্বীকৃতি এবং শুভেচ্ছা পাব আমি। এখন যা ঘটছে তার প্রতিবাদ জানাতে চাইলাম আমি, গাড়িবহরের নেতৃত্বের অবস্থান যে একান্তই আমার অধিকার সেটা বোঝানোর জন্য এগিয়ে গেলাম মেনাক্টের দিকে।

তবে চারপাশে মানুষের ভিড় এবং সেই সময়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনার কারণে আমি একটা ব্যাপার খেয়ালই করিনি। কখন যেন প্রাসাদ প্রহরীদের ছয়জন উচ্চপদস্থ সদস্য ঘাটের জনসমুদ্রের মাঝ থেকে আমার জাহাজে উঠে এসেছে। কোনো রকম ঝামেলা বা হইচই ছাড়াই বৰ্ম আর খোলা অস্ত্র দিয়ে তৈরি এক নিশ্চিদ্র দেয়ালের মাঝে আমাকে ঘিরে ফেলল তারা।

প্রভু টাইটা, ফারাওয়ের একান্ত নির্দেশে আপনাকে রাজদ্রোহিতার দায়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দয়া করে আমার সাথে আসুন, প্রহরীদের নেতা মৃদু কিন্তু শক্ত গলায় আমার কানে কানে বলল কথাগুলো। ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। এ যে সেই ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ, যার জন্য আমার মনে আলাদা একটা জায়গা আছে- এটা বুঝতে আমার এক মুহূর্ত সময় লেগে গেল।

কী সব বাজে কথা বলছ ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ? আমাকে তুমি ফারাওয়ের সবচেয়ে অনুগত প্রজা বলে ধরে নিতে পারো, অপমানিত গলায় প্রতিবাদ জানালাম আমি। কিন্তু আমার আপত্তিতে কান দিল না সে, শুধু সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝকাল একবার। সাথে সাথে সবাই আমাকে এমনভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল, একটুও নড়ার উপায় রইল না আমার। অনুভব করলাম পেছন থেকে একজন আমার তলোয়ারটা বের করে নিল খাপ থেকে। জাহাজের সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে আনা হলো আমাকে। সেই একই মুহূর্তে উপস্থিত বাদকদের দিকে হাত দিয়ে একটা ইশারা করল মেনাক্ট। ফলে সাথে সাথে নতুন একটা বাজনা শুরু হয়ে গেল, দেবোপম ফারাওয়ের প্রশংসা এবং প্রশস্তি বর্ণনা করা হতে লাগল তার তালে তালে। সেই শব্দে ঢাকা পড়ে গেল আমার প্রতিবাদ। জাহাজ থেকে আমাকে যখন পাথরের ঘাটে নামিয়ে এনেছে প্রহরীরা ততক্ষণে জনতার ভিড় ঘুরে গেছে বাদকদের দিকে। তাদের পিছু নিয়ে সম্পদবোঝাই গাড়িগুলো যেদিকে গেছে সেদিকে অর্থাৎ শহরের প্রধান দরজা অভিমুখে এগোতে শুরু করেছে তারা।

.

আমরা একাকী হয়ে পড়ার সাথে সাথেই প্রহরীদের নির্দেশ দিল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। চামড়ার দড়ি দিয়ে আমার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা হলো। দলের বাকিরা চারটে যুদ্ধের রথ নিয়ে এলো। আমাকে শক্ত করে বাঁধার পর ঠেলেঠুলে সবচেয়ে সামনের রথটার পাদানিতে উঠিয়ে দিল তারা। তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল চাবুক, রওনা হয়ে গেলাম আমরা। তবে বাদকদল আর সম্পদবোঝাই গাড়িগুলো যে পথে গেছে সেদিকে নয়, বরং শহরের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া একটা বিকল্প পথের দিকে। সেই পথ দিয়ে কিছু দূর এগোনোর পর দূরের পাথুরে পাহাড়গুলোর দিকে এগোতে শুরু করল আমাদের রথগুলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই পথটা তেমন ব্যবহার করা হয় না। সত্যি কথা বলতে শহরের বাসিন্দাদের বেশির ভাগ অংশ একান্ত ঠেকায় না পড়লে এই পথে কখনো আসে না। অবশ্য পথটা কোথায় গিয়ে থেমেছে সেটা বিবেচনা করলে এমনটাই স্বাভাবিক। রাজপ্রাসাদ এবং শহরের প্রাচীর থেকে পাঁচ লিগেরও কম দূরত্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটা নিচু পর্বতমালা। সেই পাহাড়গুলোর মাঝে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার মাথায় বসে আছে ভয়াল চেহারার এক পাথুরে দালান। পাথর কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছে ভবনটা, একেবারেই কর্কশ আর নিষ্প্রাণ চেহারা। রংটা কেমন যেন বিষণ্ণ নীলাভ। এই হচ্ছে লুক্সরের রাজকীয় কারাগার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ফাঁসিকাঠ এবং কেন্দ্রীয় অত্যাচার কক্ষগুলোও এখানেই অবস্থিত।

পাহাড়শ্রেণির গোঁড়ায় পৌঁছানোর জন্য ছোট একটা নালা পার হওয়া লাগল আমাদের। নালার ওপরে সেতুটা বেশ সরু, ঘোড়ার খুরে জোরালো শব্দ তৈরি হলো সেখানে। আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের সেই শব্দকে মনে হতে লাগল মৃত্যুর এগিয়ে আসার পদধ্বনির মতো। কারাগারের একমাত্র ফটক, যার নাম দুর্দশার দরজা; সেখানে আসার আগ পর্যন্ত কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল না আমাদের দিকে। দরজার সামনে থেমে লাফ দিয়ে আমাদের রথ থেকে নেমে পড়ল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ, তলোয়ারের বাঁট দিয়ে জোরে জোরে বাড়ি মারল দরজার ওপর। প্রায় সাথে সাথেই আমাদের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধ দরজার ওপর এসে হাজির হলো কালো পোশাক পরা এক কারারক্ষী। তার মাথাতেও একই রকমের কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে, ফলে চোখ আর মুখ বাদে আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

কে ঢুকতে চায় ভেতরে? চিৎকার করে প্রশ্ন ছুড়ল সে।

কয়েদি আর তার রক্ষী! জবাব দিল ওয়েনেগ।

তাহলে নিজ দায়িত্বে প্রবেশ করো, সাবধান করে দিল কারারক্ষী। কিন্তু জেনে রেখো, ফারাও এবং মিশরের সকল শত্ৰু এই দেয়ালের ভেতরে প্রবেশ করার পর চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর দরজাটা ঘড়ঘড় শব্দে ওপরে উঠে গেল। রথ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমরা। তবে কেবল আমরাই ভেতরে ঢুকলাম, আমাদের পাহারা দিয়ে বাকি যে তিনটি রথ এসেছিল তারা বাইরেই রয়ে গেল। তাদের সামনেই আবার ঘড়ঘড় শব্দে নেমে এলো ভারী ঝুলন্ত দরজা।

ভেতরে ঢোকার পর প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে: ছোট্ট একটা ভোলা জায়গাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে আকাশছোঁয়া দুর্ভেদ্য প্রাচীর। অনেক ওপরে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে চারকোনা আকাশ। সেটা দেখার জন্য ঘাড় অনেকখানি কাত করে ওপরে তাকাতে হলো আমাকে। দেয়ালগুলোর গায়ে অজস্র সারি সারি তাক বা কুলুঙ্গি।

প্রতিটি তাকে রয়েছে একটা করে দাঁত বের করে থাকা মাথার খুলি। শত শত খুলি চোখে পড়ল আমার। অবশ্য এখানে এটাই আমার প্রথমবার আসা নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এখানে বন্দি হওয়া হতভাগ্য কিছু লোকের সাথে দেখা করতে আসতে হয়েছে আমাকে, চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব তাদের সাহায্য করার, স্বস্তি দেওয়ার। তার পরেও চারপাশে মৃত্যুর এমন ভয়াবহ প্রমাণ, খোলাখুলি উপস্থিতি দেখে প্রতিবারই ভয়ে কুঁকড়ে উঠেছে আমার ভেতরটা। আর এবার সেটা আরো বেশি ঘটল, কারণ বিপদটা এখন আমার নিজের।

এর চেয়ে বেশি দূরে আমার যাওয়ার অনুমতি নেই, প্রভু টাইটা, মৃদু স্বরে বলল ওয়েনেগ। আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন, আমি শুধু আমার ওপরে থাকা হুকুম পালন করছি। আপনার সাথে আমি যা করেছি তাতে ব্যক্তিগত কোনো কারণ নেই, এবং কাজটা করতে আমার মোটেই ভালো লাগেনি।

আমি তোমার সমস্যা বুঝতে পেরেছি ক্যাপ্টেন, জবাব দিলাম আমি। আশা করি এরপরে যখন আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ হবে, উভয়ের জন্যই অনেক বেশি আনন্দের হবে।

এবার আমাকে রথের পাদানি থেকে নামতে সাহায্য করল ওয়েনেগ, তারপর ছুরির এক পোচে আমার হাতের বাঁধন কেটে মুক্ত করে দিল। কারারক্ষীদের কাছে আমাকে বুঝিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতাটুকু তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দিল সে, আমার শাস্তিসংক্রান্ত প্যাপিরাসগুলো তুলে দিল তাদের হাতে। প্যাপিরাসের নিচে ফারাও উটেরিকের হায়ারোগ্লিফ প্রতীক চিনতে পারলাম আমি। তারপর আমাকে স্যালুট করল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ, এবং ঘুরে দাঁড়াল। আমার চোখের সামনে এক লাফে রথে উঠে পড়ল সে, তারপর লাগামটা হাতের মুঠোয় নিয়ে রথ ঘুরিয়ে দরজার দিকে ফিরল। ঝুলন্ত দরজাটা যথেষ্ট পরিমাণ ওপরে উঠতেই তীরবেগে বাইরে বেরিয়ে গেল ওয়েনেগের রথ, একবারও পেছনে তাকাল না সে।

চার কারারক্ষী এগিয়ে এলো আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওয়েনেগ বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই চারজনের মাঝে একজন তার মাথার কালো কাপড়টুকু সরিয়ে ফেলল, তারপর বীভৎস হাসি মুখে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটা বিচ্ছিরি রকমের মোটা শরীরের অধিকারী, গলার নিচ থেকে কয়েক পরত চর্বি ঝুলে পড়েছে বুক বরাবর।

আপনাকে পেয়ে আমরা সম্মানিত বোধ করছি, হে প্রভু। এমন বিখ্যাত উচ্চপদস্থ আর ধনী ব্যক্তির খেদমত করার সৌভাগ্য তো আমাদের সব সময় হয় না। সম্পদের দিক দিয়ে ফারাওয়ের পরেই নাকি আপনার অবস্থান। আপনাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে চাই না আমি। প্রথমেই আমার পরিচয়টা দিয়ে দিই। আমার নাম ডুগ। চকচকে টাকসহ বিশাল মাথাটা নুইয়ে সম্মান দেখানোর ভঙ্গি করল সে। টাক মাথার পুরোটা জুড়ে আঁকা রয়েছে কুরুচিপূর্ণ উল্কি; এক দল কাঠের পুতুল পরস্পরের সাথে এমন সব কাজ করছে, যা দেখলে বমি আসতে বাধ্য। কিন্তু লোকটার কথা থামেনি। বলে চলেছে: আপনার মতো জ্ঞানী এবং শিক্ষিত ব্যক্তি নিশ্চয়ই খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে ডুগ হচ্ছে গুড কথাটার ঠিক উল্টো, এবং বোঝার সাথে সাথে জেনে যাবেন যে আমার কাছ থেকে কী আশা করা যায়। আমাকে যারা ভালোভাবে চেনে তারা প্রায়ই আমাকে শয়তান ডুগ বলে ডাকে। ডুগের কোনো একটা স্নায়ুঘটিত সমস্যা আছে, যার কারণে প্রতিটা বাক্যের শেষে দ্রুত কয়েকবার ডান চোখের পাতা ফেলে সে। লোভ সামলাতে পারলাম না আমি, পাল্টা চোখ টিপলাম।

হাসি মুছে গেল তার মুখ থেকে। ঠাট্টা-তামাশা করতে খুব মজা লাগে আপনার, তাই না? ঠিক আছে, তামাশা আমিও জানি। আপনাকে এমন হাসি হাসাব, পেট ফেটে মরবেন, প্রতিশ্রুতি দিল সে। কিন্তু সেই মজাটা পেতে হলে আমাদের দুজনকেই একটু অপেক্ষা করতে হবে। ফারাও আপনাকে রাজদ্রোহিতার দায়ে গ্রেপ্তার করেছেন ঠিকই, কিন্তু এখনো আপনার বিচার হয়নি, আপনি দোষী প্রমাণিত হননি। যাই হোক, সেই সময় অবশ্যই আসবে। কথা দিচ্ছি, তখন প্রস্তুত থাকব আমি।

আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করল সে; কিন্তু আমিও একই গতিতে ঘুরে তার মুখোমুখি হয়ে রইলাম। একে শক্ত করে ধরে রাখো! সাঙ্গোপাঙ্গদের উদ্দেশ্য করে হিসিয়ে উঠল ডুগ। খপ করে আমার দুই হাত চেপে ধরল ওরা, তারপর চাপ দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করল।

আপনার পোশাকগুলো খুব সুন্দর প্রভু টাইটা, মন্তব্য করল ডুগ। এমন দারুণ জিনিস খুব কমই দেখেছি আমি। কথাটা সত্যি, কারণ আমি মনে মনে আশা করছিলাম যে হিকসসদের হাত থেকে উদ্ধার করা সম্পদ সরাসরি ফারাও এবং তার পারিষদের কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে। আমার মাথায় রয়েছে একটা সোনালি শিরস্ত্রাণ, অনেক আগে যুদ্ধক্ষেত্রে এক হিকসস সেনাপতির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলাম এটা। সোনা আর রুপোয় তৈরি এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। আমার কাঁধে ঝুলছে স্বর্ণসাহস আর স্বর্ণপ্রশংসার পদক, তার সাথে একই রকম উজ্জ্বল রঙের সোনালি কণ্ঠহার, যেগুলো ফারাও টামোস নিজ হাতে আমাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। তার প্রতি আমার ত্যাগ ও সেবার নিদর্শন এগুলো। আমি জানি এই অবস্থায় আমাকে সত্যিই অসাধারণ লাগছে দেখতে। এমন সুন্দর পোশাককে কোনোভাবেই ময়লা বা নষ্ট হতে দিতে পারি না আমরা। এখনই খুলে ফেলুন ওগুলো। সব আমি আমার নিজের জিম্মায় রেখে দেব, বলল ডুগ। তবে সেইসাথে এটাও বলে রাখছি, আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর আপনি মুক্ত হলেই এগুলো সব ফিরিয়ে দেব। আমি শুধু নীরবে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে, আমার প্রতিবাদ বা মিনতি শুনে তৃপ্তি লাভ করার কোনো সুযোগ দিতে রাজি নই। আমার লোকেরা আপনাকে পোশাক খুলতে সাহায্য করবে, বলে নিজের ছোট্ট বক্তৃতার ইতি টানল ডুগ। আমি নিশ্চিত দেয়ালের তাকগুলোতে যে লোকগুলো এখন খটখটে খুলি হয়ে ঝুলে আছে তাদের সবাইকেও সে এই একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

সঙ্গীদের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করল ডুগ। সাথে সাথে আমার মাথা থেকে শিরস্ত্রাণটা খুলে নিল তারা, গলা থেকে সরিয়ে নিল সোনার হারগুলো। আমার শরীরে যে সুন্দর পোশাক ছিল তাও খুলে নেওয়া হলো, ফলে ছোট্ট এক টুকরো কাপড় বাদে প্রায় উলঙ্গ হয়ে পড়লাম আমি। সব শেষে আমাকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করানো হলো, তারপর জোর করে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো খোলা জায়গাটুকুর অপর পাশে অবস্থিত দরজাগুলোর দিকে।

আমার পাশে পাশে চলতে লাগল ডুগ। এই কারাগারের প্রাচীরের ভেতর আমরা যারা চাকরি করি তারা সবাই ফারাও উটেরিক টুরোর সিংহাসনে আরোহণ নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। নিজের উত্তেজনার পরিমাণ বোঝাতে চার পাঁচবার চোখ টিপল সে, প্রতিবার চোখ টেপার সময় ঝাঁকি খেল মাথাটা। ফারাও আমাদের জীবন বদলে দিয়েছেন, মিশরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন আমাদের। ফারাও টামোসের রাজত্বের সময় সপ্তাহে এক-আধবার আমাদের ডাক পড়ত। কিন্তু এখন তার বড় ছেলে আমাদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত রেখেছেন। সব সময়ই হয় কারো মাথা কেটে ফেলা, না হলে পুরুষ এবং মহিলাদের পেট থেকে নাড়িভুড়ি টেনে বের করে আনা; অথবা তাদের হাত-পা ভেঙে ফেলা, অথবা তাদের গলায় বা অণ্ডকোষে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া; অথবা গরম লোহার শিক দিয়ে চামড়া তুলে ফেলা- ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় আমাদের। খুশি খুশি গলায় হেসে উঠল সে। এক বছর আগেও আমার ভাই এবং আমার পাঁচ ছেলের হাতে কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু এখন তারা আমার মতোই পেশাদার অত্যাচারকারী এবং জল্লাদ। কয়েক সপ্তাহ পর পরই লুক্সরের রাজপ্রাসাদে আমাদের ডেকে পাঠান ফারাও উটেরিক টুকরা। আমরা যখন আমাদের দায়িত্ব পালন করি সেটা দেখতে ভালোবাসেন তিনি। যদিও তিনি এখানে কখনো আসেননি। তার বদ্ধমূল ধারণা, এই দেয়ালগুলোর ওপর কোনো একটা অভিশাপ আছে। এখানে যারা আসে তাদের নিয়তিতে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু লেখা থাকে না। আর সেই মৃত্যুকে ডেকে আনার কাজটা করি আমরা। তবে আমি যখন কমবয়সী মেয়েগুলোর ওপর আমার দক্ষতা ফলাই তখন সেটা দেখতে খুব ভালোবাসেন ফারাও, বিশেষ করে তারা যদি গর্ভবতী হয়। তাই এমন কাউকে পাওয়া গেলে তাদের রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাই আমরা। আমার ছোট্ট একটা শখ হচ্ছে, ওদের স্তনের মাঝে ব্রোঞ্জের হুক আটকে ঝুলিয়ে রাখা, সেইসাথে আরো একটা হুক দিয়ে ওদের পেট থেকে জ্বণটা ছিঁড়ে বের করে আনা। নিজের বর্ণনা শুনে নিজেই ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো লালা ফেলতে শুরু করেছে লোকটা। এমন বীভৎস সব কাজের কথা শুনে বমি করে দিতে ইচ্ছে হলো আমার।

আপনার পালা আসতে এখনো সময় লাগবে, তবে ততক্ষণ আমার কাজের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পাবেন আপনি। এমনিতে আমি এসব ক্ষেত্রে একটা ফি রাখি, তবে আপনি যেহেতু আপনার শিরস্ত্রাণ আর সোনার হারগুলো আমাকে রাখতে দিয়েছেন, আপনার কাছে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ… আমার দেখা সবচেয়ে ঘৃণিত লোকগুলোর মাঝে এই লোকটা অন্যতম। যে কালো পোশাক সে পরে আছে সেটা নিঃসন্দেহে তার শিকারদের রক্তের দাগ গোপন করার জন্য। কিন্তু অনেক বেশি কাছাকাছি থাকায় আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কিছু কিছু দাগ এখনো ভেজা। যে দাগগুলো শুকিয়ে গেছে সেসব জায়গায় পচন ধরেছে। কাপড়ে। লোকটার পুরো শরীরে চারপাশে যেন ভারী হয়ে ঝুলে আছে মৃত্যু আর পচনের দুর্গন্ধ, ঠিক যেমন জলাভূমির ওপর ঝুলে থাকে সঁতসেঁতে কুয়াশার চাদর।

জেলখানা নামের এই নরককুণ্ডের মাঝ দিয়ে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে ভুগের সহকারীরা। আশপাশে সবাই তাদের বীভৎস দায়িত্ব পালন করতে ব্যস্ত। রুক্ষ পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলেছে তাদের শিকারের কাতর আর্তনাদ, মিশে যাচ্ছে পেশাদার নিপীড়নকারীদের চাবুকের তীক্ষ্ণ শব্দ আর খিক খিক হাসির সাথে। তাজা রক্ত আর মানুষের মলমূত্রের গন্ধ এত ভয়ানকভাবে বাতাসে মিশে আছে যে, দম বন্ধ হয়ে এলো আমার, একটু বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য খাবি খেতে লাগলাম।

একসময় একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম আমরা। নিচে রয়েছে একটা ছোট্ট জানালাবিহীন ভূগর্ভস্থ কামরা। একটামাত্র মোমবাতি জ্বলছে সেখানে, আর কিছুই নেই। কামরাটা এত ছোট যে হাঁটুগুলো থুতনির নিচে নিয়ে এসে একটু বসতে পারব আমি, তার চেয়ে বেশি কোনো জায়গা নেই। ঠেলেঠুলে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো আমাকে।

আজ থেকে তিন দিন পর ফারাও আপনার বিচার করবেন। তখন আপনাকে নিতে আসব আমরা। তা ছাড়া আপনাকে কোনোভাবেই বিরক্ত করা হবে না, নিশ্চিত থাকুন, আমাকে আশ্বস্ত করল ডুগ।

খাবার চাই আমার, সেইসাথে পান করা এবং নিজেকে পরিষ্কার করার জন্য বিশুদ্ধ পানি, প্রতিবাদ করলাম আমি। বিচারের দিন পরার মতো কিছু পরিষ্কার কাপড়ও দরকার।

কয়েদিরা সাধারণত এসব ব্যাপার নিজেরাই জোগাড় করে নেয়। আমরা ব্যস্ত মানুষ। আপনি নিশ্চয়ই আশা করেন না যে এসব সামান্য বিষয়ে আমরা মাথা ঘামাব? ব্যঙ্গের হাসি হেসে এক ফুঁ দিয়ে মোমটা নিভিয়ে দিল ডুগ, তারপর মোমের বাকি অংশটুকু নিজের আলখাল্লার মাঝে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর দড়াম করে আমার কামরার দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। ওপাশ থেকে তালায় চাবি ঢোকানোর শব্দ শুনতে পেলাম আমি। এই বদ্ধ নোংরা পাথরের ঘরটায় তিনটি দিন কাটাতে হবে আমাকে, কোনো খাবার এবং পানি ছাড়া। জানি না তিন দিন পর আমি বেঁচে থাকব কি না।

তোমাকে টাকা দেব আমি, নিজের কণ্ঠস্বরে হতাশার আভাস পাচ্ছি।

আমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই আপনার কাছে, মোটা কাঠের দরজা ভেদ করেও ভেসে এলো ডুগের কণ্ঠস্বর। তারপর তাদের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল, নীরব হয়ে গেল একসময়। নিশ্চিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমি।

বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে আমি নিজের চারপাশে একটা প্রতিরক্ষা স্তর তৈরি করতে পারি। কিছু কিছু পোকামাকড়ের খোলস বা খুঁটি যেভাবে কাজ করে আমার এই প্রতিরক্ষা স্তরটাও ঠিক তেমন। এই সময় নিজের অনেক গভীরে এক নিরাপদ জায়গায় নিজেকে গুটিয়ে নিই আমি। এখনো আমি সেটাই করলাম।

২. বন্দিদশার তৃতীয় দিন

বন্দিদশার তৃতীয় দিন ভোরবেলায় আমাকে নিতে এলো ডুগ আর তার সহকারীরা। মনের অনেক গভীরে যেখানে আমি ডুব দিয়েছিলাম সেখান থেকে আমাকে তুলে আনতে বেশ কষ্ট করতে হলো তাদের। প্রথমে মনে হলো যেন বহু দূর থেকে  ভেসে আসছে তাদের কণ্ঠস্বর। আস্তে আস্তে অনুভব করলাম তাদের হাতগুলো জোরে জোরে ঝাঁকাচ্ছে আমাকে, জুতোগুলো লাথি মারছে। তবে শুধু যখন টের পেলাম যে আমার মুখের ওপর এক বালতি পানি ছুঁড়ে মারা হয়েছে তখনই আমার পূর্ণ চেতনা ফিরে পেলাম আমি। দুই হাতে আঁকড়ে ধরলাম বালতিটা, তারপর তলায় যেটুকু পানি পড়ে ছিল তাই গলায় ঢেলে গিলে ফেললাম। যদিও আমার হাত থেকে বালতিটা কেড়ে নেওয়ার জন্য ডুগের তিন সহকারী কম চেষ্টা করল না, তবে লাভ হলো না কোনো। ওই কয়েক ঢোক নোংরা ঈষদুষ্ণ পানি যেন আমার জন্য নতুন জীবন বয়ে আনল। অনুভব করলাম আমার পানিশূন্য দেহে নতুন করে শক্তি বয়ে যাচ্ছে, আমার চেতনার দুর্গে নতুন করে প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে আমাকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আমার ভোলা পিঠে বারবার চাবুক মারতে লাগল ডুগ; কিন্তু তাতে কোনো ক্ষেপই করলাম না আমি। একটু পরেই দিনের আলোতে খোলা বাতাসে বেরিয়ে এলাম আমরা। সত্যিই, যেই অন্ধকার কক্ষ থেকে আমাকে বের করে আনা হয়েছে তার তুলনায় এই বাতাস যেন গোলাপের সৌরভ; যদিও এখনো আমি কারাগারের ভেতরেই রয়েছি।

মাথার খুলিতে ভরা সেই প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হলো আমাকে। দেখলাম রথ নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছে ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। আমার দিকে এক নজর তাকিয়েই চমকে উঠে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সে, আমার বিধ্বস্ত চেহারা আর শুকনো অবয়বের দিকে তাকাতে চাইছে না। তার বদলে হাতে ধরা প্যাপিরাসে নিজের হায়ারোগ্লিফ আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমাকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার আগে তাকে ওই প্যাপিরাসে স্বাক্ষর করতে বলেছে ডুগ। কাজটা শেষ হতে ওয়েনেগের সঙ্গীরা আমাকে রথে উঠতে সাহায্য করল। যদিও আমি ব্যাপারটা ঢেকে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি; কিন্তু এখনো আমি অনেক দুর্বল, টলে উঠছি মাঝে মাঝেই।

লাগামে টান দিল ওয়েনেগ, খোলা ফটকের দিকে ঘোরাল রথের মুখ। মুখে বীভৎস হাসি ফুটিয়ে আমার দিকে তাকাল ডুগ। হেঁকে বলে উঠল, আপনার ফেরার অপেক্ষায় থাকব আমি প্রভু। শুধু আপনার ওপর প্রয়োগ করার জন্যই কিছু নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি আমি। এবং আশা করি সেগুলো আপনার বেশ পছন্দ হবে।

পাহাড়ের পাদদেশে সেই ছোট্ট নালাটার কাছে এসে পৌঁছলাম আমরা। এই সময় লাগাম টেনে রথ থামাল ওয়েনেগ, তারপর হাত বাড়িয়ে আমাকে নামতে সাহায্য করল। আমাকে নালার কিনারে নিয়ে এলো সে।

নিজেকে নিশ্চয়ই একটু সাফসুতরো করে নিতে চাইবেন আপনি, প্রভু। ওয়েনেগও ডুগের মতোই আমাকে প্রভু বলে ডাকছে; কিন্তু তাতে ঠাট্টার কোনো ছিটেফোঁটাও নেই। আপনার সুন্দর পোশাকগুলোর কী হয়েছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে আপনার জন্য নতুন একটা টিউনিক নিয়ে এসেছি আমি। এখন যে অবস্থায় আছেন এভাবে ফারাওয়ের সামনে যাওয়া ঠিক হবে না।

নালার পানি শীতল, সুস্বাদু। সারা শরীরে লেগে থাকা শুকনো রক্ত আর কারাকক্ষের ময়লা ধুয়ে ফেললাম আমি, তারপর পরিপাটি করে আঁচড়ে নিলাম আমার লম্বা, ঘন চুল। এগুলো আমার গর্বের বস্তু।

ওয়েনেগ ওই কারাগারে আগেও এসেছে, এবং নিশ্চয়ই জানে যে একবার ডুগের চোখে পড়ার পর আমার পোশাক এবং শিরস্ত্রাণের কী দশা হতে পারে। আর সে কারণেই আমার নগ্নতাকে আড়াল করার জন্য রথচালকদের জন্য তৈরি একটা নীল রঙের টিউনিক বা আঁটো পোশাক নিয়ে এসেছে সে। অদ্ভুত হলেও সত্যি, পোশাকটা আমার অবয়বকে স্নান করার বদলে আরো ফুটিয়ে তুলল, কারণ পোশাকটা বেশ আঁটো হওয়ার কারণে আমার একহারা পেশিবহুল গড়ন একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সাথে কোনো আয়না নেই, তা সত্ত্বেও ঝরনার পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে খুশি হয়ে উঠলাম আমি। স্বাভাবিকভাবেই এটা আমার শ্রেষ্ঠ পোশাক নয়; কিন্তু এখনো একটা ব্যাপার নিয়ে আমি গর্ব করতেই পারি। এমনকি ফারাওয়ের দরবারেও অন্তত চেহারা সুরতে আমার ওপর টেক্কা দিতে পারে এমন খুব বেশি মানুষ নেই।

ওয়েনেগ আমার জন্য পানীয় আর খাবারও নিয়ে এসেছে: রুটি আর নীলনদ থেকে ধরা ঠাণ্ডা মাছ। তার সাথে এক পাত্র বিয়ার। দারুণ সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর মনে হলো খাবারটা। অনুভব করলাম আমার সমস্ত শরীরে নতুন করে শক্তির স্রোত বইতে শুরু করেছে। এবার রথে উঠে ফারাওয়ের প্রাসাদের দিকে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। প্রাচীরঘেরা লুক্সর শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ফারাওয়ের প্রাসাদ। আজ ঠিক দুপুরে আমার বিচার শুরু হওয়ার কথা, তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা আগেই প্রাসাদের কেন্দ্রীয় হলঘরে প্রবেশ করলাম আমরা। ফারাও এবং তার সঙ্গীদের দেখা পেতে অবশ্য দুপুর গড়িয়ে বিকেলের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগল। এবং এক নজরেই বোঝ গেল সবাই কড়া মদ টানছিল এতক্ষণ, বিশেষ করে আমাদের ফারাও। লাল হয়ে আছে তার মুখ, কথায় কথায় হেসে উঠছে হো হো করে। হাঁটছে টলোমলো পায়ে।

গত কয়েক ঘণ্টা ধরে উপস্থিত সবাই ফারাওয়ের আগমনের অপেক্ষা করছিল। এবার উঠে দাঁড়াল সবাই, ফারাওয়ের সামনে এসে ঝুঁকে মার্বেল পাথরের মেঝেতে মাথা ঠেকাল। আমাদের সামনে সিংহাসনে বসল উটেরিক। তার দুই পাশে রইল সেই চাটুকারের দল। নিজেদের মাঝে খিক খিক করে হাসাহাসি করছে তারা। এমন সব কৌতুক করছে, যেগুলোর রস তারা ছাড়া আর কারো বোঝার সামর্থ্য নেই।

এরই মাঝে রাজ্যের অন্যান্য মন্ত্রী এবং রাজপরিবারের সদস্যরাও হলঘরে প্রবেশ করল। ফারাওয়ের পেছনে পাথরের আসনে তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আমার, অর্থাৎ অপরাধীর মুখোমুখিই বসল তারা।

এই উপস্থিত ব্যক্তিদের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর উঁচু পদমর্যাদার অধিকারী হচ্ছে ফারাও টামোসের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র, সিংহাসনের প্রতি যার অধিকার সত্তাই উটেরিক টুরোর পরেই সবচেয়ে বেশি।

তার নাম রামেসিস। তার মা ছিল ফারাওয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী, যার নাম রানি মাসারা। কিন্তু রামেসিসের জন্ম দেওয়ার আগে ছয়টা কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিল সে। ওদিকে টামোসের অন্য আরেক স্ত্রী, যে তার অপেক্ষাকৃত কম প্রিয় হলেও একটি ছেলের জন্ম দেয়। সেই স্ত্রীর নাম ছিল সামোরতি, এবং তার মাত্র কয়েক মাস পরেই মাসারার গর্ভে জন্ম হয় রামেসিসের। কিন্তু প্রথম পুত্র এবং সেইসাথে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীকে জন্ম দেওয়ার সম্মান লেখা ছিল সামোরতির কপালে। সেই সন্তানই উটেরিক টুরো।

উপস্থিত সবার মাঝে অটুট নীরবতা বিরাজ করলেও উটেরিক টুরো আর তার সঙ্গীদের মাঝে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আরো বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিজেদের মাঝে হাসাহাসি আর কথাবার্তা চালিয়ে গেল তারা। আমি এবং আমার সঙ্গীদের দিকে কারো খেয়ালই নেই। অগত্যা আরো কিছুক্ষণ ফারাওয়ের উদ্ভট খেয়াল সহ্য করতে বাধ্য হলাম আমরা।

হঠাৎ করেই প্রথমবারের মতো আমার দিকে তাকাল ফারাও। চাবুকের মতো তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল তার কণ্ঠস্বর। এই বিপজ্জনক অপরাধীকে আমার সামনে আনা হয়েছে অথচ তার হাত বাঁধা হয়নি কেন?

সরাসরি ফারাওয়ের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু রেখেই জবাব দিল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। হে মহাশক্তিমান অধিপতি… এমন তেলতেলে সম্বোধনে এর আগে কোনো ফারাওকে ডাকতে শুনিনি আমি। তবে পরে জেনেছিলাম কেউ যদি রাজকীয় ক্রোধের শিকার হতে না চায় তবে উটেরিক টুরোকে সম্বোধনের সময় এ কথাগুলোই তাকে ব্যবহার করতে হবে। …কয়েদিকে এখনো বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি। তাই তাকে বেঁধে রাখার কথাও ভাবিনি আমি।

কী বললে? ভাবোনি? তা তো বটেই, তা তো বটেই। চিন্তাভবনা করার জন্য মাথার ভেতরে কিছুটা মগজ থাকা লাগে। খিক খিক করে হেসে উঠল ফারাওয়ের পায়ের কাছে জড়ো হওয়া চাটুকারের দল, হাততালি দিয়ে উঠল কেউ কেউ। ওদিকে ওয়েনেগের লোকদের মাঝ থেকে দুজন আমাকে উপুড় হয়ে শোয়া অবস্থান থেকে উঠে বসতে বাধ্য করল, তারপর ডুগের কাছ থেকে নিয়ে আসা হাতকড়াগুলো পরিয়ে দিল আমার কবজিতে। তারা যখন ফারাওয়ের নির্দেশ পালন করছে, আমি খেয়াল করলাম যে লজ্জায় আমার দিকে তাকাতে পারছে না ওয়েনেগ। হাত বাঁধা শেষ হতে আবার চাপ দিয়ে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হলো আমাকে।

হঠাৎ করে সিংহাসন থেকে নেমে এলো ফারাও উটেরিক টুরো, আমার সামনে পায়চারি করতে শুরু করল। মাথা উঁচু করার সাহস পাচ্ছিলাম না আমি, ফলে তাকে দেখাও যাচ্ছিল না। কিন্তু মার্বেলের মেঝেতে তার জুতোর শব্দ ঠিকই শোনা যাচ্ছে। এবং শব্দটা শুনে বোঝা যাচ্ছ যে তার পায়চারির গতি বাড়ছে, ধীরে ধীরে খেপে উঠছে সে।

হঠাৎ করেই আমার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল ফারাও, এদিকে তাকাও, ব্যাটা বিশ্বাসঘাতক শুয়োর!

সাথে সাথে ওয়েনেগের লোকদের মাঝে একজন এগিয়ে এসে আমার চুল মুঠো করে ধরল, তারপর টান দিয়ে মেঝেতে উঠে বসতে বাধ্য করল আমাকে। এবার মুখটা রইল ফারাওয়ের দিকে।

কী কুৎসিত ভয়াবহ আর লোভী একটা চেহারা! বলে উঠল উটেরিক। কিন্তু আরো একটা জিনিস ওখানে দেখতে পাচ্ছি আমি। একেবারে দিবালোকের মতো পরিষ্কারভাবে সমস্ত মুখ জুড়ে লেখা রয়েছে একটা কথা- অপরাধী! হলঘরে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলা হলো কথাটা। এবার আমার এবং আমার পরিবারের বিরুদ্ধে এই হতভাগা যে অপরাধগুলো করেছে তার তালিকা তোমাদের জানানো হবে। তখন তোমরা বুঝতে পারবে এই বিশ্বাসঘাতকের জন্য আমি যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছি তা কতটা উপযুক্ত। ডান হাতের তর্জনী আমার মুখের দিকে তাক করল সে, রাগে থরথর করে কাঁপছে। আমার জানা মতে এর প্রথম শিকার ছিলেন আমার দাদি রানি লসট্রিস। যদিও আমার ধারণা তার আগেও আরো অনেকের সর্বনাশ করেছে এই শয়তান।

না! না! রানি লসট্রিসকে আমি ভালোবাসতোম, তীব্র ক্ষোভে আর দুঃখে চিৎকার করে বলে উঠলাম আমি, ওই নামটা শুনে কোনোভাবেই নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। তাকে আমি আমার জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসতাম।

হয়তো সে কারণেই তাকে খুন করেছিলে তুমি। তার ভালোবাসা পাওনি, তাই আর কেউ যেন পেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করেছ। শুধু তাকে খুন করেই ক্ষান্ত হওনি, এই ঘৃণিত কাজের কথা গর্ব করে লিখে রেখেছ রানি লসট্রিসের সমাধির ভেতরে তোমার তৈরি করা পুঁথিতে। তোমার হাতে লেখা সেই কথাগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছিঃ সেথের সেই অভিশপ্ত চিহ্নকে খুন করেছি আমি, যা বেড়ে উঠেছিল তার গর্ভে।

নৃশংস দেবতা সেথ আমার কত্রীর গর্ভে যে ভয়ানক জিনিসটা তৈরি করেছিল সেটার কথা মনে পড়তে গুঙিয়ে উঠলাম আমি। আমার চিকিৎসাসংক্রান্ত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ওটার নাম আমি দিয়েছি কর্কট। হ্যাঁ, রানির মৃতদেহ থেকে ওই কুৎসিত জিনিসটা বের করে এনেছিলাম আমি। প্রচণ্ড শোকার্ত হয়ে পড়েছিলাম, যখন বুঝেছিলাম যে আমার সকল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েও এর হাত থেকে আমার কত্রীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তার অনিন্দ্যসুন্দর দেহের মমীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করার আগে ওই কুৎসিত জিনিসটাকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছিলাম আমি।

কিন্তু এই সব কিছু এখন আমার কত্রীর নাতির কাছে বুঝিয়ে বলার মতো অবস্থা নেই আমার। আমি একজন কবি, যে শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলার মতো কোনো শব্দ আমি সেই মুহূর্তে খুঁজে পেলাম না। শুধু আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ফারাও উটেরিক টুরো আমার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগের তালিকা পড়ে যেতে লাগল। তার ঠোঁটে হাসি; কিন্তু চোখগুলো কোনো ফণা-তোলা গোখরার মতো ঠাণ্ডা, বিষাক্ত ঘৃণায় পরিপূর্ণ। যে বিষ সে আমার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল তা সেই বিষধর সাপের চাইতে কোনো অংশে কম নয়।

উপস্থিত অভিজাত আর রাজবংশের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে সে জানাল যে, কীভাবে আমি রাজকীয় কোষাগার থেকে সোনা এবং রুপার এক বিশাল সম্পদ চুরি করে নিয়ে গেছি, যেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছিলেন তার বাবা ফারাও টামোস। আমার বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ হিসেবে ফারাও উটেরিক আমার ভূসম্পত্তি এবং অন্যান্য অস্থাবর সম্পদের বিপুল পরিমাণের কথা উল্লেখ করল, যেগুলো বিগত বছরগুলোতে তিল তিল করে অর্জন করেছি আমি। আরো একটি পুঁথি বের করে সেখান থেকে পড়তে শুরু করল সে। এতে রয়েছে কোষাগার থেকে আমার জালিয়াতি করে সরানো সকল সম্পদের বিবরণ। সব মিলিয়ে প্রায় কয়েক হাজার কোটি রৌপ্যের হিসাব দেখানো হয়েছে সেখানে, যদিও এত রুপা সারা পৃথিবীতেও নেই।

অভিযোগগুলো এমনই ভিত্তিহীন হাস্যকর যে, কোথা থেকে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করব ভেবে পেলাম না আমি। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে কেবল কিছু নির্দিষ্ট কথা বারবার বলতে লাগলাম আমি: না! ঘটনাটা এমন ছিল না। ফারাও টায়োস ছিলেন আমার একমাত্র পুত্রের মতো। এই সব কিছুই তার। প্রতি আমার সেবা এবং আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে আমাকে দিয়েছিলেন তিনি। তার পঞ্চাশ বছরের জীবনের পুরোটা সময় আমাকে পাশে পেয়েছেন ফারাও। কখনো তার কাছ থেকে কিছু চুরি করিনি আমি, সেটা সোনা-রুপা হোক আর এক টুকরো রুটি হোক।

কিন্তু আমার কথাগুলো যেন ফারাওয়ের কানেই ঢুকল না। নিজের মতো পড়ে অভিযোগের সমাহার পড়ে যেতে লাগল সে: এই আততায়ী টাইটা তার ওষুধ এবং বিষ-সংক্রান্ত জ্ঞান ব্যবহার করে রাজপরিবারের আরো একজন সদস্যের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এবং এবার তার শিকারে পরিণত হয়েছিল আমার আপন মা; সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং কোমলপ্রাণ রানি সামোরতি।

কথাগুলো শুনে আঁতকে উঠলাম আমি। রানি সামোরতির হাতে পুরুষত্ব হারিয়েছে বা মার খেয়ে আধমরা হয়েছে এমন বহু ক্রীতদাসের চিকিৎসা। করতে হয়েছে আমাকে। আমার বন্ধ্যাত্ব এবং ক্ষতবিক্ষত পুরুষাঙ্গ নিয়ে সুযোগ পেলেই নিষ্ঠুর ঠাট্টায় মেতে উঠতেন তিনি; হতাশা প্রকাশ করতেন এই বলে যে তার আগেই অন্য কেউ আমার ওপর খোঁজা করার ছুরি চালানোর সুযোগ পেয়ে গেছে। তার চাকরানিদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল রানির শোবার ঘরে ক্রীতদাসদের অফুরন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। আর সেই ক্রীতদাসদের সাথে রানির অযাচারের কারণেই হয়তো আজ এই মানুষ নামের কলঙ্কের জন্ম হয়েছে, যে এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে আমারই মৃত্যু পরোয়ানাঃ মহাশক্তিমান অধিপতি ফারাও উটেরিক টুরো।

একটা ব্যাপার আমি নিশ্চিতভাবে জানি, রানি সামোরতিকে আমি যেসব ওষুধ এবং জড়িবুটি দিয়েছিলাম সেগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। অগণিত অবৈধ প্রেমিকের মাঝ থেকে এক বা একাধিক জনের কাছ থেকে তার শরীরে যে যৌনরোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েছিলাম আমি। যদিও আমি তার শান্তি কামনা করি, তবে আমার মনে হয় জ্ঞানী দেবতারা তার ভাগ্যে ওই জিনিসটা লেখেননি।

তবে আমার বিরুদ্ধে ফারাও উটেরিকের আনীত অভিযোগগুলোর মাঝে এটাই সর্বশেষ নয়। তার পরের অভিযোগটাও আগেরগুলোর মতোই ভিত্তিহীন এবং চূড়ান্ত রকমের অবিশ্বাস্য।

তারপরে আছে আমার দুই ফুপু রাজকুমারী বেকাথা এবং তেহুতির প্রতি এই কুচক্রী শয়তানের বিশ্বাসঘাতকতা। এ কথা সবাই জানে যে, আমার বাবা তাদের দুজনকেই ক্রিট দ্বীপের ক্ষমতাবান এবং সম্পদশালী সম্রাট মিনোসের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আমার বাবা ফারাও টামোস এই দুই কুমারীকে রাজকীয় কাফেলায় করে বিবাহের উদ্দেশ্যে মিনোসে পাঠান। তাদের সাথে যে যৌতুক পাঠানো হয় তা ছিল আমাদের জাতীয় সম্পদের এক অনন্য উদাহরণ। কয়েক শ লোক পাঠানো হয় তাদের সাথে। আমার বোনদের যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় প্রায় দুই কোটি খাঁটি রৌপ্যখণ্ড। আপনারা যে অপরাধী এবং বিশ্বাসঘাতক টাইটাকে দেখতে পাচ্ছেন এর ওপরেই আমার বাবা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। কাফেলার নেতৃত্ব অর্পণ করা হয়েছিল এর ওপর। তার সাহায্যে ছিল সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জারাস এবং কর্নেল হুই। আমার জানা মতে টাইটা নামের এই ঘৃণিত ব্যক্তি সফলভাবে ক্রিটে পৌঁছায় এবং রাজা মিনোসের সাথে আমার ফুপুদের বিয়ে দেয়। কিন্তু দেবতা ক্রোনাস, যিনি দেবতা জিউসের পিতা এবং যার সন্তানরা তাকে অনন্তকালের জন্য পাহাড়ের নিচে শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছে এবং যার নামে ক্রোনাস আগ্নেয়গিরির নামকরণ; তার ক্রোধের কারণে এক ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে… এই পর্যন্ত বলে একটু দম নিল ফারাও, তারপর আবার তার অভিযোগের তীর ছুঁড়তে ফিরে গেল: যাতে ক্রিট দ্বীপ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং পাথর চাপা পড়ে মারা যান মিনোসের সম্রাট। এর পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সুযোগে সেই দুই দস্যু জারাস এবং হুই আমার দুই ফুপুকেই অপহরণ করে। তারপর তারা আমার বাবা ফারাও টামোসের নৌবাহিনী থেকে দুটো জাহাজ ছিনতাই করে এবং আমার ফুপুদের নিয়ে উত্তরে পালিয়ে যায়, যেখানে কেবল অসভ্য বর্বরদের বাস, যেখানে পৃথিবীর শেষ। এই সবই ঘটে আমার দুই ফুপুর অনিচ্ছায়; কিন্তু আপনাদের সামনে উপস্থিত এই নরাধম টাইটার প্রত্যক্ষ উৎসাহ ও সহযোগিতায়। মিশরে ফিরে আসার পর টাইটা তার প্রাক্তন ফারাওকে জানায় যে, তারা দুজনই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে মারা গেছেন, ফলে তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা বাদ দিয়ে দেন ফারাও। এই অপহরণের ঘটনা এবং তার ফলে আমার দুই ফুপু যত কষ্ট সহ্য করেছেন তার সম্পূর্ণ দায়ভার টাইটার। এবং কেবল এই একটি অপকর্মের জন্যই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।

যদি সত্যি কথা বলতে চাই তবে এই অভিযোগও আমার মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, আমি সত্যিই অপরাধী। কিন্তু সে অপরাধ ছিল আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় দুই নারীকে তাদের ইচ্ছা পূরণ করতে সহায়তা করার, তাদের জীবনে সুখ বয়ে আনার। নিজেদের দায়িত্ব যথাসম্ভব পালন করেছিল তারা, তাদের জন্য এটুকু আমাকে করতেই হতো। কিন্তু এবারও আমার বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি অভিযোগগুলো তুলেছে তার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না। কারণ বেকাথা আর তেহুতিকে যখন তাদের ভালোবাসার পুরুষদের সাথে সুখের সন্ধানে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম তখনই আজীবন মুখ বন্ধ রাখার শপথ নিয়েছিলাম আমি।

আমার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল উটেরিক, তারপর বুক চিতিয়ে চাইল উপস্থিত অভিজাত এবং রাজপরিবারের সদস্যদের দিকে। অভিযোগের মাত্রা এবং গুরুত্ব শুনে সবাই এতটাই অবাক হয়ে গেছে যে, কারো মাঝে একটুও নড়াচড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এক এক করে প্রত্যেকের দিকে চাইল ফারাও, ইচ্ছে করেই যেন সবার উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। বহুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আবার মুখ খুলল সে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে তার কাছ থেকে কোনো দয়ামায়া আশা করা বোকামি। সত্যিই আমার সন্দেহকে ভুল প্রমাণিত করল না ফারাও উটেরিক।

আমি মনে করি কয়েদির বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। তার সকল সম্পদ, তা ছোট হোক আর বড় স্থাবর হোক বা অস্থাবর এবং পৃথিবীর যে প্রান্তেই অবস্থিত হোক না কেন; বাজেয়াপ্ত করা হবে। এখন থেকে সেগুলো সব আমার কোষাগারের অংশ বলে গণ্য হবে।

উপস্থিত দর্শকের মাঝে একটা মৃদু উত্তেজনার গুঞ্জন বয়ে গেল, হিংসার সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল কেউ কেউ। সবাই জানে এই কথাগুলোর মাঝে কী বিশাল ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে। ফারাওয়ের পরে আমিই যে মিশরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এটা কারো অজানা নেই। কিছুক্ষণ দর্শকদের এই আলাপ চালানোর সুযোগ দিল ফারাও, তারপর এক হাত উঁচু করল সে। সাথে সাথে থেমে গেল সবাই। এই মুহূর্তে ভয়ানক এক বিপদের মাঝে রয়েছি আমি, তা সত্ত্বেও নতুন ফারাওয়ের প্রতি উপস্থিত সবার সমীহ আর ভয় খেয়াল করে অবাক না হয়ে পারলাম না। কিন্তু এটাও আমি বুঝতে শুরু করেছি যে, এই ভয় অমূলক নয়। তার পরেই হঠাৎ খিক খিক করে হেসে উঠল ফারাও। সেই মুহূর্তেই আমি প্রথম বুঝতে পারলাম, উটেরিক টুরো আসলে একজন বদ্ধ উন্মাদ এবং নিজের উন্মাদনাকে সামলে রাখার কোনো ইচ্ছেই নেই তার মাঝে। ওই তীক্ষ্ণ উঁচু লয়ের হাসি কেবল একজন উন্মাদের পক্ষেই হাসা সম্ভব। আর তার পরেই আমার মনে পড়ল যে তার মা-ও একজন উন্মাদ ছিল, যদিও তার উন্মাদনা প্রকাশ পেত কেবল যৌন অযাচারের মাধ্যমে। কিন্তু উটেরিক টুরোর মাঝে সেই পাগলামি রূপ নিয়েছে চূড়ান্ত আত্মম্ভরিতায়। নিজের জান্তব প্রবৃত্তি বা ইচ্ছাগুলো কখনো চেপে রাখতে পারে না সে, রাখেও না। তার ইচ্ছে ছিল দেবতায় পরিণত হওয়ার ফলে নিজেকে দেবতা হিসেবে ঘোষণা করেছে সে। তার ধারণা, নিজের দেবত্ব ঘোষণা করলেই দেবতা হওয়া যায়।

এই ব্যাপারটা বোঝার পরেই এই মহান জাতি, পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী এই দেশের নাগরিকদের জন্য কেঁপে উঠল আমার বুক। তাদের কপালে যে বিরাট দুর্ভাগ্য নেমে আসছে তার মাত্র শুরু এখন। নিজের ভাগ্যে কী ঘটবে তা নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাচ্ছি না, কারণ জানি যে ইতোমধ্যে এই উন্মাদ তা নিশ্চিত করে ফেলেছে। কিন্তু আমার প্রিয় মিশরের কী হবে সেটা নিয়েই এখন দুশ্চিন্তা।

আবার কথা বলতে শুরু করল উটেরিক: আমার কেবল একটাই আফসোস যে, এই অপরাধীর মৃত্যু ঘটবে খুব সহজভাবে। আমার পরিবারকে সে যেই কষ্ট দিয়েছে তার তুলনায় এই শাস্তি কিছুই নয়। আমার ইচ্ছে ছিল এই বিশ্বাসঘাতক, সব সময় যে মহত্ত্ব আর মহানুভবতার ভান করেছে এবং নিজেকে বিরল ও বিপুল জ্ঞান এবং শিক্ষার অধিকারী বলে দাবি করেছে; সেই একই পরিমাণ কষ্টের সাথে তার শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

আমার ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তার প্রতি হিংসা চেপে রাখতে পারছে না উটেরিক, বুঝতে পেরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটে। ব্যাপারটা তার নজর এড়াল না, রাগে ঝলসে উঠল তার চোখগুলো। কিন্তু কথা থামাল না সে।

আমি জানি এটা তার জন্য মোটেই যথেষ্ট শাস্তি নয়। তবু আমি এই মর্মে আদেশ দিচ্ছি যে, তাকে এখান থেকে ছেঁড়া কাপড় পরিয়ে এবং শিকলে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হবে নিপীড়ন-নির্যাতনের ভবনে। সেখানে একে অত্যাচারকারীদের হাতে সোপর্দ করা হবে, যারা… এখানে ফারাও উটেরিক এমন কিছু ভয়াবহ কাজের কথা উল্লেখ করল যে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কিছু অল্পবয়স্ক মেয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসতে দেখলাম আমি, ভয়ে কেঁদেও ফেলল কেউ কেউ।

অবশেষে আবার আমার দিকে তাকাল ফারাও। এবার আমি তোমার মুখ থেকে সকল অপরাধের স্বীকৃতি শোনার জন্য প্রস্তুত। এর পরেই তোমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে তোমার নিয়তির মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি, যদিও এখনো হাত বাঁধা আমার। পরিষ্কার গলায় কথা বলতে শুরু করলাম, কারণ আর কিছু হারানোর নেই আমার। বললাম, ধন্যবাদ হে মহাশক্তিমান অধিপতি ফারাও উটেরিক টুরো। এখন আমি বুঝতে পারছি আমি এবং আপনার অন্য সকল প্রজাদের মনে আপনার প্রতি এই অনুভূতি কেন জন্মেছে। নিজের কণ্ঠস্বরে চুঁইয়ে পড়া ব্যঙ্গের ভাব লুকানোর কোনো চেষ্টাই করলাম না আমি।

কাপুরুষ উটেরিক একবার কেবল ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, তারপর হাত নেড়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিল। লুক্সরের রাজদরবারে আমিই এখন একমাত্র ব্যক্তি, যার মুখে হাসি খেলা করছে। বর্তমানে যে দানব মিশরের সিংহাসনে বসেছে তার বিরুদ্ধে কেবল এই ব্যঙ্গের হাসিটুকু ছাড়া আর কোনো অস্ত্র নেই আমার কাছে।

.

ফারাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ওয়েনেগ আর তার সৈন্যরা মিলে আমাকে নিয়ে লুক্সর প্রাসাদের দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। পরনে ছোট্ট এক টুকরো কাপড় আর শিকলগুলো ছাড়া কিছুই নেই আমার। বিশাল সিঁড়ির শুরুতে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম সিঁড়ির নিচে ভোলা প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া বিপুল জনতার দিকে। মনে হচ্ছে যেন এই বিশাল শহরের প্রতিটি নাগরিক আজ এখানে এসে হাজির হয়েছে, তাদের ভিড়ে উপচে পড়ছে প্রাঙ্গণ। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোনো কথা নেই।

তাদের ঘৃণা আর শত্রুতার ভাব অনুভব করতে পারছিলাম আমি। যদিও তাদের বেশির ভাগই আমার নিজের মানুষ। তারা অথবা তাদের বাপ-দাদারা বিগত পঞ্চাশটি যুদ্ধে আমার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। যারা যুদ্ধে পঙ্গু হয়ে গেছে তাদের দায়িত্ব নিয়েছি আমি, আমার সম্পত্তির অংশ ভাগ করে দিয়েছি। আমার কারণেই আশ্রয় এবং দিনে অন্তত একবেলা খাবার পেয়েছে। তারা। যারা মারা গেছে তাদের বিধবারাও ক্ষতিপূরণ পেয়েছে আমার কাছ থেকে। তাদের কাজ দিয়েছি আমি, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি, যাতে এই কঠিন পৃথিবীতে তারা নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার সেই দানশীলতাকে তারা সবাই অস্বীকার করেছে, তার বদলে আজ এখানে হাজির হয়েছে নিজেদের ঘৃণার উন্মুক্ত প্রকাশ ঘটাতে।

এরা এখানে কেন? মৃদু স্বরে ঠোঁট প্রায় না নাড়িয়ে ওয়েনেগকে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

আরো মৃদু গলায় আমার প্রশ্নের জবাব দিল ওয়েনেগ। ফারাওয়ের নির্দেশ। এরা আপনাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিশাপ দিতে এসেছে, আবর্জনা ছুঁড়ে মারতে এসেছে আপনার গায়ে। ফারাও বলেছেন, যতভাবে সম্ভব আপনাকে অপমান করা হবে।

এ জন্যই আমার পোশাক খুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সে। আমিও এতক্ষণ ভাবছিলাম আমার পোশাক খুলে নেওয়ার জন্য ফারাওয়ের এত ব্যস্ত তা কেন। এখন কারণটা বুঝতে পারছি। সে চায় আমি যেন ওই আবর্জনার স্পর্শ অনুভব করি। বেশ। তোমরা কিন্তু আমার বেশি কাছাকাছি থেকো না, তাহলে তোমাদের গায়েও লাগতে পারে।

আমি আপনার ঠিক এক কদম পেছনেই থাকব। যা আপনি সহ্য করতে পারবেন টাইটা তা আমিও সহ্য করতে পারব।

অনেক বেশি সম্মান দিচ্ছ আমাকে ওয়েনেগ, প্রতিবাদ জানালাম আমি।

তারপর নিজেকে শক্ত করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম ক্রোধান্বিত জনসমুদ্রের মাঝে। শুনতে পাচ্ছি আমার প্রহরীরাও সবাই আমার কাছাকাছি রয়েছে, কেউ আমাকে অপমানের মুখে একা যেতে দিতে রাজি নয়। তাড়াহুড়ো করছি না আমি, আবার ধীরে ধীরেও হাঁটছি না। স্বাভাবিক পদক্ষেপে মাথা উঁচু রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি কেবল। জনসমুদ্রের মাঝে ভেসে থাকা মুখগুলো পরীক্ষা করলাম, এক এক করে ঘৃণার চিহ্ন খুঁজছি। অপেক্ষা করছি কখন তাদের অপমানের ঝড় আছড়ে পড়বে আমার ওপর।

তারপর একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মুখ আরো পরিষ্কার হয়ে আসতে হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম আমি। উপস্থিত মহিলাদের অনেকের চোখেই অশ্রু। এটা তো আমি আশা করিনি। পুরুষদের চেহারা গম্ভীর, এমনকি ব্যাপারটা এতই অচিন্তনীয় যে, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে মন চাইল না- বিষণ্ণ হয়ে আছে, যেন শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসেছে তারা।

হঠাৎ করেই সশস্ত্র প্রহরীদের সীমানা এড়িয়ে এক মহিলা সামনে চলে এলো। প্রহরীদের রাখা হয়েছে ইচ্ছে করেই, যেন তারা ভিড় সামলে রাখতে পারে। আমার কাছ থেকে কয়েক কদম দূরে এসে থামল মহিলা, কিছু একটা ছুঁড়ে মারল আমার দিকে। জিনিসটা আমার পায়ের কাছে পড়ল। ঝুঁকে এসে শিকলে বাঁধা দুই হাত দিয়ে সেটা পাথরের মেঝে থেকে তুলে নিলাম আমি।

ফারাওয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কোনো আবর্জনা বা মানুষের বর্জ্য নয় সেটা, বরং নীলনদের পানি থেকে তুলে আনা একটা অদ্ভুত সুন্দর নীলপদ্ম ফুল। সাধারণত দেবতা হোরাসের পুজো দিতে এই ফুল ব্যবহার করা হয়। ভালোবাসা এবং গভীর সম্মানের প্রতীক এটা।

প্রহরীদের সারি থেকে দুজন এগিয়ে এলো মহিলার দিকে। তার দুই হাত ধরল তারা; কিন্তু কারো চেহারায় রাগের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। শান্ত ভঙ্গিতে মহিলাকে ধরে রেখেছে তারা, দুজনের চেহারাই বিষণ্ণ।

টাইটা! বলে উঠল মহিলা। আমরা তোমাকে ভালোবাসি।

তার পরেই জনতার সমুদ্রের মাঝখান থেকে দ্বিতীয় একটা কণ্ঠস্বর চিৎকার করে উঠল, টাইটা! তারপর আরো একজন বলে উঠল টাইটা! হঠাৎ করেই যেন একজন মানুষ থেকে শুরু করে হাজার মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আমার নাম।

দ্রুত আপনাকে শহরের প্রাচীরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে, আমার কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলল ওয়েনেগ ফারাও কিছু বুঝে ওঠার আগেই সরে যেতে হবে আমাদের। না হলে তার ক্রোধ থেকে কেউ রেহাই পাবে না। কিন্তু এসব কী হচ্ছে আমি নিজেই তো বুঝতে পারছি না? আমিও পাল্টা চিৎকার করে জবাব দিলাম। এবার আর কোনো কথা বলল না ওয়েনেগ, শুধু আমার বাহু চেপে ধরল শক্ত করে। আরেক হাত চেপে ধরল ওয়েনেগের অধীনের আরেকজন লোক। আমাকে প্রায় মাটি থেকে তুলে নিয়ে পথ ধরে দৌড়ে চলল দুজন। প্রতি মুহূর্তে কমে আসছে পথের প্রস্থ, কারণ দুই পাশে জড়ো হওয়া জনতা আমাদের দিকে সরে আসছে। সবার উদ্দেশ্য হয় আমাকে ছুঁয়ে দেখা অথবা জড়িয়ে ধরা; আসলে কোনটা সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।

পথের শেষ প্রান্তে রথের সারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ওয়েনেগের সহকারীরা। জনসমুদ্র আমাদের ওপর সম্পূর্ণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে গেলাম আমরা। এই হইচইয়ের কারণে ঘোড়াগুলো বেশ ভয় পেয়ে গেছে, তবে আমরা রথে ওঠার সাথে সাথেই চালকরা তাদের লাগামে টান দিল। নুড়ি বিছানো পথ ধরে রথ নিয়ে দৌড়ে চলল ঘোড়াগুলো, উদ্দেশ্য শহরের প্রধান দরজা। খুব তাড়াতাড়িই জনতার ভিড়কে পেছনে ফেলে এলাম আমরা। শহরের প্রধান ফটক যখন আমাদের চোখে পড়ল তখন তা বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করেছে। মরিয়া হয়ে সঙ্গীদের মাথার ওপর চাবুক ফুটিয়ে তাড়া দিল ওয়েনেগ, ফটক বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সরু পথটা দিয়ে বাইরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলাম আমরা।

.

যাচ্ছি কোথায় আমরা? কোনোমতে বলে উঠলাম আমি। কিন্তু আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না ওয়েনেগ, শুধু আমার হাতকড়ার চাবিটা তুলে দিল আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তীরন্দাজের হাতে। রথের ঝাঁকুনি থেকে আমি যেন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, এ জন্য আমাকে ধরে রেখেছিল লোকটা। আগে বাঁধন খুলে দাও, তারপর ম্যাগাসের শরীর ঢাকার ব্যবস্থা করো। আমার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না ওয়েনেগের মাঝে, তবে চেহারায় বেশ রহস্যময় একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল সে।

কী দিয়ে আমার শরীর ঢাকবে ভেবেছ? নিজের প্রায় নগ্ন দেহের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম আমি। এবারও আমার প্রশ্নের কোনো জবাব মিলল না, তবে ওয়েনেগের তীরন্দাজ রথের নিচ থেকে একটা কাপড়ের পুঁটলি তুলে নিয়ে ধরিয়ে দিল আমার হাতে।

আপনি যে এত বিখ্যাত আমি জানতামই না, বলে উঠল তীরন্দাজ। পুঁটলি থেকে একটা সবুজ টিউনিক বের করে মাথায় গলালাম আমি। পুঁটলিতে এই একটা কাপড়ই আছে, ফলে বেশ বিরক্ত হলেও এটাই পরতে হবে আমাকে। সবুজ রংটা একেবারেই আমার পছন্দ নয়, কারণ আমার চোখের রংকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দেয় এই রঙের পোশাক। ওরা কীভাবে আপনার নাম ধরে ডাকছিল শুনেছেন? উত্তেজিত গলায় বলে চলেছে তীরন্দাজ। আমি তো ভেবেছিলাম আপনাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে; কিন্তু না। ওরা তো আপনাকে ভালোবাসে! পুরো মিশর আপনাকে ভালোবাসে, টাইটা। লোকটার কথা শুনে লজ্জা লাগতে শুরু করল আমার, সুতরাং সেটা ঢাকার জন্য ওয়েনেগের দিকে তাকালাম আমি।

নির্যাতন ভবনে ভুগের কাছে পৌঁছানোর জন্য এটাই সবচেয়ে ছোট রাস্তা বলে তো মনে হয় না, বললাম আমি। এবার আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল ওয়েনেগ। ডুগের সাথে আপনার দেখা করার শখটা মেটাতে পারছি না বলে দুঃখিত প্রভু। এখন আসলে সম্মানিত ডুগের বদলে অন্য আরেকজনের সাথে দেখা করতে হবে আপনাকে। চাবুক চালিয়ে রথের গতি আরো বাড়িয়ে তুলল ওয়েনেগ। নীলনদের বন্দরের দিকে যে রাস্তা গেছে সেটা ধরে এখন ছুটছে আমাদের রথ। তবে বন্দরে পৌঁছানোর আগেই আরো একবার রথের মুখ ঘোরাল সে, এবার উত্তরমুখী একটা রাস্তায়, যেটা নদীর সাথে সমান্তরালে এগিয়ে গেছে। একই রকম দ্রুতগতিতে বেশ কয়েক লিগ পথ চলতে হলো আমাদের। একই প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করে ওয়েনেগের চোখে নিজেকে অধৈর্য প্রমাণ করতে চাই না বলে চুপ করে থাকলাম আমি। এমনিতে আমার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই- রাগের চিহ্ন আমি কখনো চেহারায় প্রকাশ করি না। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি তার এই রহস্যময় নীরবতা একটু হলেও বিরক্ত করে তুলেছে আমাকে।

নদীর তীরে জন্মানো ঘন জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে নদীর রুপালি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চেহারা ভাবলেশহীন করে রাখলাম আমি, পুব দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর হঠাৎ ওয়েনেগকে উত্তেজিত গলায় বলতে শুনলাম, এই তো! যেখানে কথা ছিল সেখানেই আছেন দেখা যায়!

আমিও ঘুরে তাকালাম, তবে একেবারেই আস্তে আস্তে অলস ভঙ্গিতে। কিন্তু হঠাৎ করেই রথের ওপর ঝাঁকি খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম আমি। নীলনদের কিনার থেকে মাত্র এক শ কদমের মতো দূরত্বে নোঙর করে দাঁড়িয়ে আছে। মিশরীয় নৌবাহিনীর প্রধান জাহাজ, নিঃসন্দেহে যেটা অন্য সব জাহাজের চাইতে বেশি শক্তিশালী এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন। দৌড়ের পাল্লায় অন্য সব জাহাজকে হারিয়ে দিতে পারে সে, নিজের ওপর ধারণ করতে পারে এক শ দক্ষ নাবিক ও যোদ্ধার ভার।

আর শান্ত হয়ে বসে থাকা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তড়বড় করে বলে উঠলাম, দেবী হাথোরের বিশাল বক্ষ আর পিচ্ছিল যোনির কসম! এ তো মেমনন!

দেবতা পোসাইডনের বিশাল পুরুষাঙ্গ আর উত্তাল অণ্ডকোষের কসম! জীবনে বোধ হয় প্রথমবারের মতো সঠিক কোনো কথা বললেন আপনি, টাইটা, আমার কথার জবাবে পাল্টা ঠাট্টা করে উঠল ওয়েনেগ।

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম আমি। তারপর নিজেকে সামলাতে না পেরে হেসে উঠলাম, জোরে একটা ঘুষি মারলাম ক্যাপ্টেনের দুই কাঁধের মাঝখানে। এত সুন্দর একটা জাহাজ আমাকে দেখানো মোটেই উচিত হয়নি তোমার। এখন যত সব উদ্ভট চিন্তা খেলা করতে শুরু করেছে আমার মাথায়।

স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, ওই উদ্দেশ্যেই কাজটা করেছি আমি। এই কথা বলে নিজের রথের ঘোড়াগুলোর লাগাম টেনে ধরল ওয়েনেগ। দাঁড়া! শক্তিশালী প্রাণীগুলো মাথা ঝাঁকাল, ঘাড় বাঁকিয়ে টানটান করে তুলল লাগাম। নদীর কিনারে ঝাঁকি খেয়ে থেমে দাঁড়াল রথ। আমাদের সামনে নীলনদের তীরে এখন ভাসমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে বিশাল যুদ্ধজাহাজটাকে।

নদীর তীরে আমাদের দেখতে পাওয়ার সাথে সাথে মেমননের নাবিকরা ব্যস্ত হয়ে উঠল। ক্রুশ আকৃতির ভারী তামার নোঙরটা পানি থেকে ওঠাতে শুরু করল কয়েকজন। তারপর ছোট ছোট পাল আর মৃদু পশ্চিমা বাতাসের সাহায্য নিয়ে জাহাজটা ধীরে ধীরে তীরের দিকে এগোতে শুরু করল, যেখানে আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

আমার উৎসাহই সবার চাইতে বেশি, কারণ আমি অনুভব করতে পারছি যে মুক্তি আসন্ন। নির্যাতন-নিপীড়নের ভবনে ভুগের সাথে আরো একবার দেখা করার হাত থেকে এবারের মতো বেঁচে গেছি আমি।

মেমনন হচ্ছে আমার প্রিয় ফারাও টামোসের ছোটবেলার নাম। হিকসস তীরের আঘাতে তার মৃত্যুর পর খুব সামান্য সময়ই পার হয়েছে। নীলের পশ্চিম তীরে রাজাদের উপত্যকায় তৈরি হয়ে আছে তার কবর; কিন্তু সেখানে শোয়ানোর আগে মৃতদেহের জন্য জরুরি মমীকরণ প্রক্রিয়াও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফারাও টামোস সেখানে তার পূর্বপুরুষদের সাথে অনন্ত বিশ্রামে শায়িত হবেন।

আর এই মেমনন আদতে বিশালাকৃতির এক জাহাজ। তার গঠন সম্পর্কে আমার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানা আছে, কারণ নকশাটা মূলত আমিই তৈরি করেছিলাম, যদিও তা কেউ জানে না। আমার বদলে ফারাও টামোসই সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তার নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছিলেন; কিন্তু এখন তিনি মৃত। আর মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে তার কৃতিত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো খারাপ মানুষ আমি নই। মেমননের খোলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হবে এক শ কিউবিটের বেশি। সম্পূর্ণ ধারণক্ষমতা পূরণ করা হলে তিন হাজার কিউবিট পর্যন্ত পানি সরাতে পারে। প্রতি পাশে তিনটি ভাগে মোট ছাপ্পান্নটা দাঁড়। দাঁড়িদের বসার জায়গাগুলো নিচের দিকে বেশ ছড়ানো এবং ওপরের দিকের সারির সাথে আছে ভারসাম্য রক্ষার বাড়তি কাঠামো, ফলে দাঁড়ের সাথে দাঁড় বাড়ি খায় না কখনো। চওড়ায় তেরো কিউবিটেরও কম, ফলে জলপথে তীরবেগে ছুটতে পারে, আবার চড়ায় থামাতেও অসুবিধা হয় না। একমাত্র মাস্তুল চাইলে নামিয়ে ফেলা যায় আবার ইচ্ছে করলে বিশাল পালও খাটানো যায় তাতে। সত্যিই রণতরীদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর নকশার জাহাজ এই মেমনন।

জাহাজটা নদীর পাড়ে নোঙর করতে দীর্ঘদেহী রহস্যময় এক আগন্তুককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম পেছনের ডেকে। পরনে লাল রঙের আলখাল্লা, একই রঙের কাপড়ে ঢেকে রেখেছে মুখ। শুধু চোখের জায়গায় ফুটো করা। মনে হচ্ছে যেন নিজের পরিচয় সবাইকে জানাতে আপত্তি আছে এই লোকের। নাবিকরা জাহাজটাকে জায়গামতো বেঁধে রাখছে, এই সময় নিচে নেমে গেল সে। তার চেহারা দেখার বা পরিচয় আন্দাজ করার কোনো সুযোগই পেলাম না আমি।

কে ওটা? ওয়েনেগকে প্রশ্ন করলাম এবার। তার সাথেই কি দেখা করতে এসেছি আমরা?

মাথা নাড়ল ওয়েনেগ। আমি কিছু বলতে পারব না। এখানেই তীরেই আপনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আমাকে।

দ্বিধা না করে মেমননের সামনের ডেকে উঠে পড়লাম আমি, তারপর লম্বা লম্বা পায়ে ডেক পার হয়ে পেছনের ডেকে চলে এলাম। এখানে একটা গোলাকৃতি দরজা দিয়ে রহস্যময় লোকটা নিচে নেমে গেছে। ডেকের ওপর পা দিয়ে জোরে আঘাত করলাম আমি। সাথে সাথে একটা ভারী কিন্তু ভদ্র কণ্ঠস্বরে জবাব এলো। গলাটা চিনতে পারলাম না আমি।

দরজা খোলা আছে। নেমে আসুন আর দরজাটা বন্ধ করে দিন।

কথামতো কাজ করে নিচের কামরায় নেমে এলাম আমি। ছোট্ট একটা ঘর, নড়াচড়ার জায়গা বেশি নেই। কারণ এটা একটা যুদ্ধজাহাজ, প্রমোদতরী নয়। একটু আগে দেখা সেই লাল পোশাক পরা আগন্তুক এখানেই বসে আছে। উঠে দাঁড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না সে, শুধু সামনে রাখা সরু বেঞ্চটা দেখিয়ে দিল।

এমন পোশাক পরে থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারবেন যে কেন সবার কাছ থেকে আমার চেহারা লুকিয়ে রাখা জরুরি, অন্তত কিছু সময়ের জন্য। ছোটবেলায় আপনাকে খুব ভালোভাবেই চিনতাম আমি; কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া আপনি আমার বাবাকেও খুব ভালোভাবে চিনতেন, যিনি অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন আপনাকে। এবং বর্তমানে আমার বড় ভাই, যে আপনার ব্যাপারে খুব একটা খুশি নয়…

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই সামনে বসে থাকা মানুষটার পরিচয় সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম আমি। তাকে সম্মান দেখানোর জন্য তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে চাইলাম এবং কাজটা করতে গিয়ে দড়াম করে মাথায় বাড়ি খেলাম ডেকের সাথে। লেবানন থেকে আনা আসল সিডার কাঠের তৈরি ডেক, তার তুলনায় আমার মাথার খুলি কিছুই নয়। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে আবার বেঞ্চে বসে পড়লাম আমি, বাম চোখের ওপর দিয়ে রক্তের সরু ধারা গড়িয়ে। পড়তে শুরু করেছে।

আমার সামনে বসে থাকা মানুষটা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। তবে আমার মতো বোকামি করল না সে, মাথা নিচুই রাখল। নিজের মাথা থেকে লাল রঙের। কাপড়টুকু খুলে ফেলল সে, পাকিয়ে গোল আকৃতি দিল। তারপর সেটা আমার ক্ষতস্থানে চেপে ধরে চেষ্টা করতে লাগল রক্ত বন্ধ করার।

আপনিই প্রথম নন যে এখানে বাড়ি খেয়েছে, আমাকে আশ্বস্ত করল সে। ব্যথা লাগে ঠিক, তবে গুরুতর কিছু যে নয়, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারি, সম্মানিত টাইটা। এখন যেহেতু তার মুখ ঢেকে রাখা কাপড়টুকু আমার মাথার পরিচর্যায় ব্যস্ত, সেহেতু ইনি যে সত্যিই যুবরাজ রামেসিস সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ রইল না আমার মনে।

এটাই কিছুই নয় মহামান্য যুবরাজ। আমার বোকামির একটু শাস্তি পেয়েছি আর কি। রামেসিসের কাছ থেকে সহানুভূতি পেয়ে কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছি আমি, তবে একই সাথে মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুবরাজকে কাছ থেকে দেখার সুযোগটাও কাজে লাগাচ্ছি পুরোদমে।

রামেসিসের পদবি হচ্ছে নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল। নিজের কর্তব্যে সে এতই অবিচল যে, নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ সৈনিকদের ছাড়া অন্য কারো সাথে প্রায় দেখাই যায় না তাকে। তার নিজের বাবার ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। যদিও ছোটবেলায় তার সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি আমি; ড্রাগন এবং অন্যান্য দানবের খপ্পর থেকে কীভাবে সুন্দরী রাজকুমারীকে উদ্ধার করে রাজপুত্র সেই গল্প শুনিয়েছি। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছি আমরা। সম্পূর্ণভাবে নিজের বাবার প্রভাবে বড় হয়েছে রামেসিস। তারপর থেকে আর কখনো তাকে জানার সুযোগ হয়নি আমার। এখন তাই তার সাথে তার বাবা ফারাও টামোসের মিল লক্ষ্য করে অবাক না হয়ে পারলাম না আমি। এবং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই মিল তার প্রতি আমার সব সময়ের উঁচু ধারণা আরো বাড়িয়ে তুলল। সত্যি কথা বলতে, বাবার চাইতেও সুদর্শন হয়েছে সে। যদিও কথাটা ভাবতে বিবেকের একটু দংশন অনুভব করলাম আমি; কিন্তু কথাটা ঠিক।

রামেসিসের চোয়ালের গঠন আরো শক্তিশালী, দাঁতগুলো ধবধবে সাদা। তার বাবার চাইতেও সামান্য বেশি লম্বা সে; কিন্তু কোমর আরো বেশি সরু। হাত পা আরো বেশি টান টান। গায়ের রং অনেকটা যেন কড়া সোনালি; তার মা রানি মাসারার কাছ থেকে পাওয়া আবিসিনীয় রক্তের চিহ্ন। চোখগুলো আরো উজ্জ্বল, আরো বেশি গাঢ় রঙের। তাতে তীক্ষ্ণ কিন্তু একই সাথে দয়ালু এবং বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি।

মুহূর্তের মাঝেই তার প্রতি আবারও আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম আমি, যেন মাঝখানে কেটে যাওয়া এতগুলো বছরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না কখনো। তার পরবর্তী কথাগুলো যেন আমার চিন্তাকেই প্রতিফলিত করল: আমাদের মাঝে অনেক মিলই আছে টাইটা। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় মিল হলো আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া শত্রুতা। আমাদের দুজনের লাশ দেখার আগে কোনোভাবেই থামবে না ফারাও উটেরিক টুরো। আপনি ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। আমার শাস্তি এখনো প্রকাশ্যে নির্ধারিত না হলেও আপনার চাইতে আমাকে কম ঘৃণা করে না উটেরিক।

কেন? জানতে চাইলাম আমি। আপনার ভাই আপনাকে ঘৃণা করছে কেন? প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে কোনো দ্বিধা বোধ করলাম না আমি। মনে হচ্ছে যেন এই লোকটার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই, কখনো ছিল না। এর কাছে আমার কিছু লুকোনোর নেই, তেমনি আমার কাছেও কিছু লুকোনোর নেই তার।

কারণটা খুব সাধারণ। ফারাও টায়োস আপনাকে এবং আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন, তার বড় ছেলে উটেরিকের চাইতেও বেশি। এক মুহূর্ত বিরতি নিল রামেসিস, তারপর বলে চলল: আরেকটা কারণ হচ্ছে, আমার ভাই একজন উন্মাদ। তার বিকৃত মনের মাঝে বাস করা কাল্পনিক দানব আর প্রেতাত্মারা সর্বক্ষণ তাড়া করে ফেরে তাকে। নিজের চাইতে জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান যেকোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে চায় সে।

এটা কি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন? প্রশ্ন করলাম আমি। মাথা ঝাঁকাল রামেসিস।

অবশ্যই। তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব রাস্তা আছে আমার টাইটা, ঠিক যেমন আছে আপনার। গোপনে শুধু নিজের চাটুকারদের কাছেই আমার সম্পর্কে নিজের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ব্যক্ত করেছে উটেরিক।

তাহলে এখন আপনি কী করতে চান? প্রশ্ন করলাম আমি এবং রামেসিসের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা জবাবটা আমার কানে এমনভাবে বাজল, মনে হলো যেন আমি নিজেই বলেছি কথাগুলো।

ওকে খুন করার কথা আমি ভাবতেও পারব না। আমার বাবা ওকে ভালোবাসতেন, এই চিন্তাটুকুই আমার হাত থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তাই বলে সে যদি আমাকে খুন করতে আসে তাহলেও আমি চুপ করে বসে থাকব না। আজই মিশর ছেড়ে চলে যাচ্ছি আমি। শান্ত যুক্তিপূর্ণ গলায় কথা বলল সে। আপনি কি আমার সাথে আসবেন, টাইটা?

অত্যন্ত আনন্দের সাথেই আপনার বাবার সেবা করেছি আমি, জবাব দিলাম আমি। আপনার জন্যও সেটা করতে পারলে সৌভাগ্য বোধ করব। আপনিই সেই রাজপুত্র, যার ফারাও হওয়া উচিত। সামনে এগিয়ে এসে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আমার ডান হাত চেপে ধরল সে। আমি বলে চললাম, তবে আরো কিছু মানুষ আছে যারা আমার জন্য নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করেছে।

হ্যাঁ, আপনি কাদের কথা বলছেন আমি জানি, জবাব দিল রামেসিস। ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ আর তার অধীনস্ত সৈন্যরা সবাই বিশ্বাসী এবং দক্ষ লোক। তাদের সাথে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে আমার। ঠিক হয়েছে আমাদের সাথেই যাবে সবাই।

মাথা কঁকালাম আমি। তাহলে আর কোনো সমস্যা দেখছি না আমি। আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন আমিও সেখানেই যাব, প্রভু রামেসিস। যদিও সেই জায়গাটা কোথায় আমি খুব ভালো করেই জানি, এমনকি যুবরাজ নিজেও হয়তো এত ভালোভাবে জানে না। তবে এখন সে ব্যাপারে কথা বলার সময় নয়।

আবার ডেকে উঠে এলাম আমরা দুজন। দেখলাম নদীর তীরে ইতোমধ্যে রথগুলো খুলে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলেছে ওয়েনেগ আর তার লোকেরা। এখন সেই টুকরোগুলো তোলা হচ্ছে জাহাজের ডেকে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিচের মাল রাখার জায়গায়। এরপর ঘোড়াগুলোকেও জাহাজে তুলে নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পাল তোলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল মেমনন। তীর থেকে সরে এলাম আমরা, উত্তর দিকে তাক করলাম জাহাজের মুখ। পালে আছে পর্যাপ্ত বাতাস, সেইসাথে নদীর ঢেউও আমাদের অনুকূলে। তার ওপরে নীলনদের জলে ফেনা তুলছে দাঁড়িদের ছন্দবদ্ধ দাঁড় টানা। তীর গতিতে উত্তর দিকে খোলা সাগর অভিমুখে এগিয়ে চললাম আমরা; ফারাওয়ের বিষাক্ত প্রভাব থেকে অনেক দূরে।

.

দীর্ঘজীবন পাওয়ার অন্যতম প্রধান সুবিধা হচ্ছে যেকোনো ক্ষত থেকে খুব দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষমতা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমার মাথায় তৈরি হওয়া ক্ষত থেকে রক্ত বের হওয়া থেমে গেল। শুকনো চামড়া জমতে শুরু করল সেখানে। নীলনদ যেখানে ভূমধ্যসাগরে পড়েছে, সেই মোহনায় পৌঁছনোর আগেই ডুগ আর তার সঙ্গীদের অত্যাচারে আমার গায়ে তৈরি হওয়া চাবুকের দাগ এবং অন্যান্য কাটাছেঁড়াগুলো ভালো হয়ে গেল পুরোপুরি। আরো একবার পূর্ণ যুবকের মতো কান্তিময় হয়ে উঠল আমার চামড়া।

নদীপথ ধরে উত্তর দিকে সাগর অভিমুখে চলতে থাকার এই দিনগুলোতে যুবরাজ রামেসিসের সাথে আমার সম্পর্ক আবারও ঝালাই করে নেওয়ার সুযোগ পেলাম আমি।

আমাদের ওপর পরবর্তী যে সিদ্ধান্তের ভারটা নেমে এলো সেটা হচ্ছে মিশর ছাড়ার পর আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ করা। আমার মনে হচ্ছিল রামেসিস নিশ্চয়ই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে হাথোরের পাথুরে দরজার মাঝ দিয়ে যেতে চায় জাহাজ নিয়ে, ওপাশে কী আছে দেখতে চায়। কিন্তু ওপাশে কী আছে আমি খুব ভালো করেই জানি। ওপাশে আছে শুধু নিঃসীম শূন্যতা। আমরা যদি সত্যিই ওই পথে এগোনোর মতো বোকামি করি তাহলে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত দিয়ে নিচে পড়ে যাব, তারপর অনন্তকাল ধরে নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মাঝ দিয়ে কেবল পড়তেই থাকব।

এটাই যে আমাদের কপালে ঘটবে, সেটা নিশ্চিত হচ্ছ কী করে? প্রশ্ন করল রামেসিস। খুব দ্রুতই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি আমরা, সম্বোধনও বদলে গেছে।

কারণ ওই দরজা থেকে এখন পর্যন্ত কেউ ফিরে আসতে পারনি, খুব স্বাভাবিক গলায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম আমি।

সেটা কীভাবে জানো তুমি? আবারও প্রশ্ন করল ও।

ওখান থেকে ফিরে আসতে পেরেছে এমন একজনের নাম বলো তো? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম আমি।

হিসপানের স্কিভা।

এই নাম কখনো শুনিনি আমি। কে ছিল সে?

তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ভ্রমণকারী। আমার দাদার বাবার সাথে তার দেখা হয়েছিল।

কিন্তু তোমার সাথে কখনো তার দেখা হয়নি, তাই তো?

উম, না। বুঝতেই পারছ আমার জন্মের আগেই তিনি মারা গেছেন। তবে আমার বাবা আমাকে সেনেবসেনের গল্প শুনিয়েছিলেন।

তোমার বাবাকে আমি কতটা সম্মান করতাম নিশ্চয়ই তুমি জানো। তবে এই সেনেবসেনের গল্প নিয়ে তার সাথে কখনো আলোচনা করার সুযোগ হয়নি আমার। তা ছাড়া হাথোরের দরজার ওপাশে সত্যিই কী আছে সেটা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে শুনে বিশ্বাস করতে চাই না আমি, বিশেষ করে যখন সেখানে নিজে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে হচ্ছে আমাকে।

তবে সৌভাগ্যক্রমে দুই রাত পরে আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্নে দেখলাম রাজকুমারী বেকাথা এবং তেহুতি তাদের সন্তানদেরসহ ফারসিয়ান জলদস্যুদের হাতে ধরা পড়েছে। টারকুইস্ট নামে এক ভয়ানক সাগর দানবকে উৎসর্গ করার জন্য সাগরতীরে একটা পাথরের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে তাদের। পাখা আছে সেই দানবের, ফলে ইচ্ছে করলে বাতাস কেটে পাখির মতো উড়ে চলতে পারে, আবার মাছের মতো সাঁতার কাটতে পারে পানিতে। পঞ্চাশটা মুখ আছে তার, যেগুলো মানুষ খাওয়ার জন্য সর্বদা লালায়িত। সেই মুখগুলোর এক কামড়ে ভেঙে ফেলতে পারে মানুষের তৈরি যেকোনো জাহাজ।

স্বাভাবিকভাবেই রামেসিসকে এই স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে দ্বিধাবোধ করতে লাগলাম আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিশরীয় রাজপরিবারের প্রতি আমি যে পবিত্র শপথ নিয়েছি তা আমাকে পালন করতেই হবে। রামেসিস অবশ্য ভবিষ্যদ্রষ্টা এবং স্বপ্নের অর্থ ব্যাখ্যাকারী হিসেবে আমার খ্যাতির কথা অনেক আগে থেকেই জানে। স্বপ্ন সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যাটুকু চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শুনল ও, তারপর নিজে কোনো মতামত না দিয়ে চলে গেল জাহাজের সামনের ডেকে। বিকেলের বাকি সময়টুকু সেখানেই কাটাল সে। সূর্য ডোবার সময় উঠে দাঁড়িয়ে আমার কাছে ফিরে এলো এবং কোনো সময় নষ্ট না করে অল্প কথায় খুলে বলল নিজের মতামত।

আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, আমার বাবা মহান ফারাও টামোস যখন আমার দুই ফুপুকে ক্রিটের রাজা মিনোসের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য তোমার দায়িত্বে পাঠিয়েছিলেন তখন তাদের ভাগ্যে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল সেটা আমাকে খুলে বলার জন্য। আমি জানি যে তারা আমার বাবার নির্দেশ পালন করেছিলেন, মিনোসকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তার পরেই ক্রোনাস পর্বতের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে তাদের মৃত্যু হয়। আমার বাবা আমাকে এটাই বলেছিলেন। কিন্তু আমার ভাই উটেরিক তোমাকে বিশ্বাসঘাতকতা এবং মিথ্যে বলার অভিযোগে দণ্ডিত করেছে। উটেরিকের মতে ওই অগ্ন্যুৎপাতে আমার দুই ফুপু বেঁচে যান; কিন্তু তাদের স্বামী মিনোসের মৃত্যু হয়। তারপর তারা নিজেদের দায়িত্ব অনুযায়ী মিশরে ফিরে না এসে জারাস এবং হুই নামের দুই দলত্যাগী সৈনিকের সাথে অদৃশ্য হয়ে যান। উটেরিকের এই কথাগুলোকে আমি পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু এখন তোমার এই স্বপ্ন যেন তাদের বেঁচে থাকার দিকেই ইঙ্গিত করছে। কথা থামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল ও। সত্যি কথাটা বলো আমাকে টাইটা। আসলে কী ঘটেছিল আমার দুই ফুপুর ভাগ্যে?

কিছু অসুবিধা ছিল সে সময়, প্রশ্নটার জবাব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম আমি।

এটা কোনো জবাব হলো না, বলে উঠল রামেসিস। অসুবিধা ছিল বলতে আসলে কী বোঝাতে চাইছ তুমি?

তার চেয়ে বরং তোমাকে আরেকটা উদাহরণ দিই, রামেসিস।

মাথা ঝাঁকাল ও। বলো। আমি শুনছি।

মনে করো মিশরের রাজপরিবারের এক রাজপুত্র হঠাৎ জানতে পারল বর্তমান ফারাও অর্থাৎ তার বড় ভাই তাকে কোনো কারণ ছাড়াই খুন করতে চায়। ফলে দেশে থেকে প্রাণ হারানোর চাইতে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সে। এটাকে কি তুমি কর্তব্যের অবহেলা বলে ধরবে? প্রশ্ন করলাম আমি। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল রামেসিস। সামনে-পেছনে দুলছে মৃদু মৃদু যেন কী বলবে ঠিক করতে পারছে না।

শেষ পর্যন্ত জোরে জোরে কয়েকবার মাথা ঝাঁকাল ও, যেন চিন্তাভাবনাগুলো পরিষ্কার করতে চাইছে। মৃদু গলায় বলল, তুমি জানতে চাইছ এই ধরনের পরিস্থিতিকে আমি ব্যতিক্রম বলে স্বীকার করব কি না?

হ্যাঁ। করবে?

আমার মনে হয় সেটাই উচিত হবে, স্বীকার করল ও এবং হেসে ফেলল।

ইতোমধ্যে কাজটা করে ফেলেছি আমি।

সুযোগ চিনতে ভুল করলাম না আমি। বেশ। এবার তাহলে তোমার দুই ফুপুর কথা বলি। অত্যন্ত ভালো মেয়ে ছিল তারা, সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং অত্যন্ত অনুগত। তোমার বাবা তাদের ক্রিটে পাঠিয়েছিলেন মিনোসের স্ত্রী হতে। তাদের অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আমাকে। তোমার বাবা এবং মিশরের প্রতি নিজেদের কর্তব্য খুব ভালোভাবেই পালন করেছিল তারা। যদিও তাদের দুজনেরই ভালোবাসার মানুষ ছিল, তবু মিনোসকে বিয়ে করে তারা। তারপর যখন ক্রোনাস পর্বতের অগ্ন্যুৎপাতে মিনোস মারা গেলেন তখন হঠাৎ করে মুক্তি মিলে গেল তাদের। তখন তারা তাদের প্রেমিকদের সাথে পালিয়ে যায় এবং তাদের আটকানোর বদলে আমি বরং সাহায্য করি এই কাজে।

আমার কথাগুলো শুনতে শুনতে বিস্ময়ের মাত্রা উত্তরোত্তর বাড়ছে রামেসিসের। তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ। তোমার দুই ফুপুই এখনো বেঁচে আছে, বললাম আমি।

সেটা তুমি কীভাবে জানো? জানতে চাইল ও।

কারণ মাত্র মাসখানেক আগেই তাদের স্বামীদের সাথে কথা হয়েছে আমার। আমার ইচ্ছে তুমি ওদের সাথে দেখা করো। ইচ্ছে করলে ছদ্মবেশেও থাকতে পারো তুমি। টামোসের পরিবারের সদস্য নয়, স্রেফ মেমননের ক্যাপ্টেন হিসেবে। একমাত্র তাহলেই তোমার নিজের পালিয়ে আসার সিদ্ধান্তের সাথে ওদের সিদ্ধান্তের তুলনা করতে পারবে তুমি, বুঝতে পারবে ওরা সঠিক কাজটা করেছি কি না।

তার পরেও যদি আমার ধারণায় কোনো পরিবর্তন না আসে?

তাহলে তোমার সাথে হাথোরের দরজা পর্যন্ত যাব আমি, জাহাজ নিয়ে পৃথিবীর কিনার থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ব অসীমের মাঝে।

উচ্চ স্বরে হেসে উঠল রামেসিস। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিতে পারল। হাসির চোটে চোখ থেকে বেরিয়ে আসা পানি মুছে জানতে চাইল, এই দুই রহস্যময় মহিলাকে কোথায় পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই জানো তুমি?

জানি।

তাহলে পথ দেখাও, আমন্ত্রণ জানাল ও।

*

দুই দিন পর আর তেমন কোনো দেরি ছাড়াই নীলের অববাহিকায় এসে পৌঁছলাম আমরা। হিকসস নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, এখন আর এমন কোনো জাহাজ নেই যা আমাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারে। মেমনন নামের মানুষটি যেমন ভূভাগের ওপর একচ্ছত্র রাজত্ব করে গেছে তেমনি একই নামের জাহাজটাও জলপথে বিস্তার করেছে পূর্ণ আধিপত্য। আমাদের সামনে এখন ভূমধ্যসাগরের বিশাল জলরাশি। নীলনদের সাতটি মুখের মাঝে সবচেয়ে বড় যে মুখ সেই ফাতনিক অববাহিকা দিয়ে সাগরে প্রবেশ করলাম আমরা। বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় আরো একবার জাহাজ নিয়ে চড়তে পেরে আনন্দে ভরে উঠল আমার মন।

আমি জানি উত্তরমুখী যে পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তাতে হয়তো বেশ কয়েক দিন, এমনকি সপ্তাহখানেক পর্যন্ত ডাঙার কোনো চিহ্ন না দেখেই থাকতে হবে আমাদের। বছরের এই সময়টায় খুব সম্ভব সূর্যও দীর্ঘ সময় মেঘে ঢাকা থাকবে। এবং এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ চালানো সত্যিই খুব কঠিন। তাই রামেসিসকে আমার জাদুর মাছটা দেখাব বলে ঠিক করলাম। বহু বছর আগে এক আফ্রিকান ওঝা আমাকে এই জিনিসটা দিয়েছিল। সাপের কামড় থেকে তার বড় ছেলেকে বাঁচিয়েছিলাম আমি। এটা তার কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ দেওয়া উপহার।

এই জাদুর মাছটা তৈরি করা হয়েছে একধরনের বিরল ভারী এবং কালো পাথর খোদাই করে, যে পাথর শুধু নীলের শেষ প্রপাতের ওপরে ইথিওপিয়াতেই পাওয়া যায়। উপজাতীয়দের কাছে এর নাম বাড়ি ফেরার পাথর, কারণ এর সাহায্যে তারা বাড়ি ফেরার পথ নির্ণয় করে। কালো উপজাতীয়দের জ্ঞানকে অনেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ঠিক; কিন্তু আমি তাদের মাঝে নই।

মার জাদুর মাছটা লম্বায় হবে আমার কড়ে আঙুলের সমান, তবে একেবারেই সরু। যখন প্রয়োজন হয় তখন পাথরটাকে আমি নৌকার মতো করে খোদাই করা এক টুকরো কাঠের সাথে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিই। তারপর মাছসহ ছোট্ট নৌকাটাকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় পানিভর্তি একটা গোল পাত্রে। পাত্রটা অবশ্যই কাঠের তৈরি হতে হবে এবং তার গায়ে থাকতে হবে উজ্জ্বল রঙে আঁকা নানা রকম রহস্যময় আফ্রিকান নকশা। এর পরেই আসে জাদুর অংশটুকু। পাথরের মাছটা ধীরে ধীরে; কিন্তু নিশ্চিতভাবেই উত্তরমুখী হয়ে ঘুরে যায়, জাহাজের মুখ যেদিকেই ঘোরানো থাকুক না কেন। যাত্রার এই পর্যায়ে এসে মেমননের নাক কেবল সামান্য বামে ঘুরিয়ে দিতে হলো আমাদের, যেদিকে মাছটা নির্দেশ করছিল। দিন হোক বা রাত, এই মাছের জাদু কখনো ব্যর্থ হয় না। যখন ফেরার সময় হবে তখন মেমননের নাকটা ঠিক উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলেই হবে, অবশ্য তার আগে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে মিশরে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে আমাদের জন্য।

ছোট্ট মাছটা দেখে অবজ্ঞায় নাক কুঁচকাল রামেসিস। আর কী কী করতে পারে এটা? প্রশ্ন করল সে। দেবতাদের প্রশস্তি গাইতে পারে? এক পাত্র ভালো মদ এনে দিতে পারে আমাকে? অথবা এমন একটা মেয়েকে দেখিয়ে দিতে পারে যার শরীরে মধুর স্বাদ পাওয়া যায়? প্রশ্নগুলো শুনেও না শোনার ভান করলাম আমি।

খোলা সাগরে নামার পর প্রথম রাতে সম্পূর্ণভাবে মেঘে ঢাকা রইল আকাশ। কোনো সূর্য চাঁদ বা তারা নেই, যা দেখে পথ নির্দেশ করা যায়। নিশ্চিদ্র অন্ধকারে কেবল বাড়ি ফেরার পাথরের নির্দেশ অনুসরণ করে সারা রাত জাহাজ চালালাম আমরা। ভোর হওয়ার অনেক আগেই আমরা দুজন ডেকের ওপর উঠে পড়লাম, তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলোয় তাকিয়ে রইলাম কাঠের পাত্রে ভাসমান মাছটার দিকে। আমার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নানা রকম কৌতুক করে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করল রামেসিস। কিন্তু দিনের আলো ফোঁটার পর যখন আকাশের মেঘ কেটে গেল তখন মেমনন এবং আমার ছোট্ট মাছটা সেই একই হালকা পশ্চিম ঘেঁষে উত্তর দিকে মুখ করে আছে দেখে বিস্ময়ের সীমা রইল না তার।

এ তো আসলেই জাদু, তৃতীয় দিন সকালেও একই ঘটনা ঘটার পর ওকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম আমি। তারপর চতুর্থ দিন সকালে দিগন্তের ওপর সূর্যের জ্বলন্ত দেহটা উঁকি দেওয়ার সাথে সাথে এক নতুন দৃশ্য দেখা গেল। আমাদের জাহাজের ঠিক নাক বরাবর পাঁচ লিগ সামনে দেখা যাচ্ছে ক্রিট দ্বীপের ঝলসানো চেহারা।

অনেক বছর আগে আমি যখন প্রথম এই দ্বীপের ওপর দৃষ্টি রেখেছিলাম তখন দ্বীপের পাহাড়গুলো ছিল সবুজ ঘন জঙ্গলে ঢাকা। দ্বীপের কিনারে গড়ে উঠেছিল বিরাট বিরাট সব শহর আর বন্দর, দেখেই বোঝা যেত যে পৃথিবীর মাঝে অন্যতম ঐশ্বর্যশালী এক দেশ এটা। দ্বীপের চারপাশের পানিতে সব সময় ভিড় করে থাকত মালবোঝাই জাহাজ আর রণতরীর দল। এখন সেই শহর বা জঙ্গল কোনোটাই নেই, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেবতা ক্রোনাসের আগ্নেয় নিঃশ্বাসে। যে পাহাড়ের নিচে তার ছেলে দেবতা জিউস তাকে আটকে রেখেছিলেন, প্রচণ্ড ক্রোধে সেই পাহাড়কেই এক তীব্র অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস করে দিয়েছেন তিনি। সেই পাহাড়টা এখন সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে পানির তলায়, কোনো চিহ্নই আর নেই তার। গতিপথ একটু বদলে নিয়ে দ্বীপের যথাসম্ভব কাছ দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। কিন্তু দ্বীপের বুকে এমন কিছুই চোখে পড়ল না, যা পরিচিত মনে হয়। এতগুলো বছর পরেও বাতাসে গন্ধকের কটু গন্ধ, তার সাথে মিশেছে মরা পশুপাখি আর মাছের দুর্গন্ধ। অথবা কে জানে এটা হয়তো স্রেফ আমার কল্পনাশক্তি আর শক্তিশালী ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কারণে হচ্ছে। তবে এমনিতেও আমাদের জাহাজের খোলের নিচে যে জলভাগ তাতে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে না। পানির নিচে যে প্রবাল প্রাচীর ছিল তা অনেক আগেই উঁচু তাপমাত্রার আগে মারা গেছে। এমনকি রামেসিস আর তার নাবিকরা যারা আগে কখনো এদিকে আসেনি তারাও এই পরিপূর্ণ ধ্বংসের করাল রূপ দেখে নিশ্চুপ হয়ে গেছে।

মানুষের সকল চেষ্টা, সকল সংগ্রামই যে দেবতাদের সামনে তুচ্ছ, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, ফিসফিসে গলায় বলে উঠল রামেসিস। এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে যেতে হবে আমাদের। দেবতা ক্রোনাসের প্রলয়ংকর ক্রোধের সামনে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।

সুতরাং এবার দাঁড় বাওয়ার গতি বাড়াতে নির্দেশ দিলাম প্রধান দাঁড়িকে। আরো উত্তরে গ্রিসীয় সাগরে এসে পড়েছি আমরা। এখনো আমাদের অভিমুখ সেই হালকা পশ্চিম ঘেঁষে উত্তরে।

আমার জন্য এদিককার সাগর একেবারেই অপরিচিত। ক্রিটের বেশি সামনে কখনো আসিনি আমি। কয়েক দিনের মাঝেই আগ্নেয়গিরির অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দ্বীপের পাশ কাটিয়ে এলাম আমরা। আবার আগের মতো শান্ত বন্ধুর মতো চেহারা ধারণ করল সাগর। রামেসিসের মস্তিষ্ক অত্যন্ত ধারাল, শেখার আগ্রহ প্রবল। এবং এতে বরং খুশিই হলাম আমি। আমার কাছ থেকে, বিশেষ করে নিজের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চাইল সে, যেটা সম্পর্কে আমার জ্ঞান প্রচুর। ফারাওদের চারটি প্রজন্মের পাশে সশরীরে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সেই জ্ঞান এখন খুশিমনেই রামেসিসের সাথে ভাগ করে নিলাম আমি।

তাই বলে মিশরের ইতিহাসে আমরা এত বেশি ডুবে যাইনি যে দায়িত্বে অবহেলা করব। সবচেয়ে শক্তিশালী রণতরীর পরিচালক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সত্যিই অনেক। অতীত নিয়ে আলোচনায় আমরা যতটা সময় দিলাম তার চাইতে অনেক বেশি সময় দিলাম ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। এমন একটা জাহাজের জন্য যেটা স্বাভাবিক, প্রতিটি নাবিককে রামেসিস নিজের হাতে বাছাই করেছে। আমার চোখেও তাদের কাজের কোনো খুঁত ধরা পড়ল না। তবে আমি বরাবরই যেকোনো কিছুকে নিখুঁতের চাইতেও নিখুঁত করে তুলতে আগ্রহী। নিজের লোকদের কঠোর প্রশিক্ষণ দিতে লাগল রামেসিস এবং আমিও সেই প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ পর্যায় নিশ্চিত করতে তাকে সাহায্য করলাম।

সবচেয়ে দক্ষ সেনানায়কদের অন্যতম প্রধান গুণ হচ্ছে বিপদ অথবা শত্রুর অবস্থান বোঝার মতো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দখল রাখা। ক্রিট দ্বীপ ছাড়িয়ে আসার পর তৃতীয় দিন দুপুরে আমিও সেই অদ্ভুত অস্বস্তিটা বোধ করতে লাগলাম। বিকেলের প্রায় পুরোটা সময় দিগন্তের আনাচকানাচে খুঁজে খুঁজে কাটালাম আমি সামনে এবং পেছনে দুদিকেই। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি মনের গভীর থেকে উঁকি দেওয়া এই অজানা অস্বস্তিকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। তারপর দেখলাম অস্বস্তিতে শুধু আমি একা ভুগছি না। রামেসিসও অস্থির হয়ে উঠছে, যদিও আমার মতো দক্ষভাবে সেটা চাপা দিতে পারছে না। তবে এটাও ঠিক যে, আমার চাইতে ওর অভিজ্ঞতা অনেক কম। শেষ বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিম-দিগন্ত থেকে আর হাতখানেক ওপরে মাত্র তখন নিজের তলোয়ার আর শিরস্ত্রাণ নামিয়ে রেখে মাস্তুল বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে গেল রামেসিস। দেখলাম বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমাদের ফেলে আসা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল ও। একসময় নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না আমি। অস্ত্র এবং বর্ম খুলে নামিয়ে রাখলাম, তারপর এগিয়ে গেলাম মাস্তুলের গোড়ার দিকে। ইতোমধ্যে অন্য নাবিকরা, বিশেষ করে যারা দাঁড় বাইছে তারা বেশ আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। প্রধান ডেক থেকে মাস্তুলের মাথায় কাকের বাসায় উঠে এলাম আমি। ঝুড়িতে নড়েচড়ে বসে আমার জন্য জায়গা করে দিল রামেসিস, যদিও এই ছোট্ট জায়গায় দুজন দাঁড়ানো বেশ মুশকিল। কিছু না বলে কেবল কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ও।

এখনো কোনো চিহ্ন দেখা গেছে তার? নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলাম আমি।

অবাক হয়ে গেল রামেসিস।

কার চিহ্ন? প্রশ্ন করল ও।

ওই যে, যে আমাদের পিছু নিয়েছে, জবাব দিলাম আমি। মৃদু স্বরে হেসে উঠল রামেসিস। তাহলে তুমিও আন্দাজ করতে পেরেছ। আস্ত একটা বুড়ো শয়তান তুমি, টাইটা।

আমি যদি বোকা হতাম তাহলে এই বয়স পর্যন্ত পৌঁছতে পারতাম না যুবক।

কেউ আমাকে বুড়ো বললে সেটা আমার ভালো লাগে না।

হাসি থামাল রামেসিস। তোমার কী মনে হয়? কে আমাদের পিছে লেগেছে?

আগের চাইতে চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল ও।

এই উত্তর সাগর হচ্ছে মানুষের রক্তে হাত রাঙানো প্রত্যেকটা জলদস্যুর আখড়া। তাদের মাঝে নির্দিষ্ট করে কোনো একজনের কথা কি বলা সম্ভব?

আমাদের চোখের সামনে অলস ভঙ্গিতে দিগন্তে ডুব দিতে শুরু করল সূর্য। তবে দিগন্তরেখার কোথাও জীবনের বা নড়াচড়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না যতক্ষণ না…

ওই যে! দুজন এক সাথে চেঁচিয়ে উঠলাম আমরা।

সূর্যটা সমুদ্রের মাঝে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে গাঢ় হয়ে আসা পানির ওপর এক ঝলক উজ্জ্বল সোনালি আলো ছুঁড়ে দিল। আমরা দুজনই বুঝতে পেরেছি যে ওটা আসলে আমাদের পেছনে যে জাহাজটা লেগেছে তার পালে সূর্যের আলোর প্রতিফলন, আর কিছু নয়।

খুব সম্ভব আমাদের ওপর হামলা চালানোর ফন্দি আঁটছে ওরা, না হলে এমন চোরের মতো আসবে কেন? নিশ্চয়ই আশা করছে যে সূর্য ডোবার পরে আমরা পাল খাটো করে ফেলব বা নামিয়ে রাখব। তাই আমাদের পাশ কাটিয়ে যেন চলে না যায় এই ভয়ে গতি কমিয়ে রেখেছে। অন্ধকারের মাঝে কোনো জানান না দিয়ে নিঃশব্দে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেছে ব্যাটা, আন্দাজ করলাম আমি। তাহলে বরং আমরাই ওদের একটু চমকে দেওয়ার বুদ্ধি করি।

তোমার পরামর্শ কী টাইটা? নীলনদের বুকে অন্য জাহাজের সাথে নৌযুদ্ধে অভ্যস্ত আমি; কিন্তু এমন খোলা সাগরে আগে কখনো যুদ্ধ করিনি। তাই এখন তোমার নির্দেশই মেনে চলব আমি।

জাহাজের খোলে একটা বাড়তি পাল দেখেছিলাম আমি। ওটা কোথায়?

ওহ কালো রঙের পালটার কথা বলছ তুমি। রাতের বেলায় ওটা বেশ কাজে আসে, বিশেষ করে আমরা যখন শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিতে চাই।

এখন ঠিক ওই পালটাই আমাদের দরকার, বললাম আমি।

দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর জাহাজের গতিপথ সম্পূর্ণ সমকোণে ঘুরিয়ে নিলাম, এবং এই অবস্থায় পাল তুলে দিয়ে চললাম প্রায় এক মাইল পথ। এবার জাহাজ থামিয়ে সাদা পাল বদলে তুলে দিলাম কালো পাল। সম্পূর্ণ অন্ধকারে করতে হলো কাজটা, এবং যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতে বেশি সময় লেগে গেল। তবে শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের মতো মিশমিশে কালো পাল টাঙিয়ে আবার আগের গতিপথে ফেরত আসতে পারলাম আমরা। এই কাজটা সম্ভব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখল আমার সেই জাদুর মাছ, এবং মাঝে মাঝে মেঘের মাঝে জ্বলে ওঠা বিদ্যুৎশিখা।

আমি আশা করছিলাম যে অন্য জাহাজটা আমাদের আগের গতিপথই অনুসরণ করছে, এবং আমরা যখন পাল বদলাচ্ছিলাম তখন সেটা পার হয়ে সামনে চলে গেছে। ওই জাহাজের নাবিকরা নিশ্চয়ই অধীর হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে এখন, জানেই না যে আমরা ওদের পেছনে চলে এসেছি। আমাদের ধরার জন্য নিশ্চয়ই জলদস্যুদের নেতা তার জাহাজের সবগুলো পাল উড়িয়ে দিয়েছে, তাই রামেসিসকেও একই কাজ করতে নির্দেশ দিলাম আমি। তীরবেগে অন্ধকার চিরে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল মেমনন। জাহাজের নাক বরাবর দুই পাশ থেকে উঠে আসছে ঢেউয়ের ফেনা, বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের। আমাদের প্রত্যেকটা নাবিক সম্পূর্ণ সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সময় কেটে যাওয়ার সাথে সাথে দুই জাহাজের অবস্থান নিয়ে মনে মনে যে হিসাব কষেছিলাম সেটা কতটা নির্ভুল তাই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলাম আমি।

তারপর একেবারে হঠাৎ করেই যেন রাতের বুক চিরে আমাদের সামনে বেরিয়ে এলো জলদস্যুদের জাহাজটা। তড়িঘড়ি করে একবার চিৎকার করে সাবধান করে দিলাম দাঁড়িদের। তার পরেই একেবারে আমাদের কাছে চলে এলো জাহাজটা। আরো একবার বিদ্যুৎ চমকাল, সেই আলোতে দেখলাম জাহাজটা পাশ ফিরে আছে। আন্দাজ করলাম জলদস্যুদের নেতা নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছিল যে আমাদের পেছন থেকে হামলা করা সম্ভব নয়, কারণ অন্ধকারে আমাদের পাশ কাটিয়েই চলে গেছে সে। এখন তাই জাহাজ ঘুরিয়ে আবার উল্টো পথে ফিরে এসে আমাদের খুঁজে বের করতে চাইছিল। এই মুহূর্তে একটা কাঠের গুঁড়ি মতো আড়াআড়ি হয়ে মেমননের সামনে ভাসছে জাহাজটা। পূর্ণ গতিতে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের জাহাজ। মেমননের গলুই অত্যন্ত ধারালো সন্দেহ নেই, যে জলদস্যুদের জাহাজটাকে দুই টুকরো করে ফেলতে পারবে মাঝ থেকে। কিন্তু তাতে আমাদের নিজেদের জাহাজের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও ষোলো আনা।

শুধু জাহাজ চালানোয় রামেসিসের দক্ষতা আর অন্য নাবিকদের প্রশিক্ষণের কারণেই সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হলো। তেমন কিছু হলে দুটো জাহাজই ধ্বংস হতো, সাগরের তলায় আশ্রয় হতো আমাদের সবার। একেবারে শেষ মুহূর্তে কোনোমতে মেমননের নাক ঘুরিয়ে ফেলতে পারল সে, ফলে আমাদের গলুইয়ের বদলে পেট দিয়ে অপর জাহাজকে বাড়ি মারল আমাদের জাহাজ। তার পরেও ধাক্কাটা এত তীব্রভাবে লাগল যে জলদস্যুদের জাহাজের প্রত্যেকটা নাবিক উল্টেপাল্টে পড়ে গেল। তাদের মাঝে এমনকি জাহাজের ক্যাপ্টেন আর প্রধান দাঁড়িকেও দেখা গেল। এদিক-ওদিক এলোমেলোভাবে পড়ে রইল তারা, বেশির ভাগই হয় আহত বা দারুণ ব্যথা পেয়েছে। যে দুই-একজন নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারল তারাও সংঘর্ষের ফলে অস্ত্র হারিয়ে ফেলেছে, ফলে আত্মরক্ষা করার কোনো উপায় নেই তাদের কাছে।

ওদিকে মেমননের বেশির ভাগ নাবিকই আগে থেকে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল। ফলে সংঘর্ষের আগেই বিভিন্ন জিনিস আঁকড়ে ধরে নিজেদের রক্ষা করেছে তারা। তবে কয়েকজন অবশ্য ধাক্কার ঝাঁকুনিতে মেমননের ডেক থেকে দস্যুদের জাহাজে গিয়ে পড়ল। তাদের মাঝে আমি একজন। নিজের চেষ্টায় পতনের গতিরোধ করতে পারব না বুঝতে পেরে সামনে সবচেয়ে নরম যে জিনিসটা পেলাম সেটাকেই বেছে নিলাম এবং সামনে এগিয়ে গেলাম। জিনিসটা ছিল দস্যু জাহাজের ক্যাপ্টেন। দুজন জড়াজড়ি করে জাহাজের ডেকে গড়িয়ে পড়লাম আমরা, কয়েক গড়ান দিয়ে তবে থামলাম। তবে আমি থাকলাম ওপরে, ক্যাপ্টেনের বুকের ওপর বসা অবস্থায়। হুট করে জাহাজ বদল করতে হওয়ায় তলোয়ারটা হারিয়ে ফেলেছি, তাই সাথে সাথে ব্যাটাকে খুন করতে পারলাম না। তবে তাতে বোধ হয় সুবিধাই হলো, কারণ প্রায় সাথে সাথেই লোকটা কাতর সুরে গুঙিয়ে উঠে মাথার শিরস্ত্রাণের মুখাবরণটা সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আরো একটা বজ্রপাতের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠল তার চেহারা।

*

সেথের দুর্গন্ধময় পশ্চাদ্দেশের কসম! তুমি এখানে কী করছ অ্যাডমিরাল হুই? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি।

আমার ধারণা তোমার আর আমার কাজ এখানে একই প্রিয় টাইটা। কিছু বাড়তি টাকা কামিয়ে নিচ্ছি আর কী, যন্ত্রণাকাতর গলায় জবাব দিল সে, দম ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল, এবার আমার বুকের ওপর থেকে সরো দেখি। তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি, তারপর আমাদের এই সময়োচিত পুনর্মিলন উদ্যাপন করার জন্য একটু খাঁটি ল্যাসিডিমনের লাল মদ নিয়ে আসি।

দুই জাহাজের নাবিকদের নিজেদের জায়গামতো ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বেশ সময় লেগে গেল। সেইসাথে আহতদের পরিচর‍্যা আর দ্বিতীয় জাহাজের পানি সেচার যন্ত্র চালু করতেও আরো কিছু সময় নষ্ট হলো। সংঘর্ষে আমাদের চাইতে ওদের জাহাজটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি, এবং পানি সেচে না ফেললে ডুবেই যাবে।

সব ঝামেলা শেষ হওয়ার পর রামেসিসের সাথে হুইয়ের পরিচয় করিয়ে দিলাম আমি। তবে রামেসিস যে মিশরের সিংহাসনের পরবর্তী সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী এটা আর বললাম না, শুধু বললাম যে সে এই জাহাজের ক্যাপ্টেন। তারপর হুইকে পরিচয় করালাম রামেসিসের সাথে; তবে তার ফুপা হিসেবে নয় বরং ল্যাসিডিমন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল এবং শখের জলদস্যু হিসেবে।

দুজনের বয়সে বেশ বড় ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দারুণ মিল হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমরা যখন লাল মদের দ্বিতীয় পাত্রটা ধরেছি তখন দুজন পুরনো দোস্তের মতো গালগল্প জুড়ে দিয়েছে।

দুই জাহাজের সব ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে, এবং আহতদের ক্ষতস্থান সেলাই আর ভাঙা হাড় জোড়া দিতে দিতে সারা রাত এবং পরের দিনের বেশির ভাগ অংশ পার হয়ে গেল। সব কাজ শেষ হওয়ার পর ল্যাসিডিমনের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত গিথিয়ন বন্দরের দিকে আমরা যখন রওনা দিলাম, মেমননকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল হুই। ওই জাহাজের নাম সে রেখেছে বেকাথা, তার স্ত্রীর নামে।

রামেসিসকে মেমননের দায়িত্বে রেখে বেকাথায় উঠে এলাম আমি, যাতে চুপি চুপি হুইকে আমাদের এই হঠাৎ আবির্ভাবের কারণটা খুলে বলা যায়। চুপচাপ আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে গেল সে এবং সব শেষ হতে হঠাৎ মৃদু স্বরে হেসে উঠল।

এতে হাসির কী হলো? জানতে চাইলাম আমি।

আরো খারাপ কিছুও ঘটতে পারত তোমার ভাগ্যে।

কীভাবে একটু বলো দেখি? এখন আমি নির্বাসিত, নিজের মাতৃভূমিতে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই আমার। ঢুকলেই মৃত্যু। সেইসাথে নিজের সব জমিজমা আর সম্মানের আসনও হারিয়েছি। মিশর ছেড়ে পালিয়ে আসার পর এই প্রথমবারের মতো নিজের দুরবস্থা নিয়ে একটু দুঃখ প্রকাশ করার সুযোগ পেলাম আমি। প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল আমার।

আর যাই হোক নির্বাসিত হলেও তুমি এখনো অনেক ধনী এবং সবচেয়ে বড় কথা, এখনো বেঁচে আছ, আমাকে মনে করিয়ে দিল হুই। এর জন্য রাজা হুরোতাসকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত তোমার।

এই নামের মালিককে মনে করতে এক মুহূর্ত সময় লেগে গেল আমার। এখনো মাঝে মাঝে শুধু জারাস ছাড়া অন্য কোনো নামে তাকে মনে করতে পারি না আমি। তবে হুই ঠিকই বলেছে। আমি এখনো একজন ধনী মানুষ, কারণ হুরোতাস আমার প্রাপ্য সেই বিশাল সম্পদের অংশটুকু নিরাপদে পাহারা দিয়ে রেখেছে। তা ছাড়া প্রায় তিন দশকের বিচ্ছেদের পর অবশেষে আমি আমার প্রিয় দুই রাজকুমারীর দেখা পেতে যাচ্ছি।

হঠাৎ করেই আবার উল্লসিত বোধ করতে শুরু করলাম আমি।

*

ল্যাসিডিমনের প্রথম যে জিনিসটার ওপর আমার চোখ পড়ল তা হচ্ছে ট্যাগেটাস পর্বতমালার চূড়াগুলো। এক একটা যেন ড্রাগনের দাঁতের মতো ধারালো আর চোখা, হেডিস প্রণালির মতো খাড়া। যদিও এখন বসন্তের শুরু; কিন্তু চূড়াগুলোর L, মাথায় এখনো ঝলমল করছে বরফ।

আমরা যতই সামনে এগিয়ে গেলাম ততই সাগরের বুক চিরে আরো ওপরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তারা। দেখলাম পাহাড়ের অপেক্ষাকৃত নিচু ঢালগুলোতে জন্মেছে সুউচ্চ সব গাছের ঘন জঙ্গল। আরো কাছে আসার পর সাগরের বেলাভূমি চোখে পড়ল আমাদের, বাদামি পাথরের প্রাকৃতিক দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত। একের পর এক ঢেউ এসে ফেনা তুলে সগর্জনে আছড়ে পড়ছে তাদের ওপর, যেন কোনো দুর্গের প্রাচীরে হামলা চালাচ্ছে প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের সারি।

অনেক লিগ চওড়া একটা উপসাগরের মুখে প্রবেশ করলাম আমরা। এই হচ্ছে গিথিয়ন উপসাগর। এখানে অবশ্য ঢেউগুলো আরো শান্ত, অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট। তীরের আরো কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল এখান থেকে। পাহাড় থেকে নেমে আসা একটা নদীর চওড়া মুখের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল আমাদের জাহাজ।

এর নাম হুরোতাস নদী, আমাকে জানাল হুই। তোমার খুব পরিচিত একজনের নামে রাখা হয়েছে এই নাম।

তার রাজধানী কোথায়? প্রশ্ন করলাম আমি।

এখান থেকে প্রায় চার লিগ ভেতরে, জবাব দিল হুই। ইচ্ছে করেই সাগরের তীর থেকে দূরে জায়গাটাকে তৈরি করেছি আমরা, যাতে অনাকাক্ষিত অতিথিদের এড়িয়ে থাকা যায়।

তাহলে তোমাদের নৌবাহিনী কোথায় থাকে? তোমাদের নৌশক্তির যে নিদর্শন আমি দেখেছি, এতগুলো যুদ্ধজাহাজকে লুকিয়ে রাখা তো সত্যিই খুব কঠিন।

ভালো করে তাকিয়ে দেখো টাইটা, বলল হুই। তোমার চোখের সামনেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে জাহাজগুলোকে।

অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আমার চোখের দৃষ্টি; কিন্তু হুই কীসের কথা বলছে তা বেশ কষ্ট করেও বুঝে উঠতে পারলাম না। ফলে বেশ বিরক্ত হয়ে উঠলাম মনে মনে। কেউ আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করলে সেটা আমার মোটেই পছন্দ হয় না। হুইও নিশ্চয়ই ব্যাপারটা বুঝতে পারল, কারণ আমাকে একটা সূত্র ধরিয়ে দিল সে। ওইখানটায় দেখো, যেখানে পাহাড়গুলো সাগরের সাথে মিশেছে, বলল সে। তারপর অবশ্য পুরো ব্যাপারটা যেন লাফ দিয়ে উঠে এসে ধরা দিল আমার চোখে। একটু আগে তীরের ওপর ছড়িয়ে থাকা কিছু মরা গাছ দেখেছিলাম আমি ওখানে। এখন বুঝতে পারছি গাছগুলো আসলে স্বাভাবিক গাছের তুলনায় খুব বেশি সোজা আর লম্বা, এবং ডালপালাও নেই।

ওগুলো কি যুদ্ধজাহাজের মাস্তুল নয়? কিন্তু জাহাজের খোল কোথায় গেল? তোমরা কি তীরের ওপর তুলে রেখেছ জাহাজগুলোকে?

দারুণ বলেছ, টাইটা! সোল্লাসে আমার প্রশংসা করল হুই, ফলে তার শিশুসুলভ আচরণের ফলে আমার মনে যে বিরক্তি জেগে উঠেছিল তা কিছুটা হলেও কমে গেল। জাহাজগুলোকে লুকিয়ে রাখার জন্য বন্দরের সামনে একটা দেয়াল বানিয়েছি আমরা। ওগুলোর খোল দেয়ালের ওপাশে থাকায় দেখতে পাচ্ছ না তুমি। এবং মাত্র কয়েকটা জাহাজের মাস্তুল এখনো তুলে রাখা হয়েছে। বেশির ভাগেরই মাস্তুল নামিয়ে ফেলেছি আমরা, ফলে ওগুলোকে খুঁজে বের করা এখন আরো কঠিন।

সত্যিই বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া হয়েছে কাজটায়, স্বীকার করলাম আমি।

এবার ওই লুকোনো বন্দরের দিকে এগিয়ে গেল আমাদের জাহাজ, মেমনন রইল পিছে পিছে। গায়ের জোরে তীর ছুড়লে যত দূরে যায়, বন্দরের দেয়াল থেকে তার অর্ধেক দূরত্বে রয়েছি আমরা; এই সময় হঠাৎ করেই প্রবেশপথটা ধরা দিল আমাদের চোখে। সাগরের দিক থেকে যেন বোঝা না যায় সে জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে ওটাকে। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে পাল নামিয়ে ফেললাম আমরা, তার বদলে দাঁড়ের শক্তির ওপর নির্ভর করলাম বাকি পথটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য। বেশ ঘোরালো একটা পথ পাড়ি দিয়ে শেষ মোড়টা পার হতেই ভেতরের বন্দরটা আমাদের সামনে ভেসে উঠল। পুরো ল্যাসিডিমন নৌবাহিনী এখানে দেয়ালের সাথে বাঁধা রয়েছে। গোপন এই বন্দরের মাঝে চলছে পুরোদস্তুর কর্মব্যস্ততা। প্রতিটি জাহাজে নাবিকরা সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নিতে দারুণ ব্যস্ত; পাল এবং খোলের মেরামতি করছে কেউ কেউ, বাকিরা খাবার পানি, যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্রের বোঝা জাহাজে তুলছে।

তবে আমাদের জাহাজ দুটো বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে হঠাৎ করেই যেন থেমে গেল সব কিছু। তীরে দাঁড়ানো লোকগুলোর মাঝে গুঞ্জনের সৃষ্টি হলো মেমননকে দেখে। এর আগে তারা কখনো এমন একটা জাহাজকে দেখেছে কি না সন্দেহ। কিন্তু তার পরেই এমন একটা ব্যাপার ঘটল, যেটা এমনকি রামেসিসের জাহাজের মতো অসাধারণ দৃশ্য থেকেও তাদের চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য করল। সেটা আর কিছুই নয়, আমাদের সামনে থাকা জাহাজটা: হুইয়ের বেকাথা। সামনের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিকদের ছোট্ট দলটার দিকে ইশারা করতে শুরু করল তারা। একে অপরকে ডাকছে কেউ কেউ। তাদের উত্তেজিত আলাপের মাঝে আমার নাম-টাইটা-ও কয়েকবার উচ্চারিত হতে শুনলাম আমি।

নিঃসন্দেহে সবাই খুব ভালোভাবেই চেনে আমাকে। আমার সুদর্শন এবং সুবেশ চেহারা, বা একসময় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি আমি- এই কারণগুলো তো আছেই, সাথে আরো একটা কারণে আমাকে মনে রেখেছে তারা; যেটা সব নাবিক বা রথচালকের কাছেই একইভাবে স্মরণীয়।

মেফিস শহর পুনর্দখল, সেইসাথে খামুদির পরাজয় এবং হিকসস বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করার পর যখন আমি ওদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম, তখন রাজা হুরোতাসকে অনুরোধ করেছিলাম আমার ভাগের সম্পদ থেকে কিছু অংশ তার সৈন্যদের মাঝে বিতরণ করে দিতে। যুদ্ধে তাদের অবদানের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই পুরস্কার। আমার প্রাপ্য দশ লাখ রৌপ্যখণ্ডের মাঝ থেকে এক লাখ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মাঝে, প্রতিজনের ভাগে পড়েছিল পাঁচ ডেবেন ওজনের দশটি করে রৌপ্যমুদ্রা। আমার কাছে বা যেকোনো অভিজাতের কাছেই এটা খুব সামান্য পরিমাণ; কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের কাছে। এর অর্থ প্রায় দুই বছরের বেতনের সমান। সোজা কথায় তাদের কাছে এটা বিশাল এক সম্পদ। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে মনে রেখেছে তারা, এবং সম্ভবত মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনে রাখবে।

এ তো প্রভু টাইটা! উত্তেজিত গলায় বলাবলি করছে তারা, আমার দিকে ইঙ্গিত করছে আঙুল তুলে।

টাইটা! টাইটা! বাকিরাও এবার তাদের উত্তেজিত চিৎকারে যোগ দিল। দলবেঁধে বন্দরের ঘাটলায় এসে জড়ো হলো সবাই, আমাকে স্বাগত জানাতে চায়। তীরে নামার সাথে সাথে আমাকে ছুঁয়ে দেখার প্রতিযোগিতা লেগে গেল সবার মাঝে, কেউ কেউ তো অত্যুৎসাহী হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে দিতে চাইল। কয়েকবার হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম আমি। শেষ পর্যন্ত হুই আর রামেসিস মিলে তাদের বিশজন লোকের সাহায্যে আমার চারদিকে বেষ্টনী তৈরি করল, যাতে আমার কোনো অসুবিধা না হয়। তারপর হট্টগোলের মাঝ থেকে আমাকে বের করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল কয়েকটা ঘোড়া, যেগুলো আমাদের নিয়ে যাবে সেই উপত্যকায়, যেখানে রাজা হুরোতাস এবং রানি স্পার্টা তাদের রাজধানী তৈরি করছেন।

উপকূল এলাকা ছাড়িয়ে যত সামনে যেতে লাগলাম ততই বাড়তে লাগল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দৃষ্টিসীমার ঠিক প্রান্তে সব সময় ভেসে আছে তুষারে ঢাকা পাহাড়চূড়াগুলো, মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কিছুদিন আগেই শীতকাল গেছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন সবুজ কোমর সমান লম্বা ঘাস আর নানা রকমের ফুলের গাছে ঢাকা তৃণভূমি, ট্যাগেটাসের চূড়া থেকে নেমে আসা মৃদু বাতাসে যেন মনের আনন্দে মাথা দোলাচ্ছে তারা। বেশ কিছুটা পথ হুরোতাস নদীর কিনার ধরে পাড়ি দিলাম আমরা। তুষারগলা পানিতে ফুলে উঠেছে নদী; কিন্তু সে পানি এত পরিষ্কার যে ঢেউয়ের বিপরীতে ভেসে থাকা বড় বড় মাছগুলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাতে। বরফঠাণ্ডা পানিতে বুক পর্যন্ত ডুবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধনগ্ন নারী-পুরুষের দল, হাতে বোনা লম্বা জাল টানছে কয়েকজনে মিলে। জালে ধরা পড়ছে মাছগুলো, সেগুলোকে তীরে তুলে এনে স্কুপ করা হচ্ছে। সেই কূপ থেকে সবচেয়ে বড় দেখে পঞ্চাশটা মাছ কিনে নিল হুই, রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো সেগুলোকে।

নদীতে দেখা এই মানুষগুলো ছাড়াও পথের পাশে মাঝে মাঝে দেখা যেতে লাগল ছোট ছোট ছেলেদের। ফাঁদ পেতে ধরা পায়রা আর তিতির বিক্রি করছে তারা। তার সাথে আরো দেখা গেল ছোট ছোট দোকান, বুনো ষাড় আর হরিণের মাংস বিক্রি হচ্ছে সেখানে। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশুর দল: গরু, ছাগল, ভেড়া এবং ঘোড়া। সবগুলোই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, মোটাসোটা আর চকচকে লোমে ঢাকা শরীর। মাঠে যেসব নারী-পুরুষ কাজ করছে তারা সবাই হয় একেবারেই তরুণ অথবা একেবারেই বৃদ্ধ। কিন্তু সবার মাঝেই একই রকম সন্তুষ্টির ভাব স্পষ্ট। আমাদের দেখে চিৎকার করে শুভেচ্ছা জানাল তারা।

রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পরেই কেবল বদলাতে শুরু করল মানুষজনের চেহারা। এখন বেশির ভাগই বয়সে তরুণ, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত। দক্ষ হাতে তৈরি বড় বড় সেনানিবাসে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধবিদ্যা শেখায় পুরোদস্তুর মগ্ন সবাই। তাদের রথ, বর্ম আর অস্ত্রগুলো দেখে বোঝা গেল সবই সর্বাধুনিক কৌশলে তৈরি। সেগুলোর মাঝে দুই দিক বাঁকানো ধনুক আর হালকা কিন্তু শক্তপোক্ত চার ঘোড়ায় টানা রথও আছে।

বেশ কয়েকবার তাদের অনুশীলন দেখার জন্য থামলাম আমি। খুব দ্রুতই একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। সেটা হচ্ছে, এরা সবাই প্রথম শ্রেণির দক্ষ সৈনিক, যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ অংশটুকু আদায় করে নিচ্ছে সবাই। কেবল হুরোতাস আর হুইয়ের মতো দক্ষ যোদ্ধাকে এদের সেনাপতি হিসেবে পাওয়া গেলেই এটা সম্ভব।

উপকুল ছেড়ে আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে সমতল ছেড়ে ওপরে উঠছি আমরা। প্রায় চার লিগ পথ পাড়ি দেওয়ার পর জঙ্গলে ঢাকা একটা ঢালু জমি বেয়ে উঠে এলাম আমরা এবং আবারও থমকে দাঁড়ালাম। তবে এবার অবাক বিস্ময়ে, কারণ আমাদের সামনে এখন দেখা যাচ্ছে চারপাশে উঁচু পাহাড়ে ঢাকা এক টুকরো সমতলভূমি। আর তার মাঝখানে গড়ে উঠেছে এই রাজ্যের রাজধানী।

সমতলের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে হুরোতাস নদী। তবে একটা নয়, বরং দুটো শক্তিশালী স্রোতস্বিনীতে নদীটা ভাগ হয়ে গেছে এখানে। দুই ধারার মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে প্রধান দুর্গ, যাকে একই সঙ্গে রাজপ্রাসাদও বলা যায়। প্রাসাদকে ঘিরে প্রাকৃতিক পরিখা তৈরি করেছে নদীটা। সমতলের শেষ প্রান্তে নদীর দুই ধারা আবার এক হয়ে সামনে এগিয়ে গেছে সেই গিথিয়ন বন্দর পর্যন্ত।

দুৰ্গটা আসলে গড়ে উঠেছে মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা আগ্নেয়শিলার ওপর ভিত্তি করে। কোনো এক প্রাচীন রাজার বাসভবন ছিল এটা। একসময় এখান থেকে চলে যায় সে। তারপর ট্যাগেটাস পর্বতমালায় বসবাসকারী বর্বর উপজাতি নেগলিন্টদের দখলে চলে যায় এই প্রাসাদ-দুর্গ। নেগলিন্টরা আবার পরাজিত হয় রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুইয়ের কাছে এবং তাদের দাসে পরিণত হয়।

নতুন পাওয়া এই দাসদের কাজে লাগিয়ে প্রাসাদের দুর্ভেদ্যতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে হুরোতাস আর হুই, ফলে এখন তা প্রায় অজেয়। ভেতরটা শুধু সুপ্রশস্ত ই নয়, দারুণ আরামদায়কও বটে। এই জায়গাকেই নিজের নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছে হুরোতাস।

দূর থেকে জায়গাটাকে দেখার জন্য অবশ্য বেশি সময় নষ্ট করলাম না আমি। তবে তাড়াহুড়ো করার আরো একটা কারণ হচ্ছে, হুই জায়গাটার ইতিহাস শোনাচ্ছিল আমাকে। নৌ সেনাপতি হিসেবে সে প্রথম শ্রেণির হতে পারে; কিন্তু বক্তা হিসেবে একেবারেই দুগ্ধপোষ্য শিশু। তাই ঘোড়ার পেটে আলতো করে পা দিয়ে চাপ দিলাম আমি, তারপর সবাইকে সাথে নিয়ে হালকা চালে দুর্গ লক্ষ্য করে এগোতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা দূরে থাকতেই খেয়াল করলাম পরিখার ওপর নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে টানা-সেতু। সেতুর অগ্রভাগ মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে তার ওপর দিয়ে পূর্ণ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এলো দুই অশ্বারোহী, প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে তাদের কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসা উত্তেজিত আনন্দের চিৎকারের তীব্রতা।

*

সামনের অশ্বারোহীকে এক নজরেই চিনে নিলাম আমি। তেহুতিই রয়েছে সামনে, সব সময় যেমন থাকে সে। বাতাসে পতাকার মতো উড়ছে তার লম্বা চুল। শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন মরিচার মতো লাল রং ছিল তার চুলের; কিন্তু এখন তা ধবধবে সাদা; সূর্যের আলোয় পেছনের ট্যাগেটাস পর্বতমালার তুষারের মতোই ঝলমল করছে। কিন্তু এই দূরত্ব থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তরুণী অবস্থায় যেমন ছিল; এখনো ঠিক তেমনই হালকা-পাতলা দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী সে।

তার পেছনে অপেক্ষাকৃত মন্থরগতিতে আসছে আরো একজন মহিলা, যার বয়স এবং ওজন দুটোই তেহুতির চাইতে বেশি। আমি নিশ্চিত, এর সাথে আগে কখনো দেখা হয়নি আমার।

উল্লসিত চিৎকার ছুঁড়তে ছুঁড়তেই পরস্পরের মুখোমুখি হলাম আমি আর তেহুতি। ঘোড়ার গতি প্রায় না কমিয়েই নেমে পড়লাম আমরা এবং মাটি থেকে পড়ার পরেও ভারসাম্য না হারিয়ে দুই পায়ে খাড়া হয়ে থাকতে পারলাম। নিজেদের ভরবেগটুকু ব্যবহার করলাম পরস্পরের দিকে ছুটে যাওয়ার কাজে। শক্ত করে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম আমরা।

একই সাথে কাঁদছে আর হাসছে তেহুতি। এতগুলো বছর কোথায় লুকিয়ে ছিলে, দুষ্টু ছেলে কোথাকার? আমি তো ভেবেছিলাম আর কখনো আমাদের দেখাই হবে না! আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ওর গাল বেয়ে, থুতনিতে এসে জমা হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে নিচে।

আমার মুখও ভিজে গেছে। অবশ্য সেটা আমার নিজের অশ্রু নয়, বরং তেহুতির চোখের পানিই এসে লেগেছে আমার গালে। কত কথা জমে আছে ওকে বলার জন্য; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যেন গলায় আটকে গেছে কথাগুলো। তাই কেবল শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে রইলাম আমি; মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন আর কখনো পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা না হই আমরা।

ইতোমধ্যে তেহুতির সঙ্গী আমাদের কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে। সাবধানে ঘোড়া থেকে নামল সে; তারপর দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের দিকে।

টাইটা! তোমার অভাব যে কত তীব্রভাবে বোধ করেছি আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। হাথোর এবং অন্য সকল দেব-দেবীকে ধন্যবাদ যে তারা তোমাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, সুরেলা কণ্ঠে বলে উঠল সে। এতগুলো বছর পরেও সেই কণ্ঠস্বর একটুও বদলায়নি। এবং কণ্ঠটা শোনার সাথে সাথেই সেটা চিনতে পারলাম আমি এবং ক্ষীণ অপরাধবোধ জেগে উঠল আমার মনে।

বেকাথা! চিৎকার করে উঠলাম আমি, তারপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। তবে আরেক হাতে ঠিকই তেহুতিকে ধরে রেখেছি আমার আলিঙ্গনে। তেহুতির ছোট বোন বেকাথা, যদিও তার আকার দেখে এখন আর তাকে ছোট বলার উপায় নেই।

তিনজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা, একই সাথে কাঁদছি আর হাজারটা অর্থহীন কথাবার্তা বলে চলেছি পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে। যে দীর্ঘ বছরগুলো আমাদের আলাদা করে রেখেছিল তার দুঃসহ স্মৃতি যেন মুছে ফেলতে চাইছি এই কথাগুলোর মাঝ দিয়ে। দুজনের মাঝে তেহুতির নজর বরাবরই একটু বেশি তীক্ষ্ণ ছিল। হঠাৎ করেই সে বলে উঠল, একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত লাগছে আমার, বুড়ো বন্ধু টাইটা। অনেকগুলো বছর আগে শেষবার যখন তোমাকে বিদায় জানাই তার পর থেকে একটুও বদলায়নি তোমার চেহারা। সত্যি কথা বলতে, আরো যেন তরুণ হয়ে উঠেছ তুমি, আরো সুদর্শন হয়েছ।

স্বাভাবিকভাবেই আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু কোনো জিনিসকে সঠিকভাবে বর্ণনা করার একটা স্বাভাবিক গুণ ছিল তেহুতির এবং এখনো একটুও বদলায়নি সেটা।

আমার যত দূর মনে আছে তার চাইতে অনেক বেশি সুন্দরী হয়েছ তোমরা দুজনই, পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম আমি। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে কিছুদিন আগেই তোমাদের স্বামীদের সাথে কথা হয়েছে আমার; কিন্তু তাতে তোমাদের দেখার ইচ্ছে কমেনি, বরং আরো বেড়ে গেছে। বেকাথা, তোমার চার ছেলে যখন হিকসস আধিপত্য থেকে মিশরকে মুক্ত করতে এসেছিল তখন তাদের সাথে দেখা হয়েছে আমার। কিন্তু সেটা ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। এখন ওদের সম্পর্কে সব কিছু আবার তোমার কাছ থেকে শুনতে চাই আমি। যেকোনো মায়ের জন্যই তার সন্তানদের কথা সব সময়ই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। প্রাসাদ পর্যন্ত বাকি পথটুকু নিজের ছেলেদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেই কাটাল বেকাথা।

আমার বোন যতটা বলছে এমন সোনার টুকরো নিশ্চয়ই নয় ওরা, দুষ্টুমির ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল তেহুতি। কিন্তু তেমন নিখুঁত কে-ই বা আছে বলো?

এটা শুধু হিংসে আর কিছুই নয়, আপত্তি জানাল বেকাথা। বুঝলে টাইটা, আমার বেচারা বোনটা কেবল এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে। তাও একটা মেয়ে। তবে এই কথায় কিছুই মনে করল না তেহুতি। বোঝা গেল আগেও বোনের কাছ থেকে বহুবার এই খোঁচা সহ্য করেছে সে, ফলে এখন আর এতে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না তার।

মাথায় রুপালি চুলের ঢল নেমেছে, তা সত্ত্বেও তেহুতি এখনো দারুণ দেখতে। কে জানে, হয়তো চুলগুলোই এর কারণ। চেহারায় কোনো বয়সের ছাপ বা রেখা পড়েনি, শরীর এখনো হালকা-পাতলা; কিন্তু শক্ত পেশিতে গড়া। শরীরের পোশাকে কোনো ফুল-লতা-পাতার নকশা বা নারীসুলভ চপলতার চিহ্ন নেই; বরং সৈনিকদের টিউনিক পরে আছে সে। চলাফেরায় নারীসুলভ কমনীয়তা যেমন আছে তেমনি আছে পুরুষের আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভাব। সহজেই হাসি ফোটে তার ঠোঁটে; কিন্তু উপযুক্ত কোনো কারণ থাকলে তবেই। দাঁতগুলো সমান ঝকঝকে সাদা। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত। শরীরে অনেকটা ফলবান আপেল গাছের মতো ঘ্রাণ। খুব সহজেই আবার আমার ভালোবাসা জয় করে নিয়েছে সে।

বেকাথার দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম বড় বোনের ঠিক উল্টোটা হয়েছে সে। তেহুতি যদি হয় যুদ্ধের দেবী অ্যাথেনা তাহলে বেকাথা হচ্ছে ধরিত্রীর দেবী গেইয়া। মোটাসোটা চেহারা, গায়ের রং গোলাপি। পূর্ণ চন্দ্রের মতো গোলাকার মুখ; কিন্তু আরো উজ্জ্বল ঝকঝকে। একটুতেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে, হয়তো জীবন তার কাছে অত্যন্ত আনন্দময় বলেই। আমার মনে পড়ল শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল সে, আকারে ছিল তার স্বামী হুইয়ের অর্ধেক। কিন্তু বেশ কয়েক সন্তানের জননী হওয়ার সাথে সাথে যদিও এখন বেশ মুটিয়ে গেছে বেকাথা তবু তাকে আগের মতোই ভালোবাসে হুই। এবং একটু পরেই আমি বুঝতে পারলাম ভালো তাকে আমিও বাসি।

দলের বাকিদের চাইতে বেশ সামনে সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। হুই এবং রামেসিস ইচ্ছে করেই আমাদের আলাদা থাকতে দিল, যাতে দুই বোনের সাথে আমার সম্পর্কটা আবার জোড়া লাগিয়ে নিতে পারি। অবশ্য আমাদের ভেতরে এত কথা জমা হয়ে আছে যে এই সামান্য সময়ে সেগুলো মোটেও শেষ হবে না। সত্যিই কথা শেষ হওয়ার আগেই আমরা শ্রেষ্ঠ সুন্দরী স্পার্টার দুর্গ-প্রাসাদের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছলাম।

যদিও বহু দশক ধরেই ক্রীতদাসের দল এর ওপর কাজ করে যাচ্ছে, তবু এখনো সম্পূর্ণ হয়নি দুর্গের নির্মাণকাজ। তবে বিশাল প্রাচীর পরিখা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে আন্দাজ করলাম, আমার জানা মতে যত সেনাবাহিনী আছে তাদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দলের আক্রমণও খুব সহজেই ঠেকিয়ে দিতে পারবে এই দুর্গ। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম আমি, কাছ থেকে ভালোভাবে দেখতে চাই সব কিছু। ইতোমধ্যে পেছন থেকে হুই আর রামেসিস এসে যোগ দিল আমাদের সাথে।

তেহুতি এবং বেকাথা উভয়েই এবার তাদের মনোযোগ ফেরাল রামেসিসের দিকে। তাতে অবশ্য আমার কোনো আফসোস হলো না। ইতোমধ্যে তাদের মনোযোগের যথেষ্টরও বেশি ভাগ পেয়েছি আমি, রামেসিস সত্যিই দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতোই একজন মানুষ। সত্যি কথা বলতে ওর সাথে তুলনা করা যায় এমন কাউকে এখনো দেখিনি আমি। হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা হলো; কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে এর বেশি কিছু আমি বলতেও চাই না। তাই ওদের একলা ছেড়ে দিয়ে আমি একটু পেছনে সরে এলাম।

তোমার পরিচয় কী যুবক? বেকাথার মাঝে কখনো পিছিয়ে থাকার লক্ষণ ছিল না, এখনো নেই। সরাসরি রামেসিসকে লক্ষ্য করছে সে।

আমার তেমন কোনো পরিচয় নেই, মহামান্যা, ভদ্রতার হাসি হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল রামেসিস। আমি শুধু ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন, যাতে করে প্রভু টাইটা এই সুন্দর দ্বীপে আপনাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। আমার নাম ক্যাপ্টেন রামি। আমি এবং রামেসিস দুজনই একমত হয়েছি যে, মিশরের সিংহাসনের সাথে রামেসিসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা এখনই সবার সামনে প্রকাশ করা উচিত হবে না। সবাই জানে সবচেয়ে অগম্য স্থানেও ফারাও উটেরিক টুরোর গুপ্তচর পৌঁছে যেতে পারে।

ওদিকে তেহুতি সম্পূর্ণ অন্য রকম এক দৃষ্টিতে রামেসিসের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বোনের ঠাট্টা-তামাশার কোনো চিহ্ন নেই সেই দৃষ্টিতে।

মিশরীয় রাজপরিবারের সদস্য তুমি, মনে হলো যেন মন্তব্য নয়, বরং অভিযোগের সুরে কথাটা ছুঁড়ে দিল সে।

আপনি কীভাবে জানলেন, মহামান্যা? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল রামেসিস।

তুমি যখন কথা বলছ তখন তোমার বাচনভঙ্গি খেয়াল করলেই বোঝা যায়, কয়েক মুহূর্ত রামেসিসের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর জবাব দিল তেহুতি। তারপর আরো নিশ্চিত গলায় বলে উঠল, তোমাকে দেখে আমার এমন একজনের কথা মনে পড়ছে যাকে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি; কিন্তু বহু বছর দেখিনি। দাঁড়াও একটু ভেবে দেখি! তার পরেই আবার বদলে গেল তার অভিব্যক্তি; কিন্তু এবার আগের চাইতে অবাক ভাব ফুটল চেহারায়। তোমাকে দেখে আমার ভাই ফারাও টামোসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে- মাঝপথে থেমে গেল সে, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার আত্মীয়ের দিকে। রামি! আরে তাই তো! তুমি আমার ভাইপো রামেসিস। তার পরেই আমার দিকে ফিরল চোখে ভর্ৎসনা। কিন্তু একই সঙ্গে খুশিতে ঝকমক করে উঠল তার চোখজোড়া, ঠোঁটে লুকায়িত হাসি। তুমি খুব দুষ্টু, টাটা! আমাকে এমনভাবে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কীভাবে করলে তুমি? আমি যেন আমার নিজের রক্ত-মাংসকেও চিনতে পারব না। ওকে তো আমিই প্রথম গালি দিতে শিখিয়েছিলাম। তোমার মনে নেই রামেসিস?

আবর্জনার ঝড়! তারপর, পাঁজির পা-ঝাড়া! খুব ভালো করেই মনে আছে। আমার। তেহুতির সাথে মিশল রামেসিসের হাসি। তখন আমার বয়স মাত্র তিন কি চার, ওদিকে তুমি তখন ষোলো কি সতেরো বছরের বুড়ি। কিন্তু ওই মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলো এখনো আমার কানে মধুর মতো লেগে আছে!

লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নামল তেহুতি, ভাইপোর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। এদিকে এসে তোমার এই বুড়ি ফুপুকে একটা চুমু দাও দেখি, দুষ্টু ছেলে!

অত্যন্ত আনন্দের সাথে দুজনকে আলিঙ্গন করতে দেখলাম আমি, এবং আনন্দটা শুধু এ জন্য নয় যে, রামেসিসের সাথে আপাতত আমাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত থেকে লাফ দিতে হচ্ছে না। এই পুনর্মিলনী সভা শেষ হতে হতে বেশ সময় লেগে গেল, কারণ স্বাভাবিকভাবেই বেকাথাও যোগ দিল এই আনন্দের উৎসবে। তবে শেষ পর্যন্ত আবার ঘোড়ায় উঠলাম, আমরা দুর্গের দিকে এগোতে শুরু করলাম। দুই বোন রইল রামেসিসের দুই পাশে, স্পর্শ করা যায় এমন দূরত্বে।

দুর্গের কাছাকাছি আসতেই খুলে গেল বিশাল দরজা। রাজা হুরোতাসকে দেখা গেল দুর্গ-প্রাচীরের গায়ে তৈরি করা অস্থায়ী কাঠামোর ওপর থেকে নেমে আসছে। এগুলো তৈরি হয়েছে দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ করতে। এতক্ষণ ওর ওপর দাঁড়িয়ে কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল সে। চেহারা-সুরতে যতটা না রাজা তার চাইতে বেশি ওই মিস্ত্রিদের মতোই অবস্থা হয়েছে তার। সারা গায়ে ধুলোবালি ভর্তি। দূর থেকেই আমাকে চিনে ফেলেছে সে, যেটা খুবই স্বাভাবিক। ভিড়ের মাঝেও কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যাব, এমন মানুষ নই আমি। তা ছাড়া নিজের স্ত্রী এবং তার বোনকে অচেনা এক আগন্তুক যুবকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে লেগে থাকতে দেখেও বেশ আশ্চর্য হয়েছে সে।

এ হচ্ছে আমার ভাইপো রামেসিস! পঞ্চাশ কদম দূরে থাকতেই স্বামীকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল তেহুতি।

আমাদের ভাই টামোসের মেজ ছেলে, আরেকটু বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন বোধ করেছে বেকাথা। ও আসলে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, ভাইপো কথাটার অর্থ নিয়ে যেন কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। এবং তুমি আর টাইটা মিলে যখন উটেরিককে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলবে তখন ওই হবে মিশরের ফারাও। ইতোমধ্যে রাজা নির্বাচক পদে নির্বাচিত করা হয়েছে আমাকে, কথাটা শুনে বেশ অবাক হলাম আমি। তবে হুরোতাস সম্ভবত বেকাথার এ ধরনের দিবাস্বপ্ন দেখার স্বভাবের সাথে পরিচিত। সরাসরি এগিয়ে এসে রামেসিসকে জড়িয়ে ধরল সে, একই সাথে তার পরনের পোশাকে নিজের গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালির একটা বড় অংশ স্থানান্তর করল।

শেষ পর্যন্ত রামেসিসকে ভালোবাসা জানানোর পালা শেষ হলো তার। বেকাথার মতোই জোর গলায় ঘোষণা করল, যুবরাজ রামেসিসকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি উৎসবের আয়োজন করতেই হবে আমাদের। বাবুর্চিদের জানিয়ে দাও যে আজ রাতে এক ভোজের আয়োজন করছি আমি, যেখানে সবার জন্য ভালো খাবার এবং আরো ভালো মদের ব্যবস্থা থাকবে।

*

সেই সন্ধ্যায় দুর্গের ভেতরের উঠানে বারোটার মতো বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে চারদিকে আলোকিত করে তোলা হলো। সেইসাথে টেবিল পাতা হলো ল্যাসিডিমনের কয়েক শ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য। রাজা এবং তার পরিবারের সদস্যরা বসল প্রাঙ্গণের মাঝে একটা উঁচু মঞ্চের ওপর, যেখান থেকে তাদের সবাইকে স্পষ্ট দেখতে পাবে বাকি সবাই। আমি বসলাম আমার দুই প্রিয় মানুষ তেহুতি এবং বেকাথার ঠিক মাঝখানে। আমাদের ঠিক নিচেই বসার ব্যবস্থা হয়েছে বেকাথা এবং হুইয়ের ছেলেদের। চারজন সুদর্শন তরুণ, রাজা খামুদিকে বিতাড়নের অভিযানে এরা সবাই গিয়েছিল মিশরে। যদিও তখন খুব অল্প সময়ের জন্য ওদের দেখেছিলাম আমি; কিন্তু মানবচরিত্র বিচারে আমার কখনো ভুল হয় না। এক নজরেই বুঝতে পারলাম যে বেকাথা সত্যিই ফারাও রক্তের মান রেখেছে, তার ছেলেরা সবাই মিশরের অভিজাত বংশধারার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ছেলেদের মাঝে দুজন ইতোমধ্যে বিয়ে করেছে, তাদের সুন্দরী স্ত্রীরাও বসেছে একই সাথে। সবার বয়সই হবে রামেসিসের কাছাকাছি, এবং তার সাথে উপযুক্ত সম্মানসূচক আচরণই করছে তারা। ওদের সম্পর্কে আমার মনোভাবের কথা জানালাম বেকাথাকে। একটুও অবাক না হয়ে আমার প্রশংসা গ্রহণ করল সে, ছেলেদের গুণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ।

সত্যি কথা বলতে, আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলেদের মাঝেই কেউ ওদের চাচাতো বোন সেরেনাকে বিয়ে করবে, আমাকে জানাল সে। ইতোমধ্যে আমি জেনে গেছি যে সেরেনা হচ্ছে তেহুতির সেই রহস্যময় কন্যার নাম। রাজা হুরোতাস অর্থাৎ তার বাবার পাশে একটা চেয়ার এখনো খালি পড়ে আছে তার অপেক্ষায়। ওদিকে প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে চলেছে বেকাথা: ওদের চারজনই এক এক করে সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু সবাইকেই দক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ও। বলেছে যার সাথে একই সাথে ন্যাংটো হয়ে গোসল করেছে, একই পাত্রে প্রস্রাব করার সময় নিজেদের গোপনাঙ্গের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছে তাদের কাউকে ওর পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আরো কয়েক শ পুরুষ, যারা ওকে একই প্রস্তাব দিয়েছে তাদের ও কী বলে ফিরিয়েছে সেটা জানতে খুব ইচ্ছে করে আমার। পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকেও ওকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব এসেছে; কিন্তু কেউই পাত্তা পায়নি।

ওর সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে অত্যন্ত সুন্দরী সে, স্বীকার করলাম আমি। উৎসাহ পেয়ে আরো বলে চলল বেকাথা।

ওর চাচারাসহ সবাই বলে যে ও নাকি সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দরী নারী, দেবী আফ্রোদিতির সাথে পাল্লা দিতে পারে। যদিও আমার তা মনে হয় না। সে যাই হোক, এত খুঁতখুঁতে হলে বর আর জুটবে না ওর ভাগ্যে, একা একাই বুড়ি হয়ে মরতে হবে। আমার অন্য পাশে বসে থাকা তেহুতির দিকে দুষ্টুমিভরা দৃষ্টি ছুড়ল বেকাথা। তেহুতিও আমাদের কথা শুনছিল, তবে জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না সে। কেবল লাল জিভের ডগাটা বের করে দেখিয়ে দিল বেকাথাকে।

তো নারীত্বের এই আদর্শ উদাহরণ ব্যক্তিটি এখন কোথায়? জানতে চাইলাম আমি। এসব কথার কোনোটাই আসলে তেমন গুরুত্ব বহন করে না, তবে আমার মনে হলো যে দুজনের মাঝের দুষ্টুমি আরো গুরুতর রূপ নেওয়ার আগেই প্রসঙ্গ বদলে ফেলা ভালো হবে। আজ রাতে কি আমাদের সাথে যোগ দেবে না সে?

এখানে কোনো খালি আসন দেখতে পাচ্ছ? প্রশ্ন করল বেকাথা, একই সাথে চোখ দিয়ে ইশারা করল রাজা হুরোতাসের দিকে। একই টেবিলে আমাদের মুখোমুখি বসে আছে সে। এবং তার বাম পাশের চেয়ারটাই এখন এই জনাকীর্ণ উঠানে একমাত্র খালি আসন। দাঁত বের করে হাসল বেকাথা, তারপর বড় বোনের আগেই কথাটার জবাব দিয়ে দিল, স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনা শুধু সেই ঢাকের তালেই নাচে, যার শব্দ সে ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় না।

কথাটা বেশ মজার সুরেই বলল সে, ফলে অভিযোগের বদলে প্রশংসার মতো লাগল শুনতে। কিন্তু রাজা হুরোতাস এতক্ষণ মনোযোগর সাথে আমাদের কথা শুনছিল। এবার তাড়াতাড়ি সামনে ঝুঁকে এসে আলোচনায় প্রবেশ করল সে। যখন কোনো সুন্দরী নারী মাত্র এক ঘণ্টা দেরি করে, তখন বুঝতে হবে যে ঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না।

সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল বেকাথা। এবার আমি বুঝতে পারলাম এই রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে এবং রাজা হুরোতাসের প্রকৃত আনুগত্য আসলে কার প্রতি। উৎসবের কোলাহলে যেন প্রায় একই মুহূর্তে ছেদ টেনে দিল কেউ এবং এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো উপস্থিত সবাই বোধ হয় হুরোতাসের কথা শুনেই চুপ হয়ে গেছে। কিন্তু তার পরেই বুঝতে পারলাম কথাটা আসলে স্রেফ দু-একজন ছাড়া কারো কানে যাওয়ার কথা নয়। এবং এই মুহূর্তে হুরোতাস বা অন্য কারো প্রতি কেউ খেয়াল করছে না, বরং সবার দৃষ্টি ঘুরে গেছে দুর্গ থেকে প্রাঙ্গণে প্রবেশের যে দরজাগুলো রয়েছে তার দিকে। একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক তরুণী। অবশ্য আমার এবং রামেসিসের জীবনে তার প্রবেশের এই ঘটনার বিবরণ এভাবে দিতে গেলে আসলে কিছুই বলা হয় না। যেন হাঁটছে না রাজকুমারী সেরেনা, বরং শরীরে কোনো অংশ না নাড়িয়ে যেন ভেসে চলেছে বাতাসে। তার কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে পোশাকের লম্বা ঝুল, এটাই বোধ হয় কারণ। চুলগুলো মাথার ওপর চুড়ো করে বাঁধা, ঝলমলে সোনালি এক মুকুট যেন। কাঁধ এবং বাহুর হালকা রোদে পোড়া ত্বকে কোনো দাগ নেই, ঠিক পালিশ করা মার্বেল বা সদ্য বোনা রেশমের মতো। দিঘল দেহ; কিন্তু প্রতিটি অংশ নিখুঁত অনুপাতে তৈরি।

তাকে আসলে সুন্দরী বলা যায় না, কারণ ওই শব্দটার মাধ্যমে সত্যিকারের সৌন্দর্যের কোনো প্রকাশই বর্ণনা করা যায় না। বিস্ময়কর বললেও বরং কিছুটা বোঝা যায়। তার চেহারার প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশই নিখুঁত, এবং যখন সেগুলোকে একসাথে মিলিয়ে দেখা হয় তখন যে আশ্চর্য ঘটনার সৃষ্টি হয় তার বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। উপস্থিত প্রতিটি মানুষের দৃষ্টি যেন আটকে গেছে তার ওপর। তবে তার সবচেয়ে সুন্দর যে অঙ্গ, অবশ্য যদি এভাবে কিছু নির্বাচন করা যায় আর কি; সেটা হচ্ছে তার চোখ। আকারে বিশাল; কিন্তু মুখের বাকি অংশের সাথে একেবারে নিখুঁতভাবে মানিয়ে গেছে। যেকোনো পান্নার চাইতেও উজ্জ্বল সবুজ চোখগুলো। একই সাথে যেমন তীক্ষ্ণ এবং অনুভূতিপ্রবণ, তেমনি শান্ত এবং উদার দৃষ্টি সে চোখে।

এই সৌন্দর্যের কাছাকাছি আসতে পারে এমন মাত্র দুজন নারীর সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। একজন ছিল রানি লসট্রিস, আমার প্রথম ভালোবাসা। আর তারপর আছে সেই নারী, যে এই মুহূর্তে আমার পাশে বসে আছে: রানি তেহুতি, যে ছিল আমার দ্বিতীয় ভালোবাসা এবং এখনো তাই আছে। এখন যে তরুণীকে আমার সামনে দেখছি, লসট্রিস এবং তেহুতি যথাক্রমে তার নানি এবং মা।

তবে নিঃসন্দেহে রাজকুমারী সেরেনা হচ্ছে আমার দেখা জীবিত এবং মৃত সকলের মাঝে সবচেয়ে সুদর্শনা এবং স্নিগ্ধ নারী।

আমার পাশে বসে থাকা তেহুতিকে খুঁজে নিল ওর দৃষ্টি, এবং অনিন্দ্যসুন্দর হাসি ফুটল ঠোঁটে। তার পরেই টেবিলের শেষ প্রান্তে বসে থাকা রামেসিস উঠে দাঁড়াল, এবং নড়াচড়ার ফলে ওর দিকে আকৃষ্ট হলো সেরেনার চোখ। সাথে সাথে ওর ঠোঁটে ফুটে ওঠা হাসিটুকু মিলিয়ে গেল, তার বদলে চেহারায় ফুটল অবাক বিস্ময়। হাঁটার মাঝখানে এক পা তুলে রাখা অবস্থাতেই থমকে গেল ও, কাপড়ের নিচ থেকে উঁকি দিল একটা স্যান্ডেলের অগ্রভাগ। পরস্পরের দিকে দীর্ঘ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল দুজন, যে সময়টায় পৃথিবীর আর কোনো মানুষের অস্তিত্ব রইল না তাদের মাঝে। একসময় পা-টা নামিয়ে মাটিতে রাখল সেরেনা; কিন্তু চোখগুলো তখনো আটকে রইল রামেসিসের ওপর। তারপর হঠাৎ লজ্জায় গোলাপের মতো লাল হয়ে উঠল ওর গাল। এবং ব্যাপারটা যদিও অসম্ভব; কিন্তু এই লাজুকতা যেন আরো সুন্দরী করে তুলল ওকে।

তুমিই তো আমার মামাতো ভাই রামেসিস? মা বলেছিল যে তুমি আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছ, জলতরঙ্গের মতো সুরেলা সামান্য চাপা গলায় প্রশ্ন করল ও। নীরব প্রাঙ্গণের প্রতিটি আনাচকানাচে ছড়িয়ে গেল তার কণ্ঠস্বর। ওর চোখে এমন এক আলো খেলা করছে, যেটা ত্রিশ বছর আগের একটা মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দিল; যে মুহূর্তে প্রথমবারের মতো জারাসের চোখে চোখ রেখেছিল তেহুতি। কোনো কথা না বলে শুধু একবার মাথা ঝাঁকাল রামেসিস, সেরেনার নিখুঁত সৌন্দর্য থেকে এক পলকের জন্যও চোখ সরাচ্ছে না।

আমার পাশেই বসে ছিল তেহুতি; কিন্তু দুর্গের প্রাঙ্গণে বসে থাকা কেউ খেয়াল করল না যে কখন যেন টেবিলের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার হাতে চাপ দিয়েছে সে। এই তো! মৃদু কিন্তু উত্তেজিত গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল ও। এই তো!

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেই অলৌকিক মুহূর্তটাকে চিনে নিয়েছে তেহুতি। উনিশ বছর বয়সে অবশেষে নিজের জীবনসঙ্গীকে খুঁজে নিয়েছে তার মেয়ে।

*

এরপর যে সপ্তাহ এবং মাসগুলো কেটে গেল তা আমার স্মৃতিতে ধরে রাখা সময়গুলোর মাঝে অন্যতম সেরা সুখের সময়।

প্রথম খুশির ব্যাপারটা ঘটল তখন যখন রাজা হুরোতাস এবং তার রানি তাদের দুর্গ-প্রাসাদের নিচে সদ্য গড়ে তোলা কোষাগার ঘুরে দেখার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানাল। পাথরের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে অনেকগুলো ধাপ নিচে নামলাম আমরা। সামনে রইল দশজন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রহরী, পেছনে আরো দশজন। পথ দেখানোর সুবিধার জন্য সবার হাতে রয়েছে জ্বলন্ত মশাল। সব শেষের সিঁড়িটা বেয়ে নেমে আসার পর একটা ভারী ব্রোঞ্জের চাবি দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশাল দরজার তালা খুলল হুরোতাস। তারপর তিনজন প্রহরী মিলে ঠেলে খুলে ফেলল সেই দরজা।

রাজাকে অনুসরণ করে রাজকীয় ধনভাণ্ডারের ভেতরে ঢুকলাম আমি, আগ্রহের চোখে চাইলাম এদিক-ওদিক। যদিও মাটির নিচে এই অভিযানের কারণ সম্পর্কে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি, তবে মনে মনে আন্দাজ করেছিলাম যে এখানে কী চোখে পড়তে পারে আমার। হুরোতাস এবং তেহুতি দুজনই বেশ আগ্রহের সাথে লক্ষ্য করছে আমাকে। প্রায় এক মুহূর্তের মাঝেই যা খুঁজছিলাম তা পেয়ে গেলাম আমি। ভারী গ্রানাইটের টুকরো দিয়ে তৈরি করা দেয়ালের পাশে দাঁড় করানো রয়েছে প্রায় পঁচিশটার মতো সিডার কাঠের তৈরি সিন্দুক। এমনিতে যদিও নিজের আচরণ নিয়ে আমি সব সময় সচেতন তবে এই ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম ঘটিয়ে খুশির চিৎকার ছাড়ার জন্য নিশ্চয়ই আমাকে দোষ দেওয়া যায় না। এক দৌড়ে কামরার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে গেলাম আমি, একটা সিন্দুক দুই হাতে ধরে তোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। একটার ওপর আরেকটা সাজিয়ে রাখা সিন্দুকের স্তূপ থেকে সবচেয়ে ওপরের সিন্দুকটা নিচে নামানোর জন্য তিনজন প্রহরীর সাহায্য দরকার হলো। তারপর তলোয়ারের মাথা দিয়ে চাড় মেরে সিন্দুকের ডালা খুলে দিল তারা, এবং পিছিয়ে গেল।

আমি লোভী মানুষ নই। কিন্তু আপনাদের মনে রাখতে হবে, মাত্র কয়েক দিন আগেই আমার হাতে থাকা সকল জমিজমা এবং রৌপ্যমুদ্রার শেষ ডেবেন পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে চলে গেছে ফারাও উটেরিক টুরোর দখলে। যখন নিজের কাছে এক লাখ রৌপ্যখণ্ড থাকে তখন তা নিয়ে মাথায় কোনো চিন্তাই থাকে না। কিন্তু যখন সেই পরিমাণটা নেমে আসে একটিমাত্র ডেবেনে তখন মাথায় ওটা ছাড়া আর কোনো চিন্তার অবকাশ থাকে না।

আমার মনে হয় আর কখনো এমন অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাব না আমি, মশালের আলোতে ঝলমল করতে থাকা সোনা এবং রুপোর বিশাল ভাণ্ডারের দিকে চোখ কুঁচকে তাকানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম আমি। অবশ্য বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো না কথাগুলো। তারপর হাতের তালু দিয়ে মুছে ফেললাম গাল বেয়ে নামা আনন্দের অশ্রু, এবং ঘুরে তাকালাম রাজা হুরোতাসের দিকে। তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম আমি। ফিসফিস করে বললাম, ধন্যবাদ, মহামান্য রাজা। তারপর ঝুঁকে এলাম তার পায়ে চুমু খাব বলে। কিন্তু আমাকে কাজটা করার কোনো সুযোগ দিল না সে, সরে গেল সাথে সাথে। আমার দুই কাঁধে দুই হাত রেখে আমাকে তুলে দাঁড় করাল, তারপর চাইল আমার চোখের দিকে।

আমার এবং তেহুতির প্রতি তুমি শত শতবার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছ। তার প্রতিদান হিসেবে এ আর এমন কী? প্রশ্ন করল সে।

বারোজন ক্রীতদাসের সাহায্য নেওয়ার পরেও এই বিশাল সম্পদ সম্পূর্ণ বাছাই করা ওজন করা এবং পরিশেষে আবার আগের জায়গায় তুলে রাখার জন্য পরবর্তী তিন দিন সময় লেগে গেল আমার। দ্রুত একটা হিসাব করে তেহুতি জানাল যে এই সম্পদ আরো অগণিত বছর আমার বিলাসবহুলভাবে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট।

অবশ্য সত্যিই যদি ওই অগণিত বছর আয়ু থাকে তোমার, নিজের হিসাবে খুঁত বের করার চেষ্টা করল সে।

সেটা কোনো সমস্যা হবে না, তাকে আশ্বস্ত করলাম আমি। সমস্যা হবে সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরের পাঁচ শ বছর কীভাবে চলব তাই নিয়ে।

হুইয়ের চার ছেলের মাঝে পারিবারিক বন্ধন সত্যিই দৃঢ়। তবে বয়সে বড় হওয়া, সৌন্দর্য, মোহময়ী ব্যক্তিত্ব এবং রাজার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় এই দলের অবিসংবাদিত নেত্রী হচ্ছে সেরেনা। ঘূর্ণিবায়ুর মতো নাচতে পারে সে, জানে তুফান বেগে ঘোড়া ছোটাতে। মানুষের পরিচিত প্রতিটা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতা আছে তার, একই সাথে সুরেলা কণ্ঠে তুলতে পারে সাইরেনদের মতো মনমাতানো সুর; যারা নাবিকদের ভুলিয়ে নিয়ে ডুবোপাহাড়ে নিক্ষেপ করত। কিন্তু সেরেনার কণ্ঠস্বরে সর্বনাশের হাতছানি নেই, বরং আনন্দের ইশারা আছে।

এ ছাড়াও ধাঁধা বা ছড়া লিখতেও জানে সে এবং ছোট্ট এক টুকরো হাসি বা একটা শব্দ দিয়েই হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে অপরের মুখে।

পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্ত থেকেই ক্ষমতাশালী ধনী পুরুষরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু তাদের সবাইকে সেরেনা এমন বুদ্ধির সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, কেউই হৃদয় ভাঙার ব্যথা অনুভব করেনি বরং এমনভাবে বিদায় নিয়েছে যেন সেরেনা তাদের অনেক বড় কোনো উপকার করেছে।

মায়ের মতোই সেরেনাও সুদক্ষ তীরন্দাজ এবং সব ধরনের ধারালো অস্ত্র চালাতে পারদর্শী। তেহুতির সেই চুনির হাতলওয়ালা নীল রঙের তলোয়ারকে স্পর্শ করার অনুমতি আছে শুধু তার। এই অস্ত্রের খ্যাতি প্রায় কিংবদন্তির সমান, যার উৎপত্তি সম্পর্কে ছড়িয়ে আছে নানা বিভ্রান্তি। আমি এটাকে প্রথম দেখেছিলাম অনেক বছর আগে ট্যানাসের হাতে; জীবনের বেশির ভাগ সময় যে ছিল রানি লসট্রিসের একনিষ্ঠ; কিন্তু গোপন প্রেমিক। মৃত্যুশয্যায় সে এই তলোয়ার দিয়ে গিয়েছিল লসট্রিসের ছেলে রাজপুত্র মেমননের হাতে। যদিও মেমনন ছিল ট্যানাসের পুত্র; কিন্তু এই কথা তার আসল বাবা-মা বাদে জানতাম শুধু আমি। লসট্রিসের মৃত্যুর পর তার জায়গায় ফারাও পদে অধিষ্ঠিত হয় মেমনন, নাম নেয় ফারাও টামোস। আমার প্রিয় দুই নারী তেহুতি এবং বেকাথার বড় ভাই ছিল সে, এবং সেই হিসেবে সেরেনার দাদু।

ক্রিটের মিনোসের সাথে তার দুই বোনের বিয়ের ব্যাপারে টামোসই সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, আমি তাকে কিছু সাহায্য করেছিলাম মাত্র। বিয়ের উপহার হিসেবে চুনির হাতলওয়ালা এই নীল তলোয়ারটি বোনকে দিয়েছিল সে। সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে যখন মিনোস এবং তার দ্বীপ রাজ্যের প্রায় সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায় তখন দুই বিধবা বোন তাদের প্রেমিক হুই এবং জারাসের সাথে পালিয়ে আসে। উত্তরে এই ল্যাসিডিমনে নিজেদের রাজ্য গড়ে তোলে তারা। স্বাভাবিকভাবেই মিশরে ফিরে না গিয়ে প্রেমিকদের সাথে পালিয়ে যেতে দুই বোনকে সাহায্য করেছিলাম আমি। এবং স্বাভাবিকভাবেই এই বিখ্যাত অস্ত্র তখন তেহুতির কাছেই ছিল।

অত্যন্ত দক্ষ তলোয়ারযোদ্ধা হওয়ায় টামোসের কাছ থেকে উপহার পাওয়া নীল তলোয়ারের প্রায় প্রেমে পড়ে গিয়েছিল তেহুতি। খুব সম্ভব ক্রিট দ্বীপে ইচ্ছের বিরুদ্ধে রওনা দেওয়ার সময় এই একটা উপহারই সান্ত্বনা জুগিয়েছিল ওকে।

আর কাউকে কখনো এই জাদুকরী তলোয়ার, এমনকি ছুঁতেও দিত না তেহুতি; এমনকি তার স্বামী রাজা হুরোতাসকেও নয়। ঝকঝকে শরতের আকাশের মতো ধাতুর শরীর থেকে শত্রুর রক্তও সে নিজেই ধুয়ে পরিষ্কার করত সব সময়। একমাত্র তেহুতিই তলোয়ারের ধারগুলোকে পালিশ এবং ধার দিয়ে দিয়ে মৃত্যুর মতো নিখুঁত করে তুলেছিল, এবং কাজটা করতে দিয়ে নিজেও পরিণত হয়েছিল দক্ষ কামারে।

তবে হুরোতাস নদীর তীরে একদিন আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটল। এই দিনটা ছিল রাজকুমারী সেরেনার চৌদ্দতম জন্মদিন, যেদিন বালিকা থেকে সে নারীত্বে উপনীত হলো। তাকে দেওয়ার জন্য সত্যিই এর চাইতে বড় কোনো উপহার ছিল না।

আমি অবশ্য সেদিন ওদের সাথে ছিলাম না। কেবল রামেসিসকে নিয়ে ল্যাসিডিমনে পৌঁছানোর পরেই তেহুতির কাছ থেকে নিম্নোক্ত ঘটনার বিবরণ শুনেছি আমি। সেরেনার বয়স তত দিনে বিশ বছর হয়ে গেছে।

*

সেই দিন এখানকার সমাজের নিয়ম এবং নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী মা এবং মেয়ে দুজন মিলে ঘোড়া নিয়ে চলে গিয়েছিল দুর্গ থেকে দূরে হুরোতাস নদীর উজানে। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর একটু আগে নিজেদের ঘোড়াগুলো চাকরদের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছিল তারা। তারপর হাত ধরাধরি করে শেষ এক শ কিউবিট পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিল জলপ্রপাতের পাশে তৈরি করা রাজকীয় বাড়িটায়। পরিচারক বা চাকরদের কেউ ওদের অনুসরণ করেনি। রাজপরিবারের দুই সদস্যের ফিরে আসা পর্যন্ত ওখানেই অপেক্ষা করতে হবে তাদের।

নীল তলোয়ারটাকে কোমরের খাপে বেঁধে নিয়েছিল তেহুতি; কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। কারণ খুব কম সময়েই ওটা কাছ ছাড়া করে সে। সকালে তাদের চাকর এবং পরিচারকরা হাজির হয়েছিল বাড়িটায়। সব কিছু নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে রেখে এসেছে তারা। বড় বড় তামার ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখেছে তাজা ফুল, ফলে বাড়ির প্রধান কামরাটা পরিণত হয়েছে যেন এক আনন্দের বাগানে। বসার আসনগুলো সাজানো হয়েছে এলক হরিণের চামড়া আর রেশমি বালিশ দিয়ে। মেঝের মাঝখানে জ্বালানো হয়েছে আগুন, কারণ শীতকাল এখনো বাকি। তারপর দশজন ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার সাজিয়েছে টেবিলের ওপর; কারণ খুব ভালো করেই জানা আছে যে খাবার যা বাকি থাকবে সেগুলো তারাই পাবে।

বাড়ির সীমানার মাঝে প্রবেশ করার প্রায় সাথে সাথেই শরীর থেকে কাপড়ের বন্ধন খুলে ফেলতে শুরু করল তেহুতি আর সেরেনা। কোমর থেকে নীল তুলোয়ারের খাপটা খুলে নিল তেহুতি, তারপর অগ্নিকুণ্ডের সামনে রাখা টেবিলের ওপর যত্নের সাথে রাখল। পরনে থাকা সকল পোশাক এলকের চামড়ায় ঢাকা বালিশের ওপর ছুঁড়ে ফেলল দুজন। তারপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে হাত ধরাধরি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো তারা, দৌড়ে চলে গেল নদীর পাড়ে। সেখানে স্বচ্ছ পানিতে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল তারা, বাতাসে উঠল জলকণার মেঘ। পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ফলে দুজনই চমকে উঠল। নদীর ওপর ভাসছে পাহাড় থেকে ভেসে আসা বরফের বড় বড় চাঙড়। একে অপরকে পানি ছিটাতে লাগল তারা, যতক্ষণ না তেহুতি রণে ভঙ্গ দিয়ে পিছিয়ে গেল। মায়ের পিছু ধাওয়া করল সেরেনা, তারপর জোর করে ধরে রাখল ঝরনার পানির নিচে; যতক্ষণ না মাফ চাইল তেহুতি। তার গায়ে প্রচণ্ড শক্তি থাকলেও মেয়ের সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হলো তাকে। মনে হচ্ছিল যেন সেরেনার শরীরটা কোনো মানুষের রক্ত-মাংসে তৈরি নয় বরং ওই নীল তলোয়ারের মতোই রহস্যময় কোনো স্বর্গীয় পদার্থে গড়া হয়েছে তাকে।

কিন্তু পাহাড়ি নদীর বরফগলা পানির প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সাথে পাল্লা দিয়ে এই দুই নারীর কারো পক্ষেই জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে যখন তারা তীরে ফিরে এলো তখন দুজনই প্রচণ্ড শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে। ঠাণ্ডার চোটে লাল হয়ে গেছে নিতম্ব আর তলপেট। বাড়ির ভেতরে ঢুকে অগ্নিকুণ্ডের মরে আসা আগুনে নতুন করে কাঠের টুকরো ছুঁড়ে ফেলল তারা, তারপর যখন সেগুলো নতুন করে জ্বলে উঠল তখন আগুনের এত কাছে এসে দাঁড়াল যে আরেকটু হলেই তাদের গায়ে আগুন লেগে যেত। চাকরদের রেখে যাওয়া শুকনো তোয়ালে দিয়ে পরস্পরের শরীর মুছে পরিষ্কার করে দিল তারা। শরীর গরম হয়ে আসতে যখন কাঁপুনি কমে এলো তখন বড় এক পাত্র লাল মদ নিয়ে এলো তেহুতি। সেটা কয়লার ওপর রাখল সে, তারপর যখন ভেতরের মদ ফুটতে শুরু করল তখন তার ভেতরে দুই মুঠো শুকনো গুল্ম ছুঁড়ে দিয়ে ভালোভাবে নাড়ল। শরীর সম্পূর্ণ শুকিয়ে আসার পর কাপড় পরে নিল দুজন, তারপর আগুনের সামনে রাখা একটা আসনে পাশাপাশি বসল। ধূমায়িত পাত্রটা হাতবদল হতে লাগল দুজনের মাঝে, উষ্ণ মদের কারণে আর পরস্পরের সান্নিধ্যে দুজনই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট বোধ করছে।

চুনি পাথরের বাঁটসহ সেই তলোয়ারটা এখনো খাপের মাঝে ভরে নিজের কোলের ওপর রেখেছে তেহুতি। এবার মেয়ের দিকে ঝুঁকে এলো সে, মুক্ত হাতটা দিয়ে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরল। সেরেনাও মায়ের গালে চুমু খেয়ে আদরের জবাব দিল, তারপর ফিসফিস করে বলল, এই সুন্দর দিনটার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ মা। আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েতে পরিণত করেছ তুমি।

এখন আর তুমি নিছক কোনো মেয়ে নও, প্রিয়। নারী হয়ে উঠেছ তুমি এবং তোমার সৌন্দর্য এখন ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। কিন্তু তোমার জন্মদিন তো এখনো শেষ হয়নি। তোমার জন্য আরো একটা উপহার আছে আমার কাছে।

ইতোমধ্যে আমাকে যথেষ্টরও বেশি দিয়েছ তুমি… বলতে শুরু করল সেরেনা, তারপর হঠাৎ ভাষা হারিয়ে ফেলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল মায়ের দিকে। কোল থেকে নীল তলোয়ারটা তুলে নিয়েছে তেহুতি, মেয়ের কোলের ওপর রেখেছে সেটা। তারপর সেরেনার হাতটা ধরল সে, তলোয়ারের বাটের ওপর রেখে ভাঁজ করে দিল আঙুলগুলো।

এটাই তোমার প্রতি আমার উপহার, সেরেনা, বলল সে। সাবধানে ব্যবহার কোরো এটা, যত্ন নিও। কিন্তু যখন প্রয়োজন হবে তখন যেন শত্রুর হৃৎপিণ্ড বরাবর আঘাত করতে দ্বিধা কোরো না।

এ যে অনেক বেশি, দুই হাত নিজের পেছনে নিয়ে গিয়ে মাথা নেড়ে বলল সেরেনা, এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে কোলের ওপর পড়ে থাকা অস্ত্রটার দিকে। আমি জানি তোমার কাছে এটা কত মূল্যবান। আমি এটা নিতে পারি না।

কিন্তু এই উপহারের সাথে যে আমার ভালোবাসাও মিশে আছে। আর এখন যদি এটা আমি ফেরত নিতে চাই তাহলে আমার ভালোবাসাও ফিরিয়ে নিতে হবে, যেটা অসম্ভব, বলল তেহুতি।

তলোয়ারের দিক থেকে চোখ সরিয়ে এনে মায়ের দিকে চাইল সেরেনা, এই কথার কী জবাব দেবে ভাবছে। কথার খেলা চলছে এখন দুজনের মাঝে। এমন একটা ব্যাপার, যেটা উভয়েই পছন্দ করে। তার পরেই তার মাথায় সমাধানটা চলে এলো। এই নীল তলোয়ার তো তোমারই একটা অংশ, তাই না? প্রশ্ন করল সে। একটু দ্বিধা করে মাথা ঝাঁকাল তেহুতি।

হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়, ব্যাপারটা স্বীকার করে নিল সে।

কিন্তু তোমার অংশ তো আমি নিজেও। আর তুমিও আমার একটা অংশ। ঠিক কিনা, বলো?

এবার তেহুতি বুঝতে পারল কী বোঝাতে চাইছে তার মেয়ে। গম্ভীর ভাব কেটে গিয়ে উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠল তার মুখে।

তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? আমরা তিনজন আসলে একই সত্তা এবং এই তলোয়ার আমাদের দুজনেরই অংশ। তার মানে আমরা তিনজন প্রত্যেকেই একে অপরের। এই কথা বলে তলোয়ারের চুনিখচিত হাতলটা চেপে ধরল সেরেনা টান দিয়ে সেটা বের করে আনল খাপ থেকে। তারপর বলল, এই অসাধারণ জিনিসটা তুমি আমার সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছ, এটা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার, মা।

তারপর উঠে দাঁড়াল সে, তলোয়ারটা তুলে ধরল এমনভাবে যেন জ্বলন্ত মশাল তুলে ধরেছে। মনে হলো যেন তলোয়ারের ফলা থেকে প্রতিফলিত নীলচে আভায় পুরো ঘর আলোকিত হয়ে উঠেছে। এবার অনুশীলনের ধাপগুলো শুরু করল সে, যেগুলো সেই ছোটবেলায় খেলনা তলোয়ার ধরার মতো বয়স হওয়ার সাথে সাথেই তাকে শিখিয়েছিল তেহুতি। প্রথমেই আক্রমণের বারোটি প্রাথমিক পদ্ধতি অনুশীলন করল সে, তারপর কোথাও না থেমে সাবলীল দ্রুততায় অন্য সবগুলো পদ্ধতি।

তাকে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করতে লাগল তেহুতি, আর একই সাথে অনুশীলনের গতি বাড়াতে শুরু করল সেরেনা। একসময় তার হাতের তলোয়ারটা মনে হতে লাগল এক টুকরো আলোর রেখা, ঠিক যেমনটা ফুলের সামনে ভেসে থাকার সময় হামিংবার্ডের পাখায় দেখা যায়। সেই পাখারই একটা অংশে পরিণত হলো তার হাত, প্রতিনিয়ত আকার বদলাচ্ছে। তলোয়ারের তালে তালে নাচতে শুরু করল তার সম্পূর্ণ শরীর। শেষে গ্রীস্মের আকাশে ফুটে ওঠা বিদ্যুৎশিখার মতো লঘু চঞ্চল পায়ে ঘুরতে শুরু করল সে। প্রতিটা ঘূর্ণনের সাথে সাথে তামার ফুলদানিগুলো থেকে একটা করে ফুলের উঁটা কেটে পড়ে যেতে লাগল তার তলোয়ারের ঘায়ে। কাজটা এত নিখুঁতভাবে ঘটতে লাগল যে, এমনকি ফুলগুলোও বুঝতে পারল না যে তাদের গোড়া কেটে ফেলা হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য যেন শূন্যে ভেসে থাকল তারা, তারপর পড়ে যেতে লাগল মেঝেতে। ততক্ষণে হয়তো নতুন তিন-চারটি ফুলের উঁটা কেটে পড়ে গেছে সেরেনার তলোয়ারের আঘাতে। মেঝের ওপর পুরু হয়ে জমল ফুলের আস্তরণ, শীতকালে যেভাবে জমে তুষার। শেষ পর্যন্ত যখন আর একটা ফুলও বাকি রইল না তখন যেভাবে নাচ শুরু করেছিল ঠিক সেভাবেই আবার হঠাৎ করে থেমে গেল সেরেনা, ঠিক আগের মতোই নীল তলোয়ারটা মশালের মতো তুলে ধরে রেখেছে মাথার ওপর।

সেদিন তেহুতি তলোয়ারবাজির এমন উৎকৃষ্ট নিদর্শন দেখেছিল যে, আর কোনো দিন সেটা সে ভুলবে না। এবং সেরেনার কোমর থেকে ঝুলতে থাকা নীল তলোয়ারটা দেখে আমার মন্তব্যের জবাবেই এই গল্প আমাকে শুনিয়েছিল সে।

*

দিনগুলো যদি আমার জন্য সুখের হয়ে থাকে তবে রামেসিস আর সেরেনার জন্য তা ছিল স্বর্গীয়। শুনেছি প্রথম দর্শনে প্রেম বলে কিছু নেই; কিন্তু এই জুটিকে দেখে সেই ধারণাকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে বাধ্য হলাম আমি।

নিজেদের মাঝে তৈরি হওয়া আকর্ষণ এবং ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই করল না তারা। সুযোগ পেলেই নিজেদের স্পর্শ করে তারা, একজন যখন কথা বলে তখন আরেকজন তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ চোখে। মাঝে মাঝে দেখা যায় পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে কোথাও বসে আছে তারা, বহুক্ষণ কেটে গেলেও নড়ার কোনো লক্ষণ নেই।

দুজনের এই ভালোবাসা দেখে প্রথমে তেহুতি খুশি হয়েছিল ঠিক; কিন্তু খুব শীঘ্রই সেটা ভয়ে রূপ নিল। মেয়ের কাছ থেকে সতীত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার একটা শপথ আদায় করে নিল সে, তারপর আমার কাছে অভিযোগ করতে এলো। ওই শপথ ও মন থেকে নেয়নি। মাদি ঘোড়া তার প্রথম মৌসুমে যেমন উত্তেজিত হয়ে থাকে ওর অবস্থাও তাই। রামেসিসকে দেখলেই ওর মনের অবস্থা কী হয় সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারি। আমাকে সাহায্য করো, টাটা।

চেহারায় নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে তুললাম আমি। বললাম, কীভাবে সাহায্য করব? জারাস যখন তোমার পেছনে লেগেছিল তখন যেভাবে তোমার কুমারীত্ব রক্ষা করতে সাহায্য করেছিলাম সেভাবে?

চমকে উঠল তেহুতি, তারপর জ্বলন্ত চোখে তাকাল আমার দিকে। তোমার জন্য দুঃখ লাগছে আমার। এত নোংরা মন তোমার, টাইটা!

কখন আমার নোংরা মনের পরিচয় পেলে? প্রশ্ন করলাম আমি। ব্যাপারটা যখন তোমার আর জারাসের ছিল তখন, নাকি এখন রামেসিস আর সেরেনার ব্যাপারে? এই কথা শোনার সাথে সাথে নিষ্ফল রাগে হাত দুটো মাথার ওপর ছুড়ল তেহুতি, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল।

দুটোর মাঝে অনেক বড় তফাত আছে, হাসির দমক কিছুটা সামলে নিয়ে বলল সে। জারাস আর আমি কখনো আমার ভাই, অর্থাৎ ফারাওয়ের কাছ থেকে কোনো সুযোগ পাইনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এক বুড়ো বরের সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল আমাকে। আমি শুধু চেয়েছিলাম জীবনে একবারের জন্য হলেও আমার ভালোবাসার পুরুষকে কাছে পেতে। কিন্তু সেরেনা আর রামেসিসের মিলনের প্রতি সবার সম্মতি রয়েছে। আমরা শুধু চাইছি ওরা একটু ধৈর্য ধরুক।

আমার মনে হয় সেই একটু ধৈর্যটা ঠিক কতখানি সেটা নিয়ে তোমার এবং তোমার মেয়ের মতামত সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এটা বলতে পারি যে, অন্তত রামেসিসকে সামলে রাখার চেষ্টা করব আমি।

এবং তেহুতিকে সত্যি কথাই বলেছিলাম আমি। ওর মতো আমিও জানি প্রথম প্রেমের উচ্ছ্বাস কতটা অপ্রতিরোধ্য হতে পারে। রাজা হুরোতাস এবং তেহুতি দুজনই রামেসিস আর সেরেনার মিলনের পক্ষে; কিন্তু ব্যাপারটা একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বও বহন করছে। হুরোতাস এবং তেহুতির মতে ল্যাসিডিমনের চারদিকে ছোট-বড় যে অসংখ্য রাজ্য রয়েছে তাদের সবগুলোর প্রধানদের বিয়েতে উপস্থিত থাকতেই হবে। এই বিয়ে থেকে যতটা সম্ভব রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করতে চায় রাজা হুরোতাস এবং তার স্ত্রী।

ওদের আন্দাজ অনুসারে রাজনৈতিক মৈত্রী আশা করা যায় এমন সবগুলো দেশের রাজার কাছে বিয়ের আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে, সেইসাথে তাদের সবাইকে ল্যাসিডিমনের দুর্গ-প্রাসাদে অবস্থানের ব্যবস্থা সাজাতে সাজাতে প্রায় বছরখানেক সময় লেগে যাবে।

এক বছর! অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠল রামেসিস। এর ভেতরে তো আমি বুড়ো হয়ে মরেই যাব! কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম সেরেনা অনেক বেশি ধৈর্য এবং বুদ্ধির পরিচয় দিল।

তুমি যতটা বলো সত্যিই যদি আমাকে ততটা ভালোবাসো, নিজের বাবা-মা এবং আমার উপস্থিতিতে রামেসিসকে বলল সে, তাহলে আমার বাবা এবং মায়ের কথা তোমাকে শুনতেই হবে। এই সুন্দর দেশের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী আমি। সুতরাং এই দেশের প্রতি আমার কর্তব্যের গুরুত্ব আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার চাইতে অনেক বেশি। তা ছাড়া সময় এবং ত্যাগের সাথে সাথে আমাদের ভালোবাসার শক্তি আরো বাড়বে, তাই না? বলা যায় যে, এই একটা সাধারণ কিন্তু ওজনদার যুক্তি দিয়েই রামেসিসের মন ঘুরিয়ে ফেলল সে।

এখন পর্যন্ত ওকে আমি স্রেফ একজন সুন্দরী তরুণী হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু সেই দিন থেকে বুঝতে শুরু করলাম, আসলেই ওর ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী। সত্যি কথা বলতে, ওর গুণ এবং মেধার প্রায় পুরোটাই ঢাকা পড়ে গেছে সৌন্দর্যের পর্দার আড়ালে। কিন্তু যদি কেউ ওই পর্দার আড়াল ভেদ করে উঁকি দিতে পারে তাহলে দেখবে ভেতরে এমন এক বুদ্ধিমত্তা এবং ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে আছে, যা সত্যিই অসাধারণ।

দিনের মাঝে অনেকটা সময় একসাথে কাটায় ওরা, ফলে ওদের ভালোবাসার কথা কারো অজানা নেই। কিন্তু কখনো মানুষের দৃষ্টির আড়ালে যায় না সেরেনা, ফলে কেউ ওদের নিয়ে কোনো অলস গালগল্পের জালও বুনতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে এই জুটির দুজনই অন্যান্য বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী মানুষদের প্রতি দারুণভবে আকৃষ্ট, বিশেষ করে যেকোনো জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় সেরেনার আগ্রহ অনেক বেশি। প্রায় প্রতিদিনই অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য আমাকে খুঁজে নেয় সে, নানা রকম বিষয়ে আলোচনা করে। সেসব বিষয়ের মাঝে আমাদের পৃথিবীর আকৃতির মতো ব্যাপার যেমন থাকে, তেমনি থাকে জোয়ার-ভাটার কারণ এবং চাঁদ আর সূর্য কী উপাদানে তৈরি তাই নিয়ে গবেষণা।

এই আলোচনা এবং বিতর্কগুলোর জন্য বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকি আমি। প্রথম দেখা হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, সেরেনাকে তার মা তেহুতির মতোই ভালোবেসে ফেলেছি। যদিও সে আমার মতামতকে বারবার অস্বীকার করে, কিছুতেই মানতে চায় না যে পৃথিবী আসলে চ্যাপ্টা; এবং জোয়ার-ভাটা হচ্ছে সাগরদেবতা পোসাইডনের অদম্য তৃষ্ণার ফল, যে কিনা প্রতিদিন দুইবার সাগর থেকে গভীর চুমুকে পানি টেনে নেয়। এটাও বিশ্বাস করে না যে, সূর্য আর চাঁদ আসলে একই বস্তু, যা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে, যেটা এমন এক দাহ্য পদার্থে তৈরি, যেটা দিনের বেলায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠে শেষ হয়ে যায় আর রাতে আবার নিজেকে নতুন করে তৈরি করে। এসব ব্যাপারে ওর নিজের কিছু মতামত আছে, যেগুলো এমনই হাস্যকর যে একবারের বেশি দুইবার শুনতে ইচ্ছে করে না। আরে ওর কথা অনুসারে পৃথিবী যদি সত্যিই কুমড়োর মতো গোলাকার হবে, তাহলে ওর নিচে যে মানুষগুলো রয়েছে তারা পড়ে যায় না কেন?

পরবর্তী কয়েক মাসে আমার মাঝে একটা ধারণা ধীরে ধীরে শক্ত রূপ নিতে শুরু করল। সেরেনা খুব সম্ভব কোনো স্বাভাবিক মানব-মানবীর সন্তান নয়, অথবা ওর বাবা-মার মাঝে অন্তত একজনের মাঝে স্বর্গীয় কোনো গুণাবলি ছিল। এমন বুদ্ধি আর সৌন্দর্য এই পৃথিবীর কিছু হতে পারে না। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম, কারণ ইতোমধ্যে আমিও একই পথে হেঁটেছি বা বলা যায় একই আশীর্বাদ পেয়েছি। ব্যাপারটা আর ঠিক কীভাবে বুঝিয়ে বলা যায় আমার জানা নেই।

রাজা হুরোতাসের জন্য আমার মনে যে উঁচু ধারণা, তাতে কোনো খাদ নেই। সে একজন দক্ষ এবং সাহসী যোদ্ধা, পুরনো এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। রাজা হিসেবে তার দক্ষতা বরং আরো বেশি, সত্যি কথা বলতে ফারাও টামোসের পরেই রাজ্য শাসনে তাকে এগিয়ে রাখব আমি। কিন্তু স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কেউই রাজা হুরোতাসকে দেবতা বলে ভুল করবে না।

তবে সেরেনা কার গর্ভে বেড়ে উঠেছে সেটা নিয়ে অন্তত সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, কারণ দুজনের মাঝে কেবল একজনেরই ওই ক্ষমতা আছে। তাই এবার আমার মনে সন্দেহ ঢুকল, তেহুতি বোধ হয় সতীত্বের ওই চুলের মতো সরু পথটায় সারা জীবন অবিচল ছিল না।

তবু আমার সন্দেহকে নিশ্চিত করার জন্য সেরেনার এই সম্ভাব্য দেবত্বকে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। কিছু কিছু লোক ভাবে আমি সব সময়ই কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি বা থাকার ভান করি। তবে তাদের কথাকে সত্যি প্রমাণিত করতে নয়, বরং আমার চারপাশের যারা আছে তাদের সবার প্রতি ভালোবাসা থেকেই কাজটা করতে হবে আমাকে।

৩. দেবত্বের কিছু নির্ভুল পরীক্ষা

দেবত্বের কিছু নির্ভুল পরীক্ষা আছে, যেগুলো কখনো ব্যর্থ হয় না। তার মাঝ একটা হচ্ছে জাদুকর এবং বিশেষ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিদের গোপন ভাষা বোঝার এবং বলার ক্ষমতা। দেবতা হার্মিস, যার আরেক নাম হচ্ছে মার্কারি; এই ভাষা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হার্মিস হলেন বজ্রদেবতা জিউসের প্রিয় পুত্র, যিনি নিজের ছেলেকে মানবজাতির ইতিহাস এবং বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ দিয়েছেন। সেগুলোর মাঝে সবচেয়ে দরকারি কাজগুলো হচ্ছে কথা, ভাষা শিক্ষা এবং বাগ্মিতার সৃষ্টি করা। অন্যদিকে জিউস হার্মিসকে মিথ্যাবাদিতার স্রষ্টা হিসেবেও রেখেছেন, একই সাথে তিনি কথার জালে ভোলানোয় পারদর্শীও বটে। এই নানাবিধ দায়িত্বের অংশ হিসেবেই হার্মিস তৈরি করেছেন দেবতাদের ভাষা, যার নাম তিনি দিয়েছেন তেনমাস।

খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না আমাকে। বেশির ভাগ সন্ধ্যাতেই রাজপরিবারের নারী সদস্যরা অর্থাৎ তেহুতি, বেকাথা এবং সেরেনা তাদের ঘোড়া নিয়ে লম্বা সময়ের জন্য চলে যায় নদীর পাড় ধরে বেড়াতে। ট্যাগেটাস পর্বতমালার দিকে যায় তারা, অথবা দ্বীপের উত্তর তীরে সোনালি বালিতে ঢাকা বেলাভূমির দিকে। রামেসিস আর আমাকেও তাদের সাথে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয় এখন। আমার মতোই সেরেনাও আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পানিতে বাস করা নানা প্রাণী নিয়ে দারুণভাবে আগ্রহী। পাহাড় এবং জঙ্গলে বাস করা পাখি আর জীবজন্তু নিয়েও তার আগ্রহ কম নয়। পাহাড় আর জঙ্গলে বাসা বাঁধা পাখিগুলোর ডিম সংগ্রহ করে সে, সমুদ্রতীরে ভেসে আসা শামুক এবং ঝিনুকের খোলস কুড়াতে ভালোবাসে। প্রতিটি প্রজাতিকে একটা করে কাল্পনিক নাম দিয়েছে সে, নতুন কিছু খুঁজে পেলে তার আনন্দের আর সীমা থাকে না। বেশির ভাগ সৈনিক এবং পুরুষমানুষের মতো এসব ব্যাপারে রামেসিসের খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও সেরেনা তাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে কখনো আপত্তি করে না সে।

সেই বিশেষ দিনটায় আমরা যখন সমুদ্রতীরে গেলাম, দেখলাম জোয়ারের পানি অন্যান্য দিনের চাইতে আজ বেশি ওপরে উঠে এসেছে।

এই দেখে সেরেনা অদ্ভুত এক তত্ত্ব খাড়া করল। পোসাইডনের তৃষ্ণা আজ বেশি বেড়ে গেছে বলে নয়, বরং সূর্য আর চাঁদ আজ কোনো রহস্যময় উপায়ে একই রেখায় চলে এসেছে এবং সাগরের পানির ওপর দ্বিগুণ টান প্রয়োগ করছে। আর সে কারণেই তীরের ওপর বেশি উঠে এসেছে জোয়ারের পানি।

জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছে এমন সব শিক্ষিত মানুষের মতো আমিও খুব ভালো করেই জানি যে সূর্য আর চাঁদ প্রকৃতপক্ষে একই বস্তু। দিনের বেলায় যখন এর শক্তি পূর্ণ সীমায় অবস্থান করে তখন তা সূর্যে পরিণত হয়। আর রাতের বেলা যখন তার আগুন ফুরিয়ে যায়, নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে, তখন তাকে আমরা চাঁদ হিসেবে দেখি। এই সময় যা দেখা যায় তা আসলে তার অগ্নিময় চেহারার ছায়া মাত্র।

এই কথা বলার সাথে সাথে সেরেনা আমার কথার প্রতিবাদ করে বসল। আমি তো আকাশে চাঁদ এবং সূর্যকে একই সাথে একই সময়ে আলাদা আলাদাভাবে দেখেছি। তাহলে তারা এক হয় কীভাবে? এমনভাবে প্রশ্নটা ছুড়ল ও, যেন এই এক কথাতেই সব বিতর্কের অবসান করে ফেলেছে।

নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলাম আমি, ফলে সেরেনাও একই কাজ করতে বাধ্য হলো। তোমার হাতটা মুঠি পাকাও, সেরেনা, ওকে বললাম আমি। কিন্তু কথাটা বললাম তেনমাস ভাষায়। ও যখন আমার কথা অনুযায়ী কাজ করল তখন বললাম, এবার তোমার হাতটা সূর্যের দিকে তুলে ধরো।

এই যে, এভাবে? তেনমাসেই জিজ্ঞেস করল ও। প্রতিটা শব্দ ও নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করছে; কিন্তু নিজেই বুঝতে পারছে না যে কথাগুলো অন্য এক ভাষায় বের হচ্ছে ওর মুখ দিয়ে।

এবার তোমার পায়ের কাছে, মাটির দিকে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ? প্রশ্ন করলাম আমি।

কেবল আমার নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছি, আর কিছুই না, তেনমাসে জবাব দিল ও, কিছুটা বিভ্রান্তি ফুটেছে চেহারায়।

ওই গোলাকার ছায়াটা কীসের? ঘোড়ার পিঠ থেকে একটু ঝুঁকে এসে প্রশ্ন করলাম আমি।

আমার হাতের ছায়া।

তার মানে তুমি বলতে চাইছ আমরা একই সঙ্গে তোমার হাত এবং হাতের ছায়াটা দেখতে পাচ্ছি, ঠিক যেভাবে মাঝে মাঝে সূর্য এবং তার ছায়া অর্থাৎ চাঁদকে দেখতে পাওয়া যায়? প্রশ্ন করলাম আমি। আরো তর্ক করার জন্য সুন্দর মুখটা খুলল সেরেনা, তারপর কী ভেবে বন্ধ করে ফেলল আবার। নীরবে পথ চলতে লাগলাম আমরা। অদ্ভুত হলেও সত্যি, সেদিনের পর থেকে আর চাঁদ এবং সূর্য নিয়ে কথা হয়নি আমাদের মাঝে।

তবে আমরা যখন একা থাকতাম তখন প্রায়ই তেনমাসে কথা বলতাম, যদিও সেরেনা বুঝতে পারত না যে অপরিচিত এক ভাষা ব্যবহার করছি আমরা। কাজটা করতে পেরে দারুণ খুশি হলাম আমি, কারণ এতে করে স্পষ্ট প্রমাণ মিলে গেল যে সত্যিই সেরেনা দেবত্বের অধিকারী।

*

এই পৃথিবীতে একজনই আছে, যে আমাকে এই অলৌকিক জন্মের কথা খুলে বলতে পারে। তাকে এ ব্যাপারে কীভাবে প্রশ্ন করব সেটা নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা করতে হলো আমাকে। এই নাটকের প্রধান চরিত্রের সাথে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, তা সত্ত্বেও এভাবে সরাসরি জিজ্ঞেস করার অধিকার আমার নেই। এই প্রেক্ষাপটে আমার সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা আর চালাকি কাজে লাগিয়ে সত্যি কথাটা বের করতে হবে, এমন কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না যাতে পরে বিপদ হতে পারে। একবার এমনকি এটাও ভাবলাম যে, সত্যি কথাটা খুঁচিয়ে বের করার কোনো দরকার নেই। আমি শুধু এটাই পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই যে, ব্যাপারটা নিছক আমার কৌতূহলের বশে নয় বরং চারপাশের সবার মঙ্গলের জন্যই কাজটা করতে হয়েছিল আমাকে।

প্রথম যখন তেহুতি আর তার বোন বেকাথাকে আমি আঙুরের মোহনীয় রসের স্বাদ নেওয়ার অনুমতি দিই তখন তাদের বয়স ছিল পনেরো কী মোলো বছর। অনেক আগের কথা সেটা। মিশর থেকে তাদের ক্রিটে নিয়ে যাচ্ছিলাম আমি, মিনোসের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পথে ওরা প্রায়ই মিনতি করত যে এই বিয়ে করার থেকে আত্মহত্যা করাও ভালো। তখনই ওদের কষ্ট লাঘব করার জন্য মদ খাওয়ার অনুমতি দিই আমি। তাতে কাজ হয়েছিল, কারণ আমার জানা মতে এরপর আর কখনো আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেনি ওরা। ল্যাসিডিমনে ওদের সাথে আবার দেখা হওয়ার পরে আমি দেখেছি, এই দীর্ঘ সময়ে দ্রাক্ষারসের প্রতি আগ্রহ তো কমেইনি, বরং আরো বেড়েছে। তবে তফাত শুধু এটাই যে, এখন ওরা নিজেদের রুচির ব্যাপারে আরো বেশি খুঁতখুঁতে আর জেদি। কেবল প্রাসাদের আঙুর বাগান থেকে সাবধানে বাছাই করা আঙুরের তৈরি মদেই চুমুক দেয় ওরা, যদিও সেটা ওদের অধিকারও বটে।

শিকারের পানি খেতে আসার জায়গায় শিকারি যেমন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে তেমনি আমিও সঠিক সময়ের অপেক্ষায় রইলাম। তারপর একদিন পুবের এক দূর রাজ্যের রাজা এলো ল্যাসিডিমনে। বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার ছুতোয় এসেছে সে, যদিও সবাই জানে যে তার আসল উদ্দেশ্য রাজকুমারী সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। সেরেনার সৌন্দর্যের খ্যাতি ইতোমধ্যে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তার বাগদান যে হয়ে গেছে এটা অনেকেই এখনো জানে না।

ল্যাসিডিমনে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পারসিয়ান ভাষা জানে। এ কারণে আমার ওপরেই দায়িত্ব পড়ল রাজা সিমাশকি অর্থাৎ সেরেনার পাণিপ্রার্থীকে জানানো যে তার পছন্দের মেয়েটি ইতোমধ্যে আরেকজনের বাগদত্তা হয়ে গেছে। কথাটা শুনে এমন সুন্দর কাব্যিক ভাষায় সে দুঃখ প্রকাশ করল যে, পানি চলে এলো সেরেনার চোখে। তারপর সেরেনা এবং রামেসিস দুজনের গালেই চুমু খেয়ে তাদের জন্য শুভকামনা জানাল রাজা সিমাশকি। হবু দম্পতির সুখী জীবন কামনা করে তাদের বিয়ের উপহার হিসেবে তার নিজের আঙুর বাগান থেকে তৈরি বড় বড় বিশ পাত্রভর্তি লাল মদ উপহার দিল সে।

এই মদে প্রথম চুমুকটা দেওয়ার পরে তেহুতি তার স্বামীর কাছে মন্তব্য করল, এমন সুস্বাদু মদ যদি আরো বিশ পাত্র পাই তাহলে আমি সিমাশকিকে বিয়ে করতে রাজি আছি।

নিজের পেয়ালায় একটা চুমুক দিল রাজা হুরোতাস, তারপর মদটা মুখের ভেতর নেড়েচেড়ে স্বাদ পরীক্ষা করে মাথা ঝাঁকাল। আর আরো বিশ পাত্র পেলে আমিও তোমাকে তার হাতে তুলে দিতে রাজি আছি।

সৌভাগ্যক্রমে আমাদের অতিথি এক বর্ণও মিশরীয় ভাষা জানে না। রাজা এবং রানির এই সংলাপ বিনিময়ের পরেই উপস্থিত সবার মাঝে হাসির ঝড় বয়ে গেল। তবে কারণটা বুঝতে না পারায় সিমাশকি তাদের উদ্দেশ্যে হাতের পেয়ালাটা উঁচু করল কেবল, তারপর বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বাকি সবার সাথে হাসিতে যোগ দিল।

তেহুতির একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। সেটা হলো প্রতি সন্ধ্যায় দুই পেয়ালার বেশি মদ খায় না সে। তার ভাষ্য মতে, আমার মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট আবার এত বেশিও নয় যে বিছানা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য দুজনের বেশি পরিচারিকার সাহায্য লাগবে।

তবে সেই দিন সন্ধ্যায় ভোজসভার হইচই আর হট্টগোলের মাঝে সুযোগ বুঝে নিয়ে তার মদের পরিমাণ চার থেকে পাঁচ পেয়ালায় বাড়িয়ে দিলাম আমি। যতবারই সে আমার দিক থেকে অন্যদিকে তাকাল বা স্বামীকে চুমু খেতে গেল ততবারই নিজের পেয়ালা থেকে ওর পেয়ালায় মদ ঢেলে দিলাম। সুতরাং শেষ পর্যন্ত যখন তেহুতি সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল তখন উঠে দাঁড়ানোর জন্য আমার হাত ধরতে হলো তাকে। পরিচারিকাদের বিদায় করে দিলাম আমি, তারপর কোলে করে নিয়ে এলাম ওপর তলার শোবার ঘরে। দুই হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগল তেহুতি।

ওর পোশাক খুলতে সাহায্য করলাম আমি, তারপর সেই ছোটবেলায় যখন সে ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল তখনকার মতো বিছানায় শুইয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম। তারপর ওর পাশে বিছানার ওপর বসলাম আমি। আরো কিছুক্ষণ চলল আমাদের গল্প আর হাসিঠাট্টা। কিন্তু এর মাঝেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে

আমাদের আলাপকে নির্দিষ্ট একটা দিকে নিয়ে যেতে লাগলাম আমি। আচ্ছা বেকাথার তো চার সন্তান। অথচ তোমার মাত্র একটা। তাও অনেক দিন পরে হয়েছে। কারণটা কী বলো তো? সুযোগ বুঝে প্রশ্ন করলাম একসময়।

এর উত্তর বোধ হয় বিচক্ষণ দেবতারাই কেবল বলতে পারবেন, জবাব দিল তেহুতি। গত ত্রিশ বছরে এমন কোনো রাত বোধ হয় খুব কমই আছে যখন আমি আর জারাস কিছু করিনি। এমনকি আমার লাল নিশান যখন দেখা দেয় তখনো। জারাসের ক্ষুধা রাক্ষুসে, আর আমিও কিছু কম যাই না। কী তীব্রভাবেই যে একটা বাচ্চা চাইতাম আমি! আর ওদিকে তুমি যেমন বললে, আমার ছোট বোন বেকাথা একের পর এক বাচ্চা বের করে যাচ্ছিল, ঠিক যেভাবে গরম রুটি বের করে রাঁধুনি। মাঝে মাঝে প্রায় ঘৃণাই করে বসতাম ওকে এর জন্য। প্রতি রাতে জারাস আমার বিছানায় আসার আগে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার দেবী তাওয়েরেতের কাছে প্রার্থনা করতাম আমি, পুজো দিতাম তাকে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিল না, বলে একটু হাসল সে। যে দেবীকে দেখতে দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানো জলহস্তীর মতো লাগে, তাকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায় বলো? আমার সব পুজো নির্লজ্জের মতো গ্রহণ করছিল সে, কিন্তু কোনো জবাব দিচ্ছিল না। আমার নিজের কোনো বাচ্চা হোক এটা কখনোই বোধ হয় চায়নি সে।

তো তখন তুমি কী করলে? প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু জবাব না দিয়ে হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ফেলল তেহুতি।

ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করতে করতে যদি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিই আমি তাহলে নিশ্চয়ই তুমি কিছু মনে করবে না, টাটা? বিছানা থেকে নেমে কামরার এক কোণে রাখা বিশেষ পাত্রটার ওপর উবু হয়ে বসে পড়ল সে। কয়েক মুহূর্ত আমরা দুজনই চুপচাপ তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা তরল পদার্থের মিষ্টি শব্দটা শুনলাম। তারপর তেহুতি জানতে চাইল, তোমাকে যদি বলি তবে তুমি কাউকে বলবে না তো? অতিরিক্ত মদ খেয়ে ফেলায় খুব সামান্য জড়িয়ে গেছে ওর কণ্ঠস্বর।

এমন কাজ যদি কখনো করি তবে যেন দেবতাদের অভিশাপ নেমে আসে আমার ওপর, সাথে সাথে জবাব দিলাম আমি। আঁতকে উঠল তেহুতি।

এমন অলক্ষুনে কথা বলতে হয় না টাটা। এখনই ফিরিয়ে নাও কথাটা। দেবতাদের এভাবে খোঁচানো কখনোই উচিত নয়! অশুভ দৃষ্টি এড়ানোর জন্য বাতাসে একটা চিহ্ন আঁকল ও।

ইচ্ছে করেই ওর সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। কামরার অন্ধকার কোণে বসে যেসব অমর দেবতা এখন আমাদের কথা শুনছে বা যাদের শোনার সম্ভাবনা আছে তাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম, খবরদার হে বুড়ো দেবতাগণ, আমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। তাহলে রানি তেহুতি উঠে এসে তোমাদের সবার কানের ফুটোয় মুতে দেবে!

আবার হাসিতে ফেটে পড়ল তেহুতি। এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। কোনোমতে নিজের হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল সে। দেবতাদের নিয়ে কখনো ঠাট্টা করা উচিত নয়। তাদের রসবোধ খুবই কম, নেই বললেই চলে। আমাদের নিয়ে তারা কৌতুক করতে পারে ঠিকই; কিন্তু তাদের ব্যাপারে কেউ কিছু বললেই খেপে যায়।

ঠিক আছে, আর কোনো ঠাট্টা করছি না, বললাম আমি। তবে এখন এটা বলো যে গর্ভবতী হওয়ার জন্য কী করেছিলে তুমি। কথাটা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমি। আর এটাও বলছি যে, কাউকে কিচ্ছু বলব না।

কাজটা আসলে একদম শুরুতেই করা উচিত ছিল আমার, বুঝলে? একজন দেবতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম আমি, কোনো দেবীর কাছে নয়। তার নামে একটা ষাঁড় উৎসর্গ করে মাঝরাত পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করেছিলাম। তোমার স্বামী রাজা হুরোতাসের এ ব্যাপারে কী মতামত?

ও কিছুই জানতে পারেনি। সে সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত ছিল আমার স্বামী। আর বাড়ি ফেরার পরেও ওকে কিছু বলিনি আমি। সেই দেবতা কি তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন?

আমি যখন ঘুমিয়ে পড়লাম তখন তিনি আমার স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন, গলা খাদে নেমে এলো তেহুতির, লাল হয়ে উঠল গালগুলো। চোখগুলো নামিয়ে ফেলে বলল, ওটা স্রেফ একটা স্বপ্ন ছিল টাইটা। শপথ করে বলছি। আমি কখনো অন্য পথে পা বাড়াইনি। জারাস আমার স্বামী, সব সময় ওর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম আমি।

সেই দেবতা কে ছিলেন? তোমাকে নিজের পরিচয় জানিয়েছিলেন তিনি? প্রশ্ন করলাম আমি। সাথে সাথে আরো লজ্জা পেয়ে গেল তেহুতি, মাথা নামিয়ে ফেলল। আমার চোখে চোখ রাখতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সে, তারপর এত আস্তে আস্তে কথা বলল যে, আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। জোরে বলো তেহুতি। কে ছিলেন তিনি? আবার জানতে চাইলাম আমি।

এবার আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল তেহুতি। পরিষ্কার গলায় বলল, সেই দেবতা বলেছিলেন যে তিনি অ্যাপোলো। উর্বরতা, সংগীত, সত্য এবং আরোগ্যের দেবতা। তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম আমি, কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন।

চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা আঁকালাম আমি। দেবতার যে গুণগুলোর কথা তেহুতি বলেছে তার সাথে আরো কিছু গুণের কথা যোগ করতে পারি আমি। অসংখ্য গুণ এবং দোষ আছে তার, এবং এগুলোর পাশাপাশি অ্যাপোলো কাম এবং ক্রোধ, মদ এবং মাতলামি, অসুখ এবং মিথ্যার দেবতাও বটে।

তার মানে অ্যাপোলোর সাথে শারীরিক মিলন হয়েছিল তোমার, কথাটা প্রশ্ন নয় বরং মন্তব্যের সুরে বললাম আমি; যেন এটাই নির্ভেজাল সত্যি কথা। সাথে সাথে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল তেহুতির মুখ।

তুমি কি বুঝতে পারছ না টাইটা, ওটা স্রেফ একটা স্বপ্ন ছিল? উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল সে। পুরোটাই ছিল মায়া। সেরেনা আমার স্বামীর ঔরসজাত কন্যা, আমি আমার স্বামীর বিশ্বস্ত স্ত্রী। স্বামীকে ভালোবাসি আমি, ভালোবাসি আমার মেয়েকে। অলিম্পাস বা অন্য কোনো পৃথিবী থেকে নেমে আসা কোনো অস্তিত্ব আমার ভালোবাসা পেতে পারে না।

চোখে নীরব ভালোবাসা আর মায়া নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তেহুতি, দৌড়ে চলে এলো আমার কাছে। আমার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাতে আমার হাঁটু চেপে ধরল, মুখ ডোবাল আমার কোলে।

আমাকে ক্ষমা করে দাও প্রিয় টাটা, আমার কোলের মাঝে মুখ চেপে ধরে থাকায় অস্পষ্ট শোনাল তার কণ্ঠস্বর। পুরোটাই ছিল একটা স্বপ্ন, এবং যা ঘটেছিল তার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সবই ছিল জাদুবিদ্যা, ডাইনির মায়া। ঝড়ের মাঝে উড়ে যাওয়া পালকের মতো অবস্থা হয়েছিল। আমার। একই সঙ্গে ভয়ানক এবং অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা ছিল সেটা। আমার দেহ আর মনের প্রতিটা অংশ তিনি একই সাথে তীব্র ব্যথা আর তীব্র আনন্দ দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। চোখ ধাঁধানো সোনালি আলো আর নিশ্চিদ্র শূন্যতার অন্ধকারে একই সাথে ঢেকে গিয়েছিলাম আমি। তার সৌন্দর্য একই সাথে যেমন শ্বাসরুদ্ধকর, তেমনি আবার পাপের মতোই ভয়ংকর বীভৎস। পুরো ব্যাপারটা যেন এক লহমায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, আবার স্থায়ী হয়েছিল হাজার বছর ধরে। সেরেনা নামের অলৌকিক সত্তাকে তিনিই আমার গর্ভে স্থাপন করেছিলেন এবং তাতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম আমি। কিন্তু এটা তো বাস্তব ছিল না। আমার এই দুষ্টুমির জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না টাইটা?

ধীরে ধীরে ওর রেশমি চুলে হাত বুলিয়ে দিলাম আমি। ফিসফিস করে বললাম, এখানে ক্ষমা করার কিছু নেই তেহুতি। তোমার স্বামী আর তোমার মেয়ে এরাই কেবল বাস্তব। বাকি সব তো ছায়ার খেলা মাত্র। ওদের দুজনকে তোমার হৃদয়ের কাছাকাছি ধরে রেখো, ভালোবেসো। আর তোমার এই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা আর কোনো মানুষকে বলার দরকার নেই। এমনকি আমাকে যে বলেছ এটাও ভুলে যাও।

হুরোতাস যতটা ভেবেছিল, রামেসিস আর তেহুতির বিয়ের আয়োজন করতে তার চাইতেও বেশি সময় লেগে গেল। এই সময়ের মাঝে ছোট ছোট; কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত দুটো যুদ্ধে লড়াই করতে হলো আমাদের। হুরোতাস আর হুইয়ের ইচ্ছে হলো সাইক্লেডস এবং দক্ষিণ ইজিয়ান সাগরের সকল দ্বীপ এবং দেশকে নিজেদের দখলে রাখবে তারা। কিন্তু ত্রিশ বছর ধরে প্রায় সার্বক্ষণিক যুদ্ধের পরেও এই কাজের অর্ধেকও এখনো শেষ হয়নি। একটা দ্বীপপুঞ্জ যদিও বা দখলে এলো সাথে সাথে হয়তো রাজা হুরোতাসের সাম্রাজ্যের অপর প্রান্তে আরেকজন বিদ্রোহ করে বসল। তার ওপর আছে পারসিয়ানরা, যারা সেই শুরু থেকেই পুরো ব্যাপারটার ঝামেলা আরো বাড়িয়ে চলেছে। কোথাও কোনো দুর্বলতা পেলেই চোরের মতো ঢুকে পড়ে তারা, কিছু মানুষকে খুন করে জাহাজভর্তি লুটের মাল নিয়ে আবার চোরের মতোই পালিয়ে যায়। পৃথিবীর পুব প্রান্তে তাদের বিশাল এবং রহস্যময় সাম্রাজ্য, সেখানে একবার চলে গেলে তাদের আর খুঁজে বের করার উপায় থাকে না।

এরা সব অশিক্ষিত বর্বর আর রক্তপিপাসু জলদস্যুর দল, খ্যাপা গলায় আমাকে জানাল হুরোতাস।

কে জানে, আমাদের ব্যাপারেও হয়তো ওরা একই কথা বলে, শান্ত গলায়

জবাব দিলাম আমি। আমরা ওদের পথপ্রদর্শক, নতুন সাম্রাজ্যের নির্মাতা, গর্বে বুক ফুলিয়ে বলে উঠল হুরোতাস। আমাদের কাজই হচ্ছে যে সত্যিকারের দেব-দেবীদের আমরা উপাসনা করি, তাদের নামে এই পৃথিবীকে শাসন করা, সভ্যতার আওতায় নিয়ে আসা।

কিন্তু তুমি এবং তোমার লোকরা তো ওই বর্বরদের মতোই যুদ্ধ ভালোবাসে, জবাব দিলাম আমি। তুমি নিজেই সে কথা বলেছ আমাকে।

আমার লোকেরা লড়াইয়ের চাইতে বেশি ভালোবাসে শুধু একটা জিনিস, সম্মতি জানাল হুরোতাস। আর সেটা হচ্ছে কোনো উৎসব। তাই আমি ঠিক করেছি ওদের এমন এক বিবাহ উৎসব উপহার দেব, যা হবে ওদের দেখা সবচেয়ে বড় উদ্দাম আর বিখ্যাত বিয়ে। এমন উৎসবের কথা কেউ কোনো দিন স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারবে না। জীবিত প্রত্যেকটা মানুষ চাইবে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে।

মাথা ঝাঁকালাম আমি। তারপর তোমার অতিথিরা যখন ভালো মদ আর ভারি খাবারের ঘোরে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে সেই সুযোগে তাদের রাজ্যগুলো দখল করে নেবে তুমি।

প্রিয় টাইটা, তোমার রাজনৈতিক বুদ্ধির প্রশংসা না করে থাকতে পারছি না। দাড়িতে হাত বুলিয়ে উদাস ভঙ্গিতে হাসল হুরোতাস।

আমি বলে চললাম, তোমার সুন্দরী কন্যা সেরেনা যদি কোনো এক দ্বীপের প্রধানকে স্বামী হিসেবে বেছে নিত তাহলে বাকি পনেরোজনই তোমার শত্রুতে পরিণত হতো। কিন্তু এখন ওই ষোলোজনের সবাই তোমার মিত্র এবং অধীন হিসেবে থাকবে। সেরেনার বয়স হয়তো কম; কিন্তু বুদ্ধিতে ও অনেক বৃদ্ধ ব্যক্তিকেও হার মানিয়ে দিতে পারবে।

তোমার সম্পর্কে শেষ যে কথাটা বললাম সেটাই আরো একবার বলতে ইচ্ছে করছে আমার, হাসিটা ধরে রেখেই বলল হুরোতাস। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা পরিষ্কারভাবে দেখতে কখনোই অসুবিধা হয়নি তোমার।

যদিও এখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই তবু গলা নামিয়ে আনলাম আমি। ফলে আমার কথা শোনার জন্য সামনে ঝুঁকে আসতে হলো হুরোতাসকে। এই ষোলোজন মিত্র যদি তোমার সাথে থাকে, বললাম আমি, সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় মিশরকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করা এবং স্বৈরাচার উটেরিক টুরোকে শাস্তি দেওয়াটা কিন্তু মোটেই অসম্ভব কিছু নয়।

স্বীকার করছি এমন সম্ভাবনার কথা আমার মাথাতেও এসেছে। কিন্তু লুক্সর থেকে উটেরিককে সরানোর পর ফারাও পদে কাকে বসাতে চাইছ, টাইটা?

নিঃসন্দেহে তুমি, কোনো দ্বিধা না করেই জবাব দিলাম আমি। কিন্তু মুচকি হাসল হুরোতাস।

স্থায়ীভাবে মিশরে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই আমার। ল্যাসিডিমনে এই নতুন প্রাসাদে বেশ সুখেই আছি আমি। এটা গড়ে তুলতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে। তা ছাড়া মিশরের সাথে আমার যে স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে সেগুলোকে সুখের স্মৃতি বলা যায় না। কিন্তু কাজটা করতে পারে এমন যোগ্য ব্যক্তি আর কে আছে? প্রশ্ন করল সে। এক মুহূর্ত তার প্রশ্নটা নিয়ে চিন্তা করলাম আমি।

ফারাও রামেসিস নামটা শুনতে বেশ ভালোই লাগে, কী বলো? হঠাৎ করেই বলে উঠলাম আমি। হুরোতাসের মুখের ভাব বদলে গেল, কিছুটা যেন বিভ্রান্ত হয়ে উঠল সে। ভুলটা বুঝতে পারলাম আমি এবং সহজেই শুধরে নিলাম। অন্যদিকে আমি যত দূর জানি মিশরে কখনো কোনো নারী শাসক ছিল না। কিন্তু ফারাওইন সেরেনা নামটা শুনতে আরো বেশি অভিজাত এবং সুন্দর লাগছে আমার কানে। এবার আবার হাসি ফুটল হুরোতাসের মুখে। ইচ্ছে করলে ওরা যুগ্ম শাসক হিসেবেও দেশ শাসন করতে পারে। আমার এই কথা শুনে এবার হাসিতে ফেটে পড়ল হুরোতাস।

তোমার কথাগুলো শুনতে এত মজা লাগে, টাইটা। এসব চিন্তা কোথা থেকে আসে তোমার মাথায়? ঠিক আছে, যুগ্ম শাসকই হবে ওরা।

ল্যাসিডিমনে আমি এসে পৌঁছেছি মাত্র কয়েক মাস হলো; কিন্তু ইতোমধ্যে আমার উপস্থিতি এখানে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ত্রিশ বছর আগে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা নিত হুরোতাস। এই সময়ের মাঝে তার কোনো পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। তফাত শুধু এটাই যে, এখন আমার শিক্ষাগুলোকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে পরামর্শ বলে ডাকা হয়।

এই পর্যায়ে এসে হুই এবং তার ছেলেদের ওপরে অবস্থান দেওয়ার জন্য খুব বেশি তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তবে বুদ্ধি খাঁটিয়ে ওকে ল্যাসিডিমনের সামরিক এবং নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঠিক মাঝখানে রাখার ব্যবস্থা করলাম আমি। এ ছাড়া মেমনন নামের সেই শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের নিয়ন্ত্রণ এখনো ওর হাতেই আছে, যাতে করে আমরা মিশর এবং উটেরিকের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিলাম এখানে। কাগজে-কলমে এখন রামেসিসের পদবি হচ্ছে সহকারী অ্যাডমিরাল, অর্থাৎ অ্যাডমিরাল হুইয়ের ঠিক নিচে। রাজকীয় বংশধারা এবং রাজকুমারী সেরেনার সাথে বাগদান হওয়ায় এখন বেশ উঁচুতে ওর অবস্থান। কিন্তু বয়স কম হলেও এখনই যে এই উঁচু অবস্থানের সুবিধা নেওয়া ঠিক হবে না এটা রামেসিস ঠিকই বোঝে। ইতোমধ্যে হুইয়ের পরিবারে সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে সে। প্রায়ই ওকে দাওয়াত দেয় বেকাথা, খাওয়ার টেবিলে নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়ায় পেট পুরে। রামেসিসকে রামি সোনা বলে ডাকে সে। তার ছেলেরাও ওকে নিজেদের পরিবারের একজন বলে ধরে নিয়েছে, কারো মাঝে কোনো হিংসা বা বিদ্বেষের চিহ্নমাত্র নেই। হুইয়ের নাতি নাতনিরা আরো একটা চাচা পেয়ে খুব খুশি,কারণ ইচ্ছেমতো জ্বালানোর জন্য আরো একটা মানুষ পেয়ে গেছে তারা। রামেসিসকে দেখলেই গল্প শোনার জন্য ঘিরে ধরে সবাই, ওর কাঁধে আর পিঠে উঠে বসে থাকে।

রাজা হুরোতাস আর রানি তেহুতিও এটা ভেবে খুব খুশি যে, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে গেলেই রামেসিসের মাধ্যমে তাদের নিজেদের ঘরেও কিছু নাতি নাতনি আসবে। তার জন্য দুর্গে আমার ঘরে পাশেই আরেকটা কামরার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যদিও সেটা সেরেনার কামরা থেকে সবচেয়ে দূরের কামরাগুলোর একটা। রাজকুমারীকে যারা পাহারা দিয়ে রাখে তাদের সংখ্যা খুব সতর্কতার সাথে দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে, যেন সেরেনার কুমারীত্ব রক্ষার জন্য আমার নিজের সতর্ক চোখের পাহারাদারি যথেষ্ট নয়।

আমার জন্য যে কামরার ব্যবস্থা করা হয়েছে তা বিলাসব্যসনের দিক দিয়ে প্রায় রাজা-রানির শোবার ঘরের সমান। যদিও আমার ধারণা রানি তেহুতি নিজেই এর জন্য দায়ী। প্রায় প্রতিদিনই আমার খাওয়ার কামরায় এসে হাজির হয় সে, সাথে থাকে মোটামুটি শ খানেক মানুষের উদরপূর্তি করতে পারে এই পরিমাণে খাবার। তার সাথে আরো থাকে প্রচুর পরিমাণে মদ, যা দিয়ে অনায়াসে এক বছর খেতে পারে একজন মানুষ। মাঝরাতের পরে মাঝে মাঝে শোয়ার পোশাক পরেই আমার ঘরে চলে আসে সে, হাতে থাকে মোমবাতি। লাফ দিয়ে আমার বিছানায় উঠে এসে বলে, মাত্র কয়েকটা মিনিট সময় নেব, টাটা। সত্যি কথা বলছি। খুব দরকারি একটা কথা জিজ্ঞেস করা দরকার তোমাকে, এবং সেটা এখনই।

কয়েক ঘণ্টা পর আমি যখন তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে করে তার নিজের বিছানায় রেখে আসি তখন ওর স্বামী গুঙিয়ে ওঠে, তোমার দরজায় তালা লাগিয়ে রাখতে পারো না টাইটা? তাহলেই তো আর ও ঢুকতে পারে না।

ওর কাছে অতিরিক্ত চাবি থাকে।

তাহলে ওকে তোমার কাছেই রেখে দিও।

নাক ডাকে যে?

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে হুরোতাস। তোমার কি মনে হয় সেটা আমি জানি না?

তবে যাই হোক না কেন, এই আরামদায়ক কামরায় থাকার বদলে মাঝে মাঝে যদি একটু কম ঘুমাতে হয় তাহলে সেটা খুব বেশি কিছু নয়। বিশাল দুর্গ প্রাসাদের সবচেয়ে ওপরের অংশে অবস্থিত আমার কামরা এখান থেকে তুষার ঢাকা পাহাড়চূড়া আর নিচের সবুজ উপত্যকা দুটোই দেখতে পাই। সেনাবাহিনীর আসা-যাওয়া, বন্দরের কর্মব্যস্ততা কিছুই আমার চোখ এড়ায় না। বুনো পাখিদের খুব ভালোবাসি আমি, প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য বারান্দায় খাবার ছড়িয়ে রাখি। ওদের দেখে খুব আনন্দ লাগে আমার। বড় কামরাগুলোর একটাকে আমার গ্রন্থাগার এবং প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছি। তাকগুলো খুব দ্রুতই ভরে উঠল আমার বিভিন্ন পুঁথি আর প্যাপিরাসে। অতিরিক্ত যা বাকি থাকল সেগুলোকে কামরার কোনায় মাথা সমান উঁচু স্তূপ করে রেখে দেওয়া হলো।

*

উটেরিক টুরোর সেই কুখ্যাত কারাগার এবং ডুগের ভয়াবহ অত্যাচার থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিল ক্যাপ্টেন ওয়েনেগ। তার কাছে সত্যিই ঋণী আমি। কিন্তু এখানে এই ল্যাসিডিমনে সে  বেশ অস্বস্তিতে ভোগে, কারণ নিজের কোনো অবস্থান সে # খুঁজে নিতে পারছিল না। তাই নিজের অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদা এবং দক্ষতার সাথে মানানসই হয় এমন কিছু একটা কাজ খুঁজে দিতে অনুরোধ করেছিল আমাকে। সুতরাং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়েনেগ এবং তার ছোট্ট দলটিকে গোপনে মিশর ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেললাম আমি। সেখানে গিয়ে একটা গুপ্তচর দল গঠন করবে ওরা, এবং ফারাও উটেরিক টুরোর শাসনামলে আমার জন্মভূমি মিশরে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাঠাবে আমার কাছে।

ওয়েনেগ যেন তার বন্ধু এবং গুপ্তচরদের খুশি রাখতে পারে সে জন্য তার কাছে যথেষ্ট পরিমাণে রুপার ডেবেন পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম আমি। তাদের কাজে লাগানোর জন্য তিনটি ছোট কিন্তু দ্রুতগতির বাণিজ্যতরী কিনলাম। ওরা যখন গিথিয়ন বন্দর থেকে বিদায় নিল তখন সময় মাঝরাতের পরপর। বন্দরে দাঁড়িয়ে ওদের বিদায় জানালাম আমি, দক্ষিণমুখী এই সমুদ্রযাত্রায় ভাগ্য যেন ওদের সহায় থাকে সেই কামনা করলাম।

ছদ্মনাম এবং ঘন কোঁকড়া দাড়ির ছদ্মবেশে নিজের সুদর্শন চেহারা ঢেকে নিয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝেই সব ব্যবস্থা করে ফেলল ওয়েনেগ। লুক্সরে উটেরিকের প্রাসাদের ঠিক পাশেই একটা মদের দোকানে নিজের আস্তানা গেড়ে বসল সে। ওর কাছে একগাদা কাঠের বাক্স দিয়ে দিয়েছিলাম আমি। প্রতিটায় ছিল অনেকগুলো পায়রা। সবগুলোর জন্ম হয়েছে ল্যাসিডিমনের রাজপ্রাসাদে, পায়রা রাখার খোপে। রাজা হুরোতাসের কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে বড় করা হয়েছে তাদের। এই পাখিগুলোকে নিজের সাথে মিশরে নিয়ে গেল ওয়েনেগ। কয়েক মাসের মধ্যেই লুক্সরে নিজের অবস্থান পাকাঁপোক্ত করে নিল সে এবং দক্ষভাবে কাজ শুরু করে দিল। তার পাঠানো পায়রাগুলোর মাধ্যমে উত্তর সাগরের এই পারে বসেও নিয়মিতভাবে খবর পেতে লাগলাম আমি। এই সাহসী পাখিগুলো চার দিনেরও কম সময়ের মাঝে এই লম্বা দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে। অনেকগুলো মূল্যবান তথ্য পাওয়া গেল ওদের বদৌলতে।

খবর পাওয়া গেল, উটেরিক তার নাম বদলেছে। এখন তার নাম ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস। নিজের দেবত্ব অর্জনকে উদযাপন করার জন্য এই নাম নিয়েছে সে। বুবাস্টিস হচ্ছেন অনেকগুলো গুণের পাশাপাশি পুরুষালি সৌন্দর্য এবং সাহসের দেবতা। পায়রাদের মারফত এই ঘটনা ঘটার প্রায় সাথে সাথেই জেনে গেলাম আমি। তবে দেবতার অজস্র গুণগুলোর মাঝে কেবল একটা গুণকেই আমার হিংসে লাগে। সেটা হচ্ছে দেবতা বুবাস্টিস চাইলেই তার উখিত পুরুষাঙ্গকে এক শ কিউবিট পর্যন্ত লম্বা করতে পারেন, ফলে একবার তার চোখে পড়ে গেলে খুব কম নারীই রেহাই পায়।

দেবতা বুবাস্টিসকে প্রায়ই দেখানো হয় একটা পুরুষ অথবা মেয়ে বিড়াল হিসেবে। এর কারণ হলো তিনি ইচ্ছে করলে নিজের লিঙ্গও পরিবর্তন করতে পারেন। এবং সম্ভবত এ কারণেই এই বিশেষ দেবতাকে বেছে নিয়েছে উটেরিক।

ওয়েনেগের কাছ থেকে আরো জানা গেল, লুক্সর থেকে ভাটিতে নীলনদের বুকে একটা দ্বীপে নিজের জন্য এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করছে ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সেই দশ লাখ রৌপ্যখণ্ডের প্রায় পুরোটাই খরচ করছে সে, যেগুলো মেসি বিজয়ের পর খামুদির কাছ থেকে তাকে এনে দিয়েছিলাম আমি।

এর অল্প সময় পরেই জানা গেল গিথিয়ন বন্দরে মেমনন নামের সেই রণতরীর অবস্থানের কথা জেনে গেছে ফারাও উটেরিক বুবাস্টিসের গুপ্তচররা, যাতে করে মিশর থেকে পালিয়ে এসেছিলাম আমি আর রামেসিস। ওয়েনেগ জানিয়েছে ফারাওয়ের নৌ সেনাপতিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জাহাজটিকে পুনরুদ্ধার করে লুক্সরে ফিরিয়ে আনতে। তাদের ওপর আরো নির্দেশ আছে জাহাজ নিয়ে ফিরে আসার সময় তাতে যেন বিশ্বাসঘাতক টাইটাও উপস্থিত থাকে। শিকলে বেঁধে নিয়ে আসতে হবে তাকে। আমার মাথার ওপর পঞ্চাশ হাজার রৌপ্যখণ্ডের পুরস্কার ঘোষণা করেছে ফারাও। বোঝা যাচ্ছে আমাকে এখনো ভুলে যায়নি সে ক্ষমা করা তো দূরে থাক।

ইদানীং নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদাসীন হয়ে পড়েছি আমি। ভেবেছিলাম এই দুর্গে আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়ে দিতে পারব, নিরাপত্তার কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু এই বিশেষ খবরটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। এখন পর্যন্ত গিথিয়ন বন্দরের ঠিক মাঝখানে মেমননকে নোঙর করে রাখতে নির্দেশ দিয়েছে রামেসিস, এবং নামে মাত্র কিছু নাবিক রাখা হয়েছে জাহাজে। ফলে জাহাজটা যে কারো চোখেই খুব সহজে ধরা পড়বে। এবার আমার নির্দেশে তাকে বন্দরের প্রাচীরের পাশে নিয়ে আসা হলো এবং পানির নিচে দিয়ে তার খোল বেঁধে রাখা হলো বন্দরের পাথুরে কাঠামোর সাথে। আমার কবজির সমান মোটা দড়ি ব্যবহার করা হলো এই কাজে। প্রতি মুহূর্তে বিশজন সশস্ত্র নাবিক পাহারা দিতে লাগল জাহাজটাকে, এবং প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর তাদের বদল করা হতে লাগল। মেমনন যেখানে নোঙর করা আছে সেখান থেকে মাত্র ত্রিশ কদম দূরে একটা পাথরের বাড়িতে আরো পঞ্চাশজন লোককে মোতায়েন রাখা হলো সব সময়ের জন্য। শত্রুদের কোনো দলকে তীরে উঠতে দেখলেই মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ চালাতে পারবে তারা।

দুই সপ্তাহের মধ্যেই লুক্সরে অবস্থানরত ওয়েনেগের কাছ থেকে আরো একটা পায়রা পেলাম আমি। পাখিটা যে খবর নিয়ে এসেছে তাতে জানা গেল পনেরো থেকে বিশজন লোকের একটা ছোট দল নীলনদের মুখ থেকে সাগর অভিমুখে রওনা দিয়েছে। ছোট একটা মাছ ধরার নৌকা নিয়ে গেছে তারা, যেটা দেখে কিছু সন্দেহ করবে না কেউ। আন্দাজ করলাম মেমননকে দখল করে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই আসছে ওরা। এই অভিযানের দায়িত্বে থাকা লোকটার নাম জানিয়েছে ওয়েনেগ। পানমাসি নামে মহা ধূর্ত এক লোক। রামেসিস এবং আমি দুজনই তাকে আগে দেখেছি। এই মুহূর্তে সে উটেরিকের প্রিয় ব্যক্তিদের একজন। বয়স সবে পঁচিশ; কিন্তু ইতোমধ্যে শক্তপাল্লার লোক বলে খ্যাতি অর্জন করে নিয়েছে। ডান গালে একটা কাটা দাগ, খোঁড়াননা দেখে তাকে চেনা যায়। যুদ্ধে আহত হয়েছিল সে, ফলে ডান পা একটু টেনে টেনে হাঁটতে হয় তাকে।

এর কয়েক দিন পরেই ট্যাগেটাস পর্বতমালায় অবস্থিত পাহারাদারদের মারফত জানা গেল গিথিয়ন উপসাগরে একটা সন্দেহজনক চেহারার মাছ ধরার নৌকা দেখা গেছে। দেখে মনে হচ্ছিল জাল ফেলায় ব্যস্ত; কিন্তু সময়টা তখন প্রায় সন্ধ্যা এবং দূরত্বটা অনেক বেশি হওয়ায় নিশ্চিতভাবে কিছু বোঝা যায়নি। দুর্গে বসে এই খবর শোনার সাথে সাথেই আমি আর রামেসিস ঘোড়া নিয়ে পূর্ণ গতিতে বন্দরে এসে পৌঁছলাম। মেমননের পাহারায় নিয়োজিত লোকগুলো জানাল সব ঠিকই আছে। তার পরও ওদের সম্পূর্ণ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিলাম আমি। তারপর নিজেরাও নির্দিষ্ট অবস্থানে চলে এলাম, অপেক্ষা করতে লাগলাম এরপর কী ঘটে দেখার জন্য। আমি প্রায় নিশ্চিত যে মেমননকে দখল করার জন্য ভোরের ঠিক আগের সময়টা বেছে নেবে পানমাসি, কারণ সে আশা করবে যে ওই সময়টাতেই আমাদের প্রহরীদের শক্তি এবং উৎসাহ সবচেয়ে কম থাকবে। বরাবরের মতোই এ ব্যাপারেও আমার ধারণা সঠিক প্রমাণিত হলো। ভোরের প্রথম আলো ফোঁটার ঘণ্টাখানেক আগে পাশের জঙ্গল থেকে একটা রাতচরা পাখির কর্কশ ডাক ভেসে এলো আমার কানে, অথবা বলা যায় কেউ একজন অপটু গলায় পাখিটার ডাক নকল করার চেষ্টা করল। পাখিটা আমার অন্যতম প্রিয় পাখিগুলোর একটা, ফলে নকল গলাটা বোকা বানাতে পারল না আমাকে। নিঃশব্দে খবর ছড়িয়ে দিলাম আমি, প্রস্তুত হয়ে গেল সবাই।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটল। পরে জেনেছিলাম এই সময়টায় পানমাসির সঙ্গীরা বন্দরের দরজায় নিয়োজিত প্রহরীদের পেছন থেকে এসে এক এক করে তাদের চুপ করিয়ে দিচ্ছিল। কারো গলায় ছুরি চালানো হয়, কারো মাথায় মারা হয় মুগুরের বাড়ি। তার পরেই বন্দরের মালপত্র রাখার ঘরগুলোর মাঝ থেকে প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো কিছু ছায়ামূর্তি। অস্ত্র বাগিয়ে ধরে এক দৌড়ে বন্দরের পাথুরে মেঝে পেরিয়ে মেমননের দিকে এগিয়ে এলো তারা, যেখানে জাহাজটা নোঙর করা রয়েছে। আমার নির্দেশ অনুযায়ী জাহাজের সিঁড়ি আগেই নামিয়ে রাখা হয়েছিল, যেন আগন্তুকদের জাহাজে ওঠার জন্য নীরব আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

এর সাথে সাথে বন্দরের ওপর বেশ কিছু পানির পিপা আর মালভর্তি বাক্সও রেখেছিলাম আমি, যেন সকালবেলা আলো ফোঁটার সাথে সাথেই সেগুলো জাহাজে ওঠানোর কাজ শুরু হবে। এর পেছনে লুকিয়ে বসে ছিল আমাদের তীরন্দাজ আর বর্শাধারী সৈনিকরা। ছায়ামূর্তিগুলোর সামনে তাদের দলনেতা পানমাসিকে চিনতে পারল আমার চোখ। তবে তারা সবাই একেবারে খোলা জায়গায়, জাহাজের সিঁড়ির সামনে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমি। যেই দেখলাম ওদের, ওরা এখন যথেষ্ট সামনে চলে এসেছে এবং আমাদের দিকে পেছন ফিরে আছে সাথে সাথে আক্রমণের নির্দেশ দিলাম সৈন্যদের। পিপা আর বাক্সগুলোর পেছনে লুকানোর জায়গা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সবাই। প্রত্যেকে ধনুকে একটা করে তীর জুড়ে ফেলেছে, এবার একই সাথে ছোঁড়া হলো সেগুলো। এত কাছ থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগই নেই, প্রায় প্রতিটা তীরই শত্রুদের দেহে গিয়ে বিঁধল। ব্যথা আর আতঙ্কের চিৎকারে ভরে গেল চারদিক। প্রথম ধাক্কাতেই পানমাসির দলের প্রায় অর্ধেক লোক ভূপাতিত হলো। বাকিরা এবার ঘুরে দাঁড়াল আমাদের মুখোমুখি হতে। কিন্তু ওদেরকে চমকে দেওয়ার সুযোগটা খুব ভালোভাবেই নিতে পেরেছি। আমরা। প্রায় সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেল যুদ্ধ। শত্রুদের যারা বেঁচে গেল তারা অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে, দুই হাত ওপরে তুলে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ছিল পঁচিশজন। তীরের আঘাত থেকে বাঁচতে পেরেছে মাত্র ষোলোজন। পানমাসিও বেঁচে যাওয়া লোকগুলোর মাঝে রয়েছে দেখে খুশি হলাম আমি। লোকটার উদ্ধত সাহস এবং বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ওকে চরম শাস্তি দিতে চাই আমি। কিন্তু তখনো জানি না যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা দিক থেকে আমার এই ইচ্ছে ভেস্তে যাবে পুরোপুরি।

*

বন্দিদের বাঁধার জন্য ক্রীতদাসদের শিকল নিয়ে এলো রামেসিসের লোকেরা। প্রথমে সবার অন্তর্বাস বাদে আর সব পোশাক খুলে ফেলা হলো। তারপর হাতগুলো বাঁধা হলো পিছমোড়া করে, গোড়ালিতেও বেঁধে দেওয়া হলো শিকল। ফলে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটা ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো উপায় থাকল না কারো। তারপর আবর্জনা ফেলার দুটো বড় গাড়িতে তোলা হলো সবাইকে। একদল ষাড়ের সাহায্যে গাড়ি দুটো নিয়ে যাওয়া হলো দুর্গে।

দস্যুদের ধরা পড়ার খবর জানানোর জন্য কয়েকজনকে আগেই পাঠিয়ে দিলাম আমি। ফলে আমাদের এগোনোর পথের দুই পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেল জনতা, বন্দিদের গায়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল কাদামাটি আর বিষ্ঠার দলা। অপরাধীদের কপালে এখন অপেক্ষা করছে বন্দিদশা, কঠোর বিচার এবং নিঃসন্দেহে নিষ্ঠুর শাস্তি।

তিন দিন পর দুর্গের প্রাঙ্গণে বন্দিদের বিচারে বসল রাজা হুরোতাস। অবশ্য বিচার করার মতো তেমন কিছু নেই, কারণ রায় কী হবে তা মোটামুটি সবাই আগে থেকেই জানে। তার পরও বিচার অনুষ্ঠান দেখার জন্য দর্শকের অভাব হলো না। সেই দর্শকদের মাঝে রানি তেহুতি এবং রাজকুমারী সেরেনাও থাকল। মায়ের পায়ের কাছে একটা আসনের ওপর বসল সে।

বিচারে সাক্ষ্য দিলাম আমি এবং বন্দিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে সাজিয়ে-গুছিয়ে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাজির করলাম। পানমাসি এবং তার দলের গুণ্ডাগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট হলো। ইচ্ছে করলে এগুলো ছাড়াই বিচারের রায় ঘোষণা করতে পারত রাজা হুরোতাস; কিন্তু সে আসলেই একজন দয়ালু মানুষ।

এই দস্যুদলের সবার জন্য শাস্তির বিধান ঘোষণা করা হবে এখন। তার আগে তাদের দলনেতার যদি কিছু বলার থাকে তবে বলতে পারে, ঘোষণা করল সে।

এতক্ষণ ধরে সিংহাসনের সামনে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে উবু হয়ে বসে ছিল পানমাসি। তার লোকেরাও সবাই একই অবস্থানে বসে ছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। ইতোমধ্যে আমি বলেছি মহা ধূর্ত এক মানুষ সে। কিন্তু এবার সে যে তুখোড় অভিনয় শুরু করল তাতে এমনকি আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম। প্রথমেই চেহারায় প্রচণ্ড দুঃখ এবং আফসোসের ভাব ফুটিয়ে তুলল সে, যেন নিজের অপরাধার জন্য সত্যিই অনুতপ্ত। খোঁড়া পা ইচ্ছে করেই অনেক বেশি টেনে টেন হাঁটছে, নিঃসন্দেহে উপস্থিত সবার সহানুভূতি কাড়ার জন্য। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ময়লা আর অশ্রু থুতনিতে এসে জমা হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে নিচে। কাঁপা গলায় মিশরে নিজের ফেলে আসা পরিবারের বর্ণনা দিতে শুরু করল সে। তিন স্ত্রীর কথা বলল, যাদের প্রত্যেকেই গর্ভবতী। বারোটা সন্তান আছে তার, তাদের মাঝে একজন আবার পঙ্গু একটা মেয়ে, যাকে সে অত্যন্ত ভালোবাসে। সে না থাকলে সবাই না খেয়ে মরবে। কথাগুলো এমনই অবিশ্বাস্য যে, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম আমি। পানমাসি যে লুক্সরের বুকে অন্তত চারটি পতিতালয়ের মালিক, এ কথা নিশ্চিতভাবে জানা আছে আমার। এবং এটাও জানি যে, ওগুলোর সেরা খদ্দের সে নিজেই। শুধু বউদের আর্তনাদ শুনে মজা পাওয়ার জন্যই ওদের ধরে ধরে পেটায় সে। আর তার মেয়েটা পঙ্গু হয়েছে, কারণ সে ভালো করে হাঁটতে শেখার আগেই একবার তার মাথায় কোদাল দিয়ে বাড়ি মেরেছিল পানমাসি। সে যখন এই আবেগঘন বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে চলে এলো তখন আমার মতামত জানার জন্য আমার দিকে তাকাল রাজা হুরোতাস। মাথা নাড়লাম আমি। আমার আর তার প্রায় একই রকম, এটা বুঝতে পেরে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল হুরোতাস।

রায় শোনার জন্য সকল বন্দিকে উঠে দাঁড়াতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, বলল সে। অপরাধীরা সবাই উঠে দাঁড়াল, তবে এখনো সবার চোখ মাটির দিকে। আমার ধারণা হুরোতাসের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার আগেই তাদের কী শাস্তি হতে যাচ্ছে এ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে গেছে সবাই।

আজ থেকে ষাট দিন পর আমার মেয়ে সেরেনার সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে মিশরের রাজপরিবারের সদস্য যুবরাজ রামেসিসের। সেই আনন্দঘন উৎসবের দিনে আমার মেয়ের সুখ-শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য বিবাহ এবং বৈবাহিক সম্পর্কের অভিভাবক দেবী হেরার নামে এই ষোলোজন বন্দিকে উৎসর্গ করা হবে। প্রথমে মাছ ধরার বড়শির সাহায্যে বন্দিদের নাড়িভুড়ি তাদের পেছন দিক থেকে বের করে আনা হবে। তারপর তাদের শিরচ্ছেদ করা হবে। সব শেষে তাদের মৃতদেহকে আগুনে পুড়িয়ে সেই ছাই ভাটার সময় সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে দেওয়া হবে। এই সময় দেবী হেরার পূজারিনিরা আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ সুখ কামনা করে প্রার্থনা সংগীত গাইবে হেরাকে উদ্দেশ্য করে।

রাজা হুরোতাসের রায়ে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকালাম আমি। অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা বিচার করলে কোনো সন্দেহ নেই যে সঠিক শাস্তিই দেওয়া হয়েছে তাদের।

না!

জোর গলায় বলে ওঠা কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠল, এমনকি আমি এবং রাজা হুরোতাসও। সবগুলো মাথা একই সাথে ঘুরে গেল রাজকুমারী সেরেনার দিকে, সবার মুখে একই রকম হতচকিত ভাব। ওদিকে সেরেনা তখন তার বাবার বিরোধিতা করতে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।

না! আবার বলে উঠল ও। এক শ বার না!

এই অভাবনীয় আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার পর সম্ভবত সবার আগে হুরোতাসই প্রাথমিক চমকটা কাটিয়ে উঠল। সেরেনা তার একমাত্র সন্তানই শুধু নয়, বরং একমাত্র দুর্বলতাও বটে। না কেন প্রিয় কন্যা আমার? প্রশ্ন করল সে। আমি ঠিকই বুঝতে পারলাম নিজের মেজাজকে সামলে রাখতে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে তাকে। এই কাজ তো আমি তোমার সুখ নিশ্চিত করার জন্যই করছি।

আমি তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসি বাবা। কিন্তু এক সারিতে শুইয়ে রাখা ষোলোটা মাথাবিহীন লাশ দিয়ে আমাকে সুখী করা যাবে, এমনটা ভাবলে ভুল ভেবেছ তুমি।

ওদিকে প্রাঙ্গণে উপস্থিত আর সবার মতোই পানমাসি আর তার লোকেরাও প্রথমবারের মতো মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাকিয়ে আছে রাজকুমারীর দিকে। এবার তাদের চেহারায় আশার আলো ফুটতে দেখলাম আমি। কিন্তু তার চাইতেও বেশি স্পষ্ট হয়ে যেটা ফুটেছে সেটা হলো সেরেনার সৌন্দর্য দেখে তাদের অবিশ্বাস মেশানো বিস্ময়। তার ওপর এখন প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে আছে সেরেনা, ফলে তার টুকটুকে লাল গাল জ্বলজ্বলে চোখ আর ঈষৎ কাঁপতে থাকা সুন্দর ঠোঁট জোড়া- এগুলোকে যেন আরো বেশি সুন্দর লাগছে। ওর কণ্ঠস্বর যেন কোনো স্বর্গীয় বাদ্যযন্ত্রের সুমধুর বাজনা, সম্মোহিত করে রেখেছে শ্রোতাদের। এমনকি ওর কণ্ঠস্বর শুনে অভ্যস্ত আমিও যেন বিমোহিত হয়ে পড়েছি।

তাহলে এই দস্যুদের নিয়ে কী করা উচিত বলে তোমার মনে হয়? হতাশামাখা গলায় প্রশ্ন করল হুরোতাস। ইচ্ছে করলে ওদেরকে রণতরীর দাঁড় বাওয়ার কাজে লাগিয়ে দিতে পারি আমি, অথবা তামার খনিতে পাঠাতে পারি শ্রমিক হিসেবে…

মিশরে ওদের স্ত্রী এবং পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাও সবাইকে, তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল সেরেনা। যদি তুমি দয়াপরবশ হয়ে এই কাজটুকু করো তাহলে অনেক মানুষ খুশি হবে। এবং আমিও আমার বিয়ের দিনে সুখী হব, বাবা।

কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলল হুরোতাস। দেখলাম রাগে জ্বলে উঠল তার চোখ জোড়া। তার পরেই হঠাৎ মুখ বন্ধ করে ফেলল সে। উভয় সংকটে পড়লে তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনেকেই যে কাজটা করে হুরোতাসও সেই একই কাজ করল। অসহায় চোখে আমার দিকে তাকাল সে। হা হা করে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল আমার। যুদ্ধের ময়দানে অভিজ্ঞ সেনানীকে সামান্য এক তরুণীর হাতে নাস্তানাবুদ হতে দেখলে হাসি পাওয়ারই কথা।

বহুদিন আগেই আমি হুরোতাসকে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে কথা পড়তে শিখিয়েছিলাম। এবার নিঃশব্দে দুটো শব্দ উচ্চারণ করল আমার ঠোঁট। মেনে নাও! ওকে উপদেশ দিলাম আমি।

গম্ভীর চেহারায় সেরেনার দিকে ফিরল হুরোতাস। এটা কিন্তু একেবারেই বোকামি, কড়া গলায় মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল সে। আমি আর এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। এই দস্যুদেরকে তোমার বিয়ের উপহারের অংশ হিসেবে দান করা হলো। এবার তুমি ওদের নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারো।

দ্বীপের অন্য প্রান্তে সৈকতের কাছাকাছি খোঁজাখুঁজি করতেই সেই ছোট্ট মাছ ধরার নৌকাটা পাওয়া গেল, যাতে করে নীলনদের মুখ থেকে এ পর্যন্ত এসেছিল পানমাসি আর তার লোকেরা। নৌকাটা টেনে তীরে উঠিয়ে শুকনো পাতা আর শেওলা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল তারা। নৌকাটা দেখতে যেমন নড়বড়ে মনে হয় আদতে নিশ্চয়ই তার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। তা না হলে এত অল্প সময়ে এতগুলো লোক নিয়ে এই দূরের পথ পাড়ি দিতে পারত না। রাজকুমারী সেরেনার ইচ্ছে অনুযায়ী আমার লোকেরা পানমাসি এবং তার অবশিষ্ট সঙ্গীদের নৌকায় তুলে দিল। তবে অস্ত্র বা খাবারদাবার কিছুই দেওয়া হলো না তাদের। এবার দক্ষিণ দিকে নীলনদের অববাহিকা বরাবর আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলাম আমি।

আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই নেই, অনুনয় জানাল পানমাসি। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যাব আমরা সবাই। দয়া করো, হে টাইটা। তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি আমি।

তোমাকে বড়জোর কিছু উপদেশ দিতে পারি আমি। কিন্তু খাবার এবং পানি দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ ওগুলোর দাম বেশি, আর আমাদের কাছে খুব অল্প পরিমাণেই আছে। তবে প্রস্রাব ঠাণ্ডা করে রাখতে পারো। ওভাবে খেতে অনেক বেশি ভালো লাগে, বন্ধুত্বপূর্ণ গলায় তাকে বললাম আমি। চব্বিশ ঘণ্টার সময় দেওয়া হচ্ছে তোমাদের। তার পরই তোমাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটা রণতরী পাঠিয়ে দেব আমি। বিদায়, পানমাসি। মিশরে পৌঁছানোর পর ফারাও উটেরিককে আমার শুভেচ্ছা জানিও- অবশ্য যদি কোনো দিন পৌঁছতে পারো আর কি। এই বলে আমার লোকদের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকালাম আমি। এতক্ষণ বন্দিদের পাহারা দিচ্ছিল ওরা, আমার ইশারা পেয়ে এবার ঘোড়া থেকে নেমে নৌকাটাকে সৈকত থেকে সাগরে ঠেলে নামানোর প্রস্তুতি নিতে লাগল। কিন্তু সেই মুহূর্তে একটা সুরেলা গলার চিৎকারে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো তারা।

দাঁড়াও টাইটা! এখনই যেতে দিও না ওদের! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। দেখলাম ল্যাসিডিমনের রাজকুমারী সেরেনা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার পেছনে রয়েছে ছয়টা মালবাহী ঘোড়া, প্রত্যেকটার পিঠে বোঝাই খাবারের ঝুড়ি আর পানির মশক। জঙ্গলের মাঝ থেকে বেরিয়ে সৈকতের বালি পেরিয়ে এদিকেই আসছে তারা। ওদের কি খাবার বা পানির দরকার হবে না, বোকা কোথাকার? কাছে এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল ও। মিশরে পৌঁছানোর আগেই তো খিদে তেষ্টায় মারা যেত সবাই!

আমি তো সেটাই আশা করছিলাম, বিড়বিড় করে বললাম আমি। কথাটা শুনেও না শোনার ভান করল সেরেনা। পরিস্থিতি আরো বিব্রতকর হয়ে উঠল যখন দেখলাম খাবার আর পানি ছাড়াও হুরোতাসের ভাড়ার থেকে বড় বড় দুই মশক ভর্তি সবচেয়ে ভালো লাল মদও নিয়ে এসেছে ও। আমার কাছে এটা একেবারেই বোকামি বলে মনে হলো।

তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সেরেনার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল পানমাসি, তার সৌন্দর্য, মহানুভবতা আর দয়ার প্রশংসা করতে লাগল প্রাণ খুলে। সকল দেবতার আশীর্বাদ কামনা করল সে সেরেনার ওপর। কিন্তু ব্যাটা চোখের কোণ দিয়ে সেরেনার দিকে কীভাবে তাকাচ্ছে সেটা আমার চোখ এড়াল না, এবং বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম আমি। এগিয়ে গিয়ে দড়াম করে পানমাসির দুই নিতম্বের মাঝ বরাবর একটা লাথি কষলাম। উল্টে পড়ে গেল লোকটা। বললাম, এবার ভাগ এখান থেকে, ব্যাটা ধাড়ি ছুঁচো কোথাকার। আর কখনো যেন এই দিকে না দেখি তোকে, তাহলে মাটিতে পুঁতে রেখে দেব। চিরকাল তখন এখানেই থাকতে হবে তোকে!

পাছা ডলতে ডলতে তাড়াতাড়ি নৌকার দিকে ফিরে গেল পানমাসি, চিৎকার করে গালাগালি করছে নিজের লোকদের। দ্রুত দাঁড় বাইতে শুরু করল লোকগুলো, তারপর প্রবালপ্রাচীর পার হয়েই পাল খাটাল নৌকায়। দক্ষিণ দিকে ভেসে চলল তাদের নৌকায়। পানমাসি আর আমি পরস্পরের দিকে তাকিয়েই রইলাম, যতক্ষণ না দূরত্বটা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াল, তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে প্রিয় রাজকুমারীকে নিয়ে দুর্গ-প্রাসাদে ফিরে এলাম আমি। কেন যেন আমার মনে হতে লাগল ওই ধূর্ত শয়তানটার সাথে এটাই আমার শেষ দেখা নয়, আবারও ওর মুখোমুখি হতে হবে আমাকে।

পরবর্তী দিনগুলোর ব্যস্ততা আর আনন্দও আমার মন থেকে এই আশঙ্কা পুরোপুরি মুছে ফেলতে ব্যর্থ হলো। বেশ কয়েকবার সেরেনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলতে মন চাইল আমার, ইচ্ছে করল মেমননকে নিয়ে ধাওয়া করি পানমাসির পেছনে, সব ঝামেলা চুকিয়ে দিয়ে আসি। আমি জানি, ইচ্ছে করলে রামেসিসকে আমার সাথে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারব। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার অর্থ হচ্ছে নিজের সম্মানকে বিনষ্ট করা। আমার মুখ দিয়ে একবার যে কথা বের হয় তাকে আমি পবিত্র বলে গণ্য করি।

এখন যখন চিন্তা করি যে ওই একবার যদি আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতাম তাহলে হয়তো সহস্র সাহসী এবং সম্মানিত মানুষের জীবন বেঁচে যেত। সেইসাথে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা আর কষ্ট থেকে বেঁচে যেত আমার কাছের প্রিয় মানুষগুলো। কিন্তু এই চিন্তাতে খুব সামান্যই সান্ত্বনা মেলে।

*

মিশরের যুবরাজ রামেসিস এবং স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনার বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রায় সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়ল আমারই ঘাড়ে। যার অর্থ হচ্ছে যদি সব কিছু ঠিকভাবে ভালায় ভালোয় শেষ হয় তবে তার সম্পূর্ণ প্রশংসা পাবে স্পার্টার রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতি। আর যদি কোনো কারণে কোনো বিপদ দুর্যোগ বা ঝামেলা এসে হাজির হয় তাহলে অভিযোগের সবগুলো আঙুল সাথে সাথে তাক করা হবে আমার দিকে।

বিয়ের আসল অনুষ্ঠানের আগে এক মাস ধরে চলবে বিবাহপূর্ব উৎসবের বহর। এবং তার পরের এক মাস চলবে বিবাহ-পরবর্তী উৎসব। রানি তেহুতির অনুরোধ অনুসারে এই সব অনুষ্ঠানই উৎসর্গ করা হবে দেবতা অ্যাপোলোর নামে, যিনি উর্বরতা বা বহু সন্তান জন্মদানের দেবতা, যদিও তার অন্যান্য গুণের মাঝে অবিশ্বস্ততাও রয়েছে।

এই অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রধান অংশ হিসেবে থাকবে ভোজ এবং আনন্দ উৎসব, দেড় শ প্রধান প্রধান দেবতা এবং দেবীর পুজো, রথের দৌড় এবং নৌকাবাইচ, নাচগান, প্রচুর পরিমাণে মদপান, কুস্তি; গান, বক্তৃতা এবং ধনুর্বিদ্যার প্রতিযোগিতা, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি। সবগুলো অনুষ্ঠান এবং প্রতিযোগিতাতেই থাকবে বিজয়ীদের জন্য সোনা এবং রুপোর প্রচুর পরিমাণে পুরস্কারের ব্যবস্থা।

রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতির আমন্ত্রণে আনন্দ উৎসবে যোগ দিতে আসছে তাদের মোলোজন করদ রাজা এবং তাদের পরিবার। উপরোক্ত কাজগুলোর দেখাশোনার সাথে সাথে তাদের উপযুক্ত বাসস্থান নির্মাণের তদারকিও করতে হবে আমাকে।

হুরোতাসের সাথে এসব রাজাদের সম্পর্কটা একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। প্রায় ত্রিশ বছর আগে ক্রিট থেকে তেহুতিকে নিয়ে পালানোর পর হুয়োতাস পৃথিবীর বুকে এক টুকরো জায়গা খুঁজছিল, যেখানে সে রাজ্য বিস্তার করতে পারে, হয়ে উঠতে পারে শক্তিশালী। গিথিয়ন বন্দরে প্রথমবারের মতো নোঙর করার পর তৎকালীন রাজা ক্লাইডিসের কাছ থেকে তার রাজ্য দখল করে নেয় সে, বর্তমানে যার নাম ল্যাসিডিমন। কাজটা করার জন্য বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি তাকে, স্রেফ রাজার অসন্তুষ্ট প্রজাদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহ দিয়েছে, তারপর হুরোতাস নদীর তীরে তিন দিন ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পরাজিত করেছে রাজাকে।

রাজ্যের উত্তরে আরো তিনটি রাজ্যের রাজাদের নিজের মিত্র হিসেবে পেয়েছিল ক্লাইডিস। তারা তিনজনই যুদ্ধে ক্লাইডিসের পক্ষে লড়তে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে। তবে তাদের বড় ছেলেরা নতুন রাজা হুরোতাসের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। তবে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়নি হুরোতাস, অথচ সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তার বদলে তিনজনের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ দাবি করে সে। বলা বাহুল্য, তিনজনই অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সেই প্রস্তাব মেনে নেয়, কারণ তারা ভেবেছিল মরণই তাদের কপালে লেখা আছে। তারপর তাদের ট্যাগেটাস পর্বতমালার অপর পাশে নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে অনুমতি দেয় হুরোতাস। রাজ্যগুলো ইতোমধ্যে তার দখল চলে এলেও তিন পুত্রকে স্বাধীনভাবে রাজ্য চালানোর অনুমতি দেয় সে, নিজের জন্য রাখে কেবল ক্লাইডিসের রাজ্যটুকু।

স্বাভাবিকভাবেই এরপর আজীবন নিজ নিজ রাজ্যের আয় থেকে বেশ বড় অঙ্কের একটা অংশ হুরোতাসকে দিতে আগ্রহী হয় সেই তিনজন। তাদের উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চালু করা হয়। এমন এক ব্যবস্থা, যাতে সবাই লাভবান হচ্ছে, কেউ বেশি আর কেউ একটু কম- এই যা।

তিন রাজাকে তাদের জীবন এবং রাজ্য দুটোই নিজেদের দখলে রাখার অনুমতি দেয় হুরোতাস। ওদিকে তার নিজেরও তিন-তিনটে রাজ্যের অসংখ্য বর্বর গোত্রের অধিবাসীকে সামলানোর ঝামেলায় যাওয়া লাগছে না, যাদের আনুগত্য বা আত্মসমর্পণের অর্থ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। পরবর্তী বছরগুলোতে আশপাশের দ্বীপগুলোর মোলোজন রাজার সবাই হুরোতাসের আধিপত্য মেনে নেয় একই শর্তে: হয় আনুগত্য না হয় মৃত্যু। একমাত্র হুরোতাসই সবগুলো গোত্রের প্রধানকে একই হাতের শাসনের নিচে রাখার মতো বুদ্ধি এবং যোগ্যতা রাখে। সবাইকে শাসন করার জন্য যদি সে না থাকত তাহলে পরস্পরের মাঝে চিরন্তন বিবাদে লিপ্ত থাকত রাজ্যগুলো। তবে এখন তাদের নিজেদের মাঝে কিছুটা ঠাণ্ডা সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও কেউ যুদ্ধে নামতে সাহস পায় না। আর হুরোতাসের প্রতি তাদের সম্মান এবং ভয়ের পরিমাণ এত বেশি যে, তার কোনো নির্দেশ কখনো অমান্য করার কথা চিন্তাও করে না কেউ। এবং একই সাথে নির্দিষ্ট তারিখের অনেক আগেই তার প্রাপ্য কর দিয়ে দেয় সবাই।

এবং এরই ধারাবাহিকতায় আজ তিন দশকেরও বেশি সময় পর হুরোতাস তার ষোলোজন করদ রাজাকে অথবা তাদের উত্তরাধিকারীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তার মেয়ের বিয়েতে। আর আমার দায়িত্ব পড়েছে এই সব ঝামেলা সামলানোর।

শোমু ঋতু শুরু হওয়ার ঠিক ত্রিশ দিন আগেই সব কিছু প্রস্তুত করে রাখতে হবে। নীলনদের পানি যখন কমে যায় এবং আমাদের মিশরে গ্রীষ্মকাল নেমে আসে সেই সময়কে বলা হয় শোমু। ল্যাসিডিমন আলাদা একটি রাজ্য হলেও এখানে এখনো যথাযথভাবে মিশরের দিনপঞ্জি মেনে চলা হয়, কারণ হুরোতাস আর তার স্ত্রী তেহুতির জন্ম সেখানেই। এ ছাড়া তাদের মাতৃভাষাও মিশরীয়। বিয়ের কনের লাল চাঁদ শেষ হওয়ার দিনটি খুব সাবধানতার সাথে হিসাব করার পর তার সাথে আরো দশ দিন যোগ করেছে রাজকুমারী সেরেনা এবং রানি তেহুতি। কনে যেন বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামীকে বিছানায় সঠিকভাবে স্বাগতম জানাতে পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যই এই আয়োজন। এই হিসাবে শোমুর প্রথম দিনকে বিয়ের দিন হিসেবে ঠিক করা হয়েছে।

এর অর্থ হচ্ছে শোমুর আগের মাস থেকেই বিয়ের অতিথিরা সবাই এসে পৌঁছতে শুরু করবে এবং উৎসবও তখন থেকেই শুরু হবে। সেই মাসটার নাম হচ্ছে রেনওয়েত, নীলনদে বেশি পানি থাকার শেষ মাস।

চাবুক খাওয়া ক্রীতদাসের মতো খেটে চললাম আমরা সবাই, কারণ হাতে সময় খুব কম। তার ওপর আবার আমার দুই প্রিয় নারী তেহুতি এবং সেরেনার মাথায় কিছুক্ষণ পরপরই অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য নতুন নতুন সব বুদ্ধি আসছে, এবং প্রতিটি বুদ্ধিই তার আগেরটার চাইতে বেশি জটিল এবং কঠিন।

আমরা তো জানি, এসব করতে তোমার কোনো কষ্টই হবে না, টাটা। তুমি তো বুদ্ধিতে সবার সেরা। তুমি পারবে না এমন কোনো কাজ নেই। আমাকে নিরাশ করবে না তুমি, আমি জানি। হাজার হোক সেরেনার বিয়ের অনুষ্ঠান বলে কথা, প্রতিবার নতুন আবদার নিয়ে আসার পর আমার গালে চুমু খেয়ে এই কথা বলে সান্ত্বনা দিচ্ছে তেহুতি।

শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক দিক থেকে দিগন্তে দেখা দিতে শুরু করল আমাদের অতিথিদের জাহাজ। গিথিয়ন উপসাগরের দিকে এগিয়ে আসছে তারা, যেখানে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিজ নিজ সেনাপতির সাথে অপেক্ষা করছে। তাদের স্বাগত জানানোর জন্য। তীরে নামার পর হুরোতাস নদীর তীর ধরে তাদের নিয়ে আসা হবে দুর্গ-প্রাসাদে, যেখানে সবার জন্য বিলাসবহুলভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো ব্যাপারটা সামলানো বেশ জটিল হয়ে দাঁড়াল, বিশেষ করে একসাথে একের বেশি জাহাজ তীরে এসে যখন থামল। নিজেদের প্রাধান্যের বিচারে আমাদের অতিথিরা খুবই স্পর্শকাতর। প্রয়োজন হলে দাঁত খিঁচিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে কে আগে এসেছে তার ফয়সালা করবে তারা। দুই পক্ষকেই বুঝিয়ে-শুনিয়ে সামলে রাখতে গিয়ে নিজের কুটনৈতিক জ্ঞানের সবটুকু প্রয়োগ করতে হলো আমাকে।

তবে শেষ পর্যন্ত আমার কারিশমায় মুগ্ধ হয়ে সবাই শান্ত হয়ে তীরে নামতে পারল। সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ায় আমার দক্ষতার কারণেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা। থেকে বেঁচে গেলাম আমরা।

তীরে নামার সাথে সাথেই প্রধান প্রধান অতিথি এবং তাদের স্ত্রী ও রক্ষিতাদের তুলে দেওয়া হলো অপেক্ষমাণ রথ বাহিনীর জিম্মায়। তাদের সাথে থাকল অশ্বারোহী সৈন্যদের সারি, সেইসাথে বাদকদের দল। উল্লসিত জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়ে রইল পথের দুই পাশে, তাদের সাথে আরো থাকল নৃত্যরত মেয়ের দল। গিথিয়ন বন্দর থেকে শুরু করে দুর্গ-প্রাসাদের প্রধান দরজা পর্যন্ত পুরো পথ ঢেকে দেওয়া হলো নানা রকমের ফুল দিয়ে।

দুর্গে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিল রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতি। তাদের সাথে যুবরাজ রামেসিস এবং তার হবু স্ত্রীও ছিল। উপস্থিত অতিথিদের মাঝে খুব কম ব্যক্তিই এর আগে সেরেনাকে সচক্ষে দেখেছে। যদিও তার অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা কারো অজানা নয়; কিন্তু তাকে সামনাসামনি দেখার জন্য বোধ হয় কেউই প্রস্তুত ছিল না। এমনকি এর আগে যারা সেরেনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ল্যাসিডিমন এসেছিল তারাও যেন সেরেনার সৌন্দর্যের কথা ভুলে গেছে, কারণ একই রকম বজ্রাহত চেহারা হলো তাদেরও। এক এক করে এলো তারা, আর সেরেনার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল কেবল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মাঝেই সেরেনার উষ্ণ এবং সহজ ব্যবহার আর উজ্জ্বল হাসি তাদের সবাইকে এই সম্মোহিত অবস্থা থেকে বের করে আনল।

সেরেনার অনেকগুলো গুণের মাঝে এটাও একটা; নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে যেন কোনো ধারণাই নেই ওর। একটুও অহংকার কখনো দেখা যায় না ওর মাঝে। এতে যে ওর আকর্ষণ আরো বাড়ে তাতে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই। ভিড়ের মাঝেও ওর অবস্থান খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায় জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনার জোয়ার দেখে। ও যেখানেই যায় সেখানেই ওর চারপাশের সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ওর সৌন্দর্যের সুধা পান করতে চায় প্রাণ ভরে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো, অন্য মেয়েদের মাঝে কখনো সেরেনাকে নিয়ে হিংসার চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। তাদের কেউই যেন সেরেনার সাথে পাল্লা দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না; সেরেনার সৌন্দর্য যেন ধূমকেতুর মতোই সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেয়েরা বরং নিজেদের মাঝে সেরেনাকে নারীসুলভ সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলে ধরে নেয়, ওকে নিয়ে গর্ব করে। সেরেনার মোহনীয়তা মেয়েদের সবার মাঝে প্রতিফলিত হয়, আর এ জন্যই তারা ওকে আরো বেশি ভালোবাসে।

এভাবেই রাজকীয় বিবাহের সব আয়োজন শুরু হলো। বিয়ের দিন যত কাছে ঘনিয়ে এলো অতিথিদের উত্তেজনার পারদও তত চড়তে লাগল। আনন্দমুখর পরিবেশে অপেক্ষা করতে লাগল সবাই। মনে হতে লাগল যেন প্রকৃতিও এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে, তাই অনুষ্ঠান যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। বৃষ্টি হতে লাগল; কিন্তু শুধু রাতের বেলা। ছাদের ওপর বৃষ্টির সেই শব্দ শুনলেই ভালো হয়ে যায় মন। ভোর হওয়ার সাথে সাথে পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগল আকাশ, সমস্ত দিন বিরাজ করতে লাগল সূর্যের কোমল আলো। দক্ষিণ দিক থেকে মৃদুমন্দ বাতাস বইতে লাগল। পানিতে হালকা ঢেউ উঠতে লাগল সেই বাতাসে, এবং শেষ অতিথিদের জাহাজগুলোও ধীরে ধীরে এসে ভিড়ল গিথিয়ন বন্দরে।

উৎসবমুখর এই পরিবেশে এখন শুধু একটাই আশঙ্কা কালো মেঘের মতো জমে আছে মাথার ওপর। সেটা হলো ফারাও উটেরিকের চরদের দ্বারা মেমননকে গিথিয়ন বন্দর থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। এর ফলে যুবরাজ রামেসিস এবং তার হবু স্ত্রীর ওপর বিপদের আশঙ্কা কেউ অস্বীকার করতে পারছে না।

ইতোমধ্যে সভ্য পৃথিবীর সবাই জেনে গেছে যে ফারাও উটেরিক এক বদ্ধ উন্মাদ, যার হাতের মুঠোয় রয়েছে এক শক্তিশালী সেনাদল ও নৌবাহিনী। সবাই এটাও বুঝতে পারছে যে, সামান্য কোনো ছুতো পেলেই এগুলো ব্যবহারে কোনো দ্বিধা করবে না সে।

যদিও রাজা হুরোতাস তার মেয়েকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে এবং বিয়ের এই উৎসব শুধু তার সম্মানেই আয়োজন করা হচ্ছে; তবু এই সময়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বগুলো এগিয়ে রাখার সুযোগটাকেও অবহেলা করল না সে। প্রতিদিন দুপুরে তার মন্ত্রণাকক্ষে বন্ধ দরজার ওপাশে গোপন অধিবেশনের আয়োজন করতে লাগল হুরোতাস, যেখানে উপস্থিত থাকল ল্যাসিডিমনে আগত সকল করদ রাজা এবং গোত্রপ্রধান। ইচ্ছে করেই দিনের এই সময়টা বেছে নেওয়া হয়েছে অধিবেশনের জন্য। কারণ দিনের শেষ দিকে অর্থাৎ বিকেল থেকে যখন উৎসবের নানা আয়োজন শুরু হয় সেইসাথে সবাই গলায় ঢালে রাজা হুরোতাসের আঙুর বাগান থেকে তৈরি করা উৎকৃষ্ট মদ, তখন আসলে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার ব্যাপারগুলো আলোচনা করার সময় নয়।

*

মিশরের যুবরাজ রামেসিস এবং স্পার্টার রাজকুমারী সেরেনার বিয়ের নির্দিষ্ট তারিখের দিন পনেরো আগে হুরোতাস এবং রামেসিসসহ সব মিলিয়ে আঠারোজন রাষ্ট্রপ্রধান সমবেত হয়েছে দুর্গের মন্ত্রণাকক্ষে।

এর আগের দিন এই পরিষদ নিজেদের মাঝে নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, উটেরিককে মিশরের ফারাও হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না, কারণ হচ্ছে তার উন্মাদগ্রস্ত অবস্থা। উটেরিকের বদলে রামেসিসকে ফারাও হিসেবে নির্বাচন করেছে তারা।

পরিষদের সদস্যরা সবাই আসন গ্রহণ করার পর হুরোতাস তার কথা শুরু করল। এই মুহূর্ত থেকে উত্তরের পরিষদের আলোচনা সভা শুরু হচ্ছে। আমি এই পরিষদের প্রধান সচিব প্রভু টাইটাকে আহ্বান জানাচ্ছি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্তগুলো পড়ে শোনাতে, যা ক্যালিপোলিসের রাজা টিন্ডারকাস আমাদের সামনে উত্থাপন করেছেন।

পরিষদের সদস্যদের মাঝে কেবল টিল্ডারকাস, রামেসিস এবং রাজা হুরোতাস পড়তে পারে। আর আমি একমাত্র ব্যক্তি যাকে কোনো কিছু পড়ার সময় ঠোঁট নাড়তে হয় না। সে জন্যই টিন্ডারকাসের মাধ্যমে চুক্তি উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হুরোতাস, আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে সেটা সবাইকে পড়ে শোনানোর। চুক্তিতে খুব বেশি হলে শ পাঁচেক শব্দ আছে। কিন্তু তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে উত্তর পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোনো একটির সার্বভৌমত্ব বা তার নাগরিকদের ওপর যদি কোনো বাইরের শক্তির আক্রমণ ঘটে তাহলে বাকি সদস্য রাষ্ট্রগুলো তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে।

চুক্তিনামা পড়ে শোনানোর পর কিছু টুকটাক আলোচনা চলল সবার মাঝে। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই চুক্তির শেষে স্বাক্ষর করল অথবা নিজেদের চিহ্ন এঁকে দিল। পরিষদের সদস্যদের সবার মাঝেই বেশ হালকা মেজাজ বিরাজ করছে। কক্ষের ভেতরের কাজ শেষ হতে রাজা হুরোতাসের সাথে বাইরের প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াল সবাই। এখানে আগেই বেঁধে রাখা হয়েছে একটা শক্তিশালী কালো ঘোড়া।

সদস্যদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে রুপার পেয়ালা তুলে দেওয়া হলো। ঘোড়ার চারপাশে জড়ো হলো সবাই। এবার নিজের যুদ্ধ কুঠারটা তুলে ধরে গায়ের জোরের ঘোড়ার খুলির ওপর একটা কোপ মারল হুরোতাস। সাথে সাথে মারা গেল ঘোড়াটা। এবার এক এক করে সমস্ত শাসক এবং রাজারা সামনে এগিয়ে এলো, হাতের পেয়ালাটা ধরল ঘোড়ার খুলি থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের সামনে। উষ্ণ রক্তভর্তি পেয়ালা মাথার ওপর তুলে ধরে তারা শপথ করল, যদি আমি এই পবিত্র শপথ ভঙ্গ করি তাহলে যেন আমার রক্তও একইভাবে প্রবাহিত হয়। এই কথা বলে এক চুমুকে পেয়ালা খালি করে ফেলল সবাই। কয়েকজন উচ্চ স্বরে হেসে উঠল ঠিকই তবে কাঁচা রক্তের স্বাদে অনেকেরই বমি আসার জোগাড় হলো। আমি নিশ্চিত, ওদের মাঝে কেউই ভাবেনি যে এই মাসটা শেষ হওয়ার আগেই শপথের শর্ত অনুযায়ী কাজে নামতে হবে ওদের।

*

রামেসিস এবং সেরেনার বিয়ের দিন যত ঘনিয়ে এলো ততই বাড়তে শুরু করল উৎসবের তীব্রতা। বিয়ের ঠিক চৌদ্দ দিন বাকি থাকতে হুরোতাস ঘোষণা করল এবার ল্যাকোনিয়ান শূকর শিকার করার সময় হয়েছে। এই বিশেষ প্রাণীটার ইতিহাস অনেক পুরনো, এবং একই সঙ্গে হুরোতাসের পুরনো শত্রুও বটে।

জারাস এবং তেহুতি যখন বহু বছর আগে ল্যাসিডিমনে এসে পৌঁছাল এবং জারাস পরিণত হলো রাজা হুরোতাসে; তার অনেকগুলো কাজের মাঝে একটা ছিল প্রথম আঙুরের চাষ করা। সেই আঙুর বাগান থেকে এই দ্বীপের প্রথম মদ তৈরি করেছিল সে।

কিন্তু তার পরেই একটা বড় ভুল করে বসে রাজা হুরোতাস। আঙুর বাগানের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি কামনা করে সে সব দেব-দেবীর পুজো দেয় ঠিকই; কিন্তু সেই তালিকায় দেবী আর্টেমিসের নাম যোগ করতে ভুলে যায়। আর্টেমিসের অনেকগুলো দায়িত্বের মাঝে একটা হলো, তিনি সমস্ত অরণ্য এবং বুনো প্রাণীর দেবীও বটে। আঙুর বাগানের জন্য জায়গা করতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে জঙ্গল কেটে সাফ করে ফেলে হুরোতাস। যে সমস্ত প্রাণী তার বাগানের ক্ষতি করতে পারে, যেমন বুনো শূকর, তাদের সবাইকে তাড়িয়ে দেয় জঙ্গল থেকে। বুনো শূকর হচ্ছে দেবী আর্টেমিসের অন্যতম প্রিয় একটা প্রাণী। স্বভাবতই হুরোতাসের এই উদ্ধত ব্যবহারে দারুণ রেগে যান তিনি।

তখন হুরোতাসকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য, সেইসাথে তার আঙুরের বিশাল বাগান মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য ল্যাকোনিয়ান শূকরকে পাঠান দেবী আর্টেমিস। স্বাভাবিক কোনো বুনো শূকর নয় ওটা। কেবল দেহে রাজরক্ত বইছে এমন কেউ অথবা দেবত্বের অধিকারী কারো পক্ষেই সম্ভব এই শূকরকে হত্যা করা, এবং সেটাও নেহাত সহজে নয়। যতবারই এই ল্যাকোনিয়ান শূকরকে হত্যা করা হোক না কেন, দেবী আর্টেমিস প্রত্যেক বছর এর পুনর্জন্ম ঘটানোর ব্যবস্থা করেন। প্রতিবছর ওটা হুরোতাসকে জ্বালাতে ফিরে আসে। আর প্রতিবছর দেবীর পাঠানো এই প্রাণীর চেহারা হয় আগের বছরের চাইতে আরো বিশাল, একই সাথে আরো বেশি ভয়ংকর আর হিংস্র।

হুরোতাসকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য শেষবার দেবী আর্টেমিস যে শূকরটাকে পাঠিয়েছিলেন সেটার কাঁধ বরাবর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় কিউবিট, যা একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের উচ্চতার সমান। ওজন ছিল পাঁচ শ ডেবেন, অর্থাৎ বড়সড় একটা ঘোড়ার সমান।

ট্যাগেটাস পর্বতমালার উঁচুতে ঘন জঙ্গলে বাস করে ওটা, শুধু রাতের বেলায় নিচে নেমে আসে উপত্যকায় বাস করা লোকগুলোর ফসলের ক্ষেতে তাণ্ডব চালাতে। ফলে খুব কম মানুষই ওটাকে নিজের চোখে দেখেছে। এক রাতের মাঝেই পাঁচ থেকে ছয়জন ক্ষুদ্র কৃষকের চাষ করা ফসল সাবাড় করে দেয় প্রাণীটা, যা খেতে পারে না সেগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে নষ্ট করে দিয়ে যায়। শূকরটার গজদাঁতগুলো যুদ্ধের তলোয়ারের সমান লম্বা। ওই দাঁতগুলোর সাহায্যে বিদঘুঁটে আকৃতির মাথাটা একবার দুলিয়েই একটা ঘোড়ার নাড়িভুড়ি সব বের করে দিতে পারে। প্রচণ্ড পুরু আর শক্ত চামড়া, তার ওপর তারের মতো শক্ত আর ঘন লোমের আবরণ। ফলে একমাত্র সুদক্ষ হাতের প্রচণ্ড শক্তিশালী বর্শা ছাড়া আর সব কিছুর আঘাত প্রতিহত করতে পারে ওই চামড়া। খুরে প্রচণ্ড ধার, এক লাথি মেরে ফুটো করে দিতে পারে যুদ্ধের ঘোড়ার পেট। তাই সেরেনার দুই প্রাক্তন পাণিপ্রার্থী যখন শিকারে যোগ। দেওয়ার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিল তখন আমরা কেউ খুব একটা অবাক হলাম না। একজন অজুহাত দেখাল যে এসবের পক্ষে তার বয়স অনেক বেশি, আরেকজন বলল ইদানীং নাকি তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবে দুজনই দূর থেকে অথবা গাছের ওপর বসে শিকার অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ খুশি হয়েই গ্রহণ করল।

যারা যারা শিকারে যাচ্ছে তাদের সবার মাঝে কিছুটা উদ্বেগ মেশানো উত্তেজনা কাজ করছে। ঘোড়ায় চড়ে ওই দানবকে শিকার করতে চলল সবাই।

স্বাভাবিকভাবেই সবার সামনে থাকল রাজা হুরোতাস এবং তার ডান পাশে রইল তার প্রিয় সঙ্গী অ্যাডমিরাল হুই। কয়েক দিন আগেই লুক্সরে হিকসস বাহিনীর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হয়েছিল তাতে আমাকে লড়াই করতে দেখেছে হুরোতাস, ফলে আমাকে যখন সে তার বাম পাশে রাখল তখন কেউ অবাক হলো না।

নিজের প্রিয় স্ত্রী এবং একই রকম প্রিয় কন্যাকে সবার পেছনে পেছনে আসতে নির্দেশ দিল হুরোতাস, এবং যুবরাজ রামেসিসকে তাদের প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে তাদের সাথে সাথেই আসতে বলল। অবশ্য কাজটা করার আগে যদি আমার সাথে একটু কথা বলে নিত সে তাহলে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে যেতে পারত। কিন্তু সেটা হুরোতাসের কপালে ছিল না বোধ হয়। কারণ এই নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সেরেনা তেহুতি এবং রামেসিস তীব্র আপত্তি জানাল। ঝানু উকিলের দক্ষতা নিয়ে স্বামীর মুখোমুখি হলো তেহুতি। তা ছাড়া ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে সে যে প্রাধান্য অর্জন করেছে সেটার গুরুত্বও নেহাত কম নয়।

প্রথম কবে যেন তোমার জীবন বাঁচিয়েছিলাম আমি, প্রিয়তম? মিষ্টি গলায় হুরোতাসকে জিজ্ঞেস করল সে। তখন তো এমনকি আমাদের বিয়েও হয়নি, তাই না? হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে। তখনো তুমি সেই সামান্য ক্যাপ্টেন, যার নাম ছিল জারাস। আল হাওয়াসাওয়ি নামের সেই ডাকাত, যে আমাকে অপহরণ করেছিল, তার হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছিলে তুমি আর টাইটা। কিন্তু নিজের মহান দায়িত্ব পালন করার আগেই ওই ডাকাতের হাতে পেটে ছুরি খেয়ে বসো তুমি। শেষ পর্যন্ত আমি আর টাইটা মিলে তোমাকে উদ্ধার করি! উদ্ধার কথাটার ওপর সে এত বেশি জোর দিল যে রাগে ফ্যাকাশে হয়ে গেল হুরোতাসের চেহারা। এমনকি তেহুতির মুখ থেকে সেই ঘটনার এমন রং চড়ানো বিবরণ শুনে আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু আমাদের দুজনের মাঝ থেকে কেউ প্রতিবাদ করে কিছু বলার আগেই আবার বলতে শুরু করল তেহুতি, আর সেটা ছিল কেবল প্রথমবার, এর পরেও আরো বহুবার তোমার জীবন বাঁচিয়েছি আমি… এই বলে আরো কয়েকটা ঘটনার কথা হুরোতাসকে মনে করিয়ে দিল সে।

এবার সেরেনা সামনে এগিয়ে এলো। মায়ের কথার খেই ধরে এত নিখুঁতভাবে সে নিজের কথা শুরু করল যে, মনে হতে পারে তারা দুজন আগে থেকে সব অনুশীলন করে রেখেছিল। বলল, আর মা এবং আমার মাঝে একটা চুক্তি আছে, যেখানে তার ভাইয়ের দেওয়া নীল তলোয়ারটা আমরা দুজন মিলে ব্যবহার করব বলে ঠিক করেছি। ইচ্ছে করেই আবেগপূর্ণ কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলছে ও। এখন এই শিকারে যদি আমরা একসাথে না থাকি তার অর্থ হবে যে আমাদের কোনো একজনের কাছে ওই অস্ত্রটা থাকবে না। অথচ সেটা থাকলে হয়তো তার জীবন বেঁচে যাবে। বলা যায় না, তাতে তোমারও প্রাণ বেঁচে যেতে পারে বাবা। ওই ভয়ংকর প্রাণীটার সামনে আমাদের এভাবে নিরস্ত্র অবস্থায় নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবে না তুমি, বাবা? বলো? স্ত্রীর কথার কোনো জবাব না দিয়েই মেয়ের দিকে ঘুরে তাকাল হুরোতাস। কিন্তু আরো একবার তার কথায় ছেদ পড়ল, কারণ এবার যুবরাজ রামেসিসের প্রতিবাদ জানানোর পালা।

সেরেনা আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রী। ওকে যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করা আমার অবশ্য কর্তব্য মহামান্য রাজা। ওই শূকরটা যখন আমাদের সামনে পড়বে তখন আমি ওর পাশে থাকতে চাই।

তিনজনের দিকে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রইল রাজা হুরোতাস। কিন্তু সেরেনা, তেহুতি আর রামেসিসও কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে, কেউ পিছু হঠতে রাজি নয়। সমর্থনের আশায় এদিক-ওদিক তাকাল হুরোতাস। এবার একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ওপরেই চোখ পড়ল তার। টাইটা, এই বোকাদের বোঝাও যে আমরা কত বিপজ্জনক একটা শিকারে নামতে যাচ্ছি। ওই শূকরের সামনে পড়লে সবার জন্যই অনেক বড় বিপদ নেমে আসবে।

হে রাজা, প্রতিপক্ষ যখন দলে এবং বুদ্ধিতে ভারী হয় তখন তাদের সাথে কেবল একজন বোকাই তর্ক চালিয়ে যায়। আমি সাক্ষ্য দিতে চাই যে, আপনি তেমন কোনো বোকা নন। তাই বলছি, যা হবেই তাকে মেনে নেওয়াই ভালো, জবাব দিলাম আমি। নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে রইল হুয়োতাস, চোখের তারায় একই সাথে খেলা করছে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আর হাসির ঝিলিক। বুঝতে পারছে, এমনকি আমার সমর্থনও নেই ওর পক্ষে। অগত্যা ঘুরে দাঁড়াল সে, দুই পরিচারক যেখানে তার ঘোড়াটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে এগিয়ে গেল। এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে লাগামটা চেপে ধরল সে। তারপর জ্বলন্ত চোখে তাকাল আমাদের সবার দিকে।

তাহলে এসো! মরার যদি এতই শখ হয়ে থাকে তো এসো আমার সাথে। আশা করি আর্টেমিস এবং অন্য সকল দেব-দেবী তোমাদের এই বোকামিকে ক্ষমা করবেন, যদিও তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

.

বিশাল এলাকা জুড়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, এবং পুরো জায়গাটা উঁচু-নিচু পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে ভর্তি। ঢালগুলোর গায়ে পুরু হয়ে জন্মেছে আঙুরলতা। ইচ্ছে করেই দ্রুতগতিতে চলছে হুরোতাস, সম্ভবত স্ত্রী আর কন্যাকে তার নির্দেশ অমান্য করার শাস্তি দেওয়ার জন্য। তবে ওরা খুব সহজেই হুরোতাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমিও শিকারি দলের সামনেই থাকলাম, দুই নারীর ঠিক পেছনে। দলে আরো প্রায় শ খানেক লোক রয়েছে এবং আমাদের পেছনে বেশ কয়েক লিগ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তারা। তবে সবাই বেশ খোশমেজাজে আছে, কারণ প্রায় সবারই ধারণা যে প্রাণীটা সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে তার বেশির ভাগই বাড়িয়ে বলা। ল্যাকোনিয়ান শূকরটা সম্ভবত স্বাভাবিক কোনো বুনো শূকরই হবে, কিছু তীর আর বল্লমের খোঁচা দিয়েই যাকে শিকার করা সম্ভব। শিকারের চাইতে সবার মাঝে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে হাত থেকে হাতে ঘুরে বেড়ানো মদের পেয়ালার দিকে।

আমরা যারা একেবারে সামনে রয়েছি তাদের চোখে শূকরটার উপস্থিতির প্রচুর চিহ্ন ধরা পড়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই অনেকখানি জায়গা জুড়ে আঙুরলতার ঝোঁপ উপড়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেচ দেওয়ার জন্য কৃষকরা যে ছোট ছোট নালা কেটেছিল সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাঙা জায়গা দিয়ে পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে পানি, যেই নদী থেকে পানি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানেই গিয়ে মিশে যাচ্ছে আবার। যে লতাগুলো শূকরের আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছে সেগুলো শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করেছে, খসে পড়ছে পাতাগুলো। পানির অভাবে মরতে বসেছে সব। যেসব কৃষকের ওপর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দেখাশোনার ভার ছিল তারা সবাই ভয়ে মাঠে কাজ করতে আসাই বাদ দিয়েছে। সবাই এখন ভয়ের চোটে ঘরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। বোঝা যাচ্ছে যে তারা, এমনকি হুরোতাসের চাইতেও শূকরটাকে বেশি ভয় পায়।

হুরোতাসের আঙুর বাগানে আক্রমণ চালানোর মাধ্যমে তার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দুর্বল এবং দামি জায়গাটার ওপরই নিজের ক্রোধ ফলিয়েছেন দেবী আর্টেমিস। এই বাগান থেকে উৎপন্ন মদকে প্রায় নিজের কোষাগারে রক্ষিত সম্পদের মতোই ভালোবাসে হুরোতাস। লাল মদভর্তি একটা পেয়ালা যখন তার হাতে থাকে আর আরো এক পেয়ালা মদ থাকে তার পেটের ভেতরে, তখন আর কিছু দরকার হয় না তার। যদিও বাগানের পরিচর্যাকারীদের কাছ থেকে ধ্বংসযজ্ঞের কথা আগেই শুনেছে সে; কিন্তু তখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারেনি। অন্য কারো কাছ থেকে এ ব্যাপারে শোনা এক কথা আর নিজের চোখে সেটা দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

আমাদের শিকারি দলের সবার সামনে রয়েছে হুরোতাস। হাতে ধরা বিশাল বর্শাটা মাথার ওপর তুলে নাড়ছে সে, একই সাথে দেবী এবং তার পাঠানো প্রাণীটার ব্যাপারে অশ্রাব্য সব গালি ছুড়ছে। গালিগুলোর মাঝে সবচেয়ে সভ্য যেটা তা হলো শয়তান বেশ্যা-বুড়ি। আর সবচেয়ে খারাপ যেটা সেটা হলো দেবীর সাথে তার পাঠানো শূকরের অনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক কিছু একটা। কথাটা শুনে আমার কল্পনার চোখে যে ছবি ভেসে উঠল তাতে প্রায় বমি উঠে আসার জোগাড় হলো আমার। কিন্তু তেহুতি আর তার মেয়ে সেরেনার ভাব দেখে মনে হলো দারুণ মজার কোনো কথা শুনছে তারা।

তারপর হঠাৎ করেই এই হাসিঠাট্টার শব্দকে যেন ছুরি দিয়ে কেটে থামিয়ে দিল কেউ, কারণ অন্য একটা ভয়ংকর, আরো জোরালো শব্দ ভেসে এলো। প্রায় বধির হয়ে গেলাম আমরা। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে হতচকিত চোখে এদিক ওদিক তাকাল হুরোতাস। স্বীকার করছি, এমনকি আমি নিজেও দারুণ অবাক হয়ে গেলাম, যদিও আমাকে ভয় পাওয়ানো খুব কঠিন।

এর আগে জীবনে মাত্র একবারই এমন ভয়াবহ শব্দ শুনেছি আমি। সেটা ছিল নীলনদের তীরে, ইথিওপিয়ায়। এমন এক শব্দ, যেটা যেকোনো সাহসী পুরুষের ঘাড়ের চুল খাড়া করে দিতে পারে, এমনকি তার প্রস্রাব আর পায়খানার রাস্তার মুখ ঢিলে করে দিলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সেটা ছিল কালো-কেশরওয়ালা এক পুরুষ সিংহের গর্জন। এখন যে শব্দটা শুনলাম সেটা সেই গর্জনের চাইতেও কয়েক গুণ বেশি জোরালো। মনে হলো যেন অনেকটা আপনাআপনিই আমার মাথাটা ঝটকা দিয়ে ঘুরে গেল, যেদিক থেকে বজ্রপাতের মতো শব্দটা ভেসে এসেছে সেদিকে তাকালাম আমি।

আঙুর বাগান যেখান থেকে শুরু হয়েছে আর যেখানে জঙ্গলের শেষ; সেখানে ধীরে ধীরে গাছপালার আড়াল থেকে উঁকি দিল একটা বিশাল চারকোনা মাথা। মনে হলো যেন পুরাণ থেকে উঠে এসেছে কোনো কাল্পনিক প্রাণী। কোঁকড়ানো কুচকুচে কালো পশমে ঢেকে আছে পুরো মাথাটা। বিশাল সুচাল কানগুলো খাড়া হয়ে আছে। চোখগুলো কুতকুতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। চ্যাপ্টা নাকটা এখন সমান হয়ে আছে, ফুটোগুলো আমাদের গন্ধ পেয়েছে আগেই। গজদাঁতগুলো এত লম্বা আর বাঁকানো যে, ক্ষুরের মতো ধারালো শেষ প্রান্ত দুটো প্রাণীটার বিশাল মাথার ওপর গিয়ে শেষ হয়েছে, প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে পরস্পরকে।

আরো একবার সিংহের মতো একটা গর্জন বেরিয়ে এলো প্রাণীটার গলা থেকে। এবার আমি বুঝতে পারলাম এটা প্রকৃতির সৃষ্টি কোনো স্বাভাবিক প্রাণী নয়, বরং সত্যিই একজন দেবীর খেয়ালের ফসল। এই দানব যদি ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ গলায় ডেকে ওঠে বা ছাগলের মতো ম্যা-ম্যা করে ওঠে তাহলেও আমি অবাক হব না। জঙ্গলের গাছগুলোকে অবহেলায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বা কোনোটাকে উপড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে এলো প্রাণীটা, খোলা জায়গায় এসে দাঁড়াল। পেছনের অংশটা পুরু পেশিতে ভর্তি পিঠের ওপর দুই কাঁধের মাঝখানে ঠেলে উঠেছে ঘন লোমে ঢাকা কুজ। খুর দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল এবার, রাগের চিহ্ন। নীলনদে বেশ কয়েকবার বুনো মহিষ শিকার করেছি আমি; কিন্তু এর খুরগুলো সেই মহিষের চাইতেও কয়েক গুণ বড়। মাটি থেকে এবার বাদামি ধুলোর মেঘ উঠল, ঢেকে ফেলল শূকরটাকে। তাতে যেন আরো ভয়ংকর অপার্থিব হয়ে উঠল ওটার ভয়াবহতা। তারপর হঠাৎ করেই আঙুর বাগানের মাঝ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে নেমে আসতে শুরু করল প্রাণীটা, চোখ হুরোতাসের দিকে। যেন এক মুহূর্তেই চিনে নিয়েছে। যে কে তার মালকিন আর্টেমিসের প্রধান শত্রু।

সাথে সাথে বর্শাটা তাক করে ধরল হুরোতাস, ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল শূকরটার মুখোমুখি হতে। গলা চিরে যুদ্ধ হুংকার বেরিয়ে এলো তার, যদিও প্রাণীটাকে ভয় দেখাতে নাকি নিজেকে সাহস জোগাতে চিৎকার করল সে, বলা মুশকিল। প্রাণীটাও পাল্টা একটা রক্ত হিম করা চিৎকার ছেড়ে জবাব দিল হুরোতাসের হুংকারের।

ঢাল বেয়ে নেমে আসতে থাকায় আক্রমণের পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে আর্টেমিসের শূকর। পুরো দেহটাকে ভূমিকম্পের ফলে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথরের স্রোতের মতো ব্যবহার করছে সে। কাছাকাছি আসতেই রেকাবে পায়ের ভর রেখে দাঁড়িয়ে গেল হুরোতাস, ভারী বর্শাটা মাথার ওপর তুলল। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় শক্তিশালী ডান হাতের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে বর্শাটা ছুঁড়ে মারল সে। একেবারে নিখুঁতভাবে উড়ে গেল বর্শা, প্রাণীটার ভারী চামড়া আর পুরু লোমের আস্তরণ ভেদ করে প্রায় সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেকের মতো ঢুকে পড়ল বুকের ভেতর। আমার মনে হলো নিশ্চয়ই হৃৎপিণ্ডসহ অন্তত কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জখম হয়েছে বর্শার আঘাতে।

কিন্তু হুরোতাসের কাছ থেকে এমন ভয়াবহ প্রাণঘাতী আঘাতের পরও শূকরটার মাঝে সামান্যতম প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। একটুও হোঁচট খেল না, এক পলকের জন্য শিথিল হলো না ছুটে আসার গতি। অদম্য ভঙ্গিতে ছুটে এলো সে, তারপর আরো একবার ক্রুদ্ধ কান ফাটানো তীক্ষ্ণ গর্জন ছেড়ে এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল, ঠিক যেভাবে অপরাধীর শিরচ্ছেদ করার জন্য এক টানে কুড়াল চালায় জল্লাদ। বিশাল বাঁকানো গজদাঁতগুলো ঝলসে উঠল আলোয়, তারপর ঢুকে গেল হুরোতাসের ঘোড়ার পাঁজরের ভেতর। একটা মাত্র ভয়ংকর আঘাত, সাথে সাথে চামড়া, মাংস আর হাড় ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেল দাঁতগুলো, পাঁজরের সবকটা হাড় চুরমার করে দিল। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আর নাড়িভুঁড়ি খোলা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে এলো সাথে সাথে। তার পরেই পেছনের পা দুটো যেখানে জোড়া লেগেছে সেখানকার হাড় ভেঙে দিয়ে বেরিয়ে এলো দাঁতগুলো। দুই পা আলাদা হয়ে যাওয়ায় হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল ঘোড়াটা। এই আঘাতের ফলে হুরোতাসেরও একটা পা হারানো উচিত ছিল; কিন্তু আঘাতের প্রথম ধাক্কাতেই ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়ে গিয়ে মাটিতে পড়েছে সে। তার পরেই দুটুকরো হয়ে গেছে তার ঘোড়া। নিরাপদ দূরত্বেই পড়েছে হুরোতাস। কিন্তু মাথার ওপর ভর দিয়ে পড়ার কারণে শিরস্ত্রাণ থাকার পরেও অজ্ঞান হয়ে গেছে সে।

মাটিতে পড়ে যাওয়া ঘোড়াটার ওপর এবার চড়াও হলো আর্টেমিসের শূকর, প্রচণ্ড ক্রোধের সাথে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগল প্রাণীটার শরীর। খাড়া ঢাল বেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণপণে নিজের ঘোড়াকে তাড়া দিলাম আমি। কিন্তু তেহুতি ইতোমধ্যে আমার অনেক সামনে চলে গেছে, নিজের নিরাপত্তার জন্য কণামাত্র তোয়াক্কা না করে আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে বিশাল শূকরটার ওপর। আমাদের দুজনের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে সেরেনা আর আর্টেমিস। সবাই চিৎকার করছে পাগলের মতো। হুরোতাস মারা গেছে ভেবে তীব্র স্বরে শূকরটাকে শাপশাপান্ত করছে তেহুতি, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করার হুমকি দিচ্ছে। একই সাথে সেই নীল তলোয়ার তুলে ধরে রেখেছে মাথার ওপর। ওদিকে যুদ্ধের উন্মাদনা পেয়ে বসেছে রামেসিস আর সেরেনাকে, প্রচণ্ড উত্তেজনায় একে পরস্পরকে উৎসাহ দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। এখন দুজনের কারো মাথাতেই তিল পরিমাণ যুক্তি কাজ করবে না। ওদের তিনজনকে সাবধান করার জন্য গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি আমি, বলছি যে শূকরটার ভার আমার ওপর ছেড়ে দিতে। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও আমার কথায় কর্ণপাত করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না কারো মধ্যে।

ঘোড়া নিয়ে সরাসরি শূকরটার পেছনে চলে এলো তেহুতি, তারপর ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে পড়ে তলোয়ার ধরা হাত চালাল শূকরের পেছনের পায়ের রগ কেটে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই একই মুহূর্তে তীব্র গতিতে পা ছুড়ল প্রাণীটা, ফলে তেহুতির তলোয়ার ধরা হাতের কবজিতে গিয়ে লাগল শক্ত খুরের লাথি। কবজি মচকে গেল, সাথে সাথে তলোয়ারটা হাত থেকে ছুটে গিয়ে উড়ে অন্য পাশে পড়ল। তেহুতি নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে, কারণ ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে পারল না সে, টলে উঠে পড়ে গেল নিচে। বলা যায় খ্যাপা শূকরটার প্রায় পিঠের ওপরই পড়ল সে, আহত হাতের কবজি চেপে ধরে আছে আরেক হাত দিয়ে। তবে রামেসিস ঠিক তার পেছনেই ছিল। তেহুতির বিপদ বুঝতে পেরে দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল সে, তারপর নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুঁকে এলো নিচে। নিজের গতিবেগকে ব্যবহার করে ছোঁ মেরে তেহুতিকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল সে, তারপর শূকরটার ধারালো দাঁত আর শক্ত খুরের নাগালের বাইরে চলে গেল।

ওদিকে মায়ের বিপদ দেখে মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সেরেনা। শূকরটা যখন ওর ঘোড়াকে দেখে তেড়ে এলো তখন ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠল ঘোড়াটা। ফলে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল ও। যদিও দুই পায়ের ওপর ভর দিয়েই নামতে পারল মাটিতে; কিন্তু ওর হাতে যে বর্শাটা ছিল সেটা ছুটে গেল হাত থেকে। আরেকটা অস্ত্রের খোঁজে, অথবা আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল ও।

ছেঁড়া আঙুরলতা আর ঝোঁপের ভেতরে কাদার মাঝে নীল তলোয়ারটা কোথায় পড়েছে সেটা আমার চোখ এড়াতে পারেনি। তলোয়ারের রুপালি ফলায় রোদ ঝিলিক দিচ্ছে, যেন সদ্য ধরা পড়া টুনা মাছ। তাই দেখেই অস্ত্রটা চিনে নিয়েছি আমি।

ঘোড়ার পেটে হাঁটু দিয়ে পুঁতো দিলাম এবার, তীরগতিতে এগিয়ে গেলাম তলোয়ারটা লক্ষ্য করে। ঘোড়ার গতি না কমিয়েই ঝুঁকে এসে হাত বাড়িয়ে দিলাম। রত্নখচিত হাতলটার ওপর চেপে বসল আমার আঙুলগুলো। ঘোড়ার। পিঠে আবার সোজা হয়ে বসেই চিৎকার করে ডাক দিলাম আমি সেরেনা! হইচই আর চেঁচামেচির আওয়াজ ছাপিয়ে গেল আমার কণ্ঠ, আর্টেমিসের পাঠানো বিশাল শূকরের খুরের শব্দ আর গর্জন ছাপিয়ে পৌঁছে গেল সেরেনার কানে।

আমার কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে ঘাড় ঘোরাল সেরেনা। নীল তলোয়ারের হাতল ধরে একবার মাথার ওপর ঘোরালাম আমি। এই যে, সেরেনা! ধরো! তারপর শরীরে সমস্ত শক্তি দিয়ে অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে। শূন্যে একবার চক্কর কেটে সেরেনা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিকে এগিয়ে গেল অস্ত্রটা। সাবলীল ভঙ্গিতে শরীর মুচড়ে সেটাকে এগিয়ে আসতে দিল সেরেনা, তারপর খপ করে চেপে ধরল হাতল। অসাধারণ অস্ত্রটা এখন একজন শোভা পাচ্ছে। একজন অর্ধ-দেবীর ডান হাতে, আর্টেমিসের পাঠানো বিপদের যেন এবার অবসান হতে যাচ্ছে। শূকরের পরবর্তী আক্রমণের মুখোমুখি হতে সামনে ছুটে গেল সেরেনা। কম্পিত বুকে তার ছুটে যাওয়া দেখলাম আমি, একই সাথে দুলছি গর্ব আর আতঙ্কের দোলায়। গর্বিত ওর সৌন্দর্য আর সাহস দেখে, আর আতঙ্ক ওর বিপদের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে।

শূকরটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে যে সেরেনা এগিয়ে আসছে, কারণ এবার ঘোড়ার মৃতদেহকে ছেড়ে ঘুরে দাঁড়াল সে, সেরেনার মুখোমুখি হলো। আক্রমণকারীর ওপর কুতকুতে চোখগুলো স্থির হওয়া মাত্রই লাফ দিল প্রাণীটা, দ্রুতবেগে এগিয়ে আসতে শুরু করল। আচমকা থমকে দাঁড়াল সেরেনা, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করল। মনে হলো যেন বিশাল শূকরের সামনে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে ওর শরীর; কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে অপূর্ব দক্ষতায় সরে গেল এক পাশে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ভয়াবহ গজদাঁতগুলো আবার চালাল প্রাণীটা, যেগুলো দিয়ে একটু আগেই রাজা হুরোতাসের ঘোড়ার পেট চিরে দিয়েছে। সেরেনার টিউনিকে আটকে গেল একটা দাঁতের মাথা। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেরেনার ভারসাম্যের কোনো ক্ষতি না করেই কাপড় ছিঁড়ে বের হয়ে গেল আবার।

তারপর প্রাণীটা ওর পাশ কাটানো মাত্রই নীলচে-রুপালি তলোয়ারের ফলা দিয়ে ওটার পেছনের পায়ে আঘাত করল সেরেনা। উজ্জ্বল ফলাটা শূকরের পেছনের দিকের পায়ের গোড়ায় আটকে গেল, এবং পরিষ্কারভাবে দুই ভাগ করে ফেলল সাথে সাথে। কেটে আলাদা হয়ে যাওয়া পা-টা কাদায় গেঁথে যাওয়ায় খাড়া হয়ে রইল। চামড়ার ভেতরে পেশিগুলো দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার, থরথর করে কাঁপছে আর ঝাঁকি খাচ্ছে।

তবে চার পায়ে শূকরটা যেমন ভয়ংকর ছিল, তিন পায়েও যেন তার সেই ভয়াবহতার একটুও কমতি হলো না। পেছনের এক পায়ে ভর করেই চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল ওটা। এখন আর গর্জন করছে না, শুধু চোয়ালে চোয়ালে বাড়ি দিচ্ছে, ফলে গজদাঁতগুলো পরস্পরের সাথে বাড়ি খেয়ে ভীতিকর খটাখট আওয়াজ তুলেছে। এবারও প্রাণীটাকে আক্রমণ শানিয়ে কাছে আসার সুযোগ করে দিল সেরেনা, তারপর আগের মতোই একেবারে শেষ মুহূর্তে এক পাশে সরে গেল। ওর হাতের তলোয়ারটা যেন পারদের লম্বা একটা রেখায় পরিণত হলো, কোপ মারল শূকরটার সামনের ডান পায়ের হাঁটুর কাছে। পা-টা এমনভাবে আলাদা হয়ে গেল যেন হাড় বলতে কিছু ছিল না ওখানে, স্রেফ মাংস।

দুই পা হারিয়ে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়ল শূকরটা। মাথাটা পড়ল প্রথমে, তারপর ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে পিঠ দিয়ে উল্টে পড়ল। ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টায় গলাটা লম্বা করে দিল কাদামাটিতে ভরা জমিনের ওপর। গলা তো নয় যেন প্রাচীন কোনো গাছের গুঁড়ি। এবার ওর সামনে এসে দাঁড়াল সেরেনা। দুই হাতে তলোয়ারের বাঁট চেপে ধরল শক্ত করে, তারপর মাথার ওপর তুলেই বাতাসে অর্ধবৃত্ত এঁকে এক টানে নামিয়ে আনল। মৃদু শিস কেটে নেমে এলো তলোয়ার, এত জোরে আঘাত করেছে সেরেনা। মনে হলো যেন শূকরের বিশাল মাথাটা এক লাফ দিয়ে আলাদা হয়ে এলো শরীর থেকে। মুখটা খুলে গেল হাঁ হয়ে, ধপ করে মাটিতে পড়ার সাথে সাথে একটা ভীতিকর শব্দ বেরিয়ে এলো- একই সাথে মরণ চিৎকার এবং তীব্র ক্রোধের গর্জন। কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে ঝরনার মতো বেরিয়ে এলো তাজা রক্ত, সেরেনার পোশাকের নিচের অংশ ভিজিয়ে দিল। বিজয়ীর ভঙ্গিতে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল ও।

বুনো আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম আমি। সাথে সাথে আরো শ খানেক গলার চিৎকার যোগ দিল আমার সাথে। দৌড়ে এগিয়ে এসে দারুণ স্বস্তির সাথে ওকে জড়িয়ে ধরল রামেসিস। নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল তেহুতি। মচকানো কবজিটা বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে; কিন্তু এবার তার ব্যথা অগ্রাহ্য করে দৌড়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেল সে। অ্যাডমিরাল হুইয়ের নেতৃত্বে বিদেশি রাজা এবং সেনাপতিরা সবাই সামনে এগিয়ে এলো, সেরেনার সাহস এবং দক্ষতার প্রশংসা করছে সবাই শত মুখে। এক এক করে প্রত্যেকেই ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর প্রশংসা আর স্তুতি গাইতে গাইতে ফেনা তুলে ফেলল মুখে। অল্প কথায় সবাইকে ধন্যবাদ জানাল সেরেনা, তারপর তেহুতির কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে, যেখানে ওর বাবা রাজা হুরোতাস এখনো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।

তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এলো তার, ঝাপসা চোখে এদিক-ওদিক তাকাল সে। কেবল তখনই আমার প্রিয় দুই নারী, যাদের এই পৃথিবীর সব কিছুর চাইতে বেশি ভালোবাসি আমি, একই সাথে ফিরে তাকাল আমার দিকে। ভিড় আর কোলাহলের মাথার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল

তারা, কৃতজ্ঞতার হাসি। আর এতেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট বোধ করলাম আমি।

*

হুরোতাসের করদ রাজাদের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী হচ্ছে থিবিসের বোয়েশিয়া থেকে আগত বের আর্গোলিদ। দারুণ ভারী একটা তলোয়ার ব্যবহার করার কারণে যার আরেক নাম বীরবাহু। নিজের চ্যালাদের সে  নির্দেশ দিয়েছিল তার সিংহাসনটা শিকারে নিয়ে আসতে। অজুহাত দেখিয়েছিল যে কাজটা আরামের জন্যই করেছে সে; কিন্তু আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে নিজের গুরুত্ব বোঝানো। তবে এখন সে শূকর শিকারে সেরেনা যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নিজের সিংহাসনে বসাতে চায় সে। বাকি রাজারাও পিছিয়ে থাকতে চাইল না, সেরেনাকে সিংহাসনে বসিয়ে সেটা পালাক্রমে বহন করল তারা। প্রতিবারে আটজন করে সেরেনাকে সিংহাসনসহ কাঁধে তুলে নিল, তারপর তার প্রশস্তি গাইতে গাইতে ট্যাগেটাস পর্বতমালা থেকে এগিয়ে চলল দুর্গের দিকে।

এই বীরত্বপূর্ণ শিকার অভিযানের গল্প ইতোমধ্যে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমার কাছে মনে হলো যেন পুরো ল্যাসিডিমনের সবাই এসে জড়ো হয়েছে পথের পাশে, চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে সেরেনাকে, সেইসাথে ফুলের পাপড়ির বৃষ্টি বইয়ে দিচ্ছে তার ওপর। ওর বাম পাশে হাঁটছি আমি, যেটা হচ্ছে সম্মানের জায়গা। স্বভাবজাত সৌজন্যবোধের কারণে এত সামনে আসতে চাইনি আমি; কিন্তু সেরেনা জোর করায় না এসে পারিনি।

এভাবে বাড়ি ফিরতে প্রায় সারা দিন লেগে গেল। সেরেনার সিংহাসন যখন দুর্গের সামনের প্রাঙ্গণে তৈরি করা মঞ্চের ওপর নামিয়ে রাখা হলো তখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। তবে এমনকি তখনো সেরেনাকে সিংহাসনের ওপর থেকে নামতে দেওয়া হলো না।

ওর বাবা রাজা হুরোতাস ততক্ষণে শূকরের আক্রমণের ফলে আহত অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে। সদা সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি, এই সুযোগটা চিনতে ভুল হলো না তার। ষোলোজন রাজার পক্ষ থেকে স্পার্টান ল্যাসিডিমনের প্রতি আনুগত্যের শপথকে এই সুযোগে আরো শক্তিশালী করে তোলার সিদ্ধান্ত নিল সে। অনুষ্ঠানের গুরুত্ব এবং উত্তেজনা যেন চরমে পৌঁছে গেল। সেরেনার সৌন্দর্যকে আগে যদি বলা যেত চোখ-ধাঁধানো তাহলে অজস্র প্রশংসায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠার পর এখন তাকে ভুবনমোহিনী বললেও ভুল হবে না। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক, সাধারণ মানুষ বা অভিজাত; কারো পক্ষেই সেই সৌন্দর্যের আকর্ষণকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। রাজকীয় অতিথি এবং সেরেনার প্রাক্তন পাণিপ্রার্থী- সবাই যেন সেই সৌন্দর্যের স্রোতে অসহায় হয়ে পড়ল। একই অবস্থা হলো আমাদের সবার।

আহত রানিকে পাশে নিয়ে রাজা হুরোতাস যখন সবার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল, তার প্রতিটি কথা অখণ্ড মনোযোগর সাথে শুনল সবাই, প্রতিটি বাক্যের শেষে হর্ষধ্বনি করে উঠল। আহত হাতের পরিচর‍্যা করার পর তা গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে রানি তেহুতি, দারুণ সাহসী আর অভিজাত লাগছে তাকে দেখতে। হুরোতাসের আরেক পাশে দাঁড়িয়েছে তার মেয়ে সুন্দরী সেরেনা। ফলে বক্তৃতার প্রভাবটা আরো ভালোভাবে পড়ল সবার ওপর। ইতোমধ্যে উপস্থিত রাজাদের বেশির ভাগই হুরোতাসের বাগান থেকে তৈরি দারুণ মদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গলায় ঢেলেছে এবং আরো ঢালছে। তাদের পেয়ালায় মদের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসার আগেই আবার পূর্ণ করে দিচ্ছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রীতদাসরা।

উপস্থিত সমস্ত রাজা, গোত্রপ্রধান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে হুরোতাস জানাল, তাদের সবাইকে সে আপন ভাইয়ের মতো দেখে। সে জানে, আজ পারস্পরিক সমঝোতা এবং সম্মানের ভিত্তিতেই সবাই একত্র হয়েছে। এই কথার জবাবে আগের চাইতেও জোরাল গলায় হর্ষধ্বনি উঠল উপস্থিত দর্শকের মাঝে। উল্লসিত চিৎকারের শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসতে এবার রাজা বের আর্গোলিদ উঠে দাঁড়াল। হুরোতাসের আড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতার কাছে কিছুতেই হার মানতে রাজি নয় সে, নিজের কথায় সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে বলে ঠিক করেছে।

এই মুহূর্ত থেকে আমাদের একজনের প্রতি অপমানের অর্থ হবে আমাদের সবার অপমান, চেঁচিয়ে উঠল সে। এসো সবাই হাতে হাত রেখে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার শপথ নিই!

কে সাক্ষী হবে আমাদের শপথের? জানতে চাইল হুরোতাস।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতে আর কারো দরকার আছে কি? জবাব দিল বের আর্গোলিদ। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী নারী, যে ল্যাকোনিয়ান শূকরকে বধ করেছে; সেই সাক্ষী হবে আমাদের শপথের।

সুতরাং এক এক করে ষোলোজন রাজার সবাই সামনে এগিয়ে এলো, তারপর রাজকুমারী সেরেনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শপথ নিল। এরপর শুরু হলো উৎসব এবং উদ্যাপন চলল অনেক রাত পর্যন্ত। কারো কারো কাছে মনে হতে পারে যে সারা দিনের পরিশ্রমের পর সবার এখন ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু না, এটা ছিল কেবল শুরু। নাচ-গান, মদপান আর আনন্দ কেবল শুরু হয়েছে। আর সবার মাঝে সেরেনার উৎসাহই যেন সবচেয়ে বেশি। সকল রাজার সাথে পালা করে নাচল ও, সেইসাথে ওর বাবা এবং রামেসিসের সাথেও, যে এখনো রাজা হয়নি। এমনকি আমার সাথেও একাধিকবার নাচতে এলো সেরেনা, এবং নাচ শেষে জানাল যে, যাদের সাথে এ পর্যন্ত নেচেছে তাদের মাঝে আমিই সবচেয়ে ভালো নাচতে পারি, শুধু রামেসিস বাদে। কিন্তু রামেসিসের সাথে যেহেতু ওর বাগদান হয়েছে, সেহেতু এই কথা তো ওকে বলতেই হবে, তাই না?

হুরোতাস যখন এক দফা পাঞ্জা লড়াইয়ের জন্য বীরবাহু বের আর্গোলিদকে আহ্বান জানাল তখন দেরি না করে নাচের মঞ্চ থেকে নেমে এলো সবাই, লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর বাজি ধরতে শুরু করল। প্রচুর পরিমাণে অর্থ বাজি ধরা হলো এক একজনের পক্ষে। একই পরিমাণে উত্তেজনা নিয়ে সবাই তারস্বরে চিৎকার করে নিজ নিজ খেলোয়াড়কে উৎসাহ দিতে লাগল। এক টুকরো নেংটি বাদে সব কাপড় খুলে ফেলল দুই প্রতিযোগী, তারপর ভোজসভার জন্য রাখা ওক কাঠের টেবিলটার দুই পাশে বসে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মাঝেই নানা রকম কর্কশ আওয়াজ বেরিয়ে আসতে লাগল দুজনের গলা দিয়ে, মনে হলো যেন পাঞ্জা লড়ছে না বরং পরস্পরের কাঁধ থেকে হাতটা খুলে আনতে চাইছে।

দুই প্রতিযোগী এবং তাদের সমর্থকদের হইহল্লা ভেদ করে অন্য কিছু শুনতে পাবে এমন তীক্ষ্ণ কান আমি বাদে আর কারো আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম, দুর্গ-প্রাচীরের ওপাশ থেকে খুব আস্তে আস্তে ভেসে আসছে মিষ্টি সুরেলা গলার গান।

প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে সরে এলাম আমি, তারপর বাইরের দুর্গ-প্রাচীরের ওপর উঠে পড়লাম। ওপাশে উঁকি দিয়ে দেখলাম, পঞ্চাশেরও বেশি মহিলা সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেখানে। সবার পরনে গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা সাদা পোশাক। মুখেও একই রকম সাদা রং করা, কেবল চোখের চারপাশে কাজল দিয়ে কালো রং করা হয়েছে। এই মুহূর্তে দুর্গের প্রধান ফটকের সামনের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে তারা। প্রত্যেকের হাতে একটা করে জ্বলন্ত বাতি, মুখে দেবী আর্টেমিসের প্রশস্তি গান। তাদের চেহারা এবং পোশাক দেখে এক মুহূর্তেই বুঝে নিলাম এরা হচ্ছে দেবীর পূজারিনি। এবং এটাও বুঝতে পারলাম যে, হুরোতাস আর তার সঙ্গীরা দারুণ খেপে যাবে যদি তাদের উৎসবের মাঝখানে আর্টেমিসের পূজারিরা এসে তাদের প্রিয় শূকরের মৃত্যু নিয়ে শোক করতে শুরু করে। তাই দ্রুত নিচে নেমে এলাম আমি, ইচ্ছে যে প্রধান ফটকে দাঁড়ানো প্রহরীদের সাবধান করে দেব যেন ওদের ঢুকতে না দেয়। কিন্তু এসে দেখলাম ইতোমধ্যে অনেক দেরি করে ফেলেছি। পূজারিনিদের চিনতে পেরেছে প্রহরীরা এবং তাদের স্বাগত জানিয়ে খুলে দিয়েছে দরজা।

দরজা থেকে দুর্গের ভেতর পর্যন্ত পথটা ইচ্ছে করেই অত্যন্ত সরু করে বানানো হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য শত্রুকে বাধা দিতে সুবিধা হয়। এখন সেই পথে ভিড় করে রয়েছে আর্টেমিসের পঞ্চাশজন পূজারিনি, সেইসাথে তার প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক সশস্ত্র প্রহরী। তাদের অগ্রযাত্রার মুখে পড়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলাম আমি, আরো একবার সেই প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালাম। এখানে হুরোতাস আর তার বন্ধুরা অর্থাৎ সেই করদ রাজাদের মাঝে এসে পড়তে হলো আমাকে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে বেন আর্গোলিদ। সবাই চেঁচাচ্ছে এবং তাদের সাথে সাথে আমিও। কিন্তু কেউই কারো কথা শুনছে না।

তারপর হঠাৎ করে অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার সুরেলা একটা গলা ভেসে এলো হইচই ছাপিয়ে। গলাটা এত সুন্দর যে প্রায় সাথে সাথেই নীরব হয়ে গেল সবাই। প্রত্যেকটা মাথা ঘুরে গেল শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। ভিড়ের মাঝ বরাবর ফাঁকা হয়ে গেল, একটা পথ তৈরি করে দিল সবাই। সেই পথ দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেল রাজকুমারী সেরেনার অনিন্দ্যসুন্দর অবয়বকে।

পূজারিনি মা! প্রধান পূজারিনির সামনে এসে হাঁটু ভাজ করে সম্মান দেখাল সে। আমার বাবার দুর্গে আপনাকে স্বাগতম।

প্রিয় রাজকুমারী, তোমার জন্য দেবী আর্টেমিসের কাছ থেকে শুভেচ্ছা এবং একটি সংবাদ নিয়ে এসেছি আমি। তুমি কি তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত? যদি তাই হয় তাহলে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসো, জবাব দিল ভগিনী হ্যাগনে। সোনালি ধনুক ভগিনীসংঘের প্রধান পূজারিনি মাতা সে। সোনালি ধনুক হচ্ছে দেবী আর্টেমিসের অনেকগুলো প্রতাঁকের একটা।

এবার রাজা হুরোতাস সামনে এগিয়ে আসতে শুরু করল, চেহারা গম্ভীর হয়ে আছে। চোখগুলো জ্বলছে রাগে। ওসব সংবাদের নিকুচি করি আমি… বলতে শুরু করল সে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তখন আমি তার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। খপ করে তার নগ্ন বাহুটা চেপে ধরলাম। একটু আগের পাঞ্জা লড়াইয়ের কারণে এখনো ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে সেটা।

নিজেকে সামলাও, জারাস, ফিসফিস করে বললাম আমি, যাতে সে ছাড়া আর কেউ কথাটা শুনতে না পায়। তার আগের নামটা ব্যবহার করার মাধ্যমে তার ওপর আমার অনেক আগের সেই কর্তৃত্বটা আবার বিস্তার করতে চাইলাম। সাথে সাথেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনল সে, সরে এলো এক পাশে। সেই মুহূর্তে বিরাজমান কড়া ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের কারণে আমাদের দুজনের এই সামান্য নাটকটুকু কারো চোখে পড়ল না।

বাধ্যগত মেয়ের মতো হ্যাগনের সামনে বসে পড়ল সেরেনা। এবার ওর কপালে তর্জনীর সাহায্যে সোনালি ধনুকের চিহ্ন আঁকল পূজারিনি। তারপর এমন গম্ভীর আর ভারী গলায় কথা বলতে শুরু করল যে, এমনকি আমারও গায়ের লোম সব দাঁড়িয়ে গেল সড়সড় করে। দেবী আর্টেমিস তোমাকে তার রক্ত এবং মাংসের বোন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন…

স্বামীর হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তেহুতির দিকে একবার না তাকিয়ে পারলাম না আমি। আমার মতোই সে নিজেও রাগ চেপে রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করছে। আমি তার দিকে তাকানোর সাথে সাথে সেও তাকাল আমার দিকে, দৃষ্টি বিনিময় হলো আমাদের মাঝে। তার পরেই তার চেহারা লাল হয়ে উঠল, নামিয়ে নিল চোখ। আমাদের দুজনেরই মনে পড়ে গেছে সেই অদ্ভুত প্রায় বাস্তব স্বপ্নের কথা, একমাত্র সন্তানের জন্মের গল্প বলতে গিয়ে যার কাহিনি আমাকে শুনিয়েছিল তেহুতি। তার পরেই আবার প্রধান পূজারিনির দিকে তাকালাম আমি। উপস্থিত আর সবার মতোই আমিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সে কী বলে তা শোনার জন্য।

সমগ্র নারী জাতির সম্মান এবং অবস্থানকে আরো উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আজ তুমি যে কাজ করেছ তার আন্তরিক প্রশংসা করেছেন দেবী আর্টেমিস। তুমি প্রমাণ করেছ যে পুরুষরা আমাদের দাবিয়ে রাখতে চাইলেও আমরা আসলে তাদের চাইতে কোনো অংশে কম যাই না। দেখলাম এই কথা শোনার সাথে সাথে প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলল হুরোতাস। তবে ওর মুখ থেকে যেন কোনো ধর্মদ্রোহী কথা বের না হয় সে জন্য কিছু বলার আগেই দড়াম করে ওর পায়ে লাথি মারল তেহুতি। নিশ্চয়ই খুব জোরে লেগেছিল আঘাতটা, কারণ এমনকি আমি নিজেও ওটার শব্দ শুনতে পেলাম। আর ব্যথায় ককিয়ে উঠল হুরোতাস।

আরে! আমাকে জন্মের জন্য খোঁড়া বানানোর মতলব করেছ নাকি?

কিন্তু একই সাথে আমি নিজেও চেঁচিয়ে উঠলাম, আর হুরোতাসের তুলনায় আমিই ছিলাম পূজারিনির অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি। ফলে আমার কণ্ঠস্বরের আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেল হুরোতাসের গলা। আমাদের রাজার জীবন বাঁচিয়েছে এই মেয়ে!

বলে উঠলাম আমি। বাকি ষোলো রাজাও সাথে সাথে যোগ দিল আমার সাথে। আমাদের রাজার জীবন বাঁচিয়েছে রাজকুমারী সেরেনা! তার জয় হোক!

প্রশংসা শুনে দারুণ খুশি হলো প্রধান পূজারিনি। যদিও তার নাম হ্যাগনে, যার অর্থ হচ্ছে বিশুদ্ধ; সন্দেহ নেই যে নামটা তার সাথে একেবারেই খাপ খায় না। কাজল দিয়ে চোখের চারপাশে কালো করে রাখলেও যখন প্রথমবারের মতো রাজা বের আর্গোলিদের ওপর পড়ল তার দৃষ্টি তখন তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠার ব্যাপারটা আমার নজর এড়াল না।

*

দেবী আর্টেমিস একজন চিরকুমারী; কোনো পশু, মানুষ অথবা দেবতার অনুমতি নেই তার সতীত্বের ওপর আক্রমণ করার। তিনি এবং তার শরীর উভয়ই চিরপবিত্র। কোনো পুরুষ যদি তার সাথে দৈহিক মিলনে রত হওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তিনি চরম প্রতিশোধ নেন। তবে আর্টেমিসের পূজারিনিদের অন্যতম প্রধান একটি দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রিয় দেবীর প্রতিভূ বা বিকল্প হিসেবে কাজ করা। দেবীর অনুমতিক্রমে তারা পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হতে পারে, তা সে পুরুষ, মহিলা, মানুষ, পশুপাখি, মাছ বা অন্য যা কিছু হোক না কেন। এ থেকে তারা যে দৈহিক আনন্দ পায় তা সরাসরি পৌঁছে যায় আর্টেমিসের কাছে। কিন্তু দেবী আর্টেমিসের প্রতিভূরা যতই বিকৃত মিলনে লিপ্ত হোক না কেন, তিনি নিজে চিরকাল পবিত্রই রয়ে যান। এবং বলতে দ্বিধা নেই, এ ব্যবস্থাটা বরাবরই আমাকে বেশ আশ্চর্য করে তুলেছে। এমনকি আমার মতো দৈহিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত মানুষও এমন ব্যবস্থায় নিজের সামনে অনেকগুলো পথ খুঁজে পেতে পারে।

প্রধান পূজারিনিকে অনুসরণ করে বাকি পঞ্চাশ পূজারিনির সবাই দুর্গের প্রধান। কক্ষে এসে পৌঁছাল। এমনিতে তাদের সবাইকে ভদ্র শান্তই মনে হছে; কিন্তু ভেতরে ভেতরে এমন কিছু একটা রয়েছে, যা আমাকে নীলনদের পানিতে রক্তের গন্ধ পাওয়া রাক্ষুসে মাছের দলের কথা মনে করিয়ে দিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখা গেল একটু আগের সেই ভদ্রতা এবং একই সঙ্গে পরনের কাপড়চোপড়ের সিংহ ভাগ; উভয়ই বিসর্জন দিয়েছে তারা। নাচের মুদ্রাগুলো দেখলে যে কারো কাছে মনে হতে পারে তা যৌন মিলনের অপর নাম। তবে এটা আমি স্বীকার করছি যে, একেবারে শেষ মুহূর্তে হলেও পাশের ছোট ঘরগুলোতে সবার চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার মতো ভদ্রতা লক্ষ্য করেছি জুটিদের মাঝে।

আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করে স্বস্তি পেলাম। সেটা হলো, বেকাথা এবং তেহুতি তাদের স্বামী এবং কন্যাদের পুরো সময়টা নিজেদের ঈগল চোখের আওতায় রেখেছে। তবে নিজের চার ছেলের ব্যাপারে বেশ ঢিল দিয়েছে বেকাথা। তাদের মাঝে সবচেয়ে ছোট যে জন তার সাথে সেরেনার কিছু টুকরো টুকরো কথা ঘটনাচক্রে আমার কানে চলে এলো। তখন সবে মাত্র বাইরের ছোট ঘরগুলোর একটা থেকে ফিরেছে সে।

কোথায় গিয়েছিলে পালমিস? কী করছিলে তুমি? জানতে চাইল সেরেনা। আমি তো তোমার সাথে এক দফা নাচতে চেয়েছিলাম।

আর্টেমিসের উদ্দেশ্যে একটু পুজো করতে গিয়েছিলাম, সরাসরি জবাব দিল ছেলেটা।

তাই নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম অ্যাপোলো ছাড়া আর কারো পুজো করো না তুমি।

মাঝে মাঝে রথের প্রতিযোগিতায় একই সাথে দুটো রথেও বাজি ধরতে হয়, বুঝলে?

তা ওই পুজোটা কীভাবে করতে হয় আমাকে একটু দেখাবে? দুষ্টুমির ছলে প্রশ্ন করল সেরেনা।

একবার দেখাতে চেয়েছিলাম, মনে আছে? কিন্তু তুমি তখন রাজি হওনি বোকা মেয়ে। এখন তোমার সামনে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই, অন্তত যত দিন না রামেসিস তোমাকে শিখিয়ে দেয়।

এক মুহূর্তে পালমিসের দিকে তাকিয়ে রইল সেরেনা, কথাগুলো ভেবে দেখছে। তার পরেই বুঝতে পারল, মনে হলো যেন দ্বিগুণ আকার ধারণ করল সবুজ চোখগুলো। তাদের গাঢ়তাও যেন বেড়ে গেল একই পরিমাণে। কী পরিমাণে দুষ্টু হয়ে উঠেছ তুমি পালমিস! বলে উঠল ও। ছোটবেলাতেও দুষ্ট ছিলে আর এখন বুড়ো হতে চললে; কিন্তু তোমার দুষ্টুমির কমতি নেই! বলেই চটাস করে ছেলেটার কানের নিচে একটা চাটি মারল ও। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটে গেল আর এত জোরে যে যুগপৎ ব্যথা আর বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল পালমিস।

তবে সেদিন সন্ধ্যায় কিছু আনন্দের ব্যাপারও ঘটল। প্রধান পূজারিনি হ্যাগনের সাথে কোথায় যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল রাজা বেন আর্গোলিদ, স্বাভাবিক সময়ের অনেক পরে আবার সবার সামনে উদয় হলো সে। চেহারায় বিশ্বজয়ের আনন্দ, চোখে পরিতৃপ্তির উজ্জ্বলতা। সরাসরি রাজা হুরোতাসের কাছে চলে এলো সে, জানাল যে হ্যাগনেকে সে বিয়ে করতে চায়। জানা গেল একটু আগেই সোনালি ধনুক ভগিনীসংঘের প্রধান পদ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে হ্যাগনে।

আচ্ছা তুমি যে এর আগে আমাকে বললে, মিনোয়ান রোডসে অর্থাৎ তোমার নিজের দ্বীপদেশে ইতোমধ্যে দশজন সুন্দরী স্ত্রী তোমার অপেক্ষা করছে? দাঁত বের করে হেসে প্রশ্ন করল হুরোতাস।

প্রিয় হুরোতাস, ওদের সংখ্যাটা আসলে তেরোজন। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই জানো সংখ্যাতত্ত্বের অভিধানে এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক একটা সংখ্যা। অথচ চৌদ্দকে বলা যায় দ্বিগুণ সৌভাগ্যের প্রতীক।

সেই বিকেলেই তাদের দুজনের বিয়ে দিয়ে দিল হুরোতাস। ফলে আরো একবার আনন্দ উৎসবের আয়োজন করার অজুহাত পেয়ে গেল সবাই। যদিও পরের দিন থেকে হিসাব করলে সেরেনা আর রামেসিসের বিয়ের আর তেরো দিন বাকি থাকে; কিন্তু তখন এ ব্যাপারে কোনো চিন্তাই আসেনি আমার মাথায়।

*

পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং অদ্ভুত একটা অস্বস্তি নিয়ে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গতকালের চাইতে আজকে আমার মেজাজ এমন বদলে গেল কীভাবে তাই বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এক চাকরকে পাঠালাম দেখে আসতে যে গতকাল যাদের বিয়ে হলো সেই রাজা বের আর্গোলিদ আর পূজারিনি মাতা হ্যাগনে কেমন আছে দেখে আসতে। কিন্তু সে ফিরে এসে জানাল তারা দুজন এখনো তাদের শোবার ঘর থেকে বের হয়নি। তবে ভেতর থেকে নানা রকম আনন্দসূচক শব্দ ভেসে আসছে, সেইসাথে মনে হচ্ছে ভারী আসবাব এদিক-ওদিক সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ অথবা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। ফলে বোঝা যায় যে তারা আর যা-ই করুক, ঘুমোচ্ছে না। সেইসাথে রাজকুমারী সেরেনাসহ অন্য সকল নারী ও শিশু ভালো আছে এবং কারো ভাগ্যে কোনো দুরারোগ্য অসুখ বা অন্য কোনো বিপদ দেখা দেয়নি। সত্যি কথা বলতে আমি যখন চাকরের কাছ থেকে এসব কথাগুলো শুনছি ঠিক তখনই আমার জানালার নিচের উঠান থেকে উচ্ছ্বসিত হাসি আর হইচইয়ের শব্দ ভেসে এলো। জানালার কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচে তাকালাম আমি।

দেখলাম রামেসিস এবং রাজকুমারী সেরেনা তাদের প্রিয় দুটো ঘোড়ায় বসে আছে। দারুণ স্বস্তি লাগল ওদের দেখে। সাথে আরো রয়েছে সেরেনার ব্যক্তিগত দুই পরিচারিকা এবং রামেসিসের এক দল সশস্ত্র প্রহরী। দুর্গের সদর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ওদের দলটা, নিশ্চয়ই বনভোজন বা এমন কোনো অবসর বিনোদনে যাচ্ছে। মৃদু হাসলাম আমি। এখন মনে হচ্ছে ওই অস্বস্তির কারণ আর কিছু নয়, স্রেফ গতকাল সন্ধ্যায় হুরোতাস আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যে দুই তিন পেয়ালা মদ অতিরিক্ত খেতে বাধ্য করেছিল তার ফলাফল।

দুর্গ থেকে বের হয়ে নদীর কাছে চলে এলাম আমি, নগ্ন হয়ে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলাম কনকনে ঠাণ্ডা পানিতে। মদের নেশা কেটে যাওয়ার পরবর্তী অস্বস্তি কাটানোর জন্য এর চাইতে ভালো মহৌষধ আর নেই। মাথা এবং মন পরিষ্কার হয়ে আসতে দুর্গে ফিরে এলাম, আবার হুরোতাস আর হুইয়ের সাথে যোগ দিলাম মন্ত্রণাকক্ষে। ষোলো রাজার মাঝে আজ আমাদের সাথে উপস্থিত রইল বারোজন। বাকি চারজন তাদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছে, বলেছে আজ একটু অসুস্থ থাকায় তাদের পক্ষে আলোচনায় যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

একটু পরেই রামেসিস একা একা ফিরে এলো দুর্গে। আমাদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি বিষয়ক আলোচনায় যোগ দিতে এলো সে।

তাকে দেখার সাথে সাথে আমি প্রথম যে প্রশ্নটা করলাম সেটা হচ্ছে, রাজকুমারী সেরেনা কোথায়?

উত্তরের সৈকতে রেখে এসেছি ওকে, নীল খালের কাছে।

জায়গাটা খুব ভালো করেই চিনি আমি।  নিশ্চয়ই একা রেখে আসোনি ওকে?

একাই বলতে পারো, হতাশ ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল রামেসিস। সাথে আছে কেবল ওর দুই পরিচারিকা আর আমার লোকদের মাঝে সবচেয়ে দক্ষ আটজন। আশা করি আগামী কয়েক ঘণ্টার জন্য ও নিরাপদই থাকবে। আমার মনে হয়েছিল যুদ্ধে আমার জাহাজ এবং লোকদের কাজ এবং অবস্থান সম্পর্কে তোমার সাথে আলোচনায় বসা উচিত আমার। তা ছাড়া তোমার এটাও মনে রাখা উচিত যে, সেরেনা এখন আর শিশু নয়। নিজের দিকে খুব ভালোভাবেই খেয়াল রাখতে পারে ও। আমাকে বলেছে দুপুরের চার ঘণ্টা পরেই ফিরে আসবে এখানে।

রামেসিস ঠিকই বলেছে, ওদিকে হুরোতাসও আমাদের আলোচনায় যোগ দিল। সেরেনার নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই পর্যায়ে এসে হুইও তার লম্বা নাকটা আমাদের আলোচনার মাঝে গলিয়ে দেওয়া একান্ত কর্তব্য বলে বোধ করল। তা ছাড়া ওর দেহরক্ষীদের মাঝে আমার ছোট ছেলে পালমিসও রয়েছে। ছোট হলে কী হবে, সাহসে আর শক্তিতে মোটেই কম যায় না, বড়াই করল সে।

অনুভব করলাম আবার সেই অস্বস্তিটা ফিরে আসছে আমার মাঝে। কিন্তু বাকিরা ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল আবার। আমি যখন একটু আলাদা হয়ে থাকতে চাইলাম তখন আমাকে খোঁচানো শুরু করল, বলল যোগ দিতে। সবাইকে অগ্রাহ্য করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াল। একসময় নিজের অজান্তেই ওদের কথায় আগ্রহী হয়ে উঠলাম আমি, আলোচনায় যোগ দিলাম। এবং পুরো ব্যাপারটা এমন জটিল যে, কথায় কথায় কতটা সময় পার হয়ে গেল তার কোনো হিসাবই থাকল না মাথার ভেতর।

একসময় দুই দাসী ঢুকল মশাল নিয়ে, তেলের প্রদীপগুলো এক এক করে জ্বালিয়ে দিতে শুরু করল। এই দেখে বেশ অবাক হয়ে গেলাম আমি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখলাম অসাধারণ এক রূপ নিয়েছে ট্যাগেটাস পর্বতমালা। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা শিখরের ওপাশে অস্ত যাচ্ছে জ্বলন্ত সূর্য।

জিউসের কসম! অবাক হয়ে বলে উঠলাম আমি, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি একই সঙ্গে। এখন বাজে কয়টা?

দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের অন্য পাশে রাখা পানিঘড়ির দিকে এগিয়ে গেল হুই। সেটার ওপর আঙুল দিয়ে একটা টোকা দিল সে। এই ঘড়িটায় নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। পানি খুব বেশি তাড়াতাড়ি পড়ে যাচ্ছে। এতে বলছে দুপুরের পরেও আরো আট ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এতটা নিশ্চয়ই হতে পারে না?

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখো। সূর্যের কখনো ভুল হয় না, বললাম আমি। তারপর ফিরলাম রামেসিসের দিকে। সেরেনা আর বাকিদের ফেরার কথা ছিল কখন?

তীব্র অপরাধবোধ ফুটে উঠল রামেসিসের চেহারায়। উঠে দাঁড়াল সেও। বলল আমি নিশ্চিত যে ওরা ইতোমধ্যে দুর্গে ফিরে এসেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেই ওদের ফেরার কথা। হয়তো আমাদের বিরক্ত করতে চায়নি সেরেনা। হুরোতাস সবাইকে পইপই করে বলে দিয়েছে…

আর শুনতে ইচ্ছে করল না আমার। ঘুরে দাঁড়িয়েই দৌড় দিলাম আমি। কামরার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি এই সময় পেছন থেকে হুরোতাস ডাক দিল আমাকে। ফিরে এসো টাইটা। যাচ্ছ কোথায়?

প্রধান ফটকে। প্রহরীরা বলতে পারবে যে সেরেনা এখনো ফিরেছে কি না, ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করে জবাব দিলাম আমি। নিজের কণ্ঠস্বর শুনে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। ভয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে আমার গলা, কানে আঘাত করছে। এত অস্থির হচ্ছি কেন আমি জানি না; কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সারা দিনের যত অস্বস্তি ছিল সব শকুনের পাখায় ভর করে চক্কর দিতে শুরু করেছে আমার মাথার ওপর। বিপদের তীব্র গন্ধ এসে লাগছে আমার নাকে। শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া হরিণের মতো দৌড়াচ্ছি আমি। পেছনে শুনতে পাচ্ছি জুতোর আওয়াজ বাকিরাও দৌড়ে আসছে আমার সাথে সাথে। দুর্গের প্রাঙ্গণে বের হয়ে এলাম আমি, এক শ কদম দূরে থাকতেই প্রহরীদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করতে শুরু করলাম। রাজকুমারী সেরেনা কি দুর্গে ফিরেছে? কয়েকবার প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার পর আমার কথা বুঝতে পারল ওরা।

এখনো না প্রভু টাইটা, প্রধান প্রহরী জবাব দিল আমার কথার। আমরা অপেক্ষা করে আছি…

লোকটার কথা আর একটুও শুনতে ইচ্ছা করল না আমার। তার পাশ কাটিয়ে এলাম আমি দৌড়াতে দৌড়াতেই চলে এলাম আস্তাবলের দিকে। হঠাৎ করে মনে পড়ল যে তলোয়ারটা সেই মন্ত্রণাকক্ষের দেয়ালেই ঝুলিয়ে রেখে এসেছি। কিন্তু এখন আর ওটা আনতে ফিরে যাওয়ার সময় নেই। এখন আমি প্রায় নিশ্চিত, ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছে সেরেনার ভাগ্যে। এই মুহূর্তে আমাকে দরকার ওর।

প্রিয় ঘোড়াটার মুখে লাগাম পরিয়ে দিলাম আমি। সুন্দর বাদামি রঙের একটা মাদি ঘোড়া, তেহুতি উপহার দিয়েছে আমাকে। তারপর ঘোড়ায় জিন পরানোর জন্য সময় নষ্ট না করে সরাসরি পিঠে উঠে বসলাম, দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে খোঁচা মারলাম প্রাণীটার পাঁজরে।

চল, চল! তাড়া দিলাম আমি। আস্তাবলের দরজা দিয়ে প্রায় উড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা, পাহাড় থেকে নেমে আসা পথটার মাঝখান দিয়ে যেই রাস্তাটা সৈকতের দিকে এগিয়ে গেছে সেটা ধরে এগিয়ে চললাম। পেছনে তাকালাম একবার। দেখলাম রামেসিস, হুরোতাস আর হুইয়ের নেতৃত্বে বাকি সবাই এখনো অনেক পেছনে। আমাকে ধরার জন্য প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাচ্ছে সবাই। সৈকতের পাশে নীল খালের সামনে আমি যখন পৌঁছলাম তখন দিনের আলো মুছে আসতে শুরু করেছে। তখনো পাগলের মতো ঘোড়াটাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছি আমি, এই সময় হঠাৎ প্রাণীটা রাস্তা ছেড়ে এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যে একটু অনভিজ্ঞ কেউ হলে ঘোড়ার পিঠ থেকে উড়ে দূরে গিয়ে পড়ত। তবে আমি কোনোমতে দুই হাঁটু দিয়ে চেপে ধরলাম ঘোড়াটাকে, তারপর কোনোমতে শান্ত করে একপাশে থামালাম। এবার সেই জিনিসটাকে দেখার ফুরসত মিলল, যেটা ঘোড়াটাকে ভয় দেখিয়েছে। এবং তাকানোর সাথে সাথে বুঝতে পারলাম জিনিসটা আর কিছু নয়, একটা মানুষের মৃতদেহ। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লাম আমি, তারপর লাগাম ধরে এগিয়ে এলাম লাশটার দিকে। রক্তে ভিজে আছে মৃতদেহটা। এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসলাম আমি, উল্টে দিলাম সেটাকে। এবং চিনতে পারলাম সাথে সাথেই।

পালমিস, হুই এবং বেকাথার ছোট ছেলে। সারা শরীরে একটা সুতোও নেই। জবাই করার আগে ওকে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে খেলেছে খুনির দল। পেট চিরে ভেতর থেকে বের করে এনেছে নাড়িভুড়ি। গোপনাঙ্গ কেটে ফেলেছে, কোটর থেকে তুলে নিয়েছে দুই চোখ। আগের সেই সুদর্শন চেহারার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন। ওর বাবা-মায়ের জন্য হঠাৎ প্রচণ্ড করুণা হলো আমার।

আবার উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। এবার বুঝতে পারলাম, কেন পালমিসের সাথে এই নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। জীবন দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মরার আগে লড়াই করে মরেছে ও। চার আক্রমণকারীর লাশ ছড়িয়ে পড়ে আছে পথের পাশে জন্মানো ঝোঁপগুলোর মাঝে। মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়ায় আনুবিসের কাছে যাওয়ার জন্য যে পথে গেছে পালমিস তাতে ওর সাথী হয়েছে এই লোকগুলো।

মনের সব ঝাল ঝেড়ে গালিগালাজ করলাম আমি; কিন্তু মুখের কথায় মৃত ব্যক্তির কিছুই আসে-যায় না। এবার আমার মনোযোগ ফিরল জীবন্তদের দিকে অবশ্য যদি কেউ থেকে থাকে আর কি। আক্রমণকারীদের সংখ্যা কত ছিল? মনে মনে ভাবলাম আমি। এখন কিছুই বোঝার উপায় নেই, অনেকগুলো পায়ের চাপে পথের ওপর থেকে সব চিহ্ন মুছে গেছে। আন্দাজ করলাম পালমিসের হাতে খুন হওয়া চারজনসহ কমপক্ষে ত্রিশজন তো হবেই।

কিন্তু আমার মাথার ভেতর আর সব চিন্তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে সেরেনার জন্য দুশ্চিন্তা। ওর সাথে কেমন আচরণ করেছে আততায়ীরা? ওর কাপড় ছিঁড়ে ফেলার পর সেই নগ্ন সৌন্দর্য দেখে কেউ কি সামলাতে পেরেছে নিজেকে? মনে হলো যেন সেরেনার ওপর অত্যাচার করার সময় খুনিগুলোর পৈশাচিক উল্লাসের শব্দ নিজের কানে শুনতে পাচ্ছি আমি। অনুভব করলাম রাগ, ভয় আর করুণায় মিশ্রিত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে আমার গাল বেয়ে। তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় উঠে বসলাম আমি, তারপর আবার চলতে শুরু করলাম নীল খালের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথ ধরে।

পথের ওপর ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল আরো সাতটা মৃতদেহ। সবগুলোই পুরুষ এবং সবার ওপরেই মরার আগে ভয়াবহভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। রামেসিস যাদেরকে রেখে গিয়েছিল সেরেনাকে পাহারা দিতে এরা তারাই। এবার আর থেমে ওদের পরীক্ষা করার জন্য সময় নষ্ট করলাম না। মনের ভেতর ক্ষীণ একটু আশা জেগে আছে, কারণ এখনো সেরেনা বা তার দুই পরিচারিকার কারো কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। হয়তো আততায়ীরা মেয়েদের বাঁচিয়ে রেখেছে। হয়তো ওরা জানত যে অত্যাচার করে খুন করার চাইতে সেরেনাকে অক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখলে অনেক বেশি মুক্তিপণ পাওয়া যাবে।

জঙ্গলের মাঝ থেকে সৈকতের কিনারায় বেরিয়ে এলাম আমি এবং এসেই থমকে দাঁড়ালাম। দিনের আলো দ্রুত কমে আসছে। তবে আবছা আলোতেও সোনালি সমুদ্রতটের ওপর আততায়ীদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন ঠিকই চোখে পড়ল আমার, এগিয়ে গেছে পানির কিনারার দিকে। কিন্তু আমার চোখের সামনে দ্রুত আঁধার হয়ে আসছে দিগন্তরেখা, ফলে সেখানে যদি কোনো অচেনা জাহাজ বা নৌকা থেকেও থাকে তার অস্তিত্ব বোঝার কোনো উপায় নেই। প্রথমে মনে হলো ঘোড়া নিয়ে পানির কিনারে এগিয়ে যাই। কিন্তু তার পরেই নিজেকে সামলে নিলাম, কারণ জানি যে এই কাজ করলে আমার ঘোড়ার পায়ের ছাপে দুবৃত্তদের চিহ্ন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম আমি, লাগাম ধরে একটা গাছের মোটা ডালের সাথে বেঁধে রাখলাম। তারপর বালির ওপর তৈরি হওয়া ছাপগুলোকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম, যেন নষ্ট না হয়ে যায় সে জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছি। কিছু দূর যাওয়ার পরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস ধরা পড়ল আমার চোখে। অনেকগুলো পায়ের ছাপ বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি হয়েছে বালির ওপর কিন্তু তার মাঝেও একটা ছাপ স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। পা টেনে টেনে হেঁটেছে এই ছাপের মালিক। ছাপগুলো চিনতে একটুও বেগ পেতে হলো না আমাকে।

*

এর আগে আমার ধারণা হয়েছিল যে আততায়ীরা নিশ্চয়ই কোনো জলদস্যুর দল হবে, হুট করেই যারা সেরেনা আর তার সঙ্গীদের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারলাম ঘটনা মোটেও সে রকম কিছু নয়। তবে সেই মুহূর্তে আমার মনোযোগ ছিন্ন হয়ে গেল ঘোড়ার পায়ের শব্দ আর আমার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকা কিছু কণ্ঠস্বরের আওয়াজে। জঙ্গলের দিক থেকে আসছে শব্দগুলো। রামেসিস আর হুরোতাসের গলা চেনা গেল তাদের মাঝে। এই যে এখানে! চিৎকার করে ওদের ডাক দিলাম আমি।

জঙ্গলের মাঝ থেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলো সবাই।

আমাকে দেখার সাথে সাথে সামনে এগিয়ে এলো, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। একের পর এক প্রশ্ন বর্ষিত হচ্ছে আমাকে লক্ষ্য করে।

সেরেনা! পেয়েছ ওকে?

এখানে আছে ও?

না! জবাব দিলাম আমি। এখানে নেই ও। কিন্তু আমার ধারণা আমি জানি যে ও কোথায়।

করুণাময় আর্টেমিস সাক্ষী! ককিয়ে উঠল রামেসিস। ওই শয়তানগুলো যারাই হোক না কেন পালমিস এবং আমাদের অন্য সব লোককে খুন করে রেখে গেছে। ছেলের মৃতদেহের কাছে হুইকে রেখে এসেছি আমরা। একেবারেই ভেঙে পড়েছে সে। তোমার কাছে মিনতি করছি, আমায় দয়া করে এটা নিশ্চিত করো যে আমার সেরেনার সাথেও এমন কিছু ঘটেনি।

রামেসিসের বাম পাশে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে হুরোতাস। প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপছে সে, মুখ দিয়ে একের পর এক অশ্রাব্য গালিগালাজ আর শপথের বন্যা ছুটছে। এই অমানুষিক কাজ যারাই করে থাকুক না কেন আমি তাদের খুঁজে বের করব। তাতে যদি আমার বাকি জীবন লেগে যায় তো লাগুক! বলে উঠল সে। একবার যদি ধরতে পারি তাহলে এমন শাস্তি দেব, যা দেখে দেবতাদেরও বুক কেঁপে উঠবে।

ঘোড়া নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল দুজন। কে করেছে এই কাজ টাইটা? সবই তো জানো তুমি। ঘোড়া থেকে এক লাফে নেমে এসে আমার কাঁধ চেপে ধরল রামেসিস, পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল।

আমার কাঁধ ছাড়ো রামেসিস, নিজেকে শান্ত করো! ধমকে উঠলাম আমি, তারপর কোনোমতে ছাড়িয়ে নিলাম নিজেকে। এই যে! নিজের চোখেই দেখো! বলে বালির ওপর পড়ে থাকা পায়ের ছাপগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম আমি।

তোমার কথার কিছু আমার মাথায় ঢুকছে না! হুরোতাসও চোখ রাঙিয়ে চিৎকার করে উঠল। কী দেখাতে চাইছ আমাদের?

ছাপগুলোর একেবারে মাঝখানে যে ছাপটা রয়েছে দেখেছ? বোঝাই যাচ্ছে যে এই ছাপের মালিকের ডান পায়ে সমস্যা আছে। পা টেনে টেনে হাঁটে সে।

পানমাসি! আমার কথার অর্থ বোধগম্য হওয়ার সাথে সাথে উন্মত্ত ক্রোধে চিৎকার করে উঠল রামেসিস। সেই লোক, আমাদের কাছে যার প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল সেরেনা! হারামজাদা অকৃতজ্ঞ শূকরটা আবার ফিরে এসেছে এখানে, তারপর সেরেনাকে চুরি করে নিয়ে গেছে উটেরিকের আস্তানায়।

যাই হোক এখন অন্তত এটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে সেরেনা বেঁচে আছে। এমন মূল্যবান একজন বন্দিকে কিছুতেই খুন করবে না পানমাসি, উটেরিক অনুমতি দেবে না তাকে, হুরোতাস আর রামেসিসকে সান্ত্বনা দিতে চেয়ে বলে উঠলাম আমি।

তোমার কথাই যেন সত্যি হয় টাইটা। কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের পিছু ধাওয়া করতে হবে আমাদের। রামেসিসের কথা শুনে মনে হছে যেন ওর ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালাচ্ছে কেউ। সেরেনাকে ওদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনতেই হবে।

আমার মেয়ে আমার একমাত্র সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ওই দস্যুরা। রামেসিস ঠিকই বলেছে। এখনই ওদের পিছু নেওয়া উচিত আমাদের। হুরোতাসও রাগ আর শোকে প্রায় পাগলের মতো হয়ে উঠেছে। দেবতারা সহায় হলে নীলনদের মুখে পৌঁছানোর আগেই ওদের ধরে ফেলতে পারব আমরা। এটা তো নিশ্চিত যে ওখানেই সেরেনাকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।

আমার অবস্থাও ওদের দুজনের চাইতে খুব একটা ভালো নয়; কিন্তু নিজের আবেগকে ওদের চাইতে ভালোভাবে সামলাতে জানি আমি। এখানে দাঁড়িয়ে যত কান্নাকাটি করব ততই আমাদের সময় নষ্ট হবে, কড়া গলায় বললাম আমি। চেষ্টা করছি দুজনের মাথায় কিছুটা বাস্তব বুদ্ধি ফিরিয়ে আনতে। এখান থেকে গিথিয়ন বন্দরে গিয়ে জাহাজ প্রস্তুত করে রওনা দিতে দিতে আমাদের চাইতে প্রায় দশ ঘণ্টার পথ এগিয়ে যাবে পানমাসি। সেইসাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে ওরা কী ধরনের নৌকা বা জাহাজ ব্যবহার করছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। সৈকতের ওপর তৈরি হওয়া একটা দাগের দিকে ইঙ্গিত করলাম। বোঝা যাচ্ছে যেকোনো জলযানের সামনের অংশ এখানে টেনে তুলে আনা হয়েছিল। এই চিহ্নটা বলছে কোনো একটা ছোটখাটো বাণিজ্যতরী। কিন্তু এখান থেকে মিশর পর্যন্ত সমুদ্রপথের পুরোটা এমন অসংখ্য জাহাজে ভর্তি। এবং আমাদের ওপর চোখ পড়ার সাথে সাথে প্রতিটাই ভাববে যে আমরা জলদস্যু এবং লেজ তুলে পালাবে। যতগুলো জাহাজ চোখে পড়বে তার প্রত্যেকটার পিছু ধাওয়া করতে হবে আমাদের, যা অত্যন্ত কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। আর ওদিকে পানমাসি তখন জাহাজের প্রত্যেকটা পাল তুলে দিয়ে প্রত্যেকটা দাঁড়ে দ্বিগুণ লোক লাগিয়ে ঊধ্বশ্বাসে ছুটে চলবে নীলনদের মুখের দিকে।

এই কথাগুলো শুনেই দুজনের চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল স্পষ্টভাবে। পানমাসি যে সরাসরি নীলনদের দিকে নাও যেতে পারে এটা আর ওদের জানানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না। এমনও হতে পারে যে উত্তর আফ্রিকার উপকূলে যে অসংখ্য ছোট ছোট বন্দর রয়েছে সেগুলোর কোনো একটায় রথ বাহিনী অপেক্ষা করছে পানমাসির জন্য। সেখানে জাহাজ ভিড়িয়ে বন্দিনীকে নিয়ে লুক্সর পর্যন্ত বাকি রাস্তা স্থলপথে রথের সাহায্যে পাড়ি দিতে পারে সে। এবং পানমাসি যদি একবার মিশর সীমান্তের ভেতর অথবা নীলনদের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে তাহলে তার গায়ে আঙুল ছোঁয়ানোর আর কোনো উপায় থাকবে না আমাদের।

হুরোতাস ঠিকই বলেছে, গলায় যতটা সম্ভব জোর এনে বললাম আমি। এখন প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের জন্য মূল্যবান। এই মুহূর্তে গিথিয়ন বন্দরের দিকে রওনা দিতে হবে আমাদের। জাহাজ নিয়ে সাগরে নামব আমরা, বাতাসে একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আগেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করব পানমাসির গন্ধ।

তবে যতই সাহস বা দর্প দেখাই না কেন চাঁদ ছিল না সে রাতে। ফলে অন্ধকারের মাঝে পথ চলতে গিয়ে অনেক দেরি হয়ে গেল। আমরা যখন গিথিয়ন বন্দরে পৌঁছলাম তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে।

রামেসিস, হুরোতাস আর হুই মিলে সমুদ্রযাত্রার জন্য জাহাজ প্রস্তুত করতে শুরু করল। আর আমার ওপর পড়ল সেই কঠিন কাজের ভার; তেহুতি আর বেকাথাকে গিয়ে জানাতে হবে তাদের সন্তান হারানোর কথা। যদি বলি যে হুরোতাস এবং হুইয়ের কেউই কাজটা করার মতো সাহস দেখাতে পারল না তাহলে বোধ হয় একটু বেশি নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়ে যাবে। তবে ইতোমধ্যে যে ভয়ানক ঘটনাগুলোর সাক্ষী হয়েছি আমি তাতে এখন আর কোনো কিছুই আমাকে বিচলিত করতে পারছে না।

প্রথমেই পালমিসের ক্ষতবিক্ষত লাশ নিয়ে বেকাথার কাছে গেলাম আমি। দাসীরা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার পর তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রাখলাম আমি, বলতে চাইলাম যে নিষ্ঠুর ভাগ্য তার ছোট ছেলেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু খুব সম্ভব সন্ধ্যার সময় পান করা মদের প্রভাব তখনো সম্পূর্ণ কাটেনি তার। বারবার আমাকে বলতে লাগল পালমিসকে রাতের খাবার খেতে দেখেছে সে। এখন বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে তার ছেলে।

ওকে নিয়ে সেই কামরায় চলে এলাম আমি, যেখানে আমার লোকেরা পালমিসকে শুইয়ে রেখেছে। যদিও ওর আহত স্থানগুলো ঢাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, মুখ থেকে রক্ত মুছে দিয়েছি, আঁচড়ে দিয়েছি চুলগুলো। শূন্য চোখের পাতাগুলো সেলাই করে বন্ধ করে দিয়েছি, সেলাই করতে হয়েছে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া পেট। কিন্তু তার পরও এখনো এই অবস্থায় কোনো সন্তানকে তার মায়ের সামনে হাজির করা যায় না। পালমিসকে দেখে চমকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরল বেকাথা, ওভাবেই রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলের মৃতদেহের ওপর। শোক আর কান্নার দমকে থরথর করে কেঁপে উঠছে শরীরটা।

কিছুক্ষণ পর অনেকটা জোর করেই বেকাথাকে একটা জোরালো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিলাম। আমার ওষুধের বাক্স থেকে তৈরি করেছি জিনিসটা। কাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম ওর পাশে। তারপর বাকি তিন ছেলের একজনকে ডেকে ওর দায়িত্ব নিতে বললাম। তারপর চললাম তেহুতির খোঁজে।

বেকাথার শোকার্ত অবস্থা দেখার চাইতেও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলো এবার আমাকে।

প্রথমে তেহুতির পরিচারিকাদের বাইরের ঘরে অপেক্ষা করতে বললাম আমি, তারপর ঢুকলাম ওর শোবার ঘরে। বিছানার ওপর শুয়ে ঘুমাচ্ছিল ও, পরনে একটা লম্বা রাতপোশাক। সুন্দর লম্বা চুলগুলো মাথার চারপাশে ছড়িয়ে আছে, ঠিক যেন ট্যাগেটাস পর্বতমালার ওপর চাঁদের আলোয় ঝলকাচ্ছে তুষারের শুভ্র স্তূপ। মনে হচ্ছে যেন আবার ছোট্ট একটা মেয়েতে পরিণত হয়েছে ও। ওর পাশে শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম আমি।

টাইটা! চোখ না খুলেই ফিসফিস করে বলে উঠল তেহুতি। আমি জানি তুমি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। তোমার গায়ে কি সুন্দর একটা গন্ধ থাকে সব সময়!

ঠিকই ধরেছ তেহুতি। আমি।

ভয় লাগছে আমার, বলল ও। একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।

সাহস রাখো তেহুতি। সাহস রাখতে হবে তোমাকে।

পাশ ফিরে আমার মুখোমুখি হলো তেহুতি। খারাপ খবর নিয়ে এসেছ তুমি, আমি অনুভব করতে পারছি। সেরেনার কোনো বিপদ হয়েছে, তাই না?

আমি খুব দুঃখিত, সোনামণি, কথাগুলো বলতে গিয়ে গলায় আটকে গেল আমার।

বলো টাইটা। দয়া করে সত্য গোপন করার চেষ্টা কোরো না আমার কাছ থেকে।

চুপচাপ আমার কথাগুলো শুনল ও। চেহারা রক্তশূন্য পাথরের মতো চোখগুলো জ্বলতে লাগল রাতপ্রদীপের মৃদু আলোয়। সেই ছোটবেলার মতো এখনো ভূতদের তাড়ানোর জন্য মাথার কাছ একটা প্রদীপ জ্বেলে রাখে ও। আমার কথাগুলো যখন শেষ হলো তখন মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল তুমি বলছ যে এটা উটেরিকের কাজ?

সে ছাড়া আর কেউ নেই এই কাজ করার মতো।

সে কি সেরেনার ক্ষতি করবে?

না! নিজের অনিশ্চয়তাকে ঢাকতে গিয়ে আপনাআপনি জোরাল হয়ে উঠল আমার কণ্ঠস্বর। উটেরিক একজন উন্মাদ। অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো নয় তার চিন্তাভাবনা। মোটেই না। সেরেনা যদি মারা যায় বা ওর কোনো ক্ষতি হয় তাহলে উটেরিকের কোনো লাভ হবে না। কথাগুলো বলার সময় বাম হাতের তর্জনী দিয়ে মধ্যমাকে আঁকড়ে ধরে রাখলাম আমি। চাই না যে আমার কথা শুনে খেপে উঠুক কোনো রাগী দেবতা।

তুমি আমার খুকুকে খুঁজে এনে দেবে না, টাটা?

হা তেহুতি। নিশ্চয়ই দেব তুমি জানো।

ধন্যবাদ, ফিসফিস করে বলল ও। এখন তাহলে তুমি যাও। না হলে হয়তো বোকার মতো ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করব আমি।

আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী নারী তুমি তেহুতি।

এখন বেকাথার আমাকে দরকার। ওর কাছে যেতে হবে আমাকে, বলে আমার গালে চুমু খেল ও। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা কাপড়টা পরে নিল, দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। কিন্তু আমার মনে হলো দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার সময় একটা মৃদু ফোঁপানির শব্দ শুনলাম আমি। কে জানে হয়তো ভুলও হতে পারে। খুব কম সময়েই কান্নার কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখেছি ওকে।

*

আমি যখন আবার গিথিয়ন বন্দরে পৌঁছলাম তখন সূর্য দিগন্তের ওপাশে উঁকি দিতে শুরু করেছে। দেখলাম হুরোতাস নিজের জাহাজে উঠে পড়েছে। আমি নিজেও যখন ওর সাথে কথা বলার জন্য জাহাজে উঠলাম, দেখলাম মোলোজন করদ রাজার সাথে সবে মাত্র পরামর্শ সেরে উঠছে ও। রাজাদের সবাই নিজেদের শপথের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে এবং তা পালন করতে বদ্ধপরিকর। একের অপমান এখন প্রত্যেকের অপমান।

পরবর্তী দুই-এক দিনের মধ্যেই নিজ নিজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে সবাই। দেশে পৌঁছে প্রত্যেকে তাদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করবে, কারণ আমাদের সামনে এখন যুদ্ধ আসন্ন। খবরটা সত্যিই উৎসাহ জোগাল আমাদের। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভেবেছিলাম আমাদের এই মিত্রদের মাঝ থেকে কমপক্ষে দুই কি তিনজন শপথ ভঙ্গ করবেই, বিশেষ করে যদি কখনো তাদের সাহায্য করার জন্য ডেকে পাঠানো হয়। সুতরাং হুয়োতাস আর হুইকে অভিনন্দন জানালাম আমি। এটাও জানালাম যে, সেরেনার অপহরণ আর পালমিসের খুন সম্পর্কেও তাদের প্রিয় স্ত্রীদের জানানোর কাজ শেষ হয়েছে। আমার প্রতি ওরা দারুণ কৃতজ্ঞ বোধ করল এবং একই পরিমাণে লজ্জিত হলো নিজেদের কথা চিন্তা করে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক বলে আশা করেছিলাম আমি। দুজনের কেউই তাদের স্ত্রীর সামনে দুঃসংবাদ নিয়ে দাঁড়াতে সাহস পায়নি, শোকের প্রথম ধাক্কাটা সামলানোর মতো শক্তিও খুঁজে পায়নি বুকের ভেতর।

যাই হোক, ওদের বললাম আমি। এবার তাহলে পানমাসির পিছু নেওয়ার সময় হয়েছে। কথা বলার সময় শেষ। এবার রক্ত ঝরানোর সময় চলে এসেছে।

ওদের দুজনের সাথে কথা বলা শেষ করে জাহাজ থেকে নেমে এলাম আমি, বন্দরের পথ ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললাম অন্য পাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মেমনন, আসন্ন যাত্রার প্রস্তুতি হিসেব নোঙরের দড়ি গুটাচ্ছে।

ভেবেছিলাম তোমার প্রস্তুতি নেওয়া আর শেষই হবে না, আমাকে জাহাজে উঠতে দেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠল রামেসিস। সেরেনার অপহরণের খবর শোনার পর থেকে এ পর্যন্ত ওর মুখে হাসি দেখিনি আমি। মহান দেবতা জিউসের সম্মান আর মর্যাদার কসম, এতক্ষণ কোথায় লুকিয়ে ছিলে, টাইটা?

তুমি কি আমার ওপর কাপুরুষতার অভিযোগ আনছ? আমার গলায় এমন কিছু একটা ছিল, ফ্যাকাশে হয়ে গেল রামেসিসের মুখ। এক পা পিছিয়ে গেল সে।

ক্ষমা করো, টাইটা। এমন কথা বলা মোটেই উচিত হয়নি আমার, বিশেষ করে তোমাকে। কিন্তু কী করব, শোকে পাগল হওয়ার দশা হয়েছে আমার।

আমিও, রামেসিস। সে জন্যই তোমার একটু আগে বলা কথাটা আমি মাথা থেকে মুছে ফেলেছি। বলেই সরাসরি কাজের কথায় চলে এলাম আমি। আমার পায়রাগুলো তুলেছ জাহাজে?

বারোটা খাঁচার সবগুলোই তোলা হয়েছে। সবগুলোই মেয়ে পায়রা, কারণ ওগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, দ্রুতগামী এবং আর সব মেয়েদের মতোই একগুয়ে, যেমনটা তুমি আমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিতে। যেন ওর কথার জবাবেই পরিচিত বাক-বাকুম শব্দ ভেসে এলো জাহাজের নিচের ডেকের ওদিক থেকে। মৃদু হাসি ফুটল রামেসিসের ঠোঁটে, খুব সম্ভব সেরেনাকে হারিয়ে ফেলার পর এই প্রথম।

তোমার গলা শুনতে পেয়েছে ওরা। তোমাকে খুব ভালোবাসে পায়রাগুলো, ঠিক আমাদের মতো।

তাহলে এবার জাহাজটাকে বন্দর থেকে বের করো, এখনই তোমাদের ভালোবাসার একটু প্রমাণ দাও আমাকে, বলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম আমি। পায়রাগুলোকে একটু দেখা দরকার।

আমার কামরায় রাখা আছে খাঁচাগুলো। সেগুলোর পাশেই পাওয়া গেল আমার লেখার সরঞ্জাম রাখার বাক্স, সাজিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলের ওপর। তার পাশে গোল করে পাকিয়ে রাখা কিছু প্যাপিরাস। প্রায় সাথে সাথেই টেবিলে বসে পড়লাম আমি, লুক্সর শহরে উটেরিকের প্রাসাদের পাশে মদের দোকানে আস্তানা গেড়ে বসা ওয়েনেগের কাছে পাঠানোর জন্য একটা ছোট কিন্তু স্পষ্ট চিঠি লিখতে শুরু করলাম। চিঠিতে লিখলাম, আমার দৃঢ়বিশ্বাস যে উটেরিকই সেরেনাকে অপহরণের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও কাজটা হাতে-কলমে করেছে পানমাসি।

পানমাসি এখন মিশরের পথে রওনা দিয়েছে আর তার পিছু নিয়েছি আমরা। যদিও আমাদের চাইতে কমপক্ষে প্রায় বারো ঘণ্টার পথ এগিয়ে আছে সে। মিশর পৌঁছানোর আগে তাকে আমরা ধরতে পারব বলে মনে হয় না। আর যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায় যে উটেরিক সেরেনাকে বন্দি করে রাখবে হয় দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই ভয়ংকর কারাগারে আর না হয় লুক্সরের প্রাসাদে। ওয়েনেগকে নির্দেশ দিলাম আমার ধারণা কতটা সত্যি তা যাচাই করে দেখতে। সেইসাথে রাজকুমারীর উদ্ধারে কাজে আসতে পারে এমন যেকোনো তথ্য জানতে পারলে সেটাও সাথে সাথে আমাদের জানানোর নির্দেশ রইল তার ওপরে।

চিঠির লেখা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার সাথে সাথে সেটাকে তিন টুকরো হালকা প্যাপিরাস কাগজে আলাদা আলাদা খসড়া করে ফেললাম। আমার চিঠিগুলোকে প্রতিবারই তিনটি করে কপিতে পাঠাই আমি। কারণ এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অন্তত একটা কপি অক্ষত অবস্থায় প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে যাবে। স্বাস্থ্যবান পায়রাদের জন্য আকাশপথ বেশ বিপজ্জনক স্থান, কারণ সেখানে প্রায়ই বাজপাখি আর অন্যান্য শিকারির আনাগোনা দেখা যায়। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে তিনটির মাঝে কমপক্ষে একটা পাখি তার নির্দিষ্ট খোপে পৌঁছবেই, যেখানে ডিম ফুটে জন্ম নিয়েছিল সে।

এবার খাঁচা থেকে সবচেয়ে শক্তপোক্ত দেখে তিনটি পাখি বেছে নিলাম আমি, প্রতিটার পায়ে বেঁধে দিলাম একটা করে চিঠি। তারপর দুটোকে আবার খাঁচায় ফিরিয়ে দিয়ে একটাকে আলতো করে ধরে উঠে এলাম ডেকের ওপর।

ওপরে উঠে আসার সাথে সাথে একটা জিনিস দেখে খুশি হয়ে উঠল আমার মন। ইতোমধ্যে বন্দর থেকে বেরিয়ে এসেছে জাহাজ, এগিয়ে চলেছে খোলা সাগরের দিকে। এবার প্রথম পায়রাটাকে উড়িয়ে দিলাম বাতাসে। তিনবার জাহাজকে ঘিরে চক্কর দিল পায়রাটা, তারপর উড়ে চলল দক্ষিণ দিকে। এর এক ঘণ্টা পর পর বাকি দুটো পাখিকেও ছেড়ে দিলাম আমি, দেখলাম উড়তে উড়তে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেল তারা। অপেক্ষাকৃত মন্থর গতিতে তাদের পিছু নিয়ে চলতে লাগল মেমনন।

উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তাজা বাতাস বইছে, আর সেই বাতাসে ভর করে এগিয়ে চলেছি আমরা। ছয় দিন চলার পরেই ক্রিট দ্বীপ পার হয়ে আসতে পারলাম আমরা, এবং আরো পাঁচ দিনের মাথায় দেখা মিলল আফ্রিকান উপকূলের। এই সময়ের মাঝে মোট নয়টা অচেনা জাহাজকে মাঝ সাগরে থামিয়েছে আমাদের জাহাজ, তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে সেগুলো। প্রত্যেকটা জাহাজই প্রথমে আমাদের জলদস্যু ভেবে পালানোর চেষ্টা করেছে। ফলে পিছু ধাওয়া করে ওদের থামাতে বাধ্য হয়েছি আমরা। এবং এই কাজ করতে গিয়ে বেশ লম্বা সময় নষ্ট হয়েছে আমাদের, গিথিয়ন বন্দর থেকে নীলনদের অববাহিকায় পৌঁছাতে স্বাভাবিকভাবে যত সময় লাগে তার চাইতে অনেক বেশি। নয়টা জাহাজের কোনোটাতেই অবশ্য সেরেনাকে পাওয়া যায়নি; কিন্তু রামেসিস আর আমি চাইনি যে ভাগ্যের ফেরে হাতের নাগালে পেয়েও হারিয়ে ফেলি ওকে।

আর্টেমিসের কাছে আমি প্রার্থনা করলাম, সেরেনাকে যদি সত্যিই দুঃখ-দুর্দশার ফটকে বন্দি করে রাখা হয়ে থাকে তাহলে দেবী যেন ওর ওপর অত্যাচার চালানো থেকে কুখ্যাত ডুগকে বিরত রাখেন। যদিও জানি যে ফারাও উটেরিক নিজে কখনো সেরেনার ওপর চড়াও হবে না; কিন্তু সেটা জানা সত্ত্বেও খুব একটা স্বস্তি পেলাম না। ফারাও উটেরিকের পছন্দ অন্যদিকে, সেরেনার সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করবে না বলেই আমার ধারণা।

নীলনদের অববাহিকায় পৌঁছানোর পর আরো তিন দিন সেখানে পাহারা দিলাম আমরা। দিনের বেলায় নদীর মুখ থেকে দূরে সাগরের মাঝে অবস্থান করলাম, রাতের বেলায় সরে এলাম কাছাকাছি। চতুর্থ দিন রামেসিস আর আমি দুজনই একমত হলাম যে, এখানে আর পাহারা দিয়ে লাভ নেই। আমরা জানি যে এই সময়ের মধ্যে সেরেনা প্রায় নিশ্চিতভাবেই মিশর পৌঁছে গেছে। ওর অপহরণের পর কম দিন তো পার হয়নি। তাই এবার উত্তর-পশ্চিম দিকে জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমরা, গন্তব্য সেই ল্যাসিডিমনের গিথিয়ন বন্দর। তবে এবার আর বাতাস আমাদের সাহায্য করল না। ফলে অসহ্য রকমের ধীর গতিতে চলতে লাগল জাহাজ, দিনগুলো যেন আর কাটতেই চায় না।

৪. গিথিয়ন বন্দর

শেষ পর্যন্ত আমরা যখন গিথিয়ন বন্দরের দেখা পেলাম, দেখলাম যে বন্দর থেকে বেরিয়ে আসা একটা মাছ ধরার নৌকা আমাদের ডাক দিচ্ছে। জাহাজ থামিয়ে নৌকাটা আমাদের কাছাকাছি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা। কাছে আসলে দেখা গেল যে মানুষটা আমাদের ডাক দিয়েছে সে আসলে অ্যাডমিরাল হুইয়ের অবশিষ্ট তিন ছেলের একজন। হাসিখুশি ধরনের একটা ছেলে, নাম হুইসন।

টাটা চাচা! কাছে আসার সাথে সাথে চিৎকার করে ডাক দিল সে। সেরেনার খবর পাওয়া গেছে। ভালো আছে ও। নৌকা আরো কাছাকাছি আসার সঙ্গে তার চিৎকারের মাত্রাও বাড়তে লাগল। এক সিরীয় ব্যবসায়ী ব্যবসার কাজে মিশরে গিয়েছিল। লুক্সরে উটেরিকের দরবার থেকে আমাদের রাজা হুরোতাসের কাছে একটা চিঠি নিয়ে এসেছে সে। উটেরিক গর্ব করে বলেছে যে তার লোকেরা আমাদের বোন সেরেনাকে তুলে নিয়ে গেছে, এখন সে বন্দি হয়ে আছে লুক্সরে। উপযুক্ত প্রতিদানের বিনিময়ে সেরেনাকে মুক্তি দিতে রাজি আছে উটেরিক; কিন্তু তার নিজের শর্ত অনুযায়ী।

কথাগুলো শোনার সাথে সাথে স্বস্তির শীতল পরশ বয়ে গেল আমার ওপর দিয়ে; তার পরেই প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরল। স্বস্তি পেলাম এটা শুনে যে সেরেনা এখনো বেঁচে আছে। আর হতাশা বোধ করলাম কারণ, এখন দর কষাকষির জন্য উটেরিকের পাল্লাই বেশি ভারী।

মেমননে উঠে এলো হুইসন। গিথিয়ন বন্দরে প্রবেশ করলাম আমরা, একই সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেলাম এ পর্যন্ত যা কিছু জানা গেছে তার গুরুত্ব এবং উপযযাগিতা নিয়ে। জাহাজ নোঙর করার পরেই রামেসিস আর হুইসনকে জাহাজে অপেক্ষা করতে বলে আমি তীরে নামলাম। উদ্দেশ্য আমার পায়রাগুলোর দায়িত্বে যে লোক নিয়োজিত আছে তার কাছ থেকে এ পর্যন্ত আসা খবরগুলো সংগ্রহ করব। আমাকে দেখেই হাতে বেশ কিছু প্যাপিরাস নিয়ে দৌড়ে এলো সে। সবগুলোই এসেছে লুক্সরে অবস্থানরত ওয়েনেগের কাছ থেকে। কিন্তু চিঠির কথাগুলো পড়তে পড়তে জলে ভিজে এলো আমার চোখ।

ওয়েনেগ জানিয়েছে, আঠারো দিন আগে পানমাসি এবং তার বন্দিনী রাজকুমারী সেরেনা লুক্সরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মেমননকে নিয়ে আমরা নীলনদের মুখে পৌঁছানোর তিন দিন আগেই নিজের ডেরায় পৌঁছে গেছে ধুরন্ধর শয়তানটা।

ফারাও উটেরিক বুবাস্টিসের নির্দেশে বন্দরে জড়ো হয়েছিল কয়েক শ নারী পুরুষ। তাদের মাঝে ওয়েনেগও ছিল। তাদের সবার সামনে সেরেনাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তীরে নামানো হয়। পায়ে কোনো জুতো ছিল না তার, অদ্ভুত সুন্দর চুলের রাশি লম্বা হয়ে ঝুলছিল কোমর পর্যন্ত; কিন্তু তাই বলে এত লম্বা নয় যে তার নিতম্ব ঢাকতে পারবে।

ওয়েনেগ লিখেছে, সেরেনার সৌন্দর্যে এবং তার প্রতি নিষ্ঠুরতার মাত্রা দেখে উপস্থিত সবার মাঝে কেমন অটুট নীরবতা নেমে এসেছিল। যদিও দর্শকদের মাঝে কেউই জানত না যে কে এই তরুণী।

বন্দরে নামানোর পর প্রহরীদের একজন সেরেনাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে। রাজপরিচারকদের একজন এসে এরপর সেরেনার লম্বা চুলের গোছা কেটে ফেলে। এই সময় দর্শকদের মাঝে মৃদু প্রতিবাদের গুঞ্জন ওঠে।

জ্বলন্ত চোখে তাদের দিকে তাকায় উটেরিক, বোঝার চেষ্টা করে যে কে তার মতামতের বিরোধিতা করছে। তার দৃষ্টির সামনে চুপ হয়ে যায় সবাই। এবার অন্যদিকে ফিরে প্রধান অত্যাচারকারী এবং জল্লাদ কুখ্যাত ডুগকে সামনে ডেকে পাঠায় ফারাও। প্রায় নাচতে নাচতে তার সামনে এসে দাঁড়ায় লোকটা। সাথে সাথে আসে তার কিছু মুখোশপরা সাঙ্গোপাঙ্গ, যাদের সাথে ছিল একটা ষাঁড়ে টানা আবর্জনা ফেলার গাড়ি। সেরেনাকে ওই গাড়িতে তুলে নেয় তারা। গাড়ির ভেতর একটা খাড়া খুঁটির সাথে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয় সেরেনাকে, যাতে নিজের নগ্নতা সে ঢাকতে না পারে। এবার মিছিল করে লুক্সরের পথে পথে ঘোরানো হয় তাকে। মিছিলের শুরুতে ছিল এক ঢাকবাদক। পথের দুপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছিল। ডুগের লোকদের ইশারায় সেরেনার ওপর নানা রকম অভিশাপ আর অপমান ছুঁড়ে দিতে থাকে তারা। শেষে পাহাড়ের ওপরে দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই ভয়ংকর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কারাগারের দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যায় সেরেনা আর তার পেছনে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। এরপর থেকে তাকে আর দেখেনি ওয়েনেগ।

ওয়েনেগের জবানিতে সেরেনার দুর্দশার বিবরণ পড়ার পরেই গিথিয়ন বন্দর থেকে বের হয়ে এলাম আমি, চলে গেলাম ট্যাগেটাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ শিখরে। পাহাড়ে ওঠার পথে প্রায় পুরো রাস্তা দৌড়ে এলাম আমি, মনে মনে চাইছি যেন শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে মনের কষ্টকে কিছুটা হলেও দাবিয়ে রাখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে অলিম্পাস পর্বতে বসবাসকারী দেবতাদের উদ্দেশ্যে তীব্র অভিশাপ বর্ষণ করলাম আমি, সাবধান করে দিলাম যে তারা যদি তাদের সন্তানকে রক্ষা না করে তাহলে তাদের দায়িত্ব এখন থেকে আমাকেই পালন করতে হবে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ে উঠেছি বলেই কি না কে জানে, কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে এসে যখন দেখলাম যে রামেসিস আর হুইসন আমার জন্য ঘোড়ায় জিন পরিয়ে অপেক্ষা করছে, ততক্ষণে হারানো আত্মবিশ্বাস অনেকটাই ফিরে পেয়েছি আমি। প্রায় সাথে সাথেই দুর্গের দিকে রওনা দিলাম আমরা। দুর্গে পৌঁছেই চলে এলাম মন্ত্রণাকক্ষে। দেখলাম রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুই সেখানে অন্য রাজাদের সাথে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। আমি কক্ষের ভেতরে ঢুকতেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল হুরোতাস দ্রুত এগিয়ে এলো আমার দিকে।

খবর শুনেছ? গর্জে উঠল সে। এক ব্যবসায়ীর মারফত সরাসরি উটেরিকের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি আমরা। তুমি ঠিকই বলেছিলে, টাইটা! উটেরিকের চ্যালা পানমাসিই চুরি করে নিয়ে গেছে আমার সেরেনাকে। সেই কথা আবার বড় মুখ করে চিঠিতে লিখেছে শয়তানটা। সেরেনা না থাকলে আজ পানমাসি জীবিতই থাকত না, অথচ হারামজাদা সেই প্রতিদান দিল কি না এইভাবে! কিন্তু এখন আমরা নিশ্চিত যে কী ঘটেছে এবং এটাও জানি যে ওকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা সেটা হলো ওর গায়ে হাত দেয়নি কেউ। কিন্তু তীব্র অপমানের শিকার হতে হয়েছে ওকে।

হ্যাঁ। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হুরোতাসকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। হুইসন এই কথাগুলো আগেই বলেছে আমাকে। এটাও বলেছে যে সেরেনার বিনিময়ে অন্য কিছু চায় উটেরিক।

উটেরিককে আমি বিশ্বাস করি না। সে একটা বিষাক্ত সাপ। যত যা-ই বলুক না কেন, আমি প্রায় নিশ্চিত যে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধে নামতেই হবে, জবাব দিল হুরোতাস। তবে তার আগে আমরা দেখব যে সে আসলে কী চায়। তবে সহজ কিছু চাইবে না এটা আগে থেকেই ধরে রাখা যায়। কিন্তু আমি তাকে জবাব দেব রক্ত আর অস্ত্রের মাধ্যমে, গম্ভীর মুখে শপথ করল সে। তারপর পেছনে বসে থাকা রাজাদের মাঝে তিনজনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এরা হচ্ছে গোত্রপ্রধান ফাস, পারভিজ এবং পো।

হ্যাঁ এদের সবাইকেই আমি চিনি, বলে তিনজনের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা জানালাম আমি।

তাই তো আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, একটু লজ্জিত দেখাল হুরোতাসকে।

ক্ষমা চাইছি, টাইটা। সেরেনাকে নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি আমি।

ভালো খবরটা কি তেহুতিকে জানিয়েছ এখনো? প্রশ্ন করলাম আমি।

এখনো না, স্বীকার করল হুরোতাস। আমি নিজেই শুনেছি মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে। তা ছাড়া ঘোড়া নিয়ে বের হয়ে গেছে তেহুতি এবং আমি জানি না যে কোথায় গেছে ও। চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল হুরোতাস। কোনো কথা না বললেও বুঝতে পারলাম আমার কাছে আসলে কী চাইছে সে।

ও কোথায় গেছে আমি বোধ হয় জানি। যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাই, বললাম আমি।

অবশ্যই! এখনই যাও, টাইটা। অত্যন্ত কষ্টে আছে ও। আমাদের মাঝে কেবল তুমিই জানো কীভাবে ওর মন ভালো করতে হবে।

*

হুরোতাস নদীর তীরে সেই রাজকীয় কুটিরে এসে পৌঁছলাম আমি। বাড়ির সামনে তৈরি করা আস্তাবলে ঘোড়াটা বেঁধে রাখলাম, তারপর শূন্য কামরাগুলোর মাঝে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। ডাকছি তেহুতির নাম ধরে। কিন্তু কোনো ৮ কামরাতেই কাউকে পাওয়া গেল না, সবগুলো শূন্য। তাই এবার বাড়িটা থেকে বের হয়ে নদীর তীরে চলে এলাম আমি।

নদীর ধারে যেই জায়গাটায় মা আর মেয়ে একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছে। সেখানে উপস্থিত হওয়ার আগেই পানির শব্দ শুনতে পেলাম। বাকের কাছ এসে দেখলাম ঢেউয়ের মাঝে ভেসে রয়েছে তেহুতির মাথাটা, ঘন সাদা চুল লেপটে আছে তাতে। আমাকে দেখতে পায়নি ও। তাই এবার পানির কিনারে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লাম আমি, তারপর ওকে দেখতে লাগলাম। জানি, অন্তরের ব্যথাকে শারীরিক কষ্ট দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে ও। ট্যাগেটাস পর্বতমালায় চড়ার সময় আমিও এ কাজটা করেছিলাম।

নদীর এপার থেকে ওপারে বারবার সাঁতরে পার হতে লাগল ও, যতক্ষণ না ওকে দেখতে দেখতে আমার নিজেরই পেশিতে ব্যথা শুরু হলো। তারপর একসময় নদীর যে কিনারে আমি বসে আছি সেখানে চলে এলো ও, অল্প পানিতে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সম্পূর্ণ নগ্ন; কিন্তু ত্রিশ বছর আগে যেমনটা ছিল এখনো ঠিক তেমনই সুগঠিত পাকানো শরীর। নদীর কিনারে উঠে এলো এবার, এখনো পাথরের ওপর বসে থাকা আমাকে দেখতে পায়নি।

তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার আমাকে চোখে পড়ল ওর। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, সাথে সাথে চোখের পাতায় খেলা করছে ভয়। তারপর আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। সাথে সাথে সুন্দর মুখটা আনন্দে ভরে উঠল। নদীর পানিতে ঝড় তুলে এক দৌড়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো ও।

ধন্যবাদ! ধন্যবাদ টাইটা! হাসছে ও, আবার একই সাথে স্বস্তির অশ্রু নেমেছে চোখে।

আমিও হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে। কীভাবে বুঝলে ভালো খবর এনেছি আমি?

তোমার মুখ দেখে! তোমার হাসিভরা মুখটা দেখেই বুঝে নিয়েছি আমি! কাছাকাছি এসেই ঠাণ্ডা হয়ে আসা শরীরটা নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরল ও। পরস্পকে আলিঙ্গন করলাম আমরা। এবার তেহুতি জানতে চাইল কোথায় ও?

উটেরিকের কারাগারে বন্দি হয়ে আছে ও, জবাব দিলাম আমি। দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামটা তেহুতির সাথে উচ্চারণ করতে কিছুতেই মন চাইল না আমার।

হাসিটা মুছে গেল ওর মুখ থেকে। প্রশ্ন করল লুক্সরে?

ভালো আছে ও, কোনো ক্ষতি হয়নি, তেহুতিকে আশ্বস্ত করলাম আমি। নির্দিষ্ট কিছু শর্তের বদলে ওর মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে উটেরিক।

ওহ, আমি যদি যেতে পারতাম আমার মেয়ের কাছে! ফিসফিসিয়ে বলে উঠল তেহুতি। কথাটা শুনে মাথা নাড়লাম আমি।

না! ওখানে একবার গেলে তুমি আর ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু সেরেনা ঠিকই ফিরে আসবে। হয়তো একটু সময় লাগবে; কিন্তু আমি শপথ করে বলছি যে, ওকে ফিরিয়ে আনব তোমার কাছে, বললাম আমি। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেলেই এখান থেকে রওনা দেব আমি। যেখানে ওকে বন্দি করে রাখা হয়েছে সে পর্যন্ত হয়তো পৌঁছতে পারব না; কিন্তু ওকে অন্তত এটুকু জানাতে পারব যে আমি কাছেই আছি। আর তাতে ওর সাহস বেড়ে যাবে অনেক এবং কষ্টের মাত্রা কিছুটা হলেও কমে আসবে।

আমরা সবাই তোমার কাছে অনেক ঋণে ঋণী, টাইটা। কীভাবে তোমার প্রতিদান দেব বলো তো?

বেশি কিছু নয়, শুধু তোমার মুখের হাসি আর একটা ছোট্ট চুমু হলেই চলবে তেহুতি। এখন তোমার বোনের কাছে যেতে হবে আমাকে। ওর-ও আমাকে দরকার।

আমিও যাব তোমার সাথে। আগামীকাল হচ্ছে সেই দিন, যেদিন ও আর ওর স্বামী মিলে ওদের ছোট ছেলে পালমিসকে সমাধিস্থ করবে। কুচক্রী উটেরিকের আরো এক শিকারে পরিণত হয়েছে ওদের ছেলে।

*

পালমিস ছিল এমন একটা ছেলে, যাকে সবাই ভালোবাসতো। কমপক্ষে কয়েক শ শোকার্ত মানুষ যোগ দিল আমাদের শোকযাত্রায়। ট্যাগেটাস পর্বতমালার এক নির্দিষ্ট জায়গায় কিছু গুহার উদ্দেশ্যে চলেছি আমরা, যেখানে রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুইয়ের সকল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং আত্মীয়স্বজনদের কবর দেওয়া হয়েছে। পালমিসের মৃতদেহকে মমি করে রাখা হয়েছে একটা শবাধারে। দশটা কালো ষাঁড়ের সাহায্যে টানা একটা কাঠের গাড়িতে রয়েছে সেই শবাধার।

তার পেছন পেছন আসছে বেকাথা। এক হাত ধরে আছে তার স্বামী হুই, গম্ভীর হয়ে আছে তার চেহারা। আরেক পাশে হাঁটছে তেহুতি। পাগলের মতো কাঁদছে বেকাথা, কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না তাকে। তার বাকি তিন ছেলে রয়েছে ঠিক তার পেছনেই, আর তাদের পেছনে রয়েছে তাদের নিজ নিজ বাহিনীর সৈনিকরা। সবার পরনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সাজ, কণ্ঠে নিজ নিজ বাহিনীর বীরত্বসূচক গান, যুদ্ধের সময় যা গায় তারা। একজন দক্ষ সাহসী তরুণ যোদ্ধা, যার জীবন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, তার জন্য এর চাইতে সঠিক শেষকৃত্য আর কিছুতেই হতে পারে না।

এমনকি আমি নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া থেকে নিজেকে সামলাতে পারছি না, যদিও আমার চোখের সামনে বহু যুবককে মারা যেতে দেখেছি, দেখেছি তাদের মৃতদেহকে কবরে শুইয়ে দিতে বা আগুনে পুড়িয়ে দিতে। প্রতিশোধের জন্য জ্বলছে আমার বুকের ভেতরটা। অ্যারেসের উপত্যকায় প্রবেশ করল আমাদের দলটা। জিউসের পুত্র অ্যারেস, যিনি যুদ্ধ এবং নির্মমতার দেবতা। উপত্যকার দুই পাশে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ের সারি, ফলে সার্বক্ষণিক ছায়া ঘিরে রয়েছে জায়গাটাকে। কবরের প্রবেশপথের সামনে এসে দাঁড়াল শবাধার টানা গাড়িটা। পাহাড়ের গায়ে একটা গভীর এবড়োখেবড়ো ফাটল বলা যায় প্রবেশপথটাকে। এরপর আর গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই গাড়ির চালকদের শহরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। যে পথে এসেছিল সে পথেই আবার ফিরে গেল তারা। এবার পালমিসের সহযোদ্ধারা এগিয়ে এলো সামনে। শবাধারটিকে অনন্ত বিশ্রামে শায়িত করল তারা। আবারও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বেকাথা, কাঁদছে অঝোরে। শেষ পর্যন্ত তেহুতি আর হুই এগিয়ে গিয়ে প্রায় টেনে সরিয়ে আনল তাকে। তারপর যে পথে এসেছিলাম সেই পথেই আবার দুর্গে ফিরে এলাম আমরা।

*

যুদ্ধের জন্য অধীর হয়ে আছে আমার হৃদয়, তাই মনে হতে লাগল যেন ইচ্ছে করেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দেরি করছে সবাই। গোত্রপ্রধান আর অন্য রাজারা সবাই একে একে তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে পৌঁছতে লাগল, গিথিয়ন উপসাগরে নোঙর করল তাদের যুদ্ধজাহাজ। সাদা পালে ছেয়ে গেল উপসাগরের ঘন নীল পানি। তীরের কাছাকাছি বিভিন্ন জায়গায় নোঙর করল তারা। গিথিয়ন বন্দরে এখন এত বেশি জাহাজ যে ইচ্ছে করলে শুধু এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজের ডেকে পা রেখেই বন্দরের এ মাথা থেকে ও মাথায় চলে যাওয়া যায়। হুরোতাস নদীর তীরে খোলা মাঠগুলো ধীরে ধীরে ভরে উঠতে লাগল অসংখ্য সশস্ত্র যোদ্ধার জন্য আশ্রয় হিসেবে গড়ে তোলা তাবু আর ছাউনিতে। উপত্যকার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ঢাল আর শিরস্ত্রাণের সাথে তলোয়ারের সংঘর্ষের ঝনঝন আওয়াজ। প্রশিক্ষকরা চিৎকার করে নির্দেশ দিতে লাগল যোদ্ধাদের, প্রত্যেকেই চাইছে তার বাহিনীকে সর্বোচ্চ দক্ষ করে তুলতে।

প্রতিদিন পাহাড়ের মাথায় চড়ে বসি আমি, সাগরের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য রাখি যে একটা বিশেষ পালের দেখা পাওয়া যায় কি না। সেই সিরীয় ব্যবসায়ীর যেকোনো দিন মিশর থেকে ফিরে আসার কথা। ফারাও উটেরিকের শর্তগুলো আমাদের শোনানোর জন্য বয়ে আনবে সে। অবশেষে একদিন তার জাহাজের হালকা নীল পালের দেখা পাওয়া গেল। এই রং করা হয়েছে এক বিশেষ প্রজাতির সাগর-শামুকের রস থেকে। ধারণা করা হয় বিপজ্জনক সমুদ্র এবং জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে এই রং। আমার বিশ্বাস করতে মন চাইল যে, এই রং হয়তো সৌভাগ্য বয়ে আনবে আমাদের জন্য। কিন্তু জাহাজটা কাছে আসার পর বুঝতে পারলাম সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বন্দরে জাহাজের এত বেশি ভিড়, সেখানে ব্যবসায়ীর জাহাজ ভেড়ানোর কোনো জায়গায় পাওয়া গেল না। ফলে একটা ছোট মাছ ধরার নৌকা নিয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলাম আমি। ব্যবসায়ীর নাম বেন জাকেন। আমাকে সে জানাল, ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস-সুমহান এবং সুউচ্চ-এর পক্ষ থেকে সে একটা চিঠি এনেছে ঠিকই। সন্দেহ নেই নিজের নামের সাথে আরো একটা বিশেষণ যোগ করেছে উটেরিক। কিন্তু চিঠিটা আমার হাতে দিতে রাজি হলো না ব্যবসায়ী। বলল, চিঠিটা রাজা হুরোতাসের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে এবং নিজের দায়িত্বে সে কোনো অবহেলা করতে রাজি নয়। ধারণা করলাম, চিঠির বদলে হুরোতাসের কাছ থেকে বড় অঙ্কের পুরস্কার আশা করছে সে, এবং সেটা সংগ্রহেও কোনো রকম অবহেলা করার ইচ্ছে নেই তার। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, চিঠিটা অন্তত একবার আমাকে দেখতে দেওয়া উচিত, যাতে কোনো খারাপ খবর থাকলে সেটা অপেক্ষাকৃত নরম ভাষায় রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতিকে জানানো যায়। কিন্তু কোনোভাবেই রাজি করানো গেল না ব্যাটাকে।

অগত্যা বেন জাকেনকে নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে এলাম আমি, তারপর দুর্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখানে পৌঁছে দেখলাম অধীর আগ্রহে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সেরেনার বাবা-মা। পুরস্কারের পরিমাণ নিয়ে একটু ঝগড়া করার চেষ্টা করল বেন জাকেন, কিছুটা সময় নষ্ট হয়ে গেল তাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে উঠল হুরোতাস এবং তার রাগ দেখে আর কিছু বলার সাহস পেল না ব্যবসায়ী। তবে চলে যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে অভিযোগ জানাতে শুনলাম তাকে।

মন্ত্রণাকক্ষে এখন আমি হুরোতাস আর তেহুতি ছাড়া আর কেউ নেই। এবার উটেরিকের পাঠানো শ্বেতপাথরের পাত্রটার মুখে লাগানো সিল ভাঙল হুরোতাস। ভেতরে রয়েছে গোল করে পাকানো একটা প্যাপিরাসের চিঠি আর সিল করা একটা অর্ধস্বচ্ছ সবুজ কাঁচের পাত্র। আমার জানা মতে এ ধরনের পাত্রে জ্ঞানী চিকিৎসকরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বা নমুনা সংরক্ষণ করে থাকে।

আপাতদৃষ্টিতে একেবারেই সাধারণ এই জিনিসগুলো টেবিলের ওপর রাখল হুরোতাস। নীরবে ওগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম আমরা। তারপর তেহুতি মৃদু স্বরে বলে উঠল, আমার ভয় লাগছে। ওর ভেতর কী আছে আমি জানি না, জানতেও চাই না। কিন্তু এটা ঠিকই বুঝতে পারছি যে ভালো কিছু হতে পারে না।

হুরোতাস বা আমি কেউই ওর কথার জবাবে কিছু বললাম না। কিন্তু আমি জানি আমাদের তিনজনই এই মুহূর্তে একই রকম বোধ করছে। শেষ পর্যন্ত হুরোতাসই নড়ে উঠল প্রথম। নিজেকে একটা ঝাঁকি দিল সে, যেন এইমাত্র জেগে উঠেছে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে। হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছল, চোখ পিটপিট করল কয়েকবার। তারপর হাত বাড়িয়ে প্যাপিরাসটা তুলে নিয়ে তাতে লাগানো মোমের সিলমোহরটা পরীক্ষা করল। তারপর কোমরের খাপে ঝোলানো ছুরিটা বের করে সেটার মাথা ঢুকিয়ে দিল সিলের ভেতর। চাড় দিতেই প্যাপিরাস থেকে আলগা হয়ে উঠে এলো সেটা। এবার কাগজটা খুলে আলোর দিকে ধরল সে। মৃদু মচমচ শব্দ করে উঠল সেটা। হায়ারোগ্লিফে লেখা কথাগুলো বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করল হুরোতাস।

না! তীক্ষ্ণ স্মরে বলে উঠল তেহুতি। জোরে জোরে পড়ো। ওতে কী লেখা আছে আমিও জানতে চাই।

থমকে গেল হুরোতাস। আমি চাই না কোনো কারণে কষ্ট পাও তুমি।

জোরে জোরে পড়ো! আবার বলে উঠল তেহুতি। ভ্রূ কুঁচকে উঠল হুরোতাসের। কিন্তু তার পরেই হার মেনে নিল সে, জোরে জোরে পড়তে শুরু করল।

জারাস এবং হুই,

মিশরের রাজকীয় সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই কাপুরুষ দলত্যাগীর প্রতি।

সেরেনা নামের বেশ্যাটা এখন আমার কবজায়। আমার কারাগারের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছে তাকে, যেখানে ওকে তোমরা জীবনেও খুঁজে পাবে না। তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো যদি তোমরা মানতে রাজি থাকো তাহলে ওকে মুক্তি দিতে পারি আমি।

শর্ত এক। তোমরা আমাকে তিন কোটি রৌপ্যখও পরিশোধ করবে। আমার বাবা ফারাও টামোসের সময়ে তোমরা যখন এই মিশরের সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক ছিলে তখন তোমরা দল ত্যাগ করে পালিয়ে যাও। তার পর থেকে এ পর্যন্ত তোমাদের কারণে আমার এই পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে তোমাদের।

শর্ত দুই। তোমরা যাকে ভুলবশত যুবরাজ রামেসিস বলে সম্বোধন করো তাকে সশরীরে আমার হাতে তুলে দিতে হবে। এই অপরাধী আসলে এক নীচু বংশজাত ক্রীতদাস, যে কি না দাবি করে যে তার শরীরে মিশরের রাজরক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। মিশর সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান ত্যাগ করে পালিয়ে গেছে সে। তাকে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় সে জন্য তাকে অবশ্যই আমার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। শর্ত তিন। তোমরা যাকে ভুলবশত প্রভু টাইটা বলে সম্বোধন করো তাকেও সশরীরে আমার হাতে তুলে দিতে হবে।

এই ঘৃণিত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে একজন শবসাধক এবং ডাকিনিবিদ্যার মতো ভয়াবহ এবং নিকৃষ্ট জাদুর উপাসনাকারী। একই সাথে সে একজন নীচ ক্রীতদাস, যে তার মনিবের কাছ থেকে পালিয়ে গেছে। তাকে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় সে জন্য তাকে অবশ্যই আমার। কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

আমার এই দাবিগুলো পুরোপুরি পূরণ করার জন্য তোমাদের এক মাস সময় দেওয়া হলো। আমার দাবি মানা না হলে প্রত্যেক মাসে তোমাদের কাছে এমন একটা জিনিস পাঠাব আমি, যেটা দেখে তোমাদের শিক্ষা হওয়া উচিত। সেই জিনিসগুলোর প্রথমটা এই চিঠির সঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। সবুজ কাঁচের পাত্রে রয়েছে তা।

মিশরের ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস (যার আরেক পরিচয় অপরাজেয়)

*

তিনজনই এবার একসাথে দৃষ্টি ফেরালাম নিরীহ চেহারার সবুজ রঙের কাঁচের বোতলটার দিকে। সবাই যেন কোনো রহস্যময় জাদুতে পাথর হয়ে গেছি। শেষ পর্যন্ত তেহুতিই নীরবতা ভঙ্গ করল।

আর সহ্য করতে পারছি না আমি। এই উটেরিককে আমি চিনি। আমার ভাই ফারাও টামোসের প্রথম সন্তান সে, সম্পর্কে আমার ভাইপো। ছোটবেলা থেকেই দুর্বল আর চুপচাপ প্রকৃতির ছিল, তাই ভেবেছিলাম হয়তো ওকে দিয়ে কারো কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওকে চিনতে ভুল হয়েছিল আমার। ওর মাঝে আসলে সব রকমের শয়তানির প্রকাশ ঘটেছে, ফিসফিস করে বলল সে। কথার মাঝখানে কান্নায় ভেঙে এলো ওর কণ্ঠস্বর, ফলে কথাগুলো প্রায় বোঝাই গেল না। কিন্তু যতটা সময় কথা বলল ও তার মাঝে একবারও দৃষ্টি সরাল না কাঁচের পাত্রটার ওপর থেকে। আমাদের কাছে সেই উটেরিক কী পাঠাতে পারে ভাবতে গেলেই শিউরে উঠছি আমি। তুমি কি পাত্রটার মুখ খুলবে টাইটা?

কাউকে না কাউকে তো খুলতেই হবে, বললাম আমি। তারপর পাত্রটা তুলে নিয়ে মুখের ছিপিটা পরীক্ষা করলাম। দেখলাম নরম কাঠ কেটে তৈরি করা হয়েছে সেটা, তারপর মুখের সাথে মোম দিয়ে শক্ত করে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাবধানে ধরে মোচড় দিতেই সিলটা ভেঙে গেল। মৃদু হিসসস শব্দের সাথে নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো ছিপিটা, যেন ভেতরের বাতাস চাপ দিয়ে ওটাকে বের করে দিয়েছে। ভেতরের যা ছিল সব টেবিলের ওপর উপুড় করে ঢেলে দিলাম আমি। তিন জোড়া চোখ রুদ্ধশ্বাসে চেয়ে রইল টেবিলের ওপর এসে পড়া জিনিসটার দিকে।

জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা মানুষের তর্জনী। একেবারে গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। সরু সুগঠিত একটা আঙুল। ত্বকের ওপর কোনো দাগ নেই, সম্পূর্ণ মসৃণ। এমন একজন নারীর আঙুল, যাকে জীবনে কখনো অবহেলা বা শারীরিক পরিশ্রমের মুখোমুখি হতে হয়নি।

তীব্র ক্ষোভ আর হতাশামিশ্রিত একটা আর্তনাদ বের হয়ে এলো তেহুতির মুখ দিয়ে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ও, ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বীভৎস জিনিসটার দিকে।

আমার মেয়ে সেরেনাকে পঙ্গু করে দিতে শুরু করেছে উটেরিক। এই কাজ করতে একবারও ওর হাত কাঁপল না? ঘুরে দাঁড়িয়েই কামরা থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল তেহুতি। হুরোতাস আর আমি বিস্ময় আর বিষণ্ণতা চোখে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।

শেষ পর্যন্ত আমিই নীরবতা ভঙ্গ করলাম। ওর কাছে যাও, বললাম হুরোতাসকে। হয়তো ও নিজেও বুঝতে পারছে না; কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকেই ওর সবচেয়ে বেশি দরকার। যাও ওর কাছে। সান্ত্বনা দাও ওকে। আমি এখানেই অপেক্ষা করব তোমার জন্য। মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল হুরোতাস, তারপর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। পেছনে খোলাই রইল দরজাটা।

ধীরে ধীরে আতঙ্কের প্রাথমিক রেশটা কাটিয়ে উঠলাম আমি, তারপর এগিয়ে গেলাম টেবিলের দিকে। এবার আগের চাইতে তীক্ষ্ণ চোখে সম্পূর্ণ চিকিৎসকের দৃষ্টিতে পরীক্ষা করলাম বিচ্ছিন্ন আঙুলটা। বুঝতে পারলাম এটা দেখতে যা মনে হচ্ছে আসলেও তাই। নকল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সত্যিই একজন তরুণীর আঙুল এবং খুব সম্ভব অভিজাত বংশের কেউ। সেরেনার হাতটা কখনো ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখিনি আমি; কিন্তু আঙুলটা দেখে মনে হচ্ছে ওরই। শুধু… কী একটা ব্যাপার যেন মিলছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম আমি। তারপর মনে পড়ল কাঁচের বোতলের ছিপি খুলে ফেলার সাথে সাথে হিসসস শব্দে কিছুটা বাতাস বের হয়ে এসেছিল। এবার বিচ্ছিন্ন আঙুলটার আরো কাছে ঝুঁকে এলাম আমি, ভালো করে শুঁকে দেখলাম। ওপরে লবণের মিহি আস্তরণ রয়েছে, পচনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লাগানো হয়েছে নিশ্চয়ই। তার পরও পচন ধরার খুব মৃদু একটা গন্ধ ইতোমধ্যে বের হতে শুরু করেছে আঙুলটার থেকে।

পুরো ব্যাপারটার রহস্য উদ্ঘাটন করতে আমি এতই চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, হুরোতাস কখন দরজা দিয়ে আবার ভেতরে এসে ঢুকেছে খেয়ালই করিনি। যতক্ষণ না মৃদু স্বরে কথা বলে উঠল ততক্ষণ পর্যন্ত ওর উপস্থিতি টেরই পেলাম না আমি।

দেবত্বের অধিকারী ব্যক্তির শরীরে কখনো পচন ধরে না, বলল ও।

চরকির মতো ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম হুরোতাসের দিকে। প্রশ্ন করলাম কী বললে?

আমার ধারণা, আমার কথা ঠিকই শুনেছ তুমি, বন্ধু। আস্তে করে মাথা। দোলাল হুরোতাস।

হ্যাঁ, তা শুনেছি, কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে সম্মতি জানালাম আমি। কিন্তু তুমি যা বললে… তা দিয়ে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছ?

দেবত্বের অধীকারী কারো শরীরে কখনো পচন ধরে না, আবার বলল ও। তারপর আরেকটা কথা বলল, এই আঙুলটা সেরেনার হতে পারে না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাল হুরোতাস।

কারণ সেরেনার মাঝে ওই দেবত্বের চিহ্ন আছে।

তুমি জানতে! অবাক হয়ে বলে উঠলাম আমি। আরো একবার মাথা ঝাঁকাল হুরোতাস। কীভাবে জানলে? জানতে চাইলাম ওর কাছে।

আমিও একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম, ব্যাখ্যা করল হুরোতাস। দেবী আর্টেমিস আমার স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন। সেরেনার কীভাবে জন্ম হয়েছে সেটা তিনিই বলেছেন আমাকে। থেমে গেল হুরোতাস। হঠাৎ করে কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠল ওর চেহারা, আগে কখনো এমন দেখিনি আমি। আর্টেমিস আমাকে বলেছিলেন: তোমার স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান বড় হচ্ছে সে তোমার হৃদয়জাত বটে; কিন্তু তোমার ঔরসজাত নয়।

এই কথা কি কখনো তেহুতিকে বলেছ তুমি? প্রশ্ন করলাম আমি। মাথা নাড়ল হুরোতাস।

না। কখনো বলবও না। তাতে হয়তো আমাদের দুজনের মাঝের বিশ্বাস আর সুখ নষ্ট হয়ে যাবে। সে জন্যই এখন তোমার কাছে ফিরে এসেছি আমি। আমি চাই তুমিই তেহুতিকে বুঝিয়ে বলো যে এটা উটেরিকের আরো একটা নোংরা চাল ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি চাই আমার এবং তেহুতির মাঝে যে। বিশ্বাস বিরাজমান তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নাও তুমি। আমার হাতটা ধরে আস্তে করে ঝাঁকি দিল সে। আমার জন্য আমাদের জন্য এটুকু তুমি করবে না?

অবশ্যই! ওকে আশ্বস্ত করলাম আমি। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে প্রবেশ করলাম সূর্যের আলোয় আলোকিত বাগানে, যেখানে তেহুতিকে পাব বলে জানি। মাছে ভরা পুকুরটার পাশে নিজের প্রিয় জায়গায় বসে ছিল ও। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে মুখ তুলে চাইল। সব হারানোর অভিব্যক্তি খেলা করছে ওর চেহারায়।

এখন আমি কী করব টাইটা? তোমাকে আর আমার ভাইপো রামেসিসকে ওই দানবটার হাতে কিছুতেই তুলে দিতে পারব না আমি। অথচ আমার একমাত্র মেয়ের অঙ্গগুলো সে এক এক করে ছিঁড়ে আনবে, এই চিন্তাও আমি সহ্য করতে পারছি না।

এই দুটো কাজের কোনোটাই তোমাকে করতে হবে না। ওর পাশে এসে বসলাম আমি, তারপর কাঁধের ওপর হাত রেখে জড়িয়ে ধরলাম। তেহুতি, তুমি নিশ্চয়ই জানো যে দেবত্বের অধিকারী শরীর পচনের অভিশাপ থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত?

মাথা নাড়ল তেহুতি। কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।

যে আঙুলটা আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, লবণ মাখানো অবস্থাতেও পচন ধরেছে তাতে। বোঝা যাচ্ছে যে স্বর্গীয় কোনো চিহ্ন নেই ওতে, অর্থাৎ ওটা সেরেনার আঙুল নয়। অন্য কোনো দুর্ভাগা মেয়ের হাত থেকে আঙুলটা কেটে নিয়েছে উটেরিক।

আমার দিকে তাকিয়ে রইল তেহুতি। ধীরে ধীরে আবার সোজা হয়ে উঠল ওর ঝুলে পড়া কাঁধ দুটো। নতুন করে শক্তি ফিরে পেয়েছে সে। ঠিকই বলেছ তুমি, টাইটা। বোতলটা খোলার সাথে সাথেই পচনের গন্ধ পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু তখন এটা নিয়ে তেমন চিন্তা করিনি। কিন্তু এখন তোমার মুখ থেকে শোনার পরে মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক।

হ্যাঁ। কিন্তু উটেরিককে এটা কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমাদের বোকা বানাতে ব্যর্থ হয়েছে সে।

মোটেই না! সম্মতি জানাল তেহুতি। কিন্তু আমার স্বামীর ব্যাপারে কী করবে? কথা দাও টাইটা হুরোতাসকে কখনো বলবে না যে সেরেনার আসল বাবা কে।

তোমার স্বামী খুব ভালো একজন মানুষ, একজন দক্ষ রাজাও বটে। কিন্তু দেবতা আর ছাগলের মাঝে তফাত ধরার মতো বুদ্ধি তার মাথায় আছে বলে মনে হয় না। তুমি যে স্বপ্নের মাঝেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলে এটা কখনো ওর মাথায় আসবে না। তা ছাড়া তোমার প্রতি ওর বিশ্বাসের কোনো সীমা নেই, তেহুতিকে আশ্বস্ত করলাম আমি। প্রয়োজন পড়লে দারুণ দক্ষ একজন মিথ্যাবাদীতে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা আছে আমার।

*

ঠিক করলাম প্রথমে গোপনে মিশরে ঢুকব আমি, চেষ্টা করে দেখব যে সেরেনার সাথে দেখা করার। কারাগার থেকে যদি ওকে মুক্ত করতে নাও পারি, একটু সাহস এবং সান্ত্বনা জোগানোর চেষ্টা তো করতে পারব। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কথা রামেসিসকে জানাব কি না বুঝতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত দুর্গের মাঝে ওর নির্দিষ্ট কামরায় গিয়ে হাজির হলাম। সবগুলো জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম, আমরা ছাড়া আর কেউ আছে কি না। নিশ্চিত হওয়ার পর রামেসিসকে খুলে বললাম আমার সিদ্ধান্ত। এবং সব শেষে বললাম যে আমার এই পরিকল্পনার কথা আর কাউকে না জানাতে।

নীরবে আমার সব কথা শুনল রামেসিস। কথা বলা শেষ হতে আস্তে করে মাথা ঝাঁকাল ও।

আমিও ঠিক এই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু এমনকি তোমাকেও বলার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমার, স্বীকারোক্তি জানাল ও।

তার মানে কি আমি ধরে নিতে পারি যে আমার সাথে আসছ তুমি? অবাক হওয়ার ভান করলাম আমি, যদিও এটাই শুরু থেকে আমার ইচ্ছে ছিল।

প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার কোনো দরকার ছিল বলে মনে হয় না টাটা। আমাকে জড়িয়ে ধরল রামেসিস এবং প্রায় সাথে সাথেই আবার ছেড়ে দিল। কখন রওনা দিচ্ছি আমরা?

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব! জবাব দিলাম আমি।

এবার লুক্সরে অভিমুখে আমাদের যাত্রার কথা জানিয়ে সেখানে মদের দোকানে আস্তানা গেড়ে বসা ওয়েনেগের উদ্দেশ্যে তিনটি পায়রা ছেড়ে দিলাম। তারপর রামেসিসকে নিয়ে গেলাম রাজা হুরোতাস আর রানি তেহুতির কাছ থেকে বিদায় নিতে। আমরা সেরেনাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি শুনে দুজনেই দারুণ খুশি হলো। সেরেনার সাথে যখন আমাদের দেখা হবে তখন ওকে দেওয়ার জন্য একটা অসাধারণ উপহার আমার কাছে দিল তেহুতি। আমি ওকে প্রতিশ্রুতি দিলাম, জীবন দিয়ে হলেও এই উপহারকে রক্ষা করব আমি এবং প্রথম সুযোগেই তুলে দেব সেরেনার হাতে।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই মেমননের পাল তুললাম আমি আর রামেসিস। দক্ষিণমুখী এই যাত্রার সময় নিজেদের কাজ ঠিক করে নিলাম আমরা, সেগুলো অনুশীলনও করে নিলাম কয়েকবার। বোকাসোকা এক পাগলাটে ভড়ের ছদ্মবেশ নিলাম আমি, আর রামেসিস হলো আমার ছন্নছাড়া মনিব। রাখালরা যে বাঁকানো লাঠির সাহায্যে পশু চরায় তাই দিয়ে আমাকে এদিক-ওদিক নিয়ে বেড়াল সে। জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলি আমি, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি। গিথিয়ন বন্দরের প্রধান দরজায় বসে থাকা দুই ভিক্ষুকের কাছ থেকে কিনে আনা পোশাক পরে নিলাম আমরা দুজন। আমাদের হয়ে আমার এক চাকর পোশাকগুলো কিনেছে তাদের কাছ থেকে, ফলে কেউ আমাদের চিনে ফেলবে সে ভয় নেই। তবে পোশাকগুলো সত্যিই দারুণ ভেঁড়া, ময়লা আর দুর্গন্ধময়। সৌভাগ্যক্রমে মিশরীয় উপকূল দৃষ্টিসীমার মাঝে আসার আগ পর্যন্ত ওই পোশাকের মাঝে ঢুকতে হলো না আমাদের।

রাত নামার আগ পর্যন্ত মেমননেই অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর অন্ধকার নেমে এলে আবারও দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করলাম, যতক্ষণ না ডাঙার আবছা রেখা বোঝা যায়। মাটি দেখা গেলে মেমননের ডেকের ওপর নিয়ে আসা ছোট্ট ডিঙি নৌকাটা নামিয়ে নিলাম। তারপর জাহাজের নাবিকদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছেঁড়া কাপড়গুলো পরে উঠে পড়লাম ডিঙিতে। নাবিকরা আবার ল্যাসিডিমনের পথে রওনা দিল, আর আমরা চললাম নীলনদের নয়টা মুখের মধ্যে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ পথ ওয়াদি তুমিলাত লক্ষ্য করে।

ভোরের আলো ফুটলে দেখা গেল ইতোমধ্যে নদী ধরে চার-পাঁচ লিগ পথ এগিয়ে এসেছি আমরা। মিশরীয় নদীপথ ধরে ভেসে চলা আরো অনেকগুলো ছোট ছোট জলযানের মাঝে মিশে গেছে আমাদের নৌকা। তবে নদীর স্রোত এখন আমাদের গতিপথের বিপরীতে, ফলে সোনালি শহর লুক্সরে পৌঁছতে গিয়ে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে গেল। এই সময়ের মাঝে আমাদের অগোছালো নোংরা চেহারা আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল, দেখে মনে হতে লাগল যে আমাদের অবস্থা জন্ম থেকেই এ রকম। তাই রামেসিস যখন লাঠির মাথায় আমাকে ঠেলতে ঠেলতে ওয়েনেগের মদের দোকানে নিয়ে ঢোকাল তখন আমার এলোমেলো দৃষ্টি আর পদক্ষেপ দেখে প্রথমে ওয়েনেগ আমাদের দুজনকে চিনতেই পারল না। দোকানে ঢোকার সাথে সাথেই আমাদের বের করে দিতে চাইল সে। শেষ পর্যন্ত যখন আমাদের সত্যিকারের পরিচয় ওকে বোঝাতে সক্ষম হলাম তখন প্রথমে একেবারে অবাক হয়ে গেল সে এবং তার পরেই দারুণ খুশি হয়ে উঠল। প্রথম রাতের বেশির ভাগ সময় জেগেই কাটালাম আমরা। রাজকুমারী সেরেনাকে কোথায় আটকে রাখা হতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করলাম, সেইসাথে ওয়েনেগের দোকানের প্রধান পণ্য অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের মদ চেখে দেখলাম। সৌভাগ্যক্রমে সবগুলোই উৎকৃষ্ট স্বাদের। বোঝা গেল ওয়েনেগের রুচি বেশ অভিজাত। একই সাথে আরো। একটা কাজ করলাম আমি। রানি তেহুতি তার মেয়ে সেরেনাকে দেওয়ার জন্য যে উপহারটা দিয়েছিলেন সেটা মদের দোকানের নিচে অবস্থিত ভাড়ার ঘরে বেশ কিছু মদের বোতলের তূপের পেছনে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলাম। অন্যান্য সকল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার পর আমরা একমত হলাম যে, সেরেনাকে সম্ভবত কুখ্যাত জল্লাদ ডুগের কাছেই বন্দি করে রাখা হয়েছে। শেষবার ওকে এই লুক্সরের রাস্তায় ডুগের হাতে বন্দি অবস্থাতেই দেখা গেছে। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, উটেরিক আর তার দোসররা আমাদের এটাই বিশ্বাস করাতে চায়। হয়তো সেরেনাকে অন্য কোনো কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। উটেরিক সিংহাসনে বসার পর এমন শত শত কারাগার গজিয়ে উঠেছে পুরো দেশে। তবে এটাও ঠিক যে, প্রধান প্রধান বন্দিদের আটকে রাখার জন্য উটেরিকের প্রথম পছন্দ হচ্ছে দুঃখ-দুর্দশার ফটক। হয়তো কারাগারের নামটাই এর কারণ। এবং আমাদের মাঝে একমাত্র আমিই ওই কারাগারের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছি। ফলে আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে কারাগারের অভ্যন্তরীণ অংশের একটা মানচিত্র তৈরি করার।

আমার দৃষ্টিশক্তিও অত্যন্ত শক্তিশালী। আলো যদি ভালো থাকে তাহলে এক লিগ দূরত্বের কোনো বস্তুর গঠনও আমি খুব সহজেই চিনতে পারি। এক ঘণ্টায় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হেঁটে হেঁটে যত দূরে যেতে পারে তাকে বলা হয় এক লিগ। ফলে আরো একটা কাজ পড়ল আমার ভাগে। সেটা হচ্ছে দিনের বেলায় কারাগারের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোর ওপরে বসে বসে কারাগারের ওপর নজর রাখা। সত্যি কথা বলতে আমি নিজেই কাজটা বেছে নিলাম আমার জন্য। অর্ধ দেবী-অর্ধ মানবী সেই নারীকে এক নজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছি আমি, তা সে যত দূর থেকেই হোক না কেন। ওকে একবার দেখতে পেলে আমার সাহস আর প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় হবে, উটেরিক এবং ডুগের হাত থেকে ওকে ছিনিয়ে আনার জন্য আরো সাহসের সাথে লড়াই করতে পারব আমি।

নিজের কিছু বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় আমার জন্য দশ-বারোটা কালো রঙের ভেড়ার ব্যবস্থা করল ওয়েনেগ। এখন প্রতিদিন সকালে সেই রাখালের লাঠিটা ব্যবহার করে প্রাণীগুলোকে পাহাড়ে চরাতে নিয়ে যাই আমি, অবস্থান নিই লুক্সর এবং কারাগারের মাঝখানে অবস্থিত রাস্তাটার আশপাশে। এখানে বসে দিনের বেশির ভাগ সময় আমার কাটে ভেড়াগুলোর ওপর লক্ষ্য রেখে এবং রাস্তা দিয়ে যারা যাতায়াত করে তাদের ওপর আড়চোখে খেয়াল রেখে। খুব তাড়াতাড়িই আমি বুঝতে পারলাম কারাগারে যেসব বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মাঝে খুব কমই আবার এ পথে ফেরত আসে। সোজা কথায় কারাগার থেকে তারা আর বের হতে পারে না। ব্যাপারটা খেয়াল করে নিজের সৌভাগ্যে খুশি না হয়ে পারলাম না আমি।

স্বাভাবিকভাবেই রামেসিসও আমার সঙ্গী হতে চেয়েছিল। কিন্তু স্রেফ দুটো প্রশ্ন করেই ওকে নিরুৎসাহিত করেছি আমি। প্রথম প্রশ্নটা হচ্ছে, কখনো দেখেছ যে দুজন রাখাল মিলে মাত্র বারোটা ভেড়াকে পাহারা দিচ্ছে? আর দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে,যদি এমনটা তোমার চোখে পড়ে তাহলে কি মনের ভেতর সন্দেহ জাগবে না?

হতাশার চোটে হাত দুটো মাথার ওপরে ছুড়ল রামেসিস। আচ্ছা, তোমার যে কখনো ভুল হয় না, এটা তোমার কেমন লাগে, টাইটা?

প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি লাগত। কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেছে, ওকে আশ্বস্ত করলাম আমি।

*

এভাবে পাহারা দিতে দিতে বিশতম দিনে ভাগ্য আমার সহায় হলো। সেদিনও শহরের দক্ষিণ দিকের দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে ভেড়াগুলোকে নিয়ে বের হয়ে এলাম আমি। তখন সবে সূর্য উঠছে। ইতোমধ্যে আমাকে মোটামুটি চিনে ফেলেছে সবাই, ফলে আমি যখন বের হয়ে এলাম তখন কেউ খেয়ালই করল না। পালের মধ্যে বুড়ো ভেড়াটা পাহাড়ের দিকে যাওয়ার রাস্তা চিনে ফেলেছে। শহরতলির মাঝ দিয়ে বাকি ভেড়াগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সে। এই রাস্তাটা সাধারণত লুক্সরের সাধারণ নাগরিকরা এড়িয়ে চলে, কারণ তারা জানে এই রাস্তা কোথায় গেছে। এটাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে গণ্য করে তারা। ভেড়ার পালের সাথে সাথে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চললাম আমি। তবে প্রথম তীক্ষ্ণ মোড়টা যেখানে ঘন জঙ্গল জন্মেছে সেখানে এসেই থমকে দাঁড়াতে হলো। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না, প্রথমে শুধু ঘঘাড়ার খুরের শব্দ আর ব্রোঞ্জ-বাঁধাই করা চাকার ভারী আওয়াজ পাওয়া গেল। তার পরেই মোড় ঘুরে আমাদের সামনে এসে পড়ল চারটি রথ। আমাদের ঠিক উল্টো দিকে যাচ্ছে তারা, লুক্সর শহরের দিকে। সবার সামনের রথটা হুড়মুড় করে এসে পড়ল আমার মদ্দা ভেড়াটার ওপর। ঘাড় ভেঙে সাথে সাথে মারা পড়ল প্রাণীটা। আরো একটা ভেড়ির সামনের পা গুঁড়ো হয়ে গেল চাকার আঘাতে। করুণ সুরে ভ্যা ভ্যা করে ডাকতে লাগল প্রাণীটা। ইতোমধ্যে এই ছোট্ট ভেড়ার দলটার প্রতি বেশ মায়া জন্মে গেছে আমার। তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চাইলাম আমি।

তবে সামনের রথের চালক ইতোমধ্যে আমাকে এবং আমার নোংরা জানোয়ারগুলোকে গালাগালি করতে শুরু করেছে, সেইসাথে সমানে চালাচ্ছে। হাতে ধরা চাবুকটা। আমি সামনে এগিয়ে যেতেই মাথার কাপড়ের আবরণটা সরিয়ে ফেলল সে। সাথে সাথে উন্মোচিত হলো ডুগের সেই ভয়ানক চেহারা। ময়লা কাপড়চোপড় এবং খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর লম্বা এলোমেলো চুলে ঢেকে থাকায় আমার চেহারা চিনতে পারেনি সে। তবু সাবধানের মার নেই ভেবে তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলাম আমি, তারপর মরা ভেড়াটাকে টানতে টানতে রাস্তার পাশে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। তারপর একটা পাথর তুলে নিয়ে আহত ভেড়িটারও যন্ত্রণা চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা করলাম। রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে রথ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল ডুগ, তবে যাওয়ার আগে আমার অর্ধনগ্ন পিঠের ওপর শেষ একটা চাবুকের বাড়ি মেরে যেতে ভুল করল না। কাতর স্বরে গুঙিয়ে উঠলাম আমি। দ্বিতীয় রথটাও চলে গেল আমার পাশ দিয়ে। কিন্তু তৃতীয় রথটা আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রথের যাত্রীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি।

মাথা কামিয়ে ফেলা হয়েছে ওর, মারের চোটে ফুলে গেছে চোখ-মুখ। এক চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। পরনে একটা খাটো টিউনিক। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে সেটা, এবং শুকনো রক্ত আর নানা রকম ময়লা লেগে আছে সবখানে। কিন্তু তার পরও এখনো আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী বলে মনে হলো ওকে।

পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দিকে এক নজর তাকাল সেরেনা। সেই মুহূর্তে আমাদের মাঝে দূরত্ব ছিল খুব বেশি হলে দুই কি তিন হাত। এক মুহূর্তের জন্য আমার ছদ্মবেশের কারণে আমাকে চিনতে পারল না ও, কিন্তু তার পরেই বদলে গেল ওর অভিব্যক্তি। আনন্দ এবং বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল চোখ জোড়া, এমনকি ফুলে ওঠা চোখেও সেই আনন্দ ফুটে উঠল পরিষ্কার। আমার নাম উচ্চারণের ভঙ্গিতে নড়ে উঠল ঠোঁট জোড়া, তবে কোনো শব্দ বের হলো না। –কুঁচকে ওকে নীরবে সাবধান করলাম আমি। সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিল সেরেনা, অন্যদিকে সরিয়ে নিল চোখ। তার পরেই আমাকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল ওর রথ। আর একবারও আমার দিকে তাকাল না সেরেনা, আমাকে চিনতে পেরেছে এমন কোনো লক্ষণও দেখা গেল না ওর মধ্যে। কিন্তু আমি খেয়াল করলাম, এখন আর হতাশায় বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে না ওকে। কাঁধগুলো সোজা হয়ে উঠেছে আবার, কামানো মাথাটা এখন আগের চাইতে উঁচু হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন নতুন করে একটা আশার চাদর ঘিরে রেখেছে ওকে এবং সেটা এত দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার।

আমার নিজের মনেও নতুন আশা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, কারণ আরো একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছে। সেটা হচ্ছে ওর হাত বাঁধা হয়নি এবং সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটা আঙুলই অক্ষত আছে। ফাঁস হয়ে গেছে উটেরিকের ধোঁকাবাজি। এ ছাড়া এটাও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, ওর চেহারায় যে আঘাতের চিহ্ন ফুটে উঠেছে সেগুলো খুব শীঘ্রই মিলিয়ে যাবে, কারণ ওর শরীর স্বর্গীয়।

ডুগের রথ বাহিনী মোড় ঘুরে ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত চেহারায় নিরীহ এবং অসহায় ভাব ফুটিয়ে রেখে অপেক্ষা করলাম আমি। তার পরেই একটা উল্লসিত চিৎকার ছেড়ে হাতের লাঠিটা একদিকে ছুঁড়ে ফেলে এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াতে শুরু করলাম পাগলের মতো। নিজেকে শান্ত করতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল আমার। তারপর লাঠিটা যেখানে ফেলেছিলাম সেখান থেকে কুড়িয়ে নিয়ে শহরের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম। পালের ভেড়াগুলো হঠাৎ করে আমাকে এভাবে পালাতে দেখে ভয় পেয়ে গেল, ব্যা ব্যা করে ডাকতে ডাকতে পিছু নিল আমার। তবে দৌড় প্রতিযোগিতায় ওদের হারিয়ে দিলাম আমি। ওয়েনেগের মদের দোকানে যখন পৌঁছলাম তখনো বেশ অনেকটা পেছনে পড়ে রয়েছে ভেড়ার দল।

মদের দোকানের নিচে গোপন আস্তানায় খুঁজে পাওয়া গেল ওয়েনেগ আর রামেসিসকে। লুক্সরে নিজের আগমনের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্ক আছে এমন সব জিনিস এখানেই রাখে ওয়েনেগ, একেবারে উটেরিকের নাকের নিচে। এগুলোর মাঝে রয়েছে ল্যাসিডিমন এবং লুক্সরের মাঝে সংবাদ আদান প্রদানের জন্য ব্যবহৃত কবুতরের বেশ কয়েকটা খাঁচা এবং প্রচুর পরিমাণে তীর-ধনুক এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র।

ওকে পেয়ে গেছি আমি! ভেতরে ঢুকেই দুজনকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।

অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল দুজন, তারপর একই সাথে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল কাকে?

সেরেনাকে, আবার কাকে! উত্তেজিত গলায় জবাব দিলাম আমি।

বলো, দ্রুত পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো রামেসিস। কোথায় ও? আমার কাঁধ চেপে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল সে। ও ঠিক আছে তো? ওর ওপর কোনো অত্যাচার করেনি তো শয়তানগুলো? যত দ্রুত সম্ভব…

রামেসিসের উত্তেজনা কমে আসার জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো আমাকে। তারপর বললাম, ডুগ আটকে রেখেছে ওকে সেই দুঃখ-দুর্দশার ফটকে। আজ সকালে রথে করে সেরেনাকে নিয়ে এদিকেই আসছিল সে… এই বলে দ্রুত কয়েক কথায় রামেসিসকে বুঝিয়ে বললাম যে, ডুগ সম্ভবত সেরেনাকে নিয়ে লুক্সরে উটেরিকের প্রাসাদে গেছে। হয়তো আরো এক দফা জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হবে সেরেনার ওপর। এটাও বললাম যে, সেরেনার কপালে এর পরে কী ঘটতে পারে বলে আমার ধারণা।

ওকে মারধর করা হয়েছে। মুখ আর হাত-পায়ে মারের দাগ লেগে আছে এখনো, তবে চিরস্থায়ী কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না। এবং উটেরিক যেমন হুমকি দিয়েছিল সেই অনুযায়ী ওর কোনো আঙুল বা শরীরে অন্য কোনো অংশ কেটে ফেলা হয়েছে বলেও আমার মনে হয়নি। আমি যতটা দেখলাম ওর দৃষ্টি অথবা মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। নিজের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ এবং সতর্ক ছিল ও। সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক, কারণ বন্দি হিসেবে ওর গুরুত্ব উটেরিকের কাছে অনেক বেশি। কিছুতেই ওর বড় কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারে না সে। এই কথাগুলো বলার পর কিছুটা শান্ত হয়ে এলো রামেসিস আর ওয়েনেগ। এবার আমার ঠাণ্ডা মাথায় সাজানো পরিকল্পনার কথা খুলে বললাম ওদের কাছে।

সেরেনাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার জন্য এর চাইতে ভালো সুযোগ আর আমাদের সামনে আসবে বলে আমার মনে হয় না। কারাগার থেকে নিরাপদ কোনো জায়গায় সরিয়ে আনতে হবে ওকে। ডুগ যদি একবার ওকে নিয়ে আবার কারাগারের দরজার ওপাশে ঢুকে পড়তে পারে তাহলে সেরেনাকে উদ্ধার করার কোনো উপায়ই থাকবে না। এবং আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, কারণ কারাগারের ভেতরে আমি ঢুকেছি এবং জানি যে কাজটা কত কঠিন! কেউই আমার সাথে তর্ক করার কোনো চেষ্টা করল না। কিন্তু রামেসিসের চেহারায় একই সাথে আশা আর নিরাশা খেলা করতে শুরু করল।

তাহলে বলো কী করতে হবে আমাদের, অনুনয়ের সুরে বলল সে।

আমার পরিকল্পনাটা এ রকম, ওদের বললাম আমি। আমরা জানি যে এই মুহূর্তে সেরেনা কারাগারের বাইরে রয়েছে। উটেরিক তার পোষা জল্লাদ ডুগকে নির্দেশ দিয়েছে সেরেনাকে তার প্রাসাদে নিয়ে আসতে। তার উন্মাদ মস্তিষ্ক কেন এই কাজ করতে চাইল তা আন্দাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, হয়তো সেরেনার ওপর আরো অত্যাচার চালাতে চায় সে; অথবা অপমান করতে চায়, কে জানে। তবে এটা ঠিক যে, আজ সন্ধ্যার আগেই সেরেনাকে নিয়ে কারাগারে ফিরে আসার চেষ্টা করবে ডুগ। তাই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি আজ দুপুর থেকে সূর্যাস্তের মাঝে কোনো একসময়ে ওই একই রাস্তা ধরে ফিরে যাবে ডুগ, যেখানে সকালে তার সাথে দেখা হয়েছে আমার। এই পর্যন্ত বলে ওয়েনেগের দিকে ফিরলাম আমি। প্রশ্ন করলাম, আজ দুপুরের আগে কতজন দক্ষ এবং বিশ্বাসী লোক জোগাড় করতে পারবে তুমি?

মাত্র কয়েক মুহূর্ত নীরবে চিন্তা করল ওয়েনেগ, আঙুলে কর গুনল কয়েকবার। তার পরই জবাবটা প্রস্তুত হয়ে গেল তার মুখে। বারোজনের কথা নিশ্চিত বলতে পারি, বলল সে। ভাগ্য যদি ভালো থাকে তো পনেরোজন। তবে এরা সবাই উটেরিকের চরম শত্রু এবং জাত যোদ্ধা। তবে এটা জানা নেই যে, ওদের সবার কাছে নিজস্ব ঘোড়া আছে কি না।

মাথা ঝাঁকালাম আমি। অস্ত্র থাকলেই চলবে। ভালো ঘোড়া কোথায় পাওয়া যাবে সেটা আমি জানি। তার মানে আন্দাজ করা যাচ্ছে যে ভুগের দলবলের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি সমান সমানই থাকবে। উপরন্তু ওদেরকে চমকে দেওয়ার মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা থাকবে আমাদের হাতে।

আমি যেটা নিশ্চিত বলতে পারি সেটা হচ্ছে, এখানে বসে এক দল বুড়ি মহিলার মতো বকবক করে কোনো কাজই হাসিল করতে পারব না আমরা। অস্থির হয়ে উঠেছে রামেসিস, কামরার ভেতরে পায়চারি করছে অনবরত। সেরেনার বিপদের কথা শুনে যেমন কষ্ট পাচ্ছে তেমনি ওকে উদ্ধার করার একটা সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে উত্তেজিতও হয়ে উঠেছে। তবে রওনা দেওয়ার আগে আরেকটু দেরি করলাম আমি, মদের বোতলের তূপের ওপাশ থেকে তেহুতির দেওয়া সেই উপহারটা বের করলাম, যেটা ওর মেয়েকে দেওয়ার জন্য ল্যাসিডিমনে থাকতে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল সে। জিনিসটা আমার ছেঁড়া ময়লা পোশাকের ভেতরে পিঠের সাথে বেঁধে নিলাম আমি। তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা না হলে এখন কেউ ওটা খুঁজে পাবে না।

এবার ওয়েনেগকে কিছু জিনিসপত্রের একটা তালিকা দিলাম, যেগুলো ওর লোকদের অবশ্যই সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। ডুগের সাথে যেখানে আমার দেখা হয়েছিল তার চাইতেও আধ লিগ দূরে একটা ঝরনা বয়ে গেছে পথের মাঝ দিয়ে। একটা পাথরের সেতু দিয়ে পথ করা হয়েছে সেখানে। ঠিক হলো ওখানেই দেখা হবে আমাদের। ওয়েনেগকে পই পই করে বলে দিলাম যে আমাদের দলের প্রত্যেক সদস্য যেন দুপুরের অন্তত এক ঘণ্টা আগেই সেখানে উপস্থিত থাকে। জানি যে এত অল্প সময়ের মাঝে প্রস্তুত হওয়া প্রত্যেকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ইচ্ছে করেই একটু অল্প সময় বেঁধে দিলাম ওদের, যেন পথে কেউ দেরি করে না বসে।

*

ওদিকে আমার ন্যাওটা ভেড়াগুলো তখন মদের দোকানের পেছনে উঠানে এসে অপেক্ষা করছে। আরো একবার শহরের দক্ষিণ ফটক দিয়ে বের হয়ে এলাম আমরা, অলস পায়ে পথ চলছি। স্বাভাবিকভাবেই ঝরনার ওপর সেই সেতুর গোঁড়ায় যেখানে আমাদের মিলিত হওয়ার কথা সেখানে সবার আগে আমিই পৌঁছে গেলাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েনেগের যোদ্ধারা এক এক করে পৌঁছতে শুরু করল। ওয়েনেগকে আগেই বলে দিয়েছিলাম লোকজনের সন্দেহের চোখ এড়ানোর জন্য একসাথে দুজনের বেশি যেন কেউ না আসে। তাই করেছে ওরা, একজন দুজন করে এসে পৌঁছাচ্ছে। প্রত্যেকের কাছেই রয়েছে পর্যাপ্ত অস্ত্র। এই উত্তাল বিপদসংকুল সময়ে একা একা চলাফেরা করছে। এমন যে কারো জন্য অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।

যেমনটা ভেবেছিলাম, নির্ধারিত সময়ের মাঝে পৌঁছতে পারল না সবাই। নির্দিষ্ট জায়গায় যখন শেষ ব্যক্তিটি এসে পৌঁছল তখন বিকেলের মাঝামাঝি। তবে শেষ পর্যন্ত তেরোজন দক্ষ এবং সশস্ত্র যোদ্ধাকে পেয়ে গেলাম আমি। সেতুর আগে পথের দুই পাশে জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকতে বললাম তাদের সবাইকে।

এই তেরোজনের মাঝে সবাই হিকসসদের বিরুদ্ধে অন্তত একটা যুদ্ধে লড়াই করেছে আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ফলে আমাকে সহজেই চিনতে পারল সবাই এবং আবার দেখতে পেয়ে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। আসন্ন লড়াইয়ে কার ভূমিকা কী হবে সেটা কাউকে একবারের বেশি দুবার বুঝিয়ে দেওয়া লাগল না। এ ধরনের আগের লড়াইয়ে আগেও অংশ নিয়েছে ওরা এবং কেউই কখনো ব্যর্থ হয়নি।

নিজের জন্য এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছি আমি, যেখান থেকে লুক্সর থেকে আসা পথটার অনেকখানি অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। অপেক্ষা করতে করতে অস্থির হয়ে উঠেছি, এই সময় দেখলাম দূরে ধুলো উড়ছে। শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে রথের একটা সারি, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এখন উঠে আসছে আমাদের দিকেই। ভুগের সাথে আজ সকালে যেখানে আমার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছিল সেই জায়গাটা পেরিয়ে এলো ওরা দেখতে দেখতে। কাছে আসতে দেখলাম দ্রুত গতিতে রথ ছুটিয়েছে ওরা, তবে বেশ ঢিলেঢালা মেজাজে আছে সবাই। বুঝলাম আজ সকালে আমার সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা থেকে ঠিকই কিছু একটা সন্দেহ করেছিল ডুগ। তবে এখন আর সেই সন্দেহ নেই তার মনে, কারণ ফেরার পথে কোনো বিপদের গন্ধ পাচ্ছে না সে। এবং পরিকল্পনা সাজানোর সময় ঠিক এই ব্যাপারটার ওপরেই নির্ভর করেছিলাম আমি। সত্যিকারের প্রতিভার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হচ্ছে সঠিক দূরদৃষ্টি।

এবার আমার ফাঁদের আওতায় চলে এলো ওরা, কেউ এখনো কিছু বুঝতে পারেনি। চিৎকার করে একে অপরের সাথে ঠাট্টা করছে চালকরা, ঘোড়াগুলোকে তাড়া লাগাচ্ছে। দেখলাম এবারও তৃতীয় রথের ওপরই রয়েছে। সেরেনা। এটাও আমার পরিকল্পনা সাজানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইচ্ছে করেই অন্য যযাদ্ধাদের সামনে রেখেছি আমি, যাতে সবার আগে সেরেনার কাছে পৌঁছতে পারি।

সরাসরি সামনে তাকিয়ে আমাদের অবস্থান পার হয়ে গেল প্রথম রথের চালক। পথের দুই পাশে ঘন জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকায় আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে এক চুলও সন্দেহ করেনি সে। তাকে অনুসরণ করে দ্বিতীয় রথও সেতুর ওপর উঠে পড়ল। এই রথে বসে আছে কালো আলখাল্লা পরা ডুগ। তার পরেই তৃতীয় রথ অর্থাৎ সেরেনার রথ চলে এলো আমার সামনে। আমার অবস্থান জানা না থাকায় কিছুই বুঝতে পারল না ও, যদিও এত কাছ থেকে ওকে দেখতে পেয়ে দ্রুত হয়ে উঠল আমার হৃদস্পন্দন। তার পরেই চতুর্থ ও শেষ রথটা উঠে পড়ল সেতুর ওপরে।

এবার আর ওদের ফেরার কোনো পথ নেই। সরু সেতুর ওপর এতটা জায়গা হবে না যে, কোনো একটা রথ সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে ছুটতে শুরু করবে। যে ফাঁদ পেতেছি আমি তা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই কারো।

দুই আঙুল মুখের ভেতর পুরে তীক্ষ্ণ স্বরে শিস দিলাম আমি। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে এই শব্দের সাথে সাথে আক্রমণ করা হবে। অনেক অনুশীলন করে এই শিস দেওয়া আয়ত্ত করেছি আমি। কাছ থেকে শুনলে কানে তালা লেগে যায়, এত তীক্ষ্ণ শব্দ। কিন্তু এমনকি যুদ্ধের হট্টগোলের ভেতরেও অনেক দূর থেকে শোনা যায় এই শিস। এই শব্দেরই অপেক্ষা করছিল আমার লোকেরা। সাথে সাথে কাজ শুরু করে দিল তারা।

সেতুর অন্য প্রান্তে হাতুড়ি নিয়ে দুজনকে মোতায়েন রেখেছিলাম আমি। সেতুর দুই পাশে নিচু জায়গায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে ছিল তারা। আমার শিসের শব্দ শুনেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো লুকানোর জায়গা ছেড়ে, সামনে এগিয়ে এলো। দুজনের হাতেই রয়েছে ভারী পাথরের তৈরি বিশাল হাতুড়ি। প্রথম রথের দুই চাকার সবগুলো শিক চূর্ণ হয়ে গেল তাদের হাতুড়ির আঘাতে। ভেঙে পড়ল চাকাগুলো। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এমন আকস্মিক আক্রমণের মুখে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল চালক আর তার সঙ্গী। গাড়ি থেকে উড়ে দূরে গিয়ে পড়ল তারা। তাদের গাড়ির ভাঙা অংশে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেল সেতু ছেড়ে নামার পথ, ফলে পেছনের বাকি রথগুলো একটার সাথে আরেকটা ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল সাথে সাথে।

এবার সেতুর ওপর পুরোদমে আক্রমণ চালালাম আমি। আমাদের যুদ্ধ হুংকারে আরো চমকে গেল রথের চালক আর তাদের ঘোড়াগুলো। এদিক-ওদিক পালানোর চেষ্টা করল তারা, ফলে আরো জট বেঁধে গেল রথের দড়িদড়ায়। একটা ঘোড়া পা ফসকে সেতুর ওপর থেকে পড়ে গেল নিচে। কিন্তু সম্পূর্ণ পড়তে পারল না, দড়িতে পঁাচ খেয়ে ঝুলে রইল মাঝপথে। ভয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আর সেইসাথে অন্য ঘোড়াগুলোকেও নিজের ওজনের কারণে টেনে নিচ্ছে নিচের দিকে। রথচালকরা সবাই পরস্পরের উদ্দেশ্যে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। তাদের মাঝে সবচেয়ে জোরে চেঁচাচ্ছে ডুগ। সবাই প্রচণ্ড পরিমাণে বিভ্রান্ত, কেউ বুঝতে পারছে না কী করবে।

ওদিকে ইতোমধ্যে রানি তেহুতির দেওয়া উপহারটা বের করে ডান হাতে নিয়ে নিয়েছি আমি। খাপ থেকে বের করার সাথে সাথে সূর্যের আলোতে ঝলক দিয়ে উঠেছে তলোয়ারটার নীলচে ফলা। পৃথিবীতে আর কোনো ধাতুর তৈরি তলোয়ারের সাধ্য নেই তীক্ষ্ণতার দিক দিয়ে একে হারায়। এই তলোয়ার যেন প্রলয়ের আরেক নাম।

সেরেনা! হট্টগোল ছাপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমি। চরকির মতো ঘুরে তাকাল সেরেনা এবং দেখতে পেল আমাকে।

টাটা! চিৎকার করে উঠল ও। আমি জানতাম তুমি আসবে। মনে হলো যেন এই মুহূর্তে আরো বেড়ে গেল ওর সৌন্দর্য এবং বাড়িয়ে দিল আমার উৎসাহ। ধরো! বলেই তলোয়ারটা মাথার ওপর এক পাক ঘোরালাম আমি এবং ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে। ডান হাত সম্পূর্ণ বাড়িয়ে দিল সেরেনা, তারপর তলোয়ারটা মাথার ওপর আসতে শূন্যেই খপ করে ধরে ফেলল। এবার অন্য হাতটা রথের কিনারে রেখে এক লাফে বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। মনে হলো যেন ফুলের ওপর হালকা পায়ে এসে নামল কোনো ছোট্ট পাখি। নেমেই তীরবেগে ছুটতে শুরু করল ও।

ডুগ! ছুটতে ছুটতেই ডেকে উঠল সেরেনা। ওই কুৎসিত নামটাও যেন অদ্ভুত সুন্দরভাবে বেজে উঠল ওর কণ্ঠস্বরে। স্বাভাবিকভাবেই ওর দিকে ফিরে তাকাল ডুগ। হালকা পায়ে ছুটে তার কাছে পৌঁছে গেল সেরেনা, পাগুলো যেন মাটিকে স্পর্শই করছে না। ওর হাতে ধরা উজ্জ্বল ধাতব ঝিলিকটা দেখতে পেল ডুগ এবং বুঝতে পারল যে অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন আর ওর নিজের তলোয়ার বের করার সময় নেই। বুঝে নিল সাক্ষাৎ মৃত্যু ছুটে আসছে ওর দিকে। সাথে সাথে রথের ভেতর ঝুঁকে বসে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল সে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে গেল ব্যাটা। বাতাসে লাফিয়ে উঠল সেরেনা, তারপর শূন্যে থাকতেই তলোয়ারের ফলা নামিয়ে আনল রথের ভেতরের অংশে। দেখলাম নীলচে ফলাটা প্রায় অর্ধেক ঢুকে গেল ভুগের কালো আলখাল্লা ভেদ করে। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল ডুগ, মাথাটা ঝটকা দিয়ে উঠে গেল ওপরে। যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে আছে মুখ, ফলে এর আগে যা দেখেছিলাম তার চাইতেও কুৎসিত লাগছে তাকে দেখতে।

সাবলীল ভঙ্গিতে তার পিঠ থেকে তলোয়ারটা বের করে আনল সেরেনা। ফলার অর্ধেক অংশ লাল হয়ে গেছে ভুগের রক্তে। এবার তলোয়ারটা উল্টো দিকে আঘাত করার ভঙ্গিতে নিখুঁতভাবে ঘুরিয়ে ধরল ও। লাফিয়ে উঠে একটা চক্কর দিল সেরেনা, মনে হলো ওর হাতের তলোয়ারটা যেন পরিণত হয়েছে এক ফালি সূর্যের আলোতে।

লাফ দিয়ে ডুগের দেহের বন্ধন থেকে ছিন্ন হলো তার মাথা, গড়িয়ে পড়ল রথের ভেতরে। দীর্ঘ একটা মুহূর্তের জন্য মাথাহীন ধড়টা হাঁটু গেড়ে বসে রইল, তার পরেই ফিনকি দিয়ে উজ্জ্বল রক্ত বেরিয়ে এলো তার কাটা গলা থেকে। ধপ করে রথের ভেতর পড়ে গেল ডুগের মৃতদেহ।

এসো ছেলেরা! এবার আমার বাকি যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে ডাক দিলাম আমি। সেরেনার শ্বাসরুদ্ধকর তলোয়ারবাজি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে সবাই। বাকি কুকুরগুলোর ব্যবস্থা করা যাক! অন্যান্য রথের আরোহীর দিকে ইঙ্গিত করে নির্দেশ দিলাম এবার।

না, টাইটা! প্রায় সাথে সাথেই চিৎকার করে আমাকে বাধা দিল সেরেনা। ছেড়ে দাও ওদের। ওরা সবাই ভালো লোক। ওদের কারণেই আমার ওপর নির্যাতন চালাতে গিয়েও পারেনি ডুগ।

রথের আরোহীদের মুখে এবার স্বস্তির ছায়া পড়তে দেখলাম আমি। ওরা জানে যে মৃত্যু ওদের কতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল।

যত দিন বেঁচে থাকবে তার প্রতিটা দিন মহামান্যা রাজকুমারীকে ধন্যবাদ জানানো উচিত তোমাদের, ওদের উদ্দেশ্য করে ধমকে উঠলাম আমি। তবে ইচ্ছে করেই কথাটা বলার সময় মৃদু হাসি ফোঁটালাম ঠোঁটের কোনায়। তারপর হঠাৎ করেই আমাদের পেছন দিক থেকে একটা উচ্চকিত গলার চিৎকার ভেসে এলো।

সেরেনা! তুমি ছাড়া আর কেউ হতে পারো না! তোমার গলা শুনেই চিনতে পেরেছি আমি। যেখানেই থাকি না কেন তোমার কণ্ঠস্বর চিনতে কখনো ভুল হবে না আমার। মুহূর্তের মধ্যে নিজের অবস্থান ছেড়ে দৌড়ে সামনে এগিয়ে এলো যুবরাজ রামেসিস।

দুর্ধর্ষ তলোয়ারবাজ সেরেনা, একটু আগেই যে নিজের তলোয়ারের আঘাতে কুখ্যাত ডুগের মাথা ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছে সেই এবার এমনভাবে চিৎকার করে উঠল যেন তাকে হঠাৎ গরম কয়লার ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেউ। রামেসিস! রামেসিস! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এখনো ল্যাসিডিমনেই আছো। ওহ, হাহোর আর হোরাসকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে তুমি আমাকে উদ্ধার করতে এত দূর ছুটে এসেছ!

দৌড়ে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল প্রেমিক-প্রেমিকা, এবং এমন অদম্য উৎসাহের সাথে তারা কাজটা করল যে ঝনাৎ করে বাড়ি খেল তাদের তলোয়ারের ফলা। খুব সম্ভব তাদের দাঁতও একইভাবে বাড়ি খেয়েছিল, যদিও সেটা বোঝা যায়নি। সেরেনাকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে অবাক হলাম না আমি, তবে বেশ মেজাজ খারাপ হলো। রামেসিসের অবস্থাও খুব একটা ভালো মনে হলো না। ওদের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, তারপর দুজনকে নিজেদের সামলে ওঠার সময় দিয়ে আক্রমণের পরবর্তী পর্যায় শুরু করার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করলাম বাকিদের।

*

ডুগের মৃতদেহটা স্রেফ সেতুর ওপর থেকে টেনে নিচের নালায় ফেলে দিয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হলো। তবে তার মাথাটা রেখে দিলাম আমি, একটা ঘোড়ার খাবারের থলেতে ভরে রাখলাম। পরে দেখা যাবে কী করা যায় ওটা নিয়ে। তার পরনের কালো আলখাল্লা অবশ্য এখনই আমার কাজে লাগবে। কাপড়গুলো অবশ্য আমার হালকা-পাতলা শরীরের জন্য খুব বেশি ঢোলা হয়ে গেল। তবে কী আর করা, তাই ডুগেরই আরো কিছু বাড়তি কাপড় পরে কোনোমতে মানিয়ে নিলাম নিজেকে। কাপড়গুলোতে এখনো সেরেনার আঘাতের ফলে বের হওয়া রক্ত লেগে আছে। যে রথটার চাকা ভেঙেছে সেটাকে রেখে যাওয়া লাগল। বাকি তিনটি রথে গাদাগাদি করে উঠলাম আমরা সবাই, তারপর রওনা দিলাম দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই কারাগারের দিকে। আগের আরোহীদের সাথে এখন যোগ হয়েছি আমি, রামেসিস এবং ওয়েনেগের তেরো যোদ্ধা। সৌভাগ্যক্রমে এখান থেকে আমাদের গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়। তা ছাড়া পথ কোথাও বেশি খারাপ হয়ে এলে অনেকেই নেমে রথ ঠেলতে হাত লাগাল।

সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্ত স্পর্শ করেছে সেই সময় কারাগারের সামনে এসে পৌঁছলাম আমরা। সবচেয়ে সামনের রথটার ওপর বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে মহা আরামে বসে আছি আমি, মাথার ওপর টেনে দিয়েছি কালো কাপড়। আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে সেরেনা। পরনে সেই বন্দির পোশাক, হাতগুলো ইচ্ছে করেই সবাইকে দেখিয়ে সামনে বেঁধে রাখা। অভিনেত্রী হিসেবে ওর জুড়ি মেলা ভার। এই মুহূর্তে ওকে দেখে মনে হচ্ছে নিতান্ত অসহায়, হতাশ একটা মানুষ। তবে ইচ্ছে করলে ঝকঝকে সাদা দাঁত দিয়ে একটা টান মেরেই হাতের ফস্কা গেরো খুলে ফেলতে পারবে ও। তার ওপর ওর পায়ের কাছে কিছু খড় দিয়ে ঢেকে রাখা রয়েছে নীলচে সেই তলোয়ারটা। রামেসিস আমাদের দুজনের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তলোয়ার খাপে পুরে রেখেছে সে, চেহারা ঢেকে রেখেছে একটু আগে সেরেনার বদৌলতে বেঁচে যাওয়া প্রহরীদের একজনের শিরস্ত্রাণের সাহায্যে। ফারাও টামোসের অন্যতম প্রিয় পুত্র হিসেবে তার চেহারা মিশরের প্রায় সবাই খুব ভালোভাবেই চেনে। এই মুহূর্তে তাই সবার সামনে মুখ দেখানো উচিত হবে না ওর।

সূর্যাস্তের সময়টাকে কারাগারের ফটকে পৌঁছানোর উপযুক্ত সময় হিসেবে নির্বাচন করেছি আমি, কারণ ওই সময়েই দৃষ্টিসীমা সবচেয়ে কম থাকে। তবে আমরা পৌঁছনোর সাথে সাথেই অবশ্য খুলল না দরজা। ভেতরে যেসব প্রহরীরা রয়েছে তারা বেশির ভাগই সদ্য মৃত ডুগের ভাই, ছেলে অথবা আত্মীয়স্বজন। সকালে যারা বেরিয়ে গিয়েছিল তাদের রথ এবং লোকসংখ্যার সাথে, এখন যারা ফিরে এসেছে তাদের সংখ্যায় মিল নেই দেখে নানা রকম প্রশ্ন ছুড়ল তারা। আমাদের দলের কয়েকজন তাদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল যে, ফেরার পথে খাদে পড়ে একটা রথ হারিয়েছে তারা এবং কয়েকজন মারা পড়েছে তাতে। এ ছাড়া সম্প্রতি যে কয়েদিকে এই কারাগারে আনা হয়েছে তার কারণে কারাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বাড়াতে চেয়েছেন ফারাও উটেরিক, এবং সে কারণেই বাড়তি লোক পাঠিয়েছেন তিনি।

ইচ্ছে করেই অবশ্য এই হইচই আর বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি আমি। কারণ আমি চাই যত বেশি সম্ভব প্রহরী এবং কারাগার কর্মচারী এসে জড়ো হোক প্রবেশমুখে। তাতে করে একবারেই ওদের সবার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব আমরা, কারাগারের ভেতরে ঢুকে এক এক করে খুঁজে খুঁজে মারতে হবে না। অজস্র অলিগলি, উঠান আর কামরা রয়েছে এই কারাগারের ভেতরে।

যখন মনে হলো যে আমার এই বুদ্ধিতে কাজ হয়েছে, কমপক্ষে ত্রিশজনের মতো প্রহরী এসে জড়ো হয়েছে আমাদের সামনে উঠিয়ে রাখা টানা সেতুর ওপরে তখন রথের ওপর উঠে দাঁড়ালাম আমি। তারপর ভুগের নিখুঁত অনুকরণে ফেটে পড়লাম তীব্র রাগে। কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকায় আমার মুখ দেখতে পেল না কেউ; কিন্তু দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় কুৎসিত সব গালিগালাজ ঝাড়তে লাগলাম আমি। অনেকের নামও আমার জানা আছে, ফলে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হলো আমার অভিনয়। হবে না-ই বা কেন, স্বয়ং ভুগের কাছ থেকেই এগুলো শিখেছি আমি। মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় যে ইচ্ছে করলে দারুণ অভিনেতাও হওয়া সম্ভব ছিল আমার পক্ষে। এবং এবারও সেই ধারণা সত্যি প্রমাণিত হলো। ডুগের আত্মীয়দের মাঝে কেউ একটুও সন্দেহ করল না যে তাদের সাথে যেই লোকটা কথা বলছে সে ডু