একটা ঢোক গিলে মাকডাস-এ ঢুকলেন নাহুত, টর্চ হাতে তার পেছনেই থাকলেন নও। টর্চের আলো উপহার সামগ্রী ভরা শেলফ, রঙিন কাঁচ আর মূল্যবান পাথর, তামা আর রুপো, সোনা আর দেয়ালচিত্রের উপর নাচানাচি করছে। আলোটা থামলো উঁচু সিডার কাঠের বেদির উপর, উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এপিফানি মুকুট, পানপাত্র আর রুপালি কপটিক ক্রস।
বেদির সামনে! উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলো নাহুত। গ্রিল লাগানো দরজা। এখান থেকেই পোলারয়েড ছবি তোলা হয়েছে! গ্রিল ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন। আলো, আলো!
কাপড় মোড়া ট্যাবট পাথরটাকে পাশ কাটিয়ে তাঁর দিকে ছুটে এলেন কর্নেল, গ্রিলের ভেতর টর্চের আলো ফেললেন।
এতোক্ষণ চিৎকার করছিলেন নাহুত, এখন গলা থেকে আওয়াজ বের হতে চাইছে না, আবেগে ফিসফিস করছেন, এগুলো প্রাচীন দেয়ালচিত্র। কোনো সন্দেহ নেই, ক্রীতদাস টাইটার কাজ! কর্নেলের দিকে তাকালেন তিনি। দরজাটা ভাঙতে বলুন!
কিন্তু প্রাচীন হলেও কাঠামোটা এখনো সাংঘাতিক মজবুত, সবাই মিলে চেষ্টা করেও নড়ানো গেল না। কর্নেলের নির্দেশে কয়েকজন ট্রুপারকে নিয়ে একজন জুনিয়ার অফিসার ছুটলো সন্ন্যাসীদের কোয়ার্টার সার্চ করতে, গ্রিলের গেট ভাঙার জন্য যন্ত্রপাতি দরকার।
ওরা চলে যেতে গ্রিল গেটের দিকে পেছন ফিরলেন কর্নেল। ফলকটার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, বলে মাকডাস-এর চারদিকে টর্চের আলো ফেললেন। কাপড় মোড়া ট্যাবট পাথরে স্থির হলো আলো। বোধহয় এটাই! রূপো আর সোনার তৈরি সুতোয় এমব্রয়ডারি করা কাপড়টা ভারী বলে মনে হলো। সেটা ধরে টান দিলেন নগু।
টাইটার স্টোন টেস্টামেন্ট, খোদাই করা ফলক বা পিলার, উন্মোচিত হলো। ফটোতে এ পাথরটাই দেখেছি আমরা! বিড়বিড় করলেন তিনি। হের ফন শিলার এটাই চেয়েছেন। আমরা সবাই রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেলাম!
এগিয়ে এসে ফলকটার সামনে হাঁটু গাড়লেন নাহুত, আলিঙ্গন করলেন পাথরটাকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন।
এই সময় মাকডাসে ফিরে এলো জনিয়ার অফিসার। কোথাও থেকে মরচে ধরা একটা কোদাল পেয়েছে সে, কাঠের হাতল সহ।
গ্রিল গেট ভাঙার পর সমাধির ভেতর প্রথমে ঢুকলেন নাহুত। ধুলোর ভেতর দিয়ে ছুটে এসে প্রাচীন কাঠের কফিনের সামনে হাঁটুগেড়ে বসলেন। তার পেছনে এসে টর্চের আলো ফেললেন কর্নেল কফিনের উপর।
কফিনের ভেতর যে মানুষটা শুয়ে আছেন তার ত্রিমাত্রিক ছবি আঁকা হয়েছে-শুধু কফিনে পাশগুলোয় নয়, ঢাকনির উপরও। দেয়ালচিত্র আর কফিনের ছবি যে একই শিল্পীর আঁকা, সেটা স্পষ্ট।
সমাধির উপর দেয়াললিপির দিকে মুখ তুললেন নাহুত। তারপর আবার কফিনের দিকে তাকালেন। সোনালি চুলের বীরযোদ্ধার ছবির নিচে লেখাগুলো পড়লেন তিনি। ট্যানাস, লর্ড হেরাব। ভাবাবেগে কেঁপে গেল তাঁর গলা, সশব্দে ঢোক গিললেন। সপ্তম স্ক্রোলের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। ফলক আর কফিন পেয়ে গেছি আমরা। এগুলো মহামুল্যবান ট্রেজার। হের ফন শিলার আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠবেন।
যদি আপনার কথা সত্যি হয়, বললেন নগু। মনে রাখবেন, তা না হলে কিন্তু গর্দান হারাতে হবে। হের ফন শিলার অত্যন্ত ডেঞ্জারাস মানুষ।
ফলক আর কফিনটা মঠের বাইরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করুন, কর্নেল, অভয় দিয়ে হাসলেন নাহুত। এগুলো কপ্টারে তুলে পেগাসাস ক্যাম্পে নিয়ে যেতে পারলে বস্তা বস্তা টাকা পাবেন আপনি।
কয়েকজন লোককে লাগিয়ে দেওয়া হলো, ফলকের চারপাশ থেকে চৌকো পাথরের ভিত ভাঙার কাজ শুরু হলো। ভিত থেকে ফলকটা মুক্ত করার পর নাহুত আন্দাজ করলেন, কম করেও আধ টন ওজন হবে। সন্ন্যাসীদের করুণ আবেদনে কান না দিয়ে মিডল চেম্বার থেকে উলেন পর্দা ছিঁড়ে নিয়ে এলেন তিনি, সেই পর্দা দিয়ে কফিন আর ফলক মোড়া হলো। দশজন স্বাস্থ্যবান ট্রুপার ফলকটা বহন করবে। কফিন নিয়ে রওনা হবে তিনজন। বাকি সাতজন এসকর্ট হিসেবে থাকবে।
ফলক আর কফিন নিয়ে মিছিলটা রওনা হলো। পথ তৈরি করার জন্য বসে থাকা সন্ন্যাসী আর পুরোহিতদের লাথি মারছে ট্রুপাররা। তারপর হঠাৎ প্রায় একযোগে কপাল ও বুক চাপড়ে হায় হায় করে উঠলেন সন্ন্যাসী ও ভক্তবৃন্দ। ট্রপাররা রাইফেলের গুতো মারছে তাদেরকে, কারো কারো বাহু আর পাঁজরে। বেয়নেটের ডগাও ঢুকে গেল। চিৎকার, কান্না, প্রতিবাদ ক্রমশ বাড়ছে। উপাসকরা কেউ কেউ লাফ দিয়ে সোজা হলেন, সন্ন্যাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পরস্পরকে উৎসাহ দিচ্ছেন। দেখতে দেখতে ধর্মীয় একটা উন্মাদনা দানা বেঁধে উঠলো। সবার চোখে মুখে আক্রোশ আর হিংস্রতা ফুটে উঠেছে, যেনো পবিত্র পলক আর মহামান্য সেইন্টের কফিন রক্ষা করার জন্য জান দিতেও পিছপা হবেন না তারা।
উত্তেজনা ও হৈ-চৈ তুঙ্গে উঠলো, এ সময় সরু কাঠির মতো কাঠামো নিয়ে। সোজা হলেন প্রধান পুরোহিত জালি হোরা। তাঁর দাড়ি আর আলখেল্লায় রক্ত লেগে রয়েছে, চোখ দেখে মনে হবে বদ্ধ উন্মাদ, লালচে আর নিষ্পলক। থেতলানো ঠোঁট আর চামড়া তোলা গাল থেকে অদম্য একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো, তীরবেগে ছুটলেন তিনি। রঙ করা কাকতাড়ুয়ার মতো লাগছে, ছুটে আসছেন কর্নেল নগুকে লক্ষ্য করে।
কর্নেল নগু গর্জে উঠলেন, আরে, পাগলটা করে কি! হাতে ধরা রাইফেলের বেয়নেট সামনে তাক করলেন। এটা কি দেখতে পাচ্ছ, হাঁদারাম?
